২.০১ লুসি ওয়েস্টেনরার ডায়েরী থেকে

ড্রাকুলা ২
প্রথম প্রকাশ : অক্টোবর, ১৯৭৯

লুসি ওয়েস্টেনরার ডায়েরী থেকে

১৭ সেপ্টেম্বর, সকাল।

একে একে শান্তিতেই কেটে গেল চারটে দিন আর রাত। আগের চেয়ে অনেক বেশি সুস্থ মনে হচ্ছে আজ নিজেকে। ভোর হয়েছে একটু আগে। জানালা দিয়ে ঘরে এসে পড়েছে ভোরের সোনালী রোদ। ঝিরঝিরে বাতাসে জুড়িয়ে যাচ্ছে শরীর মন। গত চারদিন সমানে রাত জেগে আমাকে পাহারা দিয়েছেন ডা. ভ্যান হেলসিং। আজ রাত থেকে আমাকে আর কারও পাহারা দেবার দরকার নেই ভেবেই বোধহয় আমস্টারডামে ফিরে গেছেন তিনি। ধীরে ধীরে সাহস ফিরে পাচ্ছি আমিও। বুঝতে পারছি রাতের বেলা একা থাকতে আর ভয় করবে না আমার। রসুনের উগ্র গন্ধটার সাথেও অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। বিশেষভাবে জন্মানো এই রসুনের আর একটা নতুন মোড়কও গতকাল হারলেম থেকে এসে গেছে, অতএব চিন্তা কি?

গভীর রাত।

আজ রাতের প্রত্যেকটি ঘটনা হুবহু লিখে রাখছি। ঈশ্বর, চরম দুর্ঘটনা ঘটার আগেই যেন শেষ করতে পারি লেখাটা। আশা করছি, আমি বলে না দিলেও লেখাটা চোখে পড়বে সবার। ভীষণ দুর্বল আর অসহায় বোধ করছি। বুঝতে পারছি ধীর পায়ে আমাকে গ্রাস করতে এগিয়ে আসছে মৃত্যু। ঈশ্বর, শক্তি দাওযেন মরার আগেই শেষ করে যেতে পারি লেখাটা।

যথারীতি রসুনের কোয়াগুলো জানালা আর দরজার চৌকাঠে রেখে মালটা গলায় পরে শুয়ে পড়লাম। কতক্ষণ ঘুমিয়ে ছিলাম জনি না, হঠাৎ অদ্ভুত একটা শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। এরকম শব্দ শুনেই প্রথমবার ঘুমের ঘোরে বাইরে বেরিয়ে গিয়েছিলাম, আর মিনা ধরে নিয়ে এসেছিল আমাকে। আশ্চর্য, এখন সব মনে পড়ছে আমার। হঠাৎ করেই জনের কথা মনে পড়লো, কেন যেন মনে হচ্ছে এখন পাশের ঘরে ওর থাকা উচিত ছিল। পাশ ফিরে কোল বালিশটা আঁকড়ে ধরে ঘুমোবার চেষ্টা করলাম, কিন্তু ঘুম এল না কিছুতেই। অকারণেই ভয় ভয় করছে, অথচ সকালে ভেবেছিলাম বিন্দুমাত্র ভয় পাব না আজ রাতে। মনে ভয় ঢুকতেই আর ঘুমোবার চেষ্টা করলাম না। এবং তা করতে গিয়েই প্রচণ্ড বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে পড়লাম। এতক্ষণ ঘুমোবার চেষ্টা করেও ঘুমোতে পারিনি। অথচ এখন জেগে থাকতে গিয়ে টেনে খুলে রাখতে পারছি না দুচোখের পাতা। হঠাৎ বারান্দায় একটা অদ্ভুত শব্দ হতেই লাফ দিয়ে বিছানা থেকে উঠে গিয়ে দরজা খুলে চেঁচিয়ে উঠলাম, কে, কে ওখানে? সাড়া দিল না কেউ, কিন্তু হলপ করে বলতে পারি ওখান থেকেই এসেছে ওই অদ্ভুত শব্দটা।

মনে মনে একটু অস্বস্তি নিয়েই ফিরে এলাম বিছানায়। হঠাৎ বাগানের দিক থেকে ভেসে এল নেকড়ের ভয়ঙ্কর হিংস্র গর্জন। অবাক কাণ্ড! শহরের এই এখানটায় নেকড়ে এল কোত্থেকে! উঠে গিয়ে জানালার বদ্ধ কাঁচের শার্সি দিয়ে বাইরে উঁকি দিলাম। আবছা চাঁদের আলোয় চোখে পড়ল বাগানের ওপরের আকাশে চক্কর মারছে একটা বাদুড়। কিন্তু নেকড়ে বা ওই জাতীয় কিছুর ছায়াও চোখে পড়ল না বাগানের কোথাও। আমি জানালার কাছে এসে দাঁড়াতেই সাঁই করে একপাক ঘুরে জানালার ধারে উড়ে এল বাদুড়টা। ওটার জ্বলজ্বলে লাল দুটো চোখের দিকে চাইতেই পুরনো ভয়টা ফিরে এলো আবার আমার মনে। বাদুড়টার দিকে চাইতে আর সাহস হল না, ফিরে এলাম বিছানায়। প্রতিজ্ঞা করলাম কিছুতেই ঘুমোবো না আজ রাতে।

এমন সময় দরজা খুলে ঘরে এসে ঢুকলেন মা। আমাকে স্তব্ধ হয়ে বিছানায় বসে থাকতে দেখে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন তিনি, কি রে, অমন করে বসে বসে কি ভাবছিস? ঘুম আসছে না?

কি জানি কেন ভয় করছে, মা।

ঠিক আছে, বাকি রাতটা আজ তোর কাছেই কাটাব। এগিয়ে এসে আমার বিছানায় বসে ডাকলেন মা, আয় শুয়ে পড়।

আমি শুতেই আমার পাশে শুয়ে পড়লেন মা। হঠাৎ জানালার কাঁচের শার্সিতে ডানা ঝাঁপটানোর শব্দ হতেই চমকে উঠে নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করলেন, এই রাতের বেলা আবার মরতে এল কোন পাখি? বলেই কয়েক মুহূর্ত সেদিকে

তাকিয়ে থেকে আবার পাশ ফিরে শুলেন মা।

ঠিক তার পর পরই ঘটল ভয়ঙ্কর ঘটনাটা। বাগানের লতা ঝোপের ওপার থেকে ভেসে এল হাজার হাজার নেকড়ের ক্রুদ্ধ চাপা গর্জন। ঝন ঝন শব্দে টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে ঘরের মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ল কঁচের শার্সিগুলো। ভাঙা শার্সির মধ্যে দিয়ে প্রঃ জোরে বইতে শুরু করল দমকা হাওয়া, থর থর করে কেঁপে উঠল খড়খড়িগুলো। একলাফে বিছানার ওপর উঠে বসলাম আমি আর মা।

জানালার দিকে চোখ পড়তেই প্রচণ্ড আতঙ্কে শিউরে উঠলাম। ভাঙা শার্সির মধ্যে দিয়ে আমাদের দিকেই ভয়ঙ্কর হিংস্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে একটা বিশাল নেকড়ে। আশ্চর্যবাড়া দেয়াল বেয়ে দোতলার জানালার কাছে নেকড়ে উঠল কি করে বুঝতে পারলাম না। চেঁচিয়ে উঠে আমাকে জড়িয়ে ধরলেন মা। আর তার হাতের ঝটকা লেগে আমার গলা থেকে ছিঁড়ে পড়ে গেল প্রফেসর হেলসিং-এর পরিয়ে দেয়া রসুনের মালাটা। মালাটা ছিঁড়ে যেতেই হা হা শব্দে কুৎসিত হাসি হেসে উঠল কেউ। সেই হাসির শব্দের সাথে তাল মিলিয়ে ঝিক করে জ্বলে উঠল একটা চোখ-ধাধান তীব্র নীল আলো। সাথে সাথে বুক ভাঙা আর্তনাদ করে মেঝেয় লুটিয়ে পড়লেন মা। বাহতের মত স্তব্ধ হয়ে বিছানায় বসে দেখতে লাগলাম অবিশ্বাস্য ঘটনাগুলো।

মা মেঝেতে পড়ে যেতেই জানালা হতে অদৃশ্য হয়ে গেল নেকড়েটা। তার বদলে হু হু করে তীব্র বাতাস ঢুকতে শুরু করল ঘরে। সেই বাতাসে ভর করে ভেসে আসছে অজস্র চকচকে রূপালী ধূলিকণা। ঘরে ঢুকেই পাক খেয়ে ঘুরতে লাগল কণাগুলো। চোখের সামনে ওই ধূলিকণার ভেতর থেকে রূপ নিচ্ছে একটা বিশাল কালো মূর্তি। ওদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই ঘুমে জড়িয়ে এল দুচোখ। কিছুতেই খুলে রাখতে পারছি না চোখের পাতা। বহু চেষ্টা করেও আর বসে থাকতে না পেরে লুটিয়ে পড়লাম বিছানায়।

ঠিক কতক্ষণ পরে জানি না, আস্তে আস্তে চোখ মেলে চাইলাম। দূরের গির্জার ঢং ঢং ঘণ্টাধ্বনি কানে এসে বাজছে। বাগানের ওপাশে এসে একসাথে জড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে চেঁচাচ্ছে পাড়ার কুকুরগুলো। আর বাগানেরই কোন ঝোপের ভেতর বসে সমানে গান গেয়ে চলেছে একটা পাপিয়া।

উঠে বসার চেষ্টা করলাম, কিন্তু পারলাম না। বিন্দুমাত্র জোর পাচ্ছি না শরীরে। চেঁচিয়ে চাকরদের ডাকার চেষ্টা করলাম, ভালমত স্বর ফুটল না গলায়। বার কয়েক ডেকেও কারও সাড়া না পেয়ে অসহায়ভাবে চুপচাপ বিছানায় পড়ে থাকলাম। আরও কিছুক্ষণ পর বাইরের বারান্দায় কার পায়ের শব্দ পাওয়া গেল, তাহলে আমার ডাক কানে গিয়েছে কারও। কয়েক মুহূর্ত পরেই দরজা খুলে ঘরের ভেতর উঁকি দিল একটা চাকর। এবং দিয়েই চেঁচিয়ে উঠল ভয়ে।

জানালার ভাঙা কাঁচের শার্সি দিয়ে ঘরে ঢুকছে দমকা হাওয়া। বার বার একটার সাথে আরেকটা বাড়ি খেয়ে বিশ্রী শব্দ করছে খড়খড়িগুলো। কুৎসিত ভঙ্গিতে মেঝেতে পড়ে আছেন মা, মড়ার মত বিছানায় শুয়ে আছি আমি, এতসব দেখে ভয় পাবারই কথা চাকরটার।

চাকরটার চেঁচামেচিতে আরও একটা চাকর এসে হাজির হল। ঘরের অবস্থা দেখে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল সে-ও। ওদের সাহায্যে বিছানার ওপর উঠে বসলাম। মাকেও মেঝে থেকে তুলে পাশের বিছানায় শুইয়ে চাদর দিয়ে ঢেকে দিল ওরা। কাজ ঠিকই করছে কিন্তু আতঙ্ক দূর হচ্ছে না ওদের মন থেকে। অগত্যা নিচে থেকে খানিকটা করে ব্র্যাণ্ডি খেয়ে আসতে বললাম ওদেরকে, ভাবলাম তাহলে কিছুটা ধাতস্থ হবে। নিচে চলে গেল ওরা। কিন্তু আর ফিরে এল না। ব্যাপার কি? গায়ের জোর দিয়ে গলা ফাটিয়ে বার কয়েক ডেকে কোন সাড়া পেলাম না চাকর দুটোর কাছ থেকে। কোনমতে বিছানা থেকে নেমে দেখতে চললাম। নিচে গিয়েই পাওয়া গেল ওদেরকে, তবে অজ্ঞান হয়ে মেঝেতে পড়ে থাকা অবস্থায়। ভুল করে ব্র্যাণ্ডির বদলে মার ঘুমের ওষুধের বোতল থেকে ওষুধ খেয়ে ফেলেছে ওরা। বুঝতে পারছি এসবই ভয়ঙ্কর কোন দুর্যোগের পূর্বাভাস।

নিজের ঘরে ফিরে এলাম। মায়ের জ্ঞান ফিরেছে কিনা পরীক্ষা করতে গিয়েই টের পেলাম দুর্যোগটা কি। বুকের ভেতর থেকে একসাথে ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছে চাপ চাপ কান্না। শেষ পর্যন্ত আর সইতে না পেরে ডুকরে কেঁদে উঠলাম। আমাকে ছেড়ে চিরদিনের মত চলে গেছেন মা।

ঠিক সেই মুহূর্তে আবার শোনা গেল বিশ্রী অট্টহাসির শব্দ। আবার বাগানের দিক থেকে একসাথে গর্জন করে উঠল হাজারো নেকড়ের দল। আবার জানালা দিয়ে ঘরে ঢুকতে শুরু করল সেই আশ্চর্য রূপালী ধূলিকণা। পরিষ্কার বুঝতে পারলাম, সময় শেষ হয়ে আসছে আমারও। কিন্তু তা বাইরের পৃথিবীটাকে জানিয়ে যাওয়া দরকার। তাড়াতাড়ি ড্রয়ার হাতড়ে ডায়েরী, খাতা আর কলম বের করে লিখতে বসলাম।

চোখের সামনে আবার কাল মূর্তির রূপ নিচ্ছে ধূলিকণাগুলো এখন থেকে যে কোন মুহূর্তে ঘটে যেতে পারে যা খুশি। ঈশ্বর, মৃত্যুর পর তোমার পায়ে ঠাই দিও আমাকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *