২. স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল মরগান

স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল মরগান, চোখের পলক পড়ছে না। সেকেন্ড দুই, তিন…পাচ। ক’জন?’ শেষে জানতে চাইল ও। ফের শিহরণ উঠল মেরুদণ্ড বরাবর-বিপদ!

ছয়জন।

সদ্য ফেলে আসা অতীতে ফিরে গেল সে। আবার ঝামেলা! এ জিনিসটাকেই ভয় পেয়েছিল, অথচ শেষ পর্যন্ত জড়িয়ে পড়ল বোধহয়, এবং খুব কম সময়ের মধ্যে। এরকম কিছু হতে পারে আশঙ্কা করেছিল, তবে ধারণা করতে পারেনি। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পিছু নেবে আলফ্রেড টেনিসন। লোকটা সম্পর্কে ওর অতি স্বচ্ছ ধারণা-ভয়ঙ্কর লোক সে। পাঁচ ঘণ্টার মধ্যে যে তোক নিজের কর্তব্য স্থির করে ফেলে, এছাড়া অন্য কিছু বলা যায় না তাকে। আরেকটা ব্যাপার পরিষ্কার, মেলিসা বডম্যান বা ফ্ল্যাগ-বি বাথানের সাথে তার বিরোধ চলছে। এদেরকে বেশ ভোগাবে লোকটা।

আধ-খাওয়া সিগারেট ছাইদানিতে গুঁজে উঠে দাঁড়াল মরগান।

ইচ্ছে করলে পেছন দিক দিয়ে চলে যেতে পারো তুমি, মি. মরগান, জানাল মেলিসা, ভয় আর আশঙ্কা দূর হয়ে গেছে মুখ থেকে। আত্মবিশ্বাস আর বুদ্ধিমত্তার ছটা চোখে। এখনও অনেক দূরে আছে ওরা। পাহাড়ের পাশ দিয়ে একটা ট্রেইল আছে, চিনি আমি। এখন রওনা দিলে ওরা পৌঁছানোর আগেই অনেক দূর চলে যেতে পারবে।

ধন্যবাদ, ম্যাম, তিক্ত সুরে বলল ও। আমার মনে হয় না লড়াই করার জন্যে আসছে ওরা। আমার ইচ্ছেও সেরকম, এখানে লড়তে যাওয়া মানে তোমাদের ওপর ঝামেলা চাপিয়ে দেওয়া। তাছাড়া আমি কোন অন্যায় করিনি, ডুয়েলটা ফেয়ার ছিল।

মাথা ঝাঁকাল বডম্যান-কন্যা। তবুও…তোমার বোধহয় ওদেরকে এড়িয়ে যাওয়া উচিত।

ক্ষীণ হাসল মরগান। পিছিয়ে যাওয়া আমার খুব অপছন্দ, ম্যাম।

কিন্তু… বলতে গিয়েও থেমে গেল মেয়েটি, শ্রাগ করে মৃদু হাসল। তুমি ভীষণ একরোখা, মি. মরগান।

দৃঢ় পায়ে এগোল মরগান।

পিছু নিল মেলিসা। সহসা উল্টোদিকের কামরা থেকে বেরিয়ে এল বাড়ির সবচেয়ে ছোট্ট সদস্যটি। কিছু একটা বলতে চেয়েছিল সে, কিন্তু তার আগেই তাকে কোলে তুলে নিল মেলিসা। আমার ঘরে চলে যাও, শ্যন, ছেলের কপালে চুমো খেয়ে বলল ও। আমি ফিরে না আসা পর্যন্ত ওখানেই থেকো। বুঝেছ?

মাথা ঝাঁকাল ছেলেটা। তাড়াতাড়ি এসো। ঘুমোব আমি।

আমার শ্যন সোনা, লক্ষ্মী ছেলে! চলো, তোমাকে পৌঁছে দিয়ে আসি। খানিক এগিয়ে অতিথির উদ্দেশে পেছনে তাকাল মেলিসা, বারান্দায় চলে গেছে সে। দ্রুত পা চালাল ও, শ্যনকে পৌঁছে দিয়ে একগাদা খেলনা রাখল সামনে, প্রিয় খেলনাগুলোও-ঘোড়া, হান্টার, ইন্ডিয়ান। মেলিসা চায় না র‍্যাঞ্চ হাউসের সামনে চলে আসুক শ্যন। নিশ্চিন্ত হয়ে বারান্দায় এল ও।

ততক্ষণে অনেকটা কাছে চলে এসেছে টেনিসনের লোকেরা। পোর্চ থেকে বিশ হাত দূরে এসে থামল ওরা। ছয়জন। এদের দু’জনকে সকালে ক্যাসল টাউনে দেখেছে মরগান। যে লোকটা মেলিসাকে চড় মেরেছিল, সে নেই।

দুই কদম এগোল বাদামী রঙের একটা মাসট্যাঙ, মেলিসার চোখে সরাসরি তাকাল এর আরোহী। এতটা শীতল আর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, মেলিসার মনে হলো লোকটা ওর চোখ ভেদ করে অন্তস্তল পর্যন্ত দেখতে পাচ্ছে, পড়ে নিচ্ছে সব চিন্তা-ভাবনা। ছাইরঙা চোখগুলো যেন জ্বলন্ত অঙ্গার, অনুভব করে শিউরে উঠল ও, অজানা কারণে কেঁপে উঠল সারা শরীর।

লোকটা আলফ্রেড টেনিসন।

মাসট্যাঙের ওপর এমনভাবে বসেছে যাতে একইসাথে আত্মবিশ্বাস আর আভিজাত্য প্রকাশ পায়। একেবারেই সাধারণ বেশভূষা-নীল শার্ট, লেভাইসের প্যান্ট আর চামড়ার চ্যাপস। কাউহ্যান্ডদের সাধারণ হ্যাট তার মাথায়, গলায় সাদা ব্যানডানা। কোমরে কিংবা উরুতে হোলস্টার বা পিস্তলের খাপ নেই। হাসছে। টেনিসন। তার হাসি প্রাণবন্ত এবং আকৃষ্ট করার মত। খানিকটা বিস্মিত হয়েছে মরগান। ওর চিন্তায়-ধারণায় আলফ্রেড টেনিসনের থাকা উচিত উল্টো সাজে, উল্টো মেজাজে। স্বীকার করতেই হবে ওর বিশ্বাসে চিড় ধরিয়েছে লোকটা। মরগান ভেবে পেল না শত্রু হিসেবে ঠিক কিভাবে নেবে তাকে। বাইরে থেকে একেবারে সাধারণ মানুষ মনে হচ্ছে। হয়তো পুরোটাই ভান, কিন্তু নিশ্চিত হতে পারল না ও।

লিসা, ভরাট গলায় ডাকল টেনিসন। তোমাকে যেতে বলেছিলাম।

আমার গায়ে হাত তুলতে বলোনি নিশ্চই? রুক্ষ স্বরে বলল মেলিসা বডম্যান, অনেকটা সামলে নিয়েছে যদিও কণ্ঠের অস্বস্তি বা মানসিক অস্থিরতা তাতে ঢাকা পড়েনি।

ম্লান হলোনা টেনিসনের হাসি। হপ্তাখানেক বিছানা ছাড়তে পারবে না ও, চাকুরিও খুইয়েছে, আড়চোখে মরগানের দিকে তাকাল সে, চোখে অর্থপূর্ণ দৃষ্টি। কারণ তোমার গায়ে হাত তুলেছে ও। আমার সম্পদের গায়ে কারও হাত পড়বে তা কিভাবে বরদাস্ত করি? করবও না।

কবে হলাম? বিদ্রূপ করল মেলিসা।

ভাল করেই জানো তুমি, একই সুরে জবাব দিল টেনিসন, মেলিসার উত্তরের অপেক্ষা করল না। সরাসরি মরগানের দিকে তাকাল সে এবার, শীতল হয়ে এল। ভরাট কণ্ঠ। মি. জেমস মরগান, ওয়াইওমিং থেকে এসেছ, যাবে মিসৌরি। আশা করছি আগামীকালের মধ্যে যাত্রা করবে তুমি। আমার এক ক্রুকে খুন করেছ, তবু একটা সুযোগ দিচ্ছি তোমাকে।

এখুনি যেতে হবে, বললে না? শোনো, মিস্টার, সকালের ডুয়েলটা ফেয়ার। ছিল, হাসলেও, লোকটার বলা তথ্যগুলো ভাবাচ্ছে মরগানকে। আমার আগেই। পিস্তলে হাত দিয়েছিল তোমার লোক। খুঁটিনাটি তথ্যগুলো জানল কিভাবে? নিজের লোক, হসল্যার ছেলেটা…বারকিপ, তিনজনের সাথে আলাপ করে তা সম্ভব। কাজটা সে করেছে সংক্ষিপ্ত সময়ে। বোঝা যাচ্ছে চালু লোক। নাকি অন্য কোন ব্যাপার?

থেকে গেলে অবশ্য ভালই হবে, খেলাটা জমবে

কি যেন একটা আছে তার বলার সুরে, নাকি ভুল শুনেছি? কিছুটা অস্বস্তি বোধ করল মরগান, পরিস্থিতিটা পছন্দ হচ্ছে না ওর। এখানে এসেছ কেন, আমাকে হুমকি দিতে?

টেনিসনের দৃষ্টি স্থির হলো ওর ওপর, দুর্বোধ্য হাসি ঝুলছে ঠোঁটের কোণে। নীরবে দেখল ওকে, তারপর অলস ভঙ্গিতে স্যাডলে নড়েচড়ে বসল। তুমি এসেছ কেন, মরগান? হেসে পাল্টা জানতে চাইল। ঘণ্টা দুয়েক আগে একটা খুন করে এসেছ। এখন গা ঢাকা দেয়াই উচিত তোমার। ডুয়েলটা হয়তো ফেয়ার ছিল, কিন্তু টার্নার, মানে যাকে খুন করলে, ওর বন্ধুরা যদি তোমাকে চ্যালেঞ্জ করে? প্রিয়জন হত্যার বদলা নেয়ার অধিকার সবারই আছে, তাই না?

পরামর্শ চাইনি।

কিন্তু এটাই আমার শেষ কথা! ঘোষণা করল টেনিসন, চাপা দম্ভ প্রকাশ পেল কণ্ঠে। তুমি চলে গেলে অযথা কিছু ঝামেলা এড়াতে পারব আমরা। আমার ধারণা সেরকম ইচ্ছে তোমারও আছে। এবার মেলিসার দিকে তাকাল সে, খানিকটা কোমল সুরে বলল: জায়গাটা আমাকে ছেড়ে দেওয়া উচিত তোমার।

সন্দেহ আছে আমার।

মনে হলো তর্ক করবে টেনিসন, ক্ষণিকের জন্যে ক্ষোভ দেখা গেল চোখে। কিন্তু নিজেকে সামলে নিয়ে হাসল সে। শ্যন কোথায়?

রক্ত সরে গেল মেলিসা বডম্যানের মুখ থেকে, আতঙ্ক ফুটে উঠল চোখে। না! ওর কাছে যেতে পারবে না তুমি!

কেন? হাসছে টেনিসন।

কোন অধিকারে যাবে?

কিছুক্ষণ চেয়ে থাকল সে, ভাবল কিছু একটা। তারপর মাথা ঝাঁকিয়ে টুপির কিনারা ছুঁয়ে উইশ করল মেলিসাকে। শ্যন আর ওর নানাকে আমার শুভেচ্ছা জানিয়ো। স্পারের মৃদু খোঁচায় ঘুরল মাসট্যাঙটা, এগোল ফিরতি পথে।

পেছনে সঙ্গীরা অনুসরণ করল তাকে।

মরগান খেয়াল করল চিন্তিত দেখাচ্ছে মেলিসাকে। তাকিয়ে আছে দলটার দিকে, চোখে জেদ। তামাক আর কাগজ বের করে সিগারেট রোল করল ও। ধারণা করল টেনিসনের সায্যে কোন একটা সমস্যায় আছে মেয়েটা। কৌতূহল হলেও নিজেকে নিবৃত্ত করে নিল। প্রয়োজন ছাড়া অন্যের ব্যাপারে কৌতূহল দেখায় বোকা আর অলসরা। যথেষ্ট তাড়া আছে ওর, অনেক দূর যেতে হবে।

নিশ্চয়ই আমার মত ভয় পাওনি তুমি? স্লান হাসি দেখা গেল মেলিসার মুখে, কণ্ঠে কৌতুক। স্বীকার করছি ওকে সত্যিই ভয় পাই আমি। আলফ্রেড টেনিসন একজন বেপরোয়া লোক, সপ্রতিভ ভাবটুকু ফিরে এসেছে মেয়েটির চেহারায়, উজ্জ্বল হলো চোখ। বাতিলের ভঙ্গিতে একটা হাত নাড়ল। এবং খারাপ লোক, অন্তত এখন।

আমাকে একটা সুযোগ দিয়েছে ও। ওটা নেব আমি

সোরেলের কাছে এসে দাঁড়াল মেলিসা বডম্যান, চোখে কৃতজ্ঞ দৃষ্টি। গুডলাক, মি. মরগান।

স্যাডলে চেপে ট্রেইলের পথ ধরল মরগান।

আলফ্রেড টেনিসন সাবধানী ও ধূর্ত। ওকে কি এভাবে ছেড়ে দেবে? ভাবছে মরগান, নাকি বুঝে গেছে গন্তব্যে পৌঁছানোর তাড়া আছে ওর? এ ধরনের লোকদের ক্ষেত্রে যা হয়-কখনও পিছু ছাড়ে না। টেনিসন ঠিক ওরকম না হলেও, লোকটার মধ্যে মরগান এমন কিছু দেখেছে যাতে ওর ধারণা হয়েছে একটা সুযোগ সত্যি পেয়েছে। আদৌ কি তাই? হতে পারে ক্যাসল টাউন পেরুনোর আগেই চোরাগোপ্তা হামলায় প্রাণ হারাবে ও, কিংবা হয়তো অযথাই সন্দেহ করছে। আসলে লোকটা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা নেই ওর, মিনিট পাঁচেকের সাক্ষাতে তা পাওয়াও সম্ভব নয়। কিন্তু অবচেতন মন থেকে একটা হামলা আশা করছে মরগান।

এবং তৈরিই আছে ও।

ফ্ল্যাগ-বি বাথানের সীমানা ছাড়িয়ে মাইল চারেক আসার পর রাশ টানল ও। সময় নিয়ে সিগারেট ধরাল। দৃষ্টি দু’শো গজ দূরের উঁচু উপত্যকায়। যাওয়ার সময়ও জায়গাটা ওর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। চকিতে মনে হলো মিসৌরি কেন এখানেই থেমে যেতে পারে! সেটা কি উচিত হবে যেখানে রয়েছে আলফ্রেড টেনিসনের মত শক্র, যে মাত্র পাঁচ ঘণ্টার মধ্যে শত্রু নিধনে বেরিয়ে পড়ে, তা-ও ক্ষুদ্র কারণে? মরগান কাপুরুষ নয়, ঝামেলা এড়াতে পারে না এটাই হচ্ছে ওর দোষ। গন্তব্যে পৌঁছতে আরও দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে ওকে। এ কদিনের যাত্রায় ক্লান্তি এসেছে, থামার আকুতি আছে ওর ভেতর, তবু উপায় নেই। ক্যাসল টাউন ওর জন্যে বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। মরগানের মাথা-ব্যথা সেখানেই। শান্তিপূর্ণ একটা জায়গায় স্থির হতে চায় ও

আলতো পায়ে স্পার দাবাল জেমস মরগান। একশো গজের মত এগিয়ে বামের ট্রেইলে নেমে পড়ল ঘোড়াটা। আশপাশে প্রচুর ঘাস আর ছোট ছোট জুনিপার ঝোঁপ। উপত্যকাটা আরও সামনে। ধীরে, অলস ভঙ্গিতে ওখানে উঠে এল সোরেলটা, কিন্তু সওয়ারীর মধ্যেই আগ্রহ বেশি। কিছুক্ষণ চোখ বুজে থাকল ও, বুক ভরে টেনে নিল পাইনের সুবাসমাখা বাতাস। চোখ খুলে পরিপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকাল তৃণভূমির দিকে। পুরো জায়গাটা সবুজ ঘাসে ছাওয়া। দৃষ্টিসীমার একেবারে শেষ প্রান্তে লজপোল পাইনের বন, বাতাসে নাচছে ওগুলোর ছোট ছোট ডাল। ডানে দিগন্তজোড়া ক্যাকটাস হিল।

নিজ থেকে ঘাস ঠেলে এগোচ্ছে ঘোড়াটা।

হঠাৎ মেলিসা বডম্যানকে মনে পড়ল ওর। দারুণ মহিলা। সুন্দরী, মিশুক ও নিরহঙ্কারী। সচরাচর এমন মহিলা দেখা যায় না। শ্যনের বাবা, সৌভাগ্যবান লোকটি কে?

আচমকা সাহসী হয়ে উঠল ও, ভাবছে এখানেই বসতি করবে কি-না…স্যাডল ব্যাগের টাকাগুলো কাজে লাগিয়ে এ জমিটা কিনতে পারে। তারপর একটা বাথান…স্বপ্ন বটে! নিজেকে ধিক্কার দিল মরগান। একটা বাচ্চা ছেলের চেয়েও খারাপ হয়ে গেছে সে। নিজের মধ্যে দ্বিধা আবিষ্কার করে অবাক হলো। এরকম হবে ভাবাই যায় না, কারণ ওর সারা জীবনে সিদ্ধান্ত নিতে কখনও দেরি হয়নি। যারা ওকে চেনে, জানে ভেবে-চিন্তে এগোয় সে। অথচ এখন ভাবনাগুলো পর্যন্ত গুলিয়ে ফেলেছে।

তৃণভূমির অনেক গভীরে চলে এসেছে মরগান। ভাবনায় ব্যস্ত ছিল, নইলে ধাতব নলে সূর্যের আলোর প্রতিফলন ওর মত সাবধানী লোকের চোখ ফাঁকি দিতে পারত না। কানের পাশ দিয়ে কিছু একটা সুর তুলে চলে যাওয়ার মুহূর্তে রাইফেলের গর্জন শুনতে পেল। এতক্ষণের নীরবতা ওর অন্তস্তল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল, তা নষ্ট হওয়ায় ভেবে পেল না কি করবে, স্থবির বসে থাকল স্যাডলে। কিন্তু সোরেলটা ছুটতে শুরু করেছে-উল্কা বেগে, পাইনের বন বরাবর ছুটছে।

প্রথমবার লক্ষ্যভ্রষ্ট হলেও এবার আর হলো না, মরগানের ডান কাঁধে বিধল গুলিটা। সবে হুঁশ ফিরেছে ওর তখন, মাথা নিচু করে স্যাডলের সাথে শরীর মিশিয়ে ফেলেছে। গুলির তীব্র ধাক্কায় পেছনে হেলে পড়ল দেহ, আপ্রাণ চেষ্টা সত্ত্বেও পড়ে গেল স্যাডল থেকে। রেকাবে আটকে রইল ডান পা, ওদিকে ছুটে চলেছে ঘোড়াটা।

হায় খোদা, প্রান্তরটা যদি ঘাসের না হত, এতক্ষণে দফারফা হয়ে যেত ওর! লোকটা যদি ফের লক্ষ্যভেদ করতে পারে তাহলেই সেরেছে। এবার লাগানো একেবারেই সহজ।

শূন্য প্রান্তরে আরেকবার রাইফেল গর্জে ওঠার আগেই রেকাব থেকে পা মুক্ত করে ঘাসের ওপর শরীর ছেড়ে দিল মরগান। দূরে সরে যাচ্ছে ঘোড়াটা। পিঠে প্রচণ্ড ব্যথা পেয়েছে সত্যি, কিন্তু এ-ও ঠিক আপাতত মুক্ত সে, কিছুক্ষণের জন্যে হলেও। লম্বা ঘাসের আড়াল থাকায় ওর অবস্থান আঁচ করতে পারবে না লোকটা। পঞ্চাশ গজের মধ্যে আছে আততায়ী, ধারণা করল মরগান।

বুক ধড়ফড় আর পাগলা নিঃশ্বাস স্বাভাবিক হতে চারপাশে শব্দ শোনার আশায় ইন্দ্রিয়গুলোকে অবাধ স্বাধীনতা দিল মরগান। ঠায় পড়ে আছে ও, কান খাড়া, চোখের পলক পর্যন্ত ফেলছে না। বাতাসে ঘাস নড়ার শা শা শব্দ ছাপিয়ে অন্য কিছু কানে এল না। অনেকক্ষণ পর নিশ্চিত হলো এগিয়ে আসছে না কেউ। এ ফুরসতে ক্ষতটার দিকে মনোযোগ দিল। এক খাবলা মাংস তুলে নিয়ে চলে গেছে সীসা, অনবরত রক্ত ঝরছে। মোটামুটি গুরুতর, তোগাবে কয়েকদিন। দাঁতে দাঁত চেপে যন্ত্রণা সহ্য করার প্রয়াস পাচ্ছে ও, ভয় হচ্ছে অত্যধিক ব্যথায় না শেষে ছটফট করতে শুরু করে, আর এ সুযোগে ওর অবস্থান জেনে ফেলবে লোকটা।

বাম হাতে হোলস্টার থেকে কোল্ট বের করে পাশে রাখল ও। সময় নিয়ে খুলল শার্টখানা। হাতা ছিড়ে, বগলের নিচ দিয়ে কাঁধ বেঁধে ফেলল। তেমন জুতসই হয়নি, তবে একহাতে এরচেয়ে ভাল কিছু সম্ভবও নয়। এটুকু করেই ক্লান্তি লাগছে। কান খাড়া করে পুরো বিশ মিনিট পড়ে থাকল ও। অধৈর্য লাগছে। ক্ষতের যন্ত্রণা বন্ধ হয়নি, মনে হচ্ছে বেড়েই চলেছে। ওদিকে অসীম ধৈর্যের পরিচয় দিচ্ছে প্রতিপক্ষ। পেশাদার লোক, ভাবল মরগান, ঝুঁকি নিয়ে নিজের অবস্থান থেকে বেরিয়ে আসতে নারাজ। নিজে সুবিধাজনক অবস্থানে থেকে গ্যাড়াকলে ফেলে দিয়েছে ওকে।

ইতোমধ্যে কয়েকবার রাইফেলে আলোর প্রতিফলন চোখে পড়েছে ওর। যে লোক এত সময় ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে পারে, এরকম বোকামি করবে না সে; গৃঢ় কোন উদ্দেশ্য আছেই, এবং তা জানে মরগান। লোকটা চায় ঘাসের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসুক ও। সে-ইচ্ছে ওর আছে ঠিকই তবে সময়ে, সুযোগমত বেরুবে। হয়তো মাত্র একবারই গুলি করার সুযোগ পাবে, ওই একবারেই সফল। হতে হবে। আশার কথা বাম হাতেও সমান তালে অস্ত্র চালাতে পারে ও, সক্ষ্যভেদেও দারুণ।

ধীরে ধীরে একটা পরিকল্পনা দাঁড় করাল মরগান, সম্ভাবনা বিচার করল-ঝুঁকি বেশি, কিন্তু এছাড়া উপায়ও নেই। ঘন্টার পর ঘণ্টা এখানে পড়ে থাকার মানে হয়। মত বদলে কাছে চলে আসতে পারে লোকটা। তাহলে কিছুই করার থাকবে না ওর, কাজ সারার জন্যে একটা সীসাই যথেষ্ট।

কিছু দূরে দাঁড়িয়ে আছে সোরেলটা। চাপা, নিচু স্বরে শিস দিতে কান খাড়া করল, ক্ষণিকের জন্যে ইতস্তত করার পর ছুটতে শুরু করল। শেষবারের মত তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চারপাশ দেখে নিল মরগান, ইতিকর্তব্য স্থির করে নিল পুনরায়। ধরেই নিয়েছে ওর পরিকল্পনা আঁচ করে ফেলবে লোকটা। ঘোড়াটা কয়েক হাত দূরে চলে আসতে, ঝটিতি উঠে দাঁড়াল ও। ছুটতে শুরু করল সোরেলের পাশাপাশি, হাত বাড়িয়ে স্যাডল হন চেপে ধরে এক লাফে উঠে বসল স্যাডলে। পমেল আঁকড়ে ধরে স্যাডলের সাথে মিশিয়ে ফেলল শরীর। এক নাগাড়ে গুলি করে চলেছে প্রতিপক্ষ, কিন্তু লাগাতে পারছে না। এ অবস্থায় লক্ষ্যভেদ করা সহজও নয়। ওকে বেঁধানোর চেয়ে বরং ঘোড়াটাকে পেড়ে ফেলা অনেক সহজ, কিন্তু তাতে অবস্থার হেরফের হবে না খুব একটা।

অকস্মাৎ রাশ টানল মরগান, গতিপথ বদলে উল্টোদিকে ঘোড়া ছোটাল। হাতে চলে এসেছে কোল্টখানা। পাইন বনের কাছে, উঁচু জায়গাটায় চোখ পড়তে। দেখতে পেল আততায়ীকে। রাইফেল উচিয়ে গুলি করছে বিশালদেহী লোকটা। প্রতিপক্ষের মরিয়া অবস্থা আঁচ করতে পেরেছে, বুঝেছে নিজের সঙ্কটাপন্ন। অবস্থাযত কাছে যাবে মরগানের সম্ভাবনা তত বেড়ে যাবে। কাজটা শেষ করার তাগিদে আড়াল ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে সে।

নিশানা করে গুলি করল মরগান, হ্যামার টানার সময় তীব্র বেগে কিছু একটা আঘাত করল ওর ডান উরুতে। হোঁচট খেয়েছে যেন, সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ল ও। হাত ফস্কে পড়ে যাচ্ছিল কোল্ট, শক্ত মুঠিতে চেপে ধরে স্যাডলের সাথে মিশে থাকার চেষ্টা করল। ইতোমধ্যে শক্রর অনেক কাছে চলে এসেছে।

ফের নিশানা করছে লোকটা।

দূরত্বটুকু হিসাব করে কোমরের কাছ থেকে গুলি করল মরগান। ভেবেছিল ছুটে চলার ঝাঁকুনিতে লক্ষ্যভ্রষ্ট হবে আগেরটার মত, কিন্তু লোকটাকে টলে উঠতে দেখে খুশি হলো। সোৎসাহে গুলি করল আবার। সটান পেছন দিকে আছাড় খেল বিশালদেহী, হাত থেকে রাইফেল খসে পড়ল। প্রায় সাথে সাথেই ওকে বিস্মিত করে দিয়ে উঠে বসার চেষ্টা করল, কিন্তু পড়ে গেল আবার। ওঠার চেষ্টায় ইস্তফা দিয়ে শুয়ে থেকে নিশানা করার প্রয়াস পেল। ধীর গতি, হাত চলছে না, এবং প্রয়োজনীয় শক্তিও যেন পাচ্ছে না। ততক্ষণে কাছে চলে এসেছে মরগান, নির্দ্বিধায় শিকারীর কপাল ফুটো করল। শেষ মুহূর্তে চার চোখ এক হয়ে গিয়েছিল ওদের, অসহায়ত্ব আর বিরক্তি ফুটে উঠেছিল লোকটার চোখে; কিন্তু শুধু করুণাই বোধ করল মরগান।

অজান্তে শিউরে উঠল ওর দেহ। লোকটার শেষ গুলি চুলে সিঁথি কেটে চলে গেছে। স্বীকার করতেই হবে দুর্দান্ত হাত ছিল লোকটির। কিন্তু জয়-পরাজয় নির্ধারণে একটা পদক্ষেপই যথেষ্ট। আড়াল ছেড়ে বেরিয়ে ভুল করেছে সে, মাসুল তো দিতেই হবে।

ঢাল বেয়ে উঁচু জায়গাটায় উঠে এল মরগান। লোকটাকে দেখল-কোমরের জোড়া হোলস্টারে বহুল ব্যবহৃত চকচকে বাটে সিক্স্যটার। চেহারার আদল চেনা চেনা লাগলেও স্মরণ করতে পারল না ও। হয়তো ভাড়াটে লোক। স্যাডল থেকে নামার ইচ্ছে হলো না ওর, নিশ্চিত জানে কোন চিহ্ন থাকবে না। পেশাদার লোক চিহ্ন রেখে যাওয়ার মত সামান্য ভুল করে না।

একটা গ্রুলা দাঁড়িয়ে ছিল অদূরে। ব্র্যান্ড নেই, এটাই স্বাভাবিক। মরগান যদি। আলফ্রেড টেনিসনের হয়ে কাজ করত, নিজের ঘোড়ই ব্যবহার করত। শুধু একটা। ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া গেছে, টেনিসনের সাথে ফ্ল্যাগ-বিতে যায়নি এ লোক।

সরে এসে প্রভুর পাশে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকল গ্রুলাটা। ছোট্ট করে মাথা ঝাঁকিয়ে খলিত পায়ে লজপোল পাইনের সারির দিকে এগোল এরপর। এ অবসরে হারিয়ে যাওয়া হ্যাটখানা খুঁজে নিয়েছে মরগান। ঘোড়াটার গন্তব্য নিয়ে তো ভাবছেই না, বরং গ্রুলার মালিকের মৃতদেহও ওর মাথা-ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়নি। নিজেকে নিয়ে ভাবছে ও। শুশ্রূষা দরকার, ক্যাসল টাউনে যাবে? ওখানে নিশ্চয়ই কোন ডাক্তার আছে। নাকি ফ্ল্যাগ-বি বাথানে যাবে? চিন্তাটা মনে আসায় নিজের ওপর বিরক্তি বোধ করল। মেলিসা বড়ম্যানকে আরেকবার বিপদে। ফেলার মানে হয় না। তারচেয়ে, শেষে সিদ্ধান্ত নিল, আশপাশে কোথাও একটা আশ্রয় খুঁজে নিয়ে ক্ষতের পরিচর্যা করবে। পারলে এগিয়ে যাবে। চোট দুটো এমন গুরুতর নয় যে ডাক্তারের কাছে যেতেই হবে। তা করলে-শহরে ওকে হাতের মুঠোয় পেয়ে যাবে টেনিসন। হয়তো এ হামলার ব্যাপারে কিছুই জানে না সে, তবু ঝুঁকি নিতে রাজি নয় মরগান। কোনরকমে যদি একবার রেডরকে পৌঁছতে পারে, ওর নাগাল পাবে না টেনিসন। বিপজ্জনক ওই খনি শহরে আগ বাড়িয়ে ঝামেলা পাকাতে পারবে না সে, এখানকার মত ক্ষমতা থাকবে না রেডরকে। তাছাড়া লুকিয়ে থাকার জন্যে শহরটা আদর্শ।

স্পার দাবাতে এগোল ঘোড়াটা। সামনে লজপোল পাইনের বন, সারি সারি গাছ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে। বাতাস বন্ধ হয়ে গেছে। অস্বস্তি লাগছে ওর, গ্রুলার মালিককে চেনা জরুরী মনে হচ্ছে। কোন একটা ব্যাপার কাটার মত বিঁধে আছে মনের গভীরে, ভুলতে পারছে না। ক্ষতস্থানগুলো যন্ত্রণা করছে, বিশেষ করে উরুর চোটটা

অধৈর্য হয়ে পড়েছে মরগান, অস্থির দৃষ্টিতে চারপাশ জরিপ করল। বন পেরিয়ে যেতে হবে, এদিকে আশ্রয় নেয়ার মত জায়গা নেই, যেটা ওর জন্যে পুরোপুরি নিরাপদ হতে পারে। এগোতে চাইছে না সোরেলটা, আসলে যে-পথ ধরে এগোচ্ছে, আদতে কোন ট্রেইল নয় ওটা। পায়ের নিচে শুকনো পাতা মাড়ানোর মচমচ শব্দ অস্বস্তিতে ফেলে দিয়েছে ঘোড়াটাকে। উঁচু কোন শৃঙ্গে ওঠার চেষ্টা করা সোরেলটার জন্যে এরচেয়ে সহজ কাজ।

লজপোলের সারি শেষে ঘন ঝোঁপ আর বোল্ডারে ছাওয়া এক জায়গায় উপস্থিত হলো ওরা। সার বেঁধে পড়ে থাকা বোন্ডার পেরুনো সম্ভব নয়, ওগুলোর ফাঁক দিয়ে এগোনোর মত কোন পথও চোখে পড়ছে না। বিরক্তি গ্রাস করল মরগানের সারা শরীর। কপাল আর কাকে বলে! এত পথ আসার পর ফিরে যেতেও ইচ্ছে করছে না। বাধ্য হয়ে বোন্ডারের সারির পাশ ঘেঁষে এগোতে থাকল ও। নাক ঝেড়ে অস্বস্তি প্রকাশ করল ঘোড়াটা, কিন্তু পাত্তা দিল না মরগান। অবচেতন মনে ক্ষীণ আশা, শিগগিরই একটা আশ্রয় খুঁজে পাবে। কিন্তু এদিকে আরও ঘন হয়েছে বোল্ডারের সারি, পেছনে ক্যাকটাস হিলও এগিয়ে এসেছে। এর মধ্যে মাথা গোঁজার ঠাই কোথায়?

মিনিট দশ পর সঙ্কীর্ণ একটা পথ দেখা গেল, বড়জোর একজন ঘোড়সওয়ার পার হতে পারবে। কোন দ্বিধা ছাড়াই এগোল ও, রুক্ষ প্রান্তর ধরে ধীর গতিতে চলছে ঘোড়াটা। খানিক বাদে মরগান লক্ষ করল বোল্ডারের সংখ্যা কমতে শুরু করেছে, পায়ের তলায় এ্যানিটের তৈরি পাথুরে জমি। সামনের পাহাড়সারি দ্বিধান্বিত করে তুলেছে ওকে, মনে আশঙ্কা শেষ পর্যন্ত হয়তো কোন আশ্রয় খুঁজে পাবে না। এদিকে ক্লান্তির চরমে পৌঁছে গেছে।

তেষ্টা পাওয়ায় স্যাডলের ওপর পড়ে থাকা ক্যান্টিন তুলে দুই ঢোক পান করল ও। কিছুটা সুস্থির বোধ করছে। ঘোড়াটা দ্রুত এগোচ্ছে এখন, সম্ভবত পানির কোন উৎসের কাছাকাছি এসে পড়েছে। ঠিক সামনেই ক্যাকটাস হিলের একটা শৈলশ্রেণী, আশপাশে ওঅটর হোল বা ঝর্না থাকা বিচিত্র নয়।

শেষ পর্যন্ত ওর ধারণাই সত্যি হলো। কিভাবে ওখানে পৌঁছল ঠিক বলতে পারবে না, কারণ শেষ দিকে ক্ষতের যন্ত্রণা আর ক্লান্তি এতটাই চরমে পৌঁছেছিল যে হাল ছেড়ে দিয়েছিল মরগান। অবশ্য ঘোড়াটার ওপর বরাবরই আস্থা আছে ওর। মাইলখানেক দূর থেকেও পানির গন্ধ পায় এ প্রাণীটি, হয়তো একসময় বুনন ছিল বলেই।

স্যাডল ছাড়তে কসরৎ করতে হলো ওকে। আসন্ন বিপদ বা ঠিক কোথায় আছে, এ নিয়ে ভাবছে না। অবসন্ন দেহে চলে এল কয়েক ফুট চওড়া স্বচ্ছ পানির প্রবাহের কাছে, হাটার সময় খেয়াল করল ডান উরুতে জোর পাচ্ছে না। প্রথমে প্রাণভরে পান করল, তারপর নিজের শুশ্রূষার দিকে মনোযোগ দিল। কোমরের খাপ থেকে বাডই ছুরি বের করে উরুর কাছে কেটে ফেলল প্যান্ট। দগদগে ঘা-র মত দেখাচ্ছে ক্ষতটা। দেখেই বোঝা যাচ্ছে ভেতরে রয়ে গেছে বুলেট হাড় পর্যন্ত অবশ্য পৌঁছায়নি। সবার আগে সীসাটা বের করা দরকার।

কোন কালেই ভীতু প্রকৃতির লোক ছিল না জেমস মরগান। বুনো এই দেশে টিকে থাকতে অনেক বিপদের মোকাবিলা করতে হয়েছে ওকে, দিতে হয়েছে অসীম ধৈর্য আর সহনশক্তির পরীক্ষা। নিজের শরীর থেকে বুলেট বের করতে পারবে না অনেকেই, কিন্তু সে পারবে। মানসিক স্থৈর্যের দিক থেকে এটা কোন ফাস্টগানকে মোকাবিলা করার চেয়ে কোন অংশে কম নয়।

ছুরি দিয়ে খুঁচিয়ে সীসার টুকরোটা বের করার পর ক্লান্ত শরীরে কিছুক্ষণ পড়ে থাকল মরগান। কাজটা করার সময় প্রচণ্ড যন্ত্রণা ভোগ করেছে, কিন্তু মুখ থেকে টু শব্দও বেরুয়নি। হুইস্কি থাকলে ভাল হত, অগত্যা পানি দিয়ে ক্ষতগুলো পরিষ্কার করল। রক্তপাত বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, আবার শুরু হয়েছে এখন। ব্যানডানা খুলে পানিতে ধুয়ে উরুর ক্ষতটা বঁধল ও। চারপাশে নজর বুলাল এরপর, কাছেই পাওয়া গেল গাছটা-ফুলে ছাওয়া ইন্ডিয়ান ঔষধি, ক্লিফ রোজ। এ ধরনের পরিবেশই গাছটার জন্যে অনুকূল। রঙিন ফুলসমেত কয়েকটা ডাল ভেঙে পানির উৎসের কাছে ফিরে এল ও

নিজের অবস্থান সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা নেই ওর। তবে আঁচ করছে ক্যাকটাস হিলের কোন উপত্যকায় এসে পড়েছে। অবশ্য এ নিয়ে খুব একটা চিন্তা করছে না, এ মুহূর্তে ওর প্রয়োজন নিরাপদ কোন জায়গায় পরিপূর্ণ বিশ্রাম, এবং অবশ্যই সবার আগে জখমের শুশ্রূষা।

উরু থেকে ব্যানডানার পট্টি সরিয়ে ফের ক্ষতটা পরিষ্কার করল মরগান, ক্লিফ রোজের ফুল আর কচি পাতা পিষে তার রস লাগাল; কাঁধের ক্ষতেও। ওটা অবশ্য তেমন মারাত্মক নয়, উত্তপ্ত সীসা আঁচড় কেটে যাওয়ার সময় একদলা মাংস তুলে নিয়ে গেছে। দুই জায়গায় ব্যান্ডেজ বেঁধে স্যাডলে চাপল ও। সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে পানির উৎস ধরে উপত্যকার আরও ভেতরে ঢুকে পড়বে। নিরাপদ একটা জায়গা খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা আছে, যেখানে নিশ্চিন্তে কয়েকটা দিন কাটিয়ে দিতে পারবে।

অনিচ্ছাসত্ত্বেও পানিতে পা রাখল ঘোড়াটা। গোড়ালি সমান উঁচু পানির প্রবাহ ভেঙে এগোতে শুরু করল। পানির তলায় শক্ত মাটি থাকায় এগোতে অসুবিধে হচ্ছে না। এতক্ষণ যা-ও বা ট্রাক ফেলে এসেছিল, এখন আর তার নাম-গন্ধও থাকবে না, ভাবল মরগান। কেউ অনুসরণ করলেও পানির কাছে এসে দিশেহারা হয়ে পড়বে, এলাকাটা পরিচিত এবং খুব ধুরন্ধর লোক হলে অবশ্য ভিন্ন কথা-ঠিকই ওর গন্তব্য আঁচ করে নেবে।

উপত্যকার ঢালু জমির ওপর দিয়ে নেমে এসেছে পানির স্রোত। দু’পাশে প্রচুর ঘাস আর ঘন ঝোঁপের ছড়াছড়ি। কয়েকটা সিডারও রয়েছে। ছোট একটা মেসার পাশ ঘেঁষে পুবে চলে এল মরগান। তিন দিক থেকে পাহাড়ে ঘেরা উপত্যকায় পৌঁছে যারপর নাই খুশি হলো ও। খোলা আকাশের নিচে এরচেয়ে চমৎকার আশ্রয় আর হতে পারে না। যেন খুব ছোট একটা বক্স ক্যানিয়ন। প্রবেশপথের উল্টোদিকে কিফের গা বেয়ে নেমে গেছে পানির স্রোত। লজপোল পাইনের বন থেকে অন্তত কয়েকশো ফুট ওপরে আছে, ধারণা করল ও। বোল্ডারের সারি পেরুনোর পর ধীরে ধীরে ওপরে উঠে এসেছে, ক্লান্তির কারণে খেয়াল করেনি।

শুকনো জুনিপার ঝোঁপের কাছে এসে স্যাডল ছাড়ল ও, নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। বেশ কিছুক্ষণ মাটির ওপর পড়ে থেকে শক্তি সঞ্চয় করল। উরু আর কাঁধের ক্ষতে নতুন পট্টি বেঁধে শুয়ে পড়ল কিছুক্ষণ পর। বুকের ওপর আড়াআড়িভাবে রেখেছে রাইফেলটা। সূর্যের আঁচ থেকে রক্ষা পেতে মুখের ওপর হ্যাট চাপিয়ে দিয়েছে। চেষ্টা করতে হলো না, এমনিতেই ঘুমিয়ে পড়ল।

টানা সাত ঘণ্টা ঘুমাল ও। প্রচণ্ড জ্বরে ঘুমের ঘোরে প্রলাপ বকেছে। জেগে উঠে প্রথমে বুঝতে পারল না ঠিক কোথায় আছে। ঘামে চটচট করছে সারা শরীর। চোখ বুজে পড়ে থাকল কিছুক্ষণ, তারপর খিদে অনুভূত হতে উঠে বসল। স্যাডল ব্যাগ থেকে শুকনো মাংসের জার্কি আর সেদ্ধ সীম বের করে খাওয়া সেরে নিল। পেট ভরে পানি খেল এরপর। এ জিনিসটার কমতি নেই।

শুয়ে পড়ে তারাজ্বলা আকাশের দিকে তাকাল মরগান। সারাদিনের ঘটনাগুলো মনে পড়ল-মেলিসা বডম্যান, আলফ্রেড টেনিসন…অচেনা আততায়ী…। হিসেব মিলছে না, কোথাও একটা অসঙ্গতি থেকে যাচ্ছে। সরাসরি শত্রুতা ঘোষণা করেনি টেনিসন, আবার খুব সৌজন্যমূলক আচরণ করেছে তা-ও বলা যায় না। এক ধরনের চ্যালেঞ্জ প্রকাশ করেছে সে, এর মানে কি? লোকটার উদ্ধত আচরণের প্রভাব মেলিসা বডম্যানের ব্যক্তিগত জীবনেও পড়েছে, মেয়েটিকে নিজের সম্পদ বলে দাবি করেছে সে। এতটা সাহস দেখায় কি করে?

অচেনা ওই আততায়ী কিভাবে জানল তৃণভূমিতে যাবে মরগান? কে সে? হতে পারে টেনিসনের ভাড়া করা লোক, কিংবা…নাহ, কোন কিছুই পরিষ্কার নয়। লোকটার পরিচয় জানতে পারলে হয়তো কিছুটা দিশা পাবে।

মেলিসার ব্যাপারে আগ্রহ দেখানো ঠিক হয়নি, তাহলে এত কিছু ঘটত না। হয়তো আগামীকালই রেডরকে পৌঁছে যেত ও। অথচ এখন আহত তো হয়েছেই, অনেক ব্যাপারেই অনিশ্চয়তায় ভুগছে। আরও ঝামেলা পোহাতে হবে কি-না খোদা মালুম।

ফের ঘুমিয়ে পড়ল মরগান। ঘুম ভাঙল পরদিন সকালে। টের পেল মুখ দিয়ে অনবরত ওর পাজরে গুতো মারছে সোরেলটা। মেরুদণ্ডে শিরশিরে অনুভূতি হলো ওর। ঝট করে উঠে বসে চারপাশে তাকাল-কোথাও কেউ নেই। শ্রবণশক্তিকে পুরো স্বাধীনতা দিতে ঘোড়ার পানি ঠেলে চলার শব্দ কানে এল। চকিতে রাইফেল তুলে নিল ও, লেভার টেনে উপত্যকার প্রবেশপথে নিশানা করল। বেডরোল ছেড়ে চলে এল জুনিপার ঝোঁপের আড়ালে। ওপাশে চলে গেছে ঘোড়াটা, নিজ দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করেছে।

এগিয়ে আসছে ওরা। একাধিক নোক, শব্দ শুনে বুঝতে পারল মরগান। কারা ওরা? আপাতত পরিচয় জানার উপায় নেই, হয়তো কোন বাথানের নিরীহ পাঞ্চার, কিন্তু কু গাইছে ওর মন। আশপাশে মাইলখানেকের মধ্যে কোন বাথান চোখে পড়েনি, তাছাড়া এত উঁচুতে পাঞ্চারদের কোন কাজ থাকার কথা নয়। অবচেতন মনের সতর্ক সঙ্কেত অগ্রাহ্য করতে পারছে না মরগান, কারণ এই জিনিসটিই এর আগে বহুবার সমূহ বিপদ থেকে উদ্ধার পেতে সাহায্য করেছে ওকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *