২.০৭ লুসিকে নিয়ে ব্যস্ত থাকায়

ডাক্তার জন সেওয়ার্ডের ডায়েরী থেকে

২৬ সেপ্টেম্বর।

লুসিকে নিয়ে ব্যস্ত থাকায় রেনফিল্ডের দিকে নজর দিতে পারিনি গত কয়েকদিন। আজ খোঁজ নিয়ে জানলাম মোটামুটি ভালই আছে সে। আর কোন ঝামেলায় পড়তে হয়নি ওকে নিয়ে।

আর্থারের একটা চিঠি পেয়েছি গতকাল। একই খামে ভরে মরিসও চিঠি দিয়েছে একটা। তাতে জেনেছি ভালই আছে ওরা। মানসিক প্রফুল্লতা অনেকটা ফিরে আসছে আর্থারের।

এদিকে নিজেকে কাজের মাঝে ডুবিয়ে রেখেছি আমি। লুসির স্মৃতি থেকে মুক্তি পেতে হলে এছাড়া আর কোন পথ নেই। বেশ ভালই ছিলাম, কিন্তু হঠাৎ করেই ঘটতে শুরু করেছে আবার নতুন ঘটনা। এসব অদ্ভুত কাণ্ডকারখানার কোথায় যে শেষ, ঈশ্বরই জানেন। আর প্রফেসর ভ্যান হেলসিং কিছু কিছু জানলেও এখন বলবেন না কিছুতেই। এগজিটার থেকে ফিরেছেন আজ প্রফেসর। আমি তখন শুয়ে শুয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলাম। গম্ভীর মুখে ঘরে ঢুকে কোন কথা না বলে আমার দিকে দি ওয়েস্ট মিনিস্টার গেজেট পত্রিকাটা এগিয়ে দিয়ে একটা বিশেষ খবরের উল্লেখ করে বললেন, পড়েছ এটা?।

পড়েছি সকালবেলাই। কিন্তু মাথামুণ্ড কিছুই বুঝিনি। আর ও নিয়ে আমার অত মাথা ঘামাবার দরকারই বা কি? ওটা পুলিশের কাজ। কিন্তু সেটা নিয়ে প্রফেসরের ভাবনা দেখে অবাক হলাম। না বুঝেই প্রশ্ন করলাম, ব্যাপারটা নিয়ে আপনি ভাবছেন কেন, স্যার?

যেটার বিরুদ্ধে আহার দ্রিা ত্যাগ করে লড়ছি গত কয়েকদিন ধরে, সেটা নিয়ে ভাবব না?

প্রফেসরের কথার অর্থ বুঝতে না পেরে বোকার মত হুঁ করে বসে রইলাম। খেপে গেলেন প্রফেসর, আসলে তোমাকে চালাক মনে করতাম, জন। কিন্তু এখন দেখছি আমার ধারণা মিথ্যে। একটু থেমে আবার বললেন, রহস্যময় ভাবে হারিয়ে যাওয়া শিশুগুলোকে ফেরত পাবর পর ওদের গলায় দাঁতের সূক্ষ্ম ক্ষত দেখা যায়। এর সঙ্গে লুসির গলার ক্ষত দুটার মিল এত সকালেই ভুলে বসে আছ?

তাই তো। দুটো ব্যাপারে বেশ সাদৃশ্য আছে দেখছি! বললাম, বুঝতে পেরেছি। যে দুর্ঘটনায় লুসির মৃত্যু হয়েছে, সেই একই জাতীয় দুর্ঘটনার কবলে পড়েছিল শিশুগুলো।

হ্যাঁ, এতক্ষণে অনেকটা বুঝতে পেরেছ, বলতে বলতে একটা চেয়ার টেনে আমার মুখোমুখি বসলেন প্রফেসর। কিন্তু লুসির দুর্ঘটনা আর শিশুগুলোর দুর্ঘটনার জন্যে আলাদা আলাদা শক্তি দায়ী।

বুঝতে না পেরে চুপ করে রইলাম। একটু সামনের দিকে ঝুঁকে বললেন প্রফেসর, একটা কথার জবাব দাও তো। এ পর্যন্ত লুসির মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে যথেষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছি আমি। তার একটুও কি তোমার মাথায় ঢোকেনি?

টুকবে না কেন? অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের ফলে স্নায়বিক দুর্বলতাই লুসিকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে।

গুড। কিন্তু সে-রক্তক্ষরণের কারণ কি? কোথায় গেল ওই রক্ত?

প্রফেসরের প্রশ্নে চমকে উঠলাম। তাই তো! এমন করে তো ভেবে দেখিনি কখনো। রক্তক্ষরণের কোন কারণই তো ঘটেনি লুসির শরীরের কোথাও। তাহলে? প্রফেসরের প্রশ্নের কোন জবাব খুঁজে পেলাম না।

আমার বিছানার একেবারে পাশে চেয়ারটাকে টেনে নিয়ে এলেন প্রফেসর। তারপর যেন ক্লাসে লেকচার দিচ্ছেন, এমন ভাবে বলতে শুরু করলেন তিনি, আসলে তুমি যথেষ্ট বুদ্ধিমান, সাহসী এবং যুক্তিবাদী হলেও কোনকিছু আচ্ছন্ন করে রেখেছে তোমার মন। ফলে দৈনন্দিন জীবনের বাইরের কোনকিছুর সাথে সম্পর্ক নেই তোমার, সেদিকে ফিরেও তাকাও না তুমি। জানা-অজানার মাঝে এমন অনেক কিছু আছে এই পুরনো পৃথিবীতে, বুদ্ধিতে যার ব্যাখ্যা চলে না, নেই ওগুলোর কোন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি। অথচ অস্বীকার করতে পারা যায় না ওগুলোকে। যেমন, সম্মোহন-একে অস্বীকার করতে পার কি তুমি? এই সম্মোহন জিনিসটা কি, এর যথাযথ উত্তর কি বিজ্ঞান দিতে পেরেছে?

কিন্তু বিজ্ঞানীরা তো একে অস্বীকার করে না।

বেশির ভাগই করে। আর যারা করে না, তারাও এ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে পরিষ্কার করে বলতে পারে না কিছু।

বুঝলাম তর্ক করে লাভ নেই। আমি নিজেও এ সম্পর্কে প্রায় কিছুই জানি না। অতএব চুপ থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ মনে করলাম। আমাকে নিরুত্তর দেখে আবার বলে চললেন প্রফেসর, অতীতে হাজার হাজার রহস্যময় কাণ্ড ঘটেছে এই পৃথিবীতে, আজও ঘটছে, ভবিষ্যতেও ঘটবে। তার কিছু কিছু সমাধান হয়ত করতে পেরেছে বা পারবে মানুষ, কিন্তু বেশির ভাগই মানুষের ক্ষমতার বাইরে।  বল তো দেখি, যেখানে বড় জোর দেড়শো বছর বাঁচে মানুষ, তাও কচিত কদাচিৎ, সেখানে নশো বছর বেঁচে ছিল কি করে মেথুসেলা? ছোট বড় সব জাতের মাকড়সাই অল্প কদিনের বেশি বাঁচতে পারে না, অথচ স্পেনের এক পুরনো গির্জায় শুধুমাত্র প্রদীপের জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত চর্বি খেয়ে কি করে শতাব্দীর পর শতাব্দী বেঁচে ছিল সেই বিখ্যাত বিশাল মাকড়সাটা? এসব প্রশ্নের কি জবাব দেবে তুমি? একটু থেমে আবার বলতে শুরু করলেন প্রফেসর, জান, দক্ষিণ আমেরিকার কোন কোন অংশে এবং পশ্চিম সাগরের কোন কোন দ্বীপে এক জাতের ছোট আকারের বাদুড় আছে, যার নাম ভ্যাম্পায়ার। দিনের বেলা গাছের ডালে মড়ার মত ঝুলে থাকে, আর রাতের বেলা মানুষ বা অন্যান্য প্রাণীর দেহ থেকে চুরি করে রক্ত খেয়ে যায় ওরা। একটা মশা কামড়ালে মশার বাপ-মা চোদ পুরুষ উদ্ধার করে থাপ্পড় মেরে শরীর থেকে তাড়াবার চেষ্টা করি ওটাকে আমরা। অথচ মশার চেয়ে লাখগুণ বড় ওই ভ্যাম্পায়ারেরা এই আমাদের মত মানুষের দেহ থেকেই রক্ত খেয়ে চলে যায়, অথচ টেরও পায় না মানুষ। কেন? কোন্ কৌশলে গায়ের চামড়া ফুটো করে রক্ত খায় ওরা, তা আজও বলতে পারে না বিজ্ঞানীরা। জান, অনেক সময় ভ্যাম্পায়ার আছে এমন সব দ্বীপের কাছ দিয়ে যাবার সময় প্রাণ দিতে হয় অনেক নাবিককে? দিনের বেলায় কিছু না, কিন্তু রাতে জাহাজের ডেকে পাহারারত নাবিকের গায়ের রক্ত খেয়ে চলে যায় ভ্যাম্পায়ার। চলতে থাকে রাতের পর রাত এই ঘটনা। প্রথম প্রথম কিছুই বুঝতে পারে না নাবিকেরা কিন্তু ক্রমাগত শরীরের রক্ত বেরিয়ে যাবার ফলে ফ্যাকাসে হতে শুরু করে ওই নাবিকদের শরীর। আস্তে আস্তে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে ওরা। লুসির কেসটাও অনেকটা এই রকম। না হলে, চার চারজন সুস্থ সবল পুরুষের শরীরের রক্ত দেয়ার পরও রক্তশূন্যতায় ভুগে সে মারা যায় কি করে?

তাহলে, তাহলে স্যার, আপনি কি বলতে চান লুসির মৃত্যুর জন্যে ভ্যাম্পায়ারই দায়ী?

হ্যাঁ। তবে ওটা সত্যিকারের ভ্যাম্পায়ার নয়, যদিও অনেকটা ভ্যাম্পায়ারের পদ্ধতিতেই কাজ করে। ইণ্ডিয়ায় অনেক তান্ত্রিক সাধক-ফকির আছেন, যারা ইচ্ছে করলেই স্বেচ্ছায় মারা যেতে পারেন, আবার বেঁচেও থাকতে পারেন যতদিন খুশি। কবরের মত জায়গায় ওদেরকে বন্দী করে রাখলেও বেরিয়ে চলে আসতে পারেন ওঁরা। আমাদের এই ভ্যাম্পায়ারটা অনেকটা ওই ধরনের।

একি শুনছি আমি? এই ঊনবিংশ শতাব্দিতে লণ্ডনের মত সভ্য উন্নত নগরীর বুকেও কি এ ধরনের কাও ঘটতে পারে? বেশ কয়েক মিনিট স্তব্ধ হয়ে বসে থাকার পর হঠাৎ লাফ দিয়ে নেমে পড়লাম বিছানা থেকে। ওই অসাধারণ প্রতিভাবান লোকটার পায়ের কাছে হাঁটু গেড়ে বসে হাত দুটো জোড় করে মিনতি জানালাম, স্যার, চিরদিনই আপনার প্রিয় ছাত্র ছিলাম আমি। জীবনে বহু শিক্ষা পেয়েছি আপনার কাছে। আজও কিছু শেখান আমাকে, এভাবে অন্ধের মত হাতড়ে হাতড়ে আর কতদিন চলবে?

সব কথা অবশ্যই তোমাকে বলব, জন। কিন্তু সময় আসেনি। এখন বললে হয়ত বিশ্বাসই করবে না সব কথা।

এমন কি কথা, স্যার, যে আপনি বললেও বিশ্বাস করব না?

করবে না। যেমন ধর শিশুদের গলার ছোট ছোট ক্ষতচিহ্নগুলোর কথা। তোমার মতে লুসির গলা আর শিশুদের গলার ক্ষতের জন্যে একই শক্তি দায়ী।

হ্যাঁ, আমার তো তাই ধারণা…।

না, তা নয়, জন, উঠে দাঁড়ালেন প্রফেসর। আসল ব্যাপারটা সত্যিই অবিশ্বাস্য।

দোহাই আপনার, স্যার। আর হেঁয়ালি সইতে পারছি না আমি। যা বলার বলে ফেলুন, প্রায় চেঁচিয়ে উঠলাম আমি।

সোজা আমার চোখে চোখ রাখলেন প্রফেসর। ভরাট গম্ভীর গলায় বললেন, যদি বলি শিশুদের গলায় ওগুলো লুসির দাঁতের চিহ্ন?

স্তব্ধ হয়ে গেলাম প্রফেসরের কথা শুনে। ধীরে ধীরে একটা অন্ধ ক্রোধ মাথা চাড়া দিয়ে উঠল আমার মনে। যেন আমার সামনে বিনা দোষে লুসির গালে একটা প্রচও থাপ্পড় মেরে বসেছেন প্রফেসর। কয়েক মুহূর্ত কথা ফুটল না আমার মুখে। শেষে ফিসফিস করে বলেই বসলাম, আসলে, আসলে আপনি পাগল হয়ে গেছেন, স্যার?

আমার কথায় বিন্দুমাত্র রাগ করলেন না প্রফেসর, যেন এই উত্তরই আশা করেছিলেন তিনি। মৃদু হেসে শান্ত কণ্ঠে বললেন, হলে সত্যিই খুশি হতাম, জন। এরকম নির্মম সত্যকে সহ্য করতে পারবে না বলেই আসল কথা সহজে বলতে চাইনি আমি।

প্রফেসরের কণ্ঠস্বর আর বলার ভঙ্গি যেন চাবুক মেরে বাস্তবে ফিরিয়ে আনল আমাকে। পরিষ্কার বুঝতে পারলাম সম্পূর্ণ সুস্থ মস্তিষ্কে আছেন প্রফেসর। আসলে ওই নির্মম সত্যকে সহ্য করতে না পেরেই হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়েছিলাম আমি। একটু আগে প্রফেসরকে অমন একটা কটু কথা বলে বসেছি ভেবে লজ্জায় চোখ তুলে চাইতে পারলাম না তার দিকে। মাথা নিচু করে বললাম, গর্দভের মত কথা বলে ফেলেছি, স্যার। দয়া করে মাপ করবেন।

এতে লজ্জার কিছু নেই, জন। তোমার বয়সে, তোমার অবস্থায় থাকলে আমিও এর চেয়ে ভাল কিছু বলতাম না। তাছাড়া লুসিকে ভালবাসতে তুমি। ওর সম্পর্কে এধরনের কথা শুনলে মাথা ঠিক না থাকারই কথা তোমার। তবু, আমার মুখের কথা শুনে তোমাকে ব্যাপারটা বিশ্বাস করতে বলব না। সাহস থাকলে চল, আজ রাতেই প্রমাণ করে দেব আমি।

এবার সত্যিই বিপদে পড়লাম। যত সহজ মনে হচ্ছে ব্যাপারটা চোখের সামনে ঘটতে দেখে সহ্য করা তত সহজ নয়। ইতস্তত করতে লাগলাম বুঝতে পেরে প্রফেসর বললেন, তোমাকে ব্যাপারটা চাক্ষুষ না দেখিয়ে আর এক পা-ও এগোব না আমি। কারণ তোমার সাহায্য যখন আমার দরকার, তোমাকে আগে পুরোপুরি বিশ্বাস করাতে হবে। তা নাহলে বার বারই নিজের অজ্ঞাতে হলেও আমার কাজে বাধার সৃষ্টি করবে তুমি।

ঠিক আছে, স্যার। যা ভাল বোঝেন, করুন। তা আপাততঃ আমাদের কাজ কি?

প্রথমেই নর্থ হসপিটালে গিয়ে সবচেয়ে শেষের শিশুটাকে পরীক্ষা করে দেখব আমি, একা। ওর চার্জে থাকা ডাক্তার ভিনসেন্টের সাথে আগেই কথা বলে রেখেছি।

তারপর?

তারপর আরো কিছু টুকিটাকি কাজ সেরে সন্ধ্যার পর চলে যাব হ্যাম্পস্টেডের কবরখানায়। রাতটা ওখানেই কাটাব দুজনে, বলে পকেট হাতড়ে কি যেন একটা বের করলেন প্রফেসর। আর এই যে দেখ, লুসিদের পারিবারিক কবরখানার চাবি। ইচ্ছে করেই আর্থারকে দিইনি আমি এটা। চাবিটা আবার পকেটে রেখে দিয়ে বললেন প্রফেসর, খেয়ে দেয়ে একটু ঘুমিয়ে নাও তুমি। নাহলে রাত জাগতে কষ্ট হবে। আমি চললাম, বলেই ঘুরে দাঁড়িয়ে রওনা হয়ে গেলেন।

প্রফেসর চলে যাবার পর সটান শুয়ে পড়লাম বিছানায়। খেতে বসেও লাভ নেই, সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে খাবার রুচি। বিছানায় শুয়েও বহুক্ষণ ঘুম এল না চোখে। কেবলই ঘুরে ফিরে মনে আসছে এক চিন্তা ভাবতে ভাবতেই কখন যে ঘুমিয়ে পড়লাম জানি না।

.

সন্ধ্যার পর পরই রাতের খাওয়াটা সেরে নিলাম আমি আর প্রফেসর। তারপর বেরিয়ে পড়লাম দুজনে। কৃষ্ণপক্ষের রাত কাজেই ঘুটঘুটে অন্ধকার। এখানে ওখানে ঘরের ফাঁক ফোকর দিয়ে বেরিয়ে আসা আলোর রেখা যাও চোখে পড়ছে দুএকটা, তাতে অন্ধকার তো কাটছেই না বরং আরো যেন বাড়িয়ে তুলেছে। এলোমেলো বয়ে চলেছে হিমেল হাওয়া। দূর থেকে ভেসে আসছে টহলদারী পুলিশের ঘোড়ার খুরের শব্দ। কর্কশ শব্দে একবার ডাকছে, একবার থামছে ঝিঝিগুলো। ঝিঝির ডাক থেমে গেলেই নিস্তব্ধ নিঝুম হয়ে পড়েছে চারদিক। মাঝে মধ্যে ডানা ঝটপট করে মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে দুএকটা নিশাচর পাখি।

হাঁটতে হাঁটতে সংকীর্ণ ঢালু পথ বেয়ে পাহাড়ী উপত্যকায় এসে পৌঁছলাম। এলাকাটা আমার সম্পূর্ণ চেনা হলেও এখন কেমন যেন রহস্যময় লাগছে আশপাশটা। অন্ধকারে আবছামত ঠাহর হচ্ছে হ্যাম্পস্টেডগির্জার উঁচু চূড়া।

কারখানার কাছে পৌঁছে গেট খুলে ভেতরে ঢুকলাম। দুপাশের বিশাল সব ওক আর বার্চের সারির মাঝখান দিয়ে চলে গেছে পাথর বা ধান চওড়া পথ। এ পথটা থেকে আবার ডাইনে বাঁয়ে বেরিয়ে গেছে বহু শাখা পথ। কুঞ্জবিতানের মত লতায় পাতায় ঢাকা এই সরু পথগুলো। এরকম একটা শাখা ধরেই লুসিদের পারিবারিক কবরখানার সামনে এসে পৌঁছলাম আমরা। আমাকে কারখানার দরজার তালা খুলতে বলে একটা ছোট্ট মোমবাতি জ্বাললেন প্রফেসর। দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে লুসির কফিনের সামনে এসে দাঁড়ালাম। আমার হাতে মোমবাতিটা দিয়ে একটা স্কু-ড্রাইভার বের করে কফিনের কজার স্কু খুলতে শুরু করলেন প্রফেসর। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কফিন খুলছেন কেন, স্যার?

হলে বিশ্বাস করা কি করে, তোমাকে? কথা বলতে বলতেই স্কু খুলে কফিনের ডালাটা তুলে ধরে আমাকে ভেতরে তাকাতে বললেন প্রফেসর। কফিনের ভেতর একবার উঁকি দিয়েই স্তব্ধ হয়ে গেলাম। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হলো না আমার। এ-ও কি সম্ভব? খা

খাঁ করছে কফিনের ভেতরটা। লুসির মৃতদেহের চিহ্নমাত্র নেই ওতে। অথচ স্থির নিশ্চিত আমি, এটাই লুসির কফিন। উত্তেজনায় ঝিমঝিম্ করতে লাগল সারা শরীর, ঝাঁ ঝাঁ করছে দুকান। মনে হচ্ছে মাথার ভেতর করাত চালাচ্ছে কেউ। আমার ভাবান্তর লক্ষ্য করে স্থির শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করলেন প্রফেসর, সন্দেহ ঘুচেছে?

না। লুসির লাশটা কফিনে নেই বলেই কোন কিছু প্রমাণ হয় না।

কেন?

কেন? এমনও তো হতে পারে কেউ চুরি করে নিয়ে গেছে ওর লাশটা, বলেই বুঝলাম গর্দভের মত কথা বলে ফেলেছি। এটা কোন যুক্তিই নয়। কারণ কফিন থেকে লাশ চুরি করতে যাবে কে? তাতে লাভই বা কি?

বোকার মত কথা বলো না। ঠিক আছে, আরো দেখতে চাও? এসো, দেখাচ্ছি, বলে কফিনের ডালাটা বন্ধ করে দিলেন প্রফেসর। ফুঁ দিয়ে বাতিটা নিভিয়ে স্কু-ড্রাইভারটাসহ ব্যাগে ভরে রাখলেন। বাইরে বেরিয়ে এসে আবার তালা মেরে দিলাম দূরজায়। তারপর আমাকে গির্জার এদিকটায় নজর রাখতে বলে অন্য দিকটায় এগিয়ে গেলেন তিনি। বিশাল একটা দেবদারুর আড়ালে লুকিয়ে থাকলাম আমি। প্রফেসর অদৃশ্য হয়ে গেলেন ওদিককার একটা গাছের আড়ালে। গা ছমছমে নিস্তব্ধতা চারদিকে। সেই অখণ্ড নীরবতাকে ভেঙে খান খান করে দিয়ে মাঝে মধ্যেই কর্কশ শব্দে ডেকে উঠছে ঝিঝিগুলো, কিছুক্ষণ একটানা ডেকেই

থেমে যাচ্ছে আবার। আরো জমাট বাঁধছে নিস্তব্ধতা। আরও কিছুক্ষণ কেটে যাবার পর চাঁদ উঠলো। কৃষ্ণপক্ষের আবছা কমলারঙা একফালি ভৌতিক চাদ। ফ্যাকাসে জ্যোৎস্নায় পরিষ্কার হয়নি আশপাশের কোন কিছুই, বরং আরো অদ্ভুত রহস্যময় দেখাচ্ছে ঝোপঝাড়গুলোকে। হিমেল হাওয়ার ঝাঁপটায় মজ্জা পর্যন্ত ভেদ করতে চাইছে প্রচণ্ড ঠাণ্ডা, এতো ঠাণ্ডায়ও ভয়ে দরদর করে ঘামছি আমি। লুসির শূন্য কফিনটার কথা মনে পড়লেই, আতঙ্কে খাড়া হয়ে যাচ্ছে গায়ের লোম। বাতাসে পাতা নড়ার সামান্যতম শব্দেও চমকে উঠছি, মনে হচ্ছে এই বুঝি ঘটলো ভয়ঙ্কর একটা কিছু। একনাগাড়ে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে পা ব্যথা করতে শুরু করেছে। গড়িয়ে চললো সময়। বারটা বাজলো, তারপর একটা, দুটো, আর কতক্ষণ অপেক্ষা করব? ঠিক এই সময় চোখে পড়লো ওটা। দেবদারুর ছায়ায় ছায়ায় কবরখানার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে আগাগোড়া সাদা কাপড়ে ঢাকা একটা মূর্তি। সাদা মূর্তিটা আরও একটু এগিয়ে আসতেই দেখলাম ওটার পেছন পেছন অনুসরণ করে আসছে একটা কালো মূর্তি। হাঁটার ধরন দেখেই বুঝলাম প্রফেসর। দেবদারুর আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে ছুটলাম সেদিকে। কয়েক পা গিয়েই একটা পাথরে হোঁচট খেয়ে মাটিতে পড়ে গেলাম, কপালটা দারুণভাবে ঠুকে গেল একটা পাথরে। ঝিঝিম্ করতে লাগল মাথাটা। কয়েক সেকেণ্ড পর ঝিঝিম্ ভাবটা একটু কমতেই দেখলাম ঠিক আমার সামনে এসে পড়েছে সাদা মূর্তি। কিছুই না বুঝে চেঁচিয়ে উঠলাম। আমার চিৎকার শুনে থমকে দাঁড়ালো সাদা মূর্তিটা, পরক্ষণেই জুনিপার ঝোপের ওপর দিয়ে উড়ে গিয়ে লুসিদের কবরখানার সামনে পৌঁছেই কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেল।

কতক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে ছিলাম জানি না, চমক ভাঙলো প্রফেসরের ডাকে, কি ব্যাপার, জন, পড়ে গেলে কি করে?

উঁ! না, এমনি, হঠাৎ একটা পাথরে হোঁচট লেগে পড়ে গিয়েছিলাম, বলতে বলতে উঠে দাঁড়ালাম আমি।

লাগেনি তো কোথাও?

না, বলেই প্রফেসরের বুকের কাছে জড়ানো ছোট্ট পুঁটলিটা নজরে পড়লো। ওটা কি, স্যার?

এটা মানব শিশু। তা সাদা মূর্তিটাকে দেখেছ তো ঠিকমত?

চেহারাটা দেখিনি।

তোমার জবাব পেয়েছ?

চেহারা যখন দেখিনি, লুসি কিনা কি করে বলব? কিন্তু, স্যার, ওই শিশুটাকে আপনি কোথায় পেলেন?

একটা দেবদারুর গোড়ায়। ডাইনীটাও ছিলো ওখানে, আমার সাড়া পেয়ে পালিয়েছে।

কোন ক্ষতি হয়নি তো শিশুটার?

না দেখে কি করে বলি? এসো আমার সাথে, ঘুরে দাঁড়িয়ে হাঁটতে শুরু করলেন প্রফেসর, আমিও তার পিছু পিছু চললাম। গির্জার কাছাকাছি পৌঁছে বসে পড়ে মাটিতে নামিয়ে রাখলেন তিনি শিশুটাকে। পকেট থেকে দেশলাই বের করে জ্বালিয়ে ভালমত পরীক্ষা করলেন শিশুর গলার কাছটা। খুশি হয়ে বললেন, না, কোন দাগ নেই। ঠিক সময়ই পৌঁছে গিয়েছিলাম আমি।

তা এখন এটাকে নিয়ে কি করবেন, স্যার?

সেটাই সমস্যা, এত রাতে ওকে নিয়ে কোন পুলিশ ফাঁড়িতে গেলে প্রশ্নের ঠেলায় জান বেরিয়ে যাবে। কে জানে উল্টো আমাদেরকে শিশু অপহরণের সাথে জড়িত ভেবে সন্দেহ করে হাজতেও পুরে দিতে পারে পুলিস। তাহলে আমাদের বারটা না বাজিয়ে ছাড়বে না ওরা। তারচেয়ে এক কাজ করা যাক। পথের ধারে পুলিশ বা সাধারণ লোকের নজরে পড়তে পারে এমন কোন জায়গায় শুইয়ে রাখি শিশুটাকে। ভোর হয়ে গেছে। নিরাপদেই থাকবে শিশুটা।

আবার যদি ডাইনী এসে তুলে নিয়ে যায় শিশুটাকে?

নেবে না। আর আসতেই পারবে না ও এখন। শুনছো না মোরগ ডাকছে?

মোরগ ডাকলে আর বেরোতে পারে না বুঝি ডাইনীরা?

না।

জায়গামত পৌঁছে শিশুটাকে মাটিতে শুইয়ে রেখে অদূরেই একটা ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে পড়লাম আমরা। একটু পরই টহলদারী পুলিশের ঘোড়ার পায়ের শব্দ শোনা গেল। ঠিক সেই সময়ই হয়ত জেগে গিয়ে বা অন্য কোন কারণে চেঁচিয়ে কেঁদে উঠলো শিশুটা। সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেল ঘোড়ার খুরের শব্দ। মুহূর্ত পরই আবার এগিয়ে আসতে লাগল দুটো ঘোড়া, এবার দ্বিগুণ জোরে। কয়েক সেকেণ্ড পরই দেখলাম লণ্ঠন হতে এগিয়ে আসছে দুজন ঘোড়সওয়ার। শিশুটাকে খুঁজে পেয়ে ওটাকে নিয়ে চলে গেল পুলিশ দুজন। ওরা চলে যাবার পরও আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলাম আমরা, তারপর ঝোপের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে বাড়ির দিকে রওনা দিলাম।

পথ চলতে চলতেই প্রফেসর বললেন, বাড়িতে গিয়ে ঘুমিয়ে নিতে হবে খানিকটা। আজ দুপুরে আবার হানা দেব হ্যাম্পস্টেডের কবরখানায়।

২৭ সেপ্টেম্বর।

গত রাতের ঘটনার পর ওই অভিশপ্ত কবরখানায় যেতে আর আমার ইচ্ছে হল, কিন্তু ছাড়লেন না প্রফেসর। নির্জন ওই সমাধি ভূমিতে পৌঁছতে পৌঁছতে মাথার ওপর উঠে এল সূর্য। আশ্চর্য, গত রাতে দেখা সেই কবরখানার সঙ্গে এর যেন কোন মিল নেই। উজ্জ্বল রোদে ঝলমল করছে সারাটা উপত্যকা।

লুসিদের কবরখানার গেট খুলে ভেতরে ঢুকে গতরাতের মতই লুসির কফিনের ডালা খুলে তুলে ধরলেন প্রফেসর। আছে। ঠিকমতই কফিনের ভেতর শুয়ে আছে লুসি। এ কি অদ্ভুত কাণ্ড-কারখানার মধ্যে পড়লাম! রাতের বেলা ছিলো না, এখন আবার সে এলো কোত্থেকে? সবচেয়ে আশ্চর্য ব্যাপার, লুসি মারা যাবার পর সাতদিন পেরিয়ে গেছে, কিন্তু একটুও বিকৃত হয়নি ওর শরীর। অথচ এতদিনে পচে গলে যাবার কথা ছিল লাশটার।

আগের চেয়েও অনেক, অনেক বেশি সুন্দরী মনে হচ্ছে লুসিকে। আশ্চর্য রকম টুকটুকে লাল হয়ে গেছে ওর ঠোঁট দুটো, যেন কাঁচা রক্ত লেপে দেয়া হয়েছে ওখানে। অবাক কণ্ঠে নিজেই নিজেকে শুধালাম, এ কি স্বপ্ন, না সত্যি?

আমার হয়ে জবাব দিলেন প্রফেসর, দিনের আলোর মত সত্যি। বলে উবু হয়ে আঙুল দিয়ে লুসির ঠোঁট দুটো একটু ফাঁক করে সেদিকে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললেন তিনি, দেখেছ, কেমন তীক্ষ্ণ হয়ে উঠেছে দাত দুটো? আমার কথাকে অস্বীকার করার আর কোন যুক্তি আছে তোমার?

নেই। এত কিছু অবিশ্বাস্য কাজ কারবার দেখার পর থাকতেও পারে না। একসময় যাকে ভালবেসেছিলাম তার এমন কদর্য ডাইনী রূপ চোখের সামনে দেখতে পাব এ কি স্বপ্নেও ভেবেছি কখনো? পরস্পর বিরোধী একটা ভাব মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে চাইল মনের মধ্যে। এ ধরনের একটা অলৌকিক ঘটনাকে কিছুতেই সত্যি বলে মেনে নিতে পারছি না, অথচ খণ্ডন করার মত যুক্তিই বা

কোথায়? তবু মিনমিন করে বললাম, যে চুরি করেছিল, ভোর রাতে হয়তো আবার সুসির লাশটাকে যথাস্থানে ফিরিয়ে দিয়ে গেছে সে-ই।

ঠিক। কিন্তু কে চুরি করেছিল লাশটা?

তা তো জানি না।

হো হো করে হেসে উঠলেন প্রফেসর, ওরকম কথা যদি তোমার হাসপাতালের কারও কাছে কখনও বল, হয় ঘাড় ধরে হাসাতাল থেকে বের করে দেবে তোমাকে, নাহয় তোমার রোগীদের সাথেই জায়গা করে দেবে। এখন আবোলতাবোল চিন্তা বাদ দিয়ে আমার কথা শোন। একটা জিনিস বল তো, কখনও কোন মানুষের ওই দুটো দাঁত অমন তীক্ষ্ণ আর লম্বা হয়ে উঠতে দেখেছ? তাও আবার মৃত্যুর পর? মেডিকেল সায়েন্সে আছে এ কথার উল্লেখ? আর মৃত্যুর পরও দীর্ঘদিন ধরে মানুষের স্বাস্থ্য অটুট থাকে, বেড়ে যায় রূপ-লাবণ্য এটা কোন কেতাবে লেখা আছে?

জবাব দিতে পারলাম না। নেই তো, দেবো কি করে? কয়েক সেকেণ্ড চুপ করে থেকে আমাকে কিছুটা ধাতস্থ হবার সময় দিলেন প্রফেসর। তারপর আবার বলতে থাকলেন, আজ তোমাকে সব খুলে বলছি, জন। এক দ্বৈত জীবনযাপন করছে এখন লুসি। আমাদের সমাজে থাকাকালীন এক ভয়ঙ্কর জঘন্য পিশাচ ওর রক্ত পান করতে আসত। ওকে সম্মোহিত করে নিজের পৈশাচিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করত শয়তানটা। শেষ পর্যন্ত সম্মোহিত অবস্থায়ই মৃত্যু ঘটে লুসির। এতে ওর ওপর পিশাচটার প্রভাব পুরোপুরিই থেকে যায়। তাই ও আজ আমাদের কাছ থেকে মরে গিয়েও অমৃতা থেকে গেছে। একটা কথা হয়ত জানো না তুমি, সম্মোহিত অবস্থায় মারা গেলে লাশের শরীরে সুপ্ত থেকে যায় আত্মা। আর পিশাচটার প্রভাব লুসির ওপর থেকে যাওয়ায় ওটার মতই রক্তচোষা হয়ে গেছে সে-ও। এখন আমাদের হাতে একটাই মাত্র পথ খোলা আছে, সত্যিকার মৃত্যুর জগতে পাঠিয়ে দিতে হবে লুসিকে।

বুঝতে পারছি এধরনের কথাবার্তা আর বেশিদিন শুনতে থাকলে আমার পরিচালিত পাগলা গারদেরই রোগী হতে হবে আমাকে। মাথার ভেতর তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে সবকিছু, তবু জিজ্ঞেস করলাম, একটা মরা মানুষকে দ্বিতীয় বার মারবেন কি করে আপনি, স্যার?

সহজেই। এসব ক্ষেত্রে প্রথমে লাশের মাথা কেটে ফেলতে হয়। তারপর মুখের ভেতর বুনো রসুনের কোয়া পুরে দিয়ে হৃদপিণ্ড বরাবর ঢুকিয়ে দিতে হয় কাঠের দুচাল কীলক।

লুসির অপূর্ব সুন্দর দেহটা ছিন্ন ভিন্ন হচ্ছে, কল্পনার চোখে দেখতে পেয়ে শিউরে উঠলাম। কিন্তু আশ্চর্য, মনে যতটা, ব্যথা পাওয়া উচিত ছিল ততটা পেলাম না। পেলাম না এই কারণে যে, মানুষ লুসিকে ভালবাসতাম আমি, ডাইনী লুসিকে নয়। আসলে প্রফেসরের কথা একটু একটু করে বিশ্বাস করতে শুরু করেছি আমি।

ভেবেছিলাম আজই কাজ শুরু করে দেবেন প্রফেসর, কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে কফিনের ডালাটা বন্ধ করে ফেললেন প্রফেসর। তারপর আমার হাত ধরে টানলেন, এসো। বাড়ি ফিরে যাই।

থমথমে গম্ভীর মুখে পাহাড়ী উপত্যকার ঢাল বেয়ে নামছেন প্রফেসর, পেছনে পেছনে নামছি আমি। দেখে মনে হচ্ছে গভীর চিন্তায় ডুবে আছেন প্রফেসর। আর থাকতে না পেরে শেষ পর্যন্ত জিজ্ঞেসই করে ফেললাম, কিছু ভাবছেন, স্যার?

অ্যাঁ, হ্যাঁ। ভাবছি বৈকি, জন। ভাবছি যত শীঘ্র সম্ভব এই পৈশাচিক জীবন থেকে মুক্তি দিতে হবে সুসিকে। তবে তার আগে আর্থারকে জানান দরকার। কিন্তু বুঝতে পারছি না কেমন করে বোঝাব তাকে। নিজের চোখে অনেক অবিশ্বাস্য ঘটনা দেখেছ তুমি। মৃত্যুর আগে লুসির গলার ক্ষতচিহ্ন, আর হাসপাতালে ভর্তি হওয়া দুএকটা আঁহত শিশুর গলার দাগের সামঞ্জস্য নিজের চোখে দেখেছ তুমি। লুসির কফিন রাতে খালি আর দিনে ভরা দেখেছ। হ্যাম্পস্টেডের কবরখানায় এক দেবদারুর গোড়ায় একটা শিশুকে কুড়িয়ে পাবার সাক্ষী তুমি। গভীর রাতে জুনিপার ঝোপের ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়া সাদা মূর্তিটাও মিথ্যে দেখনি। অথচ এতকিছু দেখার পরও তোমাকে বোঝাতে যা বেগ পেতে হয়েছে, তাতে ভয় হয় আদৌ বোঝাতে পারবো কিনা আর্থারকে। একটু থেমে দম নিয়ে আবার বলতে শুরু করলেন তিনি, মৃত্যুর আগে লুসির ঠোঁটে চুমো খেতে দিইনি আর্থারকে, তাতেই মনঃক্ষুন্ন না হবার ভান করলেও সে যে তা হয়েছিল এটা নিশ্চিত। এখন আবার ভুল করে বলে বসে লুসিকে জীবন্ত কবর দিয়েছি আমরা। কারণ লুসির মৃত্যুর রায় দিয়েছি আমরা দুই ডাক্তার। এতে আরেকটা সম্ভাবনা তার মাথায় জাগতে পারে, জীবিতাবস্থায় লুসিকে কবর দেবার পর কফিনের ভেতর আমরা খুন করেছি তাকে। আর এ ধারণায় যদি একবার পেয়ে বসে আর্থারকে তাহলে তার পরিণতি একবার চিন্তা করে দেখ তো। অতএব ভেবেচিন্তে অতি সাবধানে এগোতে হবে আমাকে। পরিষ্কারভাবে আর্থারকে বোঝাতে হবে, দেখাতে হবে সবকিছু। আর তারপর, শুধুমাত্র তারপরই লুসিকে ওই অভিশপ্ত জীবন থেকে মুক্তি দেয়া সম্ভব।

কথা বলতে বলতেই বাড়ি পৌঁছে গেলাম। এখান থেকে বিদায় নেবেন প্রফেসর। কিছু টুকিটাকি কাজ সারতে শহরে যেতে হবে তাকে। যাবার আগে বার বার আমাকে হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলে গেলেন, একটু সাবধানে থেকো, জন। একসময় ভালবাসতে তুমি লুসিকে, সুতরাং এখন তোমার ওপর ওর নজর পড়াও বিচিত্র কিছু নয়। আর কাল রাত দশটায় আমার সাথে বার্কলে হোটেলে দেখা কর। আর্থার আর মরিসকে আসার জন্যেও টেলিগ্রাম করে দেবো আজই। মরিসকে দরকার আছে আমার। এ ধরনের ভয়ঙ্কর কাজে ওর মত শক্তিমান, দুর্ধর্ষ, সাহসী পুরুষের দরকার আছে আমাদের। ওরা এসে পৌঁছুলে সবাই মিলে ঠিক করব আমাদের পরবর্তী কাজ কি, বলেই ঘুরে দাঁড়ালেন প্রফেসর। তারপর লম্বা লম্বা পা ফেলে এগিয়ে গিয়ে একটা বাঁক ঘুরে অদৃশ্য হয়ে গেলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *