২৪. কে! কে কথা বলে?

২৪. কে! কে কথা বলে?

মালভূমির পশ্চিম অংশে সামান্য হেলে থাকা জায়গায় এসে বিশ্রাম নিতে বসলাম আমরা। এখানে, উঁচুতে বসে নিচের অনেক কিছুই চোখে পড়ছে। সামনে, ঢালে জন্মে থাকা গাছপালার মাথা ছাড়িয়ে নিচে দেখা যাচ্ছে অন্তরীপ, ঢেউয়ের সাদা ফেনা জমেছে। পেছনে, অ্যাংকোরেজ পেরিয়ে, স্কেলিটন আইল্যান্ড ছাড়িয়ে সাগরের ঘোট ছোট ঢেউ কড়া রোদ প্রতিফলিত করে চোখ ধাঁধাচ্ছে আমাদের। একপাশে স্পাই-গ্লাস পাহাড়, চূড়ার কাছে ক্বচিত কদাচিত এক আধটা পাইন দাঁড়িয়ে, কালো কুৎসিত পাথুরে উপচুড়াগুলোর পাশে নেহাতই বেমানান। তীব্র রোদের হাত থেকে গা বাঁচাতে গাছের ছায়ায় আশ্রয় নিয়েছে পাখিরা, ডাকাডাকি বন্ধ। শুধু দূরে নিচ থেকে ভেসে আসছে ঢেউয়ের অবিশ্রান্ত গর্জন। প্রকৃতির এই বিশালতায় নিজেকে একেবারেই ক্ষুদ্র মনে হচ্ছে।

কম্পাসে চোখ রেখে একমনে কি হিসেব করছে সিলভার। তারপর মুখ তুলে বলল, ম্যাপ অনুসারে, স্পাই-গ্লাস পাহাড়ের কাঁধ নিশ্চয় ওই জায়গাটা, পাহাড়ের একটা দিকে আঙুল তুলে দেখাল সে। ঘুরে খাবারের ঝোলাটার দিকে তাকাল, পেট জ্বলছে। গুপ্তধন পরে খোঁজা যাবে, এসো আগে পেট ঠান্ডা করি।

খিদে নেই, বলল মরগান।

কেন?

কঙ্কালটা দেখে মন খারাপ হয়ে গেছে।

ও।

নীলমুখো শয়তানটার কথা ভাবলেই গায়ে কাঁটা দেয় এখনও। হ্যাঁ, ফ্রিন্টের কথাই বলছি।

অতিরিক্ত রাম গেলার ফল, বলল জর্জ। মুখ তো নীল হবেই।

ব্যাটা সত্যিই মরেছে তো? সন্দেহ ডিকের গলায়।

বিলি তো বলেছে, মরেছে। লাশের চোখের ওপরে নাকি দুটো তামার পয়সাও রেখে দিয়েছিল বিলি। ওই ব্যাটাও ফ্লিন্টের চেয়ে কম যেত না। শেষ পর্যন্ত ও-ও মদ খেয়েই মরল… আচমকা বাধা পেয়ে থেমে গেল মরগান।

আমাদের সামনের জঙ্গল থেকে ভেসে আসছে হালকা গলায় কাঁপা কাঁপা গানের সুর। সেই গানঃ

মরা মানুষের সিন্দুকটার…

মুখ থেকে রক্ত সরে গেছে ডাকাতদের। আতঙ্কে বড় বড় হয়ে উঠেছে চোখ।

ফ্লিন্ট! ফিসফিস করে বলল মরগান। কোটর ছেড়ে যে কোন সময় ঠিকরে বেরিয়ে আসবে যেন তার চোখ দুটো, হলপ করে বলতে পারি, এ ফ্লিন্ট ছাড়া কেউ না!

যেমন শুরু হয়েছিল, তেমনি আচমকা মাঝপথেই থেমে গেল গান। গায়কের মুখ চেপে ধরেছে যেন কেউ! পাহাড়ের ঢালে পাইনের সবুজ মাথায় কড়া রোদ, প্রকৃতির মহান বিশালতা, পেছনে মাটিতে আর ঝোপের ওপরে পাইনের ছায়ার আলপনা, স্তব্ধ দুপুর, এই সময় এই আচমকা গান শুরু হয়ে বন্ধ হয়ে যাওয়া কেমন যেন ভৌতিক অনুভূতির ছোঁয়া লাগাল সবার মনে। এমনিতেই অদ্ভুত প্রভাব ফেলেছে ফ্লিন্টের চিন্তা আর ওই কঙ্কাল, এখন এই গান একেবারে বিমূঢ় জড় করে দিল যেন সবাইকে। স্তব্ধ হয়ে গেছে বেশি কথা বলা তোতাটাও।

রক্তশূন্য পাঁশুটে ঠোঁটে কথা জড়িয়ে যাচ্ছে এমনকি সিলভারেরও, এত ভয় পেলে চলবে না! প্রেতাত্মা গান গাইতে পারে না, এ নিশ্চয় কোন জ্যান্ত মানুষ! ফ্রিন্টের স্বর নকল করছে!

আবার শোনা গেল গান! না না, গান নয়, কান্নার সুরে চেঁচিয়ে কথা বলছে কেউ! ডারবি ম্যাগ্র! ডারবি ম্যাগ্র! হঠাৎই যেন গালাগালি দিয়ে উঠল কণ্ঠস্বরটা, রাম নিয়ে আয়, ডারবি?

এর বেশি আর সইতে পারল না একজন ডাকাতের স্নায়ু। কেঁদে ফেলল সে, আর না, আর না, বারবিকিউ, আর এগোব না! চল ফিরে যাই!

ঠিক এভাবেই, এই সব কথাই বলত ফ্লিন্ট! ফিসফিস করে বলল মরগান।

বাইবেল বের করে মন দিয়ে পড়তে শুরু করেছে ডিক, কাপছে থরথর করে।

পাহাড়ের কন্দরে কন্দরে প্রতিধ্বনিত হতে থাকা আজব কণ্ঠস্বর গভীর মনোযোগ শুনছে সিলভার। তারপর হঠাৎ হেসে উঠল হো হো করে, ব্যাটা জমিয়েছে ভাল! এই, এই মরগান, ও ফ্লিন্ট নয়। কিন্তু অনেকটা ফ্লিন্টের মতই বলছে। বল তো, মানুষের গলা আর বলার ভঙ্গি নকলে ওস্তাদ আমাদের মাঝে কে ছিল?

একটু ভাবল মরগান। মুখ তুলে সিলভারের দিকে চাইল, বেন গান নয়ত?

হ্যাঁ, বেন গানই, মাথা ঝাঁকিয়ে সায় দিল সিলভার। ওই হারামজাদাই। আমাদের ভয় দেখাচ্ছে শুয়োরটা।

চল, কর্কশ চাপা কণ্ঠে খেঁকিয়ে উঠল জর্জ মেরি। চল যাই! ব্যাটাকে প্যাদানি দেয়া দরকার আচ্ছা করে!

সবারই মুখে রক্ত ফিরে এসেছে আবার, ডিক ছাড়া। এখনও বাইবেলের দিকে তাকিয়ে বিড় বিড় করছে ও, মাঝেমধ্যে মুখ তুলে তাকাচ্ছে নিচে, পাহাড়ের পাদদেশের দিকে।

কপাল ভাল তোমার, ও বেন গান, টিটকিরি মারল সিলভার। নইলে, ফ্রিন্টের ভূত হলে তোমার ঘাড়ই আগে ভাঙত। শুনেছি, পাতাছেঁড়া বাইবেলকে ভয় পায় না ভূতেরা। হাসল আবার সে। কিন্তু তবু হাসতে পারছে না ডিক।

ক্ৰাচটা নিয়ে উঠে দাঁড়াল সিলভার। আমাদের নিয়ে রওনা দিল আবার।

খাড়াই বেয়ে ওঠার চেয়ে নামা সহজ। কাজেই চলার গতি দ্রুত হয়েছে আমাদের। ছোট বড় পাইনের জঙ্গলের ভেতর দিয়ে এগিয়ে চলেছি আমরা। ম্যাপ দেখে দেখে একটা জায়গায় এসে দাঁড়াল সিলভার। আকাঙিক্ষত লম্বা পাইন গাছ খুঁজছে। বেশি খুঁজতে হল না। ঝোপের মাথা ছাড়িয়ে আকাশ ফুঁড়ে উঠে গেছে যেন দানবীয় পাইন, দুশো ফুটের কম হবে না লম্বায়।

ক্রাচে ভর দিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে গিয়ে গাছটার কাছে এসে দাঁড়াল সিলভার। নিচের দিকে তাকিয়ে চোখ বড় বড় করে কি যেন দেখছে। গুপ্তধন পেয়ে গেল নাকি?

ছুটে গেলাম। ডাকাতেরাও ছুটে এসে দাঁড়াল গাছের গোড়ায়। কিন্তু একি!

পাগলের মত মাটিতে ক্রাচ ঠুকছে সিলভার। জোরে জোরে মাথা নাড়ছে এদিকওদিক।

গাছের গোঁড়ায় মাটিতে বিশাল এক গর্ত। গর্তের ভেতর পড়ে আছে মরচে পরা একটা কোদাল। প্যাকিং বাক্সের ভাঙা কাঠ ইতস্তত ছড়ানো। একটা কাঠের টুকরোর গায়ে লোহা পুড়িয়ে ছ্যাকা দিয়ে নাম লেখা রয়েছেঃ ওয়ালরাস।

ফ্লিন্টের জাহাজের নাম! চাপা কুদ্ধ গলা মরগানের। কিন্তু গুপ্তধন কোথায়? নিয়ে গেছে কেউ!

টপাটপ গর্তের ভেতরে লাফিয়ে নামতে শুরু করল ডাকাতেরা।

বিপদটা পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারল সিলভার। আস্তে করে সরে এল কয়েক পা। পকেট থেকে পিস্তল বের করে আমার দিকে বাড়িয়ে ধরল, নাও, রাখ এটা। ব্যবহারের সময় এসেছে।

পাগলের মত গর্তের তলায় ধনরহের সন্ধানে ব্যস্ত ডাকাতেরা। কিন্তু কিছু নেই। সোজা হয়ে দাঁড়াল মরগান। তীব্র দৃষ্টিতে চাইল সিলভারের দিকে। দুচোখে আগুন। ভয়ঙ্কর গলায় চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, এই তোমার মোহর! বারবিকিউ, আর না, এইবার তোমাকে শেষ করব আমি।

তাই, না? হাসছে সিলভার। কিন্তু খোঁজা তো শেষ হয়নি। আরও ভাল করে দেখ দোস্ত, আলুটালু কিছু পেয়েও যেতে পার। আর কিছু না হোক, পুড়িয়ে তো খেতে পারবে।

লাফ দিয়ে পিস্তল বেরিয়ে এল মরগানের হাতে। খবরদার, শুয়োরের বাচ্চা! তোর জন্যেই আজ এই অবস্থা আমাদের!

মোহর খোঁজা রেখে সোজা হয়ে দাঁড়িয়েছে ডাকাতেরা। জর্জের হাতেও পিস্তল বেরিয়ে এসেছে। আমি বা সিলভার কেউই পিস্তল বের করতে পারিনি, পকেটেই রয়ে গেছে।

ক্রাচে ভর দিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে সিলভার। চোখের পাপড়ি পর্যন্ত কাঁপছে না তার। স্থির চেয়ে আছে মরগানের পিস্তলের দিকে। ধীরে ধীরে বলল, উই, আমার নয়, তোমাদের ভুলেই আজ এই অবস্থায় পড়েছ। মোহর তো পেলেই না, প্রাণ নিয়ে দেশে ফিরতে পার কিনা দেখ!

সঙ্গীদের উদ্দেশে বলল জর্জ, বন্ধুরা, এই ল্যাঙড়া হারামজাদা ঠকিয়েছে আমাদের! ওকে শেষ করে দেয়া উচিত, এখুনি। আর ওই বিচ্ছুটার চোখ উপড়ে না নিলে শান্তি পাব না। ওটাই আসলে যত নষ্টের মূল…

ঠিক এই সময় গর্জে উঠল বন্দুক। আমাদের একপাশে ঝোপের ভেতর থেকে গুলি করছে কারা যেন। উল্টে গর্তের ভেতরে পড়ে গেল জর্জ। তার পাশে দাঁড়ানো ডাকাতটাও দুই হাত শূন্যে তুলে চিত হয়ে পড়ল কাটা কলাগাছের মত। কর্কশ কণ্ঠে চেঁচিয়ে উঠল সিলভারের কাঁধের তোতাটা।

চকিতে যা বোঝার বুঝে নিল মরগান। পাক খেয়ে ঘুরেই ছুটে অদৃশ্য হয়ে গেল পাশের ঝোপটার ভেতরে। তার সঙ্গে সঙ্গেই ঝোপে ঢুকে গেল অন্য দুই ডাকাত। ঝোপঝাড় ভেঙে তাদের দ্রুত ছুটন্ত পায়ের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। পালাচ্ছে।

গর্তের ভেতর নিথর পড়ে আছে একটা ডাকাত। আহত জর্জ মেরি হাত-পা ছুঁড়ছে, পিস্তলের এক গুলিতে তাকেও সঙ্গীর মতই নিথর করে দিল সিলভার।

ওদিকে নাটমেগ ঝোপের ভেতর থেকে ছুটে বেরিয়ে এসেছেন ডাক্তারচাচা, হাতের বন্দুকের নল থেকে ধোঁয়া বেরোচ্ছে এখনও। তার পেছন পেছনই বেরিয়ে এল বেন গান আর গ্রে।

পালিয়ে যাওয়া তিন ডাকাতের গমনপথের দিকে নির্দেশ করে বললেন ডাক্তারচাচা, ওদের পালাতে দেয়া যাবে না। নৌকা দুটো দখল করে নিলে সর্বনাশ হবে! নৌকা ছাড়া আমরা অচল। বলেই ছুটলেন।

গ্রে আর বেন গান ছুটছে ডাক্তাচাচার পিছু পিছু। আমিও ছুটলাম। ক্রাচে ভর দিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে আমাদের সঙ্গে থাকার প্রাণপণ চেষ্টা করছে সিলভার। তার কাঁধের তোতাটা সমানে চেঁচাচ্ছে।

ছুটতে ছুটতে নৌকা দুটোর কাছে এসে দাঁড়ালাম আমরা। কিন্তু তিন ডাকাতের দেখা নেই। অন্য কোন দিকে পালিয়েছে ওরা, কিংবা গা ঢাকা দিয়েছে আশেপাশেই।

অনেক খোঁজাখুঁজি করেও ওদের পাওয়া গেল না। বোঝা গেল, অন্যদিকে সরে পড়েছে।

বন্দুকের কুঁদো দিয়ে পিটিয়ে আধভাঙা নৌকাটার তলাটা একেবারেই খসিয়ে দিলেন ডাক্তারচাচা। আমাদের পাঁচজনের জন্যে মোটামুটি অক্ষত বাকি একটা নৌকাই যথেষ্ট। নৌকায় চেপে বসলাম আমরা।

চলতে চলতে ডাক্তারচাচা জানালেন, এখন আমরা বেন গানের গুহায় চলেছি। ওখানেই মাটির তলায় ফ্লিন্টের সমস্ত ধনরত্ন লুকিয়ে রেখেছে বেন গান। পাইনের গোঁড়া থেকে ওগুলো ও-ই তুলে নিয়ে গেছে, আমরা ট্রেজার আইল্যান্ডে আসার অনেক আগেই। দুর্গ থেকে বেরিয়ে এসে এই কয়দিন তারা বেন গানের গুহাতেই থেকেছেন। ডাকাতদের নজর অন্যদিকে ফিরিয়ে রাখার জন্যে, বিশেষ করে খামোকা খুনখারাবি বন্ধ করার জন্যেই গুপ্তধনের নকশা সিলভারের হাতে তুলে দিয়ে এসেছেন ডাক্তারচাচা। তাছাড়া তখন আর নকশাটার কোন মূল্য ছিল না, কারণ ধনরত্ন তো সব আগেই সরিয়ে ফেলা হয়েছে। আমি সঙ্গে না থাকলে ডাকাতদেরকে গুলি করারও কোন প্রয়োজন পড়ত না। ডাকাতদের ভয় পাইয়ে দেবার জন্যে ফ্রিন্টের অনুকরণে বেন গানের ডাকাডাকির কৌশলটা সত্যিই অভিনব, স্বীকার করলেন ডাক্তারচাচা।

গুহার ভেতর বন্দুক নিয়ে তৈরি হয়ে বসে আছেন জমিদার ট্রেলনী, ক্যাপ্টেন স্মলেট আর জয়েস, কোন উপায়ে ডাকাতেরা গুহা আর ধনরত্নের খোঁজ জেনে গিয়ে যদি গুহায় হানা দেয়, তো বাধা দেবেন। আমাদের দেখে বেরিয়ে এলেন তাঁরা।

এরপরে কি হল, সংক্ষেপে শেষ করছি। মাটি খুঁড়ে সমস্ত ধনরত্ন আবার বের করা হল। অসংখ্য সোনার বাট, তার দাম অনুমান করা আমার সাধ্যের বাইরে। তাছাড়া আছে ছোট ছোট কয়েক বস্তা মোহর। পৃথিবীর প্রায় সমস্ত দেশের মোহরই আছেঃ ইংল্যান্ড, ফরাসী, স্পেন, পর্তুগাল ইত্যাদি সব দেশের। আছে জর্জ, লুই, ডাবলুন ইত্যাদি সব জাতের, বিচিত্র আকারের বিচিত্র ওজনের সব মোহর। রাজরাজড়াদের ছবি খোদাই করা ওগুলোতে। কোনটা গোল, কোনটা চারকোণা। কোন কোনটাতে আবার ফুটো করা, ভেতরে চেন ঢুকিয়ে গলায় ঝোলানোর জন্যে।

মোহর, সোনার বাট নিয়ে গিয়ে হিসপানিওলায় তুললাম আমরা। জোয়ার আসায় চরা থেকে নেমে গিয়েছে জাহাজটা, ভাটার সময় আবার আটকেছে, এমনি করে গেছে গত কয়েকটা দিন। প্রায় বদ্ধ খড়ির সঙ্কীর্ণ মুখ দিয়ে আপনাআপনি বেরিয়ে যেতে পারেনি, কাজেই এ যাত্রা রক্ষা পেয়ে গিয়েছি আমরা।

পাহাড়ি ঝর্না থেকে প্রচুর মিঠে পানি বোঝাই করে নিয়েছি জাহাজের পিপেগুলোতে। খাবার হিসেবে নিয়েছি শিকার করা বুনো ছাগলের ধোঁয়ায় শুকানো মাংস। আর নিয়েছি প্রচুর বুনো ফলমূল।

মরগান আর তার দলবল আমাদের আক্রমণ করতে আসেনি আর। সাহসই করেনি। আর করবেই বা কি করে? ওদের গোলাবারুদ নেহাতই সামান্য। এত অল্প রসদ নিয়ে আমাদের আক্রমণ করার দুঃসাহস দেখায়নি আর। ওদেরকে দ্বীপেই নির্বাসন দিয়ে এসেছি আমরা। ডাক্তারচাচা অবশ্য অনেক দয়া দেখিয়েছেন। আসার সময় দুর্গে কয়েক বস্তা ময়দা, প্রয়োজনীয় কাপড়-চোপড়, ওষুধ, কিছু গুলি, বারুদ ইত্যাদি রেখে এসেছেন তিন ডাকাতের জন্যে। এই দিয়ে যে কয়দিন বাঁচতে পারে তারা, বাঁচুক। সিলভারকে কিন্তু সঙ্গে নিয়ে এসেছি আমরা।

দেশে ফিরে ধনরত্ন সব ভাগাভাগি করা হয়েছে আমাদের মাঝে। আমাদের বলতে আমি, ডাক্তারচাচা, জমিদার ট্রেলনী এই তিনজন। ক্যাপ্টেনকে অভিযানের কয়েক মাসের পুরো বেতন প্রচুর বোনাসসহ বুঝিয়ে দিয়েছেন জমিদার। বেন গানকে এক হাজার পাউন্ড দেয়া হয়েছে, কিন্তু তিন সপ্তাহের মধ্যেই মদ খেয়ে আর জুয়া খেলে সব টাকা উড়িয়ে দিয়েছে সে, তারপর পথের ভিখিরি। ভিক্ষে করেই কাটিয়েছে জীবনের বাকি দিনগুলো।

আব্রাহাম গ্রেকেও কিছু টাকা দেয়া হয়েছে। সত্যিই ভাল হয়ে গিয়েছে সে। মোটামুটি পড়ালেখা শিখেছে, ব্যবসাও করেছে কিছু দিন। তারপর একটা চমৎকার জাহাজের আংশিক মালিকানা কিনে নিয়েছে। ওই জাহাজেই মেটের কাজ করে এখন। বিয়ে করেছে, সন্তানের পিতা হয়েছে। সুখেই আছে সে।

যেহেতু আমার প্রাণ রক্ষা করেছে লঙ জন সিলভার, দেশে ফিরে তাকে পুলিশের হাতে তুলে দিলেন না ডাক্তারচাচা। বরং কিছু টাকা দিয়ে সাহায্য করলেন, পালিয়ে যাবার সুযোগ করে দিলেন। তবে এই বলে শাসিয়ে দিলেন, যদি আমাদের এলাকায় তাকে আবার কখনও দেখা যায়, ভাল হবে না। এরপর আর ছাড়বেন না, পুলিশের হাতে দেবেনই। সেই যে কোথায় নিরুদ্দেশ হয়ে গেছে সিলভার, আর কোন খোঁজ পাইনি তার।

আজও, ভয়ঙ্কর ঝড়ের রাতে যখন ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠে সাগর, ফুঁসে উঠে তীরে এসে আছড়ে পড়ে উত্তাল ঢেউ, ঘুমের ঘোরে দুঃস্বপ্ন দেখে আঁতকে উঠি আমি। খোঁড়া এক জলদস্যু ক্রাচ বগলে নিয়ে তাড়া করে আমাকে। সেই ডাকাতের চেহারার সঙ্গে সিলভারের কোন মিল নেই। কিন্তু আশ্চর্য! খোঁড়া দানবের কাঁধে সিলভারের ক্যাপ্টেন ফ্রিন্টের মতই একটা তোতাপাখি বসা থাকে। কুৎসিত কর্কশ গলায় একটানা চেঁচাতে থাকে ওটাঃ পিসেস অভ এইট, পিসেস অভ এইট, পিসেস অভ এইট…

***

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *