১.১৬ ইউনাইটেড স্টেটস অভ আমেরিকা

ইউনাইটেড স্টেটস অভ আমেরিকা।

নিউ মেক্সিকো।

রুক্ষ মরুভূমির বুক চিরে এঁকেবেঁকে গেছে সুদীর্ঘ এক হাইওয়ে। চারপাশে সোনালী-বাদামি বালির বিস্তৃতি। তারই মাঝে কালো একটি স্তর। নীচে এই কালো মাটি-পাথর, মাথার উপর মেঘহীন সুনীল আকাশ। দুপুর। দাউদাউ আগুন ঢালছে সূর্য।

মরুভূমির হাইওয়েতে তীর বেগে ছুটছে একটিমাত্র গাড়ি। দরদর করে ঘামছে চালক অ্যাডোনিস ক্যাসেডিন। তার ভাড়া নেয়া ঊনিশ শ আশি সালের টয়োটা গাড়ির এসি বহু আগেই মহাপ্রয়াণে গেছেন। এখন গাড়ির ভিতরের অংশ হয়ে উঠেছে উত্তপ্ত আভেন। অ্যাডোনিসের ধারণা: বাইরের চেয়ে কমপক্ষে দশ ডিগ্রি বেশি গরম ভিতরে।

দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের রিপোর্টার অ্যাডোনিস ক্যাসেডিন এই পত্রিকার সঙ্গে রয়েছে বিগত তিনবছর। আগে ইনভেস্টিগেটিভ রিপোর্টিং জার্নাল গ্র্যাণ্ডমাদার মিশেল-এ ফিচার লিখত। তখনই নাম ফাটতে শুরু করে। আসতে শুরু করে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা।

গ্র্যাণ্ডৰ্মাদার মিশেল পত্রিকার সঙ্গে বেশ খাপ খাইয়ে নিয়েছিল ক্যাসেডিন। ওই পত্রিকার মূল উদ্দেশ্য: সরকারের ভুল বক্তব্য বা রিপোর্ট সাধারণ মানুষের চোখের সামনে তুলে ধরা। জটিল সব বিষয়কে খুব সহজভাবে লেখা হয় পত্রিকাটিতে। খুশি মনেই কাজ করছিল অ্যাডোনিস, ওর একটা আর্টিকেল উঁচু পর্যায়ের দুটো পুরস্কার পেল। সে আর্টিকালে তুলে ধরেছিল, কীভাবে আটলান্টিক, মহাসাগরে হারিয়ে গেছে ক্র্যাশ করা বি-২ স্টেলথ বম্বারের পাঁচটি নিউক্লিয়ার বোমা। ওই বিমান পড়ে ব্রাজিলের উপকূলে। আমেরিকান সরকার প্রেস রিলিজে বলেপ্রতিটা ওয়ারহেড খুঁজে বের করে নিরাপদে সরিয়ে আনা হয়েছে।।

এরপর তদন্ত শুরু করল ক্যাসেডিন, বের করে আনল আসল সত্য কীভাবে ওসব বোমা খোঁজা হয়েছে।

কয়েক দিনের ভিতর উন্মোচিত হলো কঠিন সত্য। আসলে রেসকিউ মিশনে জোর দিয়ে খোঁজাই হয়নি ওয়ারহেড। অফিশিয়ালদের ওপর নির্দেশ ছিল, বম্বারের সব প্রমাণ নষ্ট করে। ফেলতে হবে। এরপর সম্ভব হলে খুঁজতে হবে ওয়ারহেড। জানা–গেল, আদতে ওই ওয়ারহেডগুলো খুঁজেই পাওয়া যায়নি।

পুরস্কারপ্রাপ্ত ওই আর্টিকেল প্রকাশের পর বিপুল সাড়া পড়ে যাওয়ায় ক্যাসেডিনকে প্রথমবারের মত চিনলেন দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের সম্পাদক। উনি ওকে চাকরি দিতে চাইলেন। এরপর দেরি করেনি ক্যাসেডিন, এ্যাণ্ডমাদার মিশেল পত্রিকাটির অনুমতি নিয়েই যোগ দিয়েছে দ্য ওয়াশিংটন পোস্টে।

অ্যাডোনিস ক্যাসেডিনের বয়স তিরিশ, লম্বা লোক সে, উচ্চতা ঝাড়া সাড়ে ছয় ফুট। বালির মত বাদামি রঙের চুল, এলোমেলো। চোখে ওয়ায়ার-ফ্রেম চশমা। এখন তার ভাড়া নেয়া গাড়ির মেঝে দেখলে মনে হবে, ওখানে বোমা পড়েছে। ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে খালি কোকের ক্যান, মুচড়ে যাওয়া চিযবার্গারের র্যাপার। প্রতিটি কম্পার্টমেন্টে গুজে রাখা হয়েছে প্যাড ও কলম। অ্যাশট্রের ভিতর হেঁড়া খাম।

মরুভূমির মাঝ দিয়ে চলেছে অ্যাডোনিস ক্যাসেডিন।

বেজে উঠল তার সেলুলার ফোন। কল করেছে ক্যাসেডিনের স্ত্রী সান্থা।

ওয়াশিংটনের সাংবাদিক সমাজে বেশ জনপ্রিয় এই আন্তরিক দম্পতি। দুজনই দ্য ওয়াশিংটন পোস্টে চাকরি করে। ওদের কাছে কেউ সাহায্য চাইলে তাকে খালি হাতে ফিরতে হয় না। তিনবছর আগে ক্যাসেডিন গ্র্যাণ্ডমাদার মিশেল ছেড়ে পোস্টে চাকরি নেয়ার পর ওকে তরুণী এক রিপোর্টার সান্থা জোন্সের সঙ্গে কাজ করতে বলা হয়। এর মাত্র এক সপ্তাহের ভিতর ওদের দুজনের মনের মধ্যে কী যেন হয়ে গেল। তার দুই সপ্তাহ পর ওরা বিয়ে করল। প্রায় তিনবছর হলো ওরা আনন্দে আছে। অবশ্য, এখনও ওদের সন্তান আসেনি। একই বিষয়ের উপর কাজ করে ওরা।

পৌঁছে গেছ? স্পিকার ফোনে বলল সান্থা। ওর বয়স মাত্র। পঁচিশ, কাঁধে . লুটিয়ে পড়েছে লালচে-বাদামি চুল, বড় বড় চোখদুটো আকাশের মতই নীল, হাসলে ঝলমল করে ওঠে মুখ। খুব সুন্দরী নয় ও, কিন্তু ওই হাসি দেখলে তৃতীয়বার ফিরে চাইতে হয়। আপাতত সান্থা আছে ওয়াশিংটন ডি.সি.তে, জরুরি কিছু কাগজপত্র খুঁজছে।

প্রায় চলে এলাম, জবাব দিল অ্যাডোনিস।

নিউ মেক্সিকোর মরুভূমির মাঝে একটা অভযারভেটরির দিকে চলেছে। আজ (SETI) সেটি ইন্সটিটিউটের এক টেকনিশিয়ান ফোন করেছে পত্রিকা অফিসে, জানিয়েছে, পুরনো এক স্পাই স্যাটালাইট নেটওয়ার্কে বেশ কিছু জরুরী কথা শুনতে পেয়েছে। তদন্ত করতে পাঠানো হয়েছে অ্যাডোনিস ক্যাসেডিনকে।

প্রায়ই এমন হয়, সার্চ ফর এক্সট্রাটেরেস্ট্রিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইন্সটিটিউট বা সেটি নানা শব্দ খুঁজে পায়। তাদের রেডিয়ো স্যাটালাইট অ্যারে খুবই শক্তিশালী ও অস্বাভাবিক সেনসিটিভ। সেটির টেকটিশিয়ানরা এক্সট্রাটেরেস্ট্রিয়াল ইন্টেলিজেন্স ট্রান্সমিশন খুঁজতে গিয়ে কখনও মিলিটারি ট্র্যান্সমিশনও শুনতে পায়। নানা দিকে ছড়িয়ে থাকা গুপ্তচর স্যাটালাইটের টুকটাক আওয়াজ বা শব্দ ধরে ফেলা খুব অস্বাভাবিক নয়।

ওগুলো দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের কলামে লেখা হয়: সেটি সাইটিং শিরোনামে। বেশিরভাগ সময় দেখা যায়, ওগুলো সাধারণ, গুরুত্বহীন সব শব্দ, কোনও আগামাথা নেই। আসলে ধরে নেয়া হয়েছে: সত্যিই একদিন এসব ফালতু শব্দের মধ্যেই মিলবে ভাল কোনও কাহিনি। হয়তো সেদিন ওই কাহিনি লেখা হলে মিলে যেতে পারে পুলিত্যার!

ইন্সটিটিউটে তোমার কাজ শেষে আমার সঙ্গে যোগাযোগ কোরো, বলল সান্থা। সৈক্সি ভঙ্গিতে এবার বলল, আমার কাছে একটা জিনিস আছে, ওটা সেটি সাইটিঙের চেয়ে খারাপ হবে না।

মুচকি হাসল অ্যাডোনিস। লোভ লাগিয়ে দিচ্ছ?

হুঁ।

কাজ শেষে সোজা বাড়ি ফিরছি, বলল অ্যাডোনিস।

আমি অপেক্ষায় থাকলাম। ওপাশে ফোন রেখে দিল সান্থা।

একঘণ্টা পর সেটি ইন্সটিটিউটের ধুলো ভরা পার্কিং লটে গাড়ি রাখল অ্যাডোনিস। লটে আরও তিনটে গাড়ি দেখল। লাফ দিয়ে, গাড়ি থেকে বেরিয়ে দরজায় তালা না মেরেই রওনা হয়ে গেল। দোতলা বাড়িটার দিকে। তিন শ ফুট উঁচু রেডিয়ো টেলিস্কোপের নীচে ছায়ার ভিতর বাড়িটা। চারপাশের মরুভূমিতে আরও সাতাশটা রেডিয়ো টেলিস্কোপ, দেখলে মনে হয় বিশাল সব স্যাটালাইট ডিশ।

বাড়ির ভিতর ঢুকতেই ছোটখাটো এক লোকের সঙ্গে দেখা হলো অ্যাডোনিসের। লোকটার পরনে সাদা ল্যাব কোট, নিজের নাম বলল বার্নি ওলসন। জানাল, ওই সিগনাল ধরেছে সে-ই।

বেশ কয়েক ধাপ নেমে অ্যাডোনিসকে একটা পাতাল-ঘরে নিয়ে এল সে। নীরবে লোকটার পিছনে চলেছে অ্যাডোনিস। চারপাশের দেয়ালে একের পর এক ইলেকট্রনিক রেডিয়ো ইকুইপমেন্ট।

হাঁটতে হাঁটতে বলল ওলসন, দুপুর আড়াইটার সময় শুনতে পেলাম। বুঝতে দেরি হলো না, ইংলিশ বলছে। তখনই বুঝলাম, এরা এলিয়েন হতে পারে না।

ভাগ্যিস বুঝেছেন, চেহারা ভীষণ গম্ভীর রাখল অ্যাডোনিস।

উচ্চারণ থেকে বুঝলাম, এরা আমেরিকান। তখনই পেন্টাগনে যোগাযোগ করলাম। হাঁটতে হাঁটতে অ্যাডোনিসের দিকে চাইল সে। ওখানে আমাদের একটা ডিরেক্ট লাইন আছে।

মনে হলো এজন্যে খুব গর্বিত সে। যেন নীরবে বুঝিয়ে দিল: সরকার মনে করে আমাদের কাজ খুব গুরুত্বপূর্ণ।

অ্যাডোনিস আন্দাজ করল, ওলসন যোগাযোগ করেছে কোনও রিসেপশনিস্টের দপ্তরে। ডিপার্টমেন্ট অভ ডিফেন্সের ফোন-বুকে যে-কেউ পাবে ওই নম্বর। অ্যাডোনিসের মোবাইল ফোনের স্পিডডায়ালেও ওই নম্বর আছে। 

তা যাই হোক, তারা যখন বলল, ওই ট্র্যান্সমিশন ওদের না, তখন ভাবলাম, খবরের কাগজের সঙ্গে যোগাযোগ করা যেতে পারে, বলল ওলসন।

খবরটা দিয়েছেন বলে অনেক ধন্যবাদ, বলল অ্যাডোনিস।

প্রকাণ্ড ঘরের কোণে একটা কন্সেলের সামনে পৌঁছে গেছে ওরা। ডেস্কের উপর দুটো স্ক্রিন, নীচে একটা কি-বোর্ড। স্ক্রিনের পাশে ব্রডকাস্ট কোয়ালিটি রিল-টু-রিল রেকর্ডিং মেশিন।

শুনতে চান ওই বার্তা? বলল ওলসন, রিল-টু-রিল রেকর্ডিং মেশিনের প্লে বাটনে বুড়ো আঙুল রেখেছে।

নিশ্চয়ই।

সুইচ টিপে দিল ওলসন, ঘুরতে শুরু করল রিল।

প্রথমে কিছুই শুনল না অ্যাডোনিস, চলছে শুধু স্ট্যাটিক। দুই মিনিট পর ওলসনের দিকে চাইল। গাধাটা ভুল রিল চালু করল?

আসবে আসবে, ধৈর্য ধরুন, বলল ওলসন।

আরও কিছুক্ষণ স্ট্যাটিক হওয়ার পর হঠাৎ শুরু হলো কথা:

…কপি, ওয়ান-টু-ফাইভ-সিক্স-ওয়ান-সিক্স…।

…আয়োনোস্ফেরিক সমস্যায় যোগাযোগ হারিয়ে…

…সামনের দল…

…মাসুদ রানা…।

…মাইনাস সিক্সটি-সিক্স পয়েন্ট ফাইভ…

…সোলার ফ্লেয়ার বারোটা বাজাচ্ছে রেডিয়োর…

..ওয়ান-ফিফটিন, টোয়েন্টি মিনিটস্, টুয়েলভ সেকেণ্ড ইস্ট;

…কী করে…কড়কড় করছে।…চলে যাও, যাতে…

..রওনা হয়েছে দ্বিতীয় টিম…

বিরক্তির চোটে চোখ বুজে ফেলল অ্যাডোনিস ক্যাসেডিন। খামোকা ওকে ডেকেছে গাধাটা। মিলিটারিদের অসম্পূর্ণ কিছু বার্তা দিয়ে ও কী করবে?

বার্তা থেমে গেছে। চোখ খুলল অ্যাডোনিস, দেখল ওর মুখের দিকে আগ্রহ নিয়ে চেয়ে আছে লোকটা। আশা করছে, তার আবিষ্কার থেকে দারুণ কিছু বেরিয়ে আসবে। লোকটা আছে মরা মরুভূমির ভিতর, মানুষ হিসাবে আসলে তেমন কেউ নয়। এমন অনেক মানুষ আছে, এদের কারও কোনও দাম নেই। সে বোধহয় আশা করছে, দ্য ওয়াশিংটন পোস্টে তার নাম ছাপা হবে। মানুষটার জন্য খারাপই লাগল অ্যাডোনিসের। আস্তে করে শ্বাস ফেলল সে। অনিচ্ছাসত্ত্বেও শার্ট পকেট থেকে কাগজ-কলম বের করল।

আরেকবার শোনাতে পারেন রিলটা?

প্রায় ঝাপিয়ে পড়ে রিওয়াইণ্ড বাটন টিপল ওলসন। একটু পর। রিল প্লে করল।

চুপচাপ নোট নিতে শুরু করল অ্যাডোনিস।

.

রানা ভাবছে, কপাল খুবই মন্দ জ্যাকুস ফিউভিলের। নিজেদের আনা বোমার আঘাতে মরেছে লোকটা। ফ্রেঞ্চরা ওই বোমা পেয়েছিল ইউনাইটেড স্টেটস্ থেকেই। দু দেশের গভীর বন্ধুত্বের প্রমাণ হিসাবে ন্যাটো থেকে ফ্রান্সকে দেয়া হয় ওই মাইন।

এম১৮এ১ মাইনকে সাধারণত দুনিয়াজুড়ে বলা হয় ক্রেমোর। ফুলে থাকা পোর্সেলিন বাসনের ভিতর থাকে এক শর বেশি বলবেয়ারিং। সঙ্গে থাকে ছয় শ গ্রাম সি-৪ এক্সপ্লোসিভ। ক্লোের আসলে ডিটেকটেবল ফ্র্যাগমেন্টেশন গ্রেনেড,। যতই বিস্ফোরণ হোক, এটার পিছনে থাকলে কোনও ভয় নেই। কিন্তু সামনে থাকলে… কয়েক শ টুকরো টুকবে শরীরে।

ক্লেমোরের বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, মাইনের সামনের দিকে লেখা থাকে: এদিকটা শত্রুর দিকে দিন।

ফ্রেঞ্চ ভাষায় লেখা ছিল: BRAQUEZ CE CÖTE SUR LENNEMI. অর্থাৎ ব্যাখায়েখ সে কোতে সুখ লেনেমি।

ইংরেজিতে ওই কথা দেখলে বুঝে নিতে হবে, আপনি আছেন ক্লেমোর মাইনের ভীষণ খারাপ দিকে।

শেষ কৌশল হিসাবে ড্রিলিং রুমে দুটো ক্লেমোর মাইন পেতেছে ফ্রেঞ্চ কমাণ্ডেরা। তাদের আশা ছিল, রানার দলের সবাই অক্কা, পাবে। লোকগুলো মরবার পর তাদের পরিকল্পনার টুকরোগুলো একে একে মিলিয়েছে রানা।

ফ্রেঞ্চ কমাণ্ডো দলের নেতা নীচে এক লোককে আগেই পাঠিয়েছে। সেই লোক দরজার সামনে পেতেছে দুটো ক্লেমোর মাইন। ওই দুটোর ভিতর ট্রিপ-ওয়ায়ার সংযোগ করা ছিল। এরপর বাধ্য হয়ে পিছাতে শুরু করেছে, এমন এক ভঙ্গি নিয়ে ড্রিলিং রুমে ঢুকে পড়ত কমাণ্ডো দল। রানার দল আগেই জানে, ড্রিলিং রুম থেকে বেরুতে পারবে না তারা। কোণঠাসা হয়ে গেছে শত্রুরা। চেঁচিয়ে সারেণ্ডার করবে।

তাদের পিছনে ছুটে যাবে রানার দলের সবাই।

আর ট্রিপ-ওয়ায়ারে পা পড়তেই ব্যস, ভিঢ়িম!

খুব সহজ ফাঁদ পেতেছে ফ্রেঞ্চরা। ওই এক চালেই সব গুটি উল্টে যেত। চতুরতার সঙ্গে কাজটা করেছে তারা, পিছাতে শুরু করেছে। যে-কেউ বুঝবে, তাদেরকে হার মানতেই হবে। কারও মনে হবে না, আসলে ফ্রেঞ্চ দুর্দান্ত কাউন্টার-অ্যাটাক করছে।

কিন্তু একটা কথা জ্যাকুস ফিউভিল বোঝেনি, কংকেভ মাইনের ফাঁদ পাতার সময় রানার দলের কেউ ঢুকে পড়তে পারে ঘরে। সে। যদি ফ্রেঞ্চ কমাণ্ডোকে ঠেকিয়ে দেয়, সেক্ষেত্রে তাদের আর কোনও ভরসা থাকে না।

নাজমুলের কাজ দেখে খুশি হয়ে সবাই মিলে ওর পিঠ চাপড়ে লাল করে দিয়েছে।

কর্পোরাল কোনও হাতাহাতির ভিতর যায়নি, এক ঢিলে দুটো পাখি ঝোলার ভিতর পুরেছে। ফ্রেঞ্চ কমাণ্ডো মারা যাওয়ার পর মাত্র একটা জিনিস পাল্টে দিয়েছে নাজমুল।

ক্লেমোর মাইনের মুখ ঘুরিয়ে দিয়েছে।

জ্যাকুস ফিউভিল যখন ড্রিল রুমের ভিতর থেকে নাজমুলকে দেখল, এরপর তার চোখ পড়ল ভয়ঙ্কর এক দৃশ্যের উপর। ক্লেমোর মাইন চেয়ে আছে তার দিকেই!

আর ঠিক তখন ট্রিপ-ওয়ায়ারে পা রাখল নাজমুল। এরপর কী হয়েছে জ্যাকুস ফিউভিল জানে না।

এর ফলে শেষ হয়েছে দীর্ঘ একটা লড়াই।

.

একঘণ্টার ভিতর বেশিরভাগ মৃতদেহ খুঁজে বের করা হলো।

জ্যাকুস ফিউভিল শেষ। এ ছাড়া তিমির হামলায় মরেছে চার ফ্রেঞ্চ কমাণ্ডো। আমেরিকান মেরিনের কর্পোরাল টনি কেলগ ও জর্জ মারফি মারা গেছে। হলিডের লাশ পাওয়া গেল না, ওটা নিয়ে গেছে তিমি। সব মিলে আট ফ্রেঞ্চ কমাণ্ডোর লাশ পড়ে ছিল আইস স্টেশনের নানান জায়গায়।

আমেরিকান মেরিন ও বাংলাদেশ আর্মির সব মিলে দুজন গুরুতর ভাবে আহত। নিশাত সুলতানার এক হাঁটু কেটে নিয়ে গেছে খুনি তিমি। সবাই ভেবেছিল লড়াই শুরু হওয়ার সময় মরেছে কেভিন হাক্সলে, পরে দেখা গেল এখনও বেঁচে আছে সে।

কেভিন হাক্সলের চেয়ে অনেক সুস্থ নিশাত, এখনও জ্ঞান আছে ওর অন্য হাত-পা ঠিকভাবেই নাড়ছে। থেমে গেছে রক্ত পড়া, ব্যথাও নেই মেথডনের গুণে। এখন ওর শেষ শত্রু হয়ে উঠতে পারে শক। ঠিক করা হয়েছে, আপাতত পর্যবেক্ষণের জন্য ই-ডেকে, গুদাম-ঘরেই রাখা হবে নিশাতকে। এখন সরাতে গেলে জ্ঞান হারাতে পারে।

এদিকে কমবয়সী মেরিন ডুবে গেছে ট্রমার ভিতর, কোনও জ্ঞান নেই। রানা এবং ওর দল যখন কেভিনকে সরাতে চাইল, তখন বুঝেছে, এখনও বেঁচে আছে বেচারা। আসলে অমন গুরুতর আহত হলে মানুষের মগজ সমস্ত নিয়ন্ত্রণ নিজ হাতে তুলে নেয়। যতই মেথডন বা মর্ফিন দেয়া হোক, এত বুলেট শরীরে নিয়ে সেব্যথা কেউ সহ্য করতে পারবে না। সেরা কাজটা করেছে মগজ,। হাক্সলের সেনসারি অ্যাপারেটাস অফ করে দিয়েছে, আশা করছে, বাইরে থেকে কেউ সাহায্য করবে।

এখন জরুরি হয়ে উঠেছে একজন ডাক্তার পাওয়া।

নার্সের কাজ জানে নিশাত, কিন্তু নিজেই তো পা হারিয়ে পঙ্গু হতে বসেছে। মেরিনদের সঙ্গে মেডিক হিসাবে ছিল হলিডে সিম্পসন, সে-ও চলে গেছে সবার ধরাছোঁয়ার বাইরে।

এইমাত্র ই-ডেকে নিশাতকে দেখে এসেছে রানা, এখন হাঁটছে এ-ডেকের ক্যাটওয়াকে। ডাইনিং রুমের দরজায় থামল, জিজ্ঞেস করল, কী করছ, নাজমুল?

ঘরের ভিতর কেভিন হাক্সলের উপর ঝুঁকে পড়েছে নাজমুল। টেবিলের উপর চিত হয়ে পড়ে আছে আমেরিকান ছেলেটা। মেঝের উপর গড়িয়ে পড়ছে রক্ত, দেখতে না দেখতে জমাট বরফ হয়ে উঠছে।

কাজ থেকে চোখ তুলে চাইল নাজমুল। হতাশ হয়ে মাথা, নাড়ল। বড় করে শ্বাস ফেলে বলল, রক্ত পড়া থামাতে পারছি না। শরীরের ভিতর অনেক জখম। গোটা পেট ছিড়েখুড়ে গেছে। কপাল থেকে ঘাম মুছল ও। চোখের উপর দেখা দিল রক্তের সরু রেখা। আস্তে করে বলল, আমি আর কিছু করতে পারব না, স্যর। এখনই ওর ডাক্তার দরকার।

নিথর ছেলেটির দিকে চাইল রানা। কয়েক মুহূর্ত পর বলল, যতটা পারো করো। ঘর থেকে বেরিয়ে এল ও।

.

ঠিক আছে, এবার মন দিয়ে শোনো সবাই, বলল রানা। আমাদের হাতে খুব বেশি সময় নেই। কাজেই সংক্ষেপে বলছি।

ই-ডেকে পুলের পাশে রানাসহ হাজির হয়েছে সুস্থ ছয়জন যোদ্ধা। ফাঁকা উইলকক্স আইস স্টেশনের ভিতর গমগম করে উঠল রানার কণ্ঠ, মনে রেখো, ফ্রেঞ্চরা যখন হামলা করেছে, ধরে নিতে পারো, অন্যরাও আসবে। তারা এতক্ষণে যথেষ্ট সময় পেয়েছে। এবার আসতে পারে ফুল স্কেল অ্যাটাক। এখন যে দলই আসুক, তারা ফ্রেঞ্চদের চেয়ে অনেক বেশি প্রস্তুতি নিয়ে। আসবে। আরও অনেক অস্ত্র থাকবে তাদের কাছে।…কারও কিছু বলার আছে?

আমার কিছু বলার নেই, স্যর, বলল সার্জেন্ট হোসেন আরাফাত দবির।

একই কথা আমার, বলল গানারি সার্জেন্ট ভাইপার।

বাংলাদেশ আর্মির সার্জেন্ট দবির এবং মেরিনদের গানারি সার্জেন্ট পল সিংগার দলে সবচেয়ে বয়স্ক। ওরা বুঝেছে, ঠিকই বলছে মেজর মাসুদ রানা।

আর কেউ কিছু বলছে না। রানা বলল, ঠিক আছে, এবার শুনুন, সার্জেন্ট জনি ওয়াকার…

জী, মেজর।

আপনি গিয়ে হোভারক্রাফট দুটোর রেফাইণ্ডার ঘুরিয়ে দিন স্টেশনের বাইরের দিকে। দুটোর মধ্যে যেন গ্যাপ না পড়ে। শুধু ট্রিপ-ওয়ায়ার দিয়ে কিছুই হবে না। এখন থেকে রেঞ্জফাইণ্ডার কাজে লাগবে। স্টেশনের পঞ্চাশ মাইলের ভিতর কেউ এলেই জানতে চাই।

বুঝতে পেরেছি, বলল সার্জেন্ট ওয়াকার।

আপনি যখন উপরে থাকবেন, চেষ্টা করবেন রেডিয়ো দিয়ে ম্যাকমার্ডোর সঙ্গে যোগাযোগ করতে, বলল রানা। জানতে হবে কখন আসবে রিইনফোর্সমেন্ট। এতক্ষণে ম্যাকমাড়োয় পৌঁছে যাওয়ার কথা আমেরিকান সৈনিকদের!

বুঝেছি, রওনা হয়ে গেল ওয়াকার।

মোরশেদ… বলল রানা।

বলুন, মাসুদ ভাই।

তোমার কাজ ইরেজার বা ডিলে সুইচ খুঁজে বের করা। এই স্টেশনের উপর থেকে শুরু করে নীচ পর্যন্ত সবখানে খুঁজবে। ওটার ভিতর কোনও সুইচ থাকবে। ফ্রেঞ্চদের কোনও না কোনও চালাকি থাকতেই পারে, খুঁজে বের করো সেটা।

জী, মাসুদ ভাই, কাছের রাং-ল্যাডারের দিকে চলল লেফটেন্যান্ট গোলাম মোরশেদ।

গানারি সার্জেন্ট ভাইপার…

স্যর।

ডাইভিং বেল উঁচু করা বা নামানোর উইঞ্চের কাছে চলে যান। ওটার কন্ট্রোল প্যানেল সি-ডেকের অ্যালকোভে। লড়াইয়ের সময় গ্রেনেডের আঘাতে কন্ট্রোল প্যানেল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যত দ্রুত সম্ভব উইঞ্চ চালু করতে হবে। …আপনি ওটা মেরামত করতে পারবেন?

আশা তো করি পারব, স্যর। বিদায় নিল গানারি সার্জেন্ট ভাইপার।

রানার সামনে রয়ে গেল মাত্র দুজন সার্জেন্ট হোসেন আরাফাত দবির ও লেফটেন্যান্ট তিশা করিম।

দবির, তিশা, আপনারা ডাইভ গিয়ার তৈরি রাখুন। তিনজন ডাইভার নামবে পুলে। কাজেই চার ঘণ্টা ডাইভ কমপ্রেশন চাই। লো-অডিবিলিটি গিয়ার ব্যবহার করবেন। পরে লাগতে পারে, সেজন্য অগযিলারি রাখবেন।

এয়ার মিক্স? জানতে চাইল সার্জেন্ট দবির।

স্যাচিউরেটেড, হিলিয়াম-অক্সিজেন, নাইনটি-এইট টু টু, বলল রানা।

কয়েক মুহূর্ত চুপ রইল হোসেন আরাফাত দবির ও তিশা করিম। ৯৮%, হিলিয়াম ও ২% অক্সিজেনের মিশ্রণ খুব কমই করা হয়। অক্সিজেনের এত কম ব্যবহার থেকে বোঝা যায়, অনেক গভীরে ডাইভ দেয়া হবে।

তিশা ও দবিরের হাতে এক মুঠো নীল ক্যাপসুল দিল রানা। জিনিসটা এন-৬৭ডি অ্যান্টি-নাইট্রোজেন ব্লাড-প্রেশার ক্যাপসুল। আমেরিকান নেভি ওটা ব্যবহার করে ডিপ-ডাইভ মিশনে। রওনা হওয়ার আগে ম্যাকমার্ডো স্টেশন চিফের কাছ থেকে পেয়েছে রানা এ-জিনিস। মিলিটারি ডাইভাররা আদর করে এই ক্যাপসুলের নাম দিয়েছে পিল

গভীর পানিতে নামবার সময় রক্তের বাড়তি নাইট্রোজেন দূর করে, ঠেকিয়ে দেয় ডুবুরিদের ডিকমপ্রেশন সিকনেস বা বেণ্ড। রক্তের ভিতর নাইট্রোজেন দূর করে বলে নেভি এবং মেরিন কর্পস ডুবুরিরা অনেক সহজে নেমে যেতে পারে, তাদের নাইট্রোজেন নারকোসিসের ভয় থাকে না। আবার উঠতে গিয়ে ডিকমপ্রেশন স্টপ বা বাড়তি সময়ও দিতে হয় না। আমেরিকা ও অন্যান্য উন্নত দেশ এই বিপ্লবী পিল মিলিটারি ডিপ-ডাইভে ব্যবহার করে।

ডিপ ডাইভিং? নীল ক্যাপসুল থেকে চোখ তুলে রানার দিকে চাইল তিশা।

আস্তে করে মাথা দোলাল রানা। আমাদের জানতে হবে ওই। গুহার ভেতর কী আছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *