২০. দুলে উঠল ঘরটা

দুলে উঠল ঘরটা।

মেঝেতে পড়ে ল্যাম্প ভাঙল, ইলেকট্রিকের তার ছিঁড়ে গেল, ফুলিঙ্গের ফুলঝুরি ছিটাচ্ছে।

আগুন যেন না ধরে! ঈশ্বর! প্রার্থনা করছে এলসি। আগুন ধরতে দিয়ো না!

আরও ফুলঝুরি ছিটল কয়েক সেকেণ্ড, তীব্র নীলচে সাদা আলো ঝিলিক দিল। তারপর অন্ধকার। কাঠের গোঙানি বাড়ছে। রোম-খাড়া-করা কিচকিচ আওয়াজ তুলে কাঠের শরীর থেকে বেরিয়ে আসছে জোড়ার পেরেকগুলো।

ভীষণ ভাবে দুলে উঠল আরেকবার ঘরটা। চেঁচিয়ে উঠল মিসেস নিকারো।

বাঁচাও! আল্লা! চিৎকার শুরু করল মুসা। এই কেউ শুনছ? বাঁচাও!

কেউ জবাব দিল না। সাহায্য করতে এল না কেউ।

আর বাঁচব না! এলসি বলল। পাহাড়টাই ধসে যাবে রে, আর বাঁচব না…!

তার কথা শেষ হওয়ার আগেই হড়কে আরও দুই মিটার সরে গেল বাড়িটা। অন্ধকারে এদিক ওদিক ছিটকে পড়ল চেয়ারগুলো। মুসা গিয়ে পড়ল বিছানার ওপর, কিশোরের চেয়ারটা গেল কাত হয়ে।

মিসেস নিকারো? চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল কিশোর, আপনি ঠিক আছেন?

আমাকে জিজ্ঞেস করছ? এই অবস্থায় ভাল থাকা যায়? এলসি, তুমি কোথায়?

মেঝেতে।

পুলিশ আসবেই, কিশোর বলল। নিশ্চয় খবর দিয়েছে মিস্টার রোজার। রবিন, ভাল আছ? মুসা, কোথায় তুমি?

আছি, গলা কাঁপছে রবিনের।

আমি এখানে, জবাব দিল মুসা।

অপেক্ষা করছে ওরা। শুনছে। জলস্রোতের শব্দ কানে এল, ছাত থেকে বৃষ্টির পানি গড়িয়ে পড়ার আওয়াজ নয়। বেকায়দা ভঙ্গিতে কাত হয়ে আছে কিশোর। হাত ব্যথা করছে, বাধা জায়গাগুলোতে। কাদা আর রাসায়নিক পদার্থের ভেজা ভেজা একটা গন্ধ আসছে। আতঙ্কিত হয়ে পড়ল সে। বুঝতে পারল, ভেঙে যাচ্ছে। সুইমিং পুলের পাড়। হাজার হাজার গ্যালন পানি এসে ঝাঁপিয়ে পড়বে ওদের ওপর, কুটোর মত ভাসিয়ে নিয়ে যাবে।

খাইছে! পানি আসছে কোত্থেকে! অন্ধকারে শোনা গেল মুসার গলা।

কিশোরের মত এলসিও বুঝে গেছে কারণটা। সাহায্যের জন্যে চেঁচাতে শুরু করল আবার।

এইবার জবাব মিলল।

ওখানে! চিৎকার করে বলল একটা কণ্ঠ। ওরা ওখানে!

দরজা খোলার চেষ্টা করল কেউ। কিন্তু আটকে গেছে ওটা। ভয়ঙ্কর আরেক দুলুনি। পুলের দিকে মুখ করা জানালাগুলো ভেঙে কাচের গুঁড়ো ছড়িয়ে পড়ল মেঝেতে। আলো দেখা গেল। টর্চ হাতে ঘোরাঘুরি করছে দুজন লোক। হইচই করছে। কলকল করে পানি ঢুকতে আরম্ভ করল ঘরে। ভাঙা জানালার সামনে দেখা গেল একটা মুখ।

মিসেস নিকারোকে আগে তুলুন, চেঁচিয়ে বলল কিশোর। মিসেস নিকারো!,

জানালা দিয়ে ঢুকল একজন পুলিশ। তার পেছনেই একজন ফায়ারম্যান। টর্চের আলোয় বন্দিদের অবস্থা দেখে আঁতকে উঠল সে, সর্বনাশ…!

চোখের পলকে এসে মিসেস নিকারো আর এলসিকে তুলে নিল দুজনে, বাঁধা অবস্থায়। গলা ফাটিয়ে এখনও ঈশ্বরকে ডেকে চলেছে দুই মহিলা। আরও লোক ঢুকল ঘরে। তিন গোয়েন্দাকেও বের করা হল। বাঁধন কেটে দেয়া হল সকলের। একটা মুহূর্ত আর দেরি করল না কেউ। নামতে শুরু করল পাহাড় থেকে। বার বার হোঁচট খেয়ে, পিছলে পড়ে, অনেক কষ্টে অবশেষে হাইওয়েতে নেমে এল ওরা।

সেখানে গাড়ির ভিড়, অনেক ইঞ্জিনের গুঞ্জন। সার্চলাইটের আলো যেন ঝাড়ু দিয়ে ফিরছে সমস্ত পাহাড়টাকে।

বলেছিলাম না, ওখানেই আছে! ভিড় ঠেলে এগিয়ে আসতে লাগল রোজার। কাছে এসে কিশোরের হাত ধরে প্রায় নাচতে শুরু করল। আমি বলেছি ওদের, তোমরা ওখানে। যাক বাঁচা গেল। থ্যাঙ্ক গড!

আরি, আমার বোট! হঠাৎ চিৎকার করে বলল মিসেস নিকারো।

বাড়িটা অন্ধকার, অফিসটাও। জেটির ধারে সাদা ট্রাকটা এখন নেই। একশো মিটার দূরে দেখা গেল ছুটন্ত আলো, টিনার।

ডাকাত! ডাকাতেরা আমার বোট নিয়ে গেল? চেঁচিয়ে বলল এলসি। যদি মনে করে থাকে। বাক্যটা শেষ করল না সে। দৌড় দিল জেটির দিকে।

এস! বলেই রবিনের হাত ধরে টানল মুসা। ছুটল এলসির পেছনে।

মিস্টার রোজার, কিশোর বলল। পুলিশকে বলুন কোস্ট গার্ডককে জানাতে। বোটের লোকগুলো আর্মস স্মাগল করছে।

তুমি যাও, মিসেস নিকারো বলল। আমি বলছি সব।

মাথা নেড়ে সায় জানিয়ে কিশোরও দৌড় দিল।

ধাক্কা দিয়ে দরজা খুলে অফিসে ঢুকল এলসি। টান মেরে খুলল একটা ড্রয়ার। একটা চাবি তুলে নিয়ে মুসাকে বলল অফিসের পেছনের লকার থেকে দুটো দাঁড় নিয়ে আসতে।

হাইওয়েতে হট্টগোল শুরু হল। গর্জে উঠল একটা বড় ট্রাকের ইঞ্জিন। বিকট শব্দ করে আছড়ে পড়ে ভাঙল মোটেলটা, ভাঙা টুকরো-টাকরা ছিটকে গেল এদিক ওদিক। বাড়ি-ভাঙা জিনিসপত্রে বোঝাই হয়ে গেল রাস্তার একপাশের অর্ধেকটা। ভেঙে গেছে সুইমিং পুলের পাড়, ঢাল বেয়ে গড়িয়ে এল কাদা মেশানো পানির স্রোত। বান ডাকল যেন পথের ওপর।

সেদিকে চেয়ে মাত্র একটা মুহূর্ত নষ্ট করল এলসি। তারপর ঘুরেই দৌড় দিল বৃষ্টিভেজা ডকের দিকে। পেছনে তিন গোয়েন্দা।

সাইমনের স্পীডবোটটা নেব আমরা, এলসি বলল। টিনার চেয়ে স্পীড বেশি ওটার।

জেটিতে বাঁধা রয়েছে একটা দাড়টানা নৌকা। লাফ দিয়ে তাতে উঠল এলসি। দুলে উঠল নৌকাটা। তিন গোয়েন্দাও উঠল। দড়ি কেটে দিল কিশোর। ছপাৎ করে পানিতে দাঁড় ফেলল মুসা।

আরে, টিনার আলো কই! এলসি বলল। দেখা যাচ্ছে না আর।

উপকূল ধরে যাচ্ছে। মোড় নিয়েছে বোধহয়, বলল কিশোর।

সারেঙও না সারেঙের জাতও না বিল। পাথরে ধাক্কা লাগিয়ে বোটটা ডোবাবে আজ!

স্পীডবোটের গায়ে লাগল নৌকা। টান দিয়ে ককপিটের তেরপল সরাল ওরা। এলসি উঠল, আগে। তারপর মুসা আর রবিন। ইতিমধ্যে বয়ার সঙ্গে নৌকাটা বেঁধে ফেলেছে কিশোর। খুক করে ছোট্ট কাশি দিয়েই স্টার্ট হয়ে গেল চমৎকার ইঞ্জিন। ছুটল বোট।

বৃষ্টির বিরাম নেই। বাতাসাওও পাল্লা দিয়ে চলেছে। বড় বড় ঢেউ। বোটের তলায় চাপড় মেরে যেন কামানের গর্জন তুলছে। অভিজ্ঞ দক্ষ হাতে হুইল ধরেছে এলসি। গাদাগাদি করে বসে বোটের ধার আঁকড়ে ধরে রেখেছে ছেলেরা, যাতে ঝাঁকুনির চোটে উড়ে গিয়ে না পড়ে সাগরে।

আলোটা প্রথম রবিনের চোখে পড়ল। দূরে চলে গেছে। অস্পষ্ট। হাত তুলে বলল, ওই যায়!

বোটের গতি আরও বাড়িয়ে দিল এলসি। উত্তাল এই সাগরে মস্ত ঝুঁকি নিয়েছে।

হঠাৎ জ্বলে ওঠা উজ্জ্বল আলো ক্ষণিকের জন্যে যেন অন্ধ করে দিল ওদের। উত্তেজনায় এতক্ষণ খেয়াল করেনি, এখন কানে আসছে হেলিকপ্টারের রোটরে ক্যাট-ক্যাট-ক্যাট-ক্যাট। গাঢ় অন্ধকারে চাদর ফুড়ে কালো পানিতে বদমাশদের খুঁজে বেড়াচ্ছে সার্চলাইট।

কোস্ট গার্ড! এলসি বলল।

নিভিয়ে ফেলা হয়েছে টিনার আলো। কালো আকাশের পটভূমিতে কালচে একটা ছায়ার মত এখন চোখে পড়ছে ওটা। কাছে চলে এসেছে স্পীডবোট। আবছামত দেখা যাচ্ছে চলার পথে টিনার রেখে যাওয়া ফেনিল জলরেখা।

এহ্‌হে! চেঁচিয়ে উঠল এলসি। গভীর সাগরের দিকে চলে যাচ্ছে। শয়তানের দল! বেরিয়ে যাবে!

একবারে হুইলের পুরো অর্ধেকটা ঘুরিয়ে দিল সে। মোড় নিতে গিয়ে বিপজ্জনক ভঙ্গিতে কাত হয়ে গেল স্পীডবোট। গোঁ গোঁ করে তীব্র প্রতিবাদ জানাল ইঞ্জিন। টিনার জলরেখা ধরে ছুটল লাফিয়ে লাফিয়ে। দেখতে দেখতে চলে এল বোটটার পাশে। রাইফেলের শব্দ শোনা গেল, স্পীডবোটকে সই করে গুলি আরম্ভ করেছে।

ইতরের বাচ্চা! গাল দিল এলসি।

সামনে চলে এল স্পীডবোট। শাঁ করে বেরিয়ে গেল বোটের নাকের ডগা দিয়ে। ধাক্কা বাঁচাতে গিয়ে বোটেরও নাক ঘুরিয়ে ফেলতে হল। কাত হয়ে যাচ্ছে। উল্টে যাওয়ার ভয়ে সঙ্গে সঙ্গে কমিয়ে দেয়া হল গতি।

আবার গুলির শব্দ। এবারও ব্যর্থ হল নিশানা। বোটের কাছে পানিতে পড়ল বুলেট।

এই সময় খোলা সাগরের দিক থেকে ফিরে এল হেলিকপ্টার। ওটার শক্তিশালী নীলচে-সাদা আলো যেন বিদ্ধ করল টিনাকে।

পেয়েছে এতক্ষণে! স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল কিশোর। তাকাল তীরের দিকে। ওখানকার আলোগুলো বেশি কাছে মনে হচ্ছে এখন।

কিন্তু কোস্ট গার্ডদের কাটারটা কই? জাহাজটাকে দেখার জন্যে এদিক ওদিক তাকাল এলসি।

টিনার গতি আবার বেড়েছে। একেবেঁকে ছুটছে, যেন জেঁকের মত লেগে থাক্কা হেলিকপ্টারের আলোকরশ্মি ঝেড়ে ফেলতে চাইছে গা থেকে। তীরের দিকে গিয়ে বাঁচতে পারবে না, বুঝে গেছে, আবার মুখ ঘোরাল খোলা সাগরের দিকে।

হা-হা করে হেসে উঠল এলসি। আবার স্পীডবোটটাকে নিয়ে এল টিনার গলুইয়ের সামনে। ধাক্কা লাগার ভয়ে আবার গতি কমাতে বাধ্য হল বোটের সারেঙ।

বাঁয়ে দেখল কিশোর, মাথায় ফেনার মুকুট পরে তাথৈ নৃত্য জুড়েছে ঢেউ। ভীমগতিতে ধেয়ে আসছে বিশাল এক ঢেউ, যেন ছোটখাট এক পাহাড়।

হুঁশিয়ার! চেঁচিয়ে উঠল মুসা।

বনবন করে স্টিয়ারিং ঘোরাল এলসি। কাত হয়ে উল্টে যাওয়ার অবস্থা হল স্পীডবোটটার। পানির পাহাড়ের প্রায় গা ছুঁয়ে বেরিয়ে চলে এল কোনমতে।

টিনা পারল না। গা বাঁচাতে গিয়ে পাশে কাটল। চোখা পাথরে ঘষা লেগে ছিঁড়ে রয়ে গেল অর্ধেকটা তলা। কাঠ ভাঙার মড়মড় তো নয়, মুসার মনে হল বোটটার অন্তিম আর্তনাদ। লাফ দিয়ে পানির ওপরে উঠে গেল টিনা, ঝপাং করে পড়ল আবার। চেঁচাতে শুরু করল আরোহীরা। লকলক করে উঠল কমলা-আগুনের জিভ।

হায় হায়, আগুন লেগে গেছে! ককিয়ে উঠল এলসি।

কাত হয়ে ভাসছে এখন টিনা, ডুবে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়ছে আগুন। এলসি কাঁদছে। আগুনের আলোয় দেখা গেল, তার দুগালে অশ্রুধারা। কাঁদতে কাঁদতে বলল, নিশ্চয় ফুয়েল লাইন ফেটে গেছে!

টিনার ডেক থেকে সাগরে ঝাঁপিয়ে পড়ল একজন, তারপর আরেকজন। শেষে আরও দুজন।

নোঙরটা তুলে নাও একজনে, কঠিন কণ্ঠে বলল এলসি। বিন্দুমাত্র মায়া করবে না। আমাদের বোটে যেন উঠতে না পারে।

পারবে না, ম্যাডাম, কথা দিল মুসা। দুহাতে ধরে তুলে নিয়েছে ভারি নোঙরটা।

স্পীডবোটের দিকে সাঁতরে আসতে দেখা গেল একজনকে। সিটের নিচে লাইফজ্যাকেট আছে, আবার বলল এলসি। বের কর ওগুলো।

রবিন আর কিশোর মিলে বের করল। একটা জ্যাকেট ছুঁড়ে দিল কিশোর। ওটা ধরে সাঁতরে আরও কাছে চলে এল বিল, স্পীডবোটে ওঠার ইচ্ছে। বাড়ি মারার জন্যে নোঙর তুলল মুসা। থেমে গেল বিল। আর কাছে আসার চেষ্টা করল না। অন্য তিনজনও স্পীডবোট থেকে দূরে রইল। একটা করে জ্যাকেট ছুঁড়ে দিল সবাইকে কিশোর।

লম্বা একটা দড়ি খুঁজে বের করল রবিন। বোটের সঙ্গে একমাথা বেঁধে দড়িটা ছুঁড়ে দিল পানিতে। যাতে ওটা ধরে ভাসতে পারে বিল আর তার তিন সঙ্গী।

দাউ দাউ করে জ্বলছে আগুন। গ্রাস করে নিয়েছে পুরো বোটটাকেই। আলোয় আলোকিত করে ফেলেছে সাগরের একটা অংশ। বিস্ফোরণের বিকট শব্দ, উড়ে চলে গেল বোটের একাংশ, বাকিটা টুপ করে ডুবে গেল পাথরের মত।

অবশেষে এল কোস্ট গার্ডদের জাহাজ। তখনও দুর্ঘটনার জায়গায়ই অপেক্ষা করছে স্পীডবোট। দড়ি ধরে ঢেউয়ের মধ্যে খাবি খাচ্ছে চার ডাকাত। টিনা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *