২.১৬ ভেরেস্তিতে এসে পৌঁছেছি

মিনা হারকারের ডায়েরী থেকে

৩১ অক্টোবর।

ভেরেস্তিতে এসে পৌঁছেছি আজ দুপুরে। রাতটা হোটেলে কাটিয়ে কাল খুব ডোরে আবার বোগো গিরিপথের দিকে রওনা দেব। যেভাবে শীত পড়তে শুরু করেছে, এখান থেকেই সবার জন্যে গরম জামা-কাপড় কিনে না নিয়ে গেলে বোর্গো গিরিপথে পৌঁছে বিপদে পড়তে হবে, ভেবে, দিনের বেলায়ই সমস্ত কেনাকাটা সেরে রেখেছিলাম। জোনাথনের জন্যে দারুণ ভাবনা হচ্ছে। কি জানি কোন বিপদে পড়ে বসে আবার।

১ নভেম্বর।

আজকের মত এত সুন্দর সকাল জীবনে দেখিনি আমি। চারদিকে ছবির মত সুন্দর সব প্রাকৃতিক দৃশ্য। ধূসর, সবুজ আর নীলের মেলা চারদিকে।

ভাল কথা, দুদিন পর আজ ভোররাতে আবার আমাকে সম্মোহিত করেছিলেন প্রফেসর। আর্য। আমার কথা শুনে প্রফেসরের ধারণা হয়েছে এখন নাকি আবার জলপথে চলেছে কাউন্ট ড্রাকুলা। প্রফেসর বলেছেন, গালেজ থেকে প্রথমে টমটমে করে তৃতীয় পথ ধরে খানিকটা এগিয়ে গেছে কাউন্ট আমাদের বোকা বানানোর জন্যে। তারপর ফিরে এসে জলপথে রওনা হয়েছে। ভাবতেও পারেনি পিশাচটা, তিনটে পথেই তার পিছু নেব আমরা। কাউন্ট জলপথে চলেছে শোনার পর থেকে জোনাথনের বিপদাশঙ্কায় সারাক্ষণ কেমন করছে আমার বুকের ভেতরটা।

বোধহয় আমার মনের কথা টের পেয়েই আমার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে প্রফেসর বললেন, ভেবো না মা, এই পিশাচটার সম্বন্ধে যথেষ্ট অভিজ্ঞ জোনাথন। বিপদ আসলে ঠিকই টের পাবে সে। তাছাড়া পবিত্র ক্রুশ আর ধুনো কাছে আছে ওর, ত্রিসীমানায় ঘেঁষতে পারবে না পিশাচ ড্রাকুলা।

একটা গ্রামের ভেতর এসে রাস্তার পাশে একটা চায়ের দোকান দেখে গাড়ি থামিয়ে চা খেতে নামলাম আমরা। বিচিত্র পোশাক পরা মেয়ে-পুরুষের দল আমাদেরকে ঘিরে ধরে এটা ওটা জিজ্ঞেস করতে লাগল। একজন বৃদ্ধা জিজ্ঞেস করল প্রফেসরকে, এ এলাকায় নতুন দেধূছি তোমাদেরকে, তা চলেছ কোথায়?

বোর্গো গিরিপথ পেরিয়ে কাউন্ট ড্রাকুলার মেহমান হতে চলেছি আমরা, উত্তর দিলেন প্রফেসর।

পাগল হয়ে তোমরা। ওই হতচ্ছাড়া প্রাসাদে মেহমান হতে গিয়ে প্রাণ নিয়ে ফিরতে পারে কেউ? বুকে ক্রুশ চিহ্ন আঁকতে আঁকতে বলল বৃক্কা।

ঈশ্বর সহায় থাকলে আমরা পারব। এই দেখুন না কি কি জিনিস আছে আমাদের সাথে, বলে পকেট থেকে শ, রসুন আর ধুনো বের করে দেখালেন প্রফেসর।

হুঁ! মনে হচ্ছে পারবে তোমরা। তবু হুঁশিয়ার করে দিচ্ছি, সাবধানে থেকো, কথা শুনে মনে হল প্রফেসরের দেখান জিনিসগুলোর গুণাগুণ জানা আছে বৃদ্ধার।

চা খাওয়া হয়ে গেলে আবার রওনা দিলাম আমরা। হিসেব মত দুপুরের আগেই বোর্গো গিরিপথের মুখে পৌঁছে যাবার কথা আমাদের।

২নভেম্বর, সকাল।

দুপুরে নয়, শেষ পর্যন্ত গতকাল বিকেলে এসে পৌঁছেছিলাম বোর্গো গিরিপথের প্রবেশ মুখে। তিনটে দলের মধ্যে আমরাই প্রথম এখানে এসে পৌঁছেছি। বোর্গো গিরিপথটার প্রবেশ মুখের কাছেই বুকোভিনা থেকে বিসট্রিজ হয়ে আসা চওড়া পথটার সাথে এসে মিশেছে পুব পশ্চিম উত্তর থেকে আসা তিনটে গাড়ি চলার উপযোগী অপেক্ষাকৃত ছোট পথ। পশ্চিমের পথটা চলে গেছে কাউন্ট ড্রাকুলার প্রাসাদ দুর্গ পর্যন্ত। ক্রমশঃ ঢালু হয়ে নেমে যাওয়া পথটার দুদিকে বাড়া পাহাড় আর ঘন বন জঙ্গল। ওদিকে তাকালেই কেমন যেন ছমছম করে ওঠে গা। অথচ এই পথ দিয়েই এক আঁধার রাতে একা একা কাউন্ট ড্রাকুলার প্রাসাদ দুর্গে পাড়ি জমাতে হয়েছিল জোনাথনকে, কথাটা ভাবুলেও খাড়া হয়ে ওঠে গায়ের রোম। সত্যিই সাহসী বলতে হবে জোনাথনকে।

ঠিক উপত্যকা নয়, বরং বলা যায় বিশাল একটা সমান্তরাল চত্বরের ওপর দাঁড়িয়ে আছে বোর্গো গিরিপথের মুখটা। দক্ষিণে খাড়া পাহাড়। উত্তর পুবের পথ দুটো অনেক দূর পর্যন্ত চোখে পড়ে এখান থেকে। এঁকেবেঁকে এগিয়ে গিয়ে হঠাৎ করেই পাহাড়ের আড়ালে হাড়িয়ে গেছে পথ দুটো।

চারদিকে যতদূর চোখ যায় লোক বসতির কোনো চিহ্নই নেই। অনেক খুঁজে পেতে পুবের পাহাড়ের গায়ে একটা খিলানঅলা গুহার মত জায়গা বের করে তাতে আমাদের রাত কাটানর বন্দোবস্ত করলেন প্রফেসর। গাড়ি থেকে খুলে নিয়ে কাছেই একটা গাছের সাথে বেঁধে খেতে দিলেন ঘোড়াগুলোকে। একটানা খাড়াই পাহাড়ী পথ বেয়ে এসে অত্যন্ত পরিশ্রান্ত হয়ে পড়ছিল ওরাও।

বেলা থাকতে থাকতেই আশপাশের বন থেকে কিছু কাঠ জোগাড় করে আনলেন প্রফেসর। অল্পক্ষণ পরেই পশ্চিমের বিশাল পাহাড়টার ওপারে অস্ত গেল সূর্য। অদ্ভুত লাগল আমার কাছে সূর্যাস্তটা। অস্ত যাবার আগে পাহাড়টার চূড়ায় যেন কয়েক মুহূর্ত চুপচাপ বসে থাকল সূর্যটা, তারপরই দ্রুত নেমে গেল ওপাশে। পশ্চিমাকাশের মেঘগুলোর ওপর কিছুক্ষণ ধরে রঙ ছিটাল পাহাড়ের ওপাশে হারিয়ে যাওয়া সূর্যটা। তয় হয়ে ওই বিচিত্র রঙে রাঙান মেঘমালার দিকে তাকিয়ে ছিলাম, টেরই পাইনি কখন এসে ঘিরে ধরেছে নিকষ কালো অন্ধকার। আর টর পাব কি, সন্ধ্যা তো আর নিয়ম মাফিক পায়ে পায়ে এগিয়ে আসেনি, হঠৎ করেই যেন ঝাঁপিয়ে পড়েছে আমাদের ওপর।

আঁধার হয়ে যেতেই গুহার ভেতর থেকে আমাকে ডাকলেন প্রফেসর। ফিরে দেখলাম, কাঠের পর কাঠ সাজিয়ে বিশাল এক অগ্নিকুণ্ড তৈরি করে ফেলেছেন তিনি। সেই অগ্নিকুণ্ডে ভালমত আগুন জ্বলে উঠতেই গুহার ভেতরটা ত্রার বাইরের বেশ কিছুটা জায়গা আলোকিত হয়ে গেল। এগিয়ে গিয়ে গুহার ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ল গুহার মেঝেতে কাঠি দিয়ে এঁকে বিরাট একটা বৃত্ত তৈরি করেছেন প্রফেসর। হিজিবিজি করে আরও কি সব যেন আঁকা বৃত্তটার ভেতর। আমাকে বৃত্তটার ভেতর গিয়ে বসতে আদেশ দিলেন প্রফেসর। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, এটা কি প্রফেসর?

আগে থেকেই হুঁশিয়ার থাকলাম। কাউন্ট ড্রাকুলার এলাকা এটা। সে ছাড়াও আরও কত পিশাচ প্রেতাত্মা আছে এ এলাকায় কে জানে। ওই বৃত্তের ভেতর থাকলে আমাদের কিছুই করতে পারবে না পিশাচেরা। যদিও চেষ্টা করবে অনেকভাবে। আর একটা কথা, ওরা তোমাকে নানা ভাবে প্রলুব্ধ করে বাইরে বের করার চেষ্টা করবে, তোমারও ইচ্ছে করবে বেরোতে, কিন্তু খবরদার। এক চুল বাইরে যাবে না বৃত্তের।

বৃত্তের ভেতর বসেই খেয়ে নিলাম আমি আর প্রফেসর। হিম পড়তে শুরু করেছে। গায়ে কয়েকটা মোটা কম্বল জড়িয়ে নিয়ে গনগনে আগুনের পাশে বসে থাকা সত্ত্বেও কাঁপুনি গেল না শরীরের। আর অন্ধকার! এমন নিকষ কালো অন্ধকার জীবনে দেখিনি আমি। বনের ভেতর থেকে ভেসে আসছে অরণ্যচারী প্রাণীদের বিচিত্র ডাক। মাঝে মাঝেই কানে এসে বাজছে নেকড়ের কাজে কাঁপন বীভৎস গর্জন। সব কিছুকে ছাড়িয়ে গেছে কোটি কোটি ঝিঝির সম্মিলিত কর্কশ চিৎকার।

সারাদিনের ক্লান্তিতে ঘুমে চোখের পাতা বুজে আসছে আমার, কিন্তু কি জানি ঘুমিয়ে পড়লেই কি ঘটে এই ভয়ে জোর করে মেলে রাখছিলাম চোখের পাতা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর পারলাম না। একটা পাথরে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম।

ঠিক কতক্ষণ পর জানি না, হঠাৎ ঘোড়াগুলোর ভয়ার্ত চিৎকারে ঘুম ভেঙে গেল। চেয়ে দেখলাম বসে থেকেই থর থর করে কাঁপছে ঘোড়াগুলো। কোন কারণে প্রচণ্ড ভয় পেয়েছে ওরা।

ওদিকে শো-ওঁ-ওঁ শব্দে বয়ে চলেছে তুষার মেশান প্রচণ্ড ঝড়ো হাওয়া। হঠাৎ করেই থেমে গেল বাতাসের গর্জন। সাথে সাথেই লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে দড়ি ছেঁড়ার জন্যে আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগল ঘোড়াগুলো। পালাতে চাইছে। কেন? কি দেখতে পেয়েছে ওরা?

কয়েক সেকেণ্ড পরই বুঝতে পারলাম ব্যাপারটা, ঘোড়াগুলোর পেছনে বন থেকে যেন তালে তালে মার্চ করতে করতে এগিয়ে আসছে হাজার হাজার ধূসর লোমশ প্রাণী। ওদের হাঁ করা মুখের ফাঁকে দেখা যাচ্ছে ঝকঝকে সাদা ধারাল দাতের সারি। অগ্নিকুণ্ডের আলোয় ঝিকিয়ে উঠল দাঁতগুলো। প্রত্যেকটা মুখের ভেতর থেকে বেরিয়ে এসেছে একটা করে টকটকে লাল জিভ। ঘোড়াগুলোর কয়েক হাতের মধ্যে এসেই দাঁড়িয়ে পড়ল জানোয়ারগুলো, তারপর একসাথে হিংস্র গর্জন করে উঠে ঝাঁপিয়ে পড়ল ঘোড়াগুলোর ওপর। দেখতে দেখতে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ঘোড়াগুলোকে খেয়ে ফেলল ওরা।

ঘোড়াগুলোকে খাওয়ার পর আমাদের ওপর চোখ পড়ল নেকড়েগুলোর। ধীরেসুস্থে খুশি মনে আমাদের দিকে এগিয়ে আসতে থাকল ওরা। গুহা মুখটা থেকে হাতখানেক তফাতে থাকতেই আবার একসাথে বীভৎস গর্জন করে উঠল জানোয়ারগুলো। অর্থাৎ আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে যাচ্ছে ওরা, এটা তারই ইঙ্গিত।

আতঙ্কে চেঁচিয়ে উঠে দুহাতে জড়িয়ে ধরলাম প্রফেসরকে। সান্ত্বনা দিয়ে বললেন প্রফেসর, ভয় নেই মা, আমাদের বৃত্তের ভেতর ঢুকতে পারবে না হতচ্ছাড়া নেকড়েগুলো। ওরা সাধারণ জানোয়ার হতে পারতো, কিন্তু কাউন্ট ড্রাকুলার প্রভাব আছে ওদের ওপর। ওই পিশাচ কাউন্ট যে জিনিসকে ভয় পায়, ওই নেকড়েগুলোও ভয় পায় তাকে। প্রফেসরের কথাই ঠিক। বৃত্তটার ইঞ্চি দুয়েকের মধ্যে পা দিয়েই হিটকে পেছনে সরে গেল কয়েকটা নেকড়ে, যেন কষে চাবুক মেরেছে কেউ ওদের গায়ে! আর সামনে এগোতে সাহস করল না নেকড়ে, গুলো। বৃত্তটার কয়েক হাত দূরে বসে বসেই ক্রুদ্ধ গর্জন করে করে শাসতে লাগল আমাদের, যেন বলছে, সাহস থাকলে বাইরে আয়, তারপর দেখাচ্ছি মজা। কিন্তু ওদের মজা দেখার সাহস আমাদের নেই। তাই বৃত্তের ভেতর বসেই ভয়ে ঠক ঠক করে কাপতে থাকলাম।

কতক্ষণ পর জানি না, হঠাৎ করেই যেন কার আগমনে ভয় পেয়ে গিয়ে পেহনের জঙ্গলে ছুটে পালাল নেকড়েগুলো! কাঠগুলো পুড়ে যাওয়ায় নিবু নিবু হয়ে। এসেহে অগ্নিকুণ্ডের আগুন। কিছু নতুন ডালপালা ফেলে দিলেন তাতে প্রফেসর। আবার দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল আগুন। ঠিক এই সময় আগুনের আলোয় চোখে পড়ল জিনিসগুলো। তিনিটে ধুলোর ঘূর্ণি। আশ্চর্য রকমের উজ্জ্বল এক ধরনের দ্যুতি বিচ্ছুরিত হচ্ছে ধূলিকণাগুলো থেকে। আস্তে আস্তে সেই ঘূর্ণায়মান উজ্জ্বল ধূলিকণার ভেতর থেকে রূপ নিতে থাকল তিনটে মূর্তি। অল্পসময়েই ঝলমলে সাদা পোশাক পরা তিনজন অপূর্ব সুন্দরী তরুণীকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম গুহামুখটার সামনে। আশ্চর্য উজ্জ্বল দীর্ঘ টানাটানা চোখ, ঝকঝকে সাদা তীক্ষ্ণ দাত আর টুকটুকে লাল ঠোঁট ওদের। দুজনের রঙ একটু চাপা। পরিষ্কার বুঝলাম ওরা কারা। কাউন্ট ড্রাকুলার প্রাসাদ দুর্গে চাঁদনী রাতে এই তিন ডাইনীকেই দেখেছি জোনাথন।

আমাদের দিকে চেয়ে খিলখিল করে হেসে উঠল ওরা। আশেপাশের পাহাড়ের গায়ে ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হয়ে বেড়াতে লাগল। সেই হাসির শব্দ। মদির কণ্ঠে আমাকে ডাকল সবচেয়ে সুন্দরী ডাইনীটা, ওখানে ওই গুহার ভেতরে বসে কেন, বোন? চলো আমাদের সঙ্গে। আমরা সবাই মিলে হাসব, খেলব, গাইব। কি মজা হবে, না? এসো, চলে এসো।

মাথার ভেতরটা কেমন জানি করে উঠল আমার। মনে হল, তাইতো, এই হতচ্ছাড়া গুহায় বসে আছি কেন আমি? ওদের সাথে চলে গেলেই তো পারি। বেরিয়ে যাবার জন্যে আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াতে যেতেই কাঁধ চেপে ধরে জোর করে আমাকে বসিয়ে দিলেন প্রফেসর। পকেট থেকে একটা ক্রুশ বের করে আমার মাথায় হেয়ালেন। সঙ্গে সঙ্গে ওই তিন ডাইনীর সাথে হেসে খেলে বেড়ানোর চিন্তা

দূর হয়ে গেল আমার মাথা থেকে। বুঝতে পারলাম, চরম ভুল করতে যাচ্ছিলাম।

ক্রুশটা দেখেই একটু চমকে গেল ডাইনীরা। পকেট থেকে এক টুকরো ধুনো বের করলেন এবার প্রফেসর। তারপর ভেঙে তিন টুকরো করে ছুঁড়ে দিলেন তিন ডাইনীর দিকে। বুক ভাঙা আর্তনাদ করে চোখের পলকে কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেল ডাইনীরা।

যেমনি হঠাৎ করে থেমে গিয়েছিল, ডাইনীগুলো চলে যেতেই তেমনি হঠাৎ করেই আবার শুরু হল তুষার ঝড়। বুঝলাম, ঝড়কে থামিয়ে দিয়েছিল ওই তিন ডাইনী।

একসময় শেষ হল ওই ভয়ঙ্কর রাত। ঝড়ের বেগও কমতে কমতে থেমে গেল একসময়ে। সকাল যে এত আকাক্ষিত হতে পারে জীবনে প্রথমে টের পেলাম আজ।

.

প্রফেসর ভ্যান হেলসিং-এর মেমর‍্যাণ্ডাম

২ নভেম্বর।

নাস্তা খাওয়ার পরপরই গভীর ঘুমে ঢলে পড়েছে মিনা। ভীষণ ঘুম পাচ্ছে আমারও। কিন্তু ঘুমালে চলবে না, বহু কাজ পড়ে আছে। প্রথমেই খুঁজে বের করতে হবে ওই ডাইনী তিনটের কবর।

বৃত্তটার ভেতরই ঘুমিয়ে আছে মিনা। এই দিনের বেলা কোন ভয় নেই, কিন্তু ডাইনীদের অশুভ প্রভাব পড়তে পারে ওর ওপর, ভেবে, ওর মাথার কাছে রেখে দিলাম একটা কুশ। তারপর শরীরের ওপর কিছু ধুনোর গুঁড়ো ছিটিয়ে দিয়ে গুহা থেকে বাইরে বেরিয়ে এলাম।

কিন্তু কোন পথে যাবে? ভেবেচিন্তে পশ্চিমের পথটা ধরেই রওনা দিলাম। বেশ কিছুদূর এগিয়ে যাবার পর চোখে পড়ল পরিত্যক্ত কবরখানাটা। কবরখানাটার একপাশে একটা বড়সড় ঘর। কালের কশাঘাতে জীর্ণ হয়ে গেছে দেয়ালগুলো। প্লাস্টার খসে গিয়ে মুখ ব্যাদান করে আছে লাল ইট।

ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে ওই ঘরটাতেই ঢুকে পড়লাম। বেশ কয়েকটা পুরানো কফিন পড়ে আছে ঘরটার ভেতর। বুঝলাম আসলে এটা একটা সমাধিকক্ষ। কতদিনের পুরানো কফিন ওগুলো কে জানে? আন্দাজ করলাম, কয়েকশো বছর আগের তো হবেই। মলিন হয়ে যাওয়া কফিনগুলোর গায়ের বিচিত্র কারুকাজ দেখেই বোঝা যায় প্রাচীন আমলের কোন সম্রান্ত রাজা বা জমিদারের সমাধিকক্ষ এটা।

প্রত্যেকটা কফিন এখন খুলে দেখতে হবে আমাকে। সহজ নয় কাজটা, তবু কতেই হবে। এক এক করে খুলতে শুরু করলাম কফিনের ডালা। সব কটা কফিন খুলে দুটো ডাইনীকে পেলাম, সেই অপেক্ষাকৃত চাপা রঙের দুটো। কিন্তু সবচেয়ে সুন্দরীটা কোথায়? যেখানেই হোক, খুঁজে বের করতেই হবে ওকে। তার আগে যে দুটোকে পাওয়া গেছে ওদেরকেই শেষ করে নেয়া যাক। সেই আগের কায়দায় মাথা কেটে রসুনের কোয়া পুরে দিলাম ওদের মুখে। তারপর হৃৎপিণ্ডে বসিয়ে দিলাম কাঠের গজাল। সঙ্গে সঙ্গে কফিনের ধুলোর সাথে মিশে গেল ওরা। কোন চিহ্নই থাকল না আর ওদের। শত শত বৎসর আগে কেউ মারা গেলে তার চিহ্ন আজ পর্যন্ত থাকবেই বা কি?

ডাইনী দুটোকে শেষ করে আবার খুঁজতে শুরু করলাম। খুঁজতে খুঁজতে এ সমাধিকক্ষটার ঠিক পেছনে ছোট্ট আর একটা সমাধিক খুঁজে পেলাম। মাত্র দুটো কফিন আছে সেখানে। দুটোর গায়েই সোনার কারুকাজ করা। সোনার পাতে লাশের নাম লিখে আটকে দেয়া হয়েছে দুটো কফিনের মাথার দিকটায়। এত পুরু হয়ে ধুলো পড়ে আছে এগুলোর ওপর যে ভালমত পড়াই যায় না। পকেট থেকে রুমাল বের করে প্রথম কফিনটার গায়ে আটকান নাম লেখা পাতটার ওপরটা ভালমত মুছে নিয়ে নামটা পড়েই চমকে উঠলাম। পরিষ্কার জার্মান অক্ষরে বড় বড় করে লেখা নামটাকে বাংলা অক্ষরে লিখতে হয়, কাউন্ট ড্রাকুলা।

কফিনটার ডালার স্কুগুলো খুলে ধীরে ধীরে তুলে ধরলাম ডালাটা। শূন্য। কেউ নেই ওর ভেতর। অর্থাৎ কাউন্ট থাকে না এখানে। আর থাকে না যে তার প্রমাণ তো আমি নিজেই। নতুন নতুন কফিন বদলিয়ে এখান থেকে ওখানে ঘুরে বেড়ায় কাউন্ট। তেমনি একটা কফিনের পিছু নিয়েই তো সুদূর ইংল্যাণ্ড থেকে এই দুর্গম পার্বত্য এলাকায় এসে পৌঁছেছি আমরা। ডালাটা নামিয়ে রাখার আগে ধুনো আর রসুন ছড়িয়ে দিলাম কফিনটার ভেতরে। ভবিষ্যতে দরকার পড়লেও আর এটার ভেতর এসে আত্মগোপন করতে পারবে না কাউন্ট ড্রাকুলা।

দ্বিতীয় কফিনটার কাছে এগিয়ে গিয়ে এটার নেমপ্লেটটাও মুছে ফেললাম রুমাল দিয়ে। এটাতে লেখা নামটা হল, কাউন্টেস ফ্যানজিসকা। অর্থাৎ এই ফ্যানজিসকা নামের ভদ্রমহিলা ছিলেন কাউন্ট ড্রাকুলার সহধর্মিণী। স্কুগুলো খুলে এ কফিনটার ডালাটা তুলে ধরতেই চমকে উঠলাম। যদিও আগেই আন্দাজ করেছিলাম, তবু স্তব্ধ হয়ে সেদিকে চেয়ে থাকলাম কয়েক মুহূর্ত। কফিনের ভেতর শুয়ে আছে গতরাতের সেই রূপসী ডাইনী। গতরাতের চেয়েও অনেক, অনেক বেশি সুন্দরী মনে হচ্ছে এখন ওকে। বুঝলাম, জীবিত থাকাকালীন এই কাউন্টেসের পরিচারিকা ছিল চাপা রাঙা ডাইনী দুটো।

আর বেশিক্ষণ ভাবনা চিন্তা না করে শেষ করে দিলাম এটাকেও। কফিনের ডালা আটকে যখন বাইরে বেরিয়ে এলাম, রীতিমত কাঁপছে তখন আমার সর্বশরীর। তিন তিনটা ডাইনীকে একা শেষ করা সোজা কথা নয়।

বোগো গিরিপথের প্রবেশ মুখের ওহাটার কাছে ফিরে আসতে আসতে দুপুর গড়িয়ে গেল। এসে দেখলাম তখনও গভীর ঘুমে অচেতন হয়ে আছে মিনা।

.

মিনা আরকারের ডায়েরী থেকে

২ নভেম্বর, রাত।

ঘুম ভাঙল প্রফেসরের ডাকে। উঠে গুহা থেকে বেরিয়ে দেখলাম পশ্চিমাকাশের দিকে রওনা দিয়েছে সূর্য। প্রফেসর বললেন, এই যে মা, খাওয়া দাওয়া আজ কিছু হবে না?

একটু অপেক্ষা করুন, প্রফেসর, এখুনি আনছি, টিন খুলে শুকনো খাবার বের করতে বসলাম।

খাবারগুলো সবে সাজান শেষ করেছি, এমন সময় মাথার ওপরের পাহাড় চূড়া থেকে ভেসে এল প্রফেসরের উচ্চকিত চিৎকার, মিনা, জলদি এসো।

খাবার ফেলে ছুটলাম। চূড়ায় উঠতে উঠতে উদ্বিগ্ন গলায় জিজ্ঞেস করলাম, কি হল প্রফেসর?

চোখ থেকে বিনকিউলার নামাতে নামাতে উত্তেজিত কণ্ঠে বললেন প্রফেসর, একটা ঘোড়াগাড়ি। এদিকেই আসছে।

কই, কোথায়? প্রফেসরের পাশে এসে জিজ্ঞেস করলাম।

বিনকিউলার আমার হাতে দিতে দিতে বললেন প্রফেসর, উত্তরের পথ ধরে আসছে গাড়িটা।

বিনকিউলারটা চোখে লাগিয়ে প্রফেসরের নির্দেশিত দিকে তাকালাম। সত্যিই, উত্তরের পাহাড়ী পথ ধরে একটা দুঘোড়া টানা হুড খোলা বেশ বড় আকারের গাড়ি অত্যন্ত দ্রুতগতিতে ছুটে আসছে এদিকেই। গাড়িটায় রাখা বাক্সটাও দেখতে পাচ্ছি পরিষ্কার। কয়েকজন জিপসী বসে আছে বাক্সটার ওপর। গাড়িটার দিকে তাকিয়ে আছি, হঠাৎ বহু দূরের পাহাড়টার আড়াল থেকে বেরিয়ে এল আর একটা গাড়ি। ওটার দ্রুত আকৃতি বড় হওয়া দেখেই বোঝা যাচ্ছে ঝড়ের গতিতে এগিয়ে আসছে গাড়িটা। পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে সামনেরটাকে ধরার জন্যে পাগল হয়ে উঠেছে পেছনের গাড়িটা। ওটা আরও এগিয়ে আসতেই লাগাম ধরে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটাকে চিনতে পারলাম আমি। জোনাথন। আনন্দে দুলে উঠল বুকটা। চোখ থেকে বিনকিউলারটা নামিয়ে প্রফেসরের হাতে দিতে দিতে বললাম, দেখুন, দেখুন, প্রফেসর, জোনাথনরাও পৌঁছে গেছে।

তাই নাকি? কই দেখি? আমার হাত থেকে বিনকিউলারটা প্রায় ছিনিয়ে নিয়ে চোখে লাগালেন প্রফেসর। কয়েক সেকেও দেখে নিয়েই যন্ত্রটা চোখ থেকে নামিয়ে কান পেতে কি যেন শোনার চেষ্টা করলেন। তারপর বললেন, পুব দিক থেকেও দ্রুত ছুটে আসা ঘোড়ার পুরের শব্দ শোনা যাচ্ছে।

প্রফেসরের কথা শুনে আমিও পুব দিকে কান পেতে শোনার চেষ্টা করলাম। আমারও যেন মনে হল শুনতে পাচ্ছি শব্দটা।

চলো, মিনা। আক্রমণের প্রস্তুতি নিইগে, বলে আমার হাত ধরে দ্রুত পাহাড় বেয়ে নামতে শুরু করলেন প্রফেসর।

নিচে নেমে এসে কি মনে হতেই পশ্চিম আকাশটা একবার দেখে নিয়ে ঘড়ির দিকে তাকালেন প্রফেসর। তারপর প্রায় আঁতকে উঠে বললেন, সর্বনাশ! বেলা তো প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। হাতে সময়ও অল্প। এই সময়ের ভেতরই ওই জিপসীগুলোর হাত থেকে বাক্সটা ছিনিয়ে নিয়ে ড্রাকুলাকে শেষ করতে না পারলে আবার হাতছাড়া হয়ে যাবে পিশাচটা। সূর্য ডুবে গেলেই কফিন থেকে বেরিয়ে পালাবে কাউন্ট। তখন এই এলাকায় উল্টো তার হাতেই মারা যাব আমরা। তুমি। এখানে দাঁড়াও মিনা, আমি আসছি। এক ছুটে গিয়ে গুহার ভেতর থেকে তার ব্যাগ ও পিস্তলটা নিয়ে এলেন প্রফেসর। ও দুটো আমার হাতে দিয়ে আমাদের ঘোড়াশূন্য গাড়িটা নিজেই টানতে টানতে নিয়ে চললেন গিরিপথের উত্তর প্রবেশ মুখের কাছে। সেখানে পৌঁছে গাড়িটা আড়াআড়ি ভাবে রেখে প্রবেশ পথটা বন্ধ করে দিলেন। তারপর ছুটে এসে আমার হাত থেকে ব্যাগ আর পিস্তলটা নিয়ে আমাকে সহ ছুটলেন গিরিমুখের কাছে। ফেলে রাখা গাড়িটার কাছাকাছিই একটা বিশাল পাথরের আড়ালে লুকিয়ে রইলাম আমরা।

এক এক করে কেটে যাচ্ছে প্রতীক্ষার উৎকণ্ঠিত মুহূর্তগুলো। প্রতি সেকেণ্ডে দুবার করে সূর্যের দিকে তাকাচ্ছেন প্রফেসর। কারণ ওটা অস্ত গেলেই আমাদের আশা ভরসা সব শেষ। এই নির্জন ভয়ঙ্কর পাহাড়ী এলাকা থেকে তখন প্রাণ নিয়ে বেরিয়ে যেতে পারব কিনা সন্দেহ। ফিসফিস করে প্রফেসরকে জিজ্ঞেস করলাম, এত ভয়ের কি আছে, প্রফেসর, আপনার বানান ওই বৃত্তের ভেতর বসে থাকলেই তো আর আমাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না ড্রাকুলা।

পারবে। এবং অতি সহজে। নেকড়েগুলোর কথা ভুলে গেলে?

কিন্তু ওরাও তো বৃত্তের ভেতর ঢুকতে পারে না?

আজ পারবে। ওগুলোর ওপর থেকে শুধু নিজের প্রভাব তুলে নেবে কাউন্ট ড্রাকুলা। সঙ্গে সঙ্গে সাধারণ নেকড়েতে পরিণত হবে ওগুলো। তখন ওই যাদুর বৃত্ত থাকা না থাকা নেকড়েগুলোর কাছে সমান। গোটা চারেক রাইফেল পিস্তল দিয়ে কি করে ঠেকাব ওই হাজার হাজার রক্তলোভী হিংস্র নেকড়েকে?

এতক্ষণে টের পেলাম কোন্ পথে আসবে বিপদ। মনে পড়ল নেকড়েগুলোর ঝকঝকে তীক্ষ্ণ দাত আর টকটকে লাল জিভের কথা। কি করে ঘোড়াগুলোকে নিমেষে টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলেছিল ওরা কল্পনা করে নিজের অজান্তেই শিউরে উঠলাম একবার। ওদিকে দ্রুত এগিয়ে আসছে ঘোড়ার পদশব্দ।

খবরদার! এক পা এগোবে না আর, হঠাৎ আমাদের দুপাশের পাহাড় চূড়া থেকে রুক্ষ কঠিন গলায় আদেশ দিল কেউ কাউকে। চমকে উঠে তাকালাম দুদিকেই। দেখলাম, রাইফেল উঁচিয়ে ধরে ডান দিকের পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে আছেন মিস্টার মরিস, বায়ে জোনাথন। আবার গর্জে উঠলেন মিস্টার মরিস, শেষবারের মত বলছি, এখুনি গাড়ি না থামালে গুলি করতে বাধ্য হব।

লাফ দিয়ে পাথরের আড়াল থেকে বেরিয়ে এলেন প্রফেসর, তার সাথে সাথে আমিও। দেখলাম দ্রুত ধাবমান ঘোড়াগুলোকে থামাবার জন্যে প্রাণপণ চেষ্টা করছে জিপসী সর্দার। মিস্টার মরিসের কথা সর্দার বুঝতে পেরেছে কিনা কে জানে। কিন্তু তার কণ্ঠস্বরের দৃঢ়তায় আর হাতের রাইফেল দেখে যে কেউই আন্দাজ করতে পারবে মিস্টার মরিসের উদ্দেশ্যটা কি। আমার মনে হল আন্দাজেই বুঝে নিয়েহে জিপসী সর্দার। অসাধারণ দক্ষতায় ঘোড়াগুলোকে থামিয়ে গাড়ি ঘুরিয়ে পালাবার চেষ্টা করল সে। সঙ্গে সঙ্গে গর্জে উঠল মিস্টার মরিসের হাতের রাইফেল। প্রাণ হারিয়ে লুটিয়ে পড়ল একটা ঘোড়া। গুলি করল জোনাথনও। দ্বিতীয় ঘোড়াটাও পড়ে গেল। বেগতিক দেখে গাড়ি থেকে নেমে ছুটল জিপসী সর্দার। পিছু পিছু তার সাঙ্গপাঙ্গরাও।

এক মুহূর্ত দেরি না করে ব্যাগ হাতে ছুটলেন প্রফেসর। আমি ছুটলাম তার পিছু পিছু। জিপসীদের গাড়ির কাছে পৌঁছেই এক মুহূর্তও দেরি না করে। পকেট থেকে স্কু-ড্রাইভার বের করে বাক্সের ডালা খোলায় মনোযোগ দিলেন তিনি। ওদিকে পশ্চিম পাহাড়ের আড়ালে চলে গেছে সূর্য। মেঘের গায়ে তার রঙ ছিটানর পালাও প্রায় শেষ। এমনি সময় টান মেরে বাক্সের ডালা তুলে ফেললেন প্রফেসর। একসাথে বাক্সের ভেতরে উঁকি দিলাম আমি, প্রফেসর, জোনাথন আর মিস্টার মরিস।

বোধহয় ঘুম ভাঙার সময় হয়ে এসেছে কাউন্ট ড্রাকুলার। কারণ জ্বলতে শুরু করেছে তার লাল টকটকে চোখ দুটো। যে-কোন মুহূর্তে এখন আড়মোড়া ভেঙে উঠে পড়তে পারে পিশাচটা।

দ্রুত ব্যাগ থেকে রসুনের কোয়া বের করে কাউন্টের মুখে পুরে দিলেন প্রফেসর। পরমুহূর্তেই মাংস কাটা ছুরির এক কোপে কাউন্টের মাথাটা গলা থেকে আলাদা করে দিল জোনাথন। ডান পায়ের হাঁটু পর্যন্ত লম্বা বুটের সাথে চামড়ার স্ট্র্যাপ দিয়ে আটকে বেঁধে রেখেছিল সে ছুরিটা, বোধহয় এমনি কোন প্রয়োজনীয় মুহূর্তের জন্যেই। কাউন্টের কাটা ধড়টা সাংঘাতিকভাবে দুমড়াতে মোচড়াতে শুরু করতেই ব্যাগ থেকে একটা কাঠের গজাল আর হাতুড়ি বের করে মিস্টার মরিসের হাতে তুলে দিলেন প্রফেসর। বললেন, পিশাচটার দেহটা স্থির হলেই এই গজালটা ওর হৃৎপিণ্ডে বসিয়ে দেবে।

হাতুড়ি আর গজাল হাতে অপেক্ষা করতে থাকলেন মিস্টার মরিস। হঠাৎ আমাদের পেছনে ঘোড়ার খুরের শব্দ হতেই চমকে পেছনে ফিরে চাইলাম। দেখলাম, গাড়ি নিয়ে গিরিমুখে প্রবেশ করছেন লর্ড গোডালমিং। প্রায় একই সময়ে পুবের মুখ দিয়ে এসে ঢুকলেন ডাক্তার সেওয়ার্ড। ওদের কথা ভুলেই গিয়েছিলাম। লর্ড গোডালমিং আর ডাক্তার সেওয়ার্ডের হাতে গাড়ির ভার দিয়েই জিপসীদের আটকাতে রাইফেল হাতে দুদিক থেকে দুই পাহাড় চূড়ায় উঠে যান মিস্টার মরিস আর জোনাথন, পরে ওদের মুখেই কথাটা শুনেছি আমি। এতক্ষণ হয়ত কোন পাহাড়ের আড়ালে অপেক্ষা করছিলেন লর্ড গোডালমিং আর ডাক্তার সেওয়ার্ড, জিপসীরা পরাজিত হয়েছে টের পেয়েই এখন গিরিমুখে এসে ঢুকেছেন ওঁরা।

গিরিমুখে প্রবেশ করেই গাড়ি থেকে লাফিয়ে নেমে আমাদের দিকে ছুটে এলেন লর্ড গোডালমিং আর ডাক্তার সেওয়ার্ড। বাক্সের দিকে চোখ ফেরাতেই দেখলাম নড়াচড়া বন্ধ হয়ে গেছে কাউন্টের ধড়টার। ঠিক সেই মুহূর্তে হাতের গজালটা কাউন্টের হৃৎপিণ্ডে ঢুকিয়ে দিলেন মিস্টার মরিস।

সাথে সাথেই ঘটতে শুরু করল ঘটনা। দ্রুত গলতে শুরু করল কাউন্টের দেহটা, সবটা দেহ গলে যাওয়ার পর বাক্সের গায়ের ধুলোর সাথে মিশে যেতে শুরু করল গলিত পদার্থটুকু। দেখতে দেখতে আমাদের চোখের সামনে ধুলোয় মিলেমিশে অদৃশ্য হয়ে গেল কাউন্টের সমস্ত চিহ্ন। আজ থেকে কয়েকশো বছর আগে যদি মারা যেত কাউন্ট তাহলেও তার কফিন খুলে দেখলে এখন বাক্সের মধ্যে যেমন দেখছি তেমনি ধুলো ময়লা ছাড়া আর কিছুই দেখতাম না আমরা।

ওদিকে অকার হয়ে এসেছে। বনের ভেতর ডাকতে শুরু করেছে নেকড়েগুলো। উদ্বিগ্ন গলায় বললেন প্রফেসর, জলদি, গাড়ি দুটোতে উঠে পড় সবাই। নেকড়ের হাত থেকে বাঁচতে হলে এখুনি পালাতে হবে আমাদের। কাউন্টের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে স্বাভাবিক জানোয়ারে পরিণত হয়েছে ওরা। যাদুর বৃত্ত বা ওই ধরনের আর কিছুই এখন ওদের ঠেকাতে পারবে না।

কিন্তু পালিয়ে যাবে কোথায়? জিজ্ঞেস করলাম আমি।

কাউন্ট ড্রাকুলার প্রাসাদ দুর্গে।

প্রাসাদ দুর্গে, অবাক হয়ে গেলাম আমি। ওই অভিশপ্ত দুর্গে এই রাতের বেলা গিয়ে ঢুকতে চাইছেন আপনি?

হ্যাঁ, প্রাসাদ দুর্গে। ওটাই এখন আমাদের জন্যে সবচেয়ে নিরাপদ স্থান।

নিরাপদ হল কি করে? কাউন্ট ড্রাকুলা না হয় মরেছে, কিন্তু ওই তিন ডাইনী তো রয়ে গেছে।

না, নেই। আজ দুপুরে শেষ করে এসেছি আমি ওদের। তুমি তখন ঘুমিয়ে ছিলে।

প্রফেসরের প্রতি শ্রদ্ধায় আর একবার নুয়ে এল আমার মাথাটা।

কাউন্ট মারা যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে খুলে গিয়েছিল দুর্গের সমস্ত মায়াবী তালা, কাজেই সদর দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতে বিন্দুমাত্র বেগ পেতে হয়নি আমাদের। ঘোড়াসুদ্ধ গাড়িগুলোকেও ভেতরে নিয়ে আসার পর ভেতর থেকে দরজায় খিল তুলে দিয়েছিলেন প্রফেসর।

সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে এসে যে কামরাটায় জোনাথনের ঘুমানোর বন্দোবস্ত করেছিল কাউন্ট ড্রাকুলা তা আমাদের দেখাচ্ছিল জোনাথন, এমন সময় কয়েকজন লোকের ভয়ার্ত চিৎকার শুনে চমকে উঠে ছুটে গেলাম জানালার কাছে। তারার আবছা আলোয় চোখে পড়ল দুর্গের সদর দরজার দিকে প্রাণপণে ছুটে আসছে কয়েকটা লোক। ওদের চুল আর পোশাকের আবছা, অবয়ব দেখে বুঝলাম সেই জিপসী কয়জন। কিন্তু ওরা এভাবে চেঁচাতে চেঁচাতে ছুটছে কেন? মনে হচ্ছে ভয়ঙ্কর কোন কিছু তাড়া করেছে ওদের। কয়েক সেকেও পরই বুঝতে পারলাম ব্যাপারটা। বন থেকে বেরিয়ে হিংস্র গর্জন করতে করতে জিপসীদের পেছন পেছন ছুটে আসছে লোমশ জানোয়ারগুলো। কাউন্টের পৈশাচিক প্রভাব মুক্ত হয়ে তারই পূজারীদের তাড়া করেছে ভয়াবহ নেকড়ের দল।

বন্ধ সদর দরজার কাছে এসে প্রাণপণে তাতে ধাক্কা দিতে শুরু করল জিপসীরা, আর বার বার পেছনে তাকাতে লাগল। ওদের কাছ থেকে আর মাত্র কয়েক গজ দূরে আছে সাক্ষাৎ মৃত্যু।

উদ্বিগ্নভাবে প্রফেসরকে বললাম, দরজার খিলটা খুলে দেয়া উচিত, প্রফেসর।

এখন আর কোন লাভ নেই, শান্ত গলায় বললেন প্রফেসর। দেরি হয়ে গেছে অনেক। নিচে নেমে গিয়ে আমরা খিল খোলার আগেই জিপসীরে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলবে নেকড়ের দল।

নাটকের শেষ অঞ্চ অভিনীত হবার আগেই আস্তে করে জানালার কাছ থেকে সরে এলাম আমি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *