২১-২৩. এরফানের নাটকীয় ভাবে জেল

এরফানের নাটকীয় ভাবে জেলে ফিরে আসায় সকাল থেকে শহরটা উত্তেজনায় একেবারে টগবগ করে ফুটছে। নতুন পরিস্থিতি অনেক নাগরিককেই বেশ ভাবিয়ে তুলেছে।

ভিতরে ভিতরে কিছু একটা চক্রান্ত চলেছে, কাভানার কাছে নিজের মত প্রকাশ করল ফেনটন। আজ এমন কিছু লোককে মদ খেতে দেখা যাচেচ্ছ যাদের কাছে কোনদিনই মদ কেনার মত পয়সা আগে ছিল না। আমার সেলুনেও আজ কিছু গ্রীজার এসেছে যাদের গতকালও পয়সা দিতে পারবে না জেনে আমি কান ধরে বের করে দিতাম।

ওই জেমস লোকটার ঘাড়ে কি ভূত চেপেছিল যে সে এভাবে আবার ফিরে আসতে গেল? প্রশ্ন করল ষ্টোরকীপার।

লোকটা ভাল মানুষ-পালাবার লোক নয়, বলল সেলুন মালিক। কিন্তু মুশকিলটা হচ্ছে ন্যায় বিচার ও পাবে না।

তুমি ঠিক কথাই বলেছ। স্টোরের ওপর তুমি একটু নজর রেখো, আমি, সেই এরফান কাম এগেইনে একটা ফুঁ মেরে দেখে আসি আপটন ওখানে কি করছে।

স্টোরের মালিক রাস্তা ধরে এগোবার সময়ে লক্ষ করল চার দিকেই অসন্তোষের নিদর্শন সুস্পষ্ট। পাঁচ-ছয়জনের ছোটছোট চত্রে উত্তেজিত তর্ক বিতর্ক চলছে। প্রতি জটলার কেন্দ্রেই বার বির, একজন বা দুজন লোক রয়েছে।

বার্ট পুরো শহরের লোককে খেপিয়ে তুলছে, কিন্তু এর পিছনে উদ্দেশ্যটা কি? নিজেকেই প্রশ্ন করল কাভানা।

সেলুনের দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকে দেখল বারের সামনে উত্তেজিত খদ্দেরের ভিড় থেকে দূরে কোনায় একটা টেবিলে বার্ট একজন লোককে আপ্যায়ন করছে। লোকটা চিকন আকৃতির ভগ্ন চেহারার একটা মানুষ। বয়স প্রায় পঞ্চাশের কাছাকাছি। গলায় নেক-টাইয়ের বদলে বাঁধা রুমালে। কাঁপা আঙুলে ওটা বাধার যথেষ্ট আভাস দেখা যাচ্ছে। ফোলা মুখ, আর চোখ দেখেই বোঝা যায় লোকটা মদে কতটা আসক্ত। লোকটার পরনে রয়েছে চকচকে কালো কোট। ট্রাউজার্স উঁচু বুটের ভিতর ঢুকানো রয়েছে। এই লোকটাই জাজ আপটন। নিজের যোগ্যতায় সে জাজের পদ অর্জন করেনি, রাজনৈতিক দড়ির টানই তাকে ওই পদে বসিয়েছে। অনেক অযোগ্যতা সত্ত্বেও আজও সে পদটা উঁচু মহলের প্রভাবেই বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। কাভানা তাদের কথাবার্তা শুনতে পাচ্ছে না-যদি শুনতে পেত তাহলে সে তার প্রশ্নের জবাব পেয়ে যেত।

তুমি খুব ভাল একটা সময়ে হোপে এসে হাজির হয়েছ, জাজ, গ্লাসটা আবার ভরে দেয়ার সময়ে বলছিল বার্ট। ঠিক তোমার মত একটা লোকই এখন এই শহরের দরকার।

নিজের চেয়ারে উৎসাহের সাথে সোজা হয়ে বসল, আপটন। একজন জনসাধারণের নগণ্য সেবক হিসেবে নাগরিকদের স্বার্থে আমার পক্ষে যতটা সম্ভব তা আমি করব, মিস্টার বার্ট, বলল সে। আমি কিভাবে?

এখানে বিচারের অপেক্ষায় একজন জঘন্য ক্রিমিন্যাল জেলে আটক রয়েছে, ওকে জানাল বার্ট। লোকটা ভয়ানক প্রকৃতির-গতকাল সে জেল থেকে পালিয়েছিল, কিন্তু ওকে শেরিফ আবার ধরে এনেছে। মিথ্যে কথাটা বলতে বার্টের মুখে একটুও বাধল না।

ওর অপরাধটা কি? প্রশ্ন করল আপটন।

ও এখানকার ব্যাঙ্কটা লুট করার সময়ে ম্যানেজারকে গুলি করেছে, আমার এক অন্তরঙ্গ বন্ধুকেও সে খুন করেছে, ঠাণ্ডা মাথায় কথাগুলো বলল বার্ট। এগুলো যদি যথেষ্ট না হয় তাহলে আরও অনেক চার্জ ওর বিরদ্ধে আছে।

ঈশ্বর আমাদের মাথাপ্রতি মাত্র একটাই গলা দিয়েছেন, তাই একবার ফাঁসি দেয়াই একজনের জন্যে যথেষ্ট, রসিকতা করে বলল আপটন। তুমি ওকে রাজধানীতে পাঠাচ্ছ না কেন?

পথে পালাবার সুযোগ দেয়ার জন্যে, নাকি সাজানো জুরির কাছ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যে, কারণ ওর খুঁটির জোর আছে বলে, আঁ? বার্ট পাল্টা জবাব দিল। না, স্যার, এই শহর নিজেদের বিচার নিজেরাই করতে সক্ষম। তোমাকে আগেই বলেছি, এই লোকটা সাংঘাতিক মানুষ। হয়ত তুমি শুনে অবাক হবে যে এই লোকটাই আউটল বিদ্যুৎ এরফান।

এটা শুনে আপটন সত্যিই অবাক হলো, তার শূন্য চোখ দুটো বিস্ফারিত হলো। কিন্তু আমি শুনেছি লোকটা এখন গভর্নরের হয়ে কাজ করছে, মন্তব্য করল সে।

তাহলেই বুঝতে পারছ ওর খুঁটির জোর কোথায়, বিজয়ের সুরে বলল বার্ট। তাহলে বুঝতেই পারছ কোথায় ওর জোর।

ওটা যদি ওর এখানেও থেকৈ থাকে- সন্দিগ্ধ আপটন বলতে শুরু করেছিল।

কিন্তু বাধা দিয়ে বার্ট বলে উঠল, ওর তা নেই, ওর কেসটা একেবারে নির্ভেজাল সত্য, এর থেকে ওর বেরোবার কোন রাস্তা নেই। ওর বিরুদ্ধে সব সাক্ষ্য প্রমাণই আমাদের হাতে আছে; বলতে গেলে এই কেসটা একেবারে সমাপ্ত। তোমার কেবল ওর বিচার করতে হবে, জুরি আগে থেকেই বাছাই করে রাখা হয়েছে। তুমি কেবল বিচার করবে, বাকিটা জুরি দেখবে।

এই অশুভ ইঙ্গিতে আপটন একটু চমকে উঠল। সে এমন কিছু মোটেও আশা করেনি।

ভুলে যেয়ো না যে আমি যথার্থ আইন প্রয়োগ করার প্রতিনিধি।

তোমার কেবল বিচারের পরে ফাঁসির রায় দিতে হবে। একবার ওই আদেশ দেয়ার পর ওর কি ঘটে তা তোমার দেখার কোন প্রয়োজন নেই।

কথাটার মধ্যে প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিতটা বুঝে চোখ তুলে তাকিয়ে বাটের কথার পুরো অর্থ বোঝার চেষ্টা করে বলল, তোমার ভোলা উচিত নয় যে আমি আইনের প্রতিনিধি, মিটার বাট। মর্যাদা বজায় রাখার একটা বৃথা চেষ্টা করল আপটন।

সেই কারণেই তো আমি তোমাকে এই বিচারের ভার নিতে বলছি, জবাব দিল র‍্যাঞ্চার। শোনো, জাজ এই শহরের লোকজন সবাই এই ডাকাতির ব্যাপারে উত্তেজিত হয়ে আছে। প্রায় সবাই টাকা হারিয়েছে-আমি কোনক্রমে ওদের এখনও ঠেকিয়ে রেখেছি। ওরা যদি সত্যিই খেপে ওঠে তাহলে লোকটাকে ধরে নিয়ে জোর করেই ফাঁসিতে ঝোলাবে। একজন শিক্ষিত এবং মাননীয় জাজ শহরে উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও যদি লোকটাকে বিনা বিচারে এভাবে মরতে হয়, যে ন্যায়সঙ্গত ভাবেই কাজটা করতে পারত, সেটা কি ভাল দেখাবে?

আপটন তার গ্লাসটা খালি করে কম্পিত হাতে ওটা আবার ভরল। পশ্চিমের অভিজ্ঞতা তার আছে; সে দেখেছে উজ্জ্বল হয়ে উঠলে জনতা কি করতে পারে। শহরে কিরকম উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে এটাও তার অজানা নয়। যেকোন একটা স্ফুলিঙ্গ থেকেই বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার খাতিরে হলেও তার দেখা উচিত যেন ন্যায্য বিচার করে অপরাধীকে তার পাওনা সাজা দেয়া হয়। বার্টের পরের কথা তাকে মনোস্থির করতে সাহায্য করল।

এর জন্যে অবশ্য দুশো ডলারের একটা পারিশ্রমিক দেয়া হবে, বলল সে। অবশ্য তুমি যদি এমারির জন্যেই আমাদের।

স্পারের খোঁচা খাওয়া ঘোড়ার মতই লাফিয়ে উঠল আপটন। বার্ট ভাল করেই জানে যে এমারিকে মোটেও দেখতে পারে না লোকটা।

তার কোন দরকার নেই, আমিই কেসটা নিচ্ছি, বলল সে।

খুব খুশি হলাম আমি, কারণ এমারি আসামীর বন্ধু, বলল বার্ট। তাছাড়া এমারি এই এলাকায় মোটেও জনপ্রিয় নয়। এটা অনেকেরই ধারণা যে লেজি এম দখল করার চক্রান্তে সে-ও আসামীর সাথে জড়িত।

অশুভ একটা আলো জ্বলে উঠল আপটনের চোখে। এতে অবাক হওয়ার কিছুই নেই। সাধারণত পরিষ্কার পানির তলাতেই কাদা থাকে। তুমি বিচারটা কখন শুরু করতে চাও?

আধঘণ্টা পর, জবাব দিল র‍্যাঞ্চার। বেশি দেরি করাটা কোনমতেই নিরাপদ হবে না। আমি মালিককে টেবিল সরিয়ে জায়গা করার নির্দেশ দিচ্ছি।

আপটন যে এখনই আসামীর বিচার করতে যাচ্ছে এই খবর দাবানলের মত শহরে ছড়িয়ে পড়ল। বেশিরভাগ লোকই সন্তুষ্ট হলো এতে। কারণ হোপে এর আগেও শহরে খুন হয়েছে এবং বিচারও হয়েছে, কিন্তু সরকারি জাজের বিচার কখনও হয়নি। তার সম্মানে বারটাকে যতটা সম্ভব কোর্টের রূপ দেয়ার চেষ্টায় কোন ত্রুটি রাখা হয়নি। জাজের ব্যবহারের জন্যে একটা টেবিল রাখা হয়েছে সামনে। ওটার দুপাশে কিছু চেয়ার রাখা আছে সমাজে সম্মানীয় লোকদের বসার জন্যে। একপাশে জুরিদের বসার জন্যে বারোটা চেয়ার সাজানো হয়েছে। জাঁজের টেবিল থেকে কিছুটা দূরে টেবিলের দিকে মুখ করে রাখা হয়েছে তিনটে চেয়ার; মাঝের চেয়ারে বসবে আসামী আর তার দুপাশে দুজন ডেপুটি পাহারায় থাকবে। ওটাই হবে কাঠগড়া। দর্শকের দল যে যেখানে পেরেছে দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়েছে।

যাকে গতরাতেই নির্মম ভাবে আঘাত করেছিল এরফান, সেই জৈকই ওকে দরজার কাছে এসে হাসি মুখে সবার প্রথম খবরটা জানাল যে আজ রাতেই ওর বিচার হতে যাচ্ছে। চেহারায় রাগের কোন চিহ্নমাত্র নেই।

সে বলল, নিজেকে বাঁচানোর জন্যে কি যুক্তি দেখাবে তা এখনই ঠিক রাখো, জেমস, জাজ শিগগিরই তোমাকে ডেকে পাঠাবে।

তাহলে জাজ এমারি ফিরে এসেছে? প্রশ্ন করল সে।

না, আপটন তোমার বিচার করবে। তোমারই কপাল খারাপ, নইলে এই সময় সে এখানে এসে হাজির হতে যাবে কেন?

এই সময়ে অন্য ডেপুটির গলা শোনা গেল। ওকে নিয়ে এসো, এইমাত্র নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ এসেছে।

মিছেই তোমার এতটা সময় নষ্ট করে দিলাম আমি, দুঃখের সাথে বলল জেক। চলো, য়াওয়ার পথেই না হয় কিছু ভেবে নিয়ে!

অবশ্যই এরফানের মাথায় বিভিন্ন রকম চিন্তা চলছে। দুপাশে দুজন সশস্ত্র গার্ড নিয়ে রাস্তার মাঝখান দিয়ে হাঁটছে সে। গতরাতের ঘটনা আর সুযোগের কথা বিচার করে এরফান ভেবেছিল হুজুগে মেতে ওঠা জনতার হাতে ফাঁসিতে ঝোলা ছাড়া তার আর অন্যকোন বিপদ এই মুহূর্তে নেই; হয় হোপে এসে জাজ এমারি তার বিচার করবে, অথবা তাকে বিচারের জন্যে স্টেটের রাজধানীতে পাঠানো হবে; কিন্তু এই মাতাল জাজের কাণ্ড ওর ভাল করেই জানা আছে, তাই তার হঠাৎ এখানে উপস্থিতি ওর কাছে মোটেও ভাল ঠেকছে না। এখন তার মনে হচ্ছে সে নিজের আউটফিটকে হোপ থেকে দূরে থাকার নির্দেশ না দিলেই ভাল করত-কিন্তু এখন আর ওকথা ভেবে কোন লাভ নেই।

অভিযুক্ত ব্যক্তির প্রবেশে কামরায় গুঞ্জন বেড়ে উঠল। দৃঢ় আত্মপ্রত্যয়ে ধীর পায়ে হেঁটে নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছে হ্যাট খুলে সে নিজের আসুনে বসল। ডেপুটি দুজন তাদের পিস্তল বের করে ওর দুপাশে তৈরি হয়ে বসল, কারণ এরফানের বাঁধন এখন খুলে দেয়া হয়েছে। সে প্রথমে জাজের দিকে একবার চেয়ে জুরিদের সবাইকে দেখল। ওদের আগেই বাছাই করে বসানো হয়েছে। সে নিজের অসহায় অবস্থা ভাল ভাবেই টের পাচ্ছে। ওদের বারোজনই বার্টের নিজস্ব লোক, এবং এই বিশেষ কারণেই ওদের বাছাই করা হয়েছে। ফেনটন, কাভানা, আর লরিকে সে দর্শকদের মধ্যে দেখতে পেল। আরও একজনকে খুঁজছে এরফান, এই সময়ে ইয়র্কিকে সে ঢুকতে দেখল। ওর পিছন পিছন ঢুকল বার বি র‍্যাঞ্চের চারজন লোক। ওর চেহারাই এরফানকে বুঝিয়ে দিল পুরো ঘটনা।

ইয়র্কির মাথায় খুন চেপে আছে, আঁচ করল সে। মনে হচ্ছে বিচারের কথা শুনেই ইয়র্কি লেজি এমের লোকজনকে আনতে যেতে ধরেছিল, পথে, ওই চারজন ওকে বাধা দিয়ে জোর করে এখানে নিয়ে এসেছে। বার্ট এই বিচার কোন কারণেই পণ্ড হতে দিতে চায় না।

জাজের টেবিলের দুপাশে পাগলা মাটি আর তার কিছু লোকের সাথে বসে বার্ট। তার চোখ থেকে উপচে পড়া খুশি ঢাকার কোন চেষ্টাই করছে না। কিন্তু তা সত্ত্বেও প্রত্যাশা নিয়ে বারবার বার্ট দরজার দিকে তাকাচ্ছে। এরফান জানে লোকটা ভাবছে এই খুশির মধ্যে ফোরম্যান কেন এখনও উপস্থিত হচ্ছে না। এরফান মনেমনে একটু হাসল। জাজের টেবিলে কাঠের হাতুড়ির বাড়িতে কোর্ট নীরব হলো।

এবার বলো, শেরিফ, আসামীর বিরুদ্ধে তোমার কি কি চার্জ আছে? প্রশ্ন করল জাজ।

উঠে দাঁড়িয়ে বুক ফুলিয়ে নিজেকে সম্মানিত প্রমাণ করার ব্যর্থ একটা চেষ্টা করল টেলর। আজ নিজের ওপর খুব সন্তুষ্ট সে।

অপরাধীর বিরুদ্ধে অনেক চার্জই আছে, জাজ, শুরু করল সে। মিস্টার মার্টিনকে হত্যার চেষ্টা, ব্যাঙ্ক-ডাকাতি এবং ব্যাঙ্কের ম্যানেজারকে গুলি করা, জ্যাক মাস্টারসনকে হত্যা, জেল থেকে পালানো-

ভাল, শুরু করার জন্যে এই কয়টাই যথেষ্ট, ওকে বাধা দিয়ে বলল আপটন। আমরা ব্যাঙ্ক-ডাকাতি আর খুনের বিচারই প্রথমে করব। সে যদি ওগুলোতে অপরাধী প্রমাণিত হয় তাহলে বাকি সব মাফ করে দিলেও কোন ক্ষতি নেই।

আপটনের তিক্ত রসিকতায় কামরার প্রায় সবাই হেসে উঠল। জাজ কেবল মুখ টিপে একটু হাসল।

কোর্টে প্রথমে ডাকাতির বিচারই করা হবে। তোমার সাক্ষীকে হাজির করো, শেরিফ।

ব্যাঙ্কার এগিয়ে এসে ডাকাতির বিবরণ দিল। জাজের প্রশ্নের উত্তরে সে জানাল কালো কাপড়ে মুখ ঢাকা থাকায় কারও চেহারা সে দেখতে পায়নি বটে, কিন্তু উচ্চতা গড়ন আর পোশাকে সে এই লোকটাও হতে পারে। জেমস ডাকাতির আগে তার টাকা তুলে নিলেও গ্রেপ্তার হওয়ার আগে যে নোটগুলো সে ভাঙাতে এসেছিল সেগুলো ডাকাতি করা টাকা।

আপটনের কঠিন দৃষ্টি এবার বন্দির ওপর পড়ল।

সাক্ষীকে তোমার কিছু জিজ্ঞেস করার আছে? প্রশ্ন করল জাজ।

উঠে দাঁড়াল এরফান। নিশ্চয়, বলে সাক্ষীর দিকে ঘুরে তাকাল সে। তুমি নিশ্চিত যে তোমাকে গুলি করেছিল সে আমার চেয়ে ছোট ছিল না?

নিশ্চয়, জবাব দিল ব্যাঙ্কার। এখন তোমার দিকে চেয়ে মনে হচ্ছে যেন সে তোমার চেয়ে বরং কিছু বড়ই ছিল।

মাথা ঝাঁকাল এরফান। তাহলে তুমি যখন তার চেহারা দেখতে পাওনি তখন সে আমার সমান বা আমার চেয়ে কিছু বড় ছিল। ওর চোখ কামরার চারপাশে একবার ঘুরে এলো। যেমন ধরো, মিস্টার বার্টের মত?

সাক্ষী জোর গলায় আপত্তি জানাল। প্রস্তাবটা সম্পূর্ণ অবাস্তব! তার পাঁচ হাজার ডলার আমার ব্যাঙ্কে জমা ছিল; সে এত দয়ালু মানুষ যে ওই টাকাও দাবি করেনি।

যদি সে নিজেই ডাকাতিটা করে থাকে তবে এতে তার কোন ক্ষতি হবে কি? যুক্তি দেখাল এরফানআর আমিই যদি ডাকাতি করি তবে আমি আবার টাকা তোলার কষ্ট কেন করতে যাব?

তুমি কেন তুলেছিলে? প্রশ্ন করল জাজ।

পকেট থেকে কাগজের টুকরোটা বের করে জাজের হাতে দিয়ে ব্যাখ্যা করল এরফান। কাগজটা পড়ে দেখে জাজ ওটা জুরিদের পড়ে দেখতে দিল। ওরা সবাই একে একে ওটা পড়ে দেখার পর ওদের একজন তিক্ত স্বরে মন্তব্য করল, এত বড় একটা খবর তুমি কেন গোপন রেখেছিলে?

ফেনটন লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল। জেমস ওই কাগজটা আমাকে আর টিমকে দেখিয়েছিল, বলল সে। এর পিছনে কোন সত্য আছে কিনা তা আমাদের তিনজনের কেউই জানতাম না। কিন্তু কেউ ঝুঁকি নিতে চাইনি বলে আমরা দুজনও সেদিন আমাদের সব টাকা তুলে নিয়েছিলাম। কেউ কি বলতে চাও ওই ডাকাতিতে আমরাও জড়িত ছিলাম?

অভিযুক্ত ব্যক্তি ছাড়া আর কাউকে কেউ দোষ দিচ্ছে না, বলে উঠল আপটন।

যদিও আড়ম্বরের সাথে জাজের জবাবে অনেকেই প্রভাবিত হলো, কিন্তু এতে এরফানের ঠোঁটে একটা ক্ষীণ হাসি ফুটে উঠল। ওখানেই তোমার ভুল হলো, জাজ, আমি অভিযোগ আনছি যে ওই তোমার পাশে বসা ব্ল্যাক বার্টই এই ডাকাতিটা করেছে। ওরই আমার বদলে এই জায়গায় বিচার হওয়া উচিত। আমার কাছে এর প্রমাণও আছে!

ওর এই মন্তব্যে দর্শকদের মধ্যে নড়াচড়া আর গলা বাড়িয়ে আরেকটু ভাল করে দেখার প্রবণতা বেড়ে গেল। এরফান নড় করে সম্মতি দেয়ায় ফেনটন বার বি থেকে নেয়া নোট বইটা ওর দিকে এগিয়ে দিল। অভিযোগটা বার্ট তাচ্ছিল্যের সাথে হেসে উড়িয়ে দিল।

কই, তোমার প্রমাণ বের করো, চিৎকার করল সে।

হিসেবের বইটা উঁচু করে ধরল এরফান। এটা তোমার? প্রশ্ন করল সে।

অবাক হয়ে চেয়ে রইল র‍্যাঞ্চার। হ্যাঁ, বলল সে, কিন্তু ওটা তোমার কাছে কিভাবে।

এর ভিতর লেখাগুলোও তাহলে তোমার?

অবশ্যই, কিন্তু ডাকাতির সাথে এর কি সম্পর্ক?

বলছি। ব্ল্যাক মাস্কের দল যখন আমার একজন লোককে তুলে নিয়ে যায়। তখন ওকে ফেরত পেতে হলে আমাকে কি করতে হবে সেটা জানিয়ে একটা নোট রেখে গেছিল। সেটা এই খাতারই একটা নাম্বার লেখা পৃষ্ঠা ছিঁড়ে লেখা হয়েছিল। এক নজরেই যে কেউ বলতে পারবে ছেড়া পৃষ্ঠার নাম্বার আর চিঠির পৃষ্ঠার নাম্বার আর হাতের লেখা হুবহু এক।

কোর্টে কোন রকম শব্দ নেই। বই আর কাগজটা আপটনের দিকে বাড়িয়ে দিল এরফান। জাজ ওগুলো ভাল করে পরীক্ষা করে দেখে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে বার্টের দিকে চাইল র‍্যাঞ্চার খুব দ্রুত চিন্তা করছিল; এবং জবাবটা যেন তার ঠোঁটের আগাতেই ছিল। সে চট করে জবাব দিল, ওই খাতাটা মাসখানেক আগে খোয়া গেছিল। ওটা হেনডন নামে একটা লোক আমার থেকে চুরি করেছিল, ওর আমার ওপর ব্যক্তিগত আক্রোশ ছিল। সে এখন লেজি এমে কাজ করে। লেখাটাও আমার লেখার চমৎকার অনুকরণ।

যেটা তুমি চিনতে অস্বীকার করেছিলে যখন আমি শেডিকে ধরে এনেছিলাম। ওকে মনে করিয়ে দিল এরফান।

ধ্যাৎ, ওটা আমি ভাল করে পরীক্ষাই করিনি, মিথ্যা বলল বার্ট।

অবশ্য বইটা চুরি যাওয়ার কথাটা সত্যি। ওটা গতরাতে আমি বার বি র‍্যাঞ্চহাউস থেকে নিয়ে এসেছি। তোমার জন্যে এটা আরও একটা চার্জ, শেরিফ, হাসি মুখে বলল এরফান। আমি বার্টের দেরাজের তালা ছুরি দিয়ে খুলে এগুলো পেয়েছি। এগুলো কি তার ব্যাখ্যা মিস্টার রাস্টন ভাল দিতে পারবে।

নোটের বান্ডিলটা ব্যাঙ্কারের দিকে বাড়িয়ে দিল এরফান। সে দেখল বার্ট আর আপটনের মধ্যে ফিসফিস করে কি যেন আলাপ হলো। জেসাপ বুঝতে পারছে এখানে তাকে যেকোন উপায়ে হারাবার উদ্দেশেই আনা হয়েছে; সম্ভবত লোকটা এখন জাজের ফি আরও বাড়িয়ে দিল। কিন্তু সে হাল ছাড়ার পাত্র নয়।

তোমার এসব করার উদ্দেশ্যটা কি? প্রশ্ন করল আপটন।

এতে ব্যাখ্যা করার কিছুই নেই, তিক্তস্বরে, বলল সে। ওই বই আর নোটিসটাই প্রমাণ করছে যে বার্টই হচ্ছে ব্ল্যাক মাস্কের দলপতি। প্রমাণগুলো সংগ্রহ করার পর স্বেচ্ছায় জেলে ঢুকতেও আমাকে ঝামেলা করতে হয়েছে। অনেক প্রত্যক্ষদর্শী ও ওর কথা সমর্থন করল। বার্ট তার চেয়ারে হেলান দিয়ে হাঁসল। সে সম্পূর্ণ নিশ্চিত যে জেমসের ছাড়া পাওয়ার কোন উপায়ই নেই।

চমৎকার, জেমস, তোমার বই চুরি করার বদলে নিজেই বই লেখা উচিত, বলল সে। ওর রসিকতায় সবাই হেসে উঠল। সে সেলুন মালিকের দিকে একটা অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকাতেই লোকটা অস্থায়ী ফোরম্যান হিসেবে বলে উঠল, শোনো, জাজ, এসব কথায়, এই মামলা কোন দিকেই এগোচ্ছে না।

ঠিক আছে, এবার তাহলে খুনের কেসটার দিকে এগোই, বলল আপটন। তোমাদের কি এ বিষয়ে কোন মতামত আছে?

কার খুন, আমার? ব্যঙ্গ করে এই মন্তব্য করল এরফান। আসলে তা-ই এখানে হতে যাচ্ছে এটা সবাই জানে। কারণ তার মৃত্যুতে আমার কোন লাভ নেই। যে এটা প্রমাণ করতে পারত সেই জাজ এমারি আজ এখানে উপস্থিত নেই।

তাকেই তো তোমার সহযোগী বলে সন্দেহ করা হচ্ছে, কঠিন স্বরে ঘোষণা করল আপটন। এবং তাকে যে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, এতেও সেই রকমই ধারণা হয়। এই চাকরির জুনে ও সেই তোমাকে সুপারিশ করেছিল, তাই না?

ওর মাধ্যমেই মাস্টারসনের সাথে আমার পরিচয়, স্বীকার করল এরফান।

এবং তুমি ওই চাকরিতে যোগ দেয়ার পরপরই মাস্টারসনকে আর পাওয়া যাচ্ছে না, বলে চলল জাজ। ওর রাইফেলটা তোমার কাছে কিভাবে এলো? হঠাৎ প্রশ্ন করে বসল সে।

এই প্রশ্নে এরফানকে হতভম্ব করে দেয়ার আশা করে থাকলে সে নিরাশ হলো। কারণ সাথেসাথেই সে মারিওকে হত্যা করে ওটা পাওয়ার কথা সরাসরি খুলে বলল।

ওটা সম্পূর্ণ মিথ্যা! চিৎকার করে উঠল বার্ট, ওকে কিছুদিন আগে মেক্সিকোতে দেখা গেছে-আমার ফোরম্যান তার সাক্ষ্য দিতে পারবে।

ক্ষীণ একটু হাসল এরফান। ওই লোকটা যে আর কোনদিন ফিরে আসবে এ ব্যাপারে সে নিঃসন্দেহ। পকেট থেকে আরও এক টুকরো কাগজ সে বের করল। ওটা আপটনের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে সে বলল, এটা বার্টের সাথে ওর যোগসাজস থাকার কথা প্রমাণ করবে।

ওটা এক নজর দেখেই বাটের দিকে সে অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকাল।

দেখা যাচ্ছে লেখালিখি তোমার বেশ প্রিয়। তুমি কি ওই গান পাওয়ার কথা আর কাউকে জানিয়েছ?

কেবল মিস মাস্টারসনকে, জবাব এলো।

এবং সে-ও নিখোঁজ; তোমার কথা যারা সত্য বলে প্রমাণ করতে পারে তাদের কাউকেই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। জাজ রুক্ষ স্বরে প্রশ্ন করল, আর কোন প্রমাণ আছে, শেরিফ?

এটা শেরিফের জন্যে কতৃত্ব ফলাবার বিরাট একটা সুযোগ, যার জন্যে সে আগে থেকেই তৈরি হয়ে আছে। সে গর্বের সাথে এগিয়ে এসে জানাল সে আর তার ডেপুটি বেসিন ধরে চলার পথে একটা ট্র্যাক দেখতে পেয়ে সেটা অনুসরণ করে কিভাবে নিখোঁজ র‍্যাঞ্চারের জামা-কাপড় খুঁজে পেয়েছে। একবারে একটা করে বের করে সে আপটনকে দেখাল। সবার শেষে সে বের করল ওই রাইফেলটা। এটা সে শেষ চমকের জন্যে রেখেছিল।

এসবের নিচে আমরা পেয়েছি এই মোক্ষম প্রমাণ, বলল সে। তারপর গর্বের সাথে চারপাশে তাকাল সে।

টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছে কামরায়। তোমরা লক্ষ করো এর বাঁটে ওর নামও খোদাই করা আছে।

এটা কি তোমার? রাইফেলটা এরফানকে পরীক্ষা করতে দিয়ে প্রশ্ন করল আপটন।

হ্যাঁ, ব্ল্যাক মাস্করা আমাকে বন্দি করার সময়ে ওটা আমার থেকে কেড়ে নিয়েছিল; তবে তখন ওটায় কোন নাম খোদাই করা ছিল না, বলল এরফান। তোমার লেখা যত ভাল, প্রিন্ট তত ভাল নয়, মিস্টার বার্ট।

জবাব খুঁজে বের করতে সে অত্যন্ত পটু, তাই না? যাদের উদ্দেশে এই প্রশ্নটা করা হয়েছে, সেই জুরিরা সবাই হেসে সমর্থন জানাল।

ফেনটন এগিয়ে এসে হাত তুলে প্রতিবাদ জানাল। আমি এই ট্রায়েল ন্যায্য হচ্ছে বলে মনে করি না, কারণ এটা এত তাড়াহুড়া করে করা হয়েছে যে অভিযুক্ত ব্যক্তি তার কেস ঠিকমত তৈরি করার কোন সুযোগই পায়নি বা তার সাক্ষাদেরও হাজির করতে সক্ষম হয়নি। বাদি পক্ষ ওর জ্যাককে মেরে ফেলার পেছনে কোন যুক্তিও দেখাতে পারেনি। এখানে যেসব নিদর্শন ওর বিরুদ্ধে রাখা হয়েছে তাতে ওকে একটা বোকা গাধা বলে দেখানো হয়েছে, কিন্তু আমরা সবাই জানি সে নয়। যে ব্যাঙ্ক থেকে ডাকাতি করা হয়েছে, সেই ব্যাঙ্কেই কোন পাগলে টাকা ভাঙাতে যাবে? আর সে যদি জ্যাককে খুন করেই থাকে তাহলে বদ্ধ পাগল না হলে কেউ কি তার ইনিশিয়াল করা রাইফেল ওই কাপড়ের তলায় রাখবে? আমি জুরির কাছে প্রশ্ন রাখছি, তোমাদের কি জেমসকে দেখে এতই বোকা মনে হচ্ছে?

আপটনের জবাবটাও ফেনটনের প্রশ্নের মতই চৌকয়া হলো।

মিস্টার ফেনটন জেমসের বন্ধু, সুতরাং সে। তার পক্ষে কথা বলবে এটাই স্বাভাবিক, সে জুরিকে বোঝাল। কিন্তু সে যা জানে না, সেটা হচ্ছে অত্যন্ত চালাক ক্রিমিন্যালেরও মাঝেমাঝে এমন ভুল করে বসায় আশ্চর্য হবার কিছু নেই-এমন অনেক কেসই আমি ডীল করেছি। এটা লেজি এম দখল করার একটা গভীর প্লট, তোমাদের যদি আরও নিদর্শনের প্রযোজন থাকে- বারের মালিক মাথা নাড়ল।

এবার বার্ট তার বোমাটা ফাটাল। তোমাদের মনে যদি এখনও কোন সন্দেহ থেকে থাকে তবে জেনে রাখো যে এই জেমস গ্রীনই হচ্ছে প্রসিদ্ধ আউটল বিদ্যুৎ এরফান।

একটা শিস আর সভয়ে শ্বাস টেনে জুরিরা তাদের শঙ্কা প্রকাশ করল। বার মালিক ওদের ফিসফিস করে কি যেন বলল। এতে ওরা ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল, আমাদের আলোচনা করার কিছু নেই-আমর রায় দিতে প্রস্তুত।

এবং তোমাদের রায়। পুরোপুরি দোয়ী।

আসামীর দিকে ফিরল জাজ। ওদের সিদ্ধান্ত তুমি শুনেছ, তুমি জুরির সিদ্ধান্তের ব্যাপারে কিছু বলতে চাও?

চোখ সরু করে আপটনের দিকে তাকাল সে। তুমি জাজ নামের একটা কলঙ্ক, স্যার, শান্ত ঠাণ্ডা স্বরে বলল এরফান।

মন্তব্যটা আপটনের মোটা চামড়াও ভেদ করল। ক্ষিপ্ত স্বরে বলল আপটন, ন্যায্য বিচারই করা হয়েছে তোমার। কিন্তু চেহারাটা একটু লাল হলো। ঠোঁটে একটা কুৎসিত ভাব ফুটে উঠল।

তোমাকে যথার্থই দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে, বলল সে। এখন যা বাকি রয়েছে সেটা হচ্ছে তোমার দণ্ডাদেশ দেয়া। তোমাকে যে সাজা আমি দিচ্ছি। সেটা হচ্ছে তুমি না মরা পর্যন্ত ফাঁসিতে ঝুলবে। তারপর টেলরের দিকে ফিরে বলল, শেরিফ, ওকে ক্যাপিটালে নিয়ে এই সাজা যেন কার্যকর করা হয়, এটা দেখার ভার তোমাকে দেয়া হলো।

সে ভাল করেই জানে এখন কি ঘটবে, তাই চতুরতার সাথে পুরো দায়িত্ব আরেকজনের কাঁধে চাপিয়ে আয়েশ করে চেয়ারে হেলান দিয়ে একটা চুরুট ধরাল। এক মুহূর্ত, নীরবতার পর এই আদেশের তাৎপর্য যখন সবার মাথায় ঢুকল তখন মুখের সামনে থেকে খাবার কেড়ে নেয়া জন্তুর মতই গর্জে উঠল রুষ্ট। জনতা। পাগলা মার্টি লাফিয়ে চেয়ারের ওপর উঠে দাঁড়াল।

জাহান্নামে যাক ক্যাপিটাল! আমাদের এখানেও দড়ি আর গাছের কোন অভাব নেই। ওখানে ওর প্রভাব আছে; ওখান থেকে আগেও সে বেঁচে গেছে। আবারও হয়ত তাই হবে। ওকে আমরাই ফাঁসি দিতে পারব।

ঠিক বলেছ, বলে উঠল আরেকজন। ওর সাথে সুর মেলাল আরও অনেকে।

বার্ট চুপ করে বসে আছে। ওর ঠোঁটের কোণে ঝুলছে নিষ্ঠুর, একটা সন্তোষের হাসি। টেবিলে হাতুড়ি ঠুকে নিজে একটা কথা বলার সুযোগ করে নিল আপটন।

শেরিফ, আইন রক্ষার জন্যে তুমি নিজে ব্যক্তিগত ভাবে দায়ী থাকবে, সাবধান করল সে।

আবার চিৎকার শুরু হলো। সম্প্রতি লব্ধ মান-সম্মান হারিয়ে শেরিফকেই এখন অভিযুক্ত আসামীর মত দেখাচ্ছে। হায্যের আশায় অনুনয়ের চোখে। বার্টের দিকে চাইল টেলর। লোকটা মাথা নেরে হাসল।

ওটা তোমার কাজ, শেরিফ, বলল সে।

দড়ি আর ঘোড়া, চিৎকার করল মার্টি। ওকে ধরে নিয়ে এসো, বয়েজ।

হুড়োহুড়ি বেধে গেল। যদিও কিছু লোক ওদের ঠেকাবার চেষ্টা করল, লোকজনের ধাক্কায় ওরা আর শেরিফসহ ডেপুটিরা সরে যেতে বাধ্য হলো। এরফানকে জোর করে ধরে খোলা রাস্তায় নামানো হলো।

এবার কোথায়? ডজনখানেক লোক প্রশ্ন তুলল।

ওকে হার্ভির ওখানে নিয়ে চলো, চিৎকার করে বলল মার্টি। ওখানকার ভূতগুলো আর একটা সঙ্গী পাবে।

এরফানকে ঘোড়ার পিঠে তুলে দিয়ে ওর গলায় একটা দড়ির ফাস পরিয়ে দেয়া হলো। ওকে ঘিরে আছে পিস্তল হাতে বারোজন লোক। যাত্রা শুরু হলো; পশ্চিমের উদ্ধৃঙ্খল জনতার সাথে জেসাপ পরিচিত। সুতরাং এটাই যে তার জীবনের শেষ রাইড হবে তাতে ওর মনে কোন সন্দেহ নেই।

যারা কোর্টরূমে ছিল তারা সবাই ওদের পিছু নিল। বার্ট যাচ্ছে শেরিফ আর আপটনের সাথে। জাজ যাচ্ছে কারণ সে জানে নিজের মান বাচাতে তাকে শেষ পর্যন্ত প্রতিবাদ করে যেতে হবে।

এরফানের চেহারা পাথরের মূর্তির মতই নির্বিকার। খেলায় সে হেরে গেছে, তাই তাকে এর মূল্যও দিতে হবে; যদিও সাজানো তাস দিয়ে খেলেছে ওরা।

ওখানে পৌঁছতে বেশি সময় লাগল না। মার্টিই লীড় করছিল, সে হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে উত্তেজিত স্বরে চিৎকার করে উঠল, আরে, ওখানে দেখছি আগে থেকেই একজন ঝুলছে!

একনজর তাকিয়েই ডোভারকে চিনল বার্ট। ওকে দড়ি খুলে নিচে নামাও, আদেশ দিল সে। তারপর বিষাক্ত দৃষ্টিতে এরফানের দিকে চেয়ে বলল, তাহলে। এই কাজেই তুমি গতরাতে জেল থেকে বেরিয়েছিলে? এর উচিত সাজাই তোমাকে দেয়া হবে, ওর জায়গায় এখন তুমি ঝুলবে।

কাজটা বেআইনী হবে, সাবধান করল আপটন। নিজের মান বাঁচাতে ওকে কথাটা বলতেই হলো।

গাছে উঠে ওকে দড়ি খুলে নিচে নামাল মার্টি।

এবার এরফানকে ঘোড়ার পিঠ থেকে টেনে নিচে নামানো হলো। আপটন লোক দেখানোর জন্যে শেরিফকে অনুরোধ করল ওদের ঠেকাতে। দোটানায় পড়ে শেরিফ কয়েক পা এগোল। তাকে বাধ্য হয়ে থামতে হলো কারণ তার মুখে পিস্তল ঠেসে ধরল ওদের একজন। সভয়ে পিছিয়ে এলো সে।

গাছ থেকে নেমে এসে আবার লীডারের ভূমিকা নিল মার্টি। সে এরফানের গলায় বাধা লম্বা দড়িটা ছুঁড়ে একটা ডালের ওপর দিয়ে ঘুরিয়ে নিচে নামাল। এরফান নির্বিকার চোখে ওকে ঘিরে দাঁড়ানো লোকগুলোর চেহারা একবার দেখল। ওদের পিছনে দেখা যাচ্ছে নিরুপায় অবস্থায় করুণ মুখে লরি দাঁড়িয়ে রয়েছে ফেনটন এবং আরও কয়েকজন সভ্য নাগরিকের পাশে। আপটন আর শেরিফ রয়েছে বার্টের পাশে। অদূরেই একটা গাছে হেলান দিয়ে দাড়িয়ে আছে ইয়র্কি। চেহারা দেখে মনে হচ্ছে যা ঘটছে তাতে ওর কোন কৌতূহল নেই। কিন্তু এরফান জানে, জীবন থাকতে সে ওকে মরতে দেবে না-শেষ পর্যন্ত লড়ে যাবে, তাতে যাই ঘটুক না কেন।

২২.

শহরের লোকজন তাদের মিশনে হার্ভির বাড়ির উদ্দেশে রওনা হওয়ার পরপরই নবাগত একটা লোক হোপে পৌঁছল। রাস্তা ধরে এগোবার সময়ে একটা লোকও তার চোখে না পড়ায় সে খুব অবাক হলো। একটা খোলা দরজার মুখে এক মহিলাকে দাড়িয়ে থাকতে দেখে লোকটা হ্যাট খুলে তাকে সম্মান জানিয়ে জানতে চাইল শহরে একটা লোককেও দেখা যাচ্ছে না কেন।

হ্যাঁ, সব পুরুষই ফাঁসি দেখতে গেছে, জানাল মহিলা। আট বছর বয়েসের ছেলে আমার, সেও ওদের সাথে যাবার বায়না ধরে বসেছিল। আমি মার দিয়ে ঠেকিয়ে না রাখলে সে-ও যেত।

ফাঁসি? পুনরাবৃত্তি কৃরল লোকটা।

হ্যাঁ, হ্যাঁ, ফাঁসি। আমার বিশ্বাস কথাটার মানে তুমি জানো, জবাব দিল সে। আজই ওর বিচার হয়েছে। ওকে ফাঁসি দিতে নিয়ে গেছে ওরা। লোকটা দেখতে চমৎকার, আমার কাছে ওকে খারাপ লোক বলে মনে হয়নি; তবে চেহারা দেখে অবশ্য সবসময় লোক চেনা যায় না। ওরা বলে সে নাকি ব্যাঙ্ক লুট করেছে, তার বসকেও খুন করেছে।

তাহলে তার ফাঁসিতে ঝোলাই উচিত, বলল স্ট্রেঞ্জার। তা ওই লোকটার নাম কি?

সে তো নিজেকে জেমস বলে পরিচয় দেয়, কিন্তু ওরা বলে সে নাকি আউটল বিদ্যুৎ এরফান।

কথাটা শুনে তার জিনের ওপর লোকটা সোজা হয়ে বসল। সে যখন আবার কথা বলল তখন তার স্বরটা তীক্ষ্ণ শোনাল।

এই ফাঁসিটা কোথায় দেয়া হচ্ছে?

হার্ভির ওখানে। এখান থেকে বেশি দূরে নয়। কাছাকাছি এত গাছ থাকতে ওরা যে ওখানে কেন গেল তা আমি জানি না।

পকেট থেকে একটা পাঁচ ডলারের নোট বের করে মহিলার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে লোকটা বলল, তোমার ছেলে যদি আমাকে পথ দেখিয়ে ওখানে নিয়ে যায় তবে আমি কথা দিতে পারি ওকে কোন ফাঁসি দেখতে হবে না।

ছোঁ মেরে টাকাটা নিয়ে হাঁক দিল মহিলা। জবাবে খালি পায়ে একটা ছোট বাচ্চা কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে এলো।

রেব, তুমি এই ভদ্রলোককে হার্ভির বাড়ি যাওয়ার পথটা চিনিয়ে দেবে। যদি শুনি তুমি ফাঁসি দেখেছ তবে তোমার পিঠের চামড়া আমি তুলে নেব, সাবধান করল মহিলা।

ঝুঁকে বাচ্চাটাকে ঘোড়ার পিঠে তুলে নিল লোকটা। সবথেকে তাড়াতাড়ি পৌঁছা’নোর পথটা দেখাবে। সময় মত পৌঁছে দিলে তুমি এক ডলার পুরস্কার পাবে। কিন্তু যদি দেরি হয়ে যায়—

কথাটা শেষ করল না সে, কিন্তু ওর স্বর থেকে মধুরতা বিদায় নিয়েছে, এবং ওর তীক্ষ্ণ  চোখেও কোন উষ্ণতা আর নেই।

*

পাগলা মার্টি নিজেকে এই নাটকের নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে নিলেও আসল নায়ক যে কে তা সবাই জানে। নিজের কোমরে হাত দুটো রেখে মার্টি এরফানের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়েছে। মুখে একটা অবজ্ঞার হাসি।

তোমার সাথে আমার বিরোধটার শোধ আমি আজ সুদে-আসলে তুলে নেব, জেমস, হিসহিসিয়ে বলল সে। তুমি ঝুলে পড়ার পর, এই চাবুক দিয়ে পিটিয়ে আমি তোমার সারা গায়ের চামড়া তুলে নেব!

তবু বার্টের সম্মতির অপেক্ষায় আছে সে। এই সময়ে গাছের ফাঁক গলে তিজন রাইডারকে বেগে ঘোড়া ছুটিয়ে এগিয়ে আসতে দেখে একজন চিৎকার করে উঠল, কারা যেন আসছে!

ওদের দিকে এক নজর তাকিয়েই একটা গালি দিল বার্ট।

ওকে ঝুলিয়ে দাও, আদেশ দিল সে।

খবরদার! বার্ট! হুঙ্কার দিয়ে উঠল ইয়র্কি। ওই দড়িতে প্রথম টানেই তুমি মরবে, একই সাথে মরবে মাটি!

ৰার্ট ঘুরে তাকিয়ে দেখল দুহাতে দুই পিস্তল নিয়ে পা ফাঁক করে দাঁড়িয়ে ওদের দুজনকেই কাভার করে আছে ইয়র্কি।

তুমি কে? এর মধ্যে তুমি কেন নাক গলাচ্ছ? গর্জে উঠল র‍্যাঞ্চার।

আমার নাম ইয়র্কি। আমি কেবল দেখতে চাই এখানে যেন কোন অন্যায় করা হয়। তোমরা দশ মিনিট পরেও ওকে ফাঁসি দিতে পারবে। কিন্তু তার আগে আমি জানতে চাই ওই লোকগুলো কি চায়। হয়ত ওরা ফাঁসিটা দেখতেই আসছে।

ইয়র্কিকে ওদের কেউ সামনা সামনি না দেখলেও ওর নামটা পশ্চিমের অনেকেই শুনেছে। এবং ব্যাঙ্ক থেকে জেমসকে গ্রেপ্তার করার সময়ে ওদের অনেকেই দেখেছে লোকটা কত ফাস্ট। বার্টও নতুন কোন উপায় ভেবে বের। করার আগেই রাইডার তিনজন এসে পৌঁছে গেল।

ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, আমরা সময় মতই এসেছি! হাঁপাতে হাঁপাতে বলল এমারি। ক্লান্ত ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে মেয়েটাকে নামতে সাহাৰ্য্য করল সে।

এক চোখে প্যাঁচ লাগানো তৃতীয় লোকটার দিকে কেউ নজর দিচ্ছে না। সবাই জাজ এমারি আর মেয়েটাকেই দেখছে। লোকটা নিচে নেমে বোকার মত এদিক ওদিক দেখছে। সোজা আপটনের দিকে এগিয়ে গেল জাজ এমারি।

এর মানে কি, আপটন? কঠিন সুরে প্রশ্ন করল সে। তুমি একটা অবৈধ লিঞ্চিঙে সাহায্য করছ, এমন একটা দৃশ্য আমাকে নিজের চোখে দেখতে হবে। এটা আমি ভাবতেও পারিনি!

অবশ্যই না; আমি এখানে এসেছিলাম ঠেকাতে, জবাব দিল সে।

আর মিস্টার বার্ট? সে-ও কি প্রতিবাদ করেছে?

আপটনের মুখটা লাল হয়ে উঠল। আমাকে সে সব রকম সাহায্য করেছে, আড়ষ্ট ভাবে বলল সে।

এমনকি তোমাকে আসতে দেখে তার লোকজনকে জুলদি কাজ শেষ করার আদেশও দিয়েছে, বলে উঠল ফেনটন।

তাই নাকি! ক্ষিপ্ত স্বরে বলল এমারি।

আমি জানতাম না ওটা তুমি, মিথ্যা বলে বার্ট সেলুন মালিকের দিকে অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করল। আমি ভেবেছিলাম ওর র‍্যাঞ্চ থেকে একটা উদ্ধার পার্টি আসছে। আমরা কোন ঝামেলা চাইনি। যাই হোক, তোমার আসায় কোন কিছু বদলেছে বলে আমি মনে করি না। এখানে আমাদের যা খুশি করার মত লোকবল আছে।

ব্যাপারটা তোমার আবার ভেবে দেখা ভাল, কারণ আমার যদি ভুল না। হয়ে থাকে তবে অনেক লোক এখনই এসে পৌঁছবে যাদের অনেক কথাই বলার থাকবে।

অনেকগুলো ঘোড়ার দ্রুত ছুটে আসার শব্দ এখনই শোনা যাচ্ছে। বার বি মালিকের মুখটা এক্স টি আর লেজি এমের বারো-চোদ্দজন কঠিন লোককে ছুটে আসতে দেখে গম্ভীর হলো। কিন্তু সে ভাবছে যদি লড়তেই হয় তাহলে লোকবল তারও আছে। সে উদ্ধত ভাবে এমারির দিকে ফিরে বলল, বিচারের রায় হয়ে গেছে, এখন তোমার আর করার কি আছে?

হোপ আমার এলাকার মধ্যে পড়েছে, সুতরাং আমি নতুন ভাবে কেসটা বিচার করার আদেশ দিতে পারি, জবাব দিল সে।

আপটনের মুখটা আবার লাল হয়ে উঠল। অপরাধী প্রমাণিত ব্যক্তির পুনর্বিচার নেহাত রীতিবিরুদ্ধ কাজ হবে, যুক্তি দেখিয়ে প্রতিবাদ জানাল সে।

ইতোমধ্যে বিপক্ষের লোকজন পৌঁছে গেছে। ওরা এরফানকে জীবিত দেখে উল্লাসে চিৎকার করছে।

ওর কথার জবাবে এমারি বলল, একজন নিরপরাধ লোককে ফাঁসি দেয়াটা অনেক বেশি রীতিবিরুদ্ধ হবে।

ফাঁসির সাজা প্রাপ্ত এই নাটকের নায়ক এরফান নির্বিকার চোখে দেখছে ঘটনা কোনদিকে গড়ায়। গলা থেকে ফসটা খুলে যে গাছে ওকে প্রায় ঝুলিয়ে দেয়ার জোগাড় করা হয়েছিল তাতেই হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে। ওর, বন্ধুরা টিমের নিচু স্বরের নির্দেশে ঘোড়ার পিঠেই অর্ধচক্রাকারে মুহূর্তে অ্যাকশনে নামার জন্যে তৈরি হয়ে অপেক্ষা করছে। বার্টের পক্ষের লোকজনও তৈরি লড়াই শুরু হওয়ার জন্যে, কেবল একটা স্ফুলিঙ্গই যথেষ্ট।

কেসটার পুনরায় বিচার কে করবে, আসামীর সহযোগী হিসেবে তুমি, নাকি নিরপেক্ষ জাজ আপটন? টিপ্পনী কেটে প্রশ্ন করল বার্ট।

তোমার ওই প্রশ্নের একটা মীমাংসা হয়ত আমি দিতে পারব জেন্টলমেন, শান্ত স্বরে বলল কেউ। এই লোকটাই শহরে ঢুকে কাউকে দেখতে না পেয়ে দরজায় দাঁড়ানো মহিলার সাহায্য নিয়েছিল।

এমারি ঘুরে তাকিয়ে বক্তাকে দেখল। চেহারা খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল তার। গভর্নর ব্লেক! অবিশ্বাসের সাথে বলে উঠল সে, জীবনে আমি কাউকে দেখে এত খুশি হইনি! তুমি হঠাৎ বিনা নেটিসে-

শক্ত বেঁটে লোকটা কাঁধ উঁচাল। এমনি ঘুরতে ঘুরতে চলে এলাম, বলল সে। তারপর পকেট থেকে একটা ডলার বের করে বাচ্চাটার হাতে দিতেই রেব ঘোড়ার পিঠ থেকে পিছলে নেমে এক ছুটে বাড়ির পথ ধরল। গভর্নরের সাথে একই ঘোড়ায় চড়েছিল সে! কথাটা সবাইকে জানাতে হবে না? এই এলাকায় একটা ছোট বাচ্চার জন্যে এটা বিরাট একটা গর্বের বিষয়। ডলারটা তো ওর একটা ফাও পাওনা।

আপটনের দিকে চেয়ে ব্লেক নড় করল, যার চেহারা এখন ঠিক পনিরের মতই সাদা দেখাচ্ছে। এবার ব্ল্যাক বার্টের দিকে তাকাল ব্লেক।

এমারি পরিচয় করিয়ে দিল। বার বির মালিক, মিস্টার বার্ট।

ওর কথা আমি শুনেছি, অতি সাধারণ সুরে বলল ব্লেক, কিন্তু হাত মেলাবার জন্যে হাত বাড়াল না।

বার্টের রোদে পোড়া বাদামী রঙও কিছুটা ফেকাসে হলো। ঘটনার এই অস্বাভাবিক মোড়ের জন্যে সে মোটেও তৈরি ছিল না। প্রচণ্ড রাগে তার দম আটকে আসছে। কিন্তু বাধ্য হয়েই নিজেকে সংযত রাখতে হচ্ছে কারণ এখন। তার জোর খাটিয়ে কিছু করার উপায় নেই। উদ্ধতভাবে আপটন নিজেকে বাঁচিয়ে বিচার কিভাবে করেছে, তার বিবরণ শুনল।

বোঝার ভঙ্গিতে নড করল গভর্নর।

কেসটা আমি প্রয়োজন মনে করলে পুনরায় বিবেচনা করে দেখতে পারি, যদি কোন নতুন সাক্ষ্যপ্রমাণ তোমার কাছে থাকে, এমারি। সাধারণত এমন মনোরম পরিবেশে কোর্টের কাজ করার সুযোগ সচরাচর পাওয়া যায় না। হেঁটে এগিয়ে একটা উপড়ে পড়া গাছের গুড়ির ওপর বসল সে। আপাতত এটাই জাজের বেঞ্চের কাজ করবে। এবং ওই লেডিও এখানে বসবে। তবে জায়গা কম থাকায় বাকি সবার দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া উপায় নেই।

বুদ্ধিদীপ্ত চোখের অধিকারী লোকটা ছোট হলেও সবার মনকে প্রভাবিত করে ফেলেছে। সবাই গভর্নরের সামনে কিছুটা গোল হয়ে দাড়াল। ওদের মধ্যে কিছু অসন্তুষ্ট চেহারাও যে দেখা যাচেছ না তা নয়। তবে কেউ সাহস করে প্রতিবাদ জানাল না। কেবল বার্ট নিচু স্বরে তার লোকজনকে আসামীর ওপর নজর রাখার নির্দেশ দিয়ে বলল, ও এখনও নির্দোষ প্রমাণিত হয়নি।

ও যখন স্বেচ্ছায় জেলে ফেরত গেছিল আমার মনে হয় না সে পালাবে, মিস্টার বার্ট, মন্তব্য করল গভর্নর। কিন্তু সে আমার বাম পাশের ঘেরের ভিতর থাকবে। তুমি যদি ওর মুখোমুখি উল্টোপাশে দাঁড়াও তবে তুমি নিজেই ওর ওপর নজর রাখতে পারবে।

র‍্যাঞ্চার একটু ভুরু কুঁচকাল, কিন্তু যা বলা হয়েছে তাই করল; এরফান লক্ষ করল সে যেখানে দাঁড়িয়েছিল, ইয়র্কি ঠিক সেইখানে গিয়ে দাঁড়াল।

গভর্নর আপটনের দিকে ফিরে বলল, বন্দি যেসব প্রমাণ কোর্টে জমা দিয়েছিল সেগুলো আমি দেখতে চাই।

দুটো লেখা গভীর মনোযোগ দিয়ে মিলিয়ে দেখে ব্লেক বলল; এগুলো কি তোমার কাছে নকল বলে মনে হয়?

এতে মনে হওয়ার কি আছে-আমি জানি ওগুলো নকল, আপটন জবাব দিল।

খুব দক্ষ হাতের নকল বলতে হবে, ব্লেকের কথায় কুঁকড়ে গেল আপটন। এবার তোমার কথা শোনা যাক, এমারি।

জাজ খুব সংক্ষেপে তাকে ধরে নিয়ে যাওয়া থেকে শুরু করে বার বির মালিকের সাথে সাক্ষাতের বিবরণ দিল।

ওই আউটলদের ওপর তোমার এই প্রভাব, থাকার কি কারণ? বার্টের দিকে তাকাল গভর্নর।

ওদের চীফ তার জীবন রক্ষার জন্যে আমার কাছে ঋণী।

তুমি বিফল হয়ে হোপে ফিরে ওদের উদ্ধার করার কোন ব্যবস্থা কেন নেওনি?

আমি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলাম-সেটাই ছিল শর্ত-কাউকে কথা দিলে সেটা আমি রক্ষা করি।

ওই ডলার বিলগুলো তুমি কোথায় পেলে? পরবর্তী প্রশ্ন এলো।

ওগুলো আমার কাছে কখনও ছিল না, জেমস মিথ্যা বলেছে যে সে ওগুলো আমার দেরাজে পেয়েছে, জবাব দিল বার্ট।

র‍্যাঞ্চার তার আত্মবিশ্বাস ধীরেধীরে ফিরে পাচ্ছে। অবজ্ঞায় তার ঠোঁট বাঁকা হয়ে উঠেছে। এমারির ইশারায় চোখে ঠুলি পরা লোকটা এগিয়ে এলো। কিন্তু টুপি পরেই আছে দেখে জাজ ওকে ধমক দিল। এই লোক এই টেরিটোরির গভর্নর, টুপি নামাও!

যদি গভর্নর আমাকে কিছুক্ষণের জন্যে দয়া করে ক্ষমা করে তাহলে ওটা আমি আরও কিছুক্ষণ মাথায় রাখতে চাই, বলল সে।

ব্লেক হাত নেড়ে এমারিকে থামিয়ে দিল। তাতে কিছু ক্ষতি নেই, তুমি তোমার যা বলার বলো, তবে কথাগুলো সত্যি হওয়া চাই।

লোকটার নিচু করে টেনে নামানো হ্যাট আর দাঁড়ানোর ভঙ্গি দেখে কেমন যেন অস্বস্তি বোধ করছে বার্ট, আগে সে লোকটাকে ভাল করে খেয়াল করে দেখেনি; কিন্তু এখন ওর মনে হচ্ছে ওই লোকও ব্ল্যাক মাস্কেরই একজন সদস্য।

লোকটা তার কথা শুরু করল, আমি ব্যাঙ্ক ডাকাতি থেকেই আমার কথা শুরু করছি। যদিও এটাই আসল শুরু নয়, বলল সাক্ষী। নিচু স্বরে কথা বললেও গলা কর্কশ হওয়ায় সবাই ওর কথা পরিষ্কার শুনতে পাচ্ছে। যে-দুজন ব্যাঙ্কে ঢুকেছিল তাদের মধ্যে আমি একজন। বাইরে যে ঘোড়া নিয়ে অপেক্ষা করছিল সে মারা গেছে, কথাটা শুনে স্বস্তির শ্বাস ফেলল বার্ট। তবে রাস্টনকে আমি গুলি করিনি।

তবে কে করেছে? প্রশ্ন করল গভর্নর।

আঙুল তুলে দেখাল সাক্ষী। বার্ট, জবাব দিল সে।

বেশ কিছু নাগরিকের মুখ থেকে অবাক হওয়ার শব্দ বেরিয়ে এলো, আবার অনেকে হেসেও উঠল। অভিযুক্ত লোকটার হাসিই সব থেকে জোরালো শোনাল।

অথচ ডাকাতির আধঘণ্টার মধ্যেই আমি শহরে পৌঁছে ডাকাত ধরার জন্যে পাস জোগাড় করায় ব্যস্ত ছিলাম, বলল সে।

হ্যাঁ, কারণ শহর ছেড়ে এক মাইল দূরে গিয়েই তুমি পোশাক আর ঘোড়া বদলে ঝোঁপের ভিতর দিয়ে লুকিয়ে শহরে ফিরে এসেছিলে। আমি জানি; কারণ, আমি তোমার পিছনেই ছিলাম, শান্ত স্বরে বলল লোকটা।

এটা একটা ডাহা মিথ্যে কথা, আমি তোমার

লোকটাকে তার কথা শেষ করতে দাও; তোমার কথা আমি পরে শুনব, বাট, ওকে বাধা দিয়ে বলল ব্লেক। খাতা এবং লেখা, যেগুলোকে বার্ট মিথ্যে বলে উড়িয়ে দিয়েছিল সেগুলো ওর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে সে আবার বলল, এগুলো সম্পর্কে তুমি কি জানো?

ওগুলো বার্ট নিজে লিখেছে, কোন দ্বিধা না করে বলল সে। মারিওকে সে জেমসকে হত্যা করার আদেশ দিয়েছিল, কিন্তু ওকে অ্যামবুশ করে মারতে গিয়ে সে নিজেই মারা পড়েছে।

মারিও এখনও, বেঁচেই আছে। প্রতিবাদ করল বার্ট।

আমি নিজে ওকে গুলি খেয়ে মরতে দেখেছি, সাক্ষী বলে চলল অবিচল স্বরে। বার্টের আদেশেই মিস মাস্টারসনকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। ওই সময়েই জেমসের টাকা সরিয়ে ডাকাতির টাকা রেখে ওই টাকা বার্টকে দেয়া হয়, বার্ট নিজেই ব্ল্যাক মাস্ক দলের লীডার।

ভর্ৎসনার সুরে হাসল বার্ট।

তুমি নিজের বন্ধুকে বাঁচাবার জন্যে চোর এবং আউটল বলে স্বীকৃত ওই লোকটাকে সব শিখিয়ে পড়িয়ে এনেছ, এমারি।

জাজ তার জবাবটা গভর্নরকে দিল। আমি জানতাম না এই লোকটা কি বলবে। সে আমাদের পালাতে সাহায্য করার পর নিজেই আমাদের সাথে শহরে আসতে চাইল, কিন্তু এর কোন কারণ সে আমাদের বলেনি।

মাথা কঁকাল ব্লেক, কিন্তু ওর চোখ এবং চেহারা ঠাণ্ডা আর নির্বিকার থাকল। কারণ এখন সে একজন জাজ, বন্ধু বা শত্ৰু না বেছে তাকে নিরপেক্ষ ভাবে বিচার করতে হবে।

তুমি মাস্টারসন সম্পর্কে কি জানো? প্রশ্ন করল সে।

অনেক কিছুই জানি, বলল লোকটা। আমি জানি তার স্ত্রী মারা যাওয়ার পর সে একেবারে ভেঙে পড়েছিল। সব ভুলে থাকার জন্যে কিছু কঠিন লোকের সাথে ভিড়ে সে মদ খাওয়া আর জুয়া খেলা শুরু করল। একদিন ডেজার্ট এজে একটা স্টেজ ডাকাতির ঘটনা ঘটল। স্টেজের ড্রাইভার তাতে মারা পড়ল। হয়ত ওই ঘটনার কথা এখনও কিছু লোকের মনে আছে।

সবাই একযোগে মাথা ঝাঁকিয়ে সায় দিল।

ভাল, মাস্টারসন যাদের সাথে মিশত ওই কাজটা সেই দলের লোকেরাই করেছিল, বলে চলল লোকটা। ওই ঘটনার পরদিন সকালে মাস্টারসন যখন সেই এরফান তার মাতাল অবস্থা কাটিয়ে উঠল তখন সে শুনল ওই রেইডে সে কেবল অংশই নেয়নি, স্টেজ ড্রাইভারকেও সে-ই হত্যা করেছে। এই মর্মে লেখা একটা বিবৃতিও ওকে দেখানো হলো, যেটাতে ওদেরই দলের একজনের সই রয়েছে। যার কাছে সেই কাগজটা আছে সে তাকে অভয় দিল যে ওটা কোনদিন ব্যবহার করা হবে না, কেবল দলের নিরাপত্তার জন্য ওটা রাখা হয়েছে। তোমরা সবাই জানো যে ওই ডাকাত দল আর ধরা পড়েনি।

এই ঘটনার প্রচণ্ড ধাক্কা মাস্টারসনকে আবার সোজা পথে নিয়ে এলো। সে আবার তার র‍্যাঞ্চে ফিরে গেল বটে, কিন্তু ওই মর্মান্তিক অপরাধ করার অনুশোচনা তাকে কুরেকুরে খেতে শুরু করল। সেইসাথে যার কাছে ওই কাগজটা ছিল, সে-ও তাকে শুষে খেতে শুরু করল।

এতগুলো কথা বলে একটু থামল নোকটা। সবাই নীরব রয়েছে, কেবল পাখির ডাক আর মাঝেমাঝে মাটিতে ঘোড়ার পা ঠোকার শব্দ ছাড়া আর কোন আওয়াজ শোনা যাচ্ছে না। বার্টের আগের সেই আত্মবিশ্বাস আর এখন নেই। অবিশ্বাসের চোখে সে লোকটার দিকে চেয়ে আছে। আবার বলতে শুরু করল সে।

প্রথম দিকে কেবল ছোট অঙ্কের টাকা দাবি করা হত। কিন্তু টাকার অঙ্ক ক্রমেই বাড়তে শুরু করল। শেষে যখন টাকা ফুরিয়ে গেল তখন সে গরু দাবি করা আরম্ভ করল। যখন মাস্টারসন বুঝল ওই বন্ধুবেশী জোঁকের নজর ওর মেয়ের ওপর পড়েছে, তাকে শেষ করে লোকটা তার মেয়েকে বিয়ে করে র‍্যাঞ্চটাও দখল করতে চাইছে তখন তার মাথায় একটা বুদ্ধি খেলল; একজন বিশ্বাসী আর যোগ্য লোকের হাতে র‍্যাঞ্চের ভার তুলে দিয়ে সে যদি অদৃশ্য হয় তাহলে আর কাউকে ব্ল্যাকমেইল করতে পারবে না ওই লোক। এবং তা-ই সে করল।

এই ব্ল্যাকমেইলারের নাম কি? প্রশ্ন করল গভর্নর।

আবার আঙুল তুলে দেখিয়ে সে শান্ত স্বরে বলল, বার্ট।

র‍্যাঞ্চার আগেই টের পেয়ে জবাবের জন্যে তৈরি হয়েই ছিল! সে বলে উঠল, এমারি, তোমার বুদ্ধির প্রশংসা না করে পারছি না, তুমি সত্যিই চমৎকার একটা চক্রান্ত কেঁদেছ। কিন্তু কথা বলা খুব সহজ। এতে কিছুই প্রমাণ হয় না। এবার সে প্যাচের দিকে ফিরল। তুমি ওর সম্পর্কে এত কিছু কিভাবে জানো? হয়ত তুমি নিজেই ওকে খুন করেছ।

আউটল এবার জবাব দিতে একটু সময় নিয়ে বলল, হ্যাঁ, এক অর্থে তোমার কথাটাই ঠিক। লেজি এমের লোকজনের মধ্যে উত্তজিত হয়ে ওঠার স্পষ্ট একটা ভাব দেখা গেল। পিছন দিকে মাথা হেলিয়ে হো হো করে হেসে উঠল লোকটা। ঠিক আছে, বয়েজ, ওর স্বর থেকে এখন কর্কশ ভাবটা পুরো বিদায় নিয়েছে। এত উত্তেজিত হয়ে ওঠার কোন কারণ নেই। তোমাদের বসকে আমি আবার ফিরিয়ে আনছি। একটানে হ্যাট খুলে চোখ থেকে ঠলি সরিয়ে ফেলে সে ডাকল, ফিল!

যাকে দেখার আশা সে একেবারেই ছেড়ে দিয়েছিল তাকেই চোখের সামনে দেখে নিজের চোখকেই ওর বিশ্বাস হচ্ছে না।

ড্যাডি! বলে বাবার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ল সে।

২৩.

ব্ল্যাক বার্টের কাছে জ্যাকের এভাবে ফিরে আসাটা একটা বিরাট ধাক্কা। পুরো খেলাতেই হেরে গেছে সে। সাজানো তাস দিয়ে খেলেও তাকে এভাবে হারতে হবে এটা সে স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি। পালাবার মতলবে সে গুটিগুটি পিছনে সরতে শুরু করল; কিন্তু কয়েকগজ মাত্র সরেছে এই সময়ে কে যেন বলল:

সবার থেকে বিদায় না নিয়ে এভাবে চলে যাওয়াটা কি ঠিক হবে, বার্ট? তোমাকে যে সবার থেকে বিদায় নিয়ে যেতে হবে।

বার্ট ঘুরে দেখল কথাটা ইয়র্কি বলেছে। ওর হাত দুটো টিলে ভাবে পিস্তলের বাঁটের কাছে ঝুলছে। ওর সরু চোখ আর শক্ত চোয়ালে কেবল হুমকিটা প্রকাশ পাচ্ছে।

গভর্নরের গলা শোনা গেল। আমার মনে হয় জ্যাকের সব কথা শেষ হয়নি, বলল সে।

একহাতে মেয়েকে জড়িয়ে ধরে সে শুরু করল। আর বেশি কিছু আমার বলার নেই-তবে যেটুকু আছে সেটা আমার কাছে অনেক। লেজি এম ছেড়ে বেরিয়ে আমি সোজা সিঙ্কে গেলাম। ওখানে আমি আগে থেকেই ঘোড়া, খাবার, আর জামা-কাপড় রেখে এসেছিলাম। একটা খরগোস মেরে তার রক্ত জিনে লাগিয়ে ঘোড়াটাকে ছেড়ে দিয়ে পোশাক বদলে কাপড়গুলো একটা ঝোপে লুকিয়ে রেখে অন্য ঘোড়া নিয়ে আমি রওনা হয়ে গেলাম।

রাইফেলটাও রাখলে কাপড়ের তলায়, শেরিফের দিকে চেয়ে মন্তব্য করল এরফান। টেলর চোখ নামিয়ে নিল লজ্জায়।

না, ওটা আমি ঘোড়ার পিঠে খাপেই রেখে দিয়েছিলা। আমি চেয়েছিলাম সবাই ভাবুক আমি মরে গেছি। ভাল কথা, তুমি আমার লেখা নোটগুলো পেয়েছিলে তো, জেমস?

হা, ওগুলোর জন্যে অনেক ধন্যবাদ।

নিজের সম্পত্তি রক্ষা সবাই করতে চায়। শেডি ছিল ওখানের অস্থায়ী বস্, কিন্তু আসল বস্ ছিল বার্ট।

কাঁধ উঁচাল বার্ট। হ্যাঁ, আমি কি নিজের লোককে ধরিয়ে দিতে পাসি নিয়ে বেরিয়েছিলাম নাকি?

যাদের টিকিটাও তুমি খুঁজে পাওনি, রুষ্ট স্বরে মনে করিয়ে দিল ফেনটন। সেদিন পাসির সাথে আমিও ছিলাম।

ফাঁদে পড়া জন্তুর মত বার্ট গভর্নরের দিকে চাইল। সে বুঝতে পারছে হোপে তার রাজত্বের দিন শেষ।

তবু সে একটা শেষ চেষ্টা করল। এগুলো সব একগাদা মিছে কথা, ওই লইয়ার লোকটাকে জেমস লেজি এম গ্রাস করতে সাহায্য করছে, বলল বার্ট।

ওর কথায় হো হো করে হেসে উঠল জ্যাক। আসলেই তোমার মাথা মোটা, বার্ট, জেমস র‍্যাঞ্চ গ্রাস করার চেষ্টা করবে কেন, সে তো ধরতে গেলে এখনই ওটার মালিক। ওর কাছে র‍্যাঞ্চ মর্টগেজ রেখে, আমি তো তোমাকে ওর টাকাই এতদিন দিয়ে এসেছি। অবশ্য সে আমার ফোরম্যান হয়ে আসার সময়ে এটা আমি জানতাম না। আসলে বিরাট ধনী তোক জেমস, একটা সোনার খনিও আছে ওর।

নিষ্ঠুর হাসার চেষ্টা করল বার্ট। তুমি নিজেকে খুব চালাক, মনে করো, না? কিন্তু মনে রেখো তোমাকে ফাঁসিতে ঝোলাবার মত যথেষ্ট প্রমাণ এখনও আমার হাতে আছে।

ওই লেখাটা যে মিথ্যে এর প্রমাণ এমারির কাছে আছে, বলল জ্যাক।

এমারির হাত থেকে কাগজটা নিয়ে পড়ে দেখে গভর্নর কঠিন দৃষ্টিতে বার্টের দিকে চাইল।

এটা মৃত্যু শয্যায় শুয়ে সই করা জনের একটা বিবৃতি। মরার আগে সে সব কথা স্বীকার করে গেছে। এতে সে বলে গেছে তার গুলিতেই স্টেজ ড্রাইভার। মারা গেছিল, কিন্তু তোমার প্ররোচনায় জ্যাক ওই রেইডে উপস্থিত না থাকা সত্ত্বেও সে ওটা লিখে দিতে বাধ্য হয়েছিল।

বার্ট কথাটাকে হেসে উড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করে শেষে ব্লেকের কঠিন দৃষ্টির সামনে মিইয়ে গেল। সে ওই গাছের ডালটার ওপর থেকে আর চোখ সরাতে পারছে না দেখে ওর মনের কথা বুঝেই এরফান বলল, অনেক বছর আগে তুমি ওই ডালেই নিরপরাধ এক বুড়োকে ফাঁসিতে ঝুলিয়েছিলে, কঠিন স্বরে বলল এরফান।

নিজের শুকনো ঠোঁট জিভ দিয়ে চেটে ভেজাবার চেষ্টা করে বার্ট বলল, এর কোন প্রমাণ নেই।

হেনডনকে দেখিয়ে এরফান বলল, ওই লোকটাও তখন তোমার সাথে ছিল। কিন্তু সে প্রতিবাদ করেছিল বলে ওকে মাফ করে দেয়া হয়েছে। কিন্তু তোমার সাথে সেদিন আর যারা ছিল তুমি জানো তাদের ভাগ্যে কি ঘটেছে, বার্ট।

নির্ভীক হয়েও একটা অজানা ভয়ে শিউরে উঠল বার্ট। ওকে আমি বরখাস্ত করেছি-সুতরাং সে যা খুশি বলতে পরে, যুক্তি দেখাল। তাছাড়া এটা কেবল তার কথার বিরুদ্ধে আমার কথা।

না, ওই ঘটনার আরও একজন প্রত্যক্ষদর্শী আছে।

লরিকে এরফানের ইশারায় এগিয়ে আসতে দেখে বার্টের চোখ বিস্ময়ে বিস্ফারিত হলো। ও? সে তো তখন ছোট বাচ্চা ছিল।

এখন সে যা চেয়েছিল তার সবই পাবে এই ছেলেটা। বিদ্বেষে আর রাগে খেপে উঠল বার্ট। তখনই ওকে আমার শেষ করে দেয়া উচিত ছিল, বলে ক্ষিপ্র হাতে পিস্তল বের করে সে লরির বুকে তাক করল। ওদিকে শঙ্কায় চিৎকার করে উঠল ফিল। কিন্তু সে ট্রিগার টেপার আগেই এরফানের হাত থেকে একটা পিস্তল গর্জে উঠল, শূন্যে হাত ছুড়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল শিথিল বার্ট।

এরফান একটু সামনে ঝুঁকে শত্রুকে এক নজর দেখে ইয়র্কির পিস্তল ওকে ফেরত দিয়ে দিল। অপ্রত্যাশিত ঘটনার পর নীরবতার মাঝে বার বির একটা লোক ঝুঁকে দেহটা পরীক্ষা করে দেখল।

ঠিক দুই চোখের মাঝখানে, তাও আরেকজনের খাপ থেকে একটা পিস্তল তুলে নিয়ে! বিদ্যুৎ এরফান? তাহলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। বসকে মরণে টেনেছিল।

*

ওই সন্ধ্যাতেই এরফান যখন তার জিনিসিপত্র গোছাচ্ছে তখন একটা মুখ তার খোলা দরজা দিয়ে উঁকি দিল।

বাবা জিজ্ঞেস করেছে তুমি কি আজ আমাদের সাথে সাপার খাবে?

ফোরম্যান মুখ তুলে চাইল। চেহারাটা গম্ভীর, কিন্তু ওর চোখের কোণে কৌতুকের হাসি।

আমি কৃতজ্ঞ, কিন্তু আজকের এই শেষ রাতে আমি আমাদের আউটফিটের সাথেই খেতে চাই, জবাব দিল সে।

মেয়েটা খুশিতে হেসে উঠল। আমি জিতেছি, বাইরে দাঁড়ানো কাউকে চিৎকার করে জানাল সে। লরির সাথে আমি দশ ডলার বাজি ধরেছিলাম। আমি জানতাম তুমি ঠিক এই কথাই বলবে।

এরফান দরজার সামনে এসে লরিকে খুঁটিয়ে দেখে মন্তব্য করল, আমি জানি না কেন, আমার তো ওকে দেখে মনে হচ্ছে ও হেরেই যেন বেশি খুশি হয়েছে!

ফিলের মুখটা গোলাপী হলো। কিছুকিছু সময় আছে যখন আমার তোমাকে মোটেও ভাল লাগে না। মুখে ওকথা বললেও ওর চেহারা কিন্তু অন্য কথা বলছে।

অথচ দেখো আমিই তোমাকে বাজিটা জিতিয়ে দিলাম।

ওহ, তুমি একটা সাংঘাতিক বাজে লোক। লরি, তুমি ওকে জলদি নিয়ে এসো, দেরি করলে ড্যানিয়েল খেপে যাবে। সে আস্ত একজন গভর্নরকে খাওয়াবার সুযোগ কোনদিন পায়নি, তাই ওরা স্বামী-স্ত্রী দুজনেই খুব তটস্থ হয়ে আছে।

মেয়েটা লাফাতে লাফাতে আগে আগে চলল, পেছনে ওরা ওকে ধীর গতিতে অনুসরণ করল।

এরফান, বলল লরি, ওর গলার স্বর আবেগে কাঁপছে, আমি ওই মেয়ের যোগ্য নই।

কথাটাকে হালকা করার উদ্দেশ্যে জেসাপ হেসে বলল, তুমি কি মনে করেছ আমাকে তুমি কোন নতুন খবর শোনাচ্ছ?

খাবারটা লেজি এমের জীবনে সবথেকে সুস্বাদু খাবার ছিল। খাওয়ার শেষে জাজ এমারি গভর্নরকে প্রশ্ন করল, আচ্ছা, তোমার হঠাৎ এখানে এসে হাজির হওয়াটা কি সত্যিই দৈবাৎ?

শক্ত বেঁটে লোকটার চোখ দুষ্টুমির হাসিতে ভরে উঠল। তোমার মত ঝানু পোকার খেলোয়াড়কে ধোকা দেয়া কঠিন, জাজ, জাবাব দিল সে। হয়ত এদিকে কোন মরিয়া আউটলর খবর আমার কানে এসেছিল- এরফানের দিকে চেয়ে হাসল সে-কিংবা হয়ত বার্টের কুকীর্তির খবর আশাতীত ভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল।

ওই বিষয়ে এর চেয়ে বেশি আর কিছুই বলল না সে।

খাবার শেষে গভর্নর উঠে দাঁড়াল। বলল, এখানে আমার কিছু বক্তব্য আছে। অবশ্য এটা আমার বিচার শেষ হওয়ার পরেই সব শহরবাসীর সামনে ঘোষণা করা উচিত ছিল, তবে আমার মনে হয় যেহেতু এখানে শহরের সব গণ্যমান্য ব্যক্তি উপস্থিত আছে, এটা এখন বলাও অযৌক্তিক হবে না। আমি আমার বিচারে এই রায় দিচ্ছি যে, যেহেতু বার্টের কোন ওয়ারিস নেই, তাই আমি ওর র‍্যাঞ্চ এবং সব সম্পত্তি ওর চক্রান্তের প্রধান শিকার হওয়ায় এই স্টেটের গভর্নর হিসেবে লরিকেই দিয়ে যাচ্ছি। কথা শেষে প্রচণ্ড হর্ষধ্বনি আর করতালির মাধ্যমে সবাই তাকে সমর্থন করল। এবার সে জাজ এমারির দিকে চেয়ে বলল, এই সব বাজেয়াপ্ত কাগজপত্র ঠিকঠাক করে আমাকে দিয়ে সই করিয়ে নেয়ার দায়িত্ব আমি তোমার ওপর ছেড়ে দিলাম, এমারি, তবে এরফান যখন এখানে থাকতে পারছে না, তখন আমি লরিকে যে বাঁচিয়েছে তাকেই তার ফোরম্যান করা, এবং জাজ, জ্যাক আর ফিলকে যে বঁচিয়েছে, সেই অভিজ্ঞ লোককেই এই র‍্যাঞ্চের প্রধান নির্বাচিত করার পরামর্শ দিচ্ছি। বলেই সে তার বক্তব্য শেষ করল। হর্ষধ্বনি আর সমর্থনের মধ্যে তার বক্তর শেষ হলো।

পরে সবার অলক্ষে নিরিবিলি বসে লরি আর ফিল দেখল জেমস তার কামরার বাতি জ্বালিয়ে কামরার বাইরে এসে একটা সিগারেট ধরাল। একটা ধূসর ঘোড়া পায়ে পায়ে এগিয়ে ওর পায়ে নাক ঘষল। ওকে আদর করে দিয়ে এরফান বলল, কালই আমরা বাড়ির পথে রওনা হব, গ্রে, রাকা আমার আর ওই ইয়র্কির পথ চেয়ে বসে আছে।

*

কয়েকদিন পরেই লরি আর ফিলের নামে একটা বড় চিঠি এলো। তার ভিতরে রয়েছে কতগুলো দলিল আর একটা ছোট্ট চিঠি। শুভ বিয়েতে অংশ নিতে পারলাম না-আমার তরফ থেকে তোমাদের বিয়ের উপহার হিসেবে এই মর্টগেজগুলো তোমরা উপহার নিলে আমি খুশি হব।

***

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *