১.৩ চোখ মেলতেই দেখলাম

চোখ মেলতেই দেখলাম আমার ঘরে বিছানার ওপর শুয়ে আছি। একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। তাহলে কাল রাতে যা দেখেছি সব স্বপ্ন, কিছুই সত্যি নয়! ঠিক এই সময় পরনের জামাকাপড়গুলোর দিকে নজর পড়তেই সন্দেহের নিরসন হল। এ কাপড় নিয়ে কখনও ঘুমোতে যাই না আমি। হঠাৎ একটা কথা মনে হতেই গলায় হাত দিলাম। দিয়েই স্তব্ধ হয়ে গেলাম। আছে ক্ষতটা। কাল রাতে দেখা সুন্দরী ডাইনীর দাঁতের ক্ষত। প্রথম থেকে শুরু করে শেষে জ্ঞান হারানো পর্যন্ত গত রাতের সমস্ত ঘটনা মনে পড়ে গেল আমার। আমি জ্ঞান হারাবার পর কাউন্টই এ ঘরে বয়ে এনেছেন আমাকে। পকেটে হাত দিয়ে দেখলাম থোয়া যায়নি ডায়েরীটা। অর্থাৎ আমি যে ডায়েরী রাখি এটা এখনও জানেন না কাউন্ট। জানলে নিশ্চয়ই সরিয়ে ফেলতেন ওটা। স্তব্ধ হয়ে বিছানায় বসে ভাবতে লাগলাম গত রাতের অদ্ভুত ঘটনাগুলোর কথা।

১৮ মে

এসবের মানে আমাকে জানতেই হবে। তবে রাতের বেলা নয়, প্রকাশ্য দিবালোকে। বাথরূম সেরে, কাপড় বদলে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়লাম। সিঁড়ি বেয়ে ওপরের তলার সেই ঘরে আসতেই দেখলাম দরজা বন্ধ। প্রাণপণ চেষ্টা করেও একচুল নড়াতে পারলাম না বন্ধ দরজার পাল্লা। বাইরে থেকে শেকল ভোলা হয়নি। তাহলে নিশ্চয়ই ভেতর থেকে বন্ধ করা হয়েছে। গতরাতে ভাল মতই লক্ষ্য করেছিলাম এ ঘরে এই একটা মাত্র দরজা। তাহলে ভেতর থেকে দরজাটা বন্ধ করার পর কোন পথে বেরোলেন কাউন্ট? সেই তিন ডাইনীর মত জানালা গলে উড়ে-গেছেন? ব্যাপারটাকে আর স্বপ্ন বলে উড়িয়ে দিতে পারছি না কিছুতেই। প্রতিজ্ঞা করলাম এ রহস্যের সমাধান করতেই হবে আমাকে।

১৯ মে।

পরিষ্কার বুঝতে পারছি ভয়ঙ্কর এক ফাদে জড়িয়ে পড়েছি আমি। গত রাতে আমাকে দিয়ে আরও তিনটে চিঠি লিখিয়ে নিয়েছেন কাউন্ট। প্রথমটায় লিখেছিএখানের কাজ প্রায় শেষ, দিন কয়েকের মধ্যে বাড়ি ফিরছি। দ্বিতীয়টায়আগামীকাল সকালেই প্রাসাদ-দুর্গ ছেড়ে রওনা হচ্ছি। আর তৃতীয়টায়—আমি বিসট্রিজে এসে পৌঁছেছি।

প্রতিবাদ করতে পারতাম। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে কাউন্টের কথার প্রতিবাদ করা হবে পাগলামিরই নামান্তর। এখন ওঁর সম্পূর্ণ হাতের মুঠোয় আমি, বিরোধিতা করতে গেলেই রেগে গিয়ে যা খুশি করে বসতে পারেন। একমাত্র উপায় সুযোগের অপেক্ষা করা। অবশ্য সেরকম সুযোগ আর আমার জীবনে আসবে কিনা জানি না।

আমার সাথে আর আগের মত মন খুলে আলাপ করেন না কাউন্ট। গম্ভীর গলায় শুধু আদেশ করে যান আমাকে। তিনি ধরে নিয়েছেন তাঁর আদেশ মানতে আমি বাধ্য। চিঠি তিনটে লিখে শেষ করার পর ওঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, একই দিনের তারিখ দেব চিঠিগুলোতে?।

না, গম্ভীর গলায় উত্তর দিলেন কাউন্ট, এখানে নিয়মিত আসে না ডাক পিয়ন। আপনার চিঠিগুলো আমার কাছে থাকল। সময় বুঝে পরপর পাঠিয়ে দেব ওগুলো, মিনিট খানেক চুপ থেকে আবার বললেন তিনি, প্রথমটায় তারিখ দিন ১২ জুন, দ্বিতীয়টায় ১৯ জুন আর তৃতীয়টায় ২৯ জুন।

যাক তবু জানলাম আমার হাতে আর কতদিন সময় আছে। অর্থাৎ ২৯ জুন পর্যন্ত আমাকে বেঁচে থাকার অধিকার দিয়েছেন কাউন্ট।

২৮ মে।

কোত্থেকে যেন একদল জিপসী এসে তাঁবু গেড়েছে প্রাসাদ দুর্গের উঠানে। ভারি অদ্ভুত এই জিপসীদের ধরন-ধারণ। নিজেদের সমাজ, নিজেদের রীতিনীতি নিয়েই ব্যস্ত থাকে ওরা। নির্ভীক, দুঃসাহসী এই জাতটা আইনের ধারেকাছেও ঘেঁষে না, ওদের ইচ্ছে মাফিক কাজকারবার করে বেড়ায়।

জানালায় দাঁড়িয়ে আকার ইঙ্গিতে ইতোমধ্যেই ভাব জমিয়ে ফেলেছি আমি। বিচিত্র পদ্ধতিতে আমার ইঙ্গিতের উত্তরে সাড়া দিয়েছে ওরাও। ভাবছি, ওদের মাধ্যমেই বাইরের জগতে কয়েকটা চিঠি পাঠাবার চেষ্টা করতে হবে আমাকে।

দ্রুত দুটো চিঠি লিখে ফেললাম। একটা মি. হকিন্সকে। চিঠিতে মিনার সাথে যোগাযোগ করতে অনুরোধ করেছি ওকে। দ্বিতীয়টা মিনার নামে। শর্টহ্যাণ্ডে আমার অসহায়তার কথা সবই জানিয়েছি তাকে। ভয় পেয়ে অনর্থ বাধিয়ে বসতে পারে ভেবে সে-রাতের ডাইনীদের ঘটনা বাদ দিয়েছি শুধু।

পকেট থেকে পয়সা বের করে চিঠি দুটো দিয়ে সেটা মুড়ে জানালা দিয়ে বাইরে ছুঁড়ে দিলাম, ইঙ্গিতে জিপসী সর্দারকে বোঝাবার চেষ্টা করলাম, চিঠি দুটো ডাক্তে দিতে চাই আমি। কি বুঝল সে কে জানে, তবে চিঠি দুটো তুলে নিয়ে আমার উদ্দেশ্যে মাথা নুইয়ে হ্যাটের ভেতর গুঁজে রাখল ওগুলো।

কাউন্ট এলেন সন্ধ্যার একটু পরে। শান্তভাবে আমার পাশের চেয়ারটায় বসে পকেট থেকে দুটো চিঠি বের করলেন তিনি। মৃদু বিদ্রুপের স্বরে বললেন, জিপসী সর্দার দিয়েছে আমাকে চিঠি দুটো। একটা মি. হকিন্সকে লেখা, অবশ্যই আপনার হাতের, দ্বিতীয়টা মিনা মুর নামের এক মহিলাকে। বলেই রুদ্র মূর্তি ধারণ করলেন কাউন্ট। আমার দিকে তাকিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন, আন্তরিক বন্ধুত্ব এবং আতিথেয়তার তাহলে এই প্রতিদান! বলতে বলতে বাম দুটো জ্বলন্ত মোমের আগুনে তুলে ধরলেন তিনি। ধীরে ধীরে পুড়তে শুরু করল খাম দুটো। সম্পূর্ণ পুড়ে ছাই না হয়ে যাওয়া পর্যন্ত সেদিকে চেয়ে রইলেন তিনি, তারপর চেয়ারে সোজা হয়ে বসে বললেন, জানি, অন্যের চিঠি খোলা যোরতর অন্যায়, কিন্তু কি করব, মি. হারকার, নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্যেই এতটা হুঁশিয়ার হয়ে চলতে হয় আমাকে। বলতে বলতেই একটা নতুন খাম আমার দিকে এগিয়ে দিলেন তিনি, মিনা মূরের ঠিকানাটা আর একবার লিখে দিন এতে।

যন্ত্রচালিতের মত হাত বাড়িয়ে কাউন্টের হাত থেকে খামটা নিয়ে তাতে ঠিকানা লিখে দিলাম। খামটা হাতে নিয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন তিনি। তারপরই আমার ঘরের দরজায় চাবি লাগানর শব্দ শুনে লাফ দিয়ে ছুটে গেলাম দরজার দিকে। বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে দরজা।

ঘণ্টা দুয়েক পর আবার ফিরে এলেন কাউন্ট। একটানা সোফায় বসে থাকতে থাকতে একটু ঝিমুনি মত এসেছিল আমার। তাই কোনদিক দিয়ে ঘরে এসে ঢুকেছেন তিনি বুঝতে পারিনি। তাঁর পায়ের মৃদু শব্দে তন্দ্রা ছুটে যেতেই দেখলাম আমার সামনে দাঁড়িয়ে মৃদু মৃদু হাসছেন কাউন্ট আমাকে চমকে উঠতে দেখেই বললেন, খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন নাকি?

না, বসে থাকতে থাকতে…

হয়েছে, আর বসে থাকতে হবে না। সোজা গিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ুন। কয়েকটা বিশেষ জরুরী কাজে আমাকে এখুনি একটু বাইরে যেতে হচ্ছে, না হলে আপনার সাথে বসে গল্প করতাম।

কোন কথা না বলে বিছানায় এসে শুয়ে পড়লাম। সঙ্গে সঙ্গে ঢলে পড়লাম গভীর ঘুমে। সবচেয়ে আশ্চর্য, এত দুশ্চিন্তার মধ্যেও এমন গাঢ় ঘুম আমার এল কি করে।

৩০ মে।

নিবিড় প্রশান্তি নিয়ে ঘুম ভাঙল। চোখ খুলতেই কথাটা মনে হল আমার। তাই তো, প্রয়োজনের সময় কাগজ কোথায় পাব, কিছু কাগজ পকেটে রেখে দিলে হয় না? তাড়াতাড়ি বিছানা ছেড়ে উঠে স্যুটকেস খুললাম। ধুলেই চক্ষুস্থির। কাগজ তো দূরের কথা, প্রাসাদের বাইরে বেরোনর উপযোগী জামাকাপড়, ওভারকোট, কম্বল এমনকি রেল গাইডটা পর্যন্ত স্যুটকেস থেকে উধাও। বাহতের মত সেদিকে চেয়ে বসে থাকলাম। আমার বাইরে যাবার সমস্ত পথ বন্ধ করে দিয়েছেন কাউন্ট।

৭ জুন।

বিছানার এক কোণে চুপচাপ বসে বসে ভাবছি। ভোর হয়েছে একটু আগে। হঠাৎ প্রাসাদ-দুর্গের পাথর বাঁধানো বিশাল চত্বরে ঘোড়ার খুরের আওয়াজ আর চাবুকের তীক্ষ্ণ শব্দে চমকে উঠলাম। খুশিতে ছেয়ে গেল মনটা। এক লাফে বিছানা থেকে নেমে ছুটে গেলাম জানালার কাছে। আট ঘোড়ায় টানা বিশাল দুটো গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে প্রাসাদ দুর্গের প্রাঙ্গণে। লম্বা চাবুক হাতে নিয়ে গাড়ির পাশেই দাঁড়িয়ে আছে কোচোয়ান দুজন। মাথায় স্লোভাক হ্যাট, কোমরে কাটা মারা চামড়ার চওড়া বেল্ট, গায়ে ভেড়ার লোমের তৈরি নোংরা জামা আর পায়ে হাঁটু পর্যন্ত উঁচু ভারী বুট পরা কোচোয়ান দুজনকে দেখেই ওদের সাথে কথা বলার জন্যে দরজার দিকে ছুটলাম। কিন্তু দরজায় ধাক্কা দিয়ে মুখের হাসি মিলিয়ে গেল আমার। বাইরে থেকে বন্ধ দরজাটা।

ছুটে ফিরে এলাম জানালার কাছে। চেঁচিয়ে ডাকলাম কোচোয়ান দুজনকে। চমকে উঠে মাথা তুলে আমার দিকে চাইল ওরা। সেই মুহূর্তে কোত্থেকে এসে উদয় হল সেই জিপসী সর্দার, ফিসফিসিয়ে ওদের কানে কানে বলল কিছু। জিপসী সর্দারের কথা শুনে আমার দিকে তাকিয়ে হো হো করে হেসে উঠল ওরা। হতাশায় ছেয়ে গেল মনটা।

আমার দিকে আর ভুলেও ফিরে চাইল না কোচোয়ান দুজন। নিজের কাজে মন দিল ওরা। মোটা দড়ির হাতল লাগানো চৌকো মতন বেশ বড় বড় কয়েকটা কাঠের বাক্স ওরা নামিয়ে রাখল মাটিতে। তারপর সেগুলো নিয়ে পর পর সাজিয়ে রাখল প্রাঙ্গণের এক কোণে। বাক্স বয়ে নিয়ে যাবার ভঙ্গি দেখে আর পাথুরে প্রাঙ্গণে নামিয়ে রাখার সময় যে শব্দ হল তা শুনে আন্দাজ করলাম বাক্সগুলো খালি। কাজ শেষ হতেই কোচোয়ানদের ভাড়া মিটিয়ে দিল জিপসী সর্দার। বোধহয় সংস্কারের বশেই পয়সার ওপর থু থু ছিটিয়ে পকেটে পুরে খুশি মনে গাড়িতে ফিরে গেল কোচোয়ানেরা। তারপরই হিশিয়ে উঠল ওদের হাতের চাবুক। চলে গেল কোচোয়ানেরা, আর একাকী বসে বসে নিজের কপাল ধিক্কার দিতে থাকলাম আমি।

২৪ জুন, শেষ রাত।

কেন যেন একটু তাড়াতাড়িই নিজের ঘরে ফিরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলেন কাউন্ট। তিনি চলে যাবার পরপরই দ্রুত ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়লাম আমি। সিঁড়ি বেয়ে উঠে এলাম দক্ষিণের সেই ঘরে। নজর রাখতে হবে কাউন্টের ওপর।

গত কদিন ধরেই মনে হচ্ছে আমার অজান্তে প্রাসাদের কোথায় যেন ঘটে চলেছে ভয়ঙ্কর একটা কিছু। জিপসীদের সেই দলটাকে আর দেখা যায় না, কিন্তু প্রাসাদের ভেতরেই কোত্থেকে যেন ভেসে আসে শাবল, কোদাল আর বেলচার অস্পষ্ট বুং ঠাং শব্দ। প্রাসাদের ভেতরেই কি কিছু করছে জিপসীরা?

বেশ কিছুক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছি দক্ষিণের ঘরের জানালার সামনে। হঠাৎ কাউন্টের ঘরের জানালার দিকে নজর পড়তেই চট করে সরে দাঁড়ালাম একপাশে। জানালা গলে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসছেন কাউন্ট। গায়ে আমার স্যুটকেস থেকে চুরি যাওয়া বেড়ানর পোশাক, কাঁধে একটা থলে, এটাতেই বাচ্চাটাকে ভরে সেদিন রাতে ডাইনীগুলোর দিকে ছুঁড়ে দিয়েছিলেন কাউন্ট। পরিষ্কার বুঝতে পারলাম আবার কাছাকাছি গ্রাম বা শহর থেকে বাচ্চা চুরি করতে যাচ্ছেন তিনি, আর তারই শয়তানির জন্যে পরোক্ষভাবে দায়ী হতে হবে আমাকেই। কেউ দেখে ফেললে মনে করবে আমিই চুরি করেছি বাচ্চা। ঘৃণায় ক্রোধে থরথর করে কাঁপতে লাগল আমার সর্ব শরীর। কিন্তু মনে মনে জ্বলে মরা ছাড়া করার কিছু নেই। এমন অসহায় ভাবে বন্দী থেকে এ ছাড়া আর করবই বা কি?

কাউন্ট ফিরে না আসা পর্যন্ত এখানেই অপেক্ষা করব, স্থির করলাম। জানালার দিকে সতর্ক দৃষ্টি রেখে দাঁড়িয়ে থাকলাম চুপচাপ। চাঁদের উজ্জ্বল আলোয় হঠাৎ মনে হল ক্ষুদ্র কণিকার মত কি যেন সব উড়ছে বাতাসে। কি ওগুলো? ভাল করে দেখার জন্যে আর একটু সামনে ঝুঁকে দাঁড়ালাম। অকস্মাৎ দূরের উপত্যকার দিক থেকে ভেসে এল কুকুরের হিংস্র চিৎকার। ক্রমেই বাড়ছে সে চিৎকার, সেই সাথে বাড়ছে বাতাসে ভাসমান চকচকে অদ্ভুত কণাগুলোর ঘূর্ণন। ঘুমে দুচোখ বুজে আসতে চাইছে আমার, জোর করে টেনে খুলে রাখতে হচ্ছে চোখের পাতা। ওই কুকুরের ডাক, অদ্ভুত কণিকা আর এই ঘুমের সাথে কি কোন সম্পর্ক আছে? আরও কেটে গেল সময়। চোখের সামনে স্পষ্ট রূপ নিতে শুরু করেছে এখন কণিকাগুলো। বিস্ময়ে অস্ফুট চিৎকার বেরিয়ে এল আমার গলা থেকে। কণিকাগুলো মিলিয়ে গেছে, তার জায়গায় ভাসছে তিনটে নারী-মূর্তি। সেদিনকার সেই তিন ডাইনী। আতঙ্কে শিউরে উঠলাম, খাড়া হয়ে গেল ঘাড়ের কাছের লোম। একছুটে পালিয়ে এলাম নিজের ঘরে।

আরও প্রায় ঘণ্টা দুয়েক পেরিয়ে যাবার পর কাউন্টের ঘর থেকে ভেসে আসা একটা শব্দে স্তব্ধ হয়ে যেতে চাইল আমার হৃৎপিণ্ডের গতি। হিমেল হাওয়ায় ভর করে ভেসে আসছে মানব শিশুর কান্না। কয়েক মুহূর্ত চেঁচিয়েই হঠাৎ থেমে গেল বাচ্চাটার চিৎকার, যেন গলা টিপে ধরে থামিয়ে দিল কেউ ওকে। আর সহ্য করতে পারলাম না। এখনই একটা কিছু করতে হবে ওই কাউন্ট নামক পিশাচের বিরুদ্ধে। প্রচণ্ড আক্রোশে ছুটে গেলাম দরজার দিকে। কাঁধ দিয়ে একটানা ধাক্কা দিয়ে চললাম দরজার গায়ে। কিন্তু ভারী মেহগনি কাঠের দরজা নড়ল না একচুল।

ঠিক সেই সময় প্রাঙ্গণের দিক থেকে ভেসে এল কোন নারীর বুকফাটা ক্রন্দন। একলাফে জানালার কাছে এসে দাঁড়ালাম। লোহার বিশাল কপাটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক মহিলা। এলোমেলো মাথার চুল, গায়ের কাপড় এখানে ওখানে ছেঁড়া, বোধহয় পাগলিনীর মত ছুটে আসতে গিয়েই এ-অবস্থা হয়েছে ওর। কপাটের গায়ে মাথা কুটতে কুটতে বিলাপ করছে সে। হঠাৎ জানালার কাছে আমাকে দেখেই জ্বলে উঠল মহিলার দুই চোখ। তীক্ষ্ণ স্বরে চেঁচিয়ে উঠল সে, আমার ছেলেকে ফিরিয়ে দে, ফিরিয়ে দে। শয়তান! বলেই আবার করুণ বিলাপে ভেঙে পড়ল মহিলা। তার করুণ চিৎকার শুনে অসহ্য বেদনায় বুকের ভেতরটা টনটন করে উঠল আমার।

হঠাৎ মাথার ওপরে, বোধহয় প্রাসাদের ছাত থেকে ভেসে এল কাউন্টের ভয়ঙ্কর রুক্ষ, কর্কশ চিৎকার। কাকে যেন ডাকছে সে। পরমুহূর্তেই তার ডাকের সাড়া দিয়ে চারদিক থেকে হিংস্র গর্জন করে উঠল হাজার হাজার নেকড়ে। একটু পরেই চোখে পড়ল উপত্যকার দিক থেকে ছুটে আসছে নেকড়ের দল। সাথে সাথে ঘন মেঘে ঢেকে গেল চাদ। অন্ধকারে ধক ধক করে জ্বলছে হাজার হাজার রক্তচক্ষু। বিদ্যুতের মত ছুটে এসে হতভাগিনী মায়ের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল নেকড়ের দল। কয়েক মুহূর্ত পরেই থেমে গেল মায়ের বিলাপ। নিকষ কালো অন্ধকারে চোখে না পড়লেও নেকড়েদের হুটোপুটিতে বুঝলাম মহিলাকে ছিঁড়ে খুঁড়ে খাচ্ছে শয়তানের দল। কয়েক মিনিট পরই ডাকতে ডাকতে আবার উপত্যকার দিকে ফিরে গেল নেকড়েগুলো। হা ঈশ্বর, ভয়ঙ্কর এই মৃত্যুপুরীতে এসে এ-ও দেখতে হল আমাকে!

২৫ জুন, ভোর।

সূর্য উঠছে। সারাটা রাত অসহ্য আতঙ্কের ভেতর কাটিয়ে ওই সূর্যকে ঈশ্বর প্রেরিত দেবতা বলে মনে হল আমার কাছে। সমস্ত ভয়, সমস্ত আতঙ্ক আমার মন থেকে ধুয়েমুছে নিয়ে গেল ওই উজ্জ্বল সূর্যালোক। শুধু আজই নয়, এ-প্রাসাদে আসা অবধি সূর্য ওঠা মাত্রই আস্তে আস্তে ভয় কেটে যেতে থাকে আমার মন থেকে। দিনের স্বচ্ছ আলোয় একটু একটু করে ফিরে পাই হারানো সাহস। সাঁঝ ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে আবার ভয়ের দোদুল দোলায় দুলতে থাকে মন, সিটিয়ে আসতে থাকে হাত-পা।

ইতোমধ্যেই দুটো চিঠি ডাকে ফেলা হয়েছে। বাকি রয়েছে একটা। ভয়ঙ্কর বিপদে আছি। আমার মাথার ওপর ঝুলছে মৃত্যুর খাঁড়া, যে-কোন সময় নেমে আসতে পারে সেটা। কিন্তু কিভাবে আসবে আমার মৃত্যুদূত, কিভাবে মরব আমি?

বাঁচতে হলে মাথাটা সম্পূর্ণ ঠাণ্ডা রাখতে হবে এখন। গত কয়েকদিনের ঘটনাগুলোকে তলিয়ে দেখতে শুরু করলাম। একটি জিনিস খেয়াল করেছি, ভয়ঙ্কর যা কিছু ঘটছে সব রাতের বেলায়। আর একটা জিনিস, এ-পর্যন্ত দিনের বেলায় কাউন্টের সাথে সাক্ষাৎ ঘটেনি কখনও। বোধহয় সবাই যখন ঘুমিয়ে থাকে সে তখন জেগে ওঠে, আর সবার জেগে ওঠার সময় সে ঘুমোতে যায়। তাহলে যা কিছু করার, দিনের বেলায় করতে হবে আমাকে। কোনমতে কাউন্টের ঘরে একবার ঢুকতে পারলে অনেক কিছু পরিষ্কার হয়ে যেত। কিন্তু কিভাবে ঢোকা যায়? সব যে তালা বন্ধ।

অনেক ভেবেচিন্তে একটা উপায় বের করে ফেললাম। কাজটায় বিপদের সম্ভাবনা প্রচুর, কিন্তু এছাড়া আর কোন উপায় নেই। জানালা গলে কয়েকবারই কাউন্টকে বেরিয়ে যেতে দেখেছি, সে-পথে একবার চেষ্টা করে দেখলে হয়। মনস্থির করে নিয়ে বেরিয়েই পড়লাম শেষ পর্যন্ত।

সিঁড়ি বেয়ে দক্ষিণের ঘরে এসে পৌঁছুলাম। ঘরের সামনে থেকে পাথরের এবড়োথেবড়ো একটা সরু কার্নিস সোজা চলে গেছে কাউন্টের ঘরের কাছে দিয়ে। পা থেকে জুতো খুলে ঈশ্বরের নাম নিয়ে এগোতে শুরু করলাম কার্নিস বেয়ে। চলার পথে দেয়ালের মাঝেমধ্যে পলেস্তারা খসে গিয়ে ইটের পাঁজন্তুরা বেরিয়ে পড়েছে। চলতে চলতে হঠাৎ একবার নিচের দিকে চোখ পড়তেই ঘুরে উঠল মাথাটা, তবু থামলাম না। কারণ এমনিতেও দুদিন পরেই মরতে হবে আমাকে, তারচেয়ে বরং একবার চেষ্টা করেই মরা যাক। বার কয়েক পা ফসকে পড়তে পড়তে বেঁচে গিয়ে শেষ পর্যন্ত কোনমতে এসে পৌঁছুলাম কাউন্টের ঘরের জানালার সামনে। জানালার কাঁচের শার্সি লাগানো পাল্পা দুটোয় ঠেলা দিতেই মসৃণভাবে খুলে গেল ওগুলো।

কোনরকমে প্রচণ্ড উত্তেজনা দমন করে জানালা টপকে ঢুকে পড়লাম ঘরের ভেতরে। কাউন্ট নেই ঘরে। ঘুরে ঘুরে দেখতে শুরু করলাম ঘরটা। প্রাসাদের ওপরের তলার ঘরগুলোর মত এ ঘরটাও প্রাচীন আমলের আসবাবপত্রে সাজানো। বহুদিন অব্যবহৃত থাকায় ওগুলোর উপর পুরো ধুলোর আস্তরণ জমেছে। ঘরের কোণে এক জায়গায় প্রায় তিনশো বছর আগের বৃটিশ, রোম, অস্ট্রিয়া, হাঙ্গেরি, গ্রীক আর তুরস্কের স্বর্ণমুদ্রা পাকারে ফেলে রাখা হয়েছে। এছাড়া আছে অজস্র মূল্যবান সোনার গহনাপত্র। এগুলোর ওপরেও পুরু ধুলোর স্তর। উল্টোদিকের দেয়ালে একটা ভারী দরজা। জানি বাইরে থেকে তালা মারা আছে দরজায়, তবু একবার ঠেলে দেখলাম। আমাকে অবাক করে দিয়ে খুলে গেল দরজাটা। তালা দেয়া হয়নি দরজায়। বোধহয় ভুলে গেছেন কাউন্ট।

দরজার সামনেই ছোট্ট একফালি বারান্দা। বারান্দার একপ্রান্ত থেকে একটা ঘোরানো সিঁড়ি ধাপে ধাপে নেমে গেছে নিচে। অতি সতর্ক পায়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে চললাম। যতই নিচে নামছি ততই গ্রাস করছে আমাকে নিকষ কালো অন্ধকার। কিছুক্ষণ থেকেই একটা ভ্যাপসা পচা গন্ধও নাকে এসে লাগছে। মাঝে মাঝে অবশ্য পাথরের জাফরি দিয়ে সামান্য আলো এসে পড়েছে ভেতরে, কিন্তু এত অন্ধকারের কিছুই দূর করতে পারছে না সে-আলো। চলতে চলতে আর একটা গন্ধ নাকে এসে লাগল। সদ্য খোড়া মাটির বিশ্রী সোঁদা গন্ধ, বদ্ধ বাতাসে থমথম করছে। যতোই এগোচ্ছি ততোই তীব্র হয়ে উঠছে গন্ধটা।

সিঁড়ির শেষ মোড়টা ঘুরতেই আবছা আলো চোখে পড়ল। সিঁড়ির শেষ মাথায় দরজাটা খোলা। দরজা পেরিয়ে একটা চ্যাপেলের মধ্যে এসে দাঁড়ালাম। গির্জা সংলগ্ন মাটির নিচের এই ঘরটাকে নিঃসন্দেহে এক সময়ে পারিবারিক কবরখানা হিসেবে ব্যবহার করা হত। ওপরদিকে তাকিয়ে দেখলাম পলেস্তারা খসে পড়েছে ছাদের। পরপর দুসারি কফিন সাজানো আছে নিচে। সারিগুলোর মাঝখান থেকে গভীর করে মাটি খুঁড়ে বড় বড় বাক্সে ভরা হয়েছে। দেখেই চিনলাম, স্লোভাকদের আনা সেই বাক্স এগুলো।

দুরু দুরু বুকে ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলাম সেই প্রাচীন কবরখানা। আবছা আলো-আঁধারিতে ভীষণ ভয় করতে লাগল, তবু সাহস করে এগিয়ে গেলাম কফিনগুলোর দিকে। ঈশ্বরের নাম নিয়ে ডালা খুললাম প্রথম কফিনটার। ভেতরে চেয়েই একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। শুধু মাটি দিয়ে ভর্তি কফিনটা। পরপর দুটো কফিনের ডালা খুলে একই ফল পেলাম। এখন আর ভয় করছে না ডালা খুলতে। কিন্তু ভয় পেলাম তৃতীয় কফিনটার ডালা খুলেই এবং এত ভয় জীবনে কখনও পাইনি। ঘাড় থেকে মেরুদণ্ড বেয়ে শিরশির করে নিচের দিকে নেমে গেল ঠাণ্ডা ভয়ের স্রোত। সজারুর কাঁটার মত খাড়া হয়ে উঠল ঘাড়ের ঢোম। সোজা আমার দিকে তাকিয়ে মাটি ভর্তি বাক্সের মধ্যে চিত হয়ে শুয়ে আছেন কাউন্ট ড্রাকুলা।

ওঁর বিস্ফারিত চোখের মণি দুটো পাথরের মত নিথর, কিন্তু মড়ার মত নিষ্প্রভ নয়। জীবন্ত মানুষের মত সজীব গাল, রক্তলাল পুষ্ট দুটো ঠোঁট। কাউন্ট কি ঘুমিয়ে আছেন? কাঁপা কাঁপা হাতে ছুয়ে দেখলাম ওঁকে। বরফের মত ঠাণ্ডা শরীরে প্রাণের চিহ্নমাত্র নেই! সদর দরজার চাবিটা পাওয়া যাবে কাউন্টের পকেটে, ভেবে ওঁর পকেটে হাত দিতে যেয়েই চমকে উঠলাম। মনে হল তীব্র আক্রোশে যেন ক্ষণিকের জন্যে জ্বলে উঠল ওর চোখদুটো।

চাবি ধোঁজা আর হল না। সে নিথর চোখের তীব্র চাহনিতে আতঙ্কে দম বন্ধ হয়ে যাবার জোগাড় হল আমার। ছিটকে কফিনটার কাছ থেকে সরে এসে পড়িমরি করে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে শুরু করলাম। আমার ছুটন্ত পায়ের শব্দ প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরতে লাগল সেই বদ্ধ জায়গায়। আর সেই শব্দ শুনে আমি ভাবলাম পেছন পেছন আমাকে তাড়া করে আসছেন কাউন্ট।

এভাবেই ছুটতে ছুটতে কাউন্টের ঘরে এসে ঢুকলাম। সেখান থেকে জানালা গলে কার্নিস এবং তারপর নিজের ঘরে। ঘরে ঢুকেই নিজেকে ছুঁড়ে দিলাম বিছানায় বালিশের তলা থেকে টান মেরে বের করে আনলাম কুশটা। যে কাজ মন থেকে কোনদিন করিনি, তাই করে বসলাম আজ। কুশটা ঝুলিয়ে নিলাম গলায়।

২৯ জুন।

দক্ষিণের ঘরের জানালায় দাঁড়িয়ে আজ আবার পোশাক পরে জানালা গলে বেরিয়ে যেতে দেখলাম কাউন্টকে। টিকটিকির মত বুকে হেঁটে দেয়াল বেয়ে সে নেমে যাবার সময় হাতটা নিশপিশ করছিল আমার। এই মুহূর্তে যদি একটা বন্দুক থাকত আমার হাতে তাহলে আজই একহাত দেখে নিতে পারতাম তাকে। অবশ্য পারতাম কিনা সে বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে আমার মনে। তিন ডাইনীর সাথে দেখা হয়ে যাবার ভয়ে আজ আর বসে থাকলাম না এই ঘরে, নিজের কামরায় ফিরে এলাম।

কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি জানি না, ঘুম ভাঙল কাউন্টের ডাকে। কোন প্রকার ভণিতা না করে সোজা-সাপটা রায় দিল সে, আগামীকাল ইংল্যাণ্ডে ফিরে যাচ্ছেন আপনি। অতএব আপনার সাথে আর দেখা হচ্ছে না আমার। আপনার যাবার সময়ও হাজির থাকতে পারব না আমি, তবে তাতে কোন অসুবিধে হবে না। ভোরে জিপসীরা এসে শ্লোভাক কোচোয়ানদের গাড়িতে কয়েকটা কাঠের বাক্স তুলে দেবে। ওরা চলে যাবার পর আমার ব্যক্তিগত ফিটন বোর্গো গিরিপথ পর্যন্ত পৌঁছে দেবে আপনাকে। সেখানে বুকোভিনা থেকে আসা কোন গাড়ি ধরে নিশ্চিন্তে পৌঁছে যেতে পারবেন বিসট্রিজে।

তবে তার আগে কাউন্ট ড্রাকার প্রাসাদ সম্পর্কে আপনার আরও বিস্তারিত কিছু জেনে যাওয়া দরকার। আজ রাতেই তা জানতে পারবেন এবং কানে শুনে নয়, স্বচক্ষে দেখে।

কাউন্টের কথার ভঙ্গিতে রাগে ব্ৰহ্মতালু পর্যন্ত জ্বলে উঠল আমার। হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে চেঁচিয়ে উঠলাম, তোর শয়তানি দেখার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে আর আমার নেই। আজই, এই মুহূর্তে এই অভিশপ্ত প্রাসাদ ছেড়ে চলে যেতে চাই আমি।

বিন্দুমাত্র রাগ প্রকাশ পেল না কাউন্টের চেহারায়। শান্ত স্বরে বলল সে, এখন, এই রাতের বেলা গাড়ি পাবেন কোথায়?

চুলোয় যাক গাড়ি। হেঁটেই যেতে পারব আমি।

কুৎসিত হাসিতে ভরে গেল কাউন্টের মুখ, আপনার জিনিসপত্র?

তোকে দান করে গেলাম, হারামজাদা!

ভাল। তাহলে আর দেরি করে লাভ কি? চলুন, গেটের বাইরে এগিয়ে দিয়ে আসি আপনাকে। কিন্তু বিশ্বাস করুন, এভাবে বিদায় নিলে মনে ভীষণ ব্যথা পাব আমি।

এত সহজে আমাকে রেহাই দেবে কাউন্ট ড্রাকুলা ভাবতেও পারিনি। একমুহূর্ত দ্বিধা না করে উঠে দাঁড়ালাম। টেবিল থেকে বাতিটা তুলে নিয়ে রওনা দিল কাউন্ট। আমিও তার পিছু পিছু ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলাম। লম্বা লম্বা পা ফেলে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে শুরু করল কাউন্ট। তাকে অনুসরণ করে চললাম আমি। নিচে নেমে এসে সদর দরজার কাছে পৌঁছেই থমকে দাঁড়াল কাউন্ট, তার সাথে সাথে আমিও।

কান পেতে কি যেন শোনার চেষ্টা করল কাউন্ট, তারপর বলল, শুনতে পাচ্ছেন?

শুনতে পেয়েছি আমি। হিংস্র চাপা গর্জন করতে করতে এদিকেই এগিয়ে আসছে হাজার হাজার নেকড়ে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই বাঁধ ভাঙা বন্যার মত বাইরে থেকে গেটের ওপর এসে আছড়ে পড়ল ওরা। আরও কয়েক সেকেও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নেকড়েগুলোর হাঁক ডাক শুনল কাউন্ট, তারপর নির্দিধায় এগিয়ে গিয়ে খুলে ফেলল গেটের ভারী লোহার খিল।

ধীরে ধীরে খুলে যাচ্ছে ভারী লোহার দরজা। আরও উত্তাল হয়ে উঠেছে নেকড়ের গর্জন। দরজার ফাঁক দিয়ে থাবা ঢুকিয়ে দিয়েছে কয়েকটা নেকড়ে। আর মাত্র আধ সেকেণ্ড, তারপরই আমাদের ওপর এসে ঝাঁপিয়ে পড়বে জানোয়ারগুলো। পরিষ্কার বুঝলাম কাউন্টের বিরোধিতা করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। একটু একটু করে খুলেই চলেছে দরজা। দরজার সামনে পাথরের মূর্তির মত ঠায় দাঁড়িয়ে আছে কাউন্ট। মাথা দেখা যাচ্ছে নেকড়েগুলোর। কাউন্টকে দেখামাত্র নিমেষে যেন হোঁচট খেয়ে দাঁড়িয়ে গেল নেকড়ের দল। এক ইঞ্চি এগোল না আর ওরা।

আমার দিকে তাকিয়ে বিদ্রুপের হাসি হেসে বলল কাউন্ট, যাবেন? যান, গেট তো ভোলাই আছে।

চকিতে বাচ্চা-হারা মায়ের পরিণতি ভেসে উঠল আমার চোখের সামনে। আমি কাউন্টকে পার হয়ে যাওয়া মাত্র টেনে ছিঁড়ে ফেলবে আমাকে নেকড়ের দল। মনে মনে প্রচণ্ড ভয় পেলেও যথাসম্ভব শান্তভাবেই বললাম, না, কাউন্ট, এখন এতরাতে আর যাব না। আপনার ইচ্ছাই পূর্ণ হোক।

সেই ভাল, বলে দরজাটা বন্ধ করে দিল কাউন্ট। সঙ্গে সঙ্গে আবার গর্জন করে উঠল নেকড়ের দল, আওয়াজ শুনে বুঝলাম ফিরে যাচ্ছে ওরা।

ভগ্ন হৃদয়ে নিজের ঘরে ফিরে এলাম। হতাশা আর ক্লান্তিতে ভেঙে আসছে সর্বাঙ্গ। জামা-কাপড় পালটে শুতে যাব এমন সময় দরজার ওপাশে চাপা ফিসফিসানি শুনে পায়ে পায়ে এগিয়ে গিয়ে কান পাতলাম দরজার গায়ে। কাকে যেন বলছে কাউন্ট, আর একটা দিন মাত্র ধৈর্য ধরো। আগামীকাল রাতেই ওকে পাবে তোমরা।

কাউন্টের কথা শেষ হবার পরপরই একাধিক নারীকন্ঠের খিল খিল হাসি শুনে চমকে উঠলাম। পরিষ্কার বুঝলাম এ সেই তিন ডাইনী। রাগে তখন হিতাহিত জ্ঞানশূন্য আমি। দেখাই যাক হারামজাদীরা কি করে আমার! ঝটকা মেরে খুলে ফেললাম দরজাটা। ঠিক দরজার সামনেই দাঁড়িয়ে আছে ওরা। আমাকে দেখেই আবার হেসে উঠল ডাইনীরা। হাসি থামলে সুন্দরী মেয়েটা বলল, আর একটা দিন মাত্র অপেক্ষা করো, প্রিয়তম। কালই আমাদের মধুর সান্নিধ্য উপভোগ করতে পারবে তুমি, বলেই চোখের সামনে অদৃশ্য হয়ে গেল ওরা।

বুঝতে পারলাম আর মাত্র চব্বিশ ঘণ্টা আছে আমার আয়ু। কুশটাকে শক্ত করে চেপে ধরে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করতে শুরু করলাম।

৩০ জুন।

ঘুম ভাঙতেই উঠে গিয়ে জানালার ধারে দাঁড়ালাম। পুব আকাশে মেঘের বুকে সবে রঙের ছোপ লাগতে শুরু করেছে। এদিক-ওদিক থেকে কানে এসে বাজছে মোরগের ডাক। ভোর বেলা কর্কশ ডাকে ঘুম ভাঙিয়ে দেয় বলে চিরদিন মোরগকে অভিশাপ দিয়ে এসেছি আমি, আজ কিন্তু সে-ভাক মধুবর্ষণ করল আমার কানে। কারণ আপাতত নিরাপদ আমি। আঁধারের অন্তর্ধানের সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের অভিশপ্ত ডেরায় ফিরে গিয়েছে সমস্ত রক্তলোভী প্রেতাত্মার দল। পালাতে হলে এই সুযোগ।

কাল রাতেই দেখেছিলাম গেটের দরজায় তালা দেয়া নেই। মুহূর্ত মাত্র দেরি করে ঘর থেকে বেরিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে শুরু করলাম। হাঁপাতে হাঁপাতে গেটের কাছে পৌঁছে দুহাত দিয়ে টেনে খুলে ফেললাম ভারী লোহার খিল। আনন্দে দুলে উঠেছে বুক। যাক শেষ পর্যন্ত পালাতে পারব তাহলে। দুহাত দিয়ে ধাক্কা দিলাম দরজার পালায়। খুলল না। জোরে, আরও জোরে শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে ঠেলতে শুরু করলাম। কিন্তু একচুল নড়ল না কপাট। তালা ছাড়া কি করে আটকে আছে কপাটটা বুঝতে পারলাম না। কারণটা বের করার চেষ্টা করতে লাগলাম। যে করেই হোক আমাকে খুলতেই হবে ওই দরজা।

খুঁজতে খুঁজতে কপাটের গায়ে একটা ছিদ্র চোখে পড়ল, চাবির ছিদ্র। দরজা খুলছে না, তার মানে তালা দিয়ে দিয়েছে কাউন্ট। তালা যখন আছে, চাবিও নিশ্চয় আছে। যেমন করেই হোক সে চাবি খুঁজে বের করতেই হবে আমাকে। দেয়ালের কার্নিস বেয়ে আগের মত কাউন্টের ঘরে এসে ঢুকলাম। যা ভেবেছিলাম, কাউন্ট নেই ঘরে। একমুহূর্তও সময় নষ্ট না করে খুঁজতে শুরু করলাম। তন্ন তন্ন করে খুঁজেও সে-ঘরে পাওয়া গেল না চাবি। হয়ত কাউন্টের পকেটেই আছে ওটা। পিশাচটাকে কোথায় পাওয়া যাবে জানা আছে আমার। মনস্থির করে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নেমে চললাম কবরখানার দিকে।

আগের জায়গায়ই পাওয়া গেল বড় কাঠের বাক্সটা। দাঁতে দাত চেপে সাহস সঞ্চয় করে এগিয়ে গিয়ে তুলে ফেললাম বাক্সের ডালা। মনে মনে প্রস্তুত থাকা সত্ত্বেও ভয় পেলাম। চেহারা পালটে গেছে কাউন্টের। এ কি করে সম্ভব! নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করছে না। অর্ধেক বয়স যেন কমে গেছে কাউন্টের। ধবধবে সাদা গোফের বেশির ভাগই কালো হয়ে এসেছে। ভাঁজ পড়া কপাল আর গালের চামড়ায় এখন আর তেমন ভাজ দেখা যাচ্ছে না। সবচেয়ে আশ্চর্য, ঠোঁটের এক কোণ থেকে গড়িয়ে নেমে এসেছে লাল টুকটুকে রক্তের একটা ধারা। যেন অল্প আগে রক্ত পান করে এসেছে পিশাচটা।

আরও উজ্জ্বল, আরও ভয়ঙ্কর দেখাচ্ছে ওর চোখ দুটো। আজ আর সেচোখকে ভয় পেলাম না আমি। সোজা হাত ঢুকিয়ে দিলাম কাউন্টের জামার পকেটে। নেই চাবি। এ পকেট ও পকেট, সমস্ত পকেট খুঁজেও পাওয়া গেল না চাবি। কাউন্টের চোখের দিকে হঠাৎ চোখ পড়তেই ঘৃণায় রি রি করে উঠল আমার সর্বাঙ্গ। কুৎসিত হাসিতে বিকৃত হয়ে রয়েছে ওর মুখ-চোখ। আমি চাবি খুঁজে না পাওয়াতে যেন দারুণ মজা পাচ্ছে ব্যাটা। রাগে আগুন ধরে গেল যেন আমার শরীরে। বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে বাক্সটার পাশেই মাটিতে পড়ে থাকা একটা শাবল তুলে নিয়ে ধাই করে বসিয়ে দিলাম শয়তানটার মাথায়। সাধারণ মানুষের মাথা হলে ওই এক বাড়িতেই ভেঙে গুঁড়িয়ে যেত, কিন্তু কিছু হল না ওর। দ্বিগুণ মজা পেয়ে নিঃশব্দ হাসিতে ভরে গেল যেন ওর মুখ-চোখ, দুঠোঁটের কোণ ঠেলে বেরিয়ে এল গজদন্ত দুটো। প্রচণ্ড বিস্ময়ে আমার হাত থেকে খসে পড়ে গেল শাবলটা। আর এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটল সেই মুহূর্তে। দড়াম করে আপনাআপনি বন্ধ হয়ে গেল বাক্সের ডালা।

কি করা যায় এখন? সেখানেই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবতে থাকলাম। হঠাৎ কানে এল পাথুরে মেঝেতে চাকার ঘড়ঘড়ানি আর চাবুকের বাতাস কাটার তীক্ষ্ণ আওয়াজ। চমকে উঠলাম। নিশ্চয়ই পৌঁছে গেছে জিপসীরা। সদর দরজা খুলে নিশ্চয়ই ভেতরে এসে ঢুকবে ওরা এখন।

মুহূর্তে ছুটে বেরিয়ে এলাম কবরখানা থেকে। পাগলের মত অন্ধকার ঢাকা বারান্দা, ঘোরানো সিঁড়ি, কাউন্টের ঘরের জানালা, দেয়ালের গায়ের পাথরের কার্নিস আর দক্ষিণের ঘরের জানালা ডিঙিয়ে প্রাসাদের নিচে নামার প্রধান সিঁড়ির কাছে এসে পৌঁছুলাম। একমুহূর্তও সময় নষ্ট না করে হাঁপাতে হাঁপাতে এক এক লাফে তিন-চারটে করে সিঁড়ির ধাপ ডিঙিয়ে কোনমতে নিচে এসে নামলাম। সদর দরজার কাছে এসে দেখলাম দরজা আগের মতই বন্ধ, কিন্তু জিপসীরা কোথাও নেই। ওদিকে প্রাসাদের ভেতরে কোত্থেকে যেন ভেসে আসছে ভারী বস্তু টানাহেঁচড়ার শব্দ আর বহু কষ্ঠের মিলিত আওয়াজ। চেঁচিয়ে ডাকলাম, কে আছ, শুনতে পাচ্ছ?

উত্তর নেই। শুধু আমার ডাক চারপাশের পাথুরে দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে এল আমার কাছেই। বার বার চেঁচিয়ে ডেকে ডেকে গলা ফাটিয়ে ফেললাম, কিন্তু কেউ সাড়া দিল না আমার ডাকে। ঈশ্বরের এ কি পরিহাস!

আরও কিছুক্ষণ পর আবার কানে এল চাবুকের তীক্ষ্ণ শব্দ আর চাকার ঘড়ঘড়ানি। ক্রমেই দূর থেকে দূরে মিলিয়ে যাচ্ছে সে-আওয়াজ। চাকা আর চাবুকের শব্দকে ছাপিয়ে এই সময় দূর থেকে ভেসে এল সম্মিলিত জিপসী সঙ্গীতের সুর। চলে গেল জিপসীরা। আর কোন আশা নেই। এই মৃত্যুপুরীতেই জীবনের শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে হবে আমাকে।

কিন্তু এভাবে অসহায়ের মত চুপ করে থেকে তো মরতে পারব না। পারব না সেই তিন ডাইনীর সাথে একাকী রাত কাটাতে। চুষে ছিবড়ে বানিয়ে ছেড়ে দেবে ওরা আমাকে।

মিনা, মুক্তি পাবার চেষ্টা আমি করব। কিন্তু কদূর সফল হব জানি না। যদি বাঁচতে না পারি, আর এ ডায়েরী কখনও তোমার হাতে পৌঁছায় তাহলে প্রতিশোধ নেবার চেষ্টা করো। না হলে আমার মত বহু লোককে এভাবে ফাঁকি দিয়ে ভুলিয়ে এনে তিলে তিলে হত্যা করবে ওই রক্তলোভী, নিশাচর পিশাচ কাউন্ট ড্রাকুলা।

হঠাৎ একটা কথা মনে হতেই আশার আলো দেখতে পেলাম। হ্যাঁ, এ-যাত্রা বেঁচে গেলেও যেতে পারি। এতক্ষণ মনে হয়নি কেন কথাটা! এখান থেকে বেরোবার গোপন পথ যদি না পাই, ওদেরকে ঠেকাবার অন্তত একটা জিনিস তো আমার সঙ্গে আছে। পরম নির্ভরতায় গলায় ঝোলানো কুশটাকে দুহাত দিয়ে চেপে ধরলাম।

ঈশ্বর, রক্ষা করো আমাকে!

One thought on “১.৩ চোখ মেলতেই দেখলাম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *