২১. আবার উত্তরে চলেছে তিন গোয়েন্দা

এক হপ্তা পর। আবার উত্তরে চলেছে তিন গোয়েন্দা। মোড় নিয়ে সাইপ্রেস ক্যানিয়ন ড্রাইভে নামল তিনটে সাইকেল। নুমেরিজ ইন-এ পৌঁছে দেখল, ওদেরই অপেক্ষা করছেন মিস্টার ভিকটর সাইমন। সাগরের দিকে মুখ করা মস্ত ঘরটায় বসে আছেন তিনি। কাচের টেবিলে খাবার সাজিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কিম, হাসি হাসি চেহারা। ছেলেদের দেখেই ঘোষণা করল, আজ সব আমেরিকান খাবার। গুবারের পানাট-বাটার-মার্শম্যালো-ফ্লাফ স্যাণ্ডউইচ। রসাল ফ্র্যাঙ্কফর্টারস। বার্গার অন সানশাইন ব্র্যান বান, আর পিকি পিকল টেস্ট-ট্রিট রেলিশ। বলে চওড়া হাসি উপহার দিয়ে বাউ করে বেরিয়ে গেল ভিয়েতনামী।

দীর্ঘশ্বাস ফেললেন মিস্টার সাইমন। ব্র্যাণ্ড নেম বলে টিভিতে বিজ্ঞাপন না দিলে বাজারে গিয়ে মনে হয় খাবারই কিনতে পারত না কিম।

খাবারগুলো দেখে কিন্তু ভালই মনে হচ্ছে, রবিন বলল।

ভ্রূকুটি করলেন লেখক। পানাট-বাটার-মার্শম্যালো-ফ্লাফ স্যাণ্ডউইচ খেতে পারবে তুমি?

দ্বিধায় পড়ে গেল রবিন। জানি না। তবে ফ্র্যাঙ্কফুর্টার খেতে পারব।

বাকিগুলোও না পারার কোন কারণ নেই, মুসা বলল। অবশ্যই যদি শুয়োরের মাংস না থাকে।

শুরু করে দাও তাহলে, বললেন সাইমন।

দ্রুত অদৃশ্য হয়ে যেতে লাগল হ্যামবার্গার আর ফ্রাঙ্কফুর্টারগুলো। কিন্তু স্যাণ্ডউইচগুলো ছুঁয়েও দেখল না কেউ। সন্দেহের চোখে বার বার ওগুলোর দিকে তাকাচ্ছে মুসা। বলল, কয়েকটা খেয়ে দেখলে কেমন হয়? কিমের কথায় মনে হল, ওগুলোতেই বেশি আগ্রহ তার। না খেলে দুঃখ পাবে বেচারা।

পেলে আর কি করা? তাকে বুঝতে হবে, স্বাদ পায় বলেই খায় লোকে। বিস্বাদ হলে খেতে পারত না। প্রাণ বাঁচানোর জন্যে ওষুধ দরকার, কিন্তু সহজে খেতে চায় কেউ? হাত নাড়লেন সাইমন। খাবারের আলোচনা থাক। কেসের কথা বল। কয়েকবার ফোন করেছি এলসিকে, জবাবই দিতে চায় না। মেজাজ তেতে তার চুলের মতই লাল হয়ে আছে। বিলের কথা শুনলেই তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠে।

এত রাগ নিশ্চয় টিনার জন্যে? মুসা বলল।

না। পুলিশ বিলের গায়ে তাকে হাত লাগাতে দেয়নি বলে।

হাসল কিশোর। বড় বাঁচা বেঁচে গেছে বিল। নাক-মুখের চামড়া আর থাকত তাহলে। যা বড় বড় নখ দেখেছি এলসির হাতে।

রাগে অন্ধ হয়ে আছে মেয়েটা। ভাগ্যিস টিনার বীমা করা আছে। নইলে আত্মহত্যাই করে বসত। তোমাদের তদন্তের কথা খুলে বলবে, প্লীজ? খবরের কাগজে যা যা জেনেছি, তাতে সন্তুষ্ট হতে পারছি না। জীবনভর গোয়েন্দাগিরি করে করে স্বভাব খারাপ হয়ে গেছে, খুঁটিনাটি না জানলে এখন আর ভাল লাগে না। খালি খুঁতখুঁত করে মন।

কেস রিপোর্ট পড়তে চান? রবিনের হাতে বড় একটা খাম, সেটা দেখিয়ে, জিজ্ঞেস করল। মিস্টার ক্রিস্টোফারের অফিসে গিয়েছিলাম। তিনি নেই। দেশের বাইরে গেছেন। এলে তারপর দেব। ইচ্ছে করলে পড়তে পারেন।

চাই মানে? হাত বাড়ালেন সাইমন। দেখি।

নীরব হয়ে গেল ঘরটা। কোস্ট হাইওয়েতে শোনা যাচ্ছে যানবাহনের শব্দ। পাতার পর পাতা উল্টে চলেছেন সাইমন, গভীর মনোযোগে পড়ছেন। পড়া শেষ করে তাকালেন সাগরের দিকে। বললেন, অনেক সময় ছোটখাটো ব্যাপারই মানুষের সর্বনাশ করে ছাড়ে। রক ওই মানিব্যাগের লোভটা না করলেই আর ধরা পড়ত না। ধরা পড়ায় অবশ্য ভালই হয়েছে। অনেক লোকের জীবন বেঁচেছে। অস্ত্রগুলো নিয়ে যেতে পারলে কত লোক যে মারা যেত জানতেই পারতাম না কোনদিন।

মাথা ঝাঁকাল কিশোর। বিলের মত মানুষ মেসা ডিওরোতে আরও আছে। আমরা শুধু অস্ত্রের একটা চালান বন্ধ করতে পেরেছি।

রোজারের কি খবর? সন্দেহমুক্ত হয়েছে নিশ্চয়? কাগজে তো কিছু লেখেনি।

হয়েছে। পুলিশের কাছে মুখ খুলেছে বিল আর তার সঙ্গীরা। গুপ্তচরগিরি আর দূতিয়ালী করত রক। বিলের গ্রুপের মত অনেক গ্রুপ আছে রিপাবলিকানদের। নেতাদের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করত রক, এনে রাখত মিস্টার রোজারের ফ্রিজে। তারপর মাসে একবার প্লেনে করে যেত মেকসিকো সিটিতে, রডরিগেজদের কারও হাতে সেই টাকা দিয়ে আসত। সব না। কিছু কিছু করে রেখে দিত নিজের জন্যে, বুঝতে পারেনি কেউ।

রকই জিনো, তাই না?

হ্যাঁ। রক জিনিমুর রেনাল্ড। মায়ের দেশ মেসা ডিওরো। বাপের নাম রেনান্ড, আমেরিকান। রকের নানার নামও ছিল জিনিসুর, রিপাবলিকানদের একজন বড়সড় নেতা ছিলেন। রকের মা-ও ছিলেন বড় নেত্রী। মায়ের মৃত্যুর পর রক যোগ দেয় রিপাবলিকানদের দলে।

হুঁ। আচ্ছা, কি করে বুঝলে, ব্যাংক ডাকাতির কিছু টাকা রেখে দিয়েছে সে?

বুঝিনি, আন্দাজেই বলে ফেলেছিলাম। কিছু একটা বলে দেরি করাতে চাইছিলাম ওদের, তাই বিলের মনে সন্দেহ ঢোকানোর চেষ্টা করেছিলাম, মুসল কিশোর। কাজে লেগে গেল ফন্দিটা।

অন্ধ কে সেজেছিল? নিশ্চয় রক?

হ্যাঁ, জবাব দিল রবিন। তার গাড়ির ট্রাংকে উইগ আর মেকাপের সরঞ্জাম পেয়েছে পুলিশ। অ্যাট্রানটো সেজে ডাকাতি করতে যাওয়াটাকে বেশ একটা রোমাঞ্চকর ব্যাপার মনে করেছিল রক।

হাসলেন সাইমন। ওদের পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়ার মূলে ওই রক। মাইসের কথা বল। মুভিং কোম্পানিটা একটা ভাঁওতা, তাই না? আসলে ব্যবসা করত বেআইনী অস্ত্রের?

হ্যাঁ, জবাব দিল মুসা। গা ঢাকা দিয়েছে মাইস। চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে পুলিশ, এখনও ধরতে পারেনি।

এখন আসল কথাটা বল। সিনথিয়া ব্যানালিসের সঙ্গে এসবের কি সম্পর্ক?

কোন সম্পর্ক নেই। তার বাড়ি মেসা ডিওরোতে, বিলকে চেনে, ব্যস। রিপাবলিকানদের সাপোর্ট করে, তবে টেরোরিস্টদের নয়।

বিলের সঙ্গে ঝগড়া লাগল কি নিয়ে?

তাকে নিজের দলে ঢোকাতে চাইছিল বিল। সিনথিয়া রাজি হয়নি।

ভাল করেছে, খামটা রবিনের হাতে ফিরিয়ে দিলেন সাইমন। ভাল কাজ দেখিয়েছ তোমরা। আচ্ছা, তোমাদের এই গল্প নিয়ে যদি একটা বই লিখে ফেলি, আপত্তি আছে?

আমাদের নেই, বলল কিশোর। তবে মিস্টার ডেভিস ক্রিস্টোফারকে জিজ্ঞেস করতে হবে। আমার মনে হয় রাজি হবেন তিনি। আপনি বই লিখে দিলে ছবি। বানাতে সুবিধে হবে তার।

হ্যাঁ, ঠিকই বলেছ। সে-ই ভাল। আগে তাকে জিজ্ঞেস করে নাও, গাল চুলকালেন লেখক। তা আমার সঙ্গে সাগরে বেড়াতে যাচ্ছ কবে?

ছিপ নেবেন তো, স্যার? মুসা জিজ্ঞেস করল।

নিশ্চয়ই।

হাসি ছড়িয়ে পড়ল মুসার সারা মুখে। তাহলে যখন বলবেন তখনই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *