২১. শত্রু শিবিরে

২১. শত্রু শিবিরে

জাহাজে আমি এখন একা। ভাটা শুরু হয়েছে আগেই। পশ্চিম আকাশে ঢলেছে সূর্য। অ্যাংকোরেজের ওপর দিয়ে পশ্চিম উপকূল পেরিয়ে এসে জাহাজের ওপর নকশাকাটা ছায়ার সৃষ্টি করেছে বড় বড় পাইনের ছায়া। পড়ন্ত বিকেলের মৃদু বাতাসে অজানা বুনো ফুলের সুবাস। পুবের পাহাড়ে বাধা পেয়ে আসা ঝিরঝিরে বাতাসে মৃদু মৃদু দুলছে জাহাজের পাল। পুরো হিসপানিওলাকে কেমন যেন ভূতুড়ে জাহাজের মত মনে হচ্ছে এখন আমার। আর থাকা যায় না এখানে। দুর্গে পৌঁছানোর একটা ব্যবস্থা করতে হবে। এবারে আর পথ হারাব না, চেনা হয়ে গেছে। দ্বীপের ধার ধরে ধরে এগিয়ে সহজেই পৌঁছে যেতে পারব স্কেলিটন আইল্যান্ডের ধারে। আসার সময় বার বার দেখে নিয়েছি কোন্ দিক দিয়ে যেতে হবে। কাছাকাছি যেতে পারলে পৌঁছানো কঠিন হবে না।

কাত হয়ে থাকা জাহাজের দড়ি বেয়ে ধীরে ধীরে নেমে এলাম ভেজা বালিতে। কাদাপানি ভেঙে এসে উঠলাম তীরে। আরেকবার জাহাজটার দিকে তাকিয়ে সোজা হাঁটা দিলাম।

পুরো অ্যাংকোরেজে সাঁঝের ছাঁয়া নামছে। পুবের আকাশে সোনালী আলো, ধীরে ধীরে গাঢ় লাল রক্তের রঙে রূপ নিচ্ছে। আধ মাইল মত এগোতেই হালকা হয়ে এল জঙ্গল। ডুবে গেল সূর্য।

গোধূলির ধূসর আলোতে ছায়াঢাকা বনের বাইরে দ্বীপের তীর ধরে এগিয়ে চলেছি। একটা ছোট পাহাড় পেরোলাম। ছোট একটা নদী পেরোলাম। পেরিয়ে এলাম দুটো ছোট পাহাড়ের মাঝের উপত্যকা। চলেছি তো চলেছিই, বিরাম নেই।

রাত হয়েছে। কালো অন্ধকারে ঢেকে গেছে রত্নদ্বীপ। হোঁচট খেতে খেতে এগিয়ে চলেছি। কালো অন্ধকারে সাদাটে বালির সৈকত আবছা ধূসর দেখাচ্ছে। আকাশে রাশি রাশি তারার মেলা। কালো আকাশের চাঁদোয়ায় মণি-মুক্তোর কাজ করেছে যেন কোন নিপুণ শিল্পী।

পথে এক জায়গায় একটা ঝর্নার ধারে বসে, জাহাজ থেকে সঙ্গে নিয়ে আসা বিস্কুট আর কিসমিস বের করে খেলাম। তারপর আবার শুরু হল চলা।

মাঝরাত পেরোল। হঠাৎই খেয়াল করলাম, কালো অন্ধকার কেটে গেছে। কেমন ধুসর হয়ে উঠেছে প্রকৃতি। পুব আকাশে হলুদ আলোর আভাস। চাঁদ উঠছে, কৃষ্ণপক্ষের চাঁদ। খুশি হয়ে উঠল মনটা। এবারে পথ চলা অনেকখানি সহজ হবে।

ক্রমেই আরও ওপরে উঠে এল চাঁদ। গাছপালার মাঝে মাঝে ফাঁকা জায়গায় পড়েছে এসে জ্যোৎস্না। পরিষ্কার সাদা বালির রঙ হয়ে উঠেছে হলদেটে।

স্কেলিটন আইল্যান্ডে পৌঁছুতে হল না, একেবারে দুর্গেই পৌঁছে গেলাম। পাহাড়ের মাথায় কাঠের দুৰ্গটা চাঁদের আলোয় কেমন ভৌতিক দেখাচ্ছে। থমকে দাঁড়ালাম মুহূর্তের জনন্য। বাড়ি ফেরার আনন্দ অনুভব করছি। ছুটলাম।

এক ছুটে এসে দাঁড়ালাম বাইরের বেড়ার প্রবেশ পথের কাছে। তারপর ঢুকে পড়লাম। দুর্গের দরজার কাছে এসে দাঁড়াতেই ভেতর থেকে অদ্ভুত একটা আওয়াজ ভেসে এল। ডানা ঝটপটানির শব্দ। ঢুকে পড়লাম ঘরের ভেতরে।

অন্ধকার ঘর। আলো জ্বলেনি কেন? দুই পা এগিয়েই হোঁচট খেলাম, শুয়ে থাকা কারও গায়ে পা পড়েছে। কে! উত্তেজিত কণ্ঠে ধমকে উঠল লোকটা।

আশ্চর্য তো! কে এই লোক!

ঠিক এই সময়ই ধাতব কণ্ঠে ডাক শোনা গেল, পিসেস অভ এইট…পিসেস অভ এইট…পিসেস অভ এইট…

চু-উ-প! কর্কশ কষ্ঠে ধমকে উঠে পাখিটাকে থামাল সিলভার। পরক্ষণেই জ্বলে উঠল দিয়াশলাইয়ের কাঠি।

মশালের রক্তিম আলোয় আলোকিত হয়ে উঠেছে ভেতরটা। কাঠের দেয়ালে ছায়া কাঁপছে। মোট ছয়জন লোক দেখতে পাচ্ছি।

সিলভারের কাঁধে চড়ে বসেছে ক্যাপ্টেন ফ্লিন্ট, অর্থাৎ তোতা পাখিটা। ঠোঁট দিয়ে ঠুকরে পালকগুলো সাজিয়ে নিচ্ছে। আগের চেয়ে রুগ্ন হয়ে গেছে লঙ জন সিলভার, চেহারা ফ্যাকাসে। পরনে সেই তামার বোম লাগানো নীল কাপড়ের বুল-কোট। আমাকে দেখে হাসল, আরে, জিম হকিন্স যে! আকাশ থেকে নামলে মনে হয়! কিছু বললাম না।

পাইপ বের করে তামাক ঠাসল সিলভার। তারপর ডাকল, এই ডিক, একটু আগুন দাও তো!

পাইপটা ধরিয়ে নিয়ে টানতে টানতে বলল, তুমি হুট করে এসে ঢুকে পড়লে যে? জানো না নাকি কিছু?…ও, তোমার জানার তো কথা নয়…তা এসো, তোমাকে বন্ধুভাবেই নেব। একটু থেমে মশালের আলোয় আমার পা থেকে মাথা পর্যন্ত চোখ বুলিয়ে নিল। তারপর বলল, মনে হয় অনেক পথ পেরিয়ে এসেছ, অনেক ধকল গেছে। প্রথমেই বুঝেছিলাম চালাক ছেলে, কিন্তু এতটা চালাক, বুঝিনি! তা চালাক হওয়া ভাল। মাথা ঝাকাল সিলভার।

চুপ করে রইলাম।

পাইপে জোরে জোরে কয়েকটা টান দিল সিলভার। দাঁতের ফাঁক থেকে পাইপটা সরিয়ে নিয়ে বলল, হ্যাঁ, জিম, চালাক ছেলে আমার পছন্দ। হোটবেলায় তোমারই মত চঞ্চল ছিলাম আমি, রোমাঞ্চ ভাল লাগত। …তা এক কাজ কর না, আমার দলে চলে এসো। ট্রেজার আইল্যান্ডের ধনরত্ন আমাদের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নাও। কে জানে একদিন হয়ত তুমি নিজেই একটা জাহাজ কিনে নিয়ে ক্যাপ্টেন হতে পারবে। …আসবে?

এখুনি বলতে হবে? আমাকে এখনও মোটামুটি ভাল চোখেই দেখে সিলভার, জেনে সাহস পেলাম কিছুটা।

ভেবেচিন্তেই বল।

তাহলে তার আগে জানতে হবে ডাক্তার লিভসী, স্কোয়্যার ট্রেলনী, ক্যাপ্টেন স্মলেট…এরা কোথায়।

তা তো ছাই আমিও জানি না! সিলভার সত্যি কথাই বলছে, মনে হল আমার।

ও। কিন্তু তোমার দলে গিয়ে লাভ কি, সিলভার? তোমাদের অবস্থা এখন শোচনীয়। লোকজন বেশির ভাগই মারা পড়েছে, ম্যাপ নেই, গুপ্তধনের আশাও গেছে, জাহাজটাও হারালে…ওহহো, বলেই নিই, ব্রায়ানকে খুন করেছে ইসরায়েল। রাতের বেলা বোধহয় মাতাল হয়েই ওরা নোঙর তুলে ফেলেছিল, স্রোতের টানে ভেসে যায় জাহাজ। আমিও ছিলাম তখন ওতে, তোমাকে খুঁজতেই গিয়েছিলাম। তারপর জোর করে আমাকে জাহাজ চালিয়ে নিতে বাধ্য করে ইসরায়েল। তারপর আচমকা এক বালির চড়ায় ধাক্কা খেয়ে কাত হয়ে গেছে জাহাজ। হালের বাড়ি খেয়ে বোধহয় ঘাড় ভেঙেই মারা গেছে ইসরায়েল।

বোকার মত আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে সব কটা ডাকাত। জোর দিয়েই বললাম, ভেড়ার দলে কেন আসব…

তবে রে! কোমর থেকে ছুরি খুলে নিয়ে লাফিয়ে উঠল এক ডাকাত। মরগান। স্পাই-গ্লাস সরাইখানার সেই লোকটা।

খবরদার, মরগান! চেঁচিয়ে উঠল সিলভার, বাড়াবাড়ি আমি একদম পছন্দ করি না! ফিরে এসো বলছি!

দাঁড়িয়ে পড়ল মরগান। সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল এক ডাকাত, কেন ঠিকই ত  করছে মরগান। পুঁচকে শয়তানটা আমাদের ভেড়ার পাল বলে…

হ্যাঁ হ্যাঁ, ঠিকই করছে ও, মরগানের পক্ষে সায় দিল আরেকজন।

ভুরু কুঁচকে ওদের দিকে তাকাল সিলভার। চোখে আগুন। চাপা ভয়ঙ্কর গলায় বলল, কি হল, আমাকেই ধরে মারবি মনে হচ্ছে? ঠিক আছে, আয় দেখি, আয় ছুরি নিয়ে আয়, দেখি কার ঘাড়ে কটা মাথা! আয়…কি হল হাঁদার দল, আয়!

সিলভারের এই ভয়ঙ্কর মূর্তি এর আগে নিশ্চয় ওরই ডাকাতগুলোও দেখেনি। ফুটো বেলুনের মত চুপসে গেল ওরা।

কি হল আসিস না কেন? কর্কশ কণ্ঠে বলল সিলভার। প্যান্ট খারাপ করে ফেললি? আহ, কি বাহাদুর রে একেকজন। শুনে রাখ, এই ছেলেটিকে পছন্দ করি আমি, কাজেই ওর ওপর কারও হাত তোলা চলবে না। তোদের যে-কারও চেয়ে ভাল সে।

কোন কথা নেই আর কারও মুখে। মশালের আলোয় বিস্মৃত সব ছায়া নাচছে কাঠের দেয়ালে। বুকের ভেতরটা দুপদাপ করছে আমার, কিন্তু তবু ক্ষীণ একটা আশার আলো দেখতে পাচ্ছি। আমাকে খুন করবে না সিলভার।

রূপ পাল্টে গেছে সিলভারের। দাঁতের ফাঁকে পাইপ, হাত দুটো বুকের ওপর আড়াআড়ি করে রাখা, মুখের ভাব শান্ত, কাঁধে চুপচাপ বসে থাকা তোতাপাখি, ইত্যাদি সব মিলিয়ে কেমন যেন অন্যরকম লাগছে ওকে। আর যাই হোক, অন্তত ডাকাতের মত নয়।

ফ্যাকাসে মুখ তুলে বার বার সিলভারের দিকে তাকাচ্ছে ডাকাতেরা। উসখুস করছে।

অনেকক্ষণ একটানা চুপচাপ পাইপ টানল সিলভার। তারপর দাঁতের ফাঁক থেকে পাইপটা বের করে থুথু ফেলল মাটিতে। সঙ্গীদের সবার মুখের দিকে তাকাল একবার করে। শেষে জিজ্ঞেস করল, কিছু বলবে মনে হচ্ছে, তোমরা?

দেখ সিলভার, একজন বলল, কিছু প্রশ্ন আছে আমাদের। তোমাকে নেতা মেনেছি, জবাব তোমাকে দিতেই হবে। দয়া করে যদি বাইরে আস… উঠে দাঁড়াল লোকটা। তারপর ধীর শান্ত পায়ে হেঁটে ঘরের বাইরে চলে গেল। একে একে তাকে অনুসরণ করল অন্য ডাকাতেরা। ঘরে রয়ে গেলাম কেবল আমি আর সিলভার।

লক্ষণ খারাপ, মৃদু কণ্ঠে বলল সিলভার। আমাকেও মানতে চাইছে না এখন ওরা। নাহ, আর কোন আশাই নেই… এদিক-ওদিক মাথা দোলাল সে।

মানে? জিজ্ঞেস করলাম।

ধনরত্ন তো পেলামই না, গলাটাও ফাঁসির দড়ি দেখছে। তার আগে ওই ব্যাটারাই হয়ত শেষ করে দেবে আমাকে। ওদের মত লোক নিয়ে দল গড়লে পরিণতি এমনি হবে, আগেই বোঝা উচিত ছিল! আমিও এমন ভুলটা করলাম!

হুট করে বলে বসলাম, এই মুহূর্তে তুমি মরলে, আমিও বাঁচতে পারব না। এসো, আমরা দুজনে মিলে রুখে দাঁড়াই।

চমৎকার! এই তো কাজের ছেলের মত কথা! তোমার কানাকড়ি বুদ্ধি আর সাহস ওই হারামজাদাদের ঘটে থাকলেও এমনভাবে হেরে যেতাম না।

পাইপের পোড়া তামাকটুকু ফেলে দিয়ে নতুন করে তামাক ভরল সিলভার। ধরাল। কয়েকটা টান দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে বলল, জানি, কথাটা শুনলে হাসবে তুমি! কিন্তু বিশ্বাস কর, এই মুহূর্ত থেকে জমিদার ট্রেলনীর দলে যোগ দিলাম আমি। তুমি সাক্ষী। কি, আমার হয়ে বলবে তো জামিদারের কাছে?

বলব, নির্দ্বিধায় জবাব দিলাম।

বেশ, সত্যি কথাটা বলা যায় এবার তোমাকে। সকালে আমার কাছে এসেছিলেন ডাক্তার লিভসী। ম্যাপটা দিয়ে গেছেন। বুদ্ধু বনে গিয়েছিলাম তখন! ঈশ্বরই জানে, ব্যাপারটা কি!

কথাটা শুনে স্তব্ধ হয়ে গেলাম আমিও। বোকার মত চেয়ে রইলাম সিলভারের দিকে।

এ সম্পর্কে আমি কিছু জানি না, বুঝল সিলভার। শ্রাগ করল। নড়েচড়ে উঠে আবার যুত করে বসল কাঁধের তোতাটা।

বাইরে আমি যাচ্ছি না, জিম, বলল সিলভার। আসলে খুন করতে ডাকছে ওরা আমাকে। যুদ্ধের জন্যে তৈরি থাক।

0 thoughts on “২১. শত্রু শিবিরে

  1. উজ্জয়িনী কাব্যটি সম্পূর্ণ নয়, দয়া করে সম্পূর্ণ গ্রন্থটি ওয়েবসাইটে পোস্ট করবেন , সংস্করণটি উল্লেখ করলে উপকৃত হব .

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *