১.১৮ অভযারভেটরির পার্কিং লটে

সেটি অভযারভেটরির পার্কিং লটে ভাড়া করা গাড়িতে বসে আছে অ্যাডোনিস ক্যাসেডিন, দম আটকে আসতে চাইছে গরমে। দরদর করে ঘামছে সে। পকেট থেকে সেলুলার ফোন বের করে কল দিল, স্ত্রী সান্থাকে। সে আছে ওয়াশিংটন ডি.সি.তে।

কী বুঝলে? ওদিক থেকে জানতে চাইল সান্থা।

মহাবিরক্তিকর, সেটি রেকর্ডিং থেকে নোট নিয়েছে, এখন দেখছে।

কিছুই পেলে না?

নাহ্, কিছু না। কোনও স্পাই স্যাটালাইট থেকে কয়েকটা বিচ্ছিন্ন শব্দ, আর কিছুই না।

যা বলেছে সেটা লিখে নিয়েছ?

নোট বুকের উপর চোখ বোলাল ক্যাসেনি।

হ্যাঁ, তা করেছি। কিন্তু এ থেকে কিছুই পাব না।

তা-ও বলো দেখি, বলল সাহা।

ঠিক আছে, দীর্ঘশ্বাস ফেলল ক্যাসেডিন। এবার গড়গড় করে বলে গেল সে।

..কপি, ওয়ান-টু-ফাইভ-সিক্স-ওয়ান-সিক্স…

..আয়োনোস্ফেরিক সমস্যায় যোগাযোগ হারিয়ে…

…সামনের দল…

…মাসুদ রানা….

…মাইনাস সিক্সটি-সিক্স পয়েন্ট ফাইভ…।

..সোঁলার ফ্লেয়ার বারোটা বাজাচ্ছে রেডিয়োর…

…ওয়ান-ফিফটিন, টোয়েন্টি মিনিটস, টুয়েলভ, সেকেণ্ড ইস্ট…

..কী করে… কড়কড় করছে। …চলে যাও, যাতে…

.রওনা হয়েছে দ্বিতীয় টিম…।

ওদিক থেকে শ্বাস ফেলল সান্থা। ব্যস? আর কিছুই নেই?

ফাঁপা হাসল ক্যাসেডিন। আবার কী চাও? এবার তো বুঝলে কী বলেছে?

এসবের নিশ্চয়ই কোনও মানে আছে।

আমারও মনে হয়েছিল, নইলে এই নরকে আসি?

ওই কাজ আমার উপর ছেড়ে দাও, তোমাকে ওখানে পৌঁছে দেব। হাসতে শুরু করেছে সাহা। কয়েক মুহূর্ত পর বলল, এবার কোথায় যাবে?

ড্যাশবোর্ড থেকে ছোট সাদা একটা কার্ড নিল ক্যাসেডিন। ওটা ভিজিটিং কার্ড। ঝকঝকে ছাপা:

রবিন এন কার্বি
        গানস্মিথ
        ১৬ নিউম্যান স্ট্রিট, লেক আর্থার, এনএম

ভাবছি এই টাম্বলউইড ভরা নরকে যখন চলেই এলাম, তো, একবার ওই রহস্যময় রবিন এন কার্বির সঙ্গে দেখা করেই যাই, বলল ক্যাসেডিন।

যে লোক মেইল-বক্সে ভিজিটিং কার্ড রেখে গেছে? জানতে চাইল সান্থা।

হ্যাঁ, সে-ই।

দুই সপ্তাহ আগে ওই কার্ড পাওয়া যায় ক্যাসেডিনের মেইল বক্সে। সঙ্গে কোনও চিঠিও ছিল না। কিছুই লেখা হয়নি কার্ডে। ক্যাসেডিন প্রথমে ভেবেছিল ফেলে দেবে কার্ড, পরে কী মনে করে রেখে দিয়েছে।

পরদিন এল টেলিফোন। ভারী পুরুষালী কণ্ঠ। জানতে চাইল কাসেডিন কার্ড পেয়েছে কি না।

ক্যাসেডিন জানাল, সে কার্ড পেয়েছে।

এবার লোকটা বলল, তার কাছে জরুরি কিছু তথ্য আছে, আগ্রহী হয়ে উঠতে পারে ক্যাসেডিন।

ক্যাসেডিন জানতে চাইল, সে কি ওয়াশিংটনে এসে. ওর সঙ্গে কথা বলতে পারবে?

লোকটা জানিয়ে দিল, তার পক্ষে কোথাও যাওয়া সম্ভব নয়। যদি আসতে হয় তো আসতে হবে ক্যাসেডিনকেই। লোকটাকে ভীত বলে মনে হয়েছে ক্যাসেডিনের। ও নাকি আগে নেভিতে ছিল।

আমাদের কোনও ফ্যান না তো? জানতে চাইল সান্থা।

গ্র্যাণ্ডমাদার মিশেল জার্নালে কাজ করবার সময় বেশ কিছু ভক্ত জুটে গিয়েছিল ক্যাসেডিনের। মাঝে মাঝে এখনও বিরক্ত করে তারা { কেউ কেউ বলে, তার কাছে ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির চেয়ে জটিল রহস্য আছে। বদলে বেশি কিছু দিতে হবে না, জমজমাট কাহিনি বুঝে একহাজার ডলার বা দুই হাজার ডলার দিলেই সে সন্তুষ্ট থাকবে।

কিন্তু রবিন এন কার্বি লোকটা একবারও টাকা চায়নি। আর এখন ক্যাসেডিন চলে এসেছে তার এলাকার কাছেই, সুতরাং…

এমনও হতে পারে লোকটা গুরুত্বপূর্ণ কিছু বলবে, বলল ক্যাসেডিন। তার বাড়ির কাছে চলে এসেছি, তাই ভাবছি ঘুরেই আসি।

পরে আবার বোলো না তোমাকে সাবধান করিনি, বলল সান্থা, ঠিক আছে, ঘুরে এসো।

 ফোন রেখে দড়াম করে গাড়ির দরজা বন্ধ করল ক্যাসেডিন।

.

দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকা অফিসে ফোন রেখে ছাতের দিকে চাইল সান্তা ক্যাসেডিন, উদাস হয়ে উঠছে। অবশ্য কিছুক্ষণ পর সচেতন হলো।

মাঝ সকাল। নিচু ছাতের বিশাল এই ঘরে বুক-সমান সব পার্টিশনের ওপাশে এক শর বেশি কলিগ ব্যস্ত হয়ে যে যার কাজ করছে। একের পর এক ফোন আসছে। খটখট করছে কি-বোর্ড। কাগজ বা ফাইল নিয়ে নানা দিকে ছুটছে অনেকে।

নীল জিন্স প্যান্ট ও সাদা শার্ট পরেছে সান্থা, গলা থেকে ঝুলছে কালো টাই। চুলগুলোকে পনিটেইল করা।

আরও কয়েক সেকেণ্ড পর হাতের দিকে চাইল। স্বামীর কাছ থেকে পাওয়া তথ্যগুলো টুকে নিয়েছে নোট বুকে। সাবধানে প্রতিটি লাইন পড়ল সান্থা। বেশিরভাগ অংশ ফালতু মনে হলো। মাসুদ রানা নামের এক লোক, আয়োনোস্ফেরিক সমস্যা, সামনের দল ও দ্বিতীয় দলের কথা বলেছে।

কিন্তু, তিনটে লাইন গুরুত্বপূর্ণ মনে হলো সান্থার:

মাইনাস সিক্সটি-সিক্স পয়েন্ট ফাইভ
     আয়োনোস্ফেরিক সমস্যায় যোগাযোগ হারিয়ে
        ওয়ান-ফিফটিন, টোয়েন্টি মিনিটস, টুয়েলভ সেকেণ্ড ইস্ট

ভুরু কুঁচকে এই তিনটি লাইনে চোখ বোলাল সান্থা, কিছুক্ষণ পর উঠে দাঁড়াল, চলে এল পাশের ডেস্কে। ওদিকের শেলফ থেকে তুলে নিল বাদামি ফোলিও আকৃতির বই। কাভারে চোখ বুলিয়ে নিল: বার্থেলেমিউস অ্যাডভান্সড় অ্যাটলাস অভ ওয়ার্ল্ড জিয়োগ্রাফি। কয়েকটা পৃষ্ঠা উল্টেই চট করে পেয়ে গেল যা খুঁজছে।

পাতার একটা লাইন অনুসরণ করছে ওর আঙুল।

আরিহ্! উচ্চারণ করে বলল। কাছের ডেস্কে অন্য এক রিপোর্টার তার কাজ থেকে মুখ তুলে চাইল।

খেয়াল করল না সান্থা ক্যাসেডিন। সামনের পৃষ্ঠার উপর আটকে গেছে ওর চোখ।

আঙুল থেমেছে ম্যাপের ল্যাটিচ্যুড ৬৬.৫ ডিগ্রি দক্ষিণে ও লংগিচ্যুড ১১৫ ডিগ্রি, ২০ মিনিট বারো সেকেণ্ড পুবে।

ভুরু কুঁচকে গেল সান্থার। ওর আঙুল থেমেছে অ্যান্টার্কটিকার উপকূলে।

.

ই-ডেকে পুলের পারে জড় হয়েছে রানার দলের সবাই।

একটু পর সার্জেন্ট জনি ওয়াকার, লেফটেন্যান্ট তিশা করিম ও লেফটেন্যান্ট গোলাম মোরশেদ পিঠে ঝুলিয়ে নেবে স্কুবা ট্যাঙ্ক। পরতে শুরু করেছে কালো থারমাল ইলেকট্রিক ওয়েসুট।

চুপ করে ওদেরকে দেখছে রান ও গানার সার্জেন্ট ভাইপার। তাদের পিছনে দাঁড়িয়েছে কর্পোরাল নাজমুল। নিঃশব্দে ই-ডেকে গুদামঘরের দিকে রওনা হলো সার্জেন্ট হোসেন আরাফাত দবির। আরেকবার দেখে আসবে আহত নিশাত সুলতানাকে।

গোলাম মোরশেদের ড্রিল রুম খুঁজে পাওয়া কালো ব্যাকপ্যাক কাছেই পড়ে আছে। ওটার ভিতর থেকে বের করা হয়েছে ফ্রেঞ্চদের আনা ভিএলএফ ট্রান্সমিটার, রাখা হয়েছে রানার পায়ের সামনে।

কেভিন হাক্সলের মৃত্যু ওদের সবাইকে প্রবলভানে আঁকি দিয়েছে। ফ্রেঞ্চ ডাক্তার ম্যাথিউ ফ্যোনুয়্যা রানাকে বলেছে, কেভিনের গলার ভিতর অংশে ল্যাকটিক অ্যাসিড ছিল। ল্যাকটিক অ্যাসিড মানেই অন্য কোনও ক্ষতের কারণে মরণ হয়নি কেভিন হাক্সলের।

কণ্ঠনালীতে ওই অ্যাসিডের অর্থ: হঠাৎ করেই ফুসফুসে অক্সিজেন যাওয়া থেমে গেছে। তখন চালু থাকবার জন্য বাধ্য হয়ে ফুসফুস চিনি পোড়াতে শুরু করেছে। তৈরি হয়েছে ল্যাকটিক অ্যাডোসিস। অন্য কথায়: কণ্ঠনালীর ভিতর ল্যাকটিক অ্যাসিড মানেই হঠাৎ করেই ফুসফুস অক্সিজেন পায়নি। অর্থাৎ, কেভিনের অ্যাজফিক্সিয়েশন বা সাফোকেশন হয়েছে।

গুলির কারণে মারা যায়নি কেভিন। মরেছে, কারণ ফুসফুসে অক্সিজেন যায়নি। কেউ একজন গলা টিপে মেরে ফেলেছে ওকে।

খুন হয়েছে কেভিন হাক্সলে।

সেই সময়ে বাইরে জনি ওয়াকারের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল রানা ও নিনা ভিসার। ওই একই সময়ে ই-ডেকে নেমে আসে কর্পোরাল নাজমুল, ফেনুয়্যার হ্যাণ্ডকাফ খুলে দিয়ে তাকে নিয়ে উপরে রওনা হয়। আর সে সময়ে এ-ডেকের ডাইনিংরুমে ঢোকে কেউ, গলা টিপে মেরে ফেলে মুমূর্ষ কেভিন হাক্সলেকে।

খুব চিন্তিত হয়ে পড়েছে রানা।

ওদের সঙ্গেই আছে ঠাণ্ডা মাথার কোনও খুনি।

অন্যদেরকে সব খুলে বলেনি রানা, শুধু জানিয়েছে কেভিন হাক্সলে আর নেই। কীভাবে মরল, তা এড়িয়ে গেছে। ওর মনে হয়েছে, খুনিকে আরও সতর্ক হওয়ার সুযোগ না দেয়াই ভাল। লোকটা এখনও জানে না রানা টের পেয়েছে। নাজমুল ও ফেনুয়্যা শপথ করেছে, তারা এ বিষয়ে একটা কথাও বলবে না।.

চুপচাপ অন্যদেরকে পোশাক পরতে দেখছে রানা, দ্রুত চলছে। ওর মগজ।

খুনি যে-ই হোক, সে ভেবেছে অন্যরা মনে করবে গুরুতর জখমের কারণেই মরেছে হাক্সলে। রানাকে যদি তাই বলা হতো, ওই একই কথা ও-ও ভাবত। গুরুতর আহত ছেলেটা নিঃশব্দে বিদায় নিয়েছে। সবাই ঠিক তা-ই ভাববে, এটা ধরে নিয়েছে খুনিও। গলা টিপে মেরে ফেললে রক্ত বেরোয় না। কোনও ক্ষতও তৈরি হয় না। এটা স্বাভাবিক যে সবাই ভেবে নেবে শেষ যুদ্ধে হেরে গেছে আহত কেভিন।

কিন্তু খুনি জানত না গলা টিপে মারলে একটা প্রমাণ রয়ে যায়, গলার ভিতর অংশে থাকে ল্যাকটিক অ্যাসিড।

রানা বুঝতে পারছে, উইলকক্স আইস স্টেশনে কোনও ডাক্তার না থাকলে, কেউ জানত না কীভাবে মরেছে কেভিন।

নানা চিন্তা আসছে রানার মনে।

এমনও হতে পারে, স্টেশনের ভিতর রয়ে গেছে কোনও ফ্রেঞ্চ সৈনিক! এমন কেউ, যাকে খুঁজেই পায়নি ওরা। একাকী কোনও কমাণ্ডো, যে ঠিক করেছে একে একে শেষ করবে ওদের। সবচেয়ে দুর্বল, মুমূর্ষ মানুষটাকে দিয়ে শুরু করেছে নিজের কাজ।

মন থেকে চিন্তাটা দূর করে দিল রানা। গোটা স্টেশন, এর চারপাশ, বাইরে রয়ে যাওয়া অবশিষ্ট ফ্রেঞ্চ হোভারক্রাফট–সব জায়গা ভালভাবে খুঁজে দেখেছে ওর লোক। না, উইলকক্স আইস স্টেশনের বাইরে বা ভিতরে কোথাও শত্রু-সেনা নেই।

তার মানেই আরেকটা বড় সমস্যা চেপেছে ঘাড়ে।

কেভিন হাক্সলেকে যে খুন করেছে, সে ওর পরিচিত কেউ। এমন কেউ, যাকে বিশ্বাস করে ও।

দুই ফ্রেঞ্চ বিজ্ঞানী খুনি হতে পারে না। লড়াই শেষে তাদেরকে হ্যাণ্ডকাফ দিয়ে আটকে রাখা হয়েছে লোহার খুঁটির সঙ্গে।

হতে পারে উইলকক্স আইস স্টেশনের বিজ্ঞানীদের কেউ খুনি। রানার সঙ্গে ছিল নিনা ভিসার ও জনি ওয়াকার, অন্য বিজ্ঞানীরা ছিল বি-ডেকের কমন রুমে। বলতে গেলে, তাদেরকে ঘিরে ছিল মেরিন সৈনিক ও রানার দলের সবাই। কোন্ কারণে কোনও বিজ্ঞানী একজন মেরিন সৈনিককে খুন করবে? খুন করেই বা কী পাবে? বিজ্ঞানীদেরকে উদ্ধার করে সরিয়ে নেয়ার জন্যেই এসেছে ওরা।

অবশ্য, অন্য কিছুও হতে পারে।

কোনও মেরিন খুন করেছে কেভিন হাক্সলেকে।

এমন হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম, কিন্তু হতেও তো পারে?

সেক্ষেত্রে আঙুল তুলতে হয় সার্জেন্ট ভাইপারের দিকে। সে ছাড়া স্টেশনের ভিতর অংশে দ্বিতীয় কোনও মেরিন ছিল না।

রানা ও নিনা ভিসার গিয়েছিল সার্জেন্ট জনি ওয়াকারের সঙ্গে দেখা করতে। এই দুজন খুনি হতে পারে না। অন্য মেরিন অর্থাৎ সার্জেন্ট ভাইপারের ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া অসম্ভব। সে ছিল স্টেশনে, এমন সময় খুন হয় হাক্সলে।

অবশ্য, যে-কেউ কাজটা করে থাকতে পারে।

এক এক করে সবাইকে হিসাবের ভিতর আনছে রানা।

গানারি সার্জেন্ট পল সিংগার, ওরফে ভাইপার। সে ছিল সিডেকে, ব্যস্ত, ছিল বিধ্বস্ত উইঞ্চ কন্ট্রোল ঠিক করবার কাজে। একা ছিল সে।

ভাবতে শুরু করে মনটা খুব তেতো হয়ে গেল রানার।

আর কোনও মেরিন নেই যাকে সন্দেহ করবে। অন্যরা মারা গেছে। তার মানে, সার্জেন্ট ভাইপার বা অন্য চার বিজ্ঞানী ছাড়া  তেমন কেউ নেই যাকে সন্দেহ করবে।

নাকি আছে?

ওর নিজের দলের বেশ কয়েকজন?

তাদের কেউ ওই খুন করে থাকলে?

চুপ করে ভাবছে রানা।

কৃষ্ণাঙ্গদের মত কুচকুচে কালো লেফটেন্যান্ট গোলাম মোরশেদ। স্টেশনের উপর থেকে শুরু করে, নীচ পর্যন্ত ফ্রেঞ্চদের ইরেজার খুঁজেছে সে। পেয়েছে ভিএলএফ ট্রান্সমিটার। ওটা এখন ওর পায়ের কাছে। মোরশেদও একা ছিল।

এবার নাজমুল। তরুণ সৈনিক, ওকে কিশোরও বলা যায়। ওর উপর সবচেয়ে আগে সন্দেহ পড়ে। সে বলেছিল, আপাতত কেভিনের রক্ত থামাতে পেরেছে। তার মানেই ওই ছেলেটা আগের চেয়ে স্টেবল ছিল। নইলে নাজমুল ই-ডেকে নেমে আসত না। লড়াই শেষে ডাইনিংরুমে হাক্সলের সঙ্গে একা ছিল নাজমুল। ভাবতে ভাল লাগছে না, কিন্তু এমন হতেই পারে, কেভিনকে খুন করেছে সে একঘণ্টা আগেই।

কিন্তু কেন করবে কাজটা? কোনও ধরনের যুক্তি তো নেই! ম্যাকমার্ডো থেকে আসবার পথে নাজমুল ও কেভিন হাক্সলে আলাদা হোভারক্রাফটে এসেছে। ওদের দুজনের ভিতর ঝগড়া হওয়ারও কোনও সুযোগ ছিল না। নাজমুলের বয়স মাত্র একুশ বছর। কোনও কাজ দিলে বযস্ত হয়ে শেষ করে। কোনও নির্দেশ দিলে ঝাঁপিয়ে পড়ে সোৎসাহে। ওর এত বয়স হয়নি যে কাজে ফাঁকি দেবে বা কোনও প্রতিহিংসা পুষবে। সরল একটা ছেলে। নিজের দেশ বা মার কথা বলতে গিয়ে আবেগ তাড়িত হয়ে ছলছল করে ওঠে ওর দুই চোখ।

নাজমুলকে খুনি ভাবতে গিয়ে বিদ্রোহী হয়ে উঠল রানার মন। হঠাৎ অন্য একটা স্মৃতি মনে পড়ল। ওই তিক্ত অতীত স্মৃতি ভুলে .. যেতে চেয়েছে, কিন্তু পারেনি।

রবিন কার্লটন!

পেরু। এপ্রিল, দু হাজার এগারো সাল।

মানুষটা ছিল আমেরিকান। দক্ষ সেনা। পদ ছিল মেজরের। নুমা অফিসে পরিচিত হয় ওরা। দশ মিনিট পেরুবার আগেই বুঝতে পারে, পরস্পর পরস্পরকে পছন্দ করে ফেলেছে। দারুণ মিলে যায় দুজনের রুচি। দূর-সাগরকে মন থেকে ভালবাসে ওরা। দ্রুত চালাতে পছন্দ করে গাড়ি। এমন অসংখ্য মিল পেয়েছে ওরা নিজেদের ভিতর।

কার্লটন ওকে দাওয়াত দিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। অবিবাহিত মানুষের বাড়ির মত অগোছালো ছিল না, তার কটেজ। দারুণ চমৎকার রাধে কার্লটন। কিচেনে রান্নার কাজে সাহায্য করবার সময় রানা টের পেল, খুবই বুদ্ধিমান লোক ওর এই নতুন বন্ধু। স্ট্র্যাটেজির উপর দারুণ সব আইডিয়া আসে তার মগজে।

এরপর বহুবার ওদের দেখা হয়েছে নুমা অফিসে বা অন্য কোথাও। যোগাযোগ ছিল ফোনে। রানার জন্মদিনে বা ঈদে পৌঁছে যেত কার্লটনের দামি উপহার। একইভাবে ক্রিসমাস বা কার্লটনের জন্মদিনে পৌঁছে যেত রানার সুন্দর কোনও উপহার।

তারপর, দুহাজার এগারো সালের এপ্রিলে রানা ছিল পেরুর আকাশছোঁয়া আন্দেজ পর্বতে, বাংলাদেশ আর্মির একটা কমাণ্ডো ইউনিট নিয়ে ট্রেনিঙে ছিল। সেসময় গুজব শুনল, আন্দেজ পর্বতের অনেক উপরে প্রাচীন এক ইনকা মন্দিরের ভিতর আবিষ্কৃত হয়েছে খুব গুরুত্বপূর্ণ এক আর্টিফ্যাক্ট। দামি আর্টিফ্যাক্ট কেড়ে নিতে ইউনিভার্সিটি রিসার্চারদেরকে খুন করেছে একদল ট্রেজার-হান্টার। তাদের সঙ্গে আধুনিক সব অস্ত্র। পেরুভিয়ান প্রেসিডেন্ট সহায়তা চেয়েছেন ইউনাইটেড স্টেটসের কাছে।

রানা তখন ঠিক করল, পর্বতের ওই মন্দিরে ওর দল নিয়ে যাবে, তাতে ট্রেইনি অফিসাররা বাস্তব সমস্যা কেমন হয় তা বুঝবে। জায়গাটা খুব দূরেও নয়, সেদিনই রওনা দিল ওরা।

পাহাড়ের ওই এলাকায় পৌঁছে রানা দেখল, ওখানে আগেই হাজির হয়েছে ইউএস আর্মি রেঞ্জারের পুরো এক প্লাটুন সৈনিক। সবুজ একটা পাহাড় ঘিরে রেখেছে তারা। চারপাশের দুই মাইলের ভিতর কাউকে ঢুকতে দিচ্ছে না। পাহাড়ের চূড়ায় প্রায় ধসে পড়া পিরামিড আকৃতির ইনকা মন্দির দূর থেকেই চোখে পড়ছিল।

রেঞ্জারদের কর্নেলের কাছ থেকে রানা শুনল, ওই মন্দিরের ভিতর ঢুকেছে মেরিনদের একটি রিকনিসেন্স ইউনিট। মেরিনদের আরেকটি দল এসেছে। কিন্তু তাদেরকে মন্দিরের দিকে যেতে দেয়া হয়নি। রানা আরও জানল, মন্দিরের ভিতর যে ইউনিট চুকেছে, সেটার নেতৃত্বে আছে মেজর রবিন কার্লটন।

সবার আগে পৌঁছেছে সে। ওর দল নিয়ে ব্রাজিলের জঙ্গলে ট্রেইনিঙে ছিল। আমেরিকান সামরিক বাহিনীর উঁচু পদ থেকে নির্দেশ আসতেই এখানে চলে এসেছে।

আর্মি রেঞ্জার কর্নেল জানেন না, কী ঘটছে পোডড়া মন্দিরের ভিতর। অন্য ইউনিটগুলোকে বলে দেয়া হয়েছে, এই এলাকার দুই মাইলের ভিতর কেউ যেন ঢুকতে না পারে। ওই সীমানা পেরুবার উপায় ছিল না রানার, ওখানেই থামতে হয় বাংলাদেশ আর্মির দলটিকে। অবশ্য, দ্বিতীয় মেরিন ইউনিটের পরিচিত একজনের কাছ থেকে একটা হেলমেট চেয়ে নিয়েছিল রানা।

এর কিছুক্ষণ পর হাজির হলো নতুন আরেকটা মিলিটারি ইউনিট।

এদেরকে অবশ্য ভিতরে ঢুকতে দিল রেঞ্জারদের কর্নেল। ওই দলটি ছিল সিল টিম। তখন মেরিনদের কে যেন বলল, এরা এসেছে মাইন সরিয়ে নিতে। মেজর রবিন কার্লটন নাকি মন্দিরের। চারপাশে মাইন পেতে রেখেছে।

একঘণ্টা পর মন্দিরের ভিতর শুরু হলো তুমুল গোলাগুলি।

নীচ থেকে দেখা গেল, মন্দিরের ভিতর ঢুকে পড়েছে সিল ইউনিট। এরপর মেরিনদের কাছ থেকে ধার নেয়া হেলমেটের ইয়ারপিসে রানা শুনল চিৎকার। বেশ স্ট্যাটিক চলছে, তার ভিতর দিয়ে চিৎকার করে বলা হলো:

আমি মেজর রবিন কার্লটন, ইউনাইটেড স্টেটস মেরিন ফোর্স রিকনিসেন্স ইউনিট ফোর। রিপিট করছি: আমি ইউএস মেরিন ফোর্স রিকনিসেন্স ইউনিটের মেজর রবিন কার্লটন। বাইরে কি মেরিন ইউনিট আছ? থাকলে দয়া করে সাড়া দাও।

দ্বিতীয় মেরিন ইউনিটের মেজর জবাব দিল না, অন্য কাজে ব্যস্ত।

কিন্তু রানা সাড়া দিল। বলল, আমি মাসুদ রানা। ছোট একটা ইউনিট নিয়ে পাহাড়ের গোড়াতেই আছি। এরা আমাদের ঢুকতে দিচ্ছে না। রবিন, তুমি অনুমতি আদায় করে দিতে পারবে?

কিন্তু ওর মনে হলো, কার্লটন ট্র্যান্সমিট করলেও এদিকের কোনও কথা শুনছে না।

আবারও বলল কার্লটন: মন্দিরের বাইরে আছ কোনও মেরিন? দয়া করে এখনই রেইড করো! আমার ইউনিটের ভিতর বিশ্বাসঘাতক ঢুকিয়ে দিয়েছে ওরা! মেরিনস, সিল টিম বলেছিল আমাদেরকে সাহায্য করতে এসেছে। বলেছিল, ওরা স্পেশাল ইউনিট! মন্দির পাহারা দেয়ার জন্য ওয়াশিংটন থেকে এসেছে! তারপর পিস্তল বের করে একে একে আমাদেরকে খুন করতে শুরু করেছে। এখন আমাকেও খুন করতে চাইছে! আমার নিজের লোক রয়েছে তাদের সঙ্গে! হারামজাদারা বিক্রি হয়ে গেছে। আমার ইউনিটের ভিতর বিষ ঢুকিয়ে দিয়েছে ওরা! আমার নিজের লোকই এখন হামলা করছে…

এরপর কেটে গেল সিগনাল। চট করে মেরিনদের দিকে চাইল রানা। একটু আগে মেরিনদের মেজর খুলে রেখেছে হেলমেট। টুলে বসে ওটা দিয়ে হাঁটুর উপর টোকা দিচ্ছে। গাজরের মত লালচে চেহারায় মহাবিরক্তি। লোকটা বোধহয় কার্লটনের কথা শুনতে পায়নি। না কি ব্যাপারটা ইচ্ছাকৃত? দুশ্চিন্তার কোনও ছাপ নেই তার মুখে। একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে তরুণ লেফটেন্যান্ট। তার মাথায় হেলমেট নেই, তারটা দিয়ে দিয়েছে রানাকে। বুঝতে দেরি হলো না রানার, কার্লটন ট্রান্সমিট করেছে অফিসার্স-ওনলি ফ্রিকোয়েন্সিতে। তার মানে, ও নিজে ছাড়া কেউ শুনতে পাচ্ছে না কিছু।

নিজের দলকে তৈরি হতে বলল রানা, পাঁচ মিনিট পেরুনোর আগেই রওনা হলো মন্দির লক্ষ্য করে। কিন্তু বিশ ফুট যাওয়ার আগেই ওদেরকে ঘিরে ফেলল রেঞ্জারদের বড় একটা সশস্ত্র দল। সংখ্যায় তারা ষাটজন, ওদিকে রানা সহ ওর দলে মাত্র চোদ্দজন।

রেঞ্জার কর্নেল কঠোর স্বরে বলল, মেজর রানা, আমাকে স্পষ্ট নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কেউ ওদিকে যাবে না। কেউ না। কেউ বা কোনও দল মন্দিরে ঢুকতে চাইলে, তাকে বা তাদেরকে গুলি করা হবে। আপনারা বিদেশি… আমি চাই না আপনাদের উপর গুলি, চালাতে হোক। এরপর আরও শীতল হয়ে উঠল তার কণ্ঠ, আপনার কি মনে হয় আমরা গুলি করব. না? …আমি কিন্তু দ্বিতীয়বার মুখে কিছু বলব না।

চুপ করে রেঞ্জার কর্নেলের দিকে চেয়ে ছিল রানা।

লোকটার উচ্চতা সাড়ে ছয়ফুট মত। বয়স হবে পঁয়তাল্লিশ। ঢাল আকৃতির বুক। লালচে চেহারা। কু-কাট চুল। চোখদুটো মৃত মাছের চোখের মত। রানার এখনও মনে আছে লোকটার নাম। রোবটের মত করে বলেছিল; শুনে রাখুন, আমি ইউনাইটেড স্টেটস আর্মির কর্নেল ন্যাট লেদারউড।

মন্দিরের কাছে যাওয়া আর হয়নি রানা বা ওর দলের কারও। মেরিন লেফটেন্যান্টের দিকে এগোতে পারেনি, তার হেলমেটও ফিরিয়ে দেয়া সম্ভব হয়নি। তখনও হেলমেট ইন্টারকমে রবিন কার্লটনের আর্তি শুনছে রানা: মেরিনদের কেউ কি নেই তোমরা? আমাদের খুন করছে ওরা!।।

বারবার যোগাযোগ করেছে কার্লটন। তখন প্রচণ্ড রাগে থরথর করে কাঁপছে রানা। সিল টিম এরই ভিতর কার্লটনের বেশিরভাগ লোককে মেরে ফেলেছে। কার্লটন হতাশ হয়ে বলেছিল: আমার নিজের লোক যোগ দিয়েছে ওদের সঙ্গে! আমাদেরকে মেরে ফেলছে! আমি বুঝতে পারছি না কী ঘটছে!

কিছুক্ষণ পর রবিন কার্লটন বলেছে, হায় ঈশ্বর! আমি ছাড়া কেউ নেই আমার দলের!

মন্দির থেকে আর বেরোয়নি সে।

বাংলাদেশ আর্মির কমান্ডোদের ট্রেইনিং শেষে সোজা ইউএসএ ফেরে রানা। মেরিন অফিসে খোঁজ নিতেই ওখান থেকে জানানো হলো: ওই মন্দিরের ভিতর কোনও শত্রু পায়নি মেজর রবিন কার্লটন। ওখানে কোনও লড়াইও হয়নি। আসলে মন্দিরের ভিতর রহস্যজনক কোনও আর্টিফ্যাক্ট ছিল না। ফাঁকা পড়ে ছিল ভাঙা, মন্দির চারপাশ খুঁজতে শুরু করবার পর তার দলের কয়েকজন, তাদের ভিতর কার্লটন নিজেও, পড়ে যায় গোপন এক কূপের ভিতর। ওটা ছিল কমপক্ষে এক শ ফুট গভীর। চারদিকে ছিল পাথরের দেয়াল। অত উপর থেকে পড়ে একজনও বাঁচেনি। পরে উদ্ধার করা হয়েছে মৃতদেহগুলো।

অবশ্য, মেজর রবিন কার্লটনের লাশ পাওয়া যায়নি।

মেরিন অফিসের রিপোর্ট অনুযায়ী: ওই মন্দিরে অস্বাভাবিক কিছুই ঘটেনি। সতর্ক না হলে এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনা তো ঘটতেই পারে!

সেদিন মারা পড়ে বারোজন মেরিন।

রানা জানে, ও একমাত্র মানুষ যে কার্লটনের কথা শুনেছিল। কাউকে বললেও বিশ্বাস করবে না, কার্লটনের নিজ লোক ওদেরকে খুন করেছে। এরপর আমেরিকার সেনাবাহিনীর ব্যাপারে খোঁজ-খবর নিতে শুরু করে রান!। কিন্তু জরুরি তথ্য না পাওয়ায় বেশি দূর এগোতে পারেনি।

এখন বরফের নীচে অ্যান্টার্কটিকার উইলকক্স আইস স্টেশনে কথাটা মনে পড়ে কেমন যেন কু ডাকছে ওর মন। কার্লটনের কণ্ঠ বাজছে কানে: আমার ইউনিটের ভেতর বিশ্বাসঘাতক ঢুকিয়ে দিয়েছে ওরা!

বিজ্ঞানীদের ভিতর কেউ হাক্সলেকে খুন করে থাকতে পারে। কার্লটনের বলা সেই ওরা কারা? ইউএস সরকার? ইউএস মিলিটারি?

হতে পারে।

প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়ন ও ইউনাইটেড স্টেটসের মিলিটারিতে বিশেষ কিছু লোক ঢুকিয়ে দিত সরকার। আসলে তাই করে প্রায় প্রতিটি দেশ। সাধারণ অফিসার বা সৈনিকা এদেরকে ছুঁচোর চেয়ে বেশি ঘৃণা করে।

নিজের দলের ভিতর বিশ্বাসঘাতক থাকতে পারে, ঠাণ্ডা একটা শিরশিরে অনুভূতি নেমে গেল রানার মেরুদণ্ড বেয়ে। মনে মনে আবার হিসাব কষতে শুরু করেছে,

তিশা করিম। মিষ্টি একটা মেয়ে। তরুণ এবং আহত কেভিন হাক্সলেকে খুন করবে কেন? কোনও কারণ তো নেই। কারও সঙ্গে কোনও রাগারাগি নেই তিশার। স্কুবা গিয়ার তৈরি রাখতে ই-ডেকে নেমে এসেছে। তার সঙ্গে এখনও আছে সার্জেন্ট হোসেন আরাফাত দবির। তিশা কি কোনওসময়ে একেবারে একা ছিল? সেই সময়ে উঠে যায় এ-ডেকে? খুন করে কেভিন হাক্সলেকে?

সার্জেন্ট হোসেন আরাফাত দবির সত্যিকারের দক্ষ সৈনিক, যার উপর ভরসা করা যায়। একটু পর পর গিয়ে নিশাত সুলতানাকে দেখে আসছে। সে ই-ডেক ছেড়ে এ-ডেকে গিয়েছিল? উপরে উঠে যাওয়ার কোনও কারণ নেই। কিন্তু পারে তো যেতে?

একমাত্র নিশাত সুলতানাকে বিশ্বাস করতে পারবে রানা। সে নিজেই আহত, চাইলেও কেভিন হাক্সলেকে খুন করতে পারত না।

থমথমে চেহারা নিয়ে সাগরের পুলের দিকে চেয়ে রইল রানা। ওদের ভিতর বরফ-ঠাণ্ডা মগজের খুনি আছে! ওয়াকার, নিশাত, নিনা ভিসার এবং ও নিজে ছাড়া অন্যরা যে-কেউ খুনি হতে পারে!

দুই লেফটেন্যান্ট গোলাম মোরশেদ ও তিশা করিম এবং সার্জেন্ট জনি ওয়াকার ডাইভ দেয়ার জন্য প্রস্তুত। ওদের পিঠে নেভির লো-অডিবিলিটি এয়ার ট্যাঙ্ক। আজকাল ওই জিনিসকে স্টেলথ ট্যাঙ্ক বলে।

পানির ভিতর খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে আওয়াজ, আর সাধারণ স্কুবা ট্যাঙ্ক নানা শব্দ তৈরি করে। মাউথ পিস থেকে কমপ্রেসড় বাতাস বেরুবার সময় বেশ জোরালো বগ-বগ শব্দ তোলে। কমার্শিয়াল আণ্ডারওয়াটার মাইক্রোফোন চট করে ধরতে পারে ডুবুরির ব্রিদিং গিয়ারের হিসহিস আওয়াজ। এটা মাথায় রেখে ইউএস নেভি কোটি ডলার খরচ করে নিঃশব্দ আণ্ডারওয়াটার ব্রিদিং অ্যাপারেটাস তৈরি করিয়েছে। লাবা, বা লো-অডিবিলিটি ব্রিদিং অ্যাপারেটাস তাদের চাহিদা ভালভাবেই পুরণ করেছে। কোনও আওয়াজ করে না ওই জিনিস। সাধারণ অডিও ডিটেকশন সিস্টেম। যেমন স্টেলথ এয়ারক্রাফট ধরতে পারে না, ঠিক তেমনই বর্তমানের স্টেলথ ট্যাঙ্ক। .

ওর দলের দিকে চাইল রানা। যে যার মুখে মুখোশ বসিয়ে নিয়েছে। এবার আঁপিয়ে পড়বে রক্ত মিশ্রিত লালচে পানিতে। আরেকবার পুলের দিকে চাইল রানা। মাঝে ভাসছে ডাইভিং বেল, এ ছাড়া পানিতে কিছুই নেই। কমপক্ষে চল্লিশ মিনিট আগে বিদায় নিয়েছে খুনি তিমিগুলো। চট করে আবার ফিরবে বলে মনে হয় না। কাঁধে টোকা পড়তেই ঘুরে চাইল রানা।

কখন যেন এসেছে নিনা ভিসার। পরনে নীল-কালো থারমালইলেকট্রিক ওয়েটসুট। একটু চমকে গেল রানা। টানটান হয়ে আছে নিনার পোশাক। এখানে পৌঁছে তাকে ভাল করে দেখেনি ও। অপূর্ব সৌষ্ঠবের কারণে বড় মাপের মডেল হতে পারত নিনা ভিসার।

একটু আগেও আপনার সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছি, বলল নিনা। ব্যস্ততার কারণে সময় হয়নি আপনার। …আমি অন্যদের সঙ্গে নামতে চাই।

চুপ করে আছে রানা।

ওই গুহায় নামতে গিয়ে মরেছে এই স্টেশনের নয়জন। আমি জানতে চাই, ওখানে আসলে কী আছে।

নিনা ভিসারের দিক থেকে চোখ সরিয়ে বামে দাঁড়িয়ে থাকা তিন যোদ্ধাকে দেখল রানা। একটু কুঁচকে গেছে ওর ভুরু।

আমি ওদেরকে সাহায্য করতে পারব, বলল নিনা। বিশেষ করে গুহার বিষয়ে।

খুলে বলুন, কীভাবে।

জন প্রাইস বলেছিলেন ওই গুহা পানির নীচে, বলল নিনা। উনি আরও বলেন, গুহার বরফ-দেয়াল কয়েক শ ফুট চওড়া। …এখন, গুহার দেয়াল যদি খাড়া হয়, ধরে নিতে পারেন ওটা। তৈরি হয়েছে ভূমিকম্পের কারণে। বা সাগরের নীচের লাভার চাপে। শুধু নীচ থেকে পাথরের প্রচণ্ড ঠেলা খেলে তৈরি হয় এমন দেয়াল।

আমার লোক সতর্ক থাকবে, ডক্টর ভিসার। ঠিক আছে। কিন্তু আমি বলতে পারব ওখানে কী আছে।

এবার পুরো মনোযোগ দিল রানা। পানির পুলের কিনারে চলে গেছে তিন ডুবুরি। ওয়াকার-তিশা-যোরশেদ, একমিনিট অপেক্ষা, করো। ঘুরে নিনা ভিসারের দিকে চাইল রানা। তা হলে বলুন, ডক্টর ভিসার, নীচে কী আছে।

বলছি, কথা গুছিয়ে নেয়ার জন্য থামল নিনা। রানা বুঝতে পারছে, এ ব্যাপারে অনেক ভেরেছে সে।

এক নম্বর থিয়োরি। ওটা এলিয়েনদের। অন্য গ্রহ থেকে এসেছে স্পেসশিপ। অন্য সভ্যতা থেকে। এই বিষয়ে খুব বেশি জানি না। কিন্তু স্পেসশিপ যদি এলিয়েনদের হয়, ওটা একবার দেখারজন্য নিজের হাত কেটে দিতেও গররাজি হব না।

আপনার হাত-পা কাটতে হবে না, এমনিতেই আমাদের একজন পা হারিয়েছে, শুকনো শোনাল রানার কণ্ঠ।

আর কিছু বলবেন?

দুই নম্বর থিয়োরি, বলল নিনা। ওটা আসলে এলিয়েন নয়।

তাই? ভুরু নাচাল রানা।

হতেই পারে, বলল নিনা, ওটা এলিয়েন বিমান নয়। আর এ। থিয়োরি আমার পরিচিত। সত্যিকারের প্যালিয়োন্টোলজি। এটা অনেক পুরোনো থিয়োরি। কিন্তু আজ পর্যন্ত কেউ প্রমাণ করতে পারেনি।

কী ধরনের প্রমাণ?

চাপা শ্বাস ফেলল নিনা ভিসার। এই থিয়োরিতে বলা হয়েছে, বহুকাল আগে পৃথিবীতে সভ্য কোনও জাতি ছিল। থামল সে, চেয়ে আছে রানার চোখে। বুঝতে চাইছে মনের কথা।

কিছুক্ষণ পর বলল রানা, বলতে থাকুন।

সে বহু হাজার বছর আগের কথা। মিটিমিটি হাসল নিনা। আমি বলছি ডাইনোসর আসার আগের কথা। ধরুন, চার শ মিলিয়ন বছর আগে? …আপনি যদি ভাবতে শুরু করেন, ঠিক বুঝবেন এমন হতেই পারে–সে আমলে অতি সভ্য কোনও জাতি ছিল। নিশ্চয়ই জানেন, আমাদের মানব-সভ্যতার উত্থান মাত্র এক মিলিয়ন বছরের কম সময়ের।

পৃথিবীর ইতিহাসে আমাদের উদ্ভব অল্প কদিনের। যদি ধরে নিই পৃথিবীর বয়স চবিবশ ঘণ্টা, তো প্রথম মানব জন্ম নিয়েছে মাত্র তিন সেকেণ্ড আগে। তার মানে, মানব-সভ্যতা এসেছে আরও অনেক পরে। নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন, আমি হোমমা সেপিয়েন্সদের কথা বলছি। মাত্র বিশ হাজার বছর ধরে সভ্য হচ্ছি আমরা। অর্থাৎ, পৃথিবীর চব্বিশ ঘণ্টার জীবনে মাত্র এক সেকেণ্ড সময় ধরে সভ্য হচ্ছি আমরা।

চুপ করে আছে রানা। বলতে গিয়ে উত্তেজিত হয়ে উঠেছে নিনা ভিসার, পছন্দের বিষয় পেয়ে চকচক করছে দুই চোখ।

প্যালিয়োন্টোলজি আমাদেরকে জানিয়েছে, ঢের পরে এসেছে স্তন্যপায়ী প্রাণী। তারও অনেক পরে এসেছে মানুষ। সূর্য থেকে পৃথিবীর সঠিক দূরত্ব, ঠিক তাপমাত্রা, উপযুক্ত পরিবেশ, পরিবেশে পর্যাপ্ত অক্সিজেন, সবচেয়ে বড় কথা— ডাইনোসর বিলুপ্ত হওয়া, এর ফলে পৃথিবীতে উদ্ভব হয়েছে মানব জাতির। আমরা সবাই জানি অ্যালভেরেজ থিয়োরি, একটা প্রকাণ্ড গ্রহাণু আকাশ থেকে পড়ে শেষ করে দিল সমস্ত ডাইনোসর, তারপর রাজত্ব শুরু করল স্তন্যপায়ী প্রাণী। কিন্তু একটা কথা বোধহয় জানেন না, গত সাত শ মিলিয়ন বছরে কমপক্ষে চারটে গ্রহাণু এই গ্রহের বুকে পড়েছে।

অল্পস্বল্প পড়েছি, বলল রানা।

হা। জানার তো কথা, আপনি শিক্ষিত মানুষ। স্যর এডমুণ্ড হ্যালি মন্তব্য করেছেন, গোটা কৃষ্ণ সাগর তৈরি হয়েছে বিশাল একখণ্ড গ্রহাণুর আঘাতে। এমনটি ঘটে কয়েক শ মিলিয়ন বছর আগে। নিউ যিল্যাণ্ডের বিখ্যাত ফিজিসিস্ট আলেকণ্ডার বিকারটন রাদারফোর্ডে পড়াতেন, তিনি বলেন: গোটা দক্ষিণ আটলান্টিক সাগর, অর্থাৎ দক্ষিণ আফ্রিকা এবং দক্ষিণ আমেরিকা আগে প্রকাণ্ড একটা গামলার মত ছিল। তিন শ মিলিয়ন বছর আগে ওখানে এসে পড়ে বিশাল এক গ্রহাণু।

এখন, আমরা যদি ধরে নিই, প্রকাণ্ড সব ডাইনোসরদের মত করেই অন্য সব সভ্যতা হারিয়ে গেছে প্রকাণ্ড গ্রহাণুর আঘাতে…এবার নিজেদেরকে জিজ্ঞেস করতে পারি–কেমন ছিল সেই সভ্যতা? আর কেন এভাবে বিলুপ্ত হলো ডাইনোসরদের মত? গত কয়েক বছরে নামকরা কজন বিজ্ঞানী এই একই কথা বলেছেন।

স্ট্যানফোর্ডের জোসেফ সরেনসন তাঁদের ভিতর বেশি প্রখ্যাত তিনি বলেন, বহু আগের সেই সমাজ বোধহয় অন্য কোনও প্রাণীর ছিল না, ছিল মানব-সভ্যতার।

অন্যদের দিকে চাইল রানা। ওরা অপেক্ষা করছে। মনোযোগ দিয়ে শুনছে নিনা ভিসারের প্রতিটা কথা।

খেই ধরল নিনা ভিসার: হয়তো জানেন, প্রতি বাইশ হাজার বছরে আধ ডিগ্রি কাত হয় পৃথিবী। সরেনসন বলতে চেয়েছেন, চার শ মিলিয়ন বছর আগে এমন করেই কাত হয়েছিল পৃথিবী। তখন এই গ্রহ ঠিক এতটা দূরেই ছিল সূর্য থেকে। তার মানে, তাপমাত্রা ছিল এখনকার মতই। আমরা এই স্টেশন থেকে যে আইস কোর স্যাম্পল, পেয়েছি, তাতে দেখা গেছে আমাদের বর্তমানের পরিবেশের মতই ছিল সেই বাতাস। তাতে ছিল একই পরিমাণ অক্সিজেন, নাইট্রোজেন ও হাইড্রোজেন। …আপনি কি এর মানে বোঝেন? আগেও ঠিক এমনই অবস্থানে ছিল পৃথিবী।

রানা মনে মনে বলল, তাই?

ওই পাতাল-গুহা সাগরের পনেরো শ ফুট নীচে, বলল নিনা। অর্থাৎ, অ্যান্টার্কটিকার সাধারণ সমতল থেকে কমপক্ষে আড়াই হাজার ফুট নীচে। হতে পারে ওখানে রয়েছে চার শ মিলিয়ন বছরের বরফ। ওটা যদি নীচ থেকে ঠেলা খেয়ে উঠে, আসে, তো ওই বরফ আসলে আরও অনেক আগের হতে পারে।

ওখানে যা-ই থাক্‌, সেটা লক্ষ লক্ষ বছর ধরে জমাট বেঁধে আছে। তার মানেই বহু আগেকালের কথা। হতে পারে ওই স্পেসশিপ এলিয়েনদের। অথবা অতীতের মানুষের। লক্ষ লক্ষ বছর ধরে টিকে আছে মানুষ। যাই হোক, মেজর, এটা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্যালিয়োন্টোলজিকাল আবিষ্কার, আর আমি সেমুহূর্তে উপস্থিত থাকতে চাই।

প্রচুর কথা বলে হাঁপিয়ে উঠেছে নিনা ভিসার, বড় করে শ্বাস নিতে শুরু করেছে।

চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে রানা, ভাবছে।

নরম স্বরে বলল নিনা, মেজর, আমি জীবনের সামান্যতম তোয়াক্কাও করি না। এমন আবিষ্কারের জন্য মরতেও দ্বিধা করব না। এটা হতে পারে মানব-সভ্যতার সবচেয়ে বড় আবিষ্কার। আমার সারাজীবন ধরে…।

কৌতূহল নিয়ে নিনার দিকে চেয়ে আছে রানা। ও নিজে কিছু বলবে, সেটা টের পেয়ে থেমে গেল নিনা।

আপনার মেয়ের কী হবে? জানতে চাইল রানা।

আস্তে করে মাথা কাত করল নিনা। এ ধরনের প্রশ্নের জন্য তৈরি ছিল না।

আপনি মেরিকে রেখে নীচে নামতে চান? বলল রানা।

ও নিরাপদেই থাকবে, হেসে ফেলল নিনা। ওর জন্য তো আপনি থাকছেন।

আগে কখনও নিনা ভিসারকে হাসতে দেখেনি রানা। ঝলমল করে উঠেছে গোটা মুখ। . যেন নীল-সাগরে বইছে ঝিরঝিরে হাওয়া, চারপাশে সোনালী রোদ, দূরে দারুণ সুন্দর কোনও সবুজ দ্বীপ।

তা ছাড়া, নীচে গেলে আমাদের হারিয়ে যাওয়া ডুবুরিদের পরিচয় জানিয়ে দিতে পারব আপনাদেরকে। আর…

হাত তুলে বাধা দিল রানা। ঠিক আছে, আপনি যেতে পারেন। কিন্তু ব্যবহার করবেন আমাদের স্কুবা ডাইভিং গিয়ার। কারও জানা নেই পাতাল-গুহায় ডুবুরিদের কী হয়েছে। কিন্তু সন্দেহ করছি, ওখানে যা আছে, সেটা ব্রিদিং গিয়ারের আওয়াজ পেয়েই হাজির হয়েছিল। চাই না আপনারও করুণ পরিণতি হোক।

আমার জন্য ভেবেছেন, তাই অসংখ্য ধন্যবাদ, মেজর, বলল নিনা ভিসার। গলা থেকে চেইন ও লকেট খুলল সে, রানার দিকে বাড়িয়ে দিল। ডাইভ দেয়ার সময় এটা সঙ্গে রাখতে চাই না। এটা রাখুন। ফিরে এসে নেব।

বেশ, জিনিসটা নিল রানা, রেখে দিল প্যান্টের পকেটে।

ঠিক তখন পুলের বামে জোরালো গোঙানির আওয়াজ উঠল। চট করে ঘুরে চাইল রানা, গভীর থেকে বিশাল কালো কী যেন উঠে আসছে। চারপাশ ভরে গেছে সাদা বুদ্বুদ ও ফেনায়। রানা প্রথমে ভেবেছিল, আবার দেখা দিয়েছে কিলার ওয়েইল, বোধহয় পেট ভরেনি ওদের। কিন্তু এক মুহূর্ত পর টের পেল, ওটা বিন্দুমাত্র সাঁতার কাটছে না। হুইশ আওয়াজ তুলে মসৃণভাবে উঠে এল পুলের সমতলে। চারপাশে ছড়িয়ে গেল ঢেউ ও ফেনা। সেই ফেনার ভিতর মিশছে সরু রেখার রক্ত। প্রকাণ্ড কালো জিনিসটা প্রায় ডুবু-ডুবু। প্ল্যাটফর্মে কয়েক পা পিছিয়ে গেছে সবাই।

এক মুহূর্ত পর ওটাকে চিনল রানা। কিলার ওয়েইলই। মৃত। পানিতে শিথিলভাবে ভাসছে কালো-সাদা লাশ। পাশেই প্ল্যাটফর্ম। ওখান থেকে ছুঁয়ে দিতে পারবে যে-কেউ। বোধহয় পালের সবচেয়ে বড়টা এটা, পুরুষ তিমি। দৈর্ঘ্যে কমপক্ষে তিরিশ ফুট। ওজন হবে সাত টন।

রানা ভেবেছিল, এই তিমির মাথায় গুলি করেছে নিশাত সুলতানা। ওটা ছাড়া অন্য কোনও তিমি মরেনি; কিন্তু এক সেকেণ্ড পর সিদ্ধান্ত পাল্টে নিল ও।

নিশাতের গুলিতে ক্রিকেট বলের মত গর্ত হওয়ার কথা। কিন্তু এই তিমির মাথায় কোনও ক্ষত নেই।

তা ছাড়া, আরেকটি বিষয় লক্ষ্য করবার মত।

এটা পানির ভিতর ভেসে উঠেছে।

কোনও স্তন্যপায়ী প্রাণী মরলে প্রথমে পানিতে ভাসতে থাকে, তারপর পেট ভরে গেলে টুপ করে ডুবে যায়। নিশাত যে তিমিকে মেরেছে, এতক্ষণে ওটা সাগরের মেঝেতে গিয়ে ঠেকেছে।

কিন্তু এই তিমিকে খুন করা হয়েছে একটু আগে।

অবাক চোখে মৃত তিমির দিকে চেয়ে আছে সবাই।

পানির ভিতর অল্প অল্প করে গড়িয়ে চুলেছে লাশ। একটু পর চিত হলো। প্রকাণ্ড তিমির সাদা পেটে চোখ পড়তেই ঢোক গিলল রানা।

নিনা ভিসারের মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেল।

বিড়বিড় করে কী যেন বলল তিশা।

চিরে দেয়ার দীর্ঘ দুটো রক্তাক্ত ক্ষত তিমির তলপেটে। পাশাপাশি উঠে গেছে গলা পর্যন্ত। ছিড়ে দেওয়া হয়েছে পেট-বুক ও গলা। পেট থেকে বেরিয়ে এসেছে কুণ্ডলি পাকানো সাদাটেখয়েরি নাড়িভূঁড়ি, পরিধি মানুষের হাতের চেয়ে বেশি।

ছুরি দিয়ে কাটা হয়নি সমান্তরাল দুই ক্ষত, যেন পেট ফুটো করেছে মস্ত দুটো দাঁত, তারপর চিরচির করে কেটে থেমেছে গিয়ে গলার গোড়ায়। চামড়া-মাংস উপড়ে ছিড়ে নেয়া হয়েছে।

চুপ করে লাশের দিকে চেয়ে আছে ওরা, প্রায় সবার চোখে চিন্তা ও ভয়ের ছাপ। বুঝতে পারছে, নীচে এমন কিছু আছে যেটা মেরে ফেলতে পারে এই বিশাল কিলার ওয়েইলকে!

আস্তে করে শ্বাস ফেলল রানা, তারপর ঘুরল নিনা ভিসারের দিকে। এখনও যেতে চান?

আরও কয়েক সেকেণ্ড তিমির লাশের দিকে চেয়ে রইল নিনা, তারপর ফিরে চাইল রানার দিকে। না, নিচু স্বরে বলল, যাব না, এ-কথা বলব না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *