২০. লক্সলির কাছ থেকে বিদায়

লক্সলির কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সেইন্ট বটল্‌ফ প্রায়োরির পথে রওনা হলো ব্ল্যাক নাইট। গাৰ্থ আর ওয়াম্বা আগেই সেখানে চলে গেছে আহত আইভানহোকে নিয়ে।

প্রায়োরিতে পৌঁছে ব্ল্যাক নাইট দেখলো আইভানহো এখন অনেক সুস্থ, প্রায় স্বাভাবিক।

আরেক দিন এখানে বিশ্রাম নাও, বললে নাইট। কাল রওনা হবে তুমি।

না, আমি আপনার সাথেই যাব, বললো আইভানহো। পথে কি বিপদে পড়বেন তার ঠিক নেই…।

কিন্তু ব্ল্যাক নাইট শুনলো না ওর কথা। বললো, না, আমি যা বললাম তাই করবে। কাল রওনা হবে তুমি। সোজা অ্যাথেলস্টেনের কনিংসবার্গ দুর্গে চলে আসবে। ওখানে তোমার বাবার সাথে আবার যেন তোমার মিলন হয়, সে চেষ্টা করবো। ওয়াম্বাকে নিয়ে যাচ্ছি, পথ চিনিয়ে দেবে। বিপদআপদ হলে সাহায্যও করতে পারবে।

হাহ, ওয়াম্বাকে নিচ্ছেন বিপদ সামলাতে! ওকে কে সামলায় তার ঠিক নেই!

তবু আর কাউকে যখন পাওয়া যাচ্ছে না, কি আর করা। কিন্তু তুমি, কালকের আগে নড়বে না এখান থেকে। এটা আমার নির্দেশ।

বিদায় নিলো ব্ল্যাক নাইট।

ব্ল্যাক নাইট চলে যাওয়ার কয়েক মিনিটের মাথায় উদ্বেগে অস্থির হয়ে উঠলো আইভানহো। গার্থকে ডেকে পাঠালো সে। বললো, এক্ষুনি আমার ঘোড়া সাজাও, গার্থ, ব্ল্যাক নাইটের পেছন পেছন যাবো আমরা।

কিন্তু আপনি এখনো খুব দুর্বল, প্রতিবাদ করলো গাৰ্থ। তাছাড়া ব্ল্যাক নাইট বলে গেলেন কাল পর্যন্ত এখানে থাকতে।

না, গার্থ, কাল পর্যন্ত এখানে বসে থাকা যাবে না। আমার মন বলছে পথে নিশ্চয়ই বিপদে পড়বেন ব্ল্যাক নাইট। একা তিনি পেরে উঠবেন না শত্রুর সাথে। আমাকে যেতেই হবে, গার্থ। তোমরা যা-ই বলো আমি এখন সম্পূর্ণ সুস্থ।

কিন্তু…।

আর কোনো কিন্তু নয়, গাৰ্থ। আমার ঘোড়া সাজাও, যাও। দেরি হয়ে যাচ্ছে!

কয়েক মিনিটের ভেতর দুটো ঘোড়ায় চেপে রওনা হলো দুজন।

.

গভীর বনের মাঝখান দিয়ে এগিয়ে চলেছে দুটো ঘোড়া। দুজন আরোহী তাদের পিঠে। একজন ব্ল্যাক নাইট। অন্যজন ওয়া। গুনগুনিয়ে গান করছে ব্ল্যাক নাইট। মাঝে মাঝে গান থামিয়ে টুকটাক প্রশ্ন করছে ওয়াম্বাকে। প্রশ্নের জবাব দিয়েই কিছু একটা হাসির কথা শুনিয়ে দিচ্ছে। ওয়াম্বা। প্রত্যেক বারই যে ব্ল্যাক নাইট হাসছে এমন নয়, তবু ওয়াম্বার বিরাম নেই।

রাজদ্রোহী ডাকাতদের চেয়েও মারাত্মক লোকজন আছে এ বনে, তা জানেন? হঠাৎ ওয়াম্বা বললো।

তাই নাকি! কারা?

ম্যালভয়সিঁর লোকজন। ডাকাতদের ডাকাতি করা ছাড়া বেঁচে থাকার আর কোনো পথ নেই। কিন্তু ওরা কেন করে?

বড় জটিল প্রশ্ন করেছো, ওয়াম্বা জমিদার ম্যালভয়সিঁর লোকজন কেন ডাকাতি করে? যাকগে, ও নিয়ে আমাদের মাথা ঘামিয়ে লাভ নেই।

লাভ নেই ঠিকই, কিন্তু মাথা থাকলেই যে তা ঘামে, স্যার নাইট। ধরুন ওদের জন দুই এসে আমাদের আক্রমণ করলো, আপনি কি করবেন?

কি আর করবো, বর্শা চালাবো।

যদি চারজন আসে?

একই দশা হবে তাদেরও।

যদি ছজন আসে?

ঐ একই। সত্যিকারের নাইটরা দশ বিশ জন এলেও কোনো পরোয়া করে না, বুঝলে হে ভাঁড়।

বেশ, তাহলে আপনার ঐ শিঙাটা আমাকে একটু দিন।

ব্ল্যাক নাইট শিঙাটি দিতেই ওয়াম্বা সেটা নিজের গলায় ঝুলিয়ে নিলো।

আরে, আরে, তোমার মতলব কি, ওয়াম্বা? বলে উঠলেন নাইট। দাও, আমার শিঙা আমাকে ফিরিয়ে দাও! লক্সলি ওটা আমাকে উপহার দিয়েছে।

আমার কাছে এটা নিরাপদেই থাকবে, স্যার নাইট। বোকা ভাঁড়রা যখন বীরদের সাথে চলে তখন শিঙা-টিঙা এসব ভড়দেরই বহন করা উচিত। দরকারের সময় ওরাই ওগুলো ভালো বাজাতে পারে। দুশ্চিন্তা করবেন না, আপনার জিনিস আপনি ফেরত পেয়ে যাবেন।

নাহ্, হতাশ কণ্ঠে বললো নাইট, তোমার বেয়াদবি দিন দিন মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। মনে রেখো, আমারও ধৈর্যের একটা সীমা আছে।

দেখুন, স্যার নাইট, বোকা হাঁদাকে বেশি ভয় দেখাবেন না, তাহলে সে লেজ তুলে পালাবে। তখন এই অচেনা বনে পথ খুঁজে মরতে হবে আপনাকেই।

এই একটা ব্যাপারে তো আগেই হার মেনে বসে আছি। সুতরাং তোমার সাথে আর কোনো কথা নেই আমার। চুপ করে পথ দেখাও।

শিঙাটা তাহলে ভাড়ের কাছেই থাকছে। ঠিক আছে, এবার তাহলে প্রমাণ দিন কেমন বীর আপনি।

মানে?

মানে আমার মনে হচ্ছে, সামনের ঐ ঝোপটার আড়ালে একদল গুণ্ডা আমাদের আক্রমণ করার জন্যে ওঁৎ পেতে আছে।

কি করে বুঝলে?

পাতার আড়ালে দুতিনবার ওদের শিরোস্ত্রাণ ঝলকে উঠতে দেখেছি। ঐ দেখুন আবার। সৎ লোক হলে ঝোপের ভেতর লুকিয়ে না থেকে রাস্তা দিয়ে হাঁটতো।

হুঁ , তোমার কথাই ঠিক, বলতে বলতে শিরোস্ত্রাণের মুখাবরণটা নামিয়ে দিলো নাইট। ঠিক সেই সময় পর পর তিনটে তীর এসে লাগলো তার বুকে, মাথায়, মুখে। সময় মতো মুখাবরণটা নামিয়ে দেয়ায় এযাত্রা বেঁচে গেছে নাইট।

তুমি এখানে দাঁড়াও, ওয়া; ওদের একটু শিক্ষা দিয়ে আসি, বলে নাইট ঘোড়া ছুটিয়ে দিলো ঝোপটার দিকে।

কিন্তু নাইট পৌঁছানোর আগেই ঝোপের ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো সাত জন সশস্ত্র লোক। এক সঙ্গে নাইটকে আক্রমণ করলো তারা। তিন জনের বর্শা ভেঙে গেল নাইটের বর্মে লেগে।

এসবের মানে কী? চিৎকার করে উঠলো নাইট।

জবাব না দিয়ে তলোয়ার বের করলো লোকগুলো। চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে আবার আক্রমণ করলো নাইটকে।

মরো, ব্যাটা নকল রাজা, গর্জন করে উঠলো একজন।

ব্ল্যাক নাইট খেয়াল করলো, লোকটার পরনে নীল বর্ম, নীল পোশাক, নীল ঢাল।

বিশ্বাসঘাতকের দল! পাল্টা গর্জন করে তলোয়ার বের করলো নাইট।

চারদিক থেকে আক্রান্ত হয়ে একটু দিশেহারা অবস্থা ব্ল্যাক নাইটের। সামনের জনের আঘাত প্রতিহত করেই বিদ্যুৎগতিতে তাকে পেছনে নয়তো ডানে বা বায়ে ঘুরতে হচ্ছে। হঠাৎ নীল বর্ম পরা লোকটা প্রচণ্ড এক আঘাত হানলো ব্ল্যাক নাইটের ঘোড়া লক্ষ্য করে। সঙ্গে সঙ্গে আরোহীকে নিয়ে মাটিতে পড়ে গেল ঘোড়াটা। লাফ দিয়ে এগিয়ে এলো নীল পোশাক পরা নাইট।

আর দেরি করা সমীচীন মনে করলো না ওয়াম্বা। শিঙাটা মুখে লাগিয়ে জোরে ফুঁ দিলো তিনবার। অমনি গুণ্ডাগুলো চমকে উঠে পিছিয়ে গেল কয়েক পা। প্রত্যেকেরই অস্ত্র যেন জমে গেছে যার যার হাতের সাথে। ওয়াম্বা একজনের কাছ থেকে একটা তলোয়ার কেড়ে নিয়ে ছুটে গেল ব্ল্যাক নাইটের সাহায্যে।

লজ্জা করে না, ভীরুর দল! যত না তলোয়ার চালাচ্ছে তার চেয়ে বেশি চিৎকার করছে ওয়াম্বা। সামান্য একটা শিঙার শব্দ শুনে পালাচ্ছো! তাও কিনা বাজিয়েছে একটা ভড়!

এবার আবার ব্ল্যাক নাইটকে আক্রমণ করলো খুনীরা। বিরাট একটা ওক গাছের গুঁড়িতে পিঠ ঠেকিয়ে তলোয়ার হাতে আত্মরক্ষা করতে লাগলো নাইট। তলোয়ার দিয়ে বেশ কিছুক্ষণ চষ্টা করার পরও যখন ব্যর্থ হলো তখন আবার বর্শা তুলে নিলো নীল-নাইট। বাগিয়ে ধরে ছুটে আসতে লাগলো। ওয়াও ছুটলো তলোয়ার হাতে। নীলনাইটের ঘোড়ার পায়ে গায়ের সমস্ত জোর দিয়ে একটা আঘাত হানলো সে। ঘোড়া এবং আরোহী দুজনই পড়ে গেল মাটিতে। এযাত্রা বাঁচলো বটে ব্ল্যাক নাইট কিন্তু আর কতক্ষণ বাঁচবে তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। সে মাটিতে দাঁড়িয়ে, একা; প্রতিপক্ষ ছসাত জন। ক্রমেই ক্লান্ত হয়ে পড়েছে সে।

এই সময় হঠাৎ লেজের দিকে হাঁসের পালক লাগানো একটা তীর এসে লাগলো এক আক্রমণকারীর বুকে। লুটিয়ে পড়লো লোকটা। মুহূর্তে ছুটে এলো আরো তীর, এবার এক ঝাঁক। আরো কয়েক জন দুবৃত্ত পড়ে গেল আহত বা নিহত হয়ে। নীল-নাইটও আছে তাদের ভেতর।

কয়েক সেকেন্ড পরেই গাছপালার আড়াল থেকে বেরিয়ে এলো একদল লোক। সবার পরনে সবুজ পোশাক, হাতে তীর ধনুক। দলের একেবারে সামনে লক্সলি আর কপম্যানহাস্টের সন্ন্যাসী।

লক্সলিকে ধন্যবাদ জানালো ব্ল্যাক নাইট। লক্সলির মনে হলো আজ যেন একটু গম্ভীর ব্ল্যাক নাইটের কণ্ঠস্বর।

চলো দেখি, কে এই নীল-নাইট? বলে এগিয়ে গেল ব্ল্যাক নাইট। ওয়াম্বা, শিয়োস্ত্রাণটা খোলো তো!

নির্দেশ পালন করলো ওয়াম্বা।

ওয়াল্ডেমার! সবিস্ময়ে উচ্চারণ করলো ব্ল্যাক নাইট। কে পাঠিয়েছে তোমাকে?

আপনার ভাই, রাজপুত্র জন।

আমার ভাই জন! দয়া ভিক্ষা চাইবে না, ওয়াল্ডেমার?

সিংহ কখনো দয়া করে না।

আহত পশুকে আক্রমণও করে না সিংহ। না ওয়েল্ডেমার, তোমাকে আমি হত্যা করবো না। তবে, তিন দিনের ভেতর ইংল্যান্ড ছাড়বে তুমি। না হলে তোমার ভাগ্যে কি আছে আমি বলতে পারি না। লক্সলি, ওকে একটা ঘোড়া দিয়ে দাও।

তার চেয়ে ওর বুকে একটা তীর ঢুকিয়ে দিতে পারলেই ভালো লাগতো আমার। কিন্তু আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে আপনার আদেশ পালন করতেই হবে।

হ্যাঁ, আমার আদেশ তোমাকে পালন করতেই হবে। আমি ইংল্যান্ডের রাজা রিচার্ড।

চমকে উঠলো লক্সলি। সঙ্গে সঙ্গে রাজদ্রোহীরা হাঁটু গেড়ে বসে রাজার প্রতি তাদের আনুগত্য প্রকাশ করলো।

বন্ধুগণ, তোমরা উঠে দাঁড়াও, রিচার্ড বললেন। আজ তোমরা আমার জীবন বাঁচিয়েছো। টরকুইলস্টোনে তোমাদের বীরত্ব আমি দেখেছি। তোমাদের আমি ক্ষমা করলাম। আজ থেকে তোমরা আর রাজদ্রোহী নও, রাজার মিত্র। ললির দিকে ফিরলেন রিচার্ড। ললি–শুরু করলেন তিনি।

আমাকে আর ও নামে ডাকবেন না, মহানুভব, বাধা দিয়ে বললো লক্সলি। আমি শেরউড বনের রবিনহুড।

ঠিক এই সময় আইভানহো আর গাৰ্থ টগবগিয়ে ঘোড়া ছুটিয়ে হাজির হলে সেখানে। রিচার্ডের ধূলি মলিন চেহারা, সামনে ছসাতটা আহত নিহত দেহ, চারপাশে বনদস্যুদের ভীড়–এসব দেখে আইভানহো বিস্মিত হয়ে ভাবতে লাগলো, রিচার্ডকে রাজা বলে না ব্ল্যাক নাইট বলে সম্বোধন করবে।

তার দ্বিধা বুঝতে পারলেন রিচার্ড। বললেন, আইভানহো, আমার আসল নামেই এখন তুমি আমাকে ডাকতে পারো। এই মাত্র এদের আমি বললাম, আমি কে। কিন্তু তোমার ওপর খুবই অসন্তুষ্ট হয়েছি আমি। কালকের আগে সেইন্ট বটল প্রায়োরি ছাড়তে নিষেধ করেছিলাম তোমাকে।

আমি তো পুরোপুরি ভালো হয়ে গেছি, মহানুভব, বললো আইভানহো।

তাহলে চলো কনিংসবার্গে। আজই তোমার বাবার সাথে দেখা করবো আমি। কিন্তু তার আগে কিছু খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা করতে হয় যে, রবিনহুড। এতক্ষণ লড়াই করে শুধু ক্লান্তই হইনি, খিদেও পেয়েছে।

নিশ্চয়ই, মহানুভব। কিছুক্ষণ সময় দিন আমাকে।

একটা ওক গাছের নিচে ভোজের ব্যবস্থা হলো। আয়োজন সামান্য। হরিণের মাংস আর এল। সবাই ফুর্তির সঙ্গে তাই খেলো। খাওয়ার ফাকে ফাঁকে নানা গল্পগুজব, ঠাট্টা তামাশা চলতে লাগলো। সামনে যে দেশের রাজা বসে আছেন, তা যেন তারা ভুলে গেছে। রাজাও তাঁর গাম্ভীর্য ভুলে ওদের ঠাট্টা রসিকতায় যোগ দিয়েছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *