১.৫ ডাক্তার জন সেওয়ার্ডের ডায়েরী থেকে

ডাক্তার জন সেওয়ার্ডের ডায়েরী থেকে

২৫ এপ্রিল।

গতকাল কুমারী লুসির অপ্রত্যাশিত প্রত্যাখ্যানে বুকটা শূন্য হয়ে গেছে আমার। এতটুকু স্বস্তি পাচ্ছি না মনে। বার বার মনে হচ্ছে এ পৃথিবীতে বেঁচে থেকে আর লাভ নেই। অবশ্য যদি কাজের মাঝে নিজেকে ডুবিয়ে রাখতে পারি তাহলেই হয়ত এ নিঃসঙ্গতার হাত থেকে কিছুটা মুক্তি পেতে পারি। ভয় হচ্ছে মানসিক হাসপাতালের ডাক্তার হয়ে নিজেই না আবার মানসিক রোগী হয়ে পড়ি।

সাত-পাঁচ ভেবে রোগীদের একটু দেখাশোনা করতে বেরিয়ে পড়লাম। অদ্ভুত আচরণের জন্যে একজন রোগীর প্রতি আগে থেকেই বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখছিলাম আমি। আর সব সাধারণ পাগলদের চাইতে ওর ধরন-ধারণ সবই আলাদা। পাগল বলে মনেই হয় না ওকে। অথচ মাঝে মাঝে এমন সব কাজ করে বসে যা কোন স্বাভাবিক মানুষের পক্ষে একেবারেই অসম্ভব।

লোকটার নাম আর. এম. রেনফিউ, বয়স ঊনষাট। আত্মপ্রত্যয়ী মেজাজ, গায়ে শক্তি আর আশ্চর্য রকমের উগ্র ওর স্বভাব। রেনফিল্ডের সাথে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলাপ করে আমার এইটুকু ধারণাই হয়েছে, অলৌকিক শক্তির প্রতি ওর অগাধ বিশ্বাস। এবং আমার ধারণা এই অলৌকিক শক্তির অধিকারী হবার উদ্দেশ্যেই মাঝে মাঝে উদ্ভট সব কাজ কারবার করে বসে রেনফিল্ড।

মিনা মুরের ডায়েরী থেকে
২৪ জুলাই, হুইটবি।

গতকাল আমাকে নিয়ে যেতে স্টেশনে এসেছিল লুসি। আগের চেয়ে এখন অনেক সুন্দর হয়েছে সে। লুসিদের নতুন বাড়িটা দেখে দারুণ ভাল লাগল আমার। এমন জায়গায় বাড়ি বানিয়েছেন, সত্যি, রুচি ছিল লুসির বাবার। ছোটখাট একটা টিলার ওপর দাঁড়িয়ে আছে ছবির মত বাড়িটা। সামনের বিস্তীর্ণ উপত্যকার ওপর দিয়ে এঁকেবেঁকে সাগরের দিকে চলে গেছে ছোট্ট একটা পাহাড়ী নদী, নদীটার নাম এক। মোহনার মুখের উঁচু খিলানওয়ালা লম্বা সেতুটার ওপর দাঁড়ালে ঢাল হয়ে নেমে যাওয়া ঘন সবুজে ছাওয়া উপত্যকা চোখে পড়ে, আর কেমন যেন স্বপ্নিল মনে হয় দিগন্তকে। উপত্যকার একপাশে ছবির মত করে সাজানো রয়েছে টালির  ছাদ দেয়া পুরানো লাল ইটের বাড়িগুলো। শহরের ঠিক মাঝখানে পড়ে আছে হুইটবি গির্জার ধ্বংসাবশেষ, এখনও আকাশের গায়ে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে অপূর্ব কারুকাজ করা গির্জার চূড়াটা। সম্পূর্ণ শ্বেত পোশাক পরা এক অপূর্ব সুন্দরী তরুণীকে নাকি চাঁদনী রাতে গির্জায় সদর দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় আজও।

শহরের আরেক প্রান্তে, সাগরের একেবারে কোণ ঘেঁষে পড়ে আছে আর একটা বেশ বড় গির্জার ধ্বংসাবশেষ। সেটার বিশাল আঙিনার সবটাই এখন কবরখানায় পরিণত হয়েছে। হুইটবির সবচেয়ে মনোরম জায়গা এটা। ধ্বংসপ্রাপ্ত সারি সারি পুরানো সমাধিগুলোর মাঝখান দিয়ে চলে গেছে হলদে কাঁকর বিছানো সরু পথ। পথের দুপাশে সুন্দর করে লাগানো বার্চের সারি, এরই মাঝে মাঝে বসার জন্যে পাথর বসানো চওড়া বেদি তৈরি করা হয়েছে। জায়গাটা দারুণ পছন্দ হয়েছে আমার।

এখানটায় বসেই এই ডায়েরী লিখছি, আর মাঝে মাঝে উপভোগ করছি সাগর আর বনের অপূর্ব সৌন্দর্য। বার্চের পাতায় একটানা ঝির ঝির শব্দ তুলে বয়ে চলেছে দখিনা হাওয়া। একটু দূরে ঘাসের বুকে হুটোপুটি লাগিয়েছে কয়েকটা খরগোশ। ওহ, জোনাথন, এ সময়ে তোমাকে কাছে পেতে কি যে ইচ্ছে করছে।

কেন যেন দূরের ওই বন্দরটাকে অত্যন্ত কাছে মনে হয় এখান থেকে। বন্দরের একপাশে চওড়া এ্যানিটের দেয়াল অর্ধবৃত্তাকারে ঘিরে রেখেছে সাগরকে। ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে বাতিঘরটা। বন্দরের ওপাশে, সাগরের বুক থেকে বাড়া উঠে গেছে পাথরের পাহাড়, দেখলে মনে হয় খামোকাই তীর থেকে সাগরের বুকে মাইল খানেক পর্যন্ত একটা দেয়াল খাড়া করে রাখা হয়েছে। পাহাড়টা যেখানে উঠে এসেছে সাগরের বুক থেকে ঠিক সেখানে, পাহাড়ের মাথায় আর একটা বাতিঘর বসানো হয়েছে। এ্যানিটের দেয়াল থেকে দ্বিতীয় বাতিঘরটা পর্যন্ত টেনে নেয়া হয়েছে একটা ঝোলানো সেতু, বাতিঘরে পৌঁছানর জন্যেই তৈরি হয়েছে সেতুটা। বাতিঘরটার সামনে ঘণ্টার বাধা বয়া আছে একটা। ঝড় তুফানের দিনে হাওয়ার ঝাঁপটায় যখন ফুলে ওঠে সাগর, ফুঁসে ওঠা উথালপাতাল ঢেউয়ের বুকে

তখন পাগলের মত দোল খেতে থাকে এই বয়া। ঝোড়ো বাতাসে ভর করে ভেসে আসে ওই ঘণ্টার করুণ আর্তনাদ। মাঝে মাঝে কখনও সুর পাল্টায় ঘণ্টাধ্বনি, কেমন যেন বিষণভাবে একটানা বেজে চলে ওটা। বহুদূর পর্যন্ত শোনা যায় ওই আওয়াজ। হুইটবির প্রাচীন লোকেরা তখন বার বার ক্রুশ চিহ্ন আঁকতে থাকে বুকে। ওরা বলে, দূর সাগরের বুকে কোথাও জাহাজডুবি হলেই ওরকম করুণ ভাবে কেঁদে ওঠে বয়ার ঘণ্টা।

যেটুকু লিখেছি, বসে বসে ভেবেছি তারচেয়ে অনেক বেশি। কখন যে বেলা শেষ হয়ে গেছে টেরও পাইনি। হঠাৎই খেয়াল করলাম দূর পাহাড়ের ওপারে অস্ত যাচ্ছে লাল সূর্য। একটু পরই কবরখানার বুকে নেমে আসবে ঘন অন্ধকার। অকারণেই ছমছম করে উঠল গা-টা। তাড়াতাড়ি কাগজপত্র গুছিয়ে উঠে পড়লাম। ওদিকে হয়ত আমার জন্যে অপেক্ষা করে বসে আছে লুসি আর তার মা।

২০ জুলাই।

আজও এসেছি এই কবরখানায়, তবে আজ একা নই, লুসি আছে সাথে। বহুদিন পর দুবান্ধবী মিলে মন খুলে আলাপ জমালাম। বেশিরভাগ বকবক করে চলল অবশ্য লুসিই, আবার নতুন করে আর্থার আর ওর প্রেমের কাহিনী শোনাল আমাকে। লুসির কথা শুনতে শুনতে হঠাৎ আমার বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল, বার বার মনে পড়তে থাকল জোনাথনকে। সেই যে মাস দেড়েক আগে তার কাছ থেকে ছোট্ট একটা চিঠি পেয়েছি তারপর আর কোন সাড়া নেই। অন্য কোন মেয়ের পাল্লায় পড়েছে সে? ভুলে গেছে আমাকে? অনেক কষ্টে, ঠেলে বেরিয়ে আসা অশ্রু রোধ করে সুসিকে নিয়ে উঠে পড়লাম।

ডাক্তার জন সেওয়ার্ডের ডায়েরী থেকে

৫ জুন।

ক্রমেই রহস্যজনক হয়ে উঠছে রেনফিল্ডের কাজ-কারবার। স্বার্থপরতা, গোপনীয়তা এবং দুরভিসন্ধি, এই তিনটে জিনিস প্রকট হয়ে উঠেছে ওর মাঝে। আর একটা অদ্ভুত ব্যাপার বিশেষভাবে খেয়াল করেছি আমি, পশু পাখি আর পতঙ্গের প্রতি রেনফিল্ডের তীব্র আকর্ষণ। যেমন, হঠাৎ করে মাছি ধরার প্রতি সাংঘাতিকভাবে ঝুঁকে পড়েছে সে। অল্প কদিনেই এত বেশি সংখ্যক মাছি ধরে ফেলল সে, যে দেখতে দেখতে বিরক্ত হয়ে গিয়ে রীতিমত বকাঝকা দিতে শুরু করলাম ওকে। আমার ধমকানিতে প্রথমে টু শব্দটি পর্যন্ত করল না রেনফিল্ড, পরে সুযোগ বুঝে আস্তে করে বলল, যদি কিছু মনে না করেন, ডাক্তার, আমাকে অন্তত তিনটে দিন সময় দিন। এই তিন দিনেই মাছির জঞ্জালকে ঝেটিয়ে বিদেয় করব আমি।

ভাবলাম দেখাই যাক না, কি করে ও। তাই বললাম, ঠিক আছে। কিন্তু ঠিক তিন দিন, মনে থাকে যেন।

ঠিক করলাম সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে ওর ওপর।

১৮ জুন।

আমার শাসানোতে মাছির ওপর থেকে আকর্ষণ হারিয়েছে ঠিকই, কিন্তু তার পরিবর্তে মাকড়সার দিকে ঝুঁকে পড়েছে এখন রেনফিল্ড। ইতোমধ্যেই অনেকগুলো বড় সাইজের মাকড়সা ধরে একটা কাঠের বাক্সে ভরে রেখেছে সে। বাক্সটা আমিই দিয়েছি ওকে। আমার কাছে সে একটা কাঠের বাক্স চাইল, তা দিয়ে ও কি করে পর্যবেক্ষণ করার জন্যে সঙ্গে সঙ্গে বাক্সটা ওকে এনে দিয়েছিলাম আমি। বেশ কিছু মাকড়সা ধরে ফেলার পর আবার মাছির দিকে ঝুঁকল রেনফিল্ড। ওর ভাগের অর্ধেক খাবারই ও ঘরের ভেতরে-বাইরে এখানে-ওখানে ছড়িয়ে রাখে। মাছিরা প্রলুব্ধ হয়ে ওই খাবারে এসে বসলেই কায়দা করে ওগুলোকে ধরে ফেলে সে।

১ জুলাই।

ক্রমশ বেড়েই চলেছে রেনফিল্ডের ধরা মাকড়সার সংখ্যা। ওর পাগলামি আর সহ্য করতে না পেরে আজ গিয়ে সোজা বললাম ওকে, এখুনি ছেড়ে দাও মাকড়সাগুলোকে।

কথা শুনে প্রায় কেঁদে ফেলার উপক্রম হল রেনফিডের। ওর অবস্থা দেখে মায়া হল আমার। একটু নরম হয়ে বললাম, ঠিক আছে, সবগুলোকে না হোক, অন্তত অর্ধেক ছেড়ে দাও।

একটু যেন খুশি হল রেনফিল্ড। কিন্তু হ্যাঁ-না বলল না কিছু। মাকড়সাগুলোকে ছেড়ে দেয়ার জন্যে আরও তিনদিন সময় দিলাম আমি ওকে। কামরা থেকে বেরিয়ে আসতে যাব এমন সময় একটা অদ্ভুত কাণ্ড করে বসল রেনফিল্ড। ঘরের এক কোণে গোশতের টুকরো ফেলে রেখেছিল সে, আমার নির্দেশেই সরানো হয়নি সেগুলো। পচে যাওয়া ওই গোশতের ওপর থেকে রেনফিল্ডের দিকে উড়ে এল একটা বড় আকারের উঁশ মাছি। অদ্ভুত কায়দায় থাবা মেরে মাছিটাকে ধরে ফেলেই মুখে পুরে দিল সে। পরক্ষণেই চিবিয়ে গিলে ফেলল সে মাছিটাকে। দেখে ঘৃণায় রি রি করে উঠল আমার সমস্ত শরীর।

প্রচণ্ড ধমক লাগালাম আমি রেনফিল্ডকে। আমার ধমকের উত্তরে মৃদু হেসে সে জানাল, আপনার হয়ত জানা নেই, ডাক্তার, একটা জীবন্ত তাজ জীব, তা সে যাই হোক না কেন, অত্যন্ত উপাদেয় এবং তা জীবনীশক্তিকে উজ্জীবিত করে তোলে শতগুণ।

রেনফিল্ডের কথা শুনে হঠাৎ ওর মাছি সংগ্রহের একটা কারণ আন্দাজ করলাম। মাকড়সাগুলোকে কি খাবার জন্যেই ধরেছে রেনফিল্ড? নজর রাখতে হবে, দেখতে হবে মাকড়সাগুলোকে নিয়ে ও কি করে।

আমার দিকে কিন্তু, তখন আর নজর নেই রেনফিল্ডের। বালিশের তলা থেকে একটা ছোট খাতা বের করে গভীর মনোর্যোগের সাথে তাতে লেখা অঙ্কগুলো দেখছে সে। দেখে মনে হয় বেশ বড় আকারের একটা হিসেব লেখা আছে খাতায় কিন্তু কিসের হিসেব? তা-ও জানতে হবে আমাকে।

৮ জুলাই।

রেনফিল্ডের পাগলামিটাকে ঠিক পাগলামি বলে আর ভাবতে পারছি না এখন। সাধারণ পাগলদের চাইতে ওর রকম-সকম সম্পূর্ণ আলাদা। এটাই আরও বেশি চিন্তিত করে তুলল আমাকে। গত কয়েকদিন আড়ালে-আবডালে থেকে পর্যবেক্ষণ করেছি রেনফিল্ডকে। কিন্তু কোন পরিবর্তন নেই ওর মধ্যে। তবে একটা কাজ সে করেছে, কথামত তিনদিনের মধ্যেই অর্ধেক মাকড়সাকে বিদায় করেছে। কিন্তু কোথায় সরল সে মাকড়সাগুলোকে? ছেড়ে দেয়নি এ-সম্পর্কে আমি স্থির নিশ্চিত, খেয়েও ফেলেনি, তাহলে? ওদিকে কেমন করে জানি একটা চড়ুই ধরে ফেলে ওটার সাথে ইতোমধ্যেই ভাব জমিয়ে ফেলেছে রেনফিল্ড। আজ দুপুরবেলা হঠাৎ আবিষ্কার করলাম মাকড়সার রহস্যটা, আসলে হারানো মাকড়সাগুলো সব গেছে চড়ুইটার পেটে। আর তাইতেই রেনফিন্ডের পোষা হয়ে উঠেছে চড়ুইটা। মাকড়সা ধরা শুরু হবার পর আবার মাছির প্রতি কেন আকৃষ্ট হয়ে উঠেছিল পাগলটা তা-ও বুঝলাম। নিজের খাবার ছড়িয়ে মাছি ধরে রেনফিল্ড, তারপর মাছিগুলোকে ছেড়ে দেয় মাকড়সার খাঁচায়, মাকড়সাগুলোকে আবার খাওয়ায় চড়ুই দিয়ে। এরকম অদ্ভুত পাগলামির কথা জীবনে শুনিনি আমি।

১৯ জুলাই।

ইতোমধ্যেই চড়ুই পাখিদের ছোটখাট একটা বুস্তি গড়ে তুলেছে রেনফিল্ড। মাঝখানে বেশ কদিন ওর সাথে দেখা করিনি আমি। আজ ওর ঘরে ঢুকতেই ছুটে এসে আমার কাছে কেঁদে পড়ল রেনফিল্ড। বলল, যাই বলুন, ডাক্তার সাহেব, ছোট্ট একটা বিড়ালের বাচ্চা চাই আমার। ওর সাথে ভাব করব আমি। সকালসন্ধ্যা খেলব, সময় হলে খেতে না চাইলেও ধমক-ধামক দিয়ে খাওয়াব, দারুণ মজা হবে, তাই না?

কথা শুনে মেজাজটা খিঁচড়ে গেল আমার। কিন্তু তা প্রকাশ করলাম না ওর কাছে। বিড়ালের বাচ্চা কেন চাইছে সে তো আমি জানি। আসলে চড়ুইদের পুরো বস্তিটা বিড়ালের পেট ভরাতে চাইছে রেনফিল্ড। মজা করার জন্যে বললাম, বিড়ালের বাচ্চা পুষলে তো ভালই। তা বাচ্চা হলেই চলবে, নাকি আসলে একটা বড় বিড়াল দরকার তোমার?

ঠিক ধরেছেন আপনি! অত্যন্ত খুশি হয়ে বলল সে, সাধে কি আর এতবড় হাসপাতালের ডাক্তার হয়েছেন আপনি! তা, ডাক্তার সাহেব, বিড়ালটা কিন্তু আজই চাই আমার।

কিন্তু আজ তো হচ্ছে না। অর জন্যে অপেক্ষা করতে হবে তোমাকে। সত্যি একটা বিড়াল তোমাকে দেয়া যায় কিনা ভেবে দেখতে হবে আমাকে।

মুহূর্তে খুশি খুশি ভাবটা চলে গেল রেনফিল্ডের চেহারা থেকে, সে-জায়গায় স্থান নিল একটা ভয়ঙ্কর অভিব্যক্তি। এ অভিব্যক্তি শুধু উন্মাদ খুনীদের মাঝেই দেখেছি আমি। এখন যে-কোন মানুষকে পৈশাচিকভাবে খুন করতে এতটুকু বাধবে না রেনফিল্ডের, ওই চেহারা তাই প্রমাণ করে। বুঝলাম, যতটা সহজ ভেবেছিলাম ওকে তারচেয়ে অনেক, অনেক বেশি ভয়ঙ্কর সে। এখন থেকে হুঁশিয়ার থাকতে হবে আমাকে। নাহলে যে-কোন মুহূর্তে, যে-কোন অঘটন বাধিয়ে বসতে পারে রেনফিল্ড।

রাত দশটায় আবার দেখতে গেলাম রেনফিল্ডকে। গালে হাত দিয়ে ঘরের এক কোণে চুপচাপ বসে আছে ও। কিছুক্ষণ আগের ভয়ঙ্কর রূপ এখন আর তার মাঝে নেই। আমি ঘরে ঢুকতেই আবার আমার কাছে একটা বিড়ালের বাচ্চা চাইল সে। পরিষ্কার বলে দিলাম, হবে না। আর একটা কথাও বলল না রেনফিল্ড। হতাশ ভাবে ফিরে গিয়ে জানালা দিয়ে বাইরে চেয়ে চেয়ে কি যেন ভাবতে থাকল সে। আমিও আর কোন কথা না বলে ফিরে এলাম।

২০ জুলাই।

নির্দিষ্ট সময়ের অনেক আগেই বিছানা ছেড়ে উঠে পড়লাম। প্রচণ্ড কৌতূহল ব্লেনফিন্ডের ঘরের দিকে টেনে নিয়ে চলল আমাকে। ওর ঘরের জানালা দিয়ে উঁকি মেরে দেখলাম, খোশ মেজাজেই আছে রেনফিল্ড। বেসুরো কণ্ঠে শুনগুন করে গান গাইতে গাইতে ঘরের এখানে ওখানে চিনি ছিটাচ্ছে সে। আবার শুরু হয়ে গেছে মাছি শিকার। ঘরের কোথাও একটা চড়ুই চোখে পড়ল না। বিদায় করে দিয়েছে পাখিগুলোকে? জানালা থেকে সরে এসে রেফিন্ডের ঘরে গিয়ে ঢুকলাম। মৃদু হেসে জিজ্ঞেস করলাম ওকে, পাখিগুলোকে দেখছি না, ছেড়ে দিয়েছ নাকি?

ছাড়ব কেন? পাখা আছে, উড়ে গেছে। নির্লিপ্ত গলায় জবাব দিল রেনফিল্ড।

কথাটা বিশ্বাস হল না আমার। হঠাৎই চোখে পড়ল জিনিসগুলো। ঘরের এখানে ওখানে পড়ে আছে কয়েকটা পালক। কয়েক ফোটা রক্তের দাগও লেগে আছে বালিশের কভার আর বিছানার চাদরে। রক্ত এল কোত্থেকে? বেরিয়ে এসে রেনফিন্ডের ওপর কঠোর নজর রাখতে বললাম নার্সকে।

বেলা এগারোটায় ছুটতে ছুটতে এল নার্স। বলল, সাংঘাতিক রকম অসুস্থ হয়ে পড়েছে, স্যার, রেনফিল্ড। বমি করে করে ভরিয়ে ফেলছে ঘরের মেঝে, বিছানার চাদর, একটু থেমে আবার বলল নার্স, বললে বিশ্বাস করবেন না, স্যার, বমির সাথে বেরিয়ে আসছে গাদা গাদা পালক। আমার মনে হয় সব কটা চড়ুইকেই গিলে ফেলেছে হতচ্ছাড়া পাগলটা। ব্যাপারটা দেখার জন্যে ছুটলাম রেনফিন্ডের ঘরে।

রাত দশটায় আবার দেখতে গেলাম রেনফিল্ডকে। অনেকটা ভাল এখন সে, কড়া ঘুমের ওষুধ খেয়ে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে আছে। আস্তে করে বালিশের তলা থেকে বের করে আনলাম ওর হিসেবের খাতাটা। খাতাটা খুলেই পাগলটার স্বভাবচরিত্র অনেকখানি প্রকাশ হয়ে পড়ল আমার কাছে। এ-ধরনের বিচিত্র পাগল কোটিতে একটা মেলে কিনা সন্দেহ। কোন বই-পুস্তকে পাওয়া যায় না এসব রোগের নাম। তবে কিছু কিছু ভুডু বিশেষজ্ঞের কাছে এসব পাগলদের কথা শুনতে পাওয়া যায়। এদেরকে বলে ওরা জুফাগাউস ম্যানিয়াক, অর্থ আত্মাভুক উন্মাদ। এরা মনে করে অন্যান্য জীবের জীবনকে আত্মসাৎ করে ফেললে সেইসব জীবের জীবনীশক্তি পুঞ্জীভূত ও সঞ্চালিত হয়ে যাবে নিজের মধ্যে। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হল একটা বিচিত্র পদ্ধতিতে জীবনীশক্তি আত্মসাৎ করে ওরা। প্রথমে যতগুলো সম্ভব প্রাণীকে অপেক্ষাকৃত বড় আকারের প্রাণী দিয়ে খাওয়ায় ওরা। এর উদ্দেশ্য, ছোট প্রাণীগুলোর সমস্ত জীবনীশক্তি আত্মসাৎ করে নিল অপেক্ষাকৃত বড় প্রাণীটা। তারপর সেই প্রাণীটাকে নিজেই খেয়ে ফেলে ছোট প্রাণীগুলো আর বড় প্রাণীটার জীবনীশক্তি একসঙ্গে আত্মসাৎ করে নেয় জুফাগাউস ম্যানিয়াক। কখনও কখনও এই আত্মসাৎ-এর প্রক্রিয়া তৃতীয়, চতুর্থ এমনকি পঞ্চম স্তর পর্যন্ত পৌঁছায়। রেনফিন্ডের প্রক্রিয়া চতুর্থ স্তরে পৌঁছেছে, অবশ্য বিড়াল পেলে পঞ্চম স্তরেই পৌঁছে যেতে পারত সে।

এ ধরনের অন্যান্য পাগলদের চাইতে আর একটু উন্নত রেনফিল্ড। কটা জীবকে আত্মসাৎ করেছে তা নির্ভুলভাবে খাতায় লিখে রেখেছে সে। কটা মাকড়সাকে কটা মাছি খাওয়াল, সে-মাকাগুলোকে আবার কটা চড়ুই দিয়ে খাওয়াল সবকিছু অত্যন্ত সুন্দরভাবে তারিখ দিয়ে দিয়ে লিখে রেখেছে ও। একটা পাগল কি করে এত সুন্দর এবং নির্ভুলভাবে অঙ্কের হিসেব রাখল ভেবে আশ্চর্য লাগল আমার। জানো লুসি, ভেবেছিলাম, তোমার প্রত্যাখ্যানের পর আর কোন কাজেই মন বসাতে পারব না আমি। জীবনটা অর্থহীন হয়ে যাবে আমার কাছে। কিন্তু এখন দেখছি প্রেমই মানুষের জীবনে সবকিছু নয়। ইচ্ছে করলেই সুস্থ মন নিয়ে বেঁচে থাকার অনেক অবলম্বন খুঁজে বের করতে পারে মানুষ। পাগল রেনফিল্ডের কাছে একটা বড় শিক্ষা পেলাম আমি, যে-কোন কাজে স্থির অবিচলভাবে মনপ্রাণ ডুবিয়ে দিতে পারলে শুধু তাই নিয়ে বেঁচে থাকাটা এমন কঠিন কাজ নয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *