২.০২ রাতের খাওয়ার পর

ডাক্তার জন সেওয়ার্ডের ডায়েরী থেকে

১৭ সেপ্টেম্বর।

রাতের খাওয়ার পর পড়ার ঘরে বসে কয়েকদিনের জমান চিঠিপত্রগুলো দেখছিলাম। গত কয়েকদিনের কাজের চাপে ওগুলোর কথা প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম। এক মনে চিঠি পড়ছি, হঠাৎ ঝটকা মেরে দরজা খুলে ঝড়ের বেগে ঘরে এসে ঢুকল রেনফিল্ড। তরকারি কাটার ধারাল একটা ছুরি ওর হাতে। চোখের দৃষ্টি উদভ্রান্ত। ভয়ঙ্কর কোন উদ্দেশ্য নিয়েই এ ঘরে এসে ঢুকল সে। এক মুহূর্ত থমকে দাঁড়াল রেনফিল্ড, তারপর ছুরি বাগিয়ে ধরে সোজা ছুটে এল আমার দিকে। লাফ দিয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াতে গেলাম। কিন্তু তার আগেই এসে পড়ল রেনফিল্ড। প্রচণ্ড জোরে ছুরিটা ঢুকিয়ে দিতে গেল সে আমার পেটে। হাত দিয়ে ঠেকাবার চেষ্টা করলাম। পেটটা বেঁচে গেল ঠিকই, কিন্তু এফোঁড় ওফোড় হয়ে ঢুকে গেল ওটা আমার কনুইয়ের কাছে মাংসে। টান মেরে ওখান থেকে ছুরি বের করে নিল রেনফিল্ড। সাথে সাথেই ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরিয়ে এল ক্ষতস্থান থেকে। আবার ছুরি মারার চেষ্টা করল রেনফিল্ড, কিন্তু আর সুযোগ দিলাম না ওকে। গায়ের জোর দিয়ে একটা ঘুসি মারলাম ওর চোয়ালে। ঘুসি খেয়ে ছিটকে মেঝেতে পড়ে গেল রেনফিল্ড, উঠে বসল পরমুহূর্তে। মেঝেতে পড়ে যাওয়া ছুরিটা দুলতে গিয়েই আমার হাত থেকে গড়িয়ে পড়া রক্তের দিকে চোখ পড়ল ওর। সাথে সাথেই পৈশাচিক উল্লাসে, চিক চিক করে উঠল ওর দুই চোখ! হামাগুড়ি দিয়ে মেঝেতে পড়ে থাকা রক্তটুকুর দিকে এগিয়ে এল সে, তারপর উবু হয়ে বসে জিভ বের করে চাটতে লাগল সেই রক্ত। ব্যাপার দেখে রি রি করে উঠল আমার সারা শরীর।

ততক্ষণে এক এক করে দারোয়ানগুলোও এসে পড়েছে। রেনফিল্ডকে চিৎ করে মেঝেতে ফেলে ওর হাত পা বেঁধে ফেলল। নিয়ে যাবার সময় বিড় বিড় করতে করতে গেল সে, কি শান্তি, কি শান্তি। আসলে রক্তই জীবন, রক্তেই প্রাণ।

আর দেরি না করে ক্ষতস্থানটা ব্যান্ডেজ করে নিলাম। ক্লান্তিতে ভেঙে আসছে সারা শরীর। ঘুমোতে যেতে হবে এখন।

১৮ সেপ্টেম্বর।

আজ সকালে প্রফেসর ভ্যান হেলসিং-এর পাঠান তারবার্তা পেলাম। তারবার্তার কথাগুলো অবশ্যই ক্রিসেন্টে থাকবে আজ রাতে। লক্ষ্য রাখবে রসুনের কোয়াগুলো যেন ঠিক জায়গায় থাকে। যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি পৌঁছানর চেষ্টা করছি আমি।

লুসিদের বাড়ি পৌঁছে গাড়ির ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে সদর দরজার কড়া নাড়লাম। কেউ সাড়া দিল না। বার কয়েক কড়া নেড়েও কেউ সাড়া না দেয়ায় অগত্যা ঘণ্টা বাজালাম। কিন্তু তবু কারও সাড়া নেই। এত বেলায় চাকরগুলো পড়ে পড়ে ঘুমোচ্ছ নাকি? আরও কিছুক্ষণ ডাকাডাকি করেও কারও সাড়া পেলাম না। একটু শঙ্কিত হলাম মনে মনে। কিছু ঘটেনি তো? অন্য কোন পথে বাড়িতে ঢোকা যায় কিনা খুঁজে দেখলাম, কিন্তু পেলাম না। বন্ধ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবছি কি করা যায়, এমন সময় একটা গাড়ি এসে থামল সেখানে। লাফ দিয়ে গাড়ির ভেতর থেকে নামলেন প্রফেসর ভ্যান হেলসিং।

নেমেই আমাকে প্রশ্ন করলেন প্রফেসর, জন, এখন এলে নাকি? কেবল পাওনি ঠিকমত?

পেয়েছি। আজ সকালে। পেয়েই ছুটে এসেছি এখানে। আসার পর কি ঘটেছে বললাম ওকে। একবারও বাধা না দিয়ে আমার কথা শুনলেন প্রফেসর। তারপর মাথা থেকে হ্যাটটা খুলে দোলাতে দোলাতে বললেন, যেভাবেই হোক বাড়ির ভেতর ঢুকতেই হবে আমাদের। এসো তো দেখি।

একচক্কর বাড়িটা ঘুরে রান্নাঘরের জানালার সামনে এসে দাঁড়ালাম। ব্যাগ থেকে ছোট্ট একটা লোহা কাটা করাত বের করে আমার হাতে দিয়ে বললেন প্রফেসর, জানালার শিক কটা কেটে ফেলো তো।

প্রফেসরের হাত থেকে করাতটা নিয়ে কাজ শুরু করে দিলাম। জানালার পাল্লাগুলো ভেতর দিকে, কাজেই বাইরে থেকে শিক কাটতে কোন অসুবিধে হল না। অল্পক্ষণেই গোটা তিনেক শিক কেটে ফেললাম। শিক কাটা হলে একটা পাতলা ছুরির সাহায্যে দরজার খিল খুলে ফেললেন প্রফেসর। জানালা গলে ঘরের ভেতর ঢুকলাম আমরা। ঘরের মেঝেতে পড়ে নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছে একটা চাকর। বেশ কয়েকবার জোরে ধাক্কা দেবার পর আস্তে করে চোখ মেলল সে, যেন খুলতে পারছে না চোখের পাতা। আমাদেরকে দেখেই বার কয়েক চোখ মিট মিট করে উঠে বসল সে। এত বেলায়ও এমনভাবে ঘুমোচ্ছে কেন জিজ্ঞেস করেও কোন সন্তোষজনক উত্তর পেলাম না ওর কাছ থেকে। শুধু বলল, কি জানি, কখনোই তো এত বেলা পর্যন্ত ঘুমাই না। আজ যে কি হলো। ওকে আর কিছু না বলে খাবার ঘরের দিকে পা বাড়ালাম।

খাবার ঘরে ঢুকেই থমকে দাঁড়ালাম। আফিমের আরকের গন্ধে ভুর ভুর করছে সারাটা ঘর, আর জ্ঞান হারিয়ে মেঝেতে পড়ে আছে পরিচারক দুজন। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে প্রফেসরের মুখের দিকে চাইতেই দেখলাম থমথম করছে তার মুখ। গম্ভীর ভাবে বললেন তিনি, জলদি ওপরে চল। বলেই ছুটতে শুরু করলেন। তার পিছু পিছু এসে ঢুকলাম দোতলায় লুসির ঘরে।

চিৎ হয়ে মড়ার মত বিছানায় পড়ে আছে লুসি। পাশের খাটে আপাদমস্তক সাদা চাদরে মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে কে যেন, বোধহয় লুসির মা। একপাশে বিছানার ওপর ছিঁড়ে পড়ে আছে লুসির গলার রসুনের মালাটা। শয্যার পাশে কয়েক সেকেণ্ড পাথরের মূর্তির মত অনড় দাঁড়িয়ে থাকলেন প্রফেসর। তারপর আর একটু এগিয়ে গিয়ে শয্যায় শায়িত চাদরে মোড়া দেহের ওপর থেকে টান মেরে চাদরটা সরিয়ে ফেললেন। যা ভেবেছিলাম। চাদরের তলায় শুয়ে আছেন লুসির মা-ই। একনজর দেখলেই বোঝা যায়-মৃত। তবু সন্দেহ নিরসনের জন্যে একবার লুসির মার নাড়ী পরীক্ষা করে নিয়ে লুসির দিকে মন দিলেন প্রফেসর। ভুরু কুঁচকে কিছুক্ষণ লুসির হাতের নাড়ীটা টিপে ধরে রেখে হঠাৎ আমার দিকে চেয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন তিনি, নিচ থেকে একটা ব্র্যাণ্ডির বোতল নিয়ে এসো, জলদি!

বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে ছুটলাম। ব্র্যাণ্ডির বোতল এনে প্রফেসরের হাতে দিতেই বললেন, এক কাজ করো তো। ঠাণ্ডা পানির ছিটে দিয়ে জ্ঞান ফেরাবার ব্যবস্থা করাগে চাকর দুটোর। আর তাড়াতাড়ি একটু পানি গরম করে নিয়ে আসতে বলো রান্নাঘরের চাকরটাকে।

প্রায় ঘণ্টাখানেক চেষ্টা করে রীতিমত গলদঘর্ম হয়ে জ্ঞান ফেরালাম চাকর দুটোর। গরম পানি নিয়ে আগেই লুসির ঘরে চলে গেছে তৃতীয় চাকরটা। সদ্য জ্ঞান ফিরে পাওয়া চাকর দুটোকে আমার পেছন পেছন আসতে বলে ওপরে চলে এলাম। ঘরে ঢুকে দেখলাম গরম পানিতে কাপড় ভিজিয়ে সারা গায়ে ঘষে ঘষে লুসির শরীরের উত্তাপ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছেন প্রফেসর।

তখনও জ্ঞান ফিরে আসেনি লুসির, হঠাৎ সদর দরজায় ঘণ্টা বাজার শব্দ শুনলাম। খানিকক্ষণ পরই চাকর এসে জানাল, আর্থার হোমউডের কাছ থেকে খবর নিয়ে এসেছে একজন লোক। লোকটাকে নিচের হলঘরে বসাবার জন্যে নির্দেশ দিলাম চাকরকে। বেরিয়ে যাচ্ছিল চাকরটা, ওকে ডেকে বললেন প্রফেসর, পাশের ঘরের বিছানাটা ঠিক করতে বলো তো কাউকে। আর লুসিকে পরাবার জন্যে শুকনো কাপড় নিয়ে এস।

চাকরটা পোশাক এনে দিতেই চাদরের তলায় রেখে কোনমতে লুসির পোশাক পালটে দিলেন প্রফেসর। তারপর দুজনে মিলে ধরাধরি করে পাশের ঘরে নিয়ে এলাম তাকে। চাকরটাকে লুসির কাছে থাকতে আদেশ দিয়ে আমাকে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলেন প্রফেসর। নিচে নামতে নামতে বললেন, কি যে করব এখন বুঝতে পারছি না। চল, দুজনে মিলে ভেবেচিন্তে যাহোক একটা কিছু উপায় বের করা যায় কিনা দেখি।

বলতে বলতেই খাবার ঘর থেকে ড্রইংরুমে এসে ঢুকলাম। ঘরের সবকটা জানালা বন্ধ। আবছা আলোয় ঘরের কিছুই ঠিকমত দৃষ্টিগোচর হচ্ছে না। চিন্তিত ভাবে বললেন প্রফেসর, আমাদের দুজনের শরীর থেকেই রক্ত দেয়া হয়ে গেছে। অথচ এই মুহূর্তে রক্ত না পেলে লুসিকে বাঁচান যাবে না। এখন রক্ত কোথায় পাই…

প্রফেসরের কথা শেষ হবার আগেই ঘরের কোণের সোফা থেকে ভেসে এল একটা ভারি কণ্ঠস্বর, অত ভাবনা কিসের, প্রফেসর, আমি তো এসে গেছিই। একটু আগে হোমউডের খবর নিয়ে এসেছিল লোকটা, অথচ ওর কথা বেমালুম ভুলে বসে আছি আমরা। ওর কণ্ঠস্বর শুনে আশায় আনন্দে দুলে উঠল বুকটা। কারণ, ওই কণ্ঠস্বরের মালিককে ভাল মতই চিনি আমি। আমার প্রিয় বন্ধুকুইনসে মরিস।

ছুটে গিয়ে সোফা থেকে উঠে দাঁড়ান মরিসের হাতটা চেপে ধরে বললাম, খবর কি, মরিস? আর্থারের বাবা কেমন আছেন?

ভাল না। অবস্থা খুবই খারাপ। তা লুসি কেমন আছে, জন? গত তিন দিন নাকি ওর কোন খবরই জানে না আর্থার।

কথার উত্তর দিলেন প্রফেসর, লুসির অবস্থাও খুবই খারাপ, মরিস। তুমি সময় মত এসে না পড়লে বোধহয় বাঁচানই যেত না ওকে।

চিরদিনই সাধ্যমত বিপন্নকে সাহায্য করে এসেছি, প্রফেসর। আজও না হয় আর একজনকে করলাম। তা এখন কি করতে হবে আমাকে?

এস আমার সাথে, বলে দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন প্রফেসর, তার পিছু পিছু মরিস। দরজার কাছে গিয়ে ঘুরে দাঁড়ালেন প্রফেসর। আমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ভাল কথা, জন, লুসির সাংঘাতিক অসুস্থতা আর ওর মায়ের মৃত্যুর সংবাদ জানিয়ে একটা তার করে দাও আর্থারকে। একটা গাড়ি নিয়ে যেয়ে পোস্টাফিসে, তাহলে তাড়াতাড়ি যেতে পারবে, বলেই মরিসকে নিয়ে বেরিয়ে গেলেন তিনি। সময় নষ্ট না করে পোস্ট অফিসের দিকে চললাম আমি।

১৯ সেপ্টেম্বর।

অত্যন্ত ছটফট করে কাটিয়েছে লুসি গত রাতটা। কিছুক্ষণ পর পরই বোধহয় সাংঘাতিক কোন দুঃস্বপ্ন দেখে চমকে জেগে উঠেছে। সারাটা রাত পালা করে লুসিকে পাহারা দিয়েছি আমি আর প্রফেসর। ঘুরে ঘুরে বাড়ি পাহারা দিয়েছে কুইনসে মরিস। একটা জিনিস ভাল করে খেয়াল করেছি আমরা, জেগে থাকার চাইতে ঘুমিয়ে থাকলেই যেন অনেকটা স্বাভাবিক মনে হয় লুসিকে। আর ঘুমের মধ্যে কোন কারণে লুসির ঠোঁট দুটো ফাঁক হলেই ঠোঁটের দুপাশের ঝকঝকে সাদা তীক্ষ্ণ ধার দুটো দাঁত স্পষ্ট নজরে পড়েছে, অথচ হলপ করে বলতে পারি ওই দাঁত দুটো এর আগে কখনও দেখিনি।

সারারাত ছটফট করে বোধহয় অত্যন্ত ক্লান্ত হয়েই ভোরের দিকে গভীর ভাবে ঘুমিয়ে পড়ল লুসি। তার সেই ঘুম ভাঙল একেবারে বিকেল বেলা। ঘুম ভাঙলে প্রথমেই আর্থারের কথা জিজ্ঞেস করল সে। সকালবেলাই আর্থারকে আনতে মরিসকে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন প্রফেসর, সে কথাই এখন জানালেন লুসিকে।

বিকেলের অস্তগামী সূর্যের সোনালী আলো জানালার কাঁচের শার্সি ভেদ করে ঘরে এসে পড়েছে। সে আলো লুসির স্নান চিবুকে এসে পড়ায় আরো রোগাটে দেখাচ্ছে তাকে। অল্প পরেই গির্জা থেকে ভেসে এল ছটা বাজার সময় সঙ্কেত, আর ঠিক এই সময় ঘরে এসে ঢুকল আর্থার। আমাদের কারও দিকে একটি বারের জন্যেও না তাকিয়ে আশ্চর্য শান্ত পায়ে লুসির বিছানার কাছে এগিয়ে গেল সে। ওকে লুসির কাছে একটু একলা থাকতে দিয়ে ঘর থেকে সবাই বেরিয়ে এলাম আমরা।

.

মিনা আরকারের ডায়েরী থেকে

১৭ সেপ্টেম্বর।

গতকাল হঠাৎ করেই রহস্যজনক ভাবে মারা গেলেন মিস্টার হকিন্স। মোটামুটি সেরে উঠলেও এখনও অত্যন্ত দুর্বল জোনাথন। মাত্র দিন কয়েক আগে ওকে নিয়ে মিস্টার হকিমের বাড়ি এসে উঠেছি। অসংখ্য এলম গাছ দিয়ে ঘেরা তার গির্জা সংলগ্ন বাড়িটা সত্যিই চমৎকার। আমরা এসে তাঁর বাড়িতে ওঠায় দারুণ খুশি হয়েছিলেন নিঃসন্তান আর একেবারে নিরাত্মীয় মিস্টার হকিন্স। জোনাথন কাউন্ট ড্রাকুলার প্রাসাদ দুর্গ থেকে ফিরে আসার পর পরই তাকে নিজের ব্যবসার অংশীদার করে নিয়েছিলেন মিস্টার হকিন্স, অবশ্য জোনাথন অসুস্থ থাকায় ওর হয়ে সবটা ব্যবসা একাই দেখাশোনা করেছিলেন তিনি। এহেন পিতৃস্থানীয় লোকের মৃত্যুতে সত্যিই ব্যথা পেয়েছে জোনাথন। আর সত্যি বলতে কি, ওই স্নেহময় লোকটার কথা মনে হলেই চোখ ফেটে পানি বেরিয়ে আসছে আমারও।

কি করে যে মারা গেলেন মিস্টার হকিন্স তা বুঝতে পারছি না। গত রাতেও খাওয়ার সময় তাঁকে দিব্যি সুস্থ মনে হয়েছে, অথচ আজ সকালবেলা নিজের ঘরের বিছানায় মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে তাকে।

আর কেন জানি আজ বার বার সুসির কথা মনে পড়ছে। অনেকদিন তার খোঁজখবর নেয়া হয়নি। ডায়েরীটা লেখা শেষ করেই তার কাছে চিঠি লিখতে হবে একটা।

.

ডাক্তার জন সেওয়ার্ডের ডায়েরী থেকে

২০ সেপ্টেম্বর।

চাকরটার ডাকাডাকিতে ঘুম ভেঙে গেল। উঠে বসে হাতঘড়িতে দেখলাম ভোর ছটা বাজে। আমি উঠে বসতেই চাকরটা জানাল আমাকে ডাকছেন প্রফেসর। ব্যাপার কি দেখার জন্যে তাড়াতাড়ি সুসির ঘরে এসে ঢুকলাম। ঘরের সব কটা জানালা বন্ধ। পর্দাগুলো পর্যন্ত টাঙান থাকায় ভোরের আলো ঢুকতে পারছে না সে ঘরে। রসুনের অসহ্য তীব্র গন্ধে ভারি হয়ে আছে ঘরের আবহাওয়া।

আমি ঘরে ঢুকতেই জানালাগুলো খুলে দিতে বললেন আমাকে প্রফেসর। এগিয়ে গিয়ে জানালাগুলো খুলে দিতেই ঘরে এসে পড়ল ভোরের সোনালী রোদ। খোলা জানালা দিয়ে আসা নির্মল হাওয়ার ঝাঁপটা কয়েক মুহূর্তেই ঘর থেকে ঝেটিয়ে বের করে নিয়ে গেল রসুনের অসহ্য গন্ধ।

এতক্ষণ ঘর অন্ধকার থাকায় প্রফেসরকে ভালমত দেখতে পাইনি, এখন ওঁর দিকে তাকাতেই দেখলাম, লুসির বিছানার পাশে পাথরের মূর্তির মত নিশ্চল দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। ওঁর চেহারা দেখেই অনুমান করা যায় খবর ভাল না। সুসির দিকে চেয়ে বুঝলাম ঠিকই অনুমান করেছি। আরো ফ্যাকাসে হয়ে গেছে ওর গায়ের রঙ। চোয়াল বসে গিয়ে ঠেলে বেরিয়ে এসেছে চিবুকের হাড়। শ্বাস নিতে অত্যন্ত কষ্ট হচ্ছে ওর। আর একটা আশ্চর্য ব্যাপার, গতকাল কথা বলার সময়ই শুধু তীক্ষ্ণ দাত দুটো দেখা গিয়েছিল। কিন্তু আজ বদ্ধ ঠোঁটের দুকোণ থেকে ঠেলে বাইরে বেরিয়ে এসেছে দাঁত দুটো। গলার দগদগে ক্ষতচিহ্ন দুটোও যেন রাতারাতি মিলিয়ে গেছে। দেখে আদৌ বোঝা যাবে না মাত্র গতকালও ক্ষত ছিল ওর গলার ওই জায়গায়।

স্তব্ধ বিস্ময়ে তাকিয়ে ছিলাম লুসির দিকে, চমক ভাঙল প্রফেসরের কথায়। আমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন তিনি, লুসির সময় ঘনিয়ে এসেছে, জন। আর্থারকে জলদি ডেকে নিয়ে এস।

মাথা ঝাঁকিয়ে সায় দিয়ে নিঃশব্দে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এলাম। আর্থারের কাঁধে মদু ঝাকুনি দিয়ে ঘুম ভাঙালাম ওর। শুয়ে শুয়েই বার কয়েক চোখ রগড়াল সে, তারপর চাইল আমার মুখের দিকে। সেখানে কি দেখল কে জানে, তড়াক করে উঠে বসল বিছানার ওপর। বসে থেকেই আমার হাত দুটো চেপে ধরে থর থর করে কেঁপে উঠল একবার। আমার মুখ দেখেই যা বোঝার বুঝে নিয়েছে সে।

আস্তে করে ওর হাত দুটো ছাড়িয়ে নিয়ে সান্ত্বনা দেবার সুরে বললাম, নিয়তির ওপর তো মানুষের কোন হাত নেই, আধার। তুই, আমি, আমরা পুরুষ মানুষ। যত দুঃখই আসুক না কেন ভেঙে পড়লে চলবে না আমাদের। আয়, ওঠ, দেরি করলে হয়ত সুসির সাথে শেষ দেখাটাও করতে পারবি না।

প্রায় জোর করে ওকে বিছানা থেকে তুলে নিয়ে চললাম। লুসির সামনে গিয়ে স্থির থাকতে পারবে না ভেবেই বোধহয় যেতে চাইছে না ও। লুসির ঘরে ঢুকে দেখলাম, নিজেকে অনেকটা সামলে নিয়েছেন প্রফেসর। যদূর সম্ভব ঘরটাকেও গোছগাছ করে ফেলেছেন। শুধু তাই নয়, লুসির অগোছালো চুলগুলোকে পর্যন্ত হাত দিয়ে একটু ঠিকঠাক করে দিয়েছেন। আর্থারকে দেখেই স্নান কণ্ঠে বলে উঠল লুসি, এস আর্থার। এ সময়ে তোমাকেই কামনা করছিলাম মনে মনে। তুমিও বোধহয় বুঝতে পারছ, সময় শেষ হয়ে এসেছে আমার।

ধীরে ধীরে বিছানার পাশে এগিয়ে গিয়ে ধপ করে বসে পড়ল আর্থার। দুহাতে তুলে নিল লুসির রোগজীর্ণ দুটো হাত। রক্তশূন্য ফ্যাকাসে কপালের নিচে বসে যাওয়া কোটর থেকে স্থির দৃষ্টিতে আর্থারের দিকে চেয়ে আছে লুসির গভীর প্রেমপূর্ণ কিন্তু বেদনার্ত বড় বড় চোখ। কয়েক সেকেণ্ড একভাবে তাকিয়ে থেকে একটুক্ষণের জন্যে চোখের পাতা মুদে বার কয়েক জোরে জোরে শ্বাস নিল লুসি। ধীরে ধীরে আশ্চর্য একটা পরিবর্তন আসতে থাকল লুসির চেহারায়। কেমন যেন একটু কঠোর মনে হচ্ছে এখন ওর চেহারা। ঠোঁটের কোণ থেকে আরও বেরিয়ে এসেছে সেই দাঁত দুটো। একটু পরই আবার চোখ মেলল সে। কিন্তু প্রেম আর বেদনার পরিবর্তে সে চোখে এসে ভর করেছে এখন রাজ্যের লালসা। আবার কথা বলল লুসি, এস আর্থার, শুধু একবার, একবার চুমো খাও তোমার লুসিকে। কামনা মদির সে কষ্ঠে আশ্চর্য ব্যাকুলতা। এমন তো হবার কথা নয়। লুসির মত মৃত্যু পথ যাত্রিণীর মুখে কথাটা, আর তার বলার ধরন কেমন যেন বেমানান মনে হল আমার কাছে।

আমার মতই লুসির কথা শুনে চমকে উঠলেন প্রফেসরও। ধীরে ধীরে লুসির মুখের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে আর্থারের মুখ। অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে লুসি। উত্তেজনায় ফাঁক হয়ে গেছে ওর দুটো ঠোঁট, আর সে ঠোঁটের ফাঁক থেকে হিংস্র ভঙ্গিতে সম্পূর্ণ বেরিয়ে এসেছে অমানবিক তীক্ষ্ণ দাঁত দুটো।

আর্থারের মুখের সাথে মুসির মুখ লাগে লাগে এমন সময় বাঘের মত লাফ দিয়ে সামনে এগিয়ে গেলেন প্রফেসর। খপ করে আর্থারের চুলের মুঠি ধরে টেনে ওর মাথাটা সরিয়ে আনলেন পেছনে, যেন লুসিকে চুমো খেতে না পারে।

প্রফেসরের ব্যবহারে স্তম্ভিত হয়ে গেলাম আমি। আর্থারও। ওর বেদনাহত মুখের দিকে তাকিয়ে কোমল স্বরে বললেন প্রফেসর, দুঃখ পেয়ো না, আর্থার। তোমার ভালর জন্যেই করলাম কাজটা। এখনকার লুসি আর তোমার সেই আগের প্রেমিকা নেই। শয়তানের ছোঁয়ায় এখন একটা ডাইনীতে রূপান্তরিত হয়েছে সে। এই মুহূর্তে ওকে চুমো খেলে তোমাকেও হারাতে হবে আমাদের।

প্রফেসরের কথা শুনে একবারের জন্যে দপ করে জ্বলে উঠল লুসির দুই চোখ। যেন চোখের দৃষ্টি দিয়ে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ভস্মীভূত করে দিতে চাইছে সে প্রফেসরকে। তারপরই আস্তে করে দ্বিতীয়বারের জন্যে চোখ মুদলো লুসি। শ্বাস টানার তালে তালে বার কয়েক জোরে জোরে দুলে উঠেই একেবারে থেমে গেল বুকের ওঠানামা। উবু হয়ে লুসিকে একবার পরীক্ষা করেই বিড়বিড় করে রায় দিলেন প্রফেসর, সব শেষ।

সঙ্গে সঙ্গেই ছেলে মানুষের মত-ডুকরে কেঁদে উঠল আর্থার। জোর করে ঠেলে ওকে ঘর থেকে বের করে নিয়ে চলে এলাম পাশের ঘরে একটা সোফায় বসে পড়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল সে। অসহ্য বেদনায় টন টন করে উঠল আমারও বুকের ভেতরটা। আমিও তো ভালবেসেছিলাম লুসিকে।

বেশ কিছুক্ষণ পর লুসির ঘরে ফিরে এসে দেখলাম শয্যার ওপর ঝুঁকে পড়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে লুসিকে পরীক্ষা করছেন প্রফেসর। মৃত্যু যেন লুসির দেহের সমস্ত লাবণ্য আবার অকৃপণ হাতে ফিরিয়ে দিয়েছে।

আমার উপস্থিতি টের পেয়ে ঘুরে দাঁড়ালেন প্রফেসর। এগিয়ে এসে সয়েহে আমার কাধে একটা হাত রেখে বললেন, ব্যথা হয়ত পেয়েছ, জন, কিন্তু যদি জানতে কত বড় দুঃসহ যন্ত্রণা আর বীভৎসতার হাত থেকে ও মুক্তি পেয়েছে আজ তাহলে ও মারা গেছে ভেবে দুঃখ না করে বরং খুশিই হতে।

কিন্তু, স্যার, এভাবে হঠাৎ করে আমাদের মাঝ থেকে সে চলে যাবে ভাবতেই পারিনি।

চলে গেছে? কে বলল চলে গেছে?

প্রফেসরের কথার ধরনে আশ্চর্য হলাম। বুঝতে না পেরে প্রশ্ন করলাম, যায়নি?

না যায়নি। গেছে শুধু তার কোমল রূপটা। আবার সে আমাদের মাঝে ফিরে আসবে, কিন্তু অতি ভয়ঙ্কর সাংঘাতিক হিংস্ররূপে।

কি বলছেন, স্যার, কিছু বুঝতে পারছি না।

পারবে, সময় হলে ঠিকই বুঝতে পারবে সব। কিন্তু তার আগেই আমাদের তৈরি হতে হবে, জন। না হলে আরো বড় সর্বনাশ ঘটে যাবার আশঙ্কা আছে।

২১ সেপ্টেম্বর।

একটু আগে ওঁর বাবার মৃত্যু সংবাদ পেয়ে বাড়ি চলে গেছে আধার। অতএব লুসির কোন আত্মীয়স্বজন না থাকায় স্বাভাবিক ভাবেই ওর আর ওর মার শেষকৃত্যের দায়িত্বটা এসে পড়ল আমার ঘাড়ে। সারাক্ষণ পাশে পাশে থেকে আমাকে সাহায্য করছেন প্রফেসর। ওদের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় কাকে কাকে আমন্ত্রণ জানাব, কোথায় কবর দেব ভেবে ঠিক করতে পারছিলাম না, উদ্ধার করলেন প্রফেসর। তিনি বললেন, এত ভাবাভাবির কি আছে। লুসিদের পারিবারিক চিঠিপত্র দেখলেই ওসব অনুমান করা যাবে। ওদের উকিলকেও খবর দেয়া দরকার। তার আগে চল তো ঘরগুলো একবার খুঁজে দেখি।

ওদিকে, আমস্টারডামে আপনার কোন জরুরী কাজ পড়ে নেই তো?

না, নেই। আর থাকলেই বা কি? এখানকার এই ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিতে শত কাজ থাকলেও আমি ফিরে যেতে পারব না।

লুসির ঘরে খুঁজতে খুঁজতে হঠাৎ অস্ফুট শব্দ করে উঠলেন প্রফেসর। উদ্বিগ্ন ভাবে জিজ্ঞেস করলাম আমি, কি হল, স্যার?

প্রফেসরের মুখে হালকা হাসির ছাপ। আমাকে একটা খাতা দেখিয়ে বললেন তিনি, এটা পেয়ে যাওয়ায় ভালই হল, আমাদের অনেক উপকারে লাগবে।

কি ওটা? অবাক হয়ে জানতে চাইলাম।

লুসির ডায়েরী।

কোথায় পেলেন ওটা?

লুসির বালিশের তলায়। বলে একটুক্ষণ কি যেন ভাবলেন তিনি। তারপর বললেন, একটা কথা, জন, আমরা যদি এভাবে লুসিদের বাড়ি তল্লাশি করতে থাকি কারও কিছু বলার নেই তো?

না, না, কার কি বলার থাকবে? আর আপনি বোধহয় জানেন না, প্রফেসর, বিয়ের কথাবার্তা পাকাঁপাকি হরার পর পরই তার স্থাবর অস্থাবর সমস্ত সম্পত্তি আর্থারের নামে উইল করে দিয়েছিল লুসি। অবশ্য লুসির মৃত্যুর পরই সমস্ত সম্পত্তির অধিকার পাবে আর্থার, দলিলে একথাই লেখা ছিল। এখন আইনতঃ লুসির সমস্ত সম্পত্তির মালিক আর্থার। আমাদেরকে কিছু বলার অধিকার একমাত্র আর্থারেরই আছে। আর প্রাণ গেলেও আমাদের কাজে বাধা দেবে না সে, একথা হলপ করে বলতে পারি আমি।

আমার কথায় আশ্বস্ত হয়ে আবার খোঁজাখুঁজি শুরু করলেন প্রফেসর। খুব একটা কষ্ট করতে হল না। অল্প পরেই মিসেস ওয়েস্টেনরার ঘরের একটা আলমারির ভেতর পেয়ে গেলাম যা খুঁজছিলাম। কাজ সেরে ঘর থেকে বেরোবার সময় বললেন প্রফেসর, উহুঁ, কি ধকলটাই না গেল! এবার একটু বিশ্রাম দরকার আমাদের। কাল ভোরে উঠেই তো আবার খাটুনি শুরু হবে। ফেরার আগে আর একবার লুসিকে দেখতে গেলেন প্রফেসর, তার সাথে সাথে আমিও। চামেলির মিষ্টি গন্ধ ঘরের বাতাসে। তার সাথে এসে যোগ হয়েছে ধূপের সুবাস। অর্থাৎ এক কথায় যদূর সম্ভব শুচিশুদ্ধ করে তোলা হয়েছে লাশ রাখা ঘরটাকে। ধবধবে সাদা চাদরে ঢাকা লুসির সর্বাঙ্গ। এগিয়ে গিয়ে আস্তে করে চাদরের এক প্রান্ত উন্মোচিত করলেন প্রফেসর। স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলাম লুসির মুখের অপূর্ব সৌন্দর্য। যেন মরেনি সি, দীর্ঘদিন একটানা রোগভোগের পর শান্তিতে ঘুমোচ্ছ। ওর মুখের লাবণ্য কঠোর হাতে ছিনিয়ে নেয়নি মৃত্যু। বরং দুহাতে মুঠো ভরে দিয়েছে। এমন আজব কথা দেখা তো দূরের কথা, কখনো কারও মুখে শুনিনি পর্যন্ত।

কিন্তু ওই রূপকথার ঘুমন্ত রাজকন্যার মত চেহারার দিকে তাকিয়ে কিন্তু খুশি হতে পারলেন না প্রফেসর। থমথমে গভীর ওঁর মুখের চেহারা। পাথরের মত রুক্ষ কঠিন। তাহলে আর সব সাধারণ লাশের মত লুসির লাশ পচতে গলতে শুরু করলেই খুশি হতেন তিনি? বেশ কিছুক্ষণ একভাবে লুসির দিকে তাকিয়ে থাকার পর মুখ খুললেন প্রফেসর। আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, এখানে একটু অপেক্ষা কর তুমি, আমি এক্ষুণি আসছি, বলে দ্রুত ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন তিনি।

অল্পক্ষণ পরেই ফিরে এলেন প্রফেসর। হাতে এক মুঠো রসুন। রসুনগুলো লুসির বিছানার চারপাশে ছড়িয়ে দিলেন তিনি। নিজের গলা থেকে ছোট্ট একটা সোনার কুশ খুলে নিয়ে রাখলেন লুসির বুকের ওপর। একটা অদ্ভুত জিনিস পলকের জন্যে চোখে পড়ল তখনই, কিংবা আমার চোখের ভুলও হতে পারে। কুশটা সুসির বুক স্পর্শ করতেই মনে হল চকিতের জন্যে একবার কুঞ্চিত হয়েই সোজা হয়ে গেল লুসির কপালের চামড়া। ব্যাপারটা প্রফেসরের চোখে পড়েছে কিনা তা তার মুখ দেখে আন্দাজ করতে পারলাম না। কাজ শেষ করে ধীরে ধীরে চাদরটা দিয়ে আবার লুসির মুখ ঢেকে দিলেন প্রফেসর। তারপর আমার দিকে ফিরে বললেন, চল, এখনকার মত কাজ শেষ। তবে কাল রাতের বেলা আবার একবার লুসিকে পরীক্ষা করে দেখতে হবে আমার।

কাল রাতে! অত্যন্ত আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করলাম।

ঘরে চল, বলছি।

ঘরে এসে জামা কাপড় বদলে দুটো চেয়ারে সামনাসামনি বসার পর বললেন প্রফেসর, আগামীকাল রাতের আগে অস্ত্রোপচারের এক সেট যন্ত্রপাতি জোগাড় করে দিতে পার আমাকে?

আরও অবাক হয়ে প্রশ্ন করলাম, যন্ত্রপাতি দিয়ে কি হবে? কার শরীরে অস্ত্রোপচার করবেন আপনি?

লুসির শরীরে।

যা ভাবা উচিত নয় তাই ভেবে বসলাম। পাগল হয়ে গেলেন নাকি প্রফেসর? বোধহয় আমার মনের ভাব টের পেয়েই মৃদু হাসলেন তিনি। বললেন, এতে অবাক হবার কিছু নেই, জন। অস্ত্রোপচার ঠিকই করব, কিন্তু প্রচলিত ডাক্তারী পদ্ধতিতে নয়। এ জন্য বিদ্যে। একটু থেমে আবার বললেন, ঠিক আছে, তোমার সাহায্য যখন দরকার, তোমাকে খুলেই বলি ব্যাপারটা। কিন্তু, খবরদার ঘুণাক্ষরেও যেন কেউ কথাটা জানতে না পারে। প্রথমে লুসির মাথাটা কেটে শরীর থেকে আলাদা করে ফেলব আমি। এরপর বুক চিরে ছিঁড়ে বের করে আনব হৃৎপিণ্ড। ওকি, ওরকম শিউরে উঠলে কেন? তুমি না ডাক্তার? মানুষ কাটার বিদ্যে না তুমি রীতিমত সাধনা করে শিখে এসেছ? তাছাড়া এর আগে একাধিক জীবন্ত মানুষের শরীরে কি তুমি স্থির নিষ্কম্প হাতে ছুরি চালাওনি? মরা মানুষের বেলায় তোমার এত ভয় কেন?

চালিয়েছি, স্যার, তবে সে জীবন বাঁচাবার জন্যে। কিন্তু আপনি যা করতে বলছেন, এ যে রীতিমত পৈশাচিকতা।

পিশাচের হাত থেকে বাঁচতে হলে পৈশাচিকতার দরকার আছে, জন। হ্যাঁ, এখন মন দিয়ে শোন আমার কথা। তোমার ভয় পাওয়ার বা মন খারাপ করার কিছু নেই। কারণ কাজটা করব আমি। নিজের হাতে। তুমি শুধু সাহায্য করে যাবে আমাকে। সম্ভব হলে আজই করতাম। কিন্তু কাল সমাধি অনুষ্ঠানের আগে এসে নিশ্চয়ই লুসিকে দেখতে চাইবে আর্থার। তখন তাকে ব্যাপারটার গুরুত্ব বোঝান সম্ভব নাও হতে পারে। তোমাকে যা বলেছি, যেভাবেই হোক এক সেট যন্ত্রপাতি জোগাড় কর তুমি। কাল লুসির সমাধি অনুষ্ঠান শেষ হয়ে গেলে রাতের বেলায় চুপি চুপি তুমি আর আমি কবরখানায় ঢুকে আমাদের কাজ শেষ করে আসব। বুঝেছ?

না, একটু ক্ষুন্ন হয়েই জবাব দিলাম। আসলে কি করতে চাইছেন আপনি, স্যার? লুসির ওই সুন্দর মৃতদেহটাকে শুধু শুধু কাটাছেঁড়া করে কি লাভ? বিজ্ঞান বা মানুষের কোন উপকারেই তো এটা লাগবে না।

লাগবে, স্থির শান্ত গলায় জবাব দিলেন প্রফেসর। তারপর আমার কাঁধে একটা হাত রেখে ধীরে ধীরে বলতে লাগলেন তিনি, কিন্তু তা বোঝার সময় তোমার হয়নি এখনও। ব্যথা পেয়ো না, জন। বুঝতে পারছি তোমার এককালের ভালবাসার পাত্রীর শরীরটা পৈশাচিক ভাবে ছিন্নভিন্ন করতে যাচ্ছি জেনে ব্যাপারটা কিছুতেই মেনে নিতে পারছ না তুমি। কাজটা করতে আমারও যে কতটা খারাপ লাগবে তা তোমাকে বলে বোঝাতে পারব না আমি। আমাকে তো তুমি ভালমতই জান, জন। অকারণে একটা কুটোও এদিক থেকে ওদিকে সরাই না আমি। তাছাড়া অতীতে যখনই তোমার কোন চরম দুর্যোগ উপস্থিত হয়েছে, প্রথমেই কি আমাকে মনে পড়েনি তোমার? সেসব দিনেও তো আমাকে অনেক খাপছাড়া কাজ করতে দেখেছ তুমি। তাহলে? তাহলে আমার কথা মেনে নিতে পারছ না কেন? মনে পড়ছে কি, লুসির মৃত্যু সময়ে লুসির ঠোঁটে চুমু খেতে যাবার আগে আর্থারকে জোর করে টেনে সরিয়ে নিয়েছিলাম আমি? অবাক হয়ে গিয়েছিলে তোমরা, হয়ত কিছুটা বিরক্তও। কিন্তু জান না সেদিন কত বড় সর্বনাশের হাত থেকে আর্থারকে টেনে সরিয়ে এনেছি আমি। সে সময়কার লুসির চোখের ভাষা কি পড়তে পেরেছিলে তোমরা? পারনি। কারণ সে-চোখ তোমাদের নেই। কারও রহস্যময় অঙ্গুলি হেলনে আর্থারকে চুমো খেতে বাধ্য করছিল লুসি, নিজের অনিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও। কিন্তু আর্থারকে যখন টেনে সরিয়ে নিলাম, লুসির চোখের নীরব ভাষা আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানিয়েছিল আমাকে। কারণ আমি তার প্রিয়তমকে শয়তানের ক্লেদাক্ত অশুচি স্পর্শ থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছিলাম। আমি জানি, শীঘ্রই আবার আঘাত হানবে সে শয়তান, আর তার জন্যেই আমার এ প্রচেষ্টা। যে করেই হোক আর্থারকে বাঁচাতেই হবে আমাকে।

একটু জিরিয়ে নিয়ে আবার বলতে শুরু করলেন প্রফেসর, গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই ঘটে চলেছে নানারকম বিদঘুটে অস্বাভাবিক ঘটনা। এ কয়দিন যদি আমার ওপর বিশ্বাস রাখতে পারলে তাহলে আজ পারছ না কেন? জোর করলে হয়ত প্রয়োজনের খাতিরে সব বলতে হবে তোমাকে আমার, কিন্তু তার ফল খারাপ ছাড়া ভাল হবে না। শুধু তোমার সাহায্য আমার দরকার বলেই এত কথা বলতে হচ্ছে আমাকে। যদি শেষ পর্যন্ত তোমার সাহায্য না পাই তাহলে একাই এগোব আমি। দুনিয়ার কোন শক্তিই আমাকে রুখতে পারবে না, দৃঢ় আত্মপ্রত্যয়ে গম গম করে উঠল প্রফেসরের কণ্ঠ। কয়েক সেকেন্ড আমার মুখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে কোমল গলায় বললেন তিনি, আগেও বলেছি, এখনো বলছি, আমাদের সামনে অপেক্ষা করছে ভয়ঙ্কর এক পৈশাচিক ভবিষ্যৎ। আর তার জন্য আগে থেকেই কোমর বেঁধে তৈরি হতে হবে আমাদের। সামান্য ভুলের জন্যে বা সময়ের হেরফেরে সর্বনাশ হয়ে যেতে পারে। অতএব, এখন থেকেই আমাদের অন্ততঃ নিজেদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি ঘটতে দেয়া চলবে না। এর পর আর কোন কথা আহে তোমার?

এরপর আর কথা থাকতে পারে না। একটু আগে এই লোককেই মনে মনে পাগল ঠাউরেছি ভেবে অনুশোচনায় ভরে গেল মন। এতদিন ঘনিষ্ঠ ভাবে থেকেও ওই অসাধারণ প্রতিভাবান লোকটাকে চিনতে ভুল করেছি আমি? ছিঃ ছিঃ! চেয়ার থেকে উঠে গিয়ে সোজা প্রফেসরের পায়ে হাত দিয়ে মাফ চাইলাম, প্রতিজ্ঞা করলাম, জীবনে আর তার কোন কাজেরই কৈফিয়ত চাইব না আমি।

আমার কথায় অত্যন্ত খুশি হলেন প্রফেসর। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে বিদায় নিয়ে চলে গেলেন নিজের ঘরে বসে বসে চুপচাপ আকাশ পাতাল ভাবতে থাকলাম আমি।

২২ সেপ্টেম্বর।

ভোরবেলা প্রফেসরের ডাকে ঘুম ভেঙে উঠে বসলাম বিছানার ওপর। আমি উঠে বসলে এগিয়ে এসে একটা চেয়ারে বসলেন প্রফেসর। তাড়াতাড়ি বাথরূম সেরে এসে ওর সামনে বসতেই বললেন তিনি, তোমাকে অস্ত্রোপচারের যন্ত্রপাতি যোগাড় করতে বলেছিলাম না, তার আর দরকার নেই।

নেই! কেন? অবাক হয়েই প্রশ্ন করলাম।

কারণ, দেরি হয়ে গেছে অনেক, বলে পকেট থেকে একটা ছোট্ট সোনার কুশ বের করে আমাকে দেখালেন প্রফেসর। এটা চিনতে পার?

এটা তো কাল লুসির বুকে রেখে দিয়েছিলেন!

হ্যাঁ, দিয়েছিলাম। কিন্তু তারপর চুরি হয়ে যায়। চুরি করেছিল ওদের বাড়িরই একজন চাকর। আর তার শাস্তিও সে পেয়েছে।

শাস্তি পেয়েছে?

নিচের তলায় রান্নাঘরের মেঝেতে মরে পড়ে আছে চাকরটা। সারা শরীর ক্ষতবিক্ষত। দেখলে মনে হয় একাধিক কুকুর জাতীয় হিংস্র পশুর দাঁত-নখের আঘাতে মৃত্যু হয়েছে ওর। আর তার পাশেই পড়ে ছিল এই ক্রুশটা।

তাহলে! এখন কি করব আমরা? বিমূঢ়ের মত প্রশ্ন করলাম।

আপাততঃ অপেক্ষা করা ছাড়া আর কিছু করার নেই। তবে খুব বেশিদিন আমাদের অপেক্ষা করতে হবে বলে মনে হয় না, বলে উঠে দাঁড়ালেন তিনি। এখন তৈরি হয়ে নাও তো। ওদিকে আবার অনেক কাজ পড়ে আছে। নতুন আর এক প্রহেলিকার মধ্যে আমাকে ফেলে রেখে নিঃশব্দে ঘর ছেড়ে বেড়িয়ে গেলেন প্রফেসর।

অত্যন্ত ব্যস্ততার মাঝে কাটল সারাটা দিন। হ্যাম্পস্টেড কবর-খানায়লুসিদের ব্যক্তিগত কবর তৈরি করে রেখে গেছেন সুসির পূর্বপুরুষরা। মিসেস ওয়েস্টেনরার আলমারিতে পাওয়া নথিপত্রেই একথা জানতে পেরেছেন প্রফেসর। সেই কবরখানায় কফিন বয়ে নেবার সময় ধার্য করা হল বিকেল সাড়ে পাঁচটায়। আর্থারের জন্যেই এ সময়টা ঠিক করা হল। কারণ পাঁচটার আগে কিছুতেই এসে পৌঁছতে পারবে না সে। আর তাকে ফেলে লুসিকে সমাধিস্থ করার কথায় মন সায় দিল না কিছুতেই।

কাঁটায় কঁটায় বিকেল পাচটায় এসে পৌঁছল আর্থার। ওর দিকে আর তাকানই যায় না। একদিকে প্রেমিকা, অন্যদিকে বাবার মৃত্যুতে একেবারে ভেঙে পড়েছে বেচারা। ওকে আমার সাথে আসতে বলে লাশ রাখা ঘরের দিকে রওনা দিলাম আমি। নিঃশব্দে আমার পেছন পেছন হেঁটে এসে লাশঘরে ঢুকল আর্থার। ঘরে ঢুকেই শিশুর মত কেঁদে উঠল সে। কাঁদতে কাঁদতেই বলল, এ বিশাল পৃথিবীতে আপনার বলতে আমার আর কেউই রইল না, জন। বলতে পারিস এখন কি করব আমি?

কি বলে সান্ত্বনা দেব ওকে? আস্তে করে ওর দুকাঁধে আমার দুহাত রেখে ওকে টেনে আনলাম নিজের দিকে। নিবিড় ভাবে আমাকে জড়িয়ে ধরে আবার হু হু করে কেঁদে উঠল আর্থার। আমার নিজের চোখও আর শুকনো রইল না। নিঃশব্দে টপ টপ করে অশ্রু ঝরে পড়তে লাগল আমার দুগাল বেয়ে।

বেশ খানিকক্ষণ পর আর্থারের আলিঙ্গন মুক্ত হয়ে আস্তে করে বললাম, কেঁদে আর কি হবে, আর্থার, এখন শেষবারের মত একবার লুসিকে দেখবি, চল।

নিঃশব্দে লুসির শয্যা পাশে এসে দাঁড়ালাম দুজনে। আস্তে করে লুসির মুখের ওপর থেকে চাদরটা সরিয়ে দিলাম আমি। আগের চেয়ে হাজার গুণ বেড়ে গেছে সুসির রূপ। দেখে মনে হচ্ছে ছত্রিশ হাজার রাক্ষসের দেশের সেই মায়াবী যাদুকর সোনার কাঠির ছোঁয়ায় ঘুম পাড়িয়ে রেখেছে অপূর্ব সুন্দরী রাজকুমারীকে। যে কোন মুহূর্তে ওর কাঠির ছোঁয়ায় আবার ঘুম ভেঙে উঠে বসবে রাজার দুলালী। আহ, তাই যদি হতো! শেষ পর্যন্ত আমার কানের কাছে মুখ রেখে ফিসফিস করে বলেই ফেলল আর্থার, জন, সত্যিই কি মরে গেছে লুসি? তুই তো ডাক্তার। আর একবার ভালমত পরীক্ষা করে দেখ না ওকে।

না, আর্থার, সত্যিই মারা গেছে ও। কিন্তু এমন মৃত্যুর কথা আমি কখনও শুনিনি। ও আবার ভুল বুঝে বসবে ভেবে বললাম, তবে কদাচিৎ হলেও মৃত্যুর পর কোন কোন মানুষের মধ্যে আবার উল্টো প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। তারা পচে তো যায়ই না, বরং জীবিতাবস্থা থেকেও সুন্দর হয়ে ওঠে। আসলে তাদের দেহের ভেতরই সুপ্ত থেকে যায় তাদের আত্মা। লুসির মৃত্যুটাও ঠিক তেমনি। এমন সময় দরজার বাইরে করাঘাতের শব্দ হতেই জিজ্ঞেস করলাম, কে?

সময় পেরিয়ে যাচ্ছে, জন, বাইরে থেকে বললেন প্রফেসর। শব বাহকেরা অপেক্ষা করছে।

নে, চল, আর্থার, বলে লুসির মুখটা ঢেকে দিতে গেলাম আমি। কিন্তু আমাকে বাধা দিল আর্থার। এগিয়ে এসে আলতো করে লুসির কপালে ঠোঁট ছোঁয়াল সে। তারপর পরম যত্নে ধীরে ধীরে চাদর দিয়ে ঢেকে দিল লুসির মুখটা।

বিকেলের পড়ন্ত রোদে মিছিল করে কফিন নিয়ে কবরখানার দিকে রওনা দিলাম আমরা। বিকেল যে এত বিষণ্ণ লাগতে পারে ভাবিনি কখনও। রাস্তার পাশের ওক গাছগুলো পর্যন্ত যেন আমাদের শোকে অংশগ্রহণ করে দাঁড়িয়ে আছে নিথর হয়ে। আর গির্জার ঘণ্টার প্রতিটা ধ্বনি যেন শেলের মত হৃদয়ে এসে বাজছে।

কাজ শেষ হতে হতে বেশ রাত হয়ে গেল। রাতে খাবার টেবিলে বসে প্রায় কিছুই খেতে পারলাম না। কোনমতে খাওয়ার পালা সাঙ্গ হলে ড্রইংরুমে এসে বসলাম। মোটা একটা চুরুট ধরিয়ে একটানা টানতে লাগলেন প্রফেসর। কুণ্ডলী পাকিয়ে ওপরে উঠে যাচ্ছে নীলচে সাদা ধোঁয়া। আর ওই ধোঁয়ার কুণ্ডলীর ভেতর কেবলই যেন ভেসে বেড়াতে লাগল লুসির অপূর্ব সুন্দর মুখ।

কতক্ষণ কেটে গেল জানি না, প্রফেসরের কাশির শব্দে চমক ভাঙল। খুক খুরু করে কেশে গলা পরিষ্কার করছেন প্রফেসর, বোধহয় কথা বলার জন্যেই। আর্থারের কিন্তু খেয়াল নেই। একভাবেই চুপ করে বসে ঘরের কোণের ফায়ারপ্লেসটার দিকে তাকিয়ে আছে সে। ওর মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে, ওই আগুনের মতই ব্যথার আগুন জ্বলছে তার মনে।

আরো বার দুয়েক কেশে গলাটা পরিষ্কার করে নিয়ে বললেন তিনি, যদি কিছু মনে না কর, তোমাকে দুএকটা কথা জিজ্ঞেস করব, আর্থার।

যেন স্বপ্নের জগৎ থেকে উঠে এসেছে এমনি ভাবে ধীরে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে প্রফেসরের দিকে চেয়ে আস্তে করে বলল সে, বলুন।

লুসি কি তার সমস্ত সম্পত্তি তোমার নামে উইল করে দিয়ে গেছে?

হ্যাঁ।

বেশ। ওর সম্পত্তির একমাত্র উত্তরাধিকারী হিসেবে তোমার কাছ থেকে লুসির যাবতীয় ব্যক্তিগত চিঠিপত্র এবং ডায়েরীটা দেখার অনুমতি চাইছি। একটু থেমে আবার বললেন, অবশ্য, কাজ শেষ হলেই আবার তা তোমাকে ফিরিয়ে দেব আমি শুধুমাত্র কৌতূহলের বশে ওগুলো দেখতে চাইছি না আমি, এর বিশেষ কারণ আছে। পাছে বেহাত হয়ে যায় এজন্যে তোমাকে জিজ্ঞেস না করেই ওগুলো সরিয়ে রেখেছিলাম, কিন্তু বিশ্বাস কর একটা কাগজও এ পর্যন্ত খুলে দেখিনি আমি।

মিছেই লজ্জা দিচ্ছেন আমাকে, প্রফেসর। আমি জানি, আপনি চাইলে লুসি একান্ত ব্যক্তিগত ডায়েরীটাও আপনার হাতে তুলে দিতে বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করত না। যার জিনিস সে-ই করত না, আর আমি করব এটা ভাবলেন কি করে আপনি?

ভেরি গুড, আর্থার। অসংখ্য ধন্যবাদ তোমাকে। অবশ্য তোমার কাছ থেকে এ উত্তরই আমি আশা করেছিলাম, চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন প্রফেসর। লুসির মৃত্যুর পর এই প্রথম আর্থারকে সান্ত্বনা দেবার জন্যে বললেন তিনি, আমাদের সবার জীবনেই কোন না কোন সময়ে ঘনিয়ে আসে প্রচণ্ড অশান্তি আর দুঃখ। কিন্তু সেই অশান্তি আর দুঃখকে অতিক্রম করে শান্তি সুখের দুয়ারে পৌঁছতে হলে চাই অসাধারণ আত্মত্যাগ আর দুর্জয় সাহস। এবং তা হলেই, যত বড় দুঃখই আসুক না কেন, তাকে জয় করা যায়, বলে দৃঢ় পদক্ষেপে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন প্রফেসর। আর আর্থারকে জোর করে সোফা থেকে তুলে শুতে চললাম আমরা।

ওপরের তলার একটা ঘরে একই শয্যায় আর্থারের সাথে শুয়ে পড়লাম আমি। কয়েক মিনিট পরই সে ঘরে এসে ঢুকলেন প্রফেসর। আমি উঠে বসতে গেলে ইশারায় আমাকে শুয়ে থাকতে বললেন তিনি। সারাটা রাত ঘরের কোণে একটা চেয়ারে বসে, কেন, কে জানে, আমাদের বিশেষ করে আর্থারকে পাহারা দিলেন প্রফেসর। আর সারারাতই বাতাসে ভর করে বাগান থেকে ভেসে এলো হাস্নাহেনা আর রজনী গন্ধার স্নিগ্ধ সুবাস।

One thought on “২.০২ রাতের খাওয়ার পর

  1. এই গল্পটা পড়ে খুব মজা পাচ্ছি,, প্রতিটি পার্টে নতুন নতুন রহস্য জট পাকাচ্ছে।এক কথায় দারুন একটা গল্প..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *