২.১৪ বাণিজ্য দূতের দফতরে

জোনাথন হারকারের ডায়েরী থেকে

৩০ অক্টোবর, সকাল।

মিনাকে মিস্টার মরিসের সাথে আগেই তারযোগে ঠিক করে রাখা হোটেলে পাঠিয়ে দিলাম। লর্ড গোডালমিং চলে গেলেন বাণিজ্য দূতের দফতরে। আর আমরা তিনজনে রওনা দিলাম জাহাজ ঘাটার উদ্দেশে।

সোজা গিয়ে জারিনা ক্যাথেরিনের ক্যাপ্টেনের সাথে দেখা করে বাটার কথা জিজ্ঞেস করলাম। তিনি জানালেন মাটি বোঝাই বিরাট ওই বাজটাই শুধু গলেজএ নামিয়ে দেয়া হয়েছে। এছাড়া আর কোন মাল খালাস হবে না এখানে। তিনি আরও জানালেন, গতকাল বিকেলে ১৬নং বার্গেন স্ট্রাসের ইমানুয়েল হিলডেসহিয়েম নামে একজন রুমানিয়ান কাউন্ট ড্রাকুলার উপযুক্ত নির্দেশপত্র দেখিয়ে ছাড়িয়ে নিয়ে গেছে বাক্সটা। প্রথমে নাকি আপত্তি জানিয়েছিলেন ক্যাপ্টেন, কিন্তু রুমানিয়ানটা জোর করতে থাকলে বললেন যে বাটা ভার্মায় খালাস করার নির্দেশ আছে ভর ওপর। তবুও নাছোড়বান্দা রুমানিয়ানা, শেষ পর্যন্ত বাক্সের গায়ে আটকান লেবেল পড়ে দেখতে অনুরোধ করল সে ক্যাপ্টেনকে। উপায়ান্তর না দেখে তাই করলেন ক্যাপ্টেন? অবাক কাণ্ড! লেবেলে নাকি লেখা আছে গালেজ ভায়া জিব্রাল্টার। লেবেলটা জাল কিনা তাও পরীক্ষা করে দেখলেন ক্যাপ্টেন। কিন্তু না, একেবারে জেনুইন লেবেল।

এর বেশি কিছু জানেন না ক্যাপ্টেন জাহাজ থেকে নেমে এসে ভাড়াটে টমটম রাখার জায়গায় খোঁজ নিয়েও তেমন কিছু জানা গেল না। একজন টমটমঅলা শুধু বলতে পারল গতকাল বিকেলে নাকি একটা টমটমে চাপিয়ে বিরাট একটা কাঠের বাক্স নিয়ে যাওয়া হয়েছে, কিন্তু কোথায় নেয়া হয়েছে বলতে পারল না সে।

হতাশ হয়ে ফিরে এলাম হোটেলে।  

*

আমরা হোটেলে পৌঁছানর একটু পরই লর্ড গোডালমিংও ফিরে এলেন। বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে জরুরী মিটিং-এ বসলাম আমরা। এখন আমাদের গন্তব্যস্থান সোজা কাউন্ট ড্রাকুলার প্রাসাদ দুর্গ। যেভাবেই হোক বিসট্রিজ থেকে বোর্গো গিরিপথ অতিক্রম করে কাউন্টির দুর্গের পথ ধরতে হবে আমাদের। গালেজ থেকে বিসট্রিজে তিন ভাবে যাওয়া যায়। প্রথমত জলপথে, সেরেথ নদী দিয়ে। দ্বিতীয়ত রেলপথে—এখান থেকে ভেরেস্তি পর্যন্ত গিয়ে ঘোড়া গাড়িতে চেপে। আর তৃতীয় ও শেষ পথটা শুধু ঘোড়া গাড়িতে। আন্দাজ করলাম। এই পথেই গেছে কাউন্ট ড্রাকুলা।

যদি প্রথম পথেই যায়, সেক্ষেত্রে কাউন্ট ড্রাকুলাকে ধরতে হলে একটা অসাধারণ দ্রুতগামী স্টীম লঞ্চ দরকার। আর দ্বিতীয় পথে যদি গিয়ে থাকে সে তাহলে তাকে ধরা যাবে না কোনমতেই। কিন্তু সেপথে বারবার বাহন বদলাতে হবে বলে আন্দাজ করলাম কিছুতেই সে পথটা বেছে নেয়নি ড্রাকুলা। আর তৃতীয় পথটা ধরে যদি সে গিয়ে থাকে, তাহলে এই মুহূর্তে আমরা রওনা দিলেও আমাদের থেকে পনর যোল এন্টা এগিয়ে থাকবে ড্রাকুলা। সুতরাং একটা অত্যন্ত দ্রুতগামী টমটম হলে একটানা আটচল্লিশ ঘণ্টা চলার পর হয়ত কাউন্ট ড্রাকুলাকে ধরা সম্ভব হলেও হতে পারে আমাদের পক্ষে। যদিও আমরা নিশ্চিত যে তৃতীয় পথটাই বেছে নিয়েছে সে, তবুও হুঁশিয়ার থাকতে হবে আমাদের। অন্য দুটো পথে তার যাওয়ার সম্ভাবনাটাও একেবারে বাদ দিলে চলবে না।

তাহলে কি করা যায়? সংক্ষিপ্ত আলোচনার পর ঠিক হল, যত টাকা লাগুক স্টীম লঞ্চ ভাড়া করে নদীপথে যাব আমি আর লর্ড গোলমিং। মিনা আর প্রফেসর এগারটা চল্লিশের ট্রেন ধরে রেলপথে যাবেন। আর ছঘোড়ায় টানা একটা গাড়ি নিয়ে তৃতীয় পথে রওনা দেবেন ডাক্তার সেওয়ার্ড আর মিস্টার মরিস। বোর্গো গিরিপথের মুখে গিয়ে মিলিত হবে তিনটে দল এবং শেষ কথা হল যে-কোন উপায়েই হোক কাউন্ট ড্রাকুলার আগে পৌঁছতে হবে তিনটে দলের।

পথে দস্যু তস্কর বা বুনো জানোয়ারের ভয় আছে, কাজেই তিনটে দলকেই সাথে করে আগ্নেয়াস্ত্র নিতে হবে। প্রয়োজনীয় ম্যাপও নিতে হবে। সমস্ত সম্ভাবনাগুলো সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করে যার যার দায়িত্ব বুঝে নিয়ে হোটেল থেকেই তিনটে দলে ভাগ হয়ে তিন দিকে বেরিয়ে পড়লাম আমরা।

৩০ অক্টোবর, রাত।

প্রচুর টাকার বিনিয়ে একটা খুবই ভাল লঞ্চ জোগাড় করতে পেরেছি আমরা। চালককে বসে থাকতে বলে নিজের হাতেই স্টিয়ারিং হইল তুলে নিলেন লর্ড গোডালমিং। অসাধারণ দক্ষতায় প্রচণ্ড জোরে লঞ্চটাকে চালিয়ে নিয়ে চললেন তিনি। এত ভাল লঞ্চ চালনা তিনি কোথায় শিখলেন জিজ্ঞেস করে জানলাম, টেমস নদীতে তাঁর নিজেরই একটা স্টীম লঞ্চ আছে। নিরক্ষরেখা থেকে ৪৭ ডিগ্রী কৌণিক দূরত্ব রেখে উত্তর দিকে যাত্রা করেছিলাম আমরা, এখন দ্রুত গতিতে কারপাথিয়ানসের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে চলেছি। লর্ড গোডালমিং আমাকে আশ্বাস দিয়েছেন এ হারেই সারাটা রাত লঞ্চ চালিয়ে যেতে পারবেন তিনি।

অন্ধকার রাতে, অজানা পথে এক অজানা ভয়ঙ্করের দেশে পাড়ি জমিয়েছি আমরা। বাইরের পৃথিবীর সাথে এখন আমাদের সমস্ত যোগাযোগ ছিন্ন। গভীর অন্ধকারে নদীর দুতীরের বিশাল পাহাড়গুলোকে দেখলে কেন যেন ছমছম করে ওঠে গা। তার ওপর মাঝে মাঝেই হিমেল ঝড়ো বাতাসের প্রচণ্ড ঝাঁপটায় থর থর করে কেঁপে উঠছে আমাদের লঞ্চ।

৩১ অক্টোবর।

যতই সামনে এগোচ্ছি, বেড়ে চলেছে ঠাণ্ডা। লঞ্চের ভেতরে ফার্নেসের উত্তাপ মা থাকলে প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় বহু আগেই জমে যেতাম। সারারাত একটানা লঞ্চ চালিয়ে ক্লান্ত হয়ে চালকের হাতে হুইল তুলে দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন লর্ড গোডালমিং। দুপুরের পর থেকে আবার লঞ্চ চালনার ভার নিয়েছেন তিনি।

১ নভেম্বর।

সাংঘাতিক উদ্বেগ সত্ত্বেও গভীর ভাবে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, ঘুম ভাঙল লর্ড গোড়ালমিং-এর ডাকে। ধড় মড় করে উঠে বসে দেখলাম সকাল হয়ে গেছে।

ফালুতে এসে পৌঁছার পরও ড্রাকুলার বাক্সের কোন খোঁজ পেলাম না। এখান থেকে বিসট্রিজের দিকে চলে গেছে ছোট্ট একটা শাখা নদী। ওই পথেই যেতে হবে আমাদের। শাখা নদী দিয়ে ভেতরে ঢুকেই একটা ফেরিঘাট চোখে পড়ল। ওখানে খোঁজ নিয়ে জানলাম। বড় আকারের নৌকা পাল তুলে দিয়ে বেশ দ্রুত গতিতেই বিসট্রজের দিকে এগিয়ে গেছে গতকাল রাতের বেলা। কে হ্রানে, ওই নৌকাটায় করেই যাচ্ছে কিনা কাউন্ট ড্রাকুলা? যাক বা না যাক, এ ভাবেই বিসট্রজে পৌঁছুতে হবে আমাদের। এ পর্যন্ত ভাল ভাবেই এসেছি আমরা। অন্য দুটো দল ও কি আমাদের মতই এগুচ্ছে? হঠাৎ মিনার কথা মনে পড়তেই মনটা খারাপ হয়ে গেল। ঈশ্বরের কাছে আর্জি জানাচ্ছি, ও যেন বিপদ মুক্ত থাকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *