১.২০ চেঁচিয়ে উঠল সার্জেন্ট হোসেন আরাফাত দবির

ঠিক আছে! এইবার তুইল্লা ধর! চেঁচিয়ে উঠল সার্জেন্ট হোসেন আরাফাত দবির।

স্ট্যাবিলাইয়িং কেবল দিয়ে উইলকক্স আইস স্টেশনের তুবড়ে যাওয়া রেডিয়ো অ্যান্টেনা তুলে আনতে চেষ্টা করছে নাজমুল ও ভাইপার। অ্যান্টেনা বলতে তিরিশ ফুট উঁচু একটা কালো খুঁটি। মাথার উপর দপদপ করছে সবুজ বাতি। আস্তে আস্তে উপরের। দিকে উঠছে খুঁটি। কয়েক সেকেণ্ড পর পর জ্বলে উঠছে সবুজ বাতি, সে আলোয় ভূতের মত লাগছে তিনজনকে।

আর কতক্ষণ লাগবে? নীচে দাঁড়িয়ে ঝোড়ো হাওয়ার উপর দিয়ে জানতে চাইল রানা।

তুলে ধরতে বেশিক্ষণ না, স্যর, কিন্তু এটা হচ্ছে সবচেয়ে সোজা কাজ, জানাল দবির। আসল কঠিন কাজ রেডিয়োর সবকটা তার ঠিকভাবে লাগানো। বিদ্যুৎ চালু হয়ে গেছে। কিন্তু আরও পনেরো-বিশটা তার ঝালাই দিতে হবে।

আন্দাজ কতক্ষণ?

তিরিশ মিনিট, স্যর।

কাজ করতে থাকুন।

র‍্যাম্প বেয়ে আবারও স্টেশনের সুড়ঙ্গের দিকে নামতে শুরু করেছে রানা। ভিতরে ঢুকবে দুটো কারণে। নিশাত সুলতানাকে দেখে আসা উচিত। তা ছাড়া, দেখা করতে হবে রাফায়লা ম্যাকানটায়ারের সঙ্গে।

এ-ডেকের ক্যাটওয়াকে ওর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল মেয়েটির। রানা বাইরে গিয়েছিল অন্যদের কাজ দেখতে। আর এ সময়ে রেডিয়ো রুমে কমপিউটারের মনিটরে ওয়েদার ম্যাপ দেখেছে রাফায়লা। খুঁজে বের করতে চেয়েছে সোলার ফ্লেয়ারের দুর্বলতা।

কপাল খুলল? জানতে চাইল রানা।

নির্ভর করে আপনি কী আশা করছেন, বলল রাফায়লা। রেডিয়োতে কখন যোগাযোগ করতে চান?

যত দ্রুত সম্ভব।

সেক্ষেত্রে ভাল সংবাদ নেই আমার কাছে, বলল রাফায়লা। আমার হিসাব অনুযায়ী, এই স্টেশনের উপর দিয়ে সোলার ফ্লেয়ারের একটা গর্ত পেরুবে পঁয়ষট্টি মিনিট পর।

পঁয়ষট্টি মিনিট, বিড়বিড় করল রানা, পরক্ষণে জানতে চাইল, ওটা কতক্ষণ চলবে?

কাঁধ ঝাঁকাল রাফায়লা। বড়জোর দশ বা পনেরো মিনিট। এরই ভিতর সিগনাল পাঠিয়ে দেয়া কঠিন হবে না।

আরও অনেক আগেই রেডিয়ো ব্যবহার করতে পারলে ভাল হতো, খুব জরুরি হয়ে উঠেছে ম্যাকমার্ডোর সঙ্গে যোগাযোগ করা। তাদেরকে জানাতে হবে, অ্যান্টার্কটিকার কাছে হাজির হয়েছে ফ্রেঞ্চ রণতরী, এক ব্যাটারি মিসাইল তাক করেছে উইলকক্স আইস স্টেশনের উপর।

রানা জানতে চাইল, এরপর স্টেশনের আকাশে আবারও কোনও গর্ত আসবে না?

মৃদু হাসল রাফায়লা। জানতাম আপনি জানতে চাইবেন। তাই আগেই জেনে নিয়েছি। প্রথমটা পেরিয়ে গেলে আরও দুটো আসবে। কিন্তু সেজন্য অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে। …এখন দুপুর দুটো ছেচল্লিশ মিনিট। তার মানে, প্রথম সুযোগ আসবে পঁয়ষট্টি মিনিট পর। এরপর আরও অনেক পরে আসবে অন্য দুই সুযোগ। দ্বিতীয়টা আজ সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার সময়। তারপর আবারও একটা সুযোগ মিলবে রাত দশটায়।

চাপা শ্বাস ফেলল রানা। প্রথমবারে ম্যাকমার্ডোর সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পারলে এই স্টেশন থাকবে না।

গুড ওঅর্ক, রাফায়লা, বলল। অনেক ধন্যবাদ। আরেকটা কাজ করে দিলে খুশি হব–আমার লোক যখন অ্যান্টেনা ঠিক করবে, তখন রেডিয়ো রুমে থাকলে ভাল হয়। কোনও মেসেজ আসতে পারে।

মৃদু মাথা দোলাল মেয়েটি। কোনও অসুবিধে নেই।

থ্যাঙ্কস, বলল রানা। টের পেল, গত কয়েক ঘণ্টার লড়াইখুন-গোলাগুলি দেখে হাঁপিয়ে গেছে মেয়েটি। মন সরিয়ে নেয়ার জন্য কোনও কাজ খুঁজছিল।

রাফায়লার দিকে চেয়ে মৃদু হাসল রানা, রাং-ল্যাডারের দিকে পা বাড়াল। তিন মিনিট পর নেমে এল ই-ডেকে। গুদাম-ঘরের দিকে চলেছে। টানেলের মাঝে পৌঁছে নির্দিষ্ট দূরজার সামনে থামল, এক সেকেণ্ড পর নিঃশব্দে খুলল কবাট।

মেঝেতে বসে আছে নিশাত সুলতানা, পিঠ ঠেকিয়ে রেখেছে ররফ-দেয়ালে। চোখ দুটো বোজা। অবশ্য রানার পায়ের অস্পষ্ট আওয়াজ পেয়েছে। চোখ মেলল না। জানতে চাইল: কে?

আস্তে করে নিশাতের সামনে বসল রানা। এখন কেমন লাগছে, আপা?

চোখ মেলল না নিশাত। মেথাডনের কাজ শেষ।

ছিড়ে যাওয়া হাঁটুর দিকে চাইল রানা। এবড়োখেবড়ো হাড় বেরিয়ে ছিল, পরে ভালভাবে ব্যাণ্ডেজ করে দিয়েছে হোসেন আরাফাত দবির। অবশ্য, এখন রক্তে চুপচুপে ভেজা ব্যাণ্ডেজ।

মনে হয় না আর কখনও ম্যারাডোনার মত ফুটবল খেলতে পারব, বলল নিশাত।

ওঁর মুখের দিকে চেয়ে আছে রানা। বুঝতে পারছে, কতটা কষ্ট সহ্য করছে বেচারি। 

চোখ মেলল নিশাত। ওই হারামজাদা মাছ আমার পা নিয়ে গেছে, রাগ নিয়ে বলল।

পরে দেখেছি।

ঠেকানোর কোনও উপায় ছিল না, নাক দিয়ে ঘোৎ আওয়াজ করল নিশাত। চুপ করে চেয়ে আছে রানা। হাসবার চেষ্টা করল। নিশাত। ভাই, আপনি কি জানেন আপনি কত সুন্দর?

মেথাডন ঠিকই কাজ করছে, মন্তব্য করল রানা।

ভাল মানুষ চিনতে আমার ভুল হয় না, দেয়ালে আরও ঠেস দিয়ে বসল নিশাত। ওই চোখদুটো দেখেই প্রেমে পড়ে মেয়েরা। আর সব গুণ তো আছেই।

চুপ করে আছে রানা।

ঠিক আছে, ফালতু কথা বাদই দিই, বলল নিশাত। কী কাজে এসেছেন? শুধু আমাকে দেখে যাওয়ার জন্য?

না।

তা হলে কী?

কেভিন হাক্সলে মারা গেছে।

কী? চমকে গেল নিশাত। ওরা তো বলেছিল ছেলেটা বাঁচবে।

ওকে খুন করা হয়েছে।

ফ্রেঞ্চরা?

না, পরে। অনেক পরে। ততক্ষণে ফ্রেঞ্চরা মারা পড়েছে।

কোনও বিজ্ঞানী?

এখনও জানি না, বলল রানা। এ থেকে কার উদ্দেশ্য পূরণ হবে তা-ও জানি না।

নীরবতা নামল দুজনের মাঝে।

একটু পর বলল নিশাত, যে বিজ্ঞানীকে আটকে রাখা হয়েছে? ওই যে বাঙালি বিজ্ঞানী? কী যেন নাম? …হ্যাঁ, রাশেদ হাবিব।

চমকে গেছে রানা। নানা কাজে ভুলেই গিয়েছিল। বাঙালি এক বিজ্ঞানী খুন করেছে এক আমেরিকান বিজ্ঞানীকে। ওরা স্টেশনে আসবার একটু পর নিনা ভিসার তার কথা বলেছিল। রাশেদ হাবিবকে বি-ডেকে তার ঘরে আটকে রাখা হয়েছে। কিন্তু সত্যি লোকটা ঘরে আছে কি না, পরে আর পরখ করে দেখেনি রানা। সে যদি ছাড়া পেয়ে থাকে, তা হলে হয়তো সে-ই…

দিনে দিনে গাধা হচ্ছি, বলল রানা। হেলমেট মাইকে বলল, আরাফাত, ভাইপার, নাজমুল, আপনারা বাইরে?

হ্যাঁ, বাইরে, জবাব দিল সার্জেন্ট ভাইপার।

আপনাদের একজনকে বি-ডেকে যেতে হবে, দেখবেন ওই বন্দি বিজ্ঞানী এখনও তার ঘরে আছে কি না।

ঠিক আছে, যাচ্ছি, বলল ভাইপার।

হাসতে চাইল নিশাত। স্যর, আপনার উপর খুব কাজের চাপ পড়ছে।

আপন মনে কী যেন ভাবতে শুরু করেছে রানা।

কী ভাবছেন, স্যর? জানতে চাইল নিশাত।

মুখ নিচু করে নিয়েছে রানা, আস্তে করে মাথা নাড়ল।

আমার আগেই বোঝা উচিত ছিল ওরা সৈনিক, আপা।

কী যে বলেন, স্যর।

হ্যাঁ, আগেই ওদেরকে বন্দি করা উচিত ছিল।

কিছুই না জেনে বন্দি করা কি ঠিক হতো, স্যর?

আমাদের কয়েকজনকে হারিয়েছি।

কিন্তু জিতেছি আমরাই।

আমাদের কপাল ভাল যে মরিনি, বলল রানা, ওরা ক্যাটওয়াকে আমাদের পাঁচজনকে পেয়ে গেল, সবাই মরত, কিন্তু তখন ক্যাটওয়াক ধসে পড়ল পুলের ভিতর। তারপর ভাবুন ড্রিলিং রুমে কী ঘটল। ওদের পরিকল্পনা ছিল নিখুঁত। নাজমুল যদি না বুঝত, আমাদেরকে সহজেই মেরে ফেলা হতো। ওরা সবসময়েই এগিয়ে ছিল আমাদের চেয়ে; পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়েছে, অথচ পরিকল্পনা বলতে আমার কিছুই ছিল না।

শুনুন, স্যর, একটু জোর দিয়ে বলল নিশাত, একটা কথা শুনতে চান?

কী, আপা?

স্যর, আপনি কি জানেন, ছয় মাস আগে আর্মি থেকে আমাকে স্যাণ্ডহার্সটে কমান্ডো ট্রেইনিং নিতে পাঠাতে চেয়েছিল?

না, জানি না।

সেই চিঠি এখনও আমার কাছে আছে, বলল নিশাত। আর্মি চিফের সই ছিল ওটাতে। আমি সেই চিঠি পড়ে কী করেছি আপনি জানেন, স্যর?

কী করেছেন?

চিফকে ধন্যবাদ জানিয়ে চিঠি পাঠিয়েছি, তাতে লিখেছি: এত বড় সুযোগ দেয়ার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ। কিন্তু আমি বর্তমান পোস্টে সন্তুষ্ট। আমি মেজর মাসুদ রানার সঙ্গে দ্য মার্ভেল অভ গ্রিস জাহাজের মিশনে কাজ করতে চাই।

অবাক হয়ে গেছে রানা। নিশাত সুলতানা এ-কাজ করবে ভাবতে পারেনি।

রানার চোখে নিস্পলক চাইল নিশাত। কারণটা জানতে চান, স্যর? আপনি একজন সত্যিকারের নেতা। বুদ্ধিমান, সাহসী, তার চেয়ে বড় কথা, সত্যিকারের মানুষ। মানুষের মধ্যে এ গুণ খুব কমই পাওয়া যায়। …আর তাই আপনার সঙ্গে থাকতে চেয়েছি। কয়েকজন বড় অফিসারের সঙ্গেও কাজ করেছি, কিন্তু আপনার মত কাউকে পাইনি। সেই যে গরিলার দ্বীপে গিয়েছিলাম আপনার সঙ্গে, তার পর থেকে আপনার সঙ্গে কাজ করার সুযোগ খুঁজেছি। এরপর আপনার মার্ভেলে যোগ দেয়ার পর বুঝলাম সত্যি সত্যিই আপনি কেমন মানুষ। এরপর থেকে আপনার পাশে দাঁড়িয়ে জীবনের ঝুঁকি নিতে দ্বিধা করিনি। যেমন এখন, আপনি আমার কথা ভেবে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। …আসলে বেশিরভাগ সামরিক অফিসার চিন্তা করেন শুধু নিজেদের মহৎ কীর্তি ও পদোন্নতি নিয়ে। তাদের কিছুই যায় আসে না অধীনস্থ অফিসার বা সৈনিক মরল, না বাঁচল। এখানেই আপনি আলাদা, স্যর, আপনি সবার কথা ভাবেন, তাদের আপদে বিপদে হাজির থাকেন। আর সেটা আমাদের সবার মন ছুঁয়ে যায়।

অস্বস্তি বোধ করছে রানা। বিব্রত ভঙ্গিতে হাত তুলল, আপা, প্লিজ! লজ্জা দেবেন না। এসব কথা…।

বলছি, কারণ আর কখনও বলার সুযোগ না-ও পেতে পারি। …আপনি আসলে নিজের উপর রেগে আছেন, কারণটা হচ্ছে: আমরা মরতে বসেছিলাম। কিন্তু মনে রাখবেন, স্যর, আপনি দুর্দান্ত কৌশলী ও বুদ্ধিমান। তার চেয়ে বড় কথা, আপনি সত্যিকারের একজন মানুষ। কাজেই নিজের উপর বিশ্বাস রাখুন। যে ধরনের বিপদই আসুক না কেন, আপনি উতরে যাবেন। আমরা আপনার পাশে থাকব।

রানা চুপ করে চেয়ে রইল নিশাতের চোখে। কয়েক সেকেণ্ড পর বলল, আমার সাধ্যমত দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করব, আপা।

একটু বেসুরো স্বরে জানতে চাইল নিশাত, রাফায়লা। ম্যাকানটায়ার নতুন কিছু জানাতে পারল, স্যর?

তেমন কিছু না। উঠে দাঁড়াল রানা। ঠিক আছে, যাই গিয়ে দেখি, রাশেদ হাবিব তার ঘরে আছে কি না। দরজার কাছে চলে গিয়েও আবার ঘুরে চাইল। নরম স্বরে বলল, আপা, আপনি কখনও শুনেছেন যে আর্মি ইউনিটের ভেতর গুপ্তচর ঢুকিয়ে দেয় সরকার?

ঠিক কী বোঝাতে চাইছেন, স্যর?

এক মুহূর্ত দ্বিধা করল রানা, তারপর বলল, আমি যখন কেভিন হাক্সলের লাশ পেলাম, তখন একজনের একটা কথা মনে পড়ল। সে ছিল আমেরিকান মেরিন কর্পসের একজন মেজর, আমার খুব ভাল বন্ধু। মারা যাওয়ার আগে বলেছিল, ওর ইউনিটের ভিতর বিশ্বাসঘাতক ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে।

চুপ করে চেয়ে আছে নিশাত, আস্তে করে ঠোঁট চাটল। কী যেন ভাবছে। কয়েক মুহূর্ত পর বলল, শুনেছি অনেক দেশের আর্মিতেই এই কাজ করা হয়।

কী শুনেছেন, আপা?

এদের কাজ এলিমিনেট করা। সরকারের উঁচু পদের কেউ যদি কিছু গোপন রাখতে চায়, এদেরকে নির্দেশ দিলেই এরা খুন করে সহযোদ্ধাদের সবাইকে।

নিরাপত্তার স্বার্থে যেকোনও দেশের আর্মির ভিতর সরকারের নিজস্ব লোক থাকতেই পারে, বলল রানা। তারা ডিপ-কভার এজেন্ট, তাদের কাজই প্রতিরক্ষা ইউনিটের নাড়ির ভিতর ঢুকে যাওয়া। সবার উপর চোখ রাখা।

মাথা ঝাঁকাল নিশাত।

সেই যে একবার তিন মাসের জন্যে ইউ.এস. মেরিনদের রেমালপাগো রোহো, বা আর-সেভেন ট্রেইনিং এক্সারসাইজে গিয়েছিলাম আপনার সঙ্গে, ওখানেই প্রশিক্ষণের সময় কানাঘুষা শুনেছি মেরিন কর্পসেও আছে ডিপ কাভার এজেন্ট অফিসাররা বলেছে, তাদের ভিতর ডিপ-কভার এজেন্ট ঢুকিয়ে রেখেছে সিআইএ। কেউ কেউ বলেছে, তাদের উপর নজর রাখছে ন্যাশনাল রেকনিসেন্স অফিস ও জয়েন্ট চিফস্ অভ স্টাফদের সাবকমিটি। ওটার নাম নাকি ইন্টেলিজেন্স কনভার্জেন্স গ্রুপ। এদের কাজ আমেরিকান মিলিটারি ইউনিটগুলোর ভেতর ইনফিলট্রেট করা।

এক অফিসার আমাকে বলেছিল, আইসিজি আসলে কয়েকটি ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির আল্টা-সিক্রেট কমিটি। ঠিক জায়গায় নিজ লোক রাখে তারা। কোনও ইউনিট মিশনে গিয়ে যা পাওয়ার কথা নয় এমন কিছু পেলে যেমন ধরুন স্পেসশিপ বা এলিয়েন কিছু বা মূল্যবান ধাতুসেক্ষেত্রে আইসিজির লোকের কাজ হয় গ্রুপের সৈনিক আর অফিসারদেরকে সবাইকে মেরে ফেলা, যাতে খবরটা লিক-আউট না হয়, এরা কাউকে কিছু বলতে না পারে।

আস্তে করে শ্বাস ফেলল রানা। এই একই কথা ও নিজেও শুনেছে। সাধারণ ইউনিটের ভিতর ভরে দেয়া হয় ডাবল-এজেন্ট। রবিন কার্লটনের কথা আবারও মনে পড়ে গেছে ওর। মারা যাওয়ার আগে হেলমেট মাইকে বলেছিল সে আমার দলের ভিতর বিশ্বাসঘাতক ঢুকিয়ে দিয়েছে ওরা!

ওটা কোনও ফালতু কথা ছিল না। রানার সঙ্গে আসা বাঙালি সৈনিক বা অফিসারদের বিষয়ে এভাবে ভাবতে চাইছে না। ওদের কারও সঙ্গে আমেরিকার আইসিজির যোগাযোগ থাকবারও কথা নয়। কিন্তু বিজ্ঞানী বা মেরিনদের ভিতর আমেরিকান সরকারের লোক থাকতেই পারে।

ঠিক আছে, আপা, পরে আবার আপনাকে দেখে যাব, বলল রানা।

কাজ তো গুছিয়ে আনতেই হবে, বলল নিশাত। কিন্তু একটু অন্যদিকেও মন দেয়া দরকার। যেমন, কোনও মেয়ে হয়তো পাগলের মত ভালবাসে আপনাকে, সেদিকটাও…

ভুরু উঁচু করল রানা। তাই নাকি?

হ্যাঁ, স্যর। সত্যি ভালবেসে ফেলেছে।

মাথা নেড়ে হাসল রানা। আপনার মেথাডন ঠিকই কাজ করছে, আপা। চমৎকার গল্প বানাচ্ছেন।

বিশ্বাস করুন বা না করুন, এটা বাস্তব সত্য। ঠিক আছে, স্যর, পরে কথা হবে। দেয়ালে ভাল করে ঠেস দিয়ে বসল নিশাত।

গুদাম-ঘর থেকে বেরিয়ে গেল রানা। আবারও চোখ বুজল নিশাত, নরম স্বরে বলল, জানেন, স্যর, কার চোখ পড়েছে আপনার উপর? যদি বুঝতেন কীভাবে চেয়ে থাকে ওর দুই চোখ! পুল ডেকে বেরিয়ে এসেছে রানা, ওর মনে হচ্ছে পরিত্যক্ত হয়েছে গোটা স্টেশন। পুলের মাঝে নেমে গেছে ডাইভিং বেলের অনড় কেবল।

স্যর, তিশা বলছি, ইয়ারপিসে শুনতে পেল রানা। আপনি কি এখনও উপরে?

এখন পুল ডেকে। তুমি কোথায়?

পঞ্চান্ন মিনিট হলো ডাইভের। বরফের সুড়ঙ্গ বেয়ে উঠছি।

কোনও সমস্যা? এখনও না। …একমিনিট। আরে, এ কে?

কী দেখেছ, তিশা? সতর্ক হয়ে উঠেছে রানা।

না, কিছু নয়, স্যর, একটু লজ্জিত কণ্ঠ তিশার। কোনও সমস্যা নেই। আপনার সঙ্গে ছোট্ট মেয়েটা আছে যে, ওর বন্ধু এখানে নেমে এসেছে।

কার কথা বলছ? পরক্ষণে বুঝতে পারল রানা।

ওই যে আপনার বন্ধু সিল লিলি। এইমাত্র টানেলে ঢুকেছে। আমাদের পিছু নিয়ে।

মনের চোখে রানা দেখল, ডাইভারদের সঙ্গে বরফের সুড়ঙ্গ ধরে খুশি মনে চলেছে লিলি, অবাক হয়ে দেখছে, মেকানিকাল ব্রিদিং অ্যাপারেটাস পরা লোকগুলো কী কষ্টই না করছে। ওর তো কোনও সমস্যাই হচ্ছে না!

তোমাদেরকে আর কতটা উপরে উঠতে হবে? জানতে চাইল রানা।

বলা কঠিন। খুব সাবধানে উঠতে হচ্ছে। গতি কম। আন্দাজ পাঁচ মিনিট পর উপরে পৌঁছব।

আমার সঙ্গে যোগাযোগ রেখো, বলল রানা। আরেকটা কথা, খুব সতর্ক থাকবে।

জী, স্যর। আউট তিশা।

ক্লিক আওয়াজ তুলে কেটে গেল রেডিয়ো লিঙ্ক। পুলের দিকে চেয়ে রইল রানা। পানি এখনও লালচে। আপাতত একদম স্থির, কাচের মত। পুলের সামনে গিয়ে দাঁড়াবে বলে এক পা এগোলো রানা, পরক্ষণে থেমে গেল। পায়ের নীচে মুড়মুড় করে কী যেন ভেঙেছে।

মাথা নিচু করে বুটের দিকে চাইল রানা। পা সরিয়ে নিতেই দেখা গেল ধাতব ডেকে গুড়ো হয়ে গেছে কাঁচ। জিনিসটা সাদা, ফ্রস্টেড গ্লাস।

ভুরু কুঁচকে গেছে রানার। ঠিক তখন হঠাৎ করেই হেলমেট ইন্টারকমে একটা কণ্ঠ শুনল।

মেজর, আমি ভাইপার। বি-ডেকে। এইমাত্র রাশেদ হাবিবের রুম থেকে ফিরেছি। দরজায় চাপড় দিয়ে সাড়া পাইনি। তারপর দরজা ভেঙে ভিতরে ঢুকে দেখি কেউ নেই। রাশেদ হাবিব উধাও। আবারও বলছি, হাবিব তার ঘরে নেই।

রানার মেরুদণ্ড বেয়ে নেমে গেল শিরশিরে অনুভূতি।

লোকটা কোথায় যেতে পারে?

ঘুরে বেড়াচ্ছে স্টেশন জুড়ে!

সবাইকে একত্র করে খুঁজে বের করতে হবে লোকটাকে। ঘুরে দাঁড়াবে, তার আগে হালকা মৃদু শিসের আওয়াজ পেল। বাতাস চিরে কী যেন আসছে!

তারপর হঠাৎ ঠক করে আওয়াজ হলো। তীক্ষ্ণ ব্যথা পেল রানা, ভীষণ জ্বলছে ঘাড়ের পিছনে। এক সেকেণ্ডের দশ ভাগ সময়ে বুঝল, ঘাড়ে এসে লেগেছে তীব্র গতির কিছু!

ভাঁজ হয়ে যেতে চাইল দুই হাঁটু, নিজেকে বড় দুর্বল মনে হলো রানার। ডানহাতটা চলে গেল ঘাড়ের পিছনে, হাত ফিরিয়ে এনে চোখের সামনে ধরল।

ওর হাতে তাজা রক্ত!

খুব ধীরে চোখের সামনে নামছে কালো চাদর। জানে না, কখন হাঁটু গেড়ে বসে পড়েছে। বরফ-ঠাণ্ডা প্ল্যাটফর্মের উপর ঠাস করে পড়ল রানার কপাল। খুব দুশ্চিন্তা হলো–গুলি লেগেছে ঘাড়ে!

তারপর হঠাৎ করেই ঝাপসা হয়ে হারিয়ে গেল সব দুশ্চিন্তা, চারপাশে নেমে এল গাঢ় অন্ধকার।

থেমে গেল ওর হৃৎপিণ্ড! মারা গেছে কিংবদন্তির নায়ক, মেজর জেনারেল রাহাত খানের অতি আদরের প্রিয় শিষ্য, ব্রিগেডিয়ার সোহেল আহমেদের প্রাণের বন্ধু মাসুদ রানা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *