১.৮ আর্থার হোমউডের একটা চিঠি

একত্রিশে আগস্ট আর্থার হোমউডের একটা চিঠি পেল ডাক্তার সেওয়ার্ড।

প্রিয় জন,

একটা বিশেষ উপকারের আশায় তোর হাসপাতালে এসেছিলাম। কিন্তু বহুক্ষণ অপেক্ষা করেও তোক না পেয়ে এই চিঠি লিখে রেখে যাচ্ছি। দিন কয়েক ধরে সাংঘাতিক অসুস্থ হয়ে পড়েছে লুসি। দিনকে দিন কেমন যেন দুর্বল আর রোগা হয়ে যাচ্ছে সে। লুসিকে এর কারণ জিজ্ঞেস করে কোন সদুত্তর পাইনি। ওর মা-ও রলতে পারছেন না কিছু। অথচ কিছুতেই ডাক্তার দেখাতে রাজি হচ্ছে না ও। অনেক সাধ্য-সাধনা করে শেষ পর্যন্ত রাজি করানো গেছে ওকে, কিন্তু এক শর্তে, তুই ছাড়া আর কোন ডাক্তারের সাহায্য নেবে না সে। অতএব এবারের মত লুসিকে বাঁচা। হয়ত লুসির সামনে আসতে সঙ্কোচ বোধ করবি তুই, তোর অবস্থায় হলে আমিও তাই করতাম। কিন্তু অন্তত লুসির দিকে চেয়ে একবার আয়। কাল দুপুর নাগাদ তোর আগমন প্রত্যাশা করতে পারি কি?

তোর আর্থার।

পহেলা সেপ্টেম্বর আর্থারের কাছ থেকে আরেকটা ছোট্ট সংবাদ পেল সেওয়ার্ড।

প্রিয় জন,

বাবার অসুখ সাংঘাতিক রকম বেড়ে গেছে। অতএব এক্ষুণি বাড়ি রওনা হচ্ছি। লুসির ভার রইল তোর ওপর

আর্থার।

যথাসময়েই লুসির বাড়িতে এসে পৌঁছল ডাক্তার সেওয়ার্ড। ভালমত ওকে পরীক্ষা করে দেখার পর সেদিনই আর্থারকে একটা চিঠি লিখে জানাল সে।

১ সেপ্টেম্বর, হুইটবি।

আর্থার,

যথাসময়েই লুসিদের বাড়ি এসে পৌঁছেছি। লুসিকে বার বার পরীক্ষা করেও ওর শরীরে কোন রোগের লক্ষণ আমার চোখে পড়েনি। কিন্তু তবু কেন জানি সন্তুষ্ট হতে পারছি না। গতকাল ওকে যেমন দেখে গিয়েছিলাম তেমনটি আর নেই এখন ও। সন্দেহ হচ্ছে ওর রোগটা শরীরে নয়, মনে।

বার বার ওকে প্রশ্ন করে কিছু অদ্ভুত কথা জানতে পারলাম। মাঝে মাঝে শ্বাস নিতে নাকি ভীষণ কষ্ট হয় ওর, ক্লান্তিতে বুজে আসে দুচোখের পাতা। ঘুমের মাঝে প্রায়ই দুঃস্বপ্ন দেখে জেগে ওঠে, কিন্তু কি দেখেছে ঘুম ভাঙার পর তা আর মনে করতে পারে না। ছেলেবেলায় নাকি কখনও কখনও নিশিতে পেত ওকে, মাঝখানে বহুদিন ওটা আর হত না, বলতে গেলে সেরেই গিয়েছিল। কিন্তু গত কিছুদিন ধরে আবার ফিরে এসেছে পুরানো অভ্যাসটা।

সবদিক ভেবে স্থির করেছি ওকে সুস্থ করে তোলা আমার একার সাধ্যে কুলাবে না। কাজেই আমার ওস্তাদ প্রফেসর ভ্যান হেলসিংকে খবর পাঠাচ্ছি। জানিসই তো, নানারকম জটিল ব্যাধি-বিশেষ করে মানসিক রোগ সারাতে আজকের পৃথিবীতে এর জুড়ি মেলা ভার।

অত্যন্ত ব্যস্ত মানুষ প্রফেসর, তাঁর সময়ের অনেক দাম। কিন্তু আমাকে অত্যন্ত স্নেহ করেন উনি, আমি বললে তিনি না এসে পারবেন না, এ বিশ্বাস আমার আছে। কিছু ভাবিস না তুই! এসে যখন একবার পড়েছি চেষ্টার ত্রুটি রাখব না।

তোর জন।

ডাক্তার সেওয়ার্ডের চিঠি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার জবাব পাঠালেন প্রফেসর আব্রাহাম ভ্যান হেলসিং।

২ সেপ্টেম্বর, আমস্টারডাম।

ডিয়ার জন,

কয়েক মিনিট আগে তোমার চিঠি পেলাম। চিন্তা করো না, এখুনি হুইটবির উদ্দেশে রওনা হয়ে পড়ছি আমি। ক্রিসেন্টের গ্রেট ইস্টার্ন হোটেলে আমার জন্যে একটা ঘর ঠিক করে রেখো। আশীর্বাদান্তে,

ভ্যান হেলসিং।

৩ সেপ্টেম্বর আর্থারকে আর একটা চিঠি লিখল সেওয়ার্ড।

আর্থার,

বলেছিলাম না, আমি বললে আসবেনই প্রফেসর ভ্যান হেলসিং। আজ এখানে এসে পৌঁছেছেন তিনি, লুসিকে পরীক্ষাও করেছেন। লুসিকে দেখেই তার মুখ কেমন যেন থমথমে গম্ভীর হয়ে গেছে, ফেন ভয়ঙ্কর কোন সম্ভাবনার ইঙ্গিত পেয়েছেন তিনি। ওঁকে জিজ্ঞেস করলে শুধু বলেছেন লুসিকে আরও ভাল করে পরীক্ষা না করে কিছু বলতে পারবেন না উনি।

তবে আশার কথা, প্রফেসর এখানে আসার সঙ্গে সঙ্গে একটু সুস্থ মনে হচ্ছে লুসিকে। ডাক্তারের সংস্পর্শে এলেই রোগীর রোগ অর্ধেক সেরে যায়, লুসির ব্যবহার বোধহয় তাই প্রমাণ করছে।

অযথা দুশ্চিন্তা করবি না। তোর আব্বা এখন কেমন আছেন জানাবি।

তোর জন।

প্রথমবারের মত লুসিকে দেখা শেষ করে কিছু জরুরী কাজ সারতে আমস্টারডামে ফিরে গেছেন প্রফেসর হেলসিং। সেওয়ার্ডকে বলে গেছেন, লুসির অবস্থা সম্পর্কে রোজ যেন টেলিগ্রাম করে তাকে জানানো হয়। কর্তব্যকাজে বিন্দুমাত্র গাফিলতি না করে যথারীতি প্রফেসরকে তারবার্তা পাঠিয়েছে সেওয়ার্ড।

পাঠানো তারবার্তাগুলোঃ

৪ সেপ্টেম্বরঃ আজ রোগীর অবস্থা অনেকটা ভাল।

৫ সেপ্টেম্বর ও অবস্থার আরও উন্নতি হয়েছে। ঘুম স্বাভাবিক। ক্রমশ কেটে যাচ্ছে চেহারার বিবর্ণ ভাবটা।

৬ সেপ্টেম্বরঃ হঠাৎ আজ অবস্থার অত্যন্ত অবনতি ঘটেছে। এক্ষুণি চলে আসুন।

এই দিনে আর্থারকেও একটা চিঠি লিখল জন।

আর্থার,

খবর ভাল না। হঠাৎ করে আজ সকাল থেকেই লুসির অবস্থা খারাপের দিকে মোড় নিয়েছে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব প্রফেসর হেলসিংকে আসতে মেসেজ পাঠিয়ে দিয়েছি। তোকে কথাটা না জানালেও পারতাম। কিন্তু আমার মনে হয় অবস্থার চাপ সহ্য করার মত মানসিক শক্তি তোর আছে। ঠিক করেছি, লুসির ব্যাপারে যাই কিছু করি তোকে না জানিয়ে করব না। হাজার হোক, ও তোর ভাবী স্ত্রী। ওর ভালমন্দের দায়িত্ব আমাদের চেয়ে তোর অনেক বেশি।

তোর জন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *