১.১৯ পুল ডেকে থম মেরে বসে আছে

পুল ডেকে থম মেরে বসে আছে কর্পোরাল নাজমুল, খুব চিন্তিত হয়ে পড়েছে। কিছুক্ষণ পর চাইল পুলের মাঝে। উপর থেকে নেমে এসেছে উইঞ্চের কেবল, চলে গেছে পানির অনেক গভীরে। কেবলের শেষে ডাইভিং বেল। ওদের দলের ডুবুরিদের সঙ্গে গেছে নিনা ভিসার। যত দ্রুত সম্ভব গতি তুলে নামছে কেবল।

একঘণ্টার বেশি হলো, পানির নীচে ডুবুরিরা। থামবে গিয়ে তিন হাজার ফুট গভীরে। অর্থাৎ, প্রায় এক কিলোমিটার। সেজন্য বেশ সময় লাগবে। বিশ মিনিট আগে সার্জেন্ট হোসেন আরাফাত দবির, গানারি সার্জেন্ট ভাইপার ও মেজর স্যর উপরে উঠেছেন। পোর্টেবল রেডিয়ো দিয়ে ম্যাকমার্ডো স্টেশনের সঙ্গে যোগাযোগ করবার চেষ্টা করবে সার্জেন্ট দবির ও ভাইপার। স্যর গেছেন। উপরের ডেকগুলো ঘুরে দেখতে। তার আগে ওদেরকে বলেছেন, জেনে নিতে হবে কখন আসবে আমেরিকান সেনাবাহিনী। যখনতখন অন্য দেশের সেনাবাহিনীর হামলা হতে পারে। বাইরে যেভাবে তুষার-ঝড় হচ্ছে, চাইলেও ওরা সবাইকে নিয়ে রওনা দিতে পারবে না।

ই-ডেকে চুপ করে বসে আছে নাজমুল। শব্দ বলতে শুধু সিডেকের উইঞ্চ মোটরের একঘেয়ে ঘং-ঘং আওয়াজ। ওই আওয়াজ ভাল লাগছে না ওর।

হঠাৎ একটা আওয়াজ পেয়ে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল নাজমুল। শব্দটা হঠাৎ করেই শুরু হয়ে আবারও থেমে গেছে। কারও গলার আওয়াজ। পুরুষ কণ্ঠ। বলে উঠেছে ফ্রেঞ্চ ভাষায়!

ডিএলএফ ট্রান্সমিটারের উপর চোখ পড়ল ওর। ওটা কয়েক ফুট দূরে।

হঠাৎ করেই শিসের মত তীক্ষ্ণ আওয়াজ তুলল যন্ত্রটা। তারপর আবারও শোনা গেল কণ্ঠ। ধীর গতিতে বলছে। একই কথা দুবার বলল।.বোধহয় রিপোর্ট করতে বলছে।

স্যর ফ্রেঞ্চ ভাষা জানেন? কখন ছুটতে শুরু করেছে, নাজমুল জানে না। ভুলেই গেছে হেলমেট মাইকে কথা বলতে পারবে। রাং-ল্যাডারে বেয়ে দ্রুত উঠছে, দেড় মিনিট পর পৌঁছে গেল বিডেকে। ভাঙা ক্যাটওয়াকে রানাকে দেখেই দৌড়ে গিয়ে থামল সামনে। স্যর! ফরাসিদের রেডিয়ো থেকে কী যেন বলছে!

নীচে থেকে জানালে তাড়াতাড়ি নামতে পারতাম, রাংল্যাডারের দিকে ছুটতে শুরু করেছে রানা। তুমি গিয়ে দবির আর ভাইপারের কাজে সাহায্য করো।

মই বেয়ে দ্রুত নামছে রানা, মিনিট পেরুবার আগেই পৌঁছে গেল ই-ডেকে। থমথম করছে চারপাশ। কোথাও কোনও আওয়াজ নেই। বোধহয় ট্রান্সমিট শেষ করে চুপ হয়ে গেছে রেডিয়ো। হতাশ লাগছে রানার। হেলমেট মাইক চালু করে ঝুঁকে দাড়িয়েছে রেডিয়োর সামনে। কোনও কথা এলে অন্যরাও শুনবে।

আর মাত্র একবার বল, মনে মনে বলল রানা।

ঠিক তখনই আবারও বলে উঠল বার্তা প্রেরক: হায়েনার পাল, তিনঘণ্টার ভিতর রিপোর্ট দিতে হবে। আবারও বলছি, তিনঘণ্টার ভিতর রিপোর্ট চাই। এর ভিতর যোগাযোগ না করলে ধরে নেয়া হবে সময় শেষ। সেক্ষেত্রে ইঞ্জিন চালু করব আমরা। আবারও বলছি, তিনঘণ্টার ভিতর যোগাযোগ না করলে ইঞ্জিন চালু করা হবে। আউট, কিলার ওয়েইল।

চুপ হয়ে গেছে ভিএলএফ ট্রান্সমিটার।

ইরেজার ডিভাইস, বিড়বিড় করে বলল রানা। চট করে ক্যাসিয়ো ডিজিটাল ঘড়িতে কাউন্ট-ডাউন চালু করল। হেলমেট মাইকে বলল, ফ্রেঞ্চদের কাছে ইরেজার ছিল। মন দিয়ে শোনো, ফ্রেঞ্চদের সঙ্গে ইরেজার ছিল। তিনঘণ্টার আগেই ওটা খুঁজে বের করতে হবে, নইলে উড়ে যাবে এই স্টেশন।

স্যর, স্টেশনের বাইরে থেকে বলল নাজমুল। ওটা কোথায় রেখেছে আমরা খুঁজে দেখেছি, পাইনি।

নাজুমলের কথায় মন নেই রানার, দ্রুত ভাবছে। ফ্রেঞ্চ বার্তায় বলা হয়েছে, তারা কিলার ওয়েইল। আর হায়েনা ফ্রেঞ্চ কমাণ্ডোরা, হামলা করেছে এই স্টেশনে। ওদিকের লোকটা নিজেকে কিলার ওয়েইল বলেছে কেন?

কারণ, তারা আছে পানিতে। উপকূলের কাছে। বোধহয় অ্যান্টার্কটিকার তীরের কাছে থেমেছে কোনও ফ্রেঞ্চ রণতরী!

সাধারণত দীর্ঘ ওয়েভলেন্থের জন্য ভিএলএফ ট্রান্সমিটার ব্যবহার করে জাহাজ বা সাবমেরিন। কমাণ্ডোরা ট্রান্সমিটার সঙ্গে এনেছে জাহাজের সঙ্গে যোগাযোগ করবে বলে!

ওই জাহাজ কোনও ফ্রিগেট বা ডেস্ট্রয়ার, হয়তো আছে তীর, থেকে এক শ মাইল দূরে। এখন উইলকক্স আইস স্টেশনের উপর তাক করেছে অস্ত্র। বোধহয় এক ব্যাটারি নিউক্লিয়ার টিপড় ক্রুজ মিসাইল!

আগে রানার সন্দেহ হয়নি যে কেন ফ্রেঞ্চ কমাণ্ডোরা সঙ্গে ইরেজার আনেনি, কিন্তু এখন বুঝতে পারছে, বাইরে রয়ে গেছে তাদের ইরেজার উপকূল থেকে অনেক দূরে জাহাজ ও অস্ত্র। এবং তিনঘণ্টা পর কোনও ডেস্ট্রয়ার থেকে স্টেশনের উপর ফেলবে মিসাইল, সব মিশিয়ে দেবে বরফে।

এখন মাত্র দুটো জিনিস ইরেজার ডিভাইস থামাতে পারে। প্রথমত: বারো মৃত ফ্রেঞ্চ কমাপ্তোদের কেউ রিপোর্ট করলে ছোড়া হবে না মিসাইল। কিন্তু, তা হওয়ার নয়। রানার সামনে এখন একমাত্র উপায়: ম্যাকমার্ডো স্টেশনে যোগাযোগ করা। জানতে হবে কখন উইলকক্স আইস স্টেশনে পৌঁছবে আমেরিকান সৈনিকরা। একইসঙ্গে ম্যাকমাৰ্ডোর মেরিনদেরকে জানাতে হবে, এদিকে এক ব্যাটারি মিসাইল তাক করেছে ফ্রেঞ্চ কোনও রণতরী। হাতে মাত্র তিনঘণ্টা, তার আগেই যেভাবে হোক ঠেকাতে হবে ফ্রেঞ্চদেরকে।

মাইকে বলে উঠল রানা, দবি, কথা শুনতে পাচ্ছেন?

জী, স্যর, জবাব দিল সার্জেন্ট আরাফাত।

আপনারা ম্যাকমার্ডোর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পেরেছেন?

জী-না, স্যর।

বারবার চেষ্টা করুন, বলল রানা। ওদেরকে লাইনে পেতে হবে। হাতে তিনঘণ্টার চেয়ে কম সময়, তারপর এই স্টেশন গুঁড়িয়ে দেয়া হবে।

আমরা চেষ্টা করছি, জানাল গানারি সার্জেন্ট ভাইপার।

ক্রুজ মিসাইলের কথা ভাবতে গিয়ে শীতল শিরশিরে অনুভূতি নামছে রানার মেরুদণ্ড বেয়ে। চেয়ে আছে ও উইঞ্চের কেবলের দিকে। একটু পর পায়চারি শুরু করল। আসলে হাতে বড়জোর দুই ঘণ্টা, তারপর তুষার-ঝড়ের ভিতর স্টেশন থেকে অনেক দূরে সরে যেতে হবে। কিন্তু সাগরের অনেক নীচে রয়ে গেছে তিশা, মোরশেদ, ওয়াকার ও নিনা ভিসার। ওদেরকে আবার তুলে আনতে অনেক সময় বেরিয়ে যাবে।

স্যর, হঠাৎ শুনতে পেল তিশার কণ্ঠ, আমি তিশা। রিপিট করছি। আমি লেফটেন্যান্ট তিশা। শুনতে পাচ্ছেন, স্যর?

হেলমেট মাইক চালু করল রানা। হ্যাঁ, শুনছি, তিশা। নীচে তোমাদের কী অবস্থা?

প্রায় তিন হাজার ফুট গভীরতায় পৌঁছে গেছি। এবার কেবল বন্ধ করব। চুপ হয়ে গেছে মেয়েটি। সামান্য বিরতি নিয়ে বলল, ঠিক আছে, কেবল নেমে যাওয়া থেমে গেছে।

ওর কথা শেষ হতেই হঠাৎ ঝটকা খেল ই-ডেকের উপরের কেবল। অনেক নীচে আচমকা থেমে গেছে ডাইভিং বেল।

স্যর, আমাদের সময় অনুযায়ী দুটো দশ মিনিট, বলল তিশা। কনফার্ম করুন।

তিশা, কনফার্ম করছি, সময় দুপুর দুটো দশ মিনিট, বলল রানা। ডিপ-ডাইভিং করবার সময় কখন রওনা হয়েছে, তা ভালভাবেই মনে রাখা হয়। গত কয়েক দিন আগে তিশার মত করেই উইলকক্স আইস স্টেশনের বিজ্ঞানীরা এই নিয়ম মেনে ডাইভ দিয়েছে। এবং এরপর একজনও ফিরে আসেনি।

আবার বলছি, সময় দুপুর দুটো দশ মিনিট। নিজেদের বাতাস ব্যবহার করছি। এবার বেরুব ডাইভিং বেল থেকে।

হাঁটবার ফাঁকে একবার প্যান্টের পকেটে চাপড় দিল রানা, ওর মনে পড়ল নিনা ভিসার দিয়ে গেছে একটা লকেট ও চেইন। জিনিসটা বোধহয় হোয়াইট গোল্ডের। একবার ভাবল বের করে দেখবে, পরক্ষণে বাতিল করে দিল চিন্তাটা।

প্রতি মিনিটে একবার হলেও যোগাযোগ করছে তিশা।

কোনও দুর্ঘটনা ছাড়াই ডাইভিং বেল থেকে বেরিয়ে গেছে ওরা চারজন তিশা, ওয়াকার, মোরশেদ ও নিনা ভিসার। কয়েক মিনিট পর তিশা জানাল, ওরা পাতাল-সুড়ঙ্গের মুখ খুঁজে পেয়েছে। এখন ওটার ভিতর দিয়ে উপরের দিকে উঠছে।

ধীরে ধীরে পায়চারি করছে রানা, ডুবে গেছে গভীর চিন্তার ভিতর।

অনেক নীচের ওই গুহায় কী আছে? ওটার জন্য প্রাণ বাজি ধরেছিল ফ্রেঞ্চ কমাণ্ডোরা, সঙ্গে ইরেজার আনেনি। ভেবেছিল জিনিসটা নিয়ে চট করে সরে পড়বে। তাদের ইরেজার আছে সাগরে, ওখান থেকে মিসাইল এসে পড়বে এই স্টেশনের উপর। হাতে বড়জোর দুই ঘণ্টা। এদিকে ওর দলে আছে ঠাণ্ডা-মাথার খুনি। সে যে কখন কী করে বসবে, কেউ জানে না।

হেলমেট ইন্টারকম জ্যান্ত হয়ে উঠল: স্যর, দবির।

যোগাযোগ করতে পেরেছেন?

না, স্যর।

রানাদের সঙ্গে আনা পোর্টেবল রেডিয়ো দিয়ে বহুক্ষণ হলো ম্যাকমার্ডো স্টেশনে বার্তা পাঠাতে চাইছে হোসেন আরাফাত দবির, ভাইপার ও নাজমুল। স্টেশনের মেইন এন্ট্রান্স দিয়ে বেরিয়ে ফাঁকা জায়গায় থেমেছে ওরা। মনে আশা ছিল, এতে সিগনাল পাবে।

ইন্টারফেয়ারেন্স কেমন? জানতে চাইল রানা।

অনেক বেশি, স্যর, বিষন্ন স্বরে বলল দবির।

একমুহূর্ত কী যেন ভাবল রানা, তারপর বলল, দবির, আপনারা সিগনাল পাঠাবার চেষ্টা বাদ দিন। ভিতরে চলে আসুন। আপনি বি-ডেকে বিজ্ঞানীদের সঙ্গে কথা বলবেন। তারা আছেন কমন-রুমে। হয়তো তাদের কেউ স্টেশনের রেডিয়ো ব্যবহার করে ম্যাকমাৰ্ডোয় খবর পাঠাতে পারবেন।

জী, স্যর।

নীরব হয়ে গেল ইন্টারকম। পুলের পানির দিকে চেয়ে রইল রানা। একটু পর আবারও ওকে পেয়ে বসল দুশ্চিন্তা।

চোখের সামনে ভাসছে কেভিন হাক্সলের ক্ষত-বিক্ষত মৃতদেহ। ওকে খুন করল কে? আপাতত বিশ্বাস করতে পারবে শুধুমাত্র জনি ওয়াকার ও নিনা ভিসারকে। তারা ওর সঙ্গেই ছিল। অন্যরা যে-কেউ খুন করে থাকতে পারে।

সে-কারণে হোসেন আরাফাত দবির, ভাইপার ও নাজমুলকে কাছাকাছি রাখতে চাইছে। ওদের কেউ খুনি হয়ে থাকলে অন্য দুজনের সামনে খুন করতে পারবে না।

হঠাৎ আরেকটা চিন্তা এল, মাইকে বলল রানা, সার্জেন্ট দবির, আপনি এখনও বাইরে?

জী, স্যর।

আপনি যখন বি-ডেকে নামবেন, বিজ্ঞানীদের কাছে জিজ্ঞেস করবেন, তাঁদের কেউ আবহাওয়ার ব্যাপারে কিছু জানে কি না, বলল রানা।

.

উইলকক্স আইস স্টেশনে এ-ডেকের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে রেডিয়ো রুম। ডাইনিংরুমের ঠিক উল্টো পাশে। মাঝে বিশাল শাফট। রেডিয়ো রুমের ভিতর স্যাটালাইট টেলিকমিউনিকেশন গিয়ার ও শর্ট রেডিয়ো ট্রান্সমিটার। ঘরের দুপাশে চারটে রেডিয়ে কপোল, প্রতিটির সঙ্গে মাইক্রোফোন, একটা করে কমপিউটার স্ক্রিন, কিবোর্ড এবং কয়েকটি ফ্রিকোয়েন্সি ডায়াল।

একটা রেডিয়ো কন্সেলের সামনে বসেছে রাফায়লা ম্যাকানটায়ার, রানা ঘরে ঢুকতেই ঘাড় কাত করে চাই সে।

মেয়েটির বয়স পঁচিশ, আন্দাজ করল রানা। খুব দুশ্চিন্তা করছে। গোল মুখকে ঘিরে বাদামি চুলগুলো। বড় দুই বাদামি চোখে ভয়। কালির মত মাসকারা লেপ্টে আছে গালে! মেয়েটির পাশে দাঁড়িয়েছে হোসেন আরাফাত দবির, নাজমুল ও ভাইপার। ঘরে রাফায়লা একমাত্র বিজ্ঞানী।

হোসেন আরাফাত দবিরের দিকে চাইল রানা। আবহাওয়ার ব্যাপারে কিছুই জানে না আর কেউ?

তা নয়, স্যর, বলল দবির। আমাদের কপাল ভাল। ইনি মিস রাফায়লা ম্যাকানটায়ার, স্টেশনের রেডিয়ো বিশেষজ্ঞ ও রেসিডেন্ট মিটিয়োরোলজিস্ট।

আমি আসলে রেডিয়ো এক্সপার্ট নই, বলল মেয়েটি। বব হিউবার্ট ছিল… কিন্তু পাতাল-গুহার ভিতর হারিয়ে গেছে সে। তাকে কাজে সাহায্য করতাম। এখন আমাকেই এসব দেখতে… কথা শেষ না করে থেমে গেল সে।

ভরসা দেয়ার ভঙ্গিতে হাসল রানা। আপনাকে দিয়েই চলবে, মিস ম্যাকানটায়ার।

আমাকে রাফায়লা বলে ডাকতে পারেন।

ঠিক আছে রাফায়লা, এবার অন্য একটা আলাপ সেরে নেয়া যাক। এখন আমাদের সামনে দুটো সমস্যা। আপনি হয়তো দুটোর ব্যাপারেই সাহায্য করতে পারবেন। প্রথম: আমাদেরকে খুব দ্রুত ম্যাকমার্ডোর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। তাদেরকে খুলে বলতে হবে এখানে কী ঘটছে। তারা এখনও সেনাবাহিনী না পাঠিয়ে থাকলে, এখনই যেন পাঠায়। একটু আগে পর্যন্ত আমরা আমাদের পোর্টেবল রেডিয়ো দিয়ে ম্যাকমাৰ্ডোয় . যোগাযোগ করতে চেয়েছি, কিন্তু সম্ভব হয়নি। এখন প্রথম প্রশ্ন: আপনাদের রেডিয়ো কাজ করবে?

দুর্বল হাসি দিল রাফায়লা। আগে তো কাজ করত। মানে, এসব শুরু হওয়ার আগে। কিন্তু তারপর শুরু হলো সোলার ফ্লেয়ার। আমাদের সবার ট্রান্সমিশন নষ্ট হলো। শেষদিকে আমাদের অ্যান্টেনা ভেঙে পড়ল ঝড়ে। ওটা এখনও ঠিক করতে পারিনি আমরা।

ঠিক আছে, আমরা ওটা ঠিক করব, বলল রানা।

মহিলার অন্য একটা কথা শুনে চিন্তিত হয়ে পড়েছে। আগেও অ্যান্টার্কটিকায় এসে সোলার ফ্লেয়ারের খপ্পরে পড়েছে, কিন্তু এটা নিয়ে বেশি ভাবতে যায়নি। জিনিসটা আসলে বিকল করে দেয় ইলেকট্রোম্যাগনেটিক স্পেকট্রাম। সব রেডিয়ো কমিউনিকেশন বাধাগ্রস্ত হয়।

সোলার ফ্লেয়ার সম্পর্কে খুব বেশি জানি না, বলল রানা। একটু খুলে বলবেন?

বেশি কিছু বলার তো নেই, বলল রাফায়লা। আমরা বিজ্ঞানীরাও ওটা সম্বন্ধে খুব বেশি জানি না। সংক্ষেপে সোলার ফ্লেয়ার হচ্ছে: সূর্যের গায়ে প্রচণ্ড তাপের বিস্ফোরণ। বেশিরভাগ লোক বলে সানস্পট। ওই সানস্পট যখন দেখা দেবে, আমাদের গ্রহে এসে পড়বে বিপুল পরিমাণ আলট্রাভায়োলেট রেডিয়েশন। এতই বেশি, চিন্তা করা যায় না। এমনিতে সূর্য থেকে যে তাপ আসে, ঠিক সেভাবেই পৃথিবীর বুকে নামে এই রেডিয়েশন। বিষাক্ত করে ফেলে আয়োনোস্ফেয়ার। তৈরি হয় একটা পুরু চাদর, ওটা ভেদ করে বেরুতে পারে না ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ওয়েভ। বিকল হয় রেডিয়ো সিগনাল। উপর থেকে সিগনাল পাঠাতে পারে স্যাটালাইটও।

হঠাৎ রাফায়লার চোখ পড়েছে একটি কমপিউটারের স্ক্রিনের উপর। ক্লান্ত স্বরে বলল, আসলে, আমাদের কাছে ওয়েদারমনিটরিং গিয়ার আছে। একমিনিট সময় দিলে দেখাতে পারব সোলার ফ্লেয়ার কেমন দেখতে।

বেশ, বলল রানা।

পাশের কমপিউটার চালু করল রাফায়লা। ফ্যানের গুঞ্জন শুরু হয়েছে। কিছুক্ষণ পর স্ক্রিনে প্রোগ্রামগুলোর আইকন, দেখা গেল। একটা প্রোগ্রামের উপর ক্লিক করল রাফায়লা। কয়েক সেকেণ্ড পর ঝড়াৎ করে স্ক্রিনে দেখা দিল দক্ষিণ-পুব অ্যান্টার্কটিকার স্যাটালাইট ম্যাপ। তার ভিতর বেশ কয়েকটি রঙের খেলা। রানা খেয়াল করল, ওটা ব্যারোমেট্রিক ওয়েদার ম্যাপ। সারা দিন ধরে এই জিনিস দেখায় বিবিসি বা সিএনএন।

এটা অ্যান্টার্কটিকার পুর্বের ওয়েদার সিস্টেম, স্ক্রিনের কোণে তারিখ দেখে নিল রাফায়লা। দুদিন আগের। রানার দিকে ঘুরে চাইল। সোলার ফ্লেয়ার শুরু হওয়ার আগে এটা পাই। এরপর ঢাকা পড়ে ওয়েদার স্যাটালাইট।

মাউসে ক্লিক করল রাফায়লা। আরেকটা স্ক্রিন ভেসে উঠল। ওহ্, একমিনিট। পরে আরেকটা পাওয়া গেছে। এটাই এখন নতুন।

পর্দার অর্ধেক জুড়ে ম্যাপ, তার ভিতর হলদে-সাদা বিশাল বিস্ফোরণ। বামের বেশিরভাগ স্ক্রিন জুড়ে অ্যাটমোস্ফিয়ার ডিসটার্বেন্স, প্রায় ঢাকা পড়েছে অ্যান্টার্কটিকার উপকূল।

প্রকাণ্ড সোলার ফ্লেয়ার, ভাবল রানা।

এটা আমাদের সোলার ফ্লেয়ার, মেজর, আবারও রানার দিকে চাইল রাফায়লা। এই ছবি তোলার পর আরও পুবে সরে এসেছে, ঢেকে দিয়েছে আমাদেরকে।

বিস্ফোরণের ভিতর কয়েকটা রঙের খেলা। কোথাও কোথাও লাল ও কমলা রং, কয়েক জায়গায় কালো দেখা গেল।

সাধারণত সূর্যে বিস্ফোরণ হলে পৃথিবীর নির্দিষ্ট জায়গায় ফ্লেয়ার হয়, বলল রাফায়লা। হয়তো একটা স্টেশনে চলছে রেডিয়ো ব্ল্যাকআউট, কিন্তু মাত্র দুই শ মাইল দূরের স্টেশনে কোনও সমস্যা নেই।

স্ক্রিনের দিকে চেয়ে আছে রানা। এবারেরটা কতদিন ধরে চলবে বলে মনে করছেন?

শ্রাগ করল মেয়েটি। হয়তো একদিন, বা দুই দিন। কতক্ষণ ধরে সূর্য থেকে রেডিয়েশন আসবে, তার উপর নির্ভর করে। বড় সানস্পট কয়েক দিন ধরেও চলে।

আবারও কমপিউটারের স্ক্রিনে চাইল রাফায়লা। ডুবে গেছে চিন্তার ভিতর। নীচের ঠোঁট কামড়ে আঁচ করতে চাইছে কী যেন। তারপর দ্বিধান্বিত স্বরে বলল, আসলে জানি না। এবারেরটা অনেক বড়। মনে হয়, আরও পাঁচ দিন ধরে চলবে।

মেয়েটি চুপ হয়ে যাওয়ায় নীরবতা নেমেছে ঘরে। সবাই টের পেল, রেডিয়ো সুবিধা পাবে না।

রানার পিছন থেকে বলে উঠল নাজমুল, পা…আঁচ দিন?

পিছনে আছে বলে দেখতে পেল না, ভুরু কুঁচকে গেছে তার স্যরের। রাফায়লা, আপনি বলেছেন আয়োনোস্ফেয়ারে নানা বিঘ্ন তৈরি করে ফ্লেয়ার, ঠিক?

হ্যাঁ।

আর আয়োনোস্ফেয়ার হচ্ছে…।

বড় একটা স্তর, মেজর, এটা পৃথিবীর পরিবেশে পঞ্চাশ থেকে শুরু করে উপরের আড়াই শ মাইল জুড়ে ছড়িয়ে থাকে, বলল রাফায়লা। আয়োনোস্কেয়ার বলা হয় কারণ, বাতাসে মিশে থাকে আয়োনাইযড মলিকিউল।

বুঝলাম, বলল রানা। তার মানে, সূর্যে বিস্ফোরণের ফলে পৃথিবীতে এসে পড়ছে বিপুল শক্তি, তখন আয়োনোস্কেয়ারে নানা সমস্যা দেখা দিচ্ছে। আমাদের অনেক উপরে একটা বর্ম তৈরি হচ্ছে, আর তাই রেডিয়ো সিগনাল পাঠাতে পারছি না। ঠিক বলেছি?

হ্যাঁ।

আবার স্ক্রিনের দিকে চাইল রানা। হলদে-সাদা বিস্ফোরণের ভিতর কালো দাগগুলোকে দেখছে। সাদা-হলুদের মাঝে ওরকম বেশ বড় একটা কালো দাগ, তার উপর চোখ ওর। এটা কি ইউনিফর্ম? জানতে চাইল।

ইউনিফর্ম? চোখ পিটপিট করে চাইল রাফায়লা। বুঝতে পারেনি।

ওই রেডিয়েশনের বর্ম কি সব জায়গায় সমান শক্তিশালী? আসলে জানতে চাইছি, এর কোনও দুর্বল জায়গা আছে? এমন কোনও জায়গা, যেখানে বর্ম ভেদ করা যায়? যেমন ধরুন, ওই কালো দাগগুলো, ওদিক দিয়ে রেডিয়ো সিগনাল পাঠাতে পারব?

এটা সম্ভব, বলল রাফায়লা ম্যাকানটায়ার। খুব জটিল কাজ, কিন্তু অসম্ভব নয়। কিন্তু ঠিক স্টেশনের উপরে থাকতে হবে ফ্লেয়ারের ফাটল।

বেশ, বলল রানা, এবার বলুন, আপনি হিসাব কষে বের করতে পারবেন কখন এই স্টেশনের উপর কালো দাগ আসবে? যেমন ধরুন, ওদিকের ওই বড় কালো গর্তটা।

হলদে-সাদা বিস্ফোরণের মাঝে কালো গর্ত দেখিয়ে দিল ও।

মনিটরের দিকে চেয়ে ভাবতে শুরু করেছে রাফায়লা। দুমিনিট পর বলল, একটা উপায় আছে। যদি ফ্লেয়ারের আগের কয়েকটা ইমেজ বের করি, হিসাব কষে বের করতে পারব ফ্লেয়ার কী গতিতে এই মহাদেশের উপর দিয়ে যাচ্ছে। ওটার গতি ও লক্ষ্য যদি বের করে নিই, মোটামুটি একটা কোর্স বুঝতে পারব।

তা হলে কাজটা করুন, বলল রানা। কিছু পেলে আমাকে জানাবেন। আমাদের জানতে হবে স্টেশনের উপর কখন আসবে কালো গর্ত। খুব জরুরি ম্যাকমার্ডো স্টেশনে মেসেজ পাঠানো।

তার আগে অ্যান্টেনা ঠিক করতে হবে, নইলে…।

ওই কাজে হাত দিচ্ছি, বলল রানা, আপনি ফ্লেয়ারের মাঝে গর্ত খুঁজে বের করুন। আমরা অ্যান্টেনা ঠিক করছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *