২.০৫ দুচোখের পাতা এক করতে পারিনি

মিনা হারকারের ডায়েরী থেকে

২৪ সেপ্টেম্বর।

দুচোখের পাতা এক করতে পারিনি গত দুটো রাত। বার বারই ঘুরেফিরে মনে হয়েছে লুসি আর কাউন্ট ড্রাকুলার কথা। আমার স্বামীকে শেষ করতে বসেছিল কাউন্ট ড্রাকুলা, কেবল দুর্জয় সাহস আর কপাল গুণে বেঁচে গেছে জোনাথন। কিন্তু তার পৈশাচিকতা থেকে বাঁচতে পারেনি লুসি, আমার প্রিয় বান্ধবী। কাউন্ট ড্রাকুলা, লুসির এ সর্বনাশের জন্যে কিছুতেই ক্ষমা করব না আমি তোমাকে। যে কোন উপায়ে যে কোন মূল্যে তোমার ধ্বংস আমি দেখবই। না হলে আরও কত মূল্যবান প্রাণকে পিশাচে পরিণত করবে তুমি কে জানে? ওই শয়তানটাকে ধ্বংস করতে হলে প্রফেসর ভ্যান হেলসিং-এর সাহায্য আমার একান্ত প্রয়োজন। জোনাথনের ডায়েরীতে বর্ণিত কাহিনী প্রফেসরকে জানাব ভাবছি, তাহলে তাঁর কাজে হয়ত অনেক সুবিধে হবে। হ্যাঁ, তাই জানাব। তবে তার আগে। ডায়েরীতে বর্ণিত কাহিনীর প্রতিটা লাইন টাইপ করে ফেলতে হবে আমাকে।

২৫ সেপ্টেম্বর সকালে মিনা হারকারের কাছ থেকে একটা ছোট্ট টেলিগ্রাম পেলেন প্রফেসর ভ্যান হেলসিং :

সম্ভব হলে আজ সকাল সোয়া দশটার ট্রেনেই চলে আসুন-উইনহেল মিনা হারকার।

.

মিনা আরকারের ডায়েরী থেকে

২৫ সেপ্টেম্বর।

প্রফেসরের এখানে এসে পৌঁছানোর সময় যতই এগিয়ে আসছে ততই উত্তেজনা বোধ করছি মনে মনে। কেন যেন কেবলই মনে হচ্ছে জোনাথনের সেই ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার ওপর নতুন কোন আলোকপাত করতে পারেন তিনি। তাছাড়া লুসির অন্তিম মুহূর্তেও একেবারে সামনে উপস্থিত ছিলেন তিনি, তাঁর মুখ থেকে সব কথা শুনতে পাব, সেটাও কম উত্তেজনার ব্যাপার নয়। আজ মনে হচ্ছে লুসির নিশিতে পাওয়া, ঘুমের ঘোরে হাঁটার মধ্যে সত্যিই অলৌকিক কিছু একটা ছিল। হুইটবির সেই ঘটনাগুলো পরিষ্কার ভেসে উঠল মনের পর্দায়। তন্ময় হয়ে সেসব কথা ভাবছি, এমন সময় দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হল। চমকে উঠে হাতঘড়ির দিকে চাইতে চাইতে দরজা খুলতে এগিয়ে গেলাম। আড়াইটা বাজে ঘড়িতে।

দরজা খুলতেই দেখলাম দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছেন একজন ভদ্রলোক। মাঝামাঝি উচ্চতার, চমৎকার স্বাস্থ্য, পৌরুষদীপ্ত বলিষ্ঠ শরীর, পরিষ্কার করে কামান চিবুক, আর গভীর নীল দুটো চোখ ভদ্রলোকের। দেখলেই বোঝা যায় যথেষ্ট বয়েস হয়েছে ভদ্রলোকের, অথচ এখনও মুখের কোথাও উঁাজ পড়েনি। একটা। প্রফেসর ভ্যান হেলসিংকে চোখে দেখিনি কখনও, কিন্তু এখন এই ভদ্রলোককে দেখেই বুঝলাম ইনিই সেই বিখ্যাত প্রফেসর। দেখলেই ওঁর প্রতি শ্রদ্ধায় মাথা নুয়ে আসবে যে কোন লোকের।

অভিবাদন জানিয়ে বললাম, আসুন, প্রফেসর।

মাথা থেকে হ্যাটটা খুলে প্রত্যাভিবাদন জানালেন প্রফেসর, তারপর ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বললেন, তুমিই বোধহয় মিনা, লুসির বান্ধবী?

হ্যাঁ, প্রফেসর।

তোমাকে তুমি করে বলছি বলে কিছু মনে করনি তো?

কি যে বলেন, প্রফেসর। আপনি করে বললেই বরং লজ্জায় পড়ে যেতাম আমি। বসুন, একটা সোফা দেখিয়ে বসতে বললাম প্রফেসরকে।

একটা সোফায় বসে পড়ে মৃদু হেসে বললেন প্রফেসর, আমাকে তুমি নিরাশ করনি, মিনা। সারাটা পথ ভাবতে ভাবতে এসেছিলাম। লুসির বান্ধবী লুসির মতই হবে। আসলেও তুমি তাই। লুসির মতই নম্র ব্যবহার, আর লুসির মতই রূপ তোমার। প্রফেসরের কথায় লজ্জা পেলাম। বললাম, আসলে আপনি বাড়িয়ে বলছেন, প্রফেসর।

এক বিন্দুও না, বলেই আসল কথায় এলেন প্রফেসর। হ্যাঁ, এবার কাজের কথায় আসা যাক। কি কারণে আমাকে এখানে ডেকেছ তুমি?

সবই বলব, বলে উঠে গিয়ে দেরাজ থেকে জোনাথনের ডায়েরীতে বর্ণিত কাহিনীর একটা টাইপ করা কপি বের করে এনে প্রফেসরের হাতে দিতে দিতে বললাম, তবে তার আগে এটায় একবার চোখ বুলিয়ে নিন।

কি ওটা? আমার হাত থেকে কাগজন্তুগুলো নিতে নিতে জিজ্ঞেস করলেন প্রফেসর।

আমার স্বামীর লেখা ডায়েরীর একটা কপি।

কাগজন্তুগুলো হাতে নিয়েই পড়তে শুরু করলেন প্রফেসর। এই সুযোগে খাবার ব্যবস্থা দেখতে নিচে নেমে এলাম আমি। সব কিছু গোছগাছ করে ওপরে এসে দেখলাম, ঘরের ভেতর পায়চারি করছেন প্রফেসর, সারা মুখ থমথমে গম্ভীর। আমাকে দেখেই মৃদু হাসলেন প্রফেসর, যেন মেঘ কেটে গিয়ে সূর্য উঁকি দিল। বললেন, অসংখ্য ধন্যবাদ তোমাকে, মিনা। বুদ্ধি করে আমাকে ডেকে এনে ঠিকই করেছ তুমি। তোমার স্বামীর লেখা ওই কাহিনী সবটা পড়িনি এখনো, তবে যেটুকু পড়েছি তাতেই অনেক কিছু পরিষ্কার হয়ে গেছে আমার কাছে। কিন্তু কথা কি জান, আমাদের মাথার ওপর ঘনিয়ে আসছে গাঢ় মেঘ, প্রচণ্ড তুফান উঠতে যাচ্ছে, এ সময়ে অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে আমাদের। এ সময়ে তোমার মত বুদ্ধিমতী মেয়ে আর জোনাথনের মত দুঃসাহসী ছেলে আমার একান্তই দরকার। আশা করি আমাকে সাহায্য করবে তোমরা।

সাহায্য করতে এবং আপনার সাহায্য নিতেই তো আপনাকে ডেকে এনেছি এখানে। কিন্তু এখন পর্যন্ত হয়ত অনেক কিছুই আপনি জানেন না, প্রফেসর।

কি কথা, মিনা?

সে কথা বললেও বিশ্বাস করা কঠিন। সেদিন মিস্টার হকিন্সকে সমাধিস্থ করার পর বাড়ি ফিরতে ভাল লাগছিল না বলে পিকাডিলির ফুটপাত ধরে হাঁটছিলাম আমি আর জোনাথন। সে সময়েই ঘটে ঘটনাটা।

কি সে ঘটনা?

লুসিকে কাউন্ট ড্রাকুলার পাশে বসে থাকতে দেখেছি আমি, একটা বিশাল ঘোড়া গাড়ির ভেতর।

কি বললে?

হ্যাঁ, তাই, বলেই হঠাৎ খেয়াল হল আমার; এখনো খাওয়া দাওয়া হয়নি প্রফেসরের। তাড়াতাড়ি বললাম, সে কথা পরে বলা যাবে, সব বলার জন্যেই তো ডেকে এনেছি আপনাকে। তার আগে চলুন তো, হাত মুখ ধুয়ে খেয়ে নেবেন। খেতে খেতেই না হয় বলা যাবে সব।

প্রফেসরকে সাথে নিয়ে নিচের ডাইনিং রূমে নেমে এলাম। খেতে খেতেই সেদিনের সমস্ত ঘটনা খুঁটিয়ে বললাম ওকে। একটাও প্রশ্ন না করে আমার সব কথা শুনলেন তিনি। তারপর বললেন, পৃথিবীতে প্রতিদিন কত বিচিত্র ঘটনা যে ঘটছে আমরা তার কটার হিসেব রাখি, মিনা। তোমার দেখা ঘটনাটাও তেমনি অনেক ঘটনার একটা। যথেষ্ট বয়স হয়েছে আমার, দেখেছিও কম না। যথেষ্ট অভিজ্ঞতা হয়েছে বলেই বলছি, তোমার কথা শুনে হাসা তো দূরের কথা, বরং আমার ভাবনা আরও বেড়ে গেছে। ভেবেছিলাম আরও কদিন অপেক্ষা করতে হবে, কিন্তু এত তাড়াতাড়িই যে কাজ শুরু করে দেবে পিশাচটা ভাবিনি। তা তোমার স্বামী কেমন আছে এখন? দেখছি না যে ওকে?

কোর্টে গেছে। ফিরতে আরও দেরি হবে। সেদিন কাউন্ট ড্রাকুলাকে দেখার পর থেকে কেমন যেন হয়ে গেছে ও। মনে হচ্ছে আবার নার্ভাস ব্রেক ডাউন ঘটতে যাচ্ছে ওর।

ঘটবে না। কিছু ভেব না তুমি। এসে যখন একবার পড়েছি, নার্ভাস ব্রেকডাউন আর হতে দেব না ওর। আমার ওপর বিশ্বাস রাখতে পারবে না, মিনা?

না পারলে কখনোই আপনাকে ডেকে আনতাম না এখানে।

ভেরি গুড! তা এখন আমার একটু কাজ আছে। উঠি।

রাতের বেলা ফিরবেন তো?

না। যদিও এগজিটারেই থাকছি আজ রাতে, তোমার এখানে ফিরতে পারব। কাজ শেষ করতে করতে হয়ত অনেক রাত হয়ে যেতে পারে। হোটেলেই কোনমতে কাটিয়ে দেবোখন। বলে উঠে দাঁড়ালেন প্রফেসর। তারপর কি মনে হতেই বললেন, হ্যাঁ, ভাল কথা, টাইপ করা কাগজন্তুগুলো নিয়ে যেতে পারি আমি? সবটা তো পড়তে পারিনি তখন, সময়মত পড়ে দেখব।

নিশ্চয়ই আসলে আপনার জন্যেই টাইপ করে রেখেছিলাম ওগুলো।

আমার কথায় দারুণ খুশি হলেন প্রফেসর। বললেন, সত্যিই, তোমার মত বুদ্ধিমতী মেয়েদের নিয়ে কাক্ত করে আরাম আছে। ঠিক আছে, এখন চলি। কাল যদূর সম্ভব সকাল সকাল এখানে এসে পড়ব আমি, ঘুরে দাঁড়িয়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন তিনি। দরজার কাছে গিয়ে ফিরে দাঁড়িয়ে বললেন, আবার বলছি তোমাকে, জোনাথনের জন্যে একটুও চিন্তা করো না। সব ঠিক হয়ে যাবে, বলেই ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন প্রফেসর।

আশায় আনন্দে দুলে উঠল বুকটা। পরিষ্কার বুঝতে পারছি, ওই লোকের ওপর যে কোন গুরুদায়িত্ব চাপিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্তে বসে থাকা যায়।

আস্তে করে এগিয়ে গেলাম জানালাটার কাছে। শিকের গায়ে কপাল ঠেকিয়ে চেয়ে থাকলাম বাগানের দিকে। আমার নিজ হাতে লাগান সাদা গোলাপ গাছটায় একটা ইয়া বড় ফুল ফুটেছে। কোত্থেকে তার ওপর উড়ে এসে বসেছে একটা কাল ভ্রমর। ওটা দেখেই লুসির পাশে কাউন্ট ড্রাকুলার কথা মনে হল আমার। লুসি যেন ওই সাদা গোলাপ, আর ড্রাকুলা কাল ভ্রমর। দাউ দাউ করে প্রতিশোধের আগুন জ্বলে উঠল আমার মনে। অস্কুট বললাম, কাউন্ট ড্রাকুলা, তৈরি থেকো। আবারো বলছি, লুসির মৃত্যুর প্রতিশোধ আমি নেবোই। কিন্তু তখনো কি জানতাম কাজটা কতটা কঠিন আর বিপজ্জনক?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *