১.৬ মিনা মুরের ডায়েরী থেকে

মিনা মুরের ডায়েরী থেকে

২৬ জুলাই।

গতকাল মি. হকিন্সের কাছে লেখা জোনাথনের একটা চিঠি পেয়েছি। কাউন্ট ড্রাকুলার প্রাসাদ-দুর্গ থেকে লেখা মাত্র এক লাইনের ছোট্ট চিঠি লিখেছে বাড়ি রওনা হচ্ছি। চিঠিটা পড়ে কিছুই বুঝলাম না। সমস্ত ব্যাপারটাই কেমন যেন খাপছাড়া মনে হচ্ছে আমার কাছে।

লুসিদের বাড়িতেই এখনও আছি আমি। ভালই আছে সুসি, কিন্তু হঠাৎ করেই ঘুমের ঘোরে হেঁটে চলার সেই পুরানো অভ্যাসটা আবার ফিরে এসেছে ওর মাঝে। লুসির মার সাথে ব্যাপারটা নিয়ে গোপনে আলাপ করে সিদ্ধান্ত নিয়েছি, রাতে আমি নিজের হাতে বাইরে থেকে ওর ঘরে তালা লাগিয়ে দিয়ে তারপর শুতে যাব। এই ঘুমের ঘোরে হাঁটা জিনিসটা ভয়ঙ্কর, এতে কখনও-সখনও প্রাণ সংশয় পর্যন্ত দেখা দিতে পারে। লুসির মার মতে ঘুমের ঘোরে হাঁটতে হাঁটতে নিজের অজান্তেই পাহাড় কিংবা ছাদের কার্নিসের একেবারে প্রান্তে এসে থমকে দাঁড়ায় নিশিতে পাওয়া মানুষ, তারপর সেই অবস্থায়ই হঠাৎ ঘোর কেটে গিয়ে নিজের অবস্থান দেখে চমকে গিয়ে নিচে পড়ে যায়। লুসির বাবাকেও নাকি প্রায় নিশিতে পেত।

মেয়েকে নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েছেন লুসির মা; ক্রমেই ঘনিয়ে আসছে লুসির বিয়ে। এর মাঝে যদি কোন অঘটন ঘটে যায়, ভাবনার কথাই। শিগগিরই এখানে এস পৌঁছুবে অসুস্থ লর্ড গোডালমিং-এর একমাত্র পুত্র আর্থর হোমউড। আমার মনে হয় নিশি-টিশি কিছু না, আসলে আর্থারের প্রতীক্ষায়ই ক্ৰমে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছে সুলি এবং সেই চিন্তায় ঘুম না আসাতে বিছানা ছেড়ে উঠে আপনমনে ভাবতে ভাবতে ঘুরে বেড়ায় সে।

২৭ জুলাই।

আর কোনরকম খবর পাইনি জোনাথনের কাছ থেকে। ওর জন্যে আমার আশঙ্কা বেড়ে যাচ্ছে দিন দিন। ছোট্ট একটা চিঠি যদি শুধু পেতাম ওর কাছ থেকে।

ওদিকে ঘুমের ঘোরে হাঁটার অভ্যাস কিন্তু দিনকে দিন বেড়েই চলেছে লুসির। বাইরে থেকে অবশ্য ওর ঘর তালাবদ্ধ করে রাখি আমি, কিন্তু ঘরের ভেতরই ওর হাঁটার শব্দে প্রায় রাতেই ঘুম ভেঙে যায় আমার। জোনাথনের কোন খবর নেই, ওদিকে লুসির এই অবস্থা, সব মিলিয়ে দুর্ভাবনার শেষ নেই আমার। বুঝতে পারছি এ-অবস্থা আর বেশিদিন চললে অসুখে পড়ে যাব আমি। একমাত্র সান্ত্বনা, সুসির স্বাস্থ্যের কোন পরিবর্তন ঘটেনি এখনও। এই সময় তারবার্তা এল আর্থারের কাছ থেকে, ওর বাবার স্বাস্থ্যের আরও অবনতি ঘটেছে, কাজেই ওর আসতে আরও কদিন দেরি হবে।

৩ আগষ্ট।

আরও সপ্তাহখানেক কেটে গেল। এখন পর্যন্ত কোন খবর নেই জোনাথনের। কি হল ওর? সাংঘাতিক কোন অসুখে পড়েছে? ওর চিন্তায় রাতে ভাল ঘুম হয় না আমার। ঘুমের ঘোরে হাঁটা একটু কমেছে লুসির, কিন্তু নতুন আরেক পরিবর্তন টের পাওয়া যাচ্ছে ওর মাঝে। আগের চেয়ে অনেক শান্ত হয়ে গেছে ও। দশটা কথা জিজ্ঞেস করলে একটার উত্তর পাওয়া যায়। আর রাতের বেলা ঘর থেকে বেরোবার এক উদগ্র ইচ্ছে জেগে উঠেছে ওর মাঝে, অবশ্য কখনই রাতের বেলা ওকে ঘর থেকে বেরোতে দিই না আমি। এ কি ভয়ঙ্কর কোন বিপদের পূর্বলক্ষণ?

৬ আগস্ট।

দেখতে দেখতে কেটে গেল আরও তিনটে দিন, অথচ কোন খবর নেই জোনাথনের। শুধু যদি জানতাম কোথায় আছে ও, তাহলে নিজে গিয়ে দেখা করতে পারতাম তার সাথে। জানি না যখন, দুর্বিষহ হলেও অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোন উপায় নেই।

লুসির মনের অস্বস্তির ভাবটা আরও বেড়ে গেছে। রাতে বলতে গেলে আর বিছানায় পিঠই লাগায় না সে এখন।

আজ একটা অদ্ভুত কথা শুনলাম স্থানীয় লোকদের মুখে। গত রাতে নাকি প্রচণ্ড ঝড় উঠেছিল দূর সাগরে। কথাটা অবশ্য মিথ্যে ভাববার কোন কারণ নেই। এখন পর্যন্ত কালো মেঘে ছেয়ে আছে আকাশ, সূর্যের চিহ্নও দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু বিস্মিত হবার কারণ সেটা নয়, কারণ হল আশ্চর্য ঘন কুয়াশায় ছেয়ে গিয়েছিল দিগন্ত। আর বন্দরের কোলাহল ছাপিয়ে ভেসে এসেছিল একটা বিষণ্ণ চাপা গুম গুম শব্দ, সেই বয়ায় বাধা ঘণ্টার শব্দ। জেলেরা বলছে নিশ্চয়ই কোন না কোন জাহাজ ডুবেছে দূর সাগরে।

একটু আগে লুসির মার সাথে দেখা করতে এসেছিলেন মি. সোয়ালেজ। ঝড়ো বাতাসের ঝাঁপটায় ফুলে ওঠা সাগরের দিকে তাকিয়ে বসে থাকতে থাকতে হঠাৎ গম্ভীর গলায় বলে উঠেছিলেন বৃদ্ধ, জানো, মিনা, কেন যেন মনে হচ্ছে সাংঘাতিক কোন দুর্যোগ ঘনিয়ে আসছে হুইটবিকে কেন্দ্র করে। বাতাসে পৈশাচিকতার গন্ধ পাচ্ছি। সামান্য ব্ল্যাক ম্যাজিক শিখেছিলাম এক সময়। তাই অদ্ভুত কিছু ঘটতে যাবার আগে তা ঠিকই টের পাই আমি।

কথাগুলো বলতে বলতেই মন খারাপ হয়ে গেল মি. সোয়ালেজের। এরপরই উঠে চলে গেলেন তিনি।

৮ আগস্ট।

অদ্ভুত একটা খবর বেরিয়েছে আজ দি ডেইলিগ্রাফ পত্রিকায়। খবরটা আমার মনকে এত নাড়া দিয়েছে যে খবরের বিষয়বস্তুটুকু লিখে রাখছি ডায়েরীর পাতায়।

মিথ্যে বলেনি জেলেরা, সত্যিই প্রচণ্ড ঝড় হয়েছিল আগের রাতে। ডেইলিগ্রাফ পত্রিকার মতে হুইটবি বা তার আশেপাশের এলাকায় এত প্রচণ্ড ঝড় নাকি আর কখনও হয়নি। সেদিন সকাল থেকেই গুমোট ভাব ছিল আবহাওয়ায়, কিন্তু আগস্ট মাসে তা এমন কিছু অভিনব নয়। বাতাসে গুমোট ভাব থাকলেও আকাশ কিন্তু ছিল পরিস্কার। সেদিন শনিবার, অতএব হইটবির আশপাশের মালগ্রেভ উড, রবিনহুড উপসাগর, রিগ মিল, রানসউইক প্রভৃতি দ্বীপ ভ্রমণে বের হয়ে পড়ে হইটবির অ্যাডভেঞ্চার-প্রিয় লোকেরা। বিকেলের একটু পরই বাতাসের গুমোট ভাবটা কেটে গিয়ে বইতে শুরু করে ঝিরঝিরে দখিনা হাওয়া। কিন্তু সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে আবহাওয়ার সম্পূর্ণ পরিবর্তন ঘটে। হঠাৎ করেই ঘন মেঘে ছেয়ে যায় আকাশ। ভয় পেয়ে তীরে ফিরে আসে অধিকাংশ জেলে নৌকা।

রাত দশটার পরই প্রবল হাওয়া বইতে শুরু করে, ফুসে ওঠে সাগর। পাহাড়ের মত বিশাল সব ঢেউ প্রচও বেগে ছুটে এসে আছড়ে পড়তে থাকে হুইটবির উপকূলে। যে দুএকটা জেলে নৌকা সাঁঝের বেলায় ফিরে না এসে তখন পর্যন্ত খোলা সাগরে মাছ ধরছিল তারা আর ফিরে আসতে পারেনি। গ্রাস করে নিয়েছে তাদের উত্তাল সাগর।

ভয়ঙ্কর সে-ঝড়ের বর্ণনা দিতে গিয়ে হুইটবির প্রাচীন নাবিকেরা বলেছে এমন ঝড় নাকি জীবনে আর দেখেনি ওরা। এমনকি তাদের বাপ-দাদাদের মুখেও কখনও শোনননি। সূর্য ডোবার পর থেকে যেমন হঠাৎ করেই শুরু হয়েছিল ঝড়, ভোরবেলা মোরগ ডাকার সঙ্গে সঙ্গে তেমনি হঠাৎ করেই থেমে যায় আবার।

সবচেয়ে আশ্চর্য ব্যাপার হল, ভোরবেলা দুইটবির উপকূলে রহস্যজনকভাবে পড়ে ছিল একটি অচেনা পরিত্যক্ত জাহাজ।

৯ আগস্ট।

খবরের শেষ অংশটুকু লিখে রাখছি আজ। খোঁজখবর করে জানা যায় পরিত্যক্ত জাহাজটির নাম ডিমেটার। কিছুদিন আগে ভার্না বন্দর থেকে মাল নিয়ে রওনা দেয় এই ছোট্ট রাশিয়ান জাহাজটি। জাহাজটিতে করে হুইটবির জনৈক আইনজীবী মি. এস, এফ, বিলিংটনের নামে কয়েকটা বড় বড় কাঠের বাক্স পাঠানো হয়। রাশিয়ান বাণিজ্যদূত এবং স্থানীয় বন্দর কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে। পর্যবেক্ষণের উদ্দেশ্যে ডিমেটারে গিয়ে ওঠে কয়েকজন স্থানীয় সাংবাদিক। জাহাজের ভেতরে তন্ন তন্ন করে খুঁজতে থাকে সাংবাদিকরা। শেষ পর্যন্ত এঞ্জিনরূমে একটিমাত্র মৃতদেহ আবিষ্কার করে ওরা। জাহাজের হুইলের সাথে শক্ত করে বাঁধা ছিল লাশের ডান হাতটা, অন্য হাতে ধরা একটা কাঠের কুশ। লাশের সারা মুখে স্পষ্ট আতঙ্কের ছাপ। পুলিশ সার্জেন জে. এম. কাফিনের মতে দুদিন আগেই মারা গেছে লোকটা। একটা লগবুক পাওয়া গেছে লাশের পকেট থেকে। লগবুকটা পড়ে জানা গেছে ডিমেটার জাহাজের ক্যাপ্টেন ছিলেন মৃত লোকটা।

লগবুকে অদ্ভুত সব ঘটনার উল্লেখ করে গেছেন ডিমেটারের ক্যাপ্টেন। ভয়ঙ্কর, অবিশ্বাস্য ওই ঘটনাগুলোর যথাযথ বিবরণ ডায়েরীতে লিখে রাখছি আমি।

৬ জুলাই।

কয়েকটা বড় বড় বাক্স ভর্তি বালি আর মাটি নিয়ে দুপুরের দিকে রওনা হল আমাদের মালবাহী জাহাজ ডিমেটার। আবহাওয়া পরিষ্কার। আমি বাদে আর পাঁচজন নাবিক, দুজন খালাসী, একজন বাবুর্চি এবং একজন প্রধান সহকারী সহ আরও মোট নজন লোক আছে জাহাজে।

১১ জুলাই।

তুরস্কের সীমান্ত অঞ্চল বসফরাসে এসে প্রবেশ করলাম ভোর হবার আগেই। একটু পরই তদন্তের উদ্দেশ্যে জাহাজে এসে উঠল শুল্ক বিভাগের কয়েকজন লোক। ওদের তদন্ত শেষ হল বিকেল চারটে নাগাদ। ছাড়পত্র পেয়ে আবার চলতে শুরু করল জাহাজ।

১২ জুলাই।

দারদালেস-এ এসে অল্পক্ষণের জন্যে আরও কবার ঝামেলা পোহাতে হল উপকূলরক্ষী ও জলপুলিশের হাতে। আর্কিপেলাগো পার হয়ে এলাম মাঝরাতে।

১৩ জুলাই।

মাতাপান অন্তরীপ ছাড়িয়ে আসার পরপরই একটা চাপা উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ল সমস্ত জাহাজে। কেন যেন একটু আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে নাবিকেরা। কারণটা জানতে পারলাম না।

১৪ জুলাই।

ক্রমশ বেড়েই চলেছে উত্তেজনা। বলিষ্ঠ, কর্মঠ ওই লোকগুলোর এই ব্যবহারের সঠিক কোন কারণ খুঁজে পেলাম না। বহু জিজ্ঞাসাবাদের পর জানতে পারলাম, জাহাজে অস্বাভাবিক কিছু আছে বলে সন্দেহ করছে নাবিকেরা। কথায় কথায় বুকে কুশ চিহ্ন আঁকছে ওরা। এসব নিয়ে কথা কাটাকাটি করতে করতে দুজন তো প্রায় মারামারিই বাধিয়ে দিল। কিন্তু অন্যেরা ধরে শান্ত করে দিল ওদের।

১৬ জুলাই।

পেত্রোফস্কি নামে একজন নাবিককে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না মাঝরাতের পর থেকেই। বহু খোঁজাখুঁজি করেও তার সন্ধান না পেয়ে পুরোপুরি আতঙ্কিত হয়ে উঠেছে নাবিকেরা। একম কিছু ঘটার আশঙ্কা নাকি আগে থেকেই করছিল তারা। ওদের সন্দেহ, সাংঘাতিক বিপদ ঘনিয়ে আসছে ডিমেটারের ওপর।

১৭ জুলাই।

অদ্ভুত একটা ঘটনার উল্লেখ করেছে গতকাল নাবিক ওলগারেন। আগের রাতে পেছনের ডেকে দাঁড়িয়ে পাহারা দিচ্ছিল সে। ঝির ঝির বৃষ্টি পড়ছিল তখন। হঠাৎ খেয়াল করল ওলগারেন, কালো আলখালায় ঢাকা ল মত কে যেন একজন সামনের ডেকের দিকে হালকা পায়ে এগিয়ে যাচ্ছে। লোকটা জাহাজের কেউ নয় এ-ব্যাপারে নিশ্চিত গুলগারেন। আড়ালে থেকে ওকে লক্ষ্য করতে থাকল নাবিক। ওর চোখের সামনে হঠাৎই কোথাও উধাও হয়ে গেল আগন্তুক। কোথায় গেল লোকটা? সামনের ডেকে এমন কোন জায়গা নেই যেখানে চট করে লুকিয়ে পড়তে পারে সে। কেন যেন ভয় ভয় করতে লাগল ওলগারেনের। ডিউটি শেষ হবার পরপরই কথাটা আমাকে এসে জানিয়ে গিয়েছিল সে।

ওলগারেনের কথায় জাহাজটাকে তন্ন তন্ন করে খুঁজে দেখার আদেশ দিলাম সবাইকে। প্রথমে আমার সহকারী তো খেপেই গেল কিন্তু ওকে বুঝিয়ে বলতেই নিতান্ত অনিচ্ছাসত্ত্বেও খুঁজতে গেল সে। জাহাজের প্রত্যেকটি ইঞ্চি খুঁজে দেখার পরও সন্দেহজনক কিছু না দেখে আবার সাহস ফিরে এল নাবিকদের মনে। খুশি মনেই আবার কাজ করতে লাগল ওরা।

২২ জুলাই।

সাংঘাতিক খারাপ আবহাওয়া যাচ্ছে গত তিনদিন ধরে। জাহাজ সামলাতেই হিমশিম খাচ্ছে সবাই, অতএব আর ভয় পাবার সময় পায়নি কেউ। বহু কষ্টে জিব্রাল্টার প্রণালী পেরিয়ে আসার পর আবহাওয়ার একটু পরিবর্তন হয়েছে।

২৪ জুলাই।

আবার দ্বিগুণ আতঙ্ক এসে ভর করেছে নাবিকদের মনে। বিসূকে উপসাগরে পড়ার পর থেকেই আর একজন নাবিককে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এবারও রাতের বেলা জাহাজের ডেকে পাহারা দিতে গিয়ে হারিয়ে গেছে সে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে, কেউই আর রাতের বেলা ডেকে একলা দাঁড়িয়ে পাহারা দিতে সাহস পাচ্ছে না। বাধ্য হয়েই দুজন করে দাঁড়িয়ে পাহারা দেবার নির্দেশ দিতে হল। এবার কি ঘটবে কে জানে।

২৮ জুলাই।

জিব্রাল্টার প্রণালী পেরোবার পর একটু পরিষ্কার হলেও রাত নামার সঙ্গে সঙ্গে আগের চেয়ে খারাপ হয়ে গিয়েছিল আবহাওয়া। সেই থেকে ক্রমেই আবহাওয়ার অবস্থা খারাপের দিকে চলেছিল। আজ এমন অবস্থা, খোলা ডেকে গিয়ে দাঁড়ানই যাচ্ছে না। ক্রমাগত জাহাজের গায়ে এসে ঝাঁপটা দিচ্ছে ঝড়ো হাওয়া। নিচে ফুসছে অশান্ত সাগর। বিশাল সাগরের বুকে চীনাবাদামের খোসার মত দুলছে ডিমেটার। আতঙ্কে নাওয়া-খাওয়া ভুলে গেছে নাবিকেরা।

২৯ জুলাই।

দুজন করে পাহারা দিয়েও এড়ানো গেল না তৃতীয় দৃর্ঘটনা। গত রাতে একসাথে দাঁড়িয়ে পাহারা দিচ্ছিল দুজন নাবিক। ভোরের দিকে অল্পক্ষণের জন্যে বাথরূমে গিয়েছিল একজন, ফিরে এসে দেখে অপরজন নেই ডেকে। সাথে সাথেই চেঁচামেচি শুরু করে সে। শুরু হল খোঁজা। কিন্তু সেই পুরানো ইতিহাস। সারা জাহাজ তন্ন তন্ন করে খুঁজেও পাওয়া গেল না ওকে। বিন্দুমাত্র সূত্র না রেখে গায়েব হয়ে গেল তিন তিনটে লোক। আশ্চর্য!

৩০ জুলাই।

রাত শেষ হবার আগেই ইংল্যাণ্ডের কাছাকাছি এসে পড়ল জাহাজ। আবহাওয়া পরিষ্কার হয়ে গেছে। হাঁপ ছেড়ে বেঁচেছে সবাই। জাহাজের পালগুলো আবার তুলে দেয়া হয়েছে, তরতর করে পানি কেটে স্বচ্ছন্দ গতিতে ক্রমেই ইংল্যাণ্ডের উপকূলের আরও কাছে চলে যাচ্ছে জাহাজ। সবাই নিশ্চিন্ত, এমন সময় ঘটল চতুর্থ দুর্ঘটনা। আরও একজন নাবিক গায়েব। হারাধনের দশটি ছেলের মত অবস্থা হয়েছে যেন।

১ আগস্ট।

ঝড় থেমেছে ঠিকই। কিন্তু কোত্থেকে এসে হাজির হয়েছে ঘন কুয়াশা। এত ঘন যে দুহাত দূরের জিনিসও স্পষ্ট দেখা যায় না। এ-অবস্থায় জাহাজ পথ ভুল করতে বাধ্য। কয়েকবারই বিপদে পড়ার সংকেত পাঠালাম বাইরের পৃথিবীতে, কিন্তু কোন কাজ হল না। কেন যেন মনে হচ্ছে এক অজানা ভয়ঙ্করের দিকে টেনে নিয়ে চলেছে আমাদের কোন অশুভ শক্তি।

২ আগস্ট।

মধ্যরাত্রি-হঠাৎ কার আর্তচিৎকারে ঘুম ভেঙে গেল। একলাফে উঠে বিছানা থেকে নেমে ছুটে বেরিয়ে এলাম ডেকে। খুব কাছে থেকেই এসেছিল চিৎকারটা, কিন্তু বাইরে এসে কিছুই চোখে পড়ল না। অবশ্য ঘুটঘুটে অন্ধকার রাতে, ঘন কুয়াশার ভেতরে কোনকিছু চোখে পড়াটাই অস্বাভাবিক। চেঁচিয়ে ডাকতেই উত্তর দিল দুজন নবিক। আমার মত ওরাও আর্তচিৎকার শুনেই বাইরে বেরিয়ে এসেছে। সারা ডেক খুঁজেও পাহারারত নাবিকটির খোঁজ পাওয়া গেল না। এই নিয়ে হারাধনের দশটি ছেলের পাচটি নিখোঁজ।

৩ আগস্ট।

মধ্য রাত্রি-ক্লান্ত নাবিকটিকে ছুটি দেবার উদ্দেশ্যে এঞ্জিন ঘরে এসে ঢুকলাম। কিন্তু সেখানে কেউ নেই। গেল কোথায়? এমনিতেই কুয়াশার জ্বালায় অস্থির, ওদিকে আবার গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মত ঝড়ো বাতাস বইতে শুরু করেছে। এ-অবস্থায় এঞ্জিন ঘরে লোক নেই, ভারি আশ্চর্য তো? এ-সময় তো

এঞ্জিন ঘর ছেড়ে যাবার কথা নয় এঞ্জিন চালকের। চেঁচিয়ে সহকারীকে ডাকলাম। সঙ্গে সঙ্গেই ক্রু ড্রাইভার হাতে ছুটে এল সে। ওর চেহারা দেখে চমকে উঠলাম। যেন ভূত দেখেছে সে। আতঙ্কে ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চাইছে ওর দুচোখ। আমাকে দেখেই কানের কাছে ঝুঁকে এল সে। ভয়চকিত দৃষ্টিতে আশপাশটা দেখতে দেখতে ফিসফিস করে বলল, এখানেই কোথাও আছে ও, এ আমি হলপ করে বলতে পারি। একটু আগে নিজের চোখে দেখেছি আমি ওকে। ঢ্যাঙা, বোগা, মরা মানুষের মত বিবর্ণ পাংশুটে মুখ। পেছন থেকে মাংস কাটার বড় ছুরিটা ওর দিকে ছুঁড়ে মেরেছিলাম আমি। বললে বিশ্বাস করবেন না, ক্যাপ্টেন, সোজা ওকে ভেদ করে ওপাশের দেয়ালে গিয়ে ঠং করে বাড়ি খেল ছুরিটা, যেন ছায়ার ভেতর দিয়ে ওপারে চলে গেল, বলেই শ্বাস নেবার জন্যে একটু থামল সহকারী। যদি ছুরি ও সত্যিই মেরে থাকে তাহলে লক্ষ্যভ্রষ্ট হবার কোন উপায় নেই, এটা ঠিক। কারণ ওকে চিনি আমি। বিশ ফুট দূর থেকে ছুরি ছুঁড়ে মেরে একটা পাখির চোখে বিধিয়ে দেয়াটা ওর পক্ষে কিছুই না।

আবার বলতে শুরু করেছে সহকারী, আমি এখন জানি, ক্যাপ্টেন, কোথায় আছে ও। লোকজনের সাড়া পেলেই ওই বাক্সগুলোর কোন একটায় গিয়ে লুকায় ব্যাটা। কাজেই প্রত্যেকটা বাক্সের ডালা খুলে দেখতে যাচ্ছি আমি এখন, বলেই ঝড়ের বেগে ছুটে বেরিয়ে গেল সে।

বিমূঢ়ের মত এক জায়গায় ঠায় দাঁড়িয়ে থাকলাম আমি। নিচ থেকে ভেসে আসছে হাতুড়ির ঠুকঠাক আর বাক্সের ডালা খোলার মৃদু কাচকোচ আওয়াজ। হঠাৎ তীক্ষ্ণ আর্তনাদ শুনে হৃৎপিণ্ডের গতি স্তব্ধ হয়ে যাবার উপক্রম হল আমার। চেঁচাতে চেঁচাতেই এঞ্জিনরূমে এসে ঢুকল সহকারী। আতঙ্কে থরথর করে কাঁপছে ওর সারা গা। মনে হচ্ছে জ্ঞান হারাবে এখুনি। হাঁপাতে হাঁপাতে কোনরকমে বলল সে, ক্যাপ্টেন, ওকে খুঁজে পেয়েছি আমি। মানুষ না ও। এ-জাহাজে থাকলে নির্মমভাবে ওর হাতে মরতে হবে আমাকে। তারচেয়ে সত্যিকার নাবিকের মত সাগরে ডুবে মরা অনেক ভাল। তাই করতে যাচ্ছি আমি এখন। বিদায়, ক্যাপ্টেন। আমি ভালমত কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে গেল সে। মুহূর্ত পরে সংবিৎ ফিরে পেয়ে ওর পিছু পিছু ছুটে গেলাম আমিও। কিন্তু ঘন কুয়াশার জন্যে ও কোনদিকে গেল ঠাহর করতে পারলাম না। ঝড়ো বাতাসের গর্জনকে ছাপিয়ে কানে এল শুধু ওর পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ার মৃদু ছলাৎ শব্দ।

আমার চোখের সামনেই শেষ হয়ে গেল আর একটা জীবন। কয়েকটা মুহূর্ত এক জায়গায় স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে নাবিকদের কেবিনের দিকে এগিয়ে চললাম। কেবিনের দরজার কাছে পৌঁছেই থমকে দাঁড়াতে হল। দমকা বাতাসে এদিকওদিক বাড়ি খাচ্ছে খোলা দরজা। ভেতরে কেউ নেই। কেবিনের দেয়ালে ঝোলানো লণ্ঠনটা খুলে নিয়ে খুঁজতে বেরোলাম ওদের। সারাটা জাহাজ খুঁজেও পাওয়া গেল না কাউকে। নিষ্ঠুর সত্যটা আর চাপা থাকল না আমার কাছে। হারাধনের দশটি ছেলের নয়টিই সাগরে ঝাঁপ দিয়েছে।

ওদের ঝাঁপ দেয়ার কারণটা স্পষ্ট না হলেও আবছা মত আন্দাজ করলাম। ভয়ঙ্কর কোনকিছু দেখে আতঙ্কে জ্ঞানবুদ্ধি হারিয়ে আমার সহকারীর মতই পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়েছে ডিমেটারের প্রত্যেকটি নাবিক।

পরিষ্কার বুঝতে পারলাম কোনদিন আর বন্দরে পৌঁছতে পারব না আমিও।

৪ আগস্ট।

ভোর হয়েছে অনেকক্ষণ হল। কিন্তু গাঢ় কুয়াশা ভেদ করে সূর্যের আলো পৌঁছতে পারছে না এখানে। গত রাত থেকে ঠায় বসে আছি এঞ্জিনরূমে। শেষে আবার আমার নাবিকের মত বুদ্ধি-বিবেচনা হারিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ি এ-ভয়ে হুইলের কাছে কেউ নেই জেনেও এঞ্জিনরুম ছেড়ে যাবার সাহস পাচ্ছি না। বাঁচব না ঠিকই, কিন্তু ক্যাপ্টেনের সম্মানকে ক্ষুন্ন করে জাহাজ ছেড়ে যেতে পারব না আমি।

গত রাতে এঞ্জিন ঘরের এক কোণে অস্পষ্ট আলো-ছায়ার ভেতর দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি আমি ওকে। এত ভয়ঙ্কর চেহারা জীবনে দেখিনি আমি। ওকে দেখে মনে হয়েছে নরক থেকে উঠে এসেছে যেন সাক্ষাৎ শয়তান।

বার বার মনে হচ্ছে, যাই, ঝাঁপিয়ে পড়ি সাগরে। কারণ এ-চেহারা আর দ্বিতীয়বার দেখার সাহস নেই আমার। জাহাজে থাকলে আজ রাতেও আবার দেখব ওকে, এ-ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। কিন্তু না, পরাজিত হতে পারব না ওর কাছে। জাহাজে থেকেই মরব আমি। অসচেতন মুহূর্তে যাতে কিছু করে বসতে না পারি সেজন্যে ডান হাতটাকে শক্ত করে বেঁধে রাখ হুইলের সাথে।

কিন্তু রাত যতই এগিয়ে আসছে মনে মনে ততই দুর্বল হয়ে পড়ছি। আর দেরি করা যায় না। এখনই হাতটা হুইলের সাথে বেঁধে ফেলা দরকার।

আমার এ-লগবুক যদি কারও হাতে পড়ে তাহলে নিশ্চয়ই বুঝতে পারবেন কর্তব্যের খাতিরেই হুইলের সাথে হাত বেঁধে রেখেছি আমি। আমার আরও একটা অনুরোধ থাকল তার কাছে, সম্ভব হলে সে যেন দুনিয়ার বুক থেকে ধ্বংস করে দেয় এই রক্তলোভী পিশাচকে। না হলে নিরপরাধ দশজন নাবিকের আত্মা শান্তি পাবে না কোনদিন। বিদায় হে পৃথিবী, বিদায়।

ঈশ্বর,স্বর্গে দ্বার খুলে রাখো আমার জন্যে। তোমার পদপ্রান্তে ঠাই নিতে আসছি আমি।

.

মিনা মুরের ডায়েরী থেকে
১০ আগস্ট।

ঘুমের ঘোরে হাঁটার অভ্যাসটা অনেক কমে এসেছে লুসির, কিন্তু তার পরিবর্তে আরেকটা নতুন উপসর্গ দেখা দিয়েছে, ঘুমের মধ্যেই অস্বাভাবিকরকম ছটফট করে সে। গতকাল লুসির সাথে একই ঘরে রাত কাটিয়েছি। ওর ছটফটানিতে একটুক্ষণের জন্যেও দুচোখের পাতা এক করতে পারিনি আমি। সারারাত ছটফট করে ভোরের দিকে গভীর ঘুমে ঢলে পড়েছে লুসি।

ঘুম ভাঙলে ওকে নিয়ে সাগরের ধারে বেড়াতে বেরোলাম। ঝকঝকে পরিষ্কার নীল আকাশের এখানে-ওখানে ভেসে বেড়াচ্ছে সাদা মেঘের ভেলা। ভোরের কচি রোদ এসে পড়েছে বিচিত্র রঙা মেঠো ফুলের গায়ে। ফুলগুলোর কোন কোনটায় রাতের ঝরে পড়া দুএক ফোঁটা শিশিরবিন্দু এখনও লেগে আছে। সূর্যের সোনালী আলো পড়ে রামধনুর সাত রঙ সৃষ্টি করছে ওই শিশিরবিন্দুগুলো। সাগরের বুক থেকে বয়ে আসছে ঝিরঝিরে দখিনা হাওয়া। শান্ত ওই সাগরের দিকে চেয়ে কেউ কল্পনাও করতে পারবে না মাত্র কয়েকদিন আগে ঝড়ের দাপটে ওর বুকেই উথালপাতাল নেচে বেড়িয়েছে পাহাড়-প্রমাণ বিশাল সব ঢেউ।

হাঁটতে হাঁটতে ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রাচীন গির্জাটার কাছে চলে এলাম গির্জার আঙিনায় লোকের ভিড়। ডিমেটারের সেই হতভাগ্য ক্যাপ্টেনের লাশ দাফন করতে আনা হয়েছে আজ, তার শোকমিছিলে অংশ গ্রহণ করছে আঙিনার ওই লোকগুলো। কি যেন এক অজানা কারণে অস্থির হয়ে আছে লুসি, রাবার জিজ্ঞেস করেও তার কাছ থেকে সদুত্তর পেলাম না আমি। গতরাতের দুঃস্বপ্নের ঘোর বোধহয় এখনও ছায়াপাত করে রেখেছে ওর মনে।

এখানে, এই লোকের ভিড়ে লুসির ভাল লাগছে না ভেবে, পূবের ফাঁকা জায়গাটার দিকে রওনা দিলাম। হাঁটতে হাঁটতে প্রথমদিন যে-বেদিটায় বসে ডায়েরী লিখেছিলাম সেটার কাছে চলে এলাম। এখানেও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে জটলা। করছে জনাকয়েক লোক। ওদের মাঝে আমার একজন পরিচিত লোকও আছে। আমাদের দেখেই এগিয়ে এসে বলল সে, জানেন, মিস মুর, আজ ভোরে এই বেদির ওপর মরে পড়ে ছিল বৃদ্ধ মি. সোয়ালেজ। ডাক্তার রায় দিয়েছেন, অস্বাভাবিক আতঙ্কজনিত কারণে হৃৎপিণ্ডের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা গেছেন বৃদ্ধ। শুনে মনটা খারাপ হয়ে গেল। ভাবতে ভাবতেই রবিনহুড উপসাগরের পাহাড়ী উপত্যকার দিকে এগিয়ে চললাম আমি আর লুসি।

১১ আগস্ট।

গতকাল শেষ করতে পারিনি লেখাটা, আজ যেভাবেই হোক শেষ করে ফেলব; এই প্রতিজ্ঞা নিয়েই লিখতে বসেছি। রবিনহুড উপসাগরের কাছাকাছি পৌঁছেই মুখের বিষাদ ভাবটা কেটে গেল লুসির। চারপাশের অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে খুশি মনেই এগোতে থাকলাম আমরা।

উপসাগরের একেবারে তীরের কাছের পাহাড়টার কোণ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে প্রাচীন ছোট্ট একটা সরাইখানা। প্রায় নির্জন সেই সরাইখানার খোলা একটা জানালার ধারে চা খাওয়ার জন্যে বসলাম আমরা। দূরের ঢেউ খেলানো চারণভূমি থেকে ভেসে আসছে পশুর গলায় বাঁধা ঘণ্টার সুরেলা মৃদু টুংটাং আওয়াজ। চা খেয়ে নিয়ে সরাইখানার আশপাশটা ঘুরে দেখতে বেরিয়ে পড়লাম আমরা। ঘুরে ঘুরে সেই পাহাড়ী অঞ্চলেই সারাটা দিন কাটিয়ে দিলাম, খিদে পেলেই এসে খেয়ে নিচ্ছিলাম সেই সরাইখানাটায়।

বিকেল গড়িয়ে আসতেই রওনা দিলাম বাড়ির দিকে। গতরাতের দ্রিাহীনতা আর সারাদিনের পরিশ্রমের পর ক্লান্তিতে ভেঙে আসছিল সারা শরীর। বাড়ি ফিরে সোজা বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়লাম। শোয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই গভীর ঘুমে ঢলে পড়ল লুসি। ঘুমোলে অদ্ভুত সুন্দর লাগে লুসিকে। হলপ করে বলতে পারি এসময় ওকে দেখলে চুমু খাওয়ার জন্যে পাগল হয়ে যেত আর্থার।

এই সময় হঠাৎ জোনাথনের কথা মনে পড়ে গেল আমার। অনুভব করছি দুগাল বেয়ে গড়িয়ে নামছে তপ্ত অশ্রুর ধারা। ঈশ্বর, যেখানে, যে অবস্থায়ই থাকুক ও, তুমি ওকে দেখো।

কাঁদতে কাঁদতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম জানি না, হঠাৎ অস্ফুট একটা শব্দে ঘুম ভেঙে গেল আমার। নিজের অজান্তেই চমকে উঠে বসলাম বিছানার ওপর। লুসির বিছানার দিকে চোখ পড়তেই অজানা আশঙ্কায় ধড়ফড় করে উঠল বুক। বিছানা খালি। বিদ্যুৎ বেগে ঘাড় ঘুরিয়ে দরজার দিকে চাইলাম, দরজা খোলা। ব্যাপারটা বুঝতে বিন্দুমাত্র বিলম্ব হল না আমার। ঘুমের ঘোরেই দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে গেছে লুসি। একলাফে বিছানা থেকে নেমে আলনা থেকে একটা শাল টেনে নিয়েই ছুটে বেরিয়ে গেলাম ঘর থেকে।

সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে ভাবলাম এত রাতে নিশ্চয়ই বাড়ির বাইরে কোথাও যাবে না লুসি। তাই নিচে নেমে নিচের সব কটা ঘর খুঁজে দেখলাম। পাওয়া গেল

ওকে। বাগানেও নেই। মাথাটা খারাপ হয়ে যাবার জোগাড় হল আমার। কোথায় গেল লুসি? হঠাৎ খেয়াল হল বৈঠকখানার ঘরটা দেখা হয়নি এখনও। একছুটে এসে ঢুকলাম বৈঠকখানায়, নেই লুসি; কিন্তু ঘরের বাইরের দিকের দরজাটা খোলা। যতদূর মনে পড়ে, প্রতিরাতেই শুতে যাবার আগে বৈঠকখানার ওই দরজাটা বন্ধ করে যায় দারোয়ান। আন্দাজ করলাম, ওই পথেই বেরিয়ে গেছে লুসি। কোনকিছু বিবেচনা না করেই ওই দরজা দিয়ে ছুটে বেরিয়ে গিয়ে পথে এসে নামলাম।

যতদূর চোখ যায় জনপ্রাণীর চিহ্ন পর্যন্ত চোখে পড়ল না পথের কোথাও। আকাশে পূর্ণ চাদ। ফুটফুটে জ্যোৎস্নায় দূরের গির্জায় চূড়াটা চোখে পড়ছে। ঢং করে একটা বাজার ঘণ্টাধ্বনি শোনা গেল এই সময়, ওটা গির্জার বিশাল ঘড়ির ঘণ্টার আওয়াজ। কেন যেন মনে হল ওই গির্জার দিকেই গেছে লুসি, হয়ত এতক্ষণে গিয়ে শুয়ে পড়েছে ওই প্রাচীন বেদিগুলোর একটায়। বেদিগুলোর প্রতি লুসির আকর্ষণের কথা জানা আছে আমার।

দ্রুত এগিয়ে চললাম গির্জার দিকে। অস্বাভাবিক থমথমে চারদিকটা। একটু ভয় ভয় করতে লাগল। তবু মন্তে মনে সাহস সঞ্চয় করে হাঁটতে থাকলাম। গির্জার সমাধিভূমির কাছে পৌঁছে প্রথম কয়েকটা বেদি পেরিয়ে আসার পরই চোখে পড়ল সেই বেদিটা। যেটায় বসে ডায়েরী লিখেছিলাম আমি, যেটায় মরে পড়ে ছিলেন বৃদ্ধ মি. সোয়ালেজ।

চাঁদের আলোয় দূর থেকেই বেদিটা চোখে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়লাম। বেদিটার ওপর চিৎ হয়ে শুয়ে আছে লুসি।

ওর ওপর ঝুঁকে আছে কালো মত কি যেন একটা। ওটা মানুষ না পশু? আশঙ্কায়, ভয়ে ধুকপুক করছে বুকের ভেতরটা। এগিয়ে যাব কি যাব না ভাবছি। শেষ পর্যন্ত দাঁড়িয়ে না থেকে আর একটু এগিয়ে গিয়ে নাম ধরে চেঁচিয়ে ডাকলাম লুসিকে।

মুহূর্তে সোজা হয়ে দাঁড়াল কালো মূর্তিটা। মানুষই। কিন্তু মানুষের এমন চেহারা জীবনে দেখিনি আমি। মরা মানুষের মুখের মত পাংশুটে ফ্যাকাসে মুখ, চোখ দুটো রুবী পাথরের মত জ্বলজ্বল করে জ্বলছে। এক মুহূর্তের জন্যে আমার দিকে চেয়ে থাকল ওই অদ্ভুত মানুষটা, তারপরই দুহাত ছড়িয়ে দিয়ে গায়ের কালো আলখাল্লার দুটো প্রান্ত ডানার মত করে মেলে বিশাল একটা বাদুড় হয়ে যেন উড়ে গেল আকাশে।

দেখে একটা ঠাণ্ডা ভয়ের স্রোত শিরশির করে আমার মেরুদণ্ড বেয়ে নেমে গেল নিচের দিকে, বন্ধ হয়ে যাবার উপক্রম হল হৃৎপিণ্ডের গতি। ভুল দেখলাম না তো! কতক্ষণ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম জানি না, পায়ের কাছে সরসর শব্দ হতেই চেঁচিয়ে উঠে লাফ দিয়ে সরে দাঁড়ালাম। নিচের দিকে চেয়ে দেখলাম আমার চেঁচানিতে আমার চেয়ে দ্বিগুণ ভয় পেয়ে ছুটে পালাচ্ছে একটা মেঠো ইঁদুর।

আর দেরি না করে বেদিটার কাছে এগিয়ে গেলাম। অচেতনের মত বেদির ওপর চিৎ হয়ে পড়ে আছে সুসি। অল্প একটু ফাঁক হয়ে আছে ঠোঁট দুটো। লুসিকে নাকের কাছে হাত নিয়ে দেখলাম কেমন যেন একটু অস্বাভাবিক ওর শ্বাসপ্রশ্বাস। থরথর করে কাঁপছে সারা গা। ভাবলাম শীত করছে লুসির। তাড়াতাড়ি গা থেকে শালটা খুলে নিয়ে ওর গায়ে জড়িয়ে দিলাম। জড়ানর সময় ওর গলার কাছে আমার হাতের চাপ লাগায় মনে হল খানিকটা ব্যথা পেয়েই অস্ফুট শব্দ করে উঠল লুসি। আস্তে করে গায়ে ঠেলা দিয়ে ওর ঘুম ভাঙাবার চেষ্টা করলাম। প্রথমে সাড়া দিল না লুসি, শেষে অচেতন লোকের চেতনা ফিরে পাবার মত ধীরে ধীরে চোখ মেলল সে। আমাকে দেখে একটুও অবাক হল না লুসি, যেন নিজের ঘরে বিছানায় শুয়ে আছে সে, আর আমি ওর ঘুম ভাঙাচ্ছি। কোন কথা না বলে বাচ্চা মেয়ের মত দুহাত দিয়ে আমার গলা জড়িয়ে ধরে আবার চোখ মুদল লুসি। বুঝতে পারলাম, গভীর ঘোরের ভেতর আছে এখন সে।

জোর করে ওকে বেদি থেকে তুলে বাড়ির দিকে রওনা দিলাম। নিঝুম জ্যোৎস্নায় খাঁখাঁ করছে চারদিক। দমকা হাওয়ায় মাথার ওপর এক ধরনের ঝিরঝিরে ভৌতিক শব্দ করছে বার্চের পাতা। এছাড়া বাড়ি ফেরার পথে আর কোনরকম শব্দ বা কোন জীবন্ত প্রাণী চোখে পড়ল না। লুসির জন্যে মনটা খারাপ হয়ে গেল আমার। পথ চলতে চলতেই স্থির করলাম লুসি নিজে থেকে না বললে ওর এই নিশীথ অভিসারের কথা কাউকে বলব না, এমনকি ওর মাকেও না। আর চাঁদের আলোয় গির্জার ওই প্রাচীন বেদির কাছে যে ঘটনাটা ঘটল তা তো কাউকেই বলা যাবে না, কারণ বললে বিশ্বাস তো করবেই না কেউ, উল্টে পাগল ঠাওরাবে আমাকে।

ঘরে ফিরে এসে বিছানায় শুইয়ে দিলাম লুসিকে। সাথেসাথেই ঘুমিয়ে পড়ল ও। আমার কিন্তু সহজে ঘুম এল না। পুবদিকের জানালাটার দিকে চেয়ে চেয়ে একটু আগে দেখা ঘটনাগুলোর কথা ভাবতে লাগলাম আমি। হঠাৎ মনে হল কেমন যেন ফ্যাকাসে হয়ে আসছে চাঁদের আলো। বুঝলাম, ভোর হয়ে গেছে।

১২ আগস্ট।

সকাল থেকেই দিনটা আজ ভারি সুন্দর। ভোরের দিকে গভীরভাবে ঘুমিয়ে পড়েছিল লুসি। শিশিরভেজা ফুলের পাপড়ির মত চোখ মেলল ও একসময়। সারা মুখে রাত্রি জাগরণের চিহ্নমাত্র নেই। অন্যান্য দিনের চাইতে আজ ওকে বেশি সুন্দর মনে হচ্ছে, অস্থিরতাও যেন কমে গেছে একটু। ওর গলার কাছে চোখ পড়তেই দেখলাম একপাশে কণ্ঠনালীর খুব কাছে সুচ ফোটানর মত ছোট ছোট দুটো ক্ষতচিহ্ন, ধবধবে সাদা রাতের পোশাকেও দুএক ফোটা রক্ত শুকিয়ে কালছে হয়ে আছে। কেমন করে আঘাত পেল লুসি জিজ্ঞেস করলাম, কিন্তু কিছুই বলতে পারল না ও।

নাস্তা সেরে দুজনেই মালগ্রেভ উডের দিকে বেড়াতে বেরোলাম.। সারাটা সকাল আর দুপুর মালগ্রেভ উডের আশপাশে কাটিয়ে বিকেলের দিকে ঘরে ফিরে এলাম। কিছু খেয়ে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম আবার। সন্ধ্যায় ক্যাসিনো টেরাসে গিয়ে উপভোগ করলাম ম্যাকেঞ্জির অনন্য সঙ্গীতানুষ্ঠান। ওখান থেকে ফিরে একটু সকাল সকালই খেয়েদেয়ে বেডরূমে এসে ঢুকলাম দুজনেই। লুসি তখন কাপড় বদলাতে ব্যস্ত, ওর অলক্ষ্যে ভেতর থেকে দরজায় তালা আটকে দিয়ে চাবিটা রেখে দিলাম নিজের কাছে।

মাঝ রাতে একটা অস্পষ্ট আওয়াজ শুনে ঘুম ভেঙে গেল। চোখ মেলতেই দেখলাম ঘর অন্ধকার। পরিষ্কার মনে আছে বাতি জ্বালিয়ে রেখেই বিছানায় শুতে গিয়েছিলাম, তাহলে বাতিটা নেভাল কে? লুসি? টের পেলাম কে যেন দরজা খোলার চেষ্টা করছে, কিন্তু তালা মারা থাকায় খুলতে পারছে না। সেদিকে তাকিয়ে সাদা রাত্রিবাস পরা লুসির অবয়ব আবছাভাবে চোখে পড়ল। উঠে গিয়ে ওকে জোর করে দরজার কাছ থেকে এনে বিছানায় শুইয়ে দিলাম, প্রায় সাথেসাথেই ঘুমিয়ে পড়ল লুসি। একটু পরই আবার উঠে গিয়ে দরজা খুলে বাইরে বেরোনর চেষ্টা করল সে। কিন্তু দরজায় তালা দেয়া থাকায় এবারও বেরোতে পারল না। সারা রাতে দুই দুইবার ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায় ভোরের দিকে ঢলে পড়লাম দুজনেই। ঘুম ভাঙতে দেখলাম জানালা দিয়ে ঘরে এসে পড়েছে সকালের মিষ্টি রোদ।

১৩ আগস্ট।

নিরুদ্বিগ্নভাবেই কেটে গেল আরও একটা দিন। আজও শোবার আগে দরজায় তালা মেরে চাবিটা নিজের কাছে রেখে দিলাম। মাঝরাতে অকারণেই হঠাৎ ঘুম ভেঙে যেতে দেখলাম বিছানায় সোজা হয়ে উঠে বসে জানালার দিকে একাগ্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে লুসি। একটু অবাক হয়ে ওর দৃষ্টি অনুসরণ করে খোলা জানালার দিকে চাইলাম। কিছু চোখে পড়ল না। বিছানা থেকে উঠে ভাল করে দেখার জন্যে জানালার কাছে এসে দাঁড়ালাম। রূপালী জ্যোৎস্যায় আকাশ আর পৃথিবীটাকে কেমন যেন রহস্যঘন এক নিস্তব্ধ নতুন জগৎ বলে মনে হচ্ছে। ঠিক সেই সময় দেখলাম ওটাকে। আমার ঠিক মাথার ওপরের আকাশে পাক খেতে খেতে উড়ছে একটা প্রকাণ্ড বাদুড়। সাঁ করে হঠাৎ আমার দুহাত দূরে চলে এল বাদুড়টা। এত কাছে থেকে ওর জ্বলজ্বলে লাল অদ্ভুত চোখ দুটো দেখে কেন যেন ভয় ভয় করতে লাগল। আরও বারদুয়েক আমার কাছাকাছি উড়ে এল বাদুড়টা। মনে হল জানালা দিয়ে ঘরে ঢুকতে চাইছে ওটা, কিন্তু আমার জন্যে পারছে না। আরও কয়েকবার পাক খেয়ে ঘুরে বেড়িয়ে গির্জার দিকে গেল বাদুড়টা, তারপর গির্জার চূড়া পেরিয়ে সোজা চলে গেল সাগরের দিকে। বাদুড়টা চলে যেতেই বিছানায় লুটিয়ে পড়ে গভীর ঘুমে অচেতন হয়ে গেল সি। ব্যাপারটা কেমন যেন অদ্ভুত লাগল আমার কাছে।

১৪ আগস্ট।

বিকেলে ওয়েস্ট পিয়ের থেকে বেরিয়ে ফেরার পথে সেই বেদিটার ওপর বসে একটু জিরিয়ে নিচ্ছিলাম। উঁচু-নিচু পাহাড়ী পথে হেঁটে হেঁটে পা ব্যথা করছিল। হালকা সাদা মেঘগুলোকে রক্তের রঙে রাঙিয়ে দিয়ে পশ্চিম আকাশে এখন অস্ত যাচ্ছে সূর্য। মুখ বিস্ময়ে চেয়ে চেয়ে তাই দেখছিলাম। পাশে বসা লুসির হঠাৎ দীর্ঘশ্বাসের শব্দে চমকে উঠে ওর দিকে ফিরে চেয়ে দেখলাম, হুইটবি গির্জার চূড়ার দিকে নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে আছে সে। গির্জার চূড়ার কাছটায় ছোট্ট জানালার রঙিন কাঁচে অস্তগামী সূর্যের লাল আভা পড়ে এক অপূর্ব বর্ণালীর সৃষ্টি করেছে! আমি লুসির দিকে চাইতেই সেই রঙিন কাঁচের দিকে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলল সে, ঠিক ওর চোখ দুটোর মতন রঙিন আর জ্বলজ্বলে।

ঠিক বুঝতে পারলাম না লুসির কথা। কার চোখের কথা বলছে সে? অকারণেই দারুণ অস্বস্তি বোধ করতে থাকলাম।

সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গে ঘরে ফিরে এলাম। ঘরে ফিরেই মাথা ধরেছে বলে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ল লুসি, আমি চলে এলাম বাগানে। এই সন্ধ্যা বেলায়ই ঘুম আসবে না আমার, তাছাড়া মন জুড়ে ভিড় করে আছে নানারকম চিন্তা। এগিয়ে গিয়ে কোণের দিকে একটা বেঞ্চিতে বসে জোনাথনের কথা ভাবতে থাকলাম। ততক্ষণ সেখানে বসে বসে ভেবেছি জানি না, চমক ভাঙল যখন মাথার ওপর উঠে এসেছে চাদ। হলুদ জ্যোৎস্নার ঢল নেমেছে সারাটা বাগানে।

লুসিকে একলা ঘরে ফেলে এসেছি। কথাটা মনে হতেই লাফ দিয়ে উঠে ওর ঘরের দিকে ছুটলাম। দূর থেকেই দেখলাম জানালার সামনে চৌকাঠে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে লুসি, ওর সামনে কালো মত একটা কি যেন বসে আছে। ধক করে উঠল হৃৎপিণ্ডটা। থমকে দাঁড়িয়ে পড়তে গিয়েও দাঁড়ালাম না। পা টিপে টিপে এগিয়ে চললাম। ওই কালো মত জিনিসটা কী দেখতেই হবে আমাকে। দুগজের ভেতরে চলে যাবার পরেও আমার উপস্থিতি টের পেল না লুসি, কিন্তু নড়ে উঠল কালো জিনিসটা। এবার বুঝলাম আমার অচেনা কালো রঙের একটা বিশাল পাখি ওটা। চেঁচিয়ে ডাকলাম লুসিকে, কোনরকম সাড়া দিল না লুসি, কিন্তু তড়িতাহতের মত লাফ দিয়ে উঠল পাখিটা। পরমুহূর্তে ডানা মেলে ভেসে গেল বাতাসে। স্তম্ভিত হয়ে দেখলাম পাখিটা একটা বাদুড়। চিরদিন জেনে এসেছি মাথা নিচু করে নিচের দিকে ঝুলে থাকে বাদুড়েরা, কিন্তু আজ নিজের চোখে আর সব সাধারণ পাখিদের মত জানালার চৌকাঠে বসে থাকতে দেখলাম একটা বাদুড়কে। আসলে বাদুড় কিনা ওটা যথেষ্ট সন্দেহ আছে আমার। বাদুড়টা চলে যেতেই এগিয়ে গিয়ে লুসির কাঁধে হাত রাখলাম, চমকে আমার দিকে ফিরে চাইল সে। কেমন যেন ফ্যাকাসে হয়ে গেছে ওর চেহারা। খোলা জানালা দিয়ে হিমেল হাওয়ায় ভর করে হুহু করে ঘরে ঢুকছে হাস্নাহেনার মিষ্টি গন্ধ, সেই গন্ধকে ছাপিয়ে লুসির গা থেকে কেমন যেন একটা বোটকা গন্ধ ছড়াচ্ছে। জীবিত কোন মানুষের গা থেকে আসতে পারে না ওরকম বোটকা পচা গন্ধ। তাহলে? ওই রহস্যময় বাদুড়টাই কি এর কারণ?

১৭ আগস্ট।

কিছু লিখতে পারিনি গত তিনদিন। অবশ্য লেখার মত মানসিকতাও ছিল। আজও নেই, তবু জোর করেই লিখতে বসেছি। জোনাথনের খবর নেই, এদিকে লুসিও দিন দিন কেমন দুর্বল হয়ে পড়েছে। ওর চিন্তায় লুসির মা-ও প্রায় শয্যাশায়ী হতে চলেছেন। ওদিকে লুসির বিয়ের দিন দ্রুত এগিয়ে আসছে। সবদিকেই কেমন যেন একটা গোল পাকানো ভাব।

সবচেয়ে বেশি ভাবিয়ে তুলেছে আমাকে লুসি। যতই দিন যাচ্ছে মরা মানুষের মত কেমন যেন বিবর্ণ ফ্যাকাসে হয়ে যাচ্ছে ওর গায়ের রঙ, অথচ কোন কারণ খুঁজে পাচ্ছি না।

কাল রাতে জানালার ধারে আবার দেখেছি সেই রহস্যময় বাদুড়টাকে। সেদিনের মত ঠিক তেমনিভাবে জানালার চৌকাঠে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়েছিল লুসি, আর ওর কাছে বসে ছিল বাদুড়টা। আমার সাড়া পেয়েই আকাশে উড়ে যায় ওটা। জানালার কাছ থেকে ধরে এনে বিছানায় শুইয়ে দিয়েছিলাম লুসিকে। শোয়ানর সঙ্গে সঙ্গে ঘুমিয়ে পড়ল লুসি। কম্বলটা ওর গায়ে টেনে দিতে গিয়েই ওর গলার পুরানো ক্ষতটার ওপর চোখ পড়ল আমার। ঘা-টা তো শুকোয়ইনি, বরং বেড়েছে। ডাক্তার না দেখালে আর চলছে না।

১৮ আগস্ট।

অকারণেই সকাল থেকে মনটা ভাল লাগছে আজ। লুসিকেও অনেকটা সুস্থ মনে হচ্ছে। হাঁটতে হাঁটতে গিয়ে গির্জার সেই বেদিটায় বসে একটানা বকবক করে চললাম দুজনে। গত কয়েক রাতে ওর আশ্চর্য ব্যবহারের কথা জিজ্ঞেস করলাম লুসিকে। প্রথমে সে ভাল মত স্মরণ করতে পারল না কিছু। খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে আরও প্রশ্ন করতেই বলল, ঠিক বলতে পারব না, মিনা, তবে মনে হয় স্বপ্ন ওগুলো। সবকিছুই স্পষ্ট, অথচ কেমন যেন দুর্বোধ্য। সারাক্ষণ খালি মনে হয়, এই বেদিটায় এসে বসি, কিন্তু কেন বলতে পারব না। সব সময় একটা অজানা ভয় ভর করে থাকে আমাকে, অথচ কিসের ভয় বোঝাতে পারব না। রাতের বেলা হঠাৎ করেই ঘুম ভেঙে জেগে উঠে বসি বিছানায়। আশ্চর্য, হাজার হাজার নেকড়ের হিংস্র গর্জন শুনতে পাই তখন। চোখের সামনে ভেসে ওঠে একজোড়া লাল টকটকে উজ্জ্বল চোখ, সেদিন সূর্যাস্তের সময় গির্জার রঙিন কাচগুলো যেমন দেখাচ্ছিল, ঠিক তেমনি প্রচণ্ড আকর্ষণে কাছে টানতে থাকে আমায় ওই চোখ দুটো। ওই চোখ দুটোর ডাকে সাড়া দিয়ে তন্দ্রাচ্ছন্নের মত টলতে টলতে এগিয়ে যাই, তারপর আর কিছু মনে থাকে না। হঠাৎই তীব্ৰ নাড়া খেয়ে যোর কেটে যায়, দেখি পাশে দাঁড়িয়ে আছিস তুই।  

মনটা গভীর চিন্তায় ছেয়ে গেলেও ও কিছু না বলে লুসিকে সান্ত্বনা দিলাম আমি। একটু পরে খুশি মনেই বাড়ি ফিরে এলাম দুজনে। আমাদের দুজনকে হাসতে দেখে খুশি হয়ে উঠলেন লুসির মা-ও। বহুদিন পর সন্ধ্যাটা চমৎকারভাবে কাটল আজ।

১৯ আগস্ট।

দারুণ খুশিতে লাফাতে ইচ্ছে করছে আজ। কারণ একটু আগে জোনাথনের খবর পেয়েছি। যা ভেবেছিলাম তাই, অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে পড়েছিল সে। বুদাপেস্টের সেন্ট জোসেফ হাসপাতালের সিস্টার আগাথার লেখা চিঠিটা ঠিকানা পাস্টে লুসিদের বাড়ির ঠিকানায় পাঠিয়ে দিয়েছেন মি. হকিন্স। প্রচণ্ড মানসিক আঘাত পেয়ে নাকি গত ছসপ্তাহ ধরেই হাসপাতালে পড়ে আছে জোনাথন, এখন অবশ্য অনেকটা সুস্থ হয়ে উঠেছে। শীঘ্রিই হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেতে যাচ্ছে সে। ছাড়া পাবার পর নাকি সব সময় কাউকে না কাউকে তার সঙ্গে সঙ্গে থাকতে হবে।

বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে জিনিসপত্র গুছিয়ে তৈরি হয়ে নিয়েছি, পোশাকটা শুধু পাল্টানো বাকি আছে। এখান থেকে সোজা যাব লণ্ডনে, সেখান থেকে বুদাপেস্ট। জোনাথন, আমার জোনাথন। ওকে চোখে না দেখা পর্যন্ত কিছুতেই স্বস্তি পাব না এখন। ভবিষ্যতে কাজে লাগতে পারে, তাই ডায়েরীর পাতায় সেঁটে রাখার আগে আর একবার পড়লাম চিঠিটা।

সেন্ট জোসেফ হাসপাতাল,
বুদাপেস্ট।
১২ আগস্ট।

.

ডিয়ার ম্যাডাম,

মি. জোনাথন হারকারের ইচ্ছানুসারেই জানাচ্ছি আপনাকে, প্রচণ্ড মানসিক আঘাত পেয়ে গত মাস দেড়েক ধরে অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে পড়ে আছেন তিনি। সেন্ট জোসেফ এবং মেরী মায়ের কৃপায় এখন অনেকটা সুস্থ হয়ে উঠেছেন তিনি, কিন্তু শরীর এত দুর্বল যে নিজ হাতে চিঠি লিখেও আপনাকে জানাতে পারছেন না।

অহেতুক বিলম্বের জন্যে মি. হারকার ক্ষমাপ্রার্থী এবং ভারপ্রাপ্ত কাজ বেশ সুষ্ঠুভাবেই পালন করেছেন তিনি, একথা আগেই চিঠি লিখে এগজিটারের মি. হকিন্সকে জানিয়েছি আমি।

মি. হরকারের এই দুঃসময়ে আপনার সাহচর্য বিশেষভাবে কামনা করছেন উনি। অনেক আগেই আমরা আপনার সাথে যোগাযোগ করতাম, কিন্তু মি. হারকারের স্মৃতিশক্তি ফিরে না আসা পর্যন্ত আপনার ঠিকানা আমরা জানতে পারিনি। অবশ্য জানা সম্ভবও ছিল না, যদিও সম্ভাব্য সব রকম চেষ্টাই আমরা করেছি।

আশা করছি, পত্র পাওয়ামাত্র এখানে চলে আসবেন আপনি। মি. হারকারের রোগমুক্তি এবং আপনার শুভাগমন কামনা করে শেষ করছি।

প্রীতি ও শুভেচ্ছান্তে,
সিস্টার আগাখা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *