১.১৭ বি-ডেকের বাইরের সুড়ঙ্গ ধরে

বি-ডেকের বাইরের সুড়ঙ্গ ধরে হাঁটছে মাসুদ রানা, ডুবে আছে গভীর ভাবনায়। ওর মনে হচ্ছে, খুব দ্রুত সব ঘটতে শুরু করেছে।

উইলকক্স আইস স্টেশনে ফ্রেঞ্চ হামলা জোর কঁকি দিয়েছে ওকে। ভাল করেই বুঝেছে, এই স্টেশনের নীচে কী আছে, ওর জানতেই হবে। কী লুকিয়ে আছে এই স্টেশনের নীচে? যাই থাক, সেজন্য নিরপরাধ মানুষ মারতে একটুও দ্বিধা করেনি ফরাসি সরকার। 

ফ্রেঞ্চ কমাণ্ডোরা জিনিসটা কেড়ে নিতে এসেছে এবং হেরে গেছে। কিন্তু সেজন্য নিশ্চিন্ত হওয়ার কোনও কারণ নেই। এবার অন্য কোনও দেশ তাদের কমাণ্ডো পাঠাতে পারে। তা যদি হয়, ফুল স্ট্রেংথ ইউএস ফোর্স পৌঁছবার আগেই উইলকক্স আইস স্টেশনের ওপর আবারও হামলা আসবে।

আগামী কয়েকটা ঘণ্টা খুবই বিপজ্জনক সময়।

ওর ভুল না হয়ে থাকলে, একাধিক দেশের মিলিটারি আসছে, উইলকক্সআইস স্টেশনের দিকে।

এখন প্রশ্ন: আমেরিকান রিইনফোর্সমেন্ট আগে আসবে, না তার আগেই হাজির হবে অন্য কোনও দেশের সশস্ত্র বাহিনী?

সেক্ষেত্রে মাত্র এই কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে কী করতে পারবে মাসুদ রানা?

এ নিয়ে বেশি ভাবতে চাইছে না। এমনিতেই অনেক কাজ পড়ে আছে। অবশ্য অন্যসব কাজের ভিতর এখন খুব দ্রুত একটা কাজ সারতে হবে।

ফ্রেঞ্চদের সঙ্গে লড়াইয়ের পর উইলকক্স আইস স্টেশনে রয়ে গেছে পাঁচ বিজ্ঞানী। তাদের তিনজন পুরুষ, দুজন মহিলা— এরা সবাই আশ্রয় নিয়েছে বি-ডেকের লিভিং কোয়ার্টারে। এখন ওদিকেই চলেছে রানা, মনে আশা: ওই পাঁচজনের ভিতর হয়তো ডাক্তার থাকতে পারে। সে চিকিৎসা ও শুশ্রুষা দিতে পারবে কেভিন হাক্সলেকে।

বাঁকা টানেলে হেঁটে চলেছে রানা, এখনও পোশাক থেকে টপটপ করে পানি পড়ছে। ভীষণ শীত লাগছে, কিন্তু পাত্তা দিচ্ছে না। মেরিনদের সঙ্গে এসেছে বলে ওদের সবাইকে ফেটিগের নীচে থারমাল ওয়েটসুট দেয়া হয়েছে। আর্কটিক পরিবেশে প্রতিটি দেশের রিকন ইউনিটের সদস্যরা ওই পোশাক ব্যবহার করে। লংজনের চেয়ে অনেক গরম ওয়েটসুট, তা ছাড়া, ভিজে গেলেও ভারী হয়ে ওঠে না। কম ওজন বহন করা রিকন ইউনিটের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, ওয়েটসুট বয়ে নেয়ার চেয়ে পরে থাকাই অনেক সোজা।

হঠাৎ রানার ডানদিকে খুলে গেল একটা দরজা, ওদিক থেকে ভাসতে ভাসতে আসছে বাষ্প। পিচ্ছিল কালো কী যেন বেরিয়ে এল করিডোরে, থামল রানার সামনে।

লিলি।

পানিতে ভিজে চুপচুপ করছে ওটা। হাসি-হাসি ভঙ্গি করে রানার দিকে চাইল। ওদিকটা শাওয়ার রুম, বাস্পের ভিতর থেকে

বেরিয়ে এল মেরি ভিসারও। রানাকে দেখেই মিষ্টি করে হাসল। . হাই, বলল। এখন ওর পরনে শুকনো পোশাক। একটু

এলোমেলো মাথার চুলগুলো। রানা আঁচ করল, গরম শাওয়ার নিয়েছে মেরি।

হাই, মৃদু হাসল রানা।

শাওয়ার রুম খুব ভালবাসে লিলি, সিলটার দিকে ইশারা করল মেরি। বাষ্পের ভিতর পিছলে গেলে খুব ফুর্তি ওর।

কুচকুচে কালো, ছোট্ট গেযেলা সিলের দিকে চাইল রানা, ওটা থেমেছে ওর পায়ের সামনে। দেখতেই মনে হলো একটু আদর করে দেয়া উচিত। তা ছাড়া, এই সিল ওর প্রাণ বাঁচিয়েছে। নরম চাহনির বাদামি চোখে বুদ্ধির পরিষ্কার ছাপ।

মেরির দিকে চাইল রানা। এখন সুস্থ বোধ করছ?

শুকনো পোশাক পরার পর এখন আর খারাপ লাগছে না, বলল মেরি।

আস্তে করে মাথা দোলাল রানা। পুলের ভিতর ভীষণ ভয় পেয়েছিল মেয়েটা, সেই ভয় কাটিয়ে খুব দ্রুতই সামলে নিয়েছে। বাচ্চারা এমনই হয়, দ্রুত শিখতে যেমন পারে, ভুলতেও পারে। অত উপর থেকে পুলের ভিতর পড়েছে! ওর মত করে তিমির তাড়া খেলে মানসিক রোগী হয়ে উঠত বয়স্ক কেউ।

মেরি যে হাসি-খুশি আছে সেজন্য মনে মনে সার্জেন্ট দবিরের প্রশংসা করল রানা। ও নিজে যখন পুলের ভিতর মেরির হাতে ম্যাগহুক ধরিয়ে দিল, আর মেয়েটি উঠে গেল উপরের দিকে, তারপর থেকে বাকি লড়াইয়ের সময় সর্বক্ষণ ওকে নিজের পাশে রেখেছে দবির। মেরির কোনও ক্ষতি হতে দেয়নি।

গুড, বলল রানা। তুমি আসলে কিছুই ভয় পাও না, তাই না? বড় হলে মেরিন হতে পারো।

আপনি কি মেরিন? জানতে চাইল মেরি, চিকচিক করছে চোখদুটো।

না। মাথা নাড়ল রানা। আমি অন্য দেশের সৈনিক।

কিন্তু সোলজার।

তা ঠিক।

আমি ঠিক আপনার মত মানুষ হতে চাই।

তুমি ওদিকে যাবে? সামনের দিক ইশারা করল রানা।

হ্যাঁ, যাব, রানার পাশে হাঁটতে শুরু করল মেরি। টানেলের মেঝেতে থপথপ করে পিছু নিয়েছে লিলি।

আপনি কোথায় চলেছেন? জানতে চাইল মেরি।

তোমার মাকে খুঁজছি।

ওহ্, একটু মিইয়ে যাওয়া স্বরে বলল মেরি।

পরিবর্তনটা খেয়াল করেছে রানা, ওর পাশে মেঝের দিকে। চেয়ে হাঁটছে মেরি। হঠাৎ করে মেয়েটার মন খারাপ হলো কেন?

অস্বস্তিকর নীরবতা নেমেছে দুজনের মাঝে। রানা ভাবতে শুরু করেছে কী বলা যায়। কয়েক সেকেণ্ড পর বলর, হ্যাঁ, কত যেন বলেছিলে তোমার বয়স? বারো?

হ্যাঁ।

তা হলে সেভেনে পড়ো?

হ্যাঁ।

আচ্ছা, সেভেন, আর কিছুই মাথায় আসছে না, নিজের উপর রেগেই গেল রানা। এক মুহূর্ত পর বলল, তা হলে তো ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবার সময় হয়ে গেছে।

রানার কথা শুনে গভীর ভাবে ভাবতে শুরু করেছে মেরি, হাঁটতে হাঁটতে রানার দিকে চাইল। হ্যাঁ, বলল গম্ভীর সুরে। যেন সত্যি ওর বারো বছর বয়সী মনে এ নিয়ে অনেক চিন্তা জড় হয়েছে। আমি ঠিক করেছি শিক্ষক হব, বলল। আমার বাবার মত। আবার আপনার মত ভাল মানুষও হতে চাই।

তোমার বাবা কী পড়ান?

বস্টনের বড় একটা কলেজে জিয়োলজি, বলল মেরি। এবার গম্ভীর ভাবে বলল, কলেজের নাম হার্ভার্ড।

তুমি নিজে কি পড়াতে চাও? জানতে চাইল রানা।

অঙ্ক।

অঙ্ক?

আমি অঙ্কে ভাল, বলল মেরি। শ্রাগ করল, একইসঙ্গে বিব্রত ও গর্বিতা।। আমার বাবা হোমওঅর্কের সময় সাহায্য করতেন, বলল মেরি। উনি বলতেন, বয়সের তুলনায় অনেক বেশি অঙ্ক বুঝি আমি। তাই আমাকে অঙ্ক পড়াতেন, সমবয়সীরা এখনও ওসব অঙ্ক চোখেও দেখেনি। দারুণ ইন্টারেস্টিংসব অঙ্ক। আরও কয়েক বছর পর ওগুলো শেখার কথা। বাবা এমন সব অঙ্ক শিখিয়েছেন, যেগুলো কোনও স্কুলে পড়ানোই হয় না।

তাই? আগ্রহী হয়ে বলল রানা, কী ধরনের অঙ্ক সেগুলো?

আপনি মনে হয় জানেন–পলিনেমিয়াল, নাম্বার সিকিউয়েন্স, কিছু ক্যালকুলাস। 

ক্যালকুলাস… নাম্বার সিকিউয়েন্স… অবাক হয়ে গেল রানা।

যেমন ধরুন ট্রায়াঙ্গুলার নাম্বার ও ফিবোনাচি নাম্বার, এইসব আর কী।

অবাক বিস্ময় নিয়ে মাথা নাড়ল রানা, বাব্বা, অনেক শিখেছে পিচ্চি মেয়ে। ওর বয়স মাত্র বারো, অন্যদের তুলনায় একটু খাটো, কিন্তু দারুণ চালু ওর মগজ। আবারও মেরির দিকে চাইল রানা, পায়ের আঙুলে ভর দিয়ে প্রায় নাচতে নাচতে চলেছে ও। মনেই হয় না সাধারণ কোনও বাচ্চা মেয়ে নয়।

আমরা দুজন একসঙ্গে অনেক অঙ্ক করতাম, বলল মেরি। আরও কত কিছু সফটবল, হাইকিং, এমন কী, একবার আমাকে স্কুবা ডাইভিঙে নিয়ে গিয়েছিল বাবা। অথচ, তখনও ওই কোর্স আমি করিইনি।

তোমার কথা শুনে মনে হচ্ছে, তোমার বাবা এখন আর এসব করেন না, বলল রানা। .

জবাব দিচ্ছে না মেরি, নীরব হয়ে গেছে। কিছুক্ষণ পর বলল, না আর করেন না।

কেন করেন না? আস্তে করে জানতে চাইল রানা। ভাবছে, এবার শুনতে পাবে মেরির বাবা-মা সর্বক্ষণ ঝগড়া করতেন, শেষে ডিভোর্সই হয়ে গেল। আজকাল এসব: খুব চলে। এমন কী বাংলাদেশেও।

গতবছর গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা গেছেন বাবা, মৃদু স্বরে বলল মেরি।

কথাটা শুনে হঠাৎ করেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল রানা। চাইল মেরির দিকে। বাচ্চা মেয়েটির চোখ জুতোর ফিতার উপর।

আমি সত্যিই দুঃখিত, মেরি, নরম স্বরে বলল রানা।

মাথা কাত করল মেরি। না, ঠিক আছে। আবার হাঁটতে শুরু করেছে।

বাইরের দিকের টানেলে দেয়ালের ভিতর অংশে একটা দরজা বসানো, ওখানে পৌঁছে গেছে রানা ও মেরি।

আমি এখানেই থামব, বলল রানা।

আমিও, বলল মেরি।

নব মুচড়ে দরজা খুলে ফেলল রানা, আগে ঢুকতে. দিল মেরিকে। ওর পর লিলি। ওদের পিছনে ঘরে ঢুকল রানা।

যে ঘরে ঢুকেছে, সেটা কোনও কমন-রুম। বিশ্রী কটকটে কমলা রঙের কয়েকটা সোফা, একপাশে স্টেরিয়ো, টেলিভিশন ও ডিভিডি। রানা বুঝতে পারছে, এরা নিয়মিত টিভি সিগনাল পায় না। বাধ্য হয়ে টিভিতে ডিভিডির সিনেমা বা অন্য অনুষ্ঠান দেখে।

কমলা এক কাউচে বসেছে নিনা ভিসার ও রাফায়লা ম্যাকানটায়ার। দুজনের পরনে এখন শুকনো পোশাক। অন্যদিকের কাউচে তিনজন তোক। এরা সবাই উইলকক্স আইস স্টেশনের বিজ্ঞানী। আগেই লোকগুলোর নাম জেনে নিয়েছে রানা। তারা: হ্যাভেনপোর্ট, টমসন ও হ্যারি। ফ্র্যাগমেন্টেশন গ্রেনেডের আঘাতে কর্পোরাল টনি কেলগের কী হয়েছে, তা দেখবার পর কেউ ঘূর থেকে বেরুবার সাহস করেনি। সবাইকে ক্লান্ত ও হতাশ মনে হলো।

কাউচের কাছে গিয়ে নিনা ভিসারের পাশে বসল মেরি। নীরব হয়ে গেছে, মাকে কিছুই বলল না। রানার মনে পড়ল, ফ্রেঞ্চ হামলা শুরু হওয়ার আগে প্রথমবার এই মা-মেয়েকে একসঙ্গে দেখেছিল। তখনও তেমন কোনও কথা বলেনি মেরি। দুজনের ভিতর কোনও রাগারাগি ছিল, তাও মনে হয়নি। কিন্তু এখন টের পেল, আড়ষ্ট হয়ে উঠেছে তারা। মন থেকে চিন্তাটা দূর করতে চাইল রানা, নিনা ভিসারের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

আপনাদের ভিতর কোনও চিকিৎসক আছেন? জানতে চাইল রানা।

মাথা নাড়ল নিনা ভিসার। না। বব থর্নিক্রাফট ছিল স্টেশনের একমাত্র ডাক্তার। কিন্তু সে তো… চুপ হয়ে গেল সে।

কী? .

বড় করে শ্বাস ফেলল নিনা। সে ছিল হোভারক্রাফটে। কথাছিল ওই গাড়ি যাবে ডুমো ডিখ-ঈলেখে।

ধীরে মাথা দোলাল রানা। টের পেল, আবারও রেগে গেছে। পাঁচ বিজ্ঞানীকে উদ্ধারের নাম করে নিয়ে গিয়ে মেরে ফেলেছে ফ্রেঞ্চ কমাণ্ডোরা।

ওর হেলমেট ইন্টারকমে কণ্ঠ শুনল: মেজর রানা, সার্জেন্ট জনি ওয়াকার বলছি।

বলুন।

আপনার কথামত স্টেশনের বাইরের দিকে রেঞ্জফাইন্ডার তাক করেছি। আপনি কি এসে দেখবেন?

হ্যাঁ, আসব, বলল রানা। কয়েক মিনিট পর। আপনি কোথায়?

দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে।

ওখানেই অপেক্ষা করুন। ম্যাকমার্জোয় রেডিয়ো করতে পেরেছেন?

এখনও চেষ্টা চালাচ্ছি। কিন্তু প্রতিটা ফ্রিকোয়েন্সির ভিতর জট পাকিয়ে গেছে। যোগাযোগ করতে পারছি না।

চেষ্টা করতে থাকুন, বলল রানা, একটু পর আসছি।

কমন রুম থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য ঘুরে দাঁড়াল রানা, দরজার কাছে চলে গেছে, এমন সময় কে যেন, ওর কাঁধে টোকা দিল! ঘুরে দাঁড়াল রানা। নিনা ভিসার। হাসছে মহিলা।

এইমাত্র মনে পড়ল, বলল। স্টেশনে মেডিকেল ডাক্তার আছে।

.

লড়াই শেষ হওয়ার পর দুই ফ্রেঞ্চ বিজ্ঞানী ম্যাথিউ ফেনুয়্যা ও স্যা ডেনি পেয়েযিকে পাওয়া গেছে। ডাইনিংরুমের এক কাবার্ডে। প্রাণের ভয়ে লুকিয়ে ছিল লোকদুটো। তারা কোনও বাধা দেয়ারও চেষ্টা করেনি। অনানুষ্ঠানিক ভাবে ঘাড় ধরে কাবার্ড থেকে বের করা হয়েছে, ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়া হয়েছে মেঝের উপর। লোকদুটোর মুখে ফুটে উঠেছিল ভীষণ ভয়। ভুল দলের হয়ে কাজ করেছে তারা। যাদেরকে মেরে ফেলতে চেয়েছে, তারাই এখন বন্দি করেছে ওদেরকে। কাজেই ধরে নিয়েছে, এবার যে-কোনও সময়ে বিশ্বাসঘাতকার জন্য চরম শাস্তি পাবে। মেরে ফেলা হবে তাদেরকে।

তারপর যখন দেখল, তাদের দুই হাতে হ্যাণ্ডকাফ আটকে দেয়া হয়েছে, তাতে একটু স্বস্তি পেয়েছে। ঘাড় ধরে আবারও দাঁড় করানো হয়েছে, ধাক্কা দিয়ে বের করা হয়েছে ডাইনিংরুম থেকে। এরপর তাদেরকে নামিয়ে আনা হয়েছে ই-ডেকে। একটা খুঁটির সঙ্গে তাদের হ্যাণ্ডকাফ আটকে দেয়া হয়েছে। অনেক কাজ পড়ে আছে, কাজেই রানা চায়নি ওর কোনও লোক এদেরকে পাহারা দিতে বাধ্য হোক। সময় নেই ওদের হাতে। ফ্রেঞ্চ বিজ্ঞানীদের প্ল্যাটফর্মে যেখানে দাঁড় করিয়ে দেয়া হয়েছে, সেটা চারপাশ থেকে দেখা যায়। কাজের ফাঁকে তাদের উপর চোখ রাখতে পারবে সবাই।

বি-ডেকের ভাঙা ক্যাটওয়াকে বেরিয়ে এসেছে রানা, হেলমেট মাইকে কিছু বলবে, এমন সময় ক্যাটওয়াকে ওর পিছনে এসে দাঁড়াল নিনা ভিসার। একটু ইতস্তত করে বলল, একটা কথা বলতে চাই আপনাকে। কমন রুমে জিজ্ঞেস করতে পারিনি।

হাতের ইশারায় একটু অপেক্ষা করতে বলে হেলমেট মাইকে বলল রানা, নাজমুল। রানা। হাক্সলে কেমন আছে?

ইয়ারপিসে ভেসে এল নাজমুলের কণ্ঠ: আপাতত রক্ত থামাতে পেরেছি। কিন্তু স্যর, আর কিছুই করতে পারব না। যেকোনও সময়ে মরবে।

এখন কি স্টেবল?

মনে তো হয়, স্যর।

ঠিক আছে, শোনো। তুমি ই-ডেকে নামবে, ওখানে আটকে রাখা হয়েছে দুই ফ্রেঞ্চ বিজ্ঞানীকে। তাদের একজন ম্যাথিউ ফেনুয়্যা, তাকে ছুটিয়ে আনবে। কথার ফাঁকে নিনা ভিসারের দিকে চাইল রানা। জানতে পারলাম, মেসিউ ফেনুয়্যা আসলে, দক্ষ সার্জেন।

ঠিক আছে, স্যর, তাড়াতাড়ি করে বলল নাজমুল। হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছে। এবার সত্যিকারের কোনও ডাক্তার চিকিৎসা করতে পারবে হাক্সলের। এক মুহূর্ত চুপ করে থাকল সে, তারপর বলল, কিন্তু… স্যর…

কী, নাজমুল?

আমরা কি ওই লোককে বিশ্বাস করতে পারি?

না, পারি না, দৃঢ় ভাবেই বলল রানা। রাং-ল্যাডারের দিকে চলেছে। উঠবে এ-ডেকে। নিনা ভিসারকে আসতে ইশারা করল। ফুটো পয়সা দিয়েও বিশ্বাস করবে না। নাজমুল, ওই লোককে বলবে, কেভিন হাক্সলে মরলে তাকেও মেরে ফেলা হবে।

ঠিক আছে, স্যর।

রাং-ল্যাডারের উপরের ধাপে গিয়ে থামল রানা, পা রাখল এডেকের ক্যাটওয়াকে। ঘুরে দাঁড়িয়ে দু হাত ধরে নিনা ভিসারকে তুলে নিল। তখনই দেখতে পেল ডাইনিংরুম থেকে বেরিয়ে এসেছে নাজমুল, উল্টো দিকের রাং-ল্যাডারের দিকে ছুটতে শুরু করেছে। ই-ডেকে নেমে তুলে আনবে ফ্যেনুয়্যাকে।

স্টেশনের প্রধান প্রবেশ পথের দিকে চলেছে রানা ও নিনা। একবার ঘাড় ফিরিয়ে স্টেশনের ভিতর অংশ দেখে নিল রানা। চারপাশে ছড়িয়ে পড়েছে ওর দলের আর সবাই।

সার্জেন্ট জনি ওয়াকার আছে বাইরে ঝড়ের ভিতর। ই-ডেকে সার্জেন্ট দবির ও লেফটেন্যান্ট তিশা, ওরা ডাইভিঙের জন্য স্কুবা গিয়ার প্রস্তুত করছে। গানারি সার্জেন্ট আছে মাঝের সি-ডেকে, অ্যালকোভে। উইঞ্চ কন্ট্রোল ঠিক করছে। লেফটেন্যান্ট গোলাম মোরশেদকে কোথাও দেখা গেল না। সে স্টেশন ঘুরে ইরেজার খুঁজছে।

সবাই যে যার কাজে ব্যস্ত।

রানার হেলমেট ইন্টারকম খড়মড় করে উঠল। এক মুহূর্ত পর বলে উঠল গোলাম মোরশেদ।

কিছু পেলে, মোরশেদ?

না, মাসুদ ভাই। স্টেশনে কোনও ইরেজার ডিভাইস নেই।

নেই? ভুরু কুঁচকে গেল রানার। তা হয় কী করে?

কিছু নেই। ফ্রেঞ্চরা বোধহয় বুঝতে পারেনি এত তাড়াতাড়ি লড়তে হবে। তাই ইরেজার বসাতে পারেনি।

রানা ভাবল, বোধহয় ঠিকই বলেছে মোরশেদ। সার্জেন্ট আরাফাত দবির খুব দ্রুত ফিরে আসতেই জানা গেল ফ্রেঞ্চরা গুলি করে মেরে ফেলেছে বিজ্ঞানীদেরকে। বিধ্বস্ত হয়েছে তাদের হোভারক্রাফট। ফ্রেঞ্চ কমান্ডোরা চেয়েছিল ওদের সবার বিশ্বাস অর্জন করবে, তারপর পিঠে গুলি করে মারবে! যখন তাদের সে পরিকল্পনা বিফল হলো, চট করে আর ইরেজার বসাতে পারেনি।

কিন্তু একটা জিনিস পেয়েছি, মাসুদ ভাই, বলল মোরশেদ।

সেটা কী?

একটা রেডিয়ো।

রেডিয়ো? শুকনো স্বরে বলল রানা। ওই জিনিস দিয়ে কী করত লোকগুলো?

সাধারণ কোনও রেডিয়ো নয়, মাসুদ ভাই। এটা ভিএলএফ। পোর্টেবল ভিএলএফ ট্রান্সমিটার।

মোরশেদের কথায় পুরো মনোযোগ দিল রানা। ভিএলএফ খুবই লো ফ্রিকোয়েন্সি ট্রান্সমিটার। ওটার দীর্ঘ তরঙ্গ হয় তিন কিলো হার্ট থেকে তিরিশ কিলো হার্ট। ওয়েভলেংথু অনেক টানা হয়। এতই দীর্ঘ, ওই রেডিয়োর সিগনালকে বলা হয়–খুব ভারী রেডিয়ো সিগনাল। মাটি ছুঁয়ে চলে ওই তরঙ্গ। খুব শক্তিশালী ট্রান্সমিটার থেকে পাঠানো হয় ওই সিগনাল। সাধারণত এসব ট্র্যান্সমিটার হয় বিশাল এবং তাতে নানা ঝামেলা পোহাতে হয়। এসব কারণে আর্মি এই রেডিয়ো ব্যবহার করে না। অবশ্য, নতুন এক টেকনোলজির কারণে ছোট ভিএলএফ তৈরি করা যায়। কিন্তু ওটা হয় অনেক ভারী। শক্তিশালী লোক পিঠে নিতে পারে ওই। রেডিয়ো।

এখন, উইলকক্স আইস স্টেশনে ফ্রেঞ্চরা এনেছে অমন একটা ট্রান্সমিটার।

কিন্তু কেন?

ভিএলএফ রেডিয়ো সিগনাল পাঠানো হয় শুধু…

তাই বা কীভাবে হয়, ভাবল রানা। ফ্রেঞ্চরা আসলে কী চেয়েছে!

আচ্ছা, মোরশেদ, ওটা কোথায় পেয়েছ?

ড্রিলিং রুমে।

তুমি কি এখন ওখানে?

জী, মাসুদ ভাই।

ওটা নিয়ে এসো পুল ডেকে, বলল রানা। সার্জেন্ট ওয়াকারের কাজ দেখে এসে নীচে নেমে দেখব ওটা।

ঠিক আছে।

ইন্টারকম অফ করে দিল রানা। ওরসঙ্গে এন্ট্রান্স টানেলে ঢুকে পড়েছে নিনা ভিসার। জানতে চাইল, আপনি বললেন ইরেজার, ওটা কী?

আস্তে করে শ্বাস ফেলল রানা। ইরেজার বলতে এক ধরনের বোমা বোঝানো হয়। ছোট কভার্ট ফোর্স লড়াইয়ে হেরে গেলে ওটা ব্যবহার করে। সঙ্গে থাকে ডিলে সুইচ। ওটা সাধারণ টাইমারের মতই কাজ করে।

দাঁড়ান-দাঁড়ান, আমি তো কিছুই বুঝছি না, বলল নিনা।

বুঝিয়ে বলতে শুরু করল রানা: ওই ফ্রেঞ্চাদের মত ছোট ক্র্যাক ইউনিট গোপনে কোনও মিশনে যেতেই পারে। কিন্তু যদি ধরা পড়ে, তাদের কারণে আন্তর্জাতিক জটিলতা তৈরি হবে। ধরুন, যদি ফ্রেঞ্চ ইউএস রিসার্চ স্টেশনে এসে সবাইকে খুন করতে গিয়ে ধরা পড়ে যেত, তখন?

আমি বোধহয় বুঝতে শুরু করেছি। রানার দিকে চেয়ে আছে মহিলা।

কেউ নিশ্চিত হয়ে বলতে পারে না, ক্র্যাক ইউনিট সফল হবে। হয়তো তাদের চেয়ে অনেক দক্ষ একদল সৈনিক তাদেরকে মেরে ফেলল। দেয়ালের হুক থেকে একটা পারকা নিয়ে পরতে শুরু করেছে রানা। আজকাল প্রায় প্রতিটি এলিট টিম–ধরুন ফ্রেঞ্চ প্যারাশুট রেজিমেন্ট, ব্রিটেনের এসএএস, ইউএসের নেভি সিল–এরা কন্টিনজেন্সি প্ল্যানে ইরেজার রাখে। ওই জিনিসের কাজ তাদের দলের সবাইকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া। এর ফলে মনে হবে, কখনও ওদিকে যায়নি ওই দল। কোনও দল ব্যবহার করে সায়ানাইড পিল, আবার অন্যরা অন্যকিছু কিন্তু মূল কাজ আত্মহত্যা করা।

তো আপনি বলছিলেন এক্সপ্লোসিভের কথা, বলল নিনা।

বিশেষ বিস্ফোরকের কথা, বলল রানা। বেশির ভাগ সময় ইরেজার হয় ক্লোরিন-বেজড এক্সপ্লোসিভ। বা হাই-টেম্পারেচার লিকুইড ডেটোনেটার। ওগুলোর কাজ হয় সৈনিকের মুখ উড়িয়ে দেয়া, বাষ্প করে দেয়া শরীর, নষ্ট করে ফেলা ইউনিফর্ম ও ডগট্যাগ। মোট কথা, ইরেজারের মূল কাজ শত্রুপক্ষকে বুঝিয়ে দেয়া যে ওখানে কেউ ছিল না।

কবে থেকে এসব শুরু হয়েছে? জানতে চাইল নিনা।

এই তো কিছু দিন ধরে। মন্টানার পাতাল মিসাইল সাইলো স্যাবোটাজ করতে গিয়েছিল একদল জার্মান সৈনিক। তার পর থেকে।

ওরা কী করতে গিয়েছিল?

ব্যালাস্টিক নিউক্লিয়ার মিসাইলগুলো–যেগুলোর অস্তিত্ব তারস্বরে অস্বীকার করছিল আমেরিকা সেগুলো ধ্বংস করতে। যখন বুঝল ধরা পড়তে যাচ্ছে, তিনটা লিকুইড-ক্লোরিন গ্রেনেডের পিন খুলে ফেলল। ওগুলো যখন বিস্ফোরিত হলো, ওদের কিছুই থাকল না। ওখানে কোনও জার্মান সৈনিক যায়নি, দোষও পড়ল না কোনও দেশের উপর।

জার্মান স্যাবোটাজ ইউনিট, মন্ট্যানা, অবিশ্বাস নিয়ে বলল নিনা। আমার যদি কোনও ভুল হয়ে থাকে, তো ধরিয়ে দেবেন–জার্মানরা না এখন আমেরিকার মিত্রপক্ষ?

ফ্রেঞ্চরাও তো আপনাদের বন্ধু রাষ্ট্র, ভুরু নাচাল রানা, ওরা কি দোস্তি করতে এসেছিল? আসলে বেশিরভাগ সময় দেখা যায় শত্রুর চেয়ে মিত্র দেশই বেশি ক্ষতি করে। শুনেছি পেন্টাগন এর নাম দিয়েছে ক্যাসিয়াস অপারেশন্স। জুলিয়াস সিজারের খুনি ক্যাসিয়াসের নামে।

নামও দিয়েছে আবার?

পারকা পরা শেষ, সদর দরজার দিকে রওনা হয়ে গেল রানা, আগে আমেরিকা ছিল দুই মহাপরাশক্তির একটা। তখন দুই সুপারপাওয়ারের ভিতর একটা ভারসাম্য ছিল। একে অপরকে সমঝে চলত। একদল খারাপ কিছু করতে গেলে, অন্যদল সেটা ঠেকাত। কিন্তু, সোভিয়েত ইউনিয়ন শেষ হয়ে গেল, থাকল শুধু আমেরিকা পৃথিবীর সত্যিকারের একমাত্র সুপারপাওয়ার। আপনাদের হাতে আছে অন্য সবার চেয়ে অনেক বেশি অস্ত্র। আপনারা অস্ত্রের জন্য বিপুল অঙ্কের ডলার খরচ করছেন। অন্য কোনও দেশ এভাবে খরচ করলে ফতুর হয়ে যেত। সোভিয়েতরা প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে নিজেদেরকে ফকির, করেছে। এরপর হালুয়া-রুটির আশায় আমেরিকার অনেক বন্ধু রাষ্ট্র জুটে গেছে। কিন্তু তারা জানে, আমেরিকা অনেক বেশি শক্তিশালী, নিষ্ঠুর এবং নৃশংস। একের পর এক দেশে হামলা করছে সে। কাজেই প্রায়সবাই চায় আমেরিকার মস্ত পতন হোক। মহাচিন তো চায়ই, পরম মিত্র ফ্রান্স, জার্মানি, এমন কী গ্রেট ব্রিটেনও চায় আমেরিকাকে হঠিয়ে ক্ষমতার স্বাদ পেতে।

আমি কখনও এসব ভাবিনি, বলল নিনা।

আসলে ভাবার প্রয়োজন পড়েনি আপনার, বলল রানা। আমাকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে এই স্টেশনের বিজ্ঞানীদেরকে ম্যাকমার্জোয় নিরাপদে পৌঁছে দেয়া। ওখান থেকে রওনা হওয়ার আগে ওই স্টেশনের চিফ অনুরোধ করেন, তাঁদের সেনাবাহিনী পৌঁছে যাওয়া পর্যন্ত যেন আমি উইলকক্স আইস স্টেশন পাহারা দিই। আমি তাকে কোনও কথা দিইনি। এটা আমার কর্তব্যও নয়। আমি এখানে যুদ্ধ করতে বা প্রাণ দিতে আসিনি। কিন্তু এখন যদি ফ্রেঞ্চ কমাণ্ডোদের মত করে অন্য দেশের আর্মি হাজির হয়, হয়তো বাধ্য হয়ে লড়তে হবে আমাকে।

সদর দরজার সামনে পৌঁছে গেছে রানা, হাত রাখল হ্যাণ্ডেলের উপর। পাশ ফিরে চাইল। আপনি কী যেন, জানতে চেয়েছিলেন। হাঁটতে হাঁটতে বললে অসুবিধে হবে?

দরজার পাশের হুক থেকে পারকা নিল নিনা, তারপর পরতে শুরু করল। কোনও সমস্যা নেই।

মহিলা গরম কাপড় পরে নিতেই দরজা খুলে বেরিয়ে এল রানা। আসুন।

.

ই-ডেকে ডেপথ গজ ভালভাবে দেখে নিচ্ছে তিশা করিম। হোসেন আরাফাত দবিরও সঙ্গে রয়েছে, ওরা আছে পুল থেকে দূরে প্ল্যাটফর্মের উপর। শেষ কিলার ওয়েইল চলে যাওয়ার পর পৌনে একঘণ্টা পেরিয়ে গেছে। কিন্তু যখন-তখন আবার আসতে পারে। কাজেই ওরা সতর্ক।

ইউনিটের স্কুবা গিয়ারগুলো পরীক্ষা করছে ওরা। ঠিক হয়েছে। ডাইভিং বেল নিয়ে নামবে ডুবুরিরা। আপাতত ই-ডেকে ওরা দুজন ছাড়া কেউ নেই। মাঝে মাঝে বিদায় নিচ্ছে দবির ও তিশা, চলে যাচ্ছে দক্ষিণের টানেলে, গুদাম-ঘরে। ওখানেই রাখা হয়েছে ক্যাপ্টেন নিশাত সুলতানাকে।

হাতের ডেপথ গজ নামিয়ে রাখল তিশা, আরেকটা তুলে নিল। কী সুন্দর কালো চোখ মানুষটার! খুব নিচু স্বরে বলল, কাজ থেকে চোখ তুলল না।

নিজের কাজ বন্ধ করে তিশার দিকে চাইল দবির। ও যখন কোনও কথা বলল না, চোখ তুলল তিশা।

ওর মনে হলো সার্জেন্ট লোকটা লেফটেন্যান্টের ওজন বুঝতে চাইছে। তারপর হঠাৎ করেই অন্য দিকে চোখ সরিয়ে নিল।

শুনেছি আগেও সুন্দর ছিল ওঁর চোখ, কিন্তু পরে আরও সুন্দর হয়েছে, বলল দবির। অনেকেই জানে না কী হয়েছিল।

নীরবতা নেমে এসেছে দুজনের মাঝে। পাকা একমিনিট পর জানতে চাইল তিশা, কী হয়েছিল?

জবাব দিল না দবির, তারপর আস্তে করে মাথা দোলাল।

কী হয়েছিল?

বড় করে শ্বাস ফেলল দবির। হিলিয়াম কমপ্রেসার নামিয়ে রাখল, চাইল তিশার দিকে। উনি ফাইটার বিমানের খুব ভাল পাইলট। অনুচ্চ স্বরে বলতে শুরু করল দবির: মেজর মাসুদ রানা একটা মিশনে গিয়েছিলেন, বসনিয়ায়। তখন সার্বদের সঙ্গে মহা যুদ্ধ চলছিল। চলছে গণ হারে মুসলিম নিধন। এই মিশনে আমাদের কাছে সাহায্য চেয়েছেন যিনি, সেই নুমার চিফ অ্যাডমিরাল জর্জ হ্যামিলটন অনেক আগে ছিলেন মেরিন কর্পসের চিফ। তাকে অনুরোধ করে মেরিন কর্পসের একটা এভি-৮বি হ্যারিয়ার বিমান চেয়ে নেন মেজর রানা। আলাপ করে ঠিক হয়, মেরিনদের সঙ্গে বসনিয়ায় বিপজ্জনক মিশনে যোগ দেবেন তিনি।

এখানে বলে রাখি, ওই হ্যারিয়ার যুদ্ধ বিমানকে এক কথায় অনেকে চেনে জাম্পজেট বলে। ওটা একমাত্র অ্যাটাক বিমান যেটা সরাসরি আকাশে উঠে যেতে পারে। অন্য পাইলটদের সঙ্গে মেজর রানার দায়িত্ব ছিল নো-ফ্লাইং-যোন পাহারা দেয়া। কিন্তু তার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ কাজে মন দিলেন তিনি।

চুপ করে দবিরের দিকে চেয়ে আছে তিশা। লোকটা যেন হারিয়ে গেছে বহু দূরে।

একদিন সার্বিয়ানদের মিসাইল ব্যাটারি তাঁর বিমান ফেলে দিল। অনেক পরে জানা গেছে, সার্বিয়ানদের কাছে আমেরিকার তৈরি স্টিংগার মিসাইল ছিল।

তা যাই হোক, বিমানটাকে স্টিংগার মিসাইল ফেলে দেয়ার আগেই ইজেক্ট করেন মেজর রানা। বিধ্বস্ত হয়েছিল বিমান। উনি নেমে এলেন সার্বদের এলাকায়, চারপাশে ঘন জঙ্গল।

তিশার দিকে চাইল দবির।

মেজর রানা এরপর ঊনিশ দিন লুকিয়ে ছিলেন সার্বদের জঙ্গলে। একা। কোনও অস্ত্র নেই। কয়েক শ সার্বিয়ান সৈনিক গোটা জঙ্গলে খুঁজছে তাকে। তারপর যখন ধরে ফেলল, তখন আট দিন ধরে উনি অভুক্ত।

একটা পোড়ো ফার্মহাউসে নিয়ে গেল তাঁকে। একটা চেয়ারে বসিয়ে বেঁধে রাখল। নিয়মিত অত্যাচার শুরু হলো। পেরেক গাঁথা তক্তা দিয়ে সারাদেহে আঘাত করা হতো। সঙ্গে একের পর এক প্রশ্ন। মাসুদ রানা কেন ওই এলাকার উপর দিয়ে বিমান চালিয়েছে? তার ওটা কি গুপ্তচর বিমান ছিল? সে কি তাদের বর্তমানের অবস্থান জানে? আমেরিকান সেনাবাহিনী সার্ব এলাকায় ঢুকে পড়েছে?

সত্যিই কি সার্বিয়ান এলাকায় ঢুকে পড়ে আমেরিকান সেনাবাহিনী? জানতে চাইল তিশা।

আস্তে করে মাথা নাড়ল দবির। অনেক পরে দুটো সিল টিম গিয়েছিল। কিন্তু তার আগে বাংলাদেশের কয়েকজন ঢুকে পড়ে সার্বিয়ান এলাকায়। শুনেছি বিসিআই নামের একটা বাংলাদেশি সংগঠনের সদস্য তারা। তাদের কারণে স্থানীয় সার্বরা বলতে শুরু করল, গভীর জঙ্গলে ভয়ঙ্কর সব ভূত হাজির হয়েছে। ওরা নিজেরা যদি নিরীহ মুসলিমদের উপর এভাবে গণহত্যা না চালাত, তা হলে হয়তো এভাবে মরতে হতো না তাদেরকেও।

মেজর কি জানতেন বাংলাদেশি সৈনিক বা গুপ্তচররা সার্বদের, এলাকায় ঢুকে পড়েছে? বলল তিশা।

আস্তে করে মাথা দোলাল দবির। হ্যাঁ। অফিশিয়ালি মেজরের কাজ ছিল নো-ফ্লাইং-যোন পাহারা দেয়া। কিন্তু আসলে সার্বদের নেতাদের ফার্মহাউসে হামলা করার জন্য তথ্য জোগাড় করতেন।

পরে সে-তথ্য অনুযায়ী হামলা করত বাংলাদেশি সংগঠনের ইউনিট। তা যাই হোক, মেজর রানার মুখ থেকে একটা কথাও বের করতে পারল না সার্বরা।

মনোযোগ দিয়ে দবিরকে দেখছে তিশা। কী যেন বলবার আগে একটু ইতস্তত করছে সার্জেন্ট।

যাই হোক, সার্বরা ধরে নিল অদ্ভুত যে দল হামলা করছে, তাদের সঙ্গে মেজর রানার যোগাযোগ আছে। সার্বদের স্ট্র্যাটেজিক টার্গেটগুলো একের পর এক বিধ্বস্ত হচ্ছিল। এটা সম্ভব শুধু আকাশ থেকে কো-অর্ডিনেটস জানিয়ে দিলে। সারা ঠিক করল, এই লোককে চরম শাস্তি দিতে হবে। তারা মেজর রানার চোখ দুটো উপড়ে নিল।

কী করল? চমকে গেছে তিশা।

ছয়জন মিলে মেঝের উপর ফেলে গেঁথে রাখল মেজরকে, আরেকজন সার্ব খুব ধীরে কেটে বের করে নিল ওঁর দুই চোখ। কাজটা করার সময় লোকটা বাইবেল থেকে উদ্ধৃতি দিল: তোমার হাত যদি পাপ করে, ওটা কেটে ফেলো! যদি পাপ করে চোখ, উপড়ে ফেলো!

অসুস্থ বোধ করছে তিশা। অন্তরের গভীরে বুঝতে পারছে, অসহায় অন্ধ মাসুদ রানার কেমন লেগেছিল। তারপর কী করল তারা? জানতে চাইল।

কোটর থেকে বেরিয়ে রগের শেষে ঝুলতে থাকল দুটো চোখ। এরপর একটা কাবার্ডের ভিতর আটকে রাখল ওঁকে। দুই চোখ থেকে দরদর করে পড়ছে রক্ত।

তারপর? ঢোক গিলল তিশা। মেজর বেরুলেন কীভাবে?

উনি যে সংগঠনের সঙ্গে জড়িত, শুনেছি সেটার চিফ কয়েকজন লোক পাঠিয়ে দিয়েছিলেন আগেই। জুনের এক তারিখে মেজরকে খুঁজে পেল তারা। আমেরিকান বেসে আগেই অপেক্ষা করছিল একটা চার্টার বিমান। ওটাতে তুলে গোপনে লণ্ডনে নিয়ে যাওয়া হলো তাকে। কুইন এলিজাবেথ হসপিটালে ভর্তি করা হলো। কোনও পত্রিকার সাংবাদিক বা টিভি রিপোর্টার কিছুই জানল না।

মেজরকে উদ্ধার করতে গিয়ে ফার্মহাউসে প্রচণ্ড লড়াই হয় সার্বদের সঙ্গে বাংলাদেশি ওই দলের। পশুগুলোকে শেষ করে আমাদের দেশের যুবকরা, কিন্তু তাদেরও দুজন গুরুতর আহত হয়। এরা যখন লণ্ডনে হাসপাতালে ভর্তি হলো, তখনও মেজর রানার চোখ থেকে টপটপ করে রক্ত বেরুচ্ছে।

তারপর কী হলো? চোখ বড় বড় করে দবিরের দিকে চেয়ে আছে তিশা।

বাংলাদেশ সরকার-প্রধান কৈফিয়ত চাইলেন মেজরের সংগঠনের চিফের কাছে। তাদের লোক সার্বিয়ায় থাকবার কথা নয়। জবাবে উনি শুধু জানিয়ে দেন, আপনারা চাইলে আমি পদত্যাগ করতে পারি। শেষপর্যন্ত পিছিয়ে যান সরকার-প্রধান। উনি অন্যান্য সংগঠন থেকে জানতে পারেন, ওই ভদ্রলোককে সরিয়ে দিলে তাঁর হাতে তৈরি সোনার টুকরো ছেলেরা সব কজন তার সাথেই পদত্যাগ করবে।

আর মেজর রানার কী হলো?

অন্ধ হয়ে গেলেন মেজর। চোখ যদি কাজই না করে, দেখবেন কী করে? বিরতি নিল দবির। একটু পর বলল, কিন্তু তাঁর চিফ মেজর জেনারেল (অব.) রাহাত খান আর মেরিন কর্পসের প্রাক্তন চিফ, বর্তমানের নুমা চিফ অ্যাডমিরাল জর্জ হ্যামিলটন ম্যারিল্যাণ্ডের জন্স হপকিন্স ইউনিভার্সিটি হাসপাতালে নিয়ে গেলেন মেজরকে। ওখানেই আছেন দুনিয়ার সবচেয়ে দক্ষ চোখের সার্জারি ইউনিট।

তারপর?

চোখ ঠিক করল তারা। …আর কিছু জানি না, জানবই বা কী করে, আমি তো চিকিৎসার কিছুই বুঝি না। তবে মেজরের চোখ দুটো আরও সুন্দর হয়ে উঠল। কী করে যেন রেটিনা নষ্ট হয়নি তাঁর। ডাক্তাররা বললেন, যা ক্ষতি হয়েছে সেটা চোখের বাইরের দিকে। আসল অংশ ঠিক ছিল। সামান্য বিরতি নিয়ে দবির বলল, আমরা আবার মার্ভেলে ফিরলে মেজর রানার বন্ধু ব্রিগেডিয়ার সোহেল আহমেদের কাছে জিজ্ঞেস করতে পারেন। তিনি আমার চেয়ে অনেক ভাল ভাবে বুঝিয়ে বলতে পারবেন।

আস্তে করে মাথা দোলাল তিশা। বুঝতে পারছে, কেন হোসেন আরাফাত দবির মাসুদ রানাকে এত ভক্তি করে। কেন কোনও কথা বললেই সেটা পালন করতে ব্যস্ত হয়ে ওঠে। আসলে মানুষটাকে পুরো বিশ্বাস করে সে। মাসুদ রানা বললে বোধহয় নরকে যেতেও রাজি হবে এই লোক।

আমারও তো একই অবস্থা, মনে মনে বলল তিশা। শ্রদ্ধা করে ও মাসুদ রানাকে। মানুষটা সত্যিকারের নেতা। নিজের জন্য কিছুই চান না উনি। কাজ করেন দলের সবার ভালর জন্যে।

আপনি ওঁকে খুব পছন্দ করেন, তাই না? চাপা স্বরে জানতে চাইল দবির।

আমি ওঁকে বিশ্বাস করি।

নীরবতা নেমে এসেছে দুজনের মাঝে।

দীর্ঘশ্বাস ফেলল তিশা। আমার বয়স কম হয়নি, দবির।

চুপ করে আছে সার্জেন্ট।

আপনি কি জানেন, একবার আমার বিয়ে হয়েছিল?

না, লেফটেন্যান্ট জানতাম না।

উনিশ বছর বয়সে প্রেম করে বিয়ে করি। সে ছিল দুনিয়ার সেরা মিষ্টি মানুষ। সরকারী এক স্কুলের টিচার ছিল। আর আমি তখন অনার্সে পড়ছি। কী সুন্দর করেই না ইংরেজি কবিতা বলত। কী ভদ্র, শান্ত, হাসিখুশি! উনিশ পেরুনোর আগেই প্রেগনেন্ট হলাম।

চুপ করে ওর দিকে চেয়ে আছে দবির।

তারপর একদিন, ছলছল করে উঠল তিশার চোখ। তখন আমার পেটে বাচ্চাটা আড়াই মাসের। সেদিন কলেজ থেকে আগেই চলে এসেছি। বাড়িতে ফিরেই দেখলাম সোফার উপর। শুয়ে সতেরো বছরের এক ছাত্রীর সঙ্গে… সেই মেয়ে এসেছিল ইংরেজি পড়তে।

মুখ কুঁচকে অন্য দিকে চাইল দবির।..

এরপর তিন সপ্তাহ পর মিসক্যারেজ হয়ে গেল। জানি না কেন হলো। মনের চাপ, রাগ, ঘৃণা জানি না কেন। এরপর থেকে সব পুরুষকে ঘৃণা করতে লাগলাম। পশুটাকে তালাক দিয়ে যোগ দিলাম বাংলাদেশ আর্মিতে। ঘৃণা হয়তো মানুষকে ভাল যোদ্ধা করে। অন্তর থেকে প্রতিটা গুলি করি, যেন শত্রুর মগজ বা বুকে বেঁধে। এরপর থেকে কখনও কাউকে বিশ্বাস করিনি। …তারপর ট্ৰেইনিঙ এসে দেখা হলো মেজর মাসুদ রানার সঙ্গে।

বহু দূরে চেয়ে আছে তিশা করিম। চোখ থেকে টপটপ করে পড়ছে অশ্রু। আমি খেয়াল করতে শুরু করলাম ওঁকে। জাহাজের সবাই কত কথা বলে, কিন্তু মনে হলো ওই মানুষটা যেন অনেক একা। এতই একা, যেন নীরবে চলে গেছে বহু দূরের কোনও নিঝুম দ্বীপে। আমি জানি না আমার কী হলো, নতুন করে বিশ্বাস ফিরল মনে। অন্তরটা বলল, এই মানুষটা কখনও তোকে ঠকাবে না।

সার্জেন্ট, আমার অন্তর বলল, সর্বক্ষণ কী যেন খুঁজছে তার মন। সে যদি হয় কোনও মেয়ে… আমি যদি হতাম সেই মেয়ে, আমি প্রতিদিন ফুলের মালা গেঁথে ওর পায়ে নামিয়ে রাখতাম। ..আসলে ওর ভিতর কী যেন আছে। আগে কোনও পুরুষের ভিতর এমন কিছু দেখিনি।

কিছুই বলছে না দবির, শুধু চেয়ে আছে তিশার দিকে।

তিশা বুঝতে পেরেছে লোকটা অবাক হয়ে ওকে দেখছে, চট করে চোখ মুছে ফেলল ও। .

দুঃখিত, আসলে আপনাকে এসব বলতে চাইনি। কাকেই বা বলব? কেন বলব?

আপনি মেজর রানাকে বলতে পারেন আপনার মনের কথা, খুব নরম স্বরে বলল দবির।

হ্যাঁ, তাই বলি আর কী, কান্নার মত শোনাল তিশার হাসি। সহকারীরা পিছনে হাসতে শুরু করবে। এমনিতেই কোনও মেয়ে আর্মির ফ্রন্ট লাইন ইউনিটে যোগ দিলে সবাই হাসে। দবির, তার চেয়ে অনেক ভাল, যতদিন পারি আমি ওর কাছাকাছি থাকব, কখনও ওকে ছুঁয়েও দেখতে চাইব না। এটা অনেক দূরে চলে যাওয়ার চেয়ে তো ভাল?

বড় করে শ্বাস ফেলল, সার্জেন্ট দবির। মনে মনে মেয়েটির প্রশংসা না করে পারছে না। আপনি ঠিকই বলেছেন, একটু পর বলল।

আপনি বুঝেছেন, সেজন্য ধন্যবাদ, হঠাৎ আরও বিমর্ষ হয়ে উঠল তিশার মুখ। সার্জেন্টের চোখে চোখ রাখল। আর মাত্র একটা প্রশ্ন।

সেটা কী, আপা?

মাথা কাত করল তিশা। আপনি বললেন ব্রিগেডিয়ার সোহেল আহমেদ সবই জানেন। আপনি তাঁর কাছ থেকে এসব শুনেছেন তা মনে করি না। বসনিয়ার সব ঘটনা কোথা থেকে জানলেন?

মৃদু হাসল হোসেন আরাফাত দবির। কয়েক মুহূর্ত পর নিচু গলায় বলল, আমি ওই উদ্ধার টিমে ছিলাম।

.

যে-কোনও ধরনের প্যালিয়োন্টোলজি মানেই ধৈর্যের খেলা, বলল নিনা ভিসার, তুষারের মাঝে হাঁটছে রানার পাশে। কিন্তু এখন নতুন টেকনোলজি এসেছে, আপনি চাইলে কমপিউটারকে কাজে লাগাতে পারেন। হয়তো কোনও কাজে চলে গেলেন, ফিরে এসে দেখলেন দারুণ কিছু আবিষ্কার করে বসেছে কমপিউটার।

যে নতুন টেকনোলজির কথা বলছে নিনা, আসলে তা অতি দীর্ঘ সনিক তরঙ্গের স্পন্দন। উইলকক্স আইস স্টেশনের প্যালিয়োন্টোলজিস্টরা ওটার কারণেই বরফের তলায় খুঁজে পান ফসিল হওয়া হাড়। এখন আর বরফ খুঁড়ে বের করতে হয় না, ফলে ক্ষতিও হয় না ফসিলের।

সেক্ষেত্রে পরের ফসিল পাওয়া পর্যন্ত কী করেন আপনারা? জানতে চাইল রানা।

মেজর, আপনি হয়তো জানেন না, আমি সাধারণ কোনও প্যালিয়োন্টোলজিস্ট নই, ভুরু কুঁচকে আবার মৃদু হেসে ফেলল নিনা। প্যালিয়োন্টোলজিস্ট হওয়ার আগে মেরিন বায়োলজিস্ট ছিলাম। আর এসব ঘটার আগে স্টেশনের কর্তা জন প্রাইসের সঙ্গে ছিলাম বায়ো ল্যাবে, বি-ডেকে। উনি, এনহাইড্রিনা সিসেস্টোসা থেকে নতুন অ্যান্টিভেনম তৈরি করছিলেন।

মৃদু মাথা দোলাল রানা। সাগরের সাপ।

অবাক হয়ে রানাকে দেখল নিনা। আপনি তো অনেক কিছু জানেন, মেজর!

এখানে আসার আগে আমিও আলাদা পেশায় ছিলাম; মৃদু হাসল রানা।

স্টেশনের সীমানার কাছে চলে এসেছে ওরা। একটু দূরে সার্জেন্ট জনি ওয়াকার, দাঁড়িয়ে আছে মেরিনদের একটি হোভারক্রাফটের পাশে। স্টেশনের দিক থেকে বাইরের দিকে তাক করা হয়েছে হোভারক্রাফট।

চারপাশ প্রায় অন্ধকার। টানা বইছে তুমুল তুষার-ঝড়। বহু, দূরে চাইলে শুধু মাইলের পর মাইল বরফ-মোড়া জমি। দিগন্তে গাঢ় কমলা প্রভা। ওয়াকারের পিছনে হোভারক্রাফটের ছাতে নীরবে ঘুরছে রেঞ্জফাইণ্ডার। দেখলে মনে হয় রিভলভিং টারেট থেকে তাক করেছে বিশাল কামানের নাক। ধীরে ধীরে পুরো এক শ আশি ডিগ্রি ঘুরছে। আধ মিনিট পর পর একপাশ থেকে শুরু করে আরেক পাশে গিয়ে থামছে, তারপর আবার ফিরছে।

আপনার কথা মত সেট করেছি, রানার সামনে থামল ওয়াকার। অন্য এলসিএসি দক্ষিণ-পূর্ব কোণে। মেরিনদের হোভারক্রাফটের নাম এলসিএসি। অর্থাৎ, ল্যাণ্ডিং ক্রাফট-এয়ার কুশও।

গুড, বলল রানা।

যেভাবে উইলকক্স স্টেশনের বাইরের দিকে চেয়ে আছে হোভারক্রাফটের রেঞ্জফাইণ্ডার, সামনের বিস্তৃত এলাকা পাহারা দিতে পারবে। ওই দুই রেফাইণ্ডার কমপক্ষে পঞ্চাশ মাইল কাভার করবে। ওদের দিকে কেউ এলে অনেক আগেই জানবে ওরা।

আপনার সঙ্গের পোর্টেবল স্ক্রিন? ওয়াকারের কাছে জানতে চাইল রানা।

এই যে, পোর্টেবল ভিউনি বাড়িয়ে দিল ওয়াকার। পর্দায় দেখা গেল তথ্য পাঠিয়ে চলেছে দুই রেঞ্জফাইণ্ডার।

পোর্টেবল স্ক্রিন খুদে টেলিভিশনের মত, বামদিকে একটা হাতল। পর্দায় দুটো সরু সবুজ রেখা খুব ধীরে সরছে। ঠিক যেন গাড়ির উইণ্ডস্ক্রিনের ওয়াইপার। রেঞ্জফাইণ্ডার সামনে কিছু পেলে এই স্ক্রিনে জ্বলে উঠবে দপদপে লাল বিন্দু। সঙ্গে নীচে ফুটে উঠবে ভাইটাল স্ট্যাটিস্টিক্স।

বেশ চলুন, এবার দেখা যাক স্টেশনের নীচে গুহার ভিতরে কী, বলল রানা।

পাঁচ মিনিট পেরুবার আগেই প্রধান দালানের কাছে ফিরে এল ওরা। ঝরঝর করে কালো আকাশ থেকে পড়ছে সাদা তুষার, তার ভিতর দিয়ে দ্রুত হাঁটছে। রানা জানাল, কীভাবে পাতাল-গুহার ভিতর নামবে ওরা।

প্রথমে নিশ্চিত হতে হবে ওখানে স্পেসশিপ আছে কি না। সত্যিই ওই ধরনের কিছু আছে, এর কোনও প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি। শুধু জানা গেছে, উইলকক্স আইস স্টেশনের এক বিজ্ঞানী জানিয়েছে, গুহার ভিতর স্পেসশিপ দেখেছে। এবং সে-লোক সম্ভবত মারা গেছে। কেউ জানে না সে কী দেখেছে। ঠিক তখনই তার উপর হামলা হয়। জানা যায়নি শত্রু কারা। এটা জানাও খুব জরুরি।

ছোট কোনও দলকে পাতাল-গুহায় পাঠাবার আরেকটা তৃতীয় কারণ আছে রানার। অবশ্য, নিনা বা ওয়াকার তা জানে না।

নতুন করে কোনও কমাণ্ডো দলের হামলা হলে, এবং ওরা নিজেরা পরাজিত হলে, তবুওঁ পাতাল-গুহার ভিতর নিজেদের লোক থাকলে তারা পাল্টা হামলা করতে পারবে।

এই গুহার ভিতর ঢুকতে হলে যেতে হবে পানির নীচের এক সুড়ঙ্গ দিয়ে। কিন্তু কভার্ট ইনকাশানারি ফোর্স কখনোই পানির নীচ দিয়ে হামলা করতে চায় না। এর বড় কারণ: কেউ জানে না ভেসে উঠবার পর তাদের জন্য কী অপেক্ষা করছে। এখন, আগেই যদি রানার কোনও ছছাট দল ঢুকে পড়ে ওই গুহার ভিতর, শত্রুরা ভেসে উঠতেই অনায়াসে তাদেরকে শেষ করতে পারবে ওরা।

রানা, জনি ওয়াকার ও নিনা পৌঁছে গেছে স্টেশনের মেইন এন্ট্রান্সে। র‍্যাম্প বেয়ে নেমে ঢুকে পড়ল সুড়ঙ্গের ভিতর। পিছনে বন্ধ করে দেয়া হলো দরজা। দুমিনিট পেরুর আগেই এডেকের ক্যাটওয়াকে বেরিয়ে এল ওরা। ওখানে অন্য দুজনের কাছ থেকে বিদায় নিল রানা, দ্রুত চলেছে ডাইনিংরুম লক্ষ্য করে।

এতক্ষণে ফিরবার কথা নাজমুলের, সঙ্গে থাকবে ফ্যেনুয়্যা। লোকটা বলতে পারবে এখন কী অবস্থায় আছে হাক্সলে।

ডাইনিংরুমের দরজা পেরিয়ে ঢুকে পড়ল রানা, একটু দূরে দেখল নাজমুল ও ফ্যেনুয়্যাকে। তারা দাঁড়িয়ে আছে একটা টেবিলের পাশে। ওখানে চিত হয়ে পড়ে আছে কেভিন হাক্সলে।

রানা ভিতরে ঢুকতেই চট করে ওর দিকে চেয়েছে নাজমুল ও ফ্যেনুয়্যা, বিস্ফারিত হয়ে গেছে চোখ। কেন যেন রানার মনে হলো, হাতে-নাতে ধরা পড়েছে দুই চোর।

অস্বস্তিকর কয়েকটা মুহূর্ত পেরুল, তারপর বলে উঠল নাজমুল, স্যর, হাক্সলে মারা গেছে।

ভুরু কুঁচকে গেল রানার। জানত, কেভিন হাক্সলে গুরুতর আহত, যে-কোনও সময়ে মরতে পারে, কিন্তু নাজমুল যেভাবে বলল…।

এক পা সামনে বাড়ল নাজমুল, গম্ভীর গলায় বলল, স্যর, আমরা যখন ফিরলাম, তার আগেই মরেছে। ডাক্তার বলছে জখমের কারণে নয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *