১.১৫ জ্বলজ্বলে সবুজ আলোয়

জ্বলজ্বলে সবুজ আলোয় ভরে উঠেছে চারপাশ। নাইট-ভিশন গগলস্ পরে ই-ডেক ও ডি-ডেকের মাঝের রাং-ল্যাডার বেয়ে খুব ধীরে, সাবধানে উঠছে মাসুদ রানা। প্রশিক্ষকের কথা মনে পড়ছে ওর। ভদ্রলোক বলেছিলেন: মনে রাখবেন, চোখে নাইট-ভিশন গগলস্ মানেই কম পাওয়ারের বিনকিউলার ব্যবহার করা। আপনি হয়তো দূরের কিছু ছুঁতে চান, কিন্তু একটু এগুলৈই টের পাবেন, ওটা আছে আসলে অনেক কাছে।

গোটা স্টেশন ডুবে আছে ঘুটঘুটে অন্ধকারে।

থমথম করছে চারপাশ।

বড় ঠাণ্ডা পরিবেশ। কোথাও কোনও আওয়াজও নেই।

স্টেশনে দাহ্য গ্যাস ছড়িয়ে পড়তে থেমে গেছে সব গোলাগুলি। পা টিপে টিপে চলেছে সবাই। ফিসফিস করে কথা হচ্ছে হেলমেটের মাইক্রোফোনে। নিস্তব্ধ আঁধারে একটু আওয়াজও কানে আসছে।

উজ্জ্বল সবুজ রঙের স্টেশনে চারপাশে চোখ রাখছে রানা।

নতুন জটিল এক পর্যায়ে পৌঁছেছে এই লড়াই।

যেভাবেই হোক, স্টেশনের ফিউজ-বক্স পেয়েছে ফ্রেঞ্চ কমাণ্ডোরা, এবং নিভিয়েও দিয়েছে সব বাতি। সন্দেহ নেই, আর কোনও উপায় না পেয়ে এই ঝুঁকি নিয়েছে। বড় কোনও ভুলও করেনি।

ছোট দলের বন্ধু গাঢ় অন্ধকার। যতই আবিষ্কার করা হোক অ্যাম্বিয়েন্ট লাইট টেকনোলজি, নাইট-ভিশন গগলস বা গানসাইট যতই কাজের, হোক, সাধারণ মিলিটারি ট্যাকটিশিয়ানরা মনে করেন: ছোট কোনও দল নিয়ে হামলা করলে, সবচেয়ে ভাল কাজ হয় অন্ধকারের সুযোগ নিলে। নেভি-এয়ারফোর্স-আর্মি, এই তিন সংগঠনের কোনও যোদ্ধা লড়তে চায় না অন্ধকারে।

সবাই সতর্ক থেকো, ফিসফিস করল রানা। ফ্ল্যাশার ফেলতে পারে। নাইট-ভিশন লড়াইয়ে মস্ত ঝুঁকি স্টান গ্রেনেড। ওটার আরেকটা নাম ফ্ল্যাশার। ওই গ্রেনেড হঠাৎ করেই তৈরি করে চোখ ধাঁধানো আলো। এর উদ্দেশ্য কিছুক্ষণের জন্য শত্রুকে হতচকিত করে দেয়া। নাইট-ভিশন গগলস সামান্য আলো অনেক উজ্জ্বল করে, ফলে ফ্ল্যাশার জ্বলে উঠলে নাইট-ভিশন গগলস পরা যোদ্ধার চোখ শুধু ধাধিয়ে যাবে তা নয়, চিরকালের জন্য অন্ধও হয়ে যেতে পারে সে।

স্টেশনের সেন্ট্রাল শাফটে উঁকি দিল রানা। উপরের ফ্রস্টেড গ্লাস গম্বুজ দিয়ে বাইরের কোনও আলো আসছে না। জুলাই চলছে, বেশি দিন হয়নি শুরু হয়েছে অ্যান্টার্কটিকার শীতকাল। আরও দুই মাস রাতের মত অন্ধকার থাকবে।

পিছনে তিশা আসছে, টের পেল রানা। চট করে দেখে নিল। ওরা ঠিক করেছিল শাফটের দিকে যাবে।

বাতি নিভে যেতেই দলের সবাইকে নির্দেশ দিয়েছে রানা: নাইট ভিশন চালু করে। এর পর খুলে বলেছে ওর পরিকল্পনা।

অন্ধকারে আত্মরক্ষামূলক পরিকল্পনা করলে চলবে না। হামলা ওদেরই করতে হবে। এ ছাড়া কোনও উপায় নেই। দুই দলের ভিতর সেই দল জিতবে, যারা অন্ধকারকে নিজেদের কাজে ভালভাবে লাগাতে পারবে! মূল কথা: রানার দলকে আক্রমণাত্মক। হতে হবে।

আসলে তাড়িয়ে নিয়ে যেতে হবে ফ্রেঞ্চদেরকে। কোথায়? যেখানে কোণঠাসা হয় তারা!

সংখ্যায় তারা কম। বারোজনের ভিতর আছে মাত্র চারজন। একটু আগে মোরশেদ বলেছে, তাদের দুজন .এ-ডেক ছেড়ে। গেছে। ধারণা করা যায়, দুই দলে ভাগ হয়ে গেছে তারা।

এরচেয়ে বড় কথা, ধাওয়া খেয়ে পিছাতে শুরু করেছে তারা। রানার নির্দেশে ওর দলও ভাগ হয়ে গেছে। এ থেকে অনেক সুবিধা পাবে ওরা।

এ-ডেকে আছে গানারি সার্জেন্ট ভাইপার, সার্জেন্ট জনি। ওয়াকার ও লেফটেন্যান্ট মোরশেদ। এদিকে ই-ডেকে তিশা, নাজমুল ও নিজে রানা।

এখন মোরশেদরা যদি এ-ডেক থেকে ফ্রেঞ্চ কমাণ্ডোদেরকে নীচে তাড়িয়ে আনতে পারে, ওই চারজন ফাদে পড়বে। উপরে শর্ক, নীচেও তাই। ওরা সহজেই কোণঠাসা করবে ফ্রেঞ্চদেরকে।

বাড়তি কোনও কৌশল করতে যায়নি বা বেশি ভাবতে যায়নি রানা। অবস্থা বুঝে এগুতে হবে। এটা সাধারণ কোনও লড়াই নয়। এক পক্ষে দুনিয়া-সেরা মিলিটারি ইউনিট। ফ্রেঞ্চদের ছোট করবার কোনও সুযোগ নেই। অন্যদিকে দুজন আমেরিকান মেরিন এবং ওরা বাংলাদেশ আর্মির কজন।

এই লড়াই হবে ভয়ঙ্কর।

দাহ্য গ্যাসের কারণে কোনও দল আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করবে। পুরনো আমলের লড়াইয়ের মত হাতাহাতি করতে হবে।

এবং সেটা হবে নিকষ অন্ধকারে।

তার মানেই লড়াই চলবে ছোরা দিয়ে।

হঠাৎ ওর পরিকল্পনায় বড় একটা খুঁত টের পেল রানা।

ফ্রেঞ্চদের সঙ্গে রয়েছে ক্রসবো।

মৃত ফ্রেঞ্চ কমাণ্ডার কাছ থেকে সংগ্রহ করা ক্রসবোটা দেখল রানা। ওই জিনিস আগ্নেয়াস্ত্রের মত আগুনের ফুলকি তৈরি করবে না। নিরাপদে দূর থেকে ব্যবহার করবে ফ্রেঞ্চরা। স্যাণ্ডহাস্টে ক্রসবো সম্বন্ধে কী শিখেছিল, ভাবতে চাইল রানা। ছোট ক্রসবোর রেঞ্জ বেশি নয়। বড়জোর রিভলভারের মত। একটু দূরের টার্গেটে লাগানো প্রায় অসম্ভব।

রেঞ্জ বড়জোর বিশ ফুট।

নিঃশব্দে কপালকে দোষ দিল রানা। ওরা ছোরা দিয়ে কিছুই করতে পারবে না। বিশ ফুট দূর থেকে পাখির মত ওদেরকে ফেলবে ফ্রেঞ্চরা। গ্যাসীয় পরিবেশে ওদের কাছে এমন কোনও অস্ত্র নেই, যেটা দূর থেকে ছুঁড়তে পারবে।

এক সেকেণ্ড পর ভাবল রানা, ওদের সঙ্গে রয়েছে…

নিচু স্বরে হেলমেট মাইকে নির্দেশ দিতে শুরু করল ও। দু মিনিট পর তিশাকে নিয়ে উঠে এল ডি-ডেকে।

কাঁধের উচ্চতায় ম্যাগহুক রেখে সামনে বাড়ছে রানা, মুহূর্তে ছুঁড়তে পারবে অস্ত্রটা। অন্য হাতে মৃত ফ্রেঞ্চের ক্রসবো। .

যদিও নিখুঁত লক্ষ্যভেদের জন্য তৈরি হয়নি আমালাইট এমএইচ-১২ ম্যাগহুক লঞ্চার, কিন্তু ওটার ম্যাগনেটিক এ্যাপলিং হুক ছিটকে যায় কমপক্ষে এক শ ফুট। প্রথমে এমএইচ-১২ ম্যাগহুক তৈরি করা হয় আর্বান ওয়ারফেয়ার ও অ্যান্টি-টেরোরিস্ট অপারেশনের জন্য আশা করা হয়েছে, ওটার দড়ি ও গ্যাপলিং হুক ব্যবহার করে বাড়ি বা, ওয়্যারহাউসের দেয়াল অনায়াসে পেরুবে অ্যান্টি-টেরোরিস্ট ইউনিট, ঝট করে ঢুকে পড়বে শত্রু এলাকায়।

এসব মাথায় রেখেই ছোট করা হয়েছে ম্যাগক। হাতের লঞ্চার কমপক্ষে এক শ ফুট দড়ি ও হুক ছুঁড়বে। জিনিসটা স্টেট অভ আর্ট। ওটার হাইড্রলিক লঞ্চিং সিস্টেম আকাশের দিকে ছুঁড়লে প্রতি বর্গ ইঞ্চিতে চার হাজার পাউণ্ড চাপ তৈরি করে। আর সে-কারণে রানার বুঝতে দেরি হয়নি, বিশ ফুট দূরের শত্রুর দিকে ম্যাগহুক ছুঁড়লে, ওটা ঠিকভাবে বুকে-পেটে লাগলে, ওয় লোককে কষ্ট করে আর লড়তে হবে না।

পুলের পানিতে রানা নিজেই দেখেছে, কাছ থেকে সাত টনি কিলার ওয়েইলকে থামিয়ে দিয়েছে ম্যাগহুক। কাছ থেকে হুক ব্যবহার করলে এক শ আশি পাউণ্ডের যে-কারও করোটি ফাটিয়ে দিতে পারবে।

রানার কারণে আবারও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছে ওর দলের সবাই। থাকুক ফ্রেঞ্চদের হাতে ক্রসবো, ওদের আছে ম্যাগহুক, ওটা দিয়ে দূর থেকে হামলা করবে।

আপাতত লেফটেন্যান্ট মোরশেদ, গানারি সার্জেন্ট ভাইপার ও সার্জেন্ট জনি ওয়াকার স্টেশনের এ-ডেক থেকে তাড়িয়ে নীচে আনছে ফ্রেঞ্চদেরকে। এদিকে ই-ডেক থেকে উপরের দিকে রওনা হবে লেফটেন্যান্ট তিশা করিম ও কর্পোরাল নাজমুল। এই দুই দল মিলিত হবে সি-ডেকে। তারপর দেখা যাক কী ঘটে।

আপাতত রানার সঙ্গে রয়েছে তিশা করিম। নিশাত সুলতানার পা থেকে রক্ত পড়া থামলে, একটু পর ওদের সঙ্গে যোগ দেবে নাজমুল। একটু আগে নিশাতের ধমণীতে মেথাড়ন দিয়েছে ওরা। এ-ডেকে পাল্টা হামলা শুরু করেছে দুই মেরিন ও বাংলাদেশ আর্মির লেফটেন্যান্ট গোলাম মোরশেদ। দ্রুত সামনে বাড়ছে ওরা। টেক্সট বুক থ্রি-গিং ফ্লাশিং ফর্মেশন ব্যবহার করছে। লিপ ফ্লগিং করে সামনে বাড়ছে একজন, ছুঁড়ছে ম্যাগহুক। দড়ি ও হুক গুটিয়ে নিয়ে সে রিলোড করবার আগেই দ্বিতীয়জন তাকে ছাড়িয়ে সামনে বাড়ছে। তার ম্যাগহুক শত্রুদের দিকে ছুঁড়বার পর পিছনের তৃতীয়জন আবার তাকে ছাড়িয়ে সামনে বাড়ছে। ব্যবহার করছে ম্যাগহুক, ততক্ষণে তৈরি হয়ে যাচ্ছে প্রথমজন।

এ-ডেকে ওরা যা ভেবেছে, তাই করছে দুই ফ্রেঞ্চ কমাণ্ডো। ম্যাগহুকের হামলার মুখে পিছাতে শুরু করেছে। মই বেয়ে নেমে যাচ্ছে নীচের তলায়।

অবশ্য, গোলাম মোরশেদের রিপোর্ট পাওয়ার পর চিন্তিত হয়ে পড়েছে রানা। অন্য একটা বিষয় খেয়াল করেছে। ফ্রেঞ্চরা বড় জলদি সরছে। বিধ্বস্ত বি-ডেক এড়িয়ে গেছে তারা। সোজা নামছে সি-ডেকে।

এরা দক্ষতার সঙ্গে টু বাই টু কাভার ফর্মেশন ব্যবহার করছে। সামনের দুজন চারপাশ কাভার করছে, এদিকে পিছনের দুজন কাভার করছে পিছন দিক। দুই দলের মাঝে থাকছে দশ গজ দূরত্ব।

মোরশেদ আগেই জানিয়েছে, নাইট-ভিশন গগলস ব্যবহার করছে ফ্রেঞ্চা। প্রস্তুতি নিয়েই এসেছে। এখন তাড়াহুড়া করে নামছে শাফট দিয়ে।

রানা ভেবেছিল লোকগুলো টানেলে সময় নষ্ট করবে, কিন্তু অন্য কোনও পরিকল্পনা আছে তাদের। সি-ডেকের টানেলে অল্প সময় ছিল। যেন অপেক্ষা করেছে, উপর থেকে নেমে আসবে শক্ররা। তারপর হঠাৎ করেই আবারও ক্যাটওয়াকে বেরিয়ে এসেছে, রাং-ল্যাডার বেয়ে নেমে আসছে ডি-ডেকে।

হঠাৎ স্ট্র্যাটেজির বিষয়ে জুলিয়াস বি. গুণ্ডারসনের একটা কথা মনে পড়ল রানার। উনি বলেছিলেন, ভাল স্ট্রাটেজি একটা জাদুর মত। শত্রুকে একটা হাত দেখতে দিন, কিন্তু অন্য হাতে কী করছেন তা যেন বুঝতে না পারে।

মাসুদ ভাই, ওরা দক্ষিণ-পশ্চিমের মই বেয়ে নামছে,, ইয়ারপিসে মোরশেদের কণ্ঠ শুনল রানা। আপনি কি নীচে?

ডি-ডেকের ক্যাটওয়াকে বেরিয়ে এসেছে রানা। চারপাশ সবুজ। কাজ শুরু করেছি।

ডি-ডেকের দক্ষিণ-পশ্চিম কোনা কাভার করছে রানা ও তিশা। রাং-ল্যাডার দেখতে পেল, ওটা গেছে সি-ডেকের দিকে। মাইকে বলল রানা, নাজমুল, তুমি কোথায়?

কাজ প্রায় শেষ, ই-ডেকের গুদাম থেকে জানাল নাজমুল।

পশ্চিম দিক কাভার করুন, সার্জেন্ট, ইন্টারকমে শোনা গেল মোরশেদের কণ্ঠ।

জনি ওয়াকার বলল, ওদের আসতে দিন, লেফটেন্যান্ট। তারপর পাঠিয়ে দেয়া যাবে মেজর রানার দিকে।

ডি-ডেকে রাং-ল্যাডারের সামনে পৌঁছে গেছে রানা ও তিশা। কুঁজো হয়ে দাঁড়িয়েছে, ফাঁকা মইয়ের দিকে তাক করেছে ম্যাগহুক। ধাতব ক্যাটওয়াকে বুটের ধুপধাপ আওয়াজ শুরু হয়েছে। তারপর শুনতে পেল তুঙ্ক আওয়াজ। ক্রসবো ব্যবহার করা হয়েছে।

মইয়ের দিকেই আসছে, মোরশেদের কণ্ঠ।

ক্যাটওয়ার্কের গ্রিলে আরও পায়ের শব্দ।

এখন যে-কোনও সময়ে হাজির হবে লোকগুলো।

কিন্তু হঠাৎ করেই ঠং-ঠাৎ আওয়াজ তুলে কী যেন পড়ল।

মোরশেদের বিকট চিৎকার এল, সাবধান! চোখ বন্ধ! ফ্ল্যাশার গ্রেনেড ফেলেছে।

চট করে চোখ বুজে ফেলেছে রানা। উপরের ডেকে পড়েছে গ্রেনেড। এক সেকেণ্ড পর ফাটল ওটা। এক পলকের জন্য উজ্জ্বল সাদা হয়ে উঠল উইলকক্স আইস স্টেশন।

রানা চোখ খুলবে, এমন সময় অন্য আওয়াজ পেল ডানদিক থেকে। মনে হলো কেউ খুব দ্রুত খুলছে প্যান্টের চেইন।

চোখ মেলেই চরকির মত ঘুরল রানা, সামনে সবুজ আলো। কোথাও কেউ নেই। কোনও নড়াচড়াও নেই।

কপাল! বলে উঠল মোরশেদ, মাসুদ ভাই, একজন রেলিং থেকে নেমে পড়েছে।

এইমাত্র চেইন খুলবার যে আওয়াজ পেয়েছে, এখন এক পলকে বুঝল রানা। মূল শাফট দিয়ে দড়ি বেয়ে নামছে কেউ! ওর বুঝতে দেরি হয়নি; ওটা কোনও ডিভেন্সিভ মুভ নয়।

কোঅর্ডিনেটেড মুভ। পরিকল্পনা নিয়েই করেছে। এবং হামলা করবার জন্যই।

আসলে পালাতে শুরু করেমি ফ্রেঞ্চ কমাণ্ডোরা

ওদের পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করছে! .

জুলিয়াস বি. গুপ্তারসন বলেছিলেন, ভাল স্ট্রাটেজি একটা জাদুর মত। শত্রুকে এক হাত দেখতে দিন, কিন্তু অন্য হাতে কী করছেন তা যেন বুঝতে না পারে।

রাজাকে চেক দিলে যেভাবে পাল্টা হামলা করতে চায় দাবাড়, এই মুহূর্তে তেমনি করেই ভাবতে শুরু করেছে রানা।

ওরা কী করতে চায়?

এখন কী ভাবছে?

ভাবলে অনেক কিছুই বেরুতে পারে, কিন্তু এখন ওর হাতে একদম সময় নেই। এক সেকেণ্ড পর ওর পাশের বরফ-দেয়ালে এসে লাগল অন্তত চারটে তীর।

মস্ত কুঁজওয়ালা হদ্দ বুড়োর মত উবু হয়ে গেল রানা, অবশ্য ঘুরল চালু চরকির মত, দেখতে পেল ওর পিছনের মেঝেতে ঝাপিয়ে পড়েছে তিশা। পরক্ষণে আবারও ঘুরল রানা, কী ঘটছে বুঝবার আগেই রাং-ল্যাডার বেয়ে সরসর করে নেমে এল এক লোক। মুখোমুখি হয়ে গেছে রানা ও লোকটা। তাকে চিনল রানা,. ফ্রেঞ্চ কমাণ্ডোদের নেতা: জ্যাকুস ফিউভিল!

.

ই-ডেকে গুদাম-ঘরে নিশাত সুলতানার পাশে বসে আছে নাজমুল। নিশাতের হাতের শিরা শক্ত রাবারের মত, ফলে সুঁই গাঁথা কঠিন। নাইট-ভিশন গগলস পরে পরিষ্কার দেখছেও না। চারবার সুঁই বিধিয়েছে, প্রতিবার আইভি লাইন থেকে ফ্লুইড গড়িয়ে পড়েছে নিশাতের হাতে।

ঠিক ভাবে আইভি দেয়ার পর উঠে দাঁড়াল নাজমুল, দরজার দিকে রওনা হবে, এমন সময় শুনল অদ্ভুত কিছু আওয়াজ। আঁধার গুদামের বাইরে সুড়ঙ্গে আলতো পায়ে হাঁটছে কেউ!

ঘুরেই বরফের মূর্তি হয়ে গেল নাজমুল।

কান পেতে অপেক্ষা করছে।

বাইরে দক্ষিণ টানেল ধরে হালকা পায়ে গেল সে বা তারা।

সামনে বেড়ে দরজার নব ধরল নাজমুল, খুব ধীরে নিঃশব্দে খুলল কবাট, উঁকি দিল সাবধানে। নাইট-ভিশন গগলসের কারণে সবুজ লাগছে টানেল। বামে চাইতেই দেখল পুল। মৃদু সব ঢেউ এসে লাগছে ডেকের পাশে।

ডানে চাইতেই দেখল, দীর্ঘ টানেল গেছে দূরের অন্ধকারে। নাজমুলের মনে পড়ল, স্টেশনের ওদিকেই ই-ডেকে ড্রিলিং রুম।

উইলকক্স আইস স্টেশনের এই অংশ সবচেয়ে নিচু, সে কারণেই এদিকে রাখা হয়েছে ড্রিলিং রুম। ওখান থেকেই বরফের কোরে বিজ্ঞানীরা নামিয়ে দেন ড্রিল। স্টেশন থেকে বেশ দূরে ওই রুম, মাঝে চল্লিশ গজ দীর্ঘ সরু টানেল।

ডানদিকের টানেল ধরেই গেছে সে বা তারা। এক মুহূর্ত দ্বিধা করল নাজমুল, তারপর ম্যাগহুক হাতে রওনা হলো পিছনে।

.

জ্যাকুস ফিউভিলকে লক্ষ্য করে ম্যাগহুক ফায়ার করেছে রানা। কিন্তু বিদ্বেগে দু ভঁজ হয়ে গেছে লোকটা। তার মাথার উপর দিয়ে রাং-ল্যাডারে ঝটাং করে লাগল হুক, পেঁচিয়ে গেল মইয়ের ধাপে।

হাত থেকে ম্যাগহুক ছেড়ে দিল রানা, তাক করল ক্রসবো। ওই একই সময়ে রানার বুকে ক্রসবো তাক করেছে ফিউভিল।

একইসঙ্গে অস্ত্রদুটো ব্যবহার করল ওরা। শিস তুলে পরস্পরকে পাশ কাটাল দুই তীর।

রানার আর্মার্ড শোল্ডারপ্লেটে লাগল ফিউভিলের তীর। ওদিকে রানার তীর গিয়ে লেগেছে লোকটার বাহুতে। হাত তুলে মুখ ঢেকেছে বিশালদেহী কমাণ্ডো। ব্যথা পেয়ে গর্জন ছাড়ল সে, সুস্থ হাতে তাড়াহুড়া করে ক্রসবো রিলোড করতে চাইছে। ওখানে বৃত্তাকার পাঁচটি রাবার স্লট থাকে, দ্রুত রিলোড করবার জন্য ওখান থেকে তীর নেয়া হয়। কিন্তু এখন রানার ক্রসবোর স্লটে কোনও তীর নেই!

যে কমাণ্ডোকে শেষ করে ক্রসরো পেয়েছে রানা, সে আগেই শেষ করে ফেলেছে সব তীর! ছিল শুধু শেষ তীরটা!

দেরি করল না রানা, ওই তীরের মতই ছুটে সামনে বাড়ল। পরক্ষণে ঝাপিয়ে পড়ল ফ্রেঞ্চ কমাণ্ডোর উপর। একইসঙ্গে ধড়াস্ করে পড়ল ওরা মইয়ের পিছনের ক্যাটওয়াকে।

পাঁচ গজ দূরে ক্যাটওয়ার্কে মুখ ঢেকে পড়ে আছে তিশা, দেখতে পেয়েছে ফ্রেঞ্চ কমাণ্ডের উপর ঝাপিয়ে পড়েছে রানা। লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল তিশা, রানাকে সাহায্য করতে ছুটতে শুরু করবে, এমন সময় রাং-ল্যাডার বেয়ে নেমে এল আরেক ফ্রেঞ্চ কমাণ্ডো!

কালো নাইট-ভিশন গগলসের ভিতর দিয়ে ওর দিকে চাইল লোকটা!

.

ধীর পায়ে সরু, টানেল বেয়ে চলেছে নাজমুল। শেষমাথায় একটা দরজা। ওদিক দিয়েই ঢুকতে হয় ড্রিলিং রুমে দরজা এখন আধ খোলা।

পা টিপে টিপে সামনে বাড়ছে নাজমুল, খাড়া করে রেখেছে কান। ঘরের ভিতর খসখস আওয়াজ। নড়াচড়া করছে কেউ। গুদাম পাশ কাটিয়ে এখানে এসে হাজির হয়েছে লোকটা?

কী যেন করছে।

নিচু স্বরে মাইক্রোফোনে কী যেন বলল। ইংরেজি না।

লে পেইজ এস্ত তেন্দু।

পাথরের মূর্তি হয়ে গেল নাজমুল। লোকটা ফ্রেঞ্চ কমাণ্ডো।

দরজার পাশে পৌঁছে দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়াল, ও, চোখে এখনও নাইট-ভিশন গগলস— আধ খোলা দরজা দিয়ে উঁকি দিল।

ওর মনে হলো ভিডিয়ো ক্যামেরার ভিতর দিয়ে চেয়ে আছে। প্রথমে চোখে পড়ল দরজার চৌকাঠ, ওটা ওর সবুজ ভিউস্ক্রিনের ডানে। তারপর দেখা গেল ঘরের ভিতর অংশ।

এক সেকেণ্ড পর দেখল লোকটাকে। তার চোখেও নাইটভিশন গগলস, একেবারে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। হাতের ক্রসবো তাক করেছে ওর মুখ লক্ষ্য করে!

.

সামনে নাইট-ভিশন গগলস পরা ফ্রেঞ্চ কমাণ্ডো, কিন্তু এক পলকে তিশা চিনল এই লোক ভিভাদিয়েখ।

গ্যাসোয়া ভিভাদিয়েখ। এই লোকই হামলার শুরুতে ক্রসবো দিয়ে ওর কপালে তীর মেরেছিল। হেলমেটের সামনের দিকে এখনও সেই তীর ঝুলছে। হারামজাদা হাসছে আবার! ..

বুঝতে পেরেছে, আগে এই মেয়েকেই তীর মেরেছিল।

সবজেটে আলোর ভিতর ক্রসবো উপরে তুলল সে, পরক্ষণে ছুঁড়ল তীর।

তিশা আছে বিশ ফুট দূরে, এক সেকেন্দ্রে বিশ ভাগ সময়ে হঠাৎ করেই দেখল তীরের ডগা আসছে ওর দিকেই। ঝট করে সরে গেল তিশা, ডান হাত তখনও পিছনে রয়ে গেছে। হঠাৎ খটাং আওয়াজ শুনল। ভীষণ ঝাঁকি খেল ওর হাত। তীর গিয়ে লেগেছে ওর ম্যাগহুকের উপর, ঝটকা দিয়ে দূরে গিয়ে পড়ল অস্ত্রটা।

একটু সামলে নেয়ার আগেই তিশা দেখল, ছুটে আসছে ভিভাদিয়েখ, হাতে বেরিয়ে এসেছে বাউয়ি ছোরা। মনে হলো মুহূর্তে হাজির হয়েছে লোকটা, তিশার গলা লক্ষ্য করে নামিয়ে। আনল হান্টিং নাইফ।

হঠাৎ জোরালো ঠং আওয়াজ তুলল বাউয়ি, প্রচণ্ড ঝাঁকি খেয়ে থেমে গেছে চওড়া ফলা।

নিজের ছোরা দিয়ে হামলা ঠেকিয়ে দিয়েছে তিশা।

পিছিয়ে গেল দুই যোদ্ধা, বৃত্তাকারে ঘুরতে শুরু করেছে, হামলা, করবে পরস্পরের উপর। ভিভাদিয়েখ উল্টো করে ধরেছে ছোরা, একই কাজ করছে তিশাও। এখনও দুজনের চোখে নাইট-ভিশন গগলস।

হঠাৎ করেই লাফিয়ে সামনে বাড়ল ভিভাদিয়েখ, কিন্তু নিজেরটা দিয়ে তার ছোরা সরিয়ে দিল তিশা। কিন্তু ফ্রেঞ্চ কমাণ্ডোর হাত ওর চেয়ে দীর্ঘ, তিশা সরে গেলেও সুইপ করল। চোখ থেকে আলগা হয়ে গেল তিশার গগলস।

এক মুহূর্ত কিছুই দেখল না তিশা। চারপাশ শুধু ঘুটঘুটে অন্ধকার।

মুহূর্তে বুঝল, গগলস না থাকলে ও সম্পূর্ণ অন্ধ!

পিছনের ক্যাটওয়াকে কম্পন টের পেল তিশা। লাফিয়ে সামনে বেড়েছে ভিভাদিয়ে।

পুরোপুরি অন্ধ তিশা, কিন্তু ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের নির্দেশে ঝট করে বসে পড়ল। ঠিক করছে কি না এখনও জানে না।

এক সেকেণ্ড পর টের পেল, ঠিকই করেছে। ওর হেলমেটের উপর দিয়ে শ-শ আওয়াজ তুলে বেরিয়ে গেল ছোরার ফলা।

অন্ধকারে সামনের ক্যাটওয়াকে ডিগবাজি শুরু করল তিশা, সরে যাচ্ছে ভিভাদিয়েখের কাছ থেকে। তিনবার ডিগবাজি দিয়ে উঠে দাঁড়াল, চাপড় দিল হেলমেটের পাশের বাটনে। সঙ্গে সঙ্গে চোখের সামনে বসে গেল ইনফ্রারেড ভাইজার।

ওটা নাইট-ভিশন নয়, কিন্তু প্রায় সমানই কাজ করে।

চারপাশের ক্যাটওয়াক ধরা পড়ছে ইলেকট্রনিক নীল-কালো ইমেজে। ক্যাটওয়াক ও রাং-ল্যাডার নীল রঙের। মইয়ের কাছে নানা রঙের দুটো আকৃতি দেখল তিশা। তারা ক্যাটওয়াকে জাপ্টাজাল্টি করে গড়িয়ে সরছে। মাসুদ রানা ও জ্যাকুস ফিউভিল, বোধহয় কুস্তি চলছে তাদের ভিতর।

চট করে ঘুরল তিশা, ওর দিকে ছুটে আসছে লাল-সবুজ-হলুদ আরেকটা আকৃতি।

ওটা গ্যার্সেয়া ভিদিয়েখ।

অথবা, লোকটার শরীরের ভিতরের হিট প্যাটার্ন।

পাশ থেকে ছোরা চালাল গ্যাসেঁয়া ভিদিয়েখ। আবারও নিজের ছোরা দিয়ে হামলা ঠেকিয়ে দিল তিশা। পরক্ষণে জোরালো সাইড কিক করল ফ্রেঞ্চের সোলার প্লেক্সাস লক্ষ্য করে। লাথিটা জায়গামতই লেগেছে, হুমড়ি খেয়ে পড়ল ভিভাসিয়েখ। কিন্তু পড়বার আগে খপ করে ধরেছে তিশার ছোরা ধরা ডান কবজি। জোর টান খেয়ে পড়ে গেল তিশাও।

একই সঙ্গে ক্যাটওয়াকে পড়েছে ওরা। নীচে ভিভাদিয়েখ, উপরে তিশা।. গড়িয়ে সরল ও, পিঠ দিয়ে পড়ল ক্যাটওয়াকের পাশের বরফ-দেয়ালে। মেঝেতে উঠে বসতে গিয়ে হাতে কী যেন ঠেকল। মুহূর্তে বুঝে গেল ওটা কী।

ম্যাগহুক!

আর ঠিক তখনই চোখের সামনে হাজির হলো রঙিন ঝলমলে আকৃতি… ওর উপর ঝাপিয়ে পড়ছে গ্যাসোয়া ভিভাদিয়েখ! হাত বাড়িয়ে রেখেছে, এবার কচ করে কেটে দেবে তিশার কণ্ঠনালী!

হাত থেকে ছোরা ছেড়ে দিল তিশা, দুই হাতে লোকটাকে ঠেকাতে চাইল। দুই হাতে শক্ত করে ধরে ফেলল লোকটার ছোরা ধরা কবজি। ওর গলা থেকে মাত্র এক ইঞ্চি দূরে তীক্ষ্ণধার ফলা, কিন্তু ওখানেই থামাতে পারল।

অবশ্য, তা মাত্র কয়েক সেকেণ্ডের জন্য।

লোকটা অনেক বেশি শক্তিশালী।

তিশার কণ্ঠনালী থেকে আধ ইঞ্চি দূরে থামল ছোরা।

চোখের সামনে গ্যাসেয়া ভিভাদিয়েখের মুখ দেখল তিশা। ইনফ্রারেড ভাইজারে লোকটার করোটি ও দাঁতগুলো পরিষ্কার দেখছে। থরথর করে কাঁপছে রং। মাংস ও রক্ত ওগুলো। তিশার মনে হলো নরক থেকে উঠে এসেছে ভয়ঙ্কর পৈশাচিক কঙ্কাল।

লোকটা এত কাছে, তার নাইট-ভিশন গগলস ঘষা লাগছে ওর হেলমেটে।

গগলস্, চট করে ভাবল তিশা।

পর মুহূর্তে সামান্য দ্বিধা করে গ্যাসোয়ার ছোরা ধরা হাত থেকে বাম হাত সরিয়ে নিল, খামচি দিয়ে খুলে দিল লোকটার নাইট-ভিশন গগলস।

ঘোঁৎ করে উঠল গ্যাসোয়া ভিভাদিয়েখ। ক্যাটওয়াকের পাশ থেকে গগলসটা নীচে ফেলে দিল তিশা। ভাবছে, অন্ধ হয়ে গেছে হারামজাদা!

কিন্তু গলার উপর ছোরা নামিয়ে আনছে ভিভাদিয়েখ.। হঠাৎ করেই গ্যাসোয়ার নীচে পিছলে সরল তিশা, এখন ওর হেলমেট লোকটার চোখের সামনে।

মনে পড়ে? এটা দিয়েছিলে, নিচু স্বরে বলল তিশা, চোখের সামনে দেখছে হেলমেটে গাঁথা তীর। ওটা নীল রঙের। এবার ফিরিয়ে নাও!

পরক্ষণে ঝটকা দিয়ে সামনে মাথা বাড়াল তিশা। হেলমেটের তীর খছ করে বিঁধল গ্যাসেয়া ভিভাদিয়েখের ডান চোখে। বিকট চিল্কার ছাড়ল লোকটা, মনে হলো ভয়ঙ্কর কোনও হিংস্র প্রাণী গর্জে উঠেছে। তিশা টের পেল, ছলাৎ করে ওর চোখেমুখে এসে পড়েছে একগাদা উষ্ণ রক্ত।

নীচ থেকে লাথি মেরে লোকটাকে ছিটকে ফেলে দিল তিশা। ইনফ্রারেড ভাইজারে দেখল, লোকটার ডান চোখ থেকে বেরুচ্ছে তরল হলুদ-লাল কী যেন।

চিত হয়ে ক্যাটওয়াকে আছড়ে পড়েছে ভিভাদিয়েখ, একের পর এক চিৎকার ছাড়ছে। একহাতে ঢেকে ফেলেছে শূন্য কোটর। তিশার খোঁচা খেয়ে বেরিয়ে এসেছে তার চোখ। এরপরও মেঝের উপর বসে দু দিকে থাবা ছুঁড়ল সে, তিশাকে নাগালে পেলে–হামলা করবে।

ক্যাটওয়াকে পড়ে থাকা ম্যাগহুক তুলে নিল তিশা, ফ্রেঞ্চ কমাণ্ডোর রক্তাক্ত করোটি তাক করল। দাপাদাপি করছে লোকটা, কিন্তু তিশার হাতে সময় আছে। সাবধানে ম্যাকহুকের ট্রিগার টিপে দিল ও।

ভিভাদিয়েখের মুখের উপর আঘাত হানল হুক। আধ সেকেণ্ড। পর ধপ্ করে ক্যাটওয়াকের উপর পড়ল লোকটা। দু টুকরো হয়ে গেছে তার করোটি। গোটা ক্যাটওয়াক জুড়ে গড়াগড়ি করছে রানা ও ফিউভিল। নানান আওয়াজ শুনছে রানা হেলমেট ইন্টারকমে।

… ওরা আরেক দিকে যাচ্ছে!

অন্য মই বেয়ে…

উপরের ক্যাটওয়াকে ধপধপ আওয়াজ।

খুব কাছেই কোথাও ব্যবহার করা হলো ক্রসবো। স্ন্যাপ আওয়াজ। ক্রসবোর বোল্টে আরেকটা তীর বসিয়ে নিয়েছে ফিউভিল। বিশালদেহী ফ্রেঞ্চের নাইট-ভিশনের নীচে, মুখের উপর কনুই নামিয়ে আনল রানা। ভ করে বসে গেল লোকটার নাকের হাড়। রানার হাতের চারপাশে ছিটকে লাগল রক্ত। ঝাপসা হলো ফ্রেঞ্চ কমাণ্ডোর গগলস।

রাগে গরগর করছে ফিউভিল, গায়ের জোরে ধাক্কা দিয়ে রানাকে ক্যাটওয়াকের কিনারায় পাঠিয়ে দিল সে। দুজনের মাঝে দেড় ফুট দূরত্ব। এখনও ক্যাটওয়াকে পড়ে আছে সে, গগলসের উপর রক্ত পড়ায় প্রায় অন্ধ হয়ে উঠেছে। গনগনে রাগ নিয়ে ঘুরল সে, ক্রসবো তাক করল রানার মাথা লক্ষ্য করে।

ক্যাটওয়াকের কিনারায় রেলিঙের পাশে পড়েছে রানা, বিদ্যুদ্বেগে চলছে মগজ। ঝটকা খেয়ে ফিউভিলের হাত ঘুরতেই খপ করে ক্রসবো ধরল ও, আধ সেকেণ্ড পর শরীর গড়িয়ে দিয়ে নেমে গেল ক্যাটওয়াক থেকে!

শত্রু এমন করবে ভাবতেও পারেনি ফিউভিল।

ক্রসবো ছাড়ছে না রানা, নিজে পড়তে শুরু করেছে গভীর শাফটে। মুহূর্ত পর থেমে গেল পতন, এখনও ঝুলছে লোকটার ক্রসবো ধরে। একবার শরীর দুলিয়ে নেমে পড়ল নীচের ডেকে, সঙ্গে এনেছে লোকটার ক্রসবো। এখনও দুই পায়ে দাঁড়িয়ে আছে, এবার ডি-ডেকের ক্যাটওয়াকের দিকে তাক করল ক্রসবো, পরক্ষণে টিপে দিল ট্রিগার।

এখনও ক্যাটওয়াকে মুখ দিয়ে পড়ে আছে ফিউভিল, বেকায়দা ভাবে ডান হাত ঝুলছে বাইরে। ক্রসবো ডিসচার্জ হতেই পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জে ইস্পাতের গ্রিলের ভিতর দিয়ে ঢুকল তীরফিউভিলের নাইট-ভিশন গগলসের ভিতর কাত হয়ে ঢুকল, গাঁথল গিয়ে ফরাসি সৈনিকের কপালের পাশে।

.

ড্রিলিং রুমে ফ্রেঞ্চ কমাণ্ডোর ক্রসবোর মুখে থমকে গেছে নাজমুল।

ফ্রেঞ্চ লোকটা ভাবছে সে সুবিধাজনক অবস্থানে আছে। বলতে গেলে মরেই গেছে শত্রু। কিন্তু একটা কথা একদম ভুলে গেছে সে।

নাইট-ভিশন ব্যবহার করলে খুব খারাপ হয় পেরিফেরাল, ভিশন।

লোকটা অনেক বেশি কাছে। এবং সে-কারণে দেখতেই পায়নি কোমরের কাছে ম্যাকহুক ধরে আছে শত্রু।

বিন্দুমাত্র দেরি না করে ফায়ার করল নাজমুল। লঞ্চার থেকে ছিটকে বেরুল ম্যাগহুক, মাত্র তিন ফুট পেরিয়ে বিঁধল ফরাসি সৈনিকের বুকে। বিশ্রী মটমট আওয়াজ উঠল। ভিতর দিকে ডেবে গেল কমাণ্ডোর পাঁজরের খাঁচা, ভাঙা কয়েকটা হাড় ঢুকে গেল হৃৎপিণ্ডে। মেঝেতে পড়বার আগেই মারা গেল লোকটা।

বড় করে শ্বাস নিল নাজমুল, আস্তে করে দম ফেলল। যাক, বাঁচা গেছে! ড্রিলিং রুমের ভিতর অংশে চোখ গেল। ফ্রেঞ্চ কমাণ্ডো কী করছিল দেখে হা হয়ে গেল ওর মুখ। মনে পড়ল, একটু আগে কী বলছিল লোকটা–লে পেইজ এস্ত তেন্দু।

দ্বিতীয়বার ঘরে চোখ বোলাল নাজমুল, তারপর হেসে ফেলল।

.

দক্ষিণ টানেল, মাসুদ ভাই, রানার হেলমেট ইন্টারকমে এল মোরশেদের কণ্ঠ।

ফিউভিলের হাত বেয়ে আবারও ই-ডেকে নেমে এসেছে রানা। তখনই কালো পোশাক পরা এক লোককে পুলের ওপাশে দক্ষিণ টানেলে ঢুকতে দেখেছে। ওই লোক শেষ ফ্রেঞ্চ কমাণ্ডো। দড়ি দিয়ে শাফট বেয়ে নেমেছে সে।

আমি ওকে দেখেছি, ছুটতে শুরু করেছে রানা।

স্যর, আমি নাজমুল, হঠাৎ শোনা গেল কর্পোরাল নাজমুলের কণ্ঠ। আপনি কি এইমাত্র দক্ষিণ সুড়ঙ্গের কথা বললেন?

হ্যাঁ।

তাকে আসতে দিন, স্যর। দৃঢ় শোনাল নাজমুলের কণ্ঠ। তার পিছনে আসেন।

ব্যাপার কী, নাজমুল? মৃদু কুঁচকে গেল রানার ভুরু।

তার পিছনে আসেন, স্যর, এবার ফিসফিস করে বলল নাজমুল। সে চায় আপনি ওর পিছন পিছন আসেন।

এক পলক থামল রানা, তারপর জিজ্ঞেস করল, নাজমুল তুমি বোধহয় এমন কিছু জানো, সেটা আমি জানি না?

জী, স্যর।

সার্জেন্ট জনি ওয়াকার, গানারি সার্জেন্ট ভাইপার ও তিশা ইডেকে রানার : পাশে দক্ষিণ সুড়ঙ্গের মুখে পৌঁছেছে। সবাই হেলমেট ইন্টারকমে নাজমুলের বক্তব্য শুনতে পেয়েছে।

এদের সবাইকে দেখে নিল রানা, তারপর হেলমেট মাইকে বলল, ঠিক আছে, নাজমুল, দেখা যাক কী করো।

ই-ডেকের দক্ষিণ টানেলে ঢুকে পড়ল ওরা। বেশ কিছুক্ষণ হেঁটে যাওয়ার পর সুড়ঙ্গের শেষমাথায় দেখল একটা দরজা। এইমাত্র সবজেটে আলোয় দরজা পেরিয়ে ঘরে ঢুকে পড়েছে কালো এক মূর্তি।

নাজমুল ঠিকই বলেছে। লোকটা খুব ধীরে হাঁটছিল। যেন বোঝাতে চেয়েছে, সে ড্রিলিং রুমে ঢুকবে।

এগিয়ে চলেছে রানা ও অন্যান্যরা। ড্রিলিং রুমের দরজার দশ গজ দূরে পৌঁছে গেছে, এমন সময় হঠাৎ করেই অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এল একুটি হাত, টান দিল রানার বাহু ধরে। চরকির মত ঘুরল রানা, ঘুষি মারবার আগেই দেখল দেয়ালে বসানো কাবার্ড থেকে উদয় হয়েছে নাজমুল। ওর পিছনে কাবার্ডের ভিতর আরেকটা দেহ। নিজের ঠোঁটের উপর আঙুল রাখল নাজমুল, তারপর সবাইকে এগুতে ইশারা করে রওনা হলো ড্রিলিং রুমের দরজার দিকে।

ফাঁদ পেতে বসে আছি, দরজার কাছে গিয়ে নিচু স্বরে বলল নাজমুল। টান দিয়ে দরজা খুলল। জোরালো কটকট আওয়াজ তুলে বাইরের দিকে খুলে গেছে দরজা।

ঘরের দূর-দেয়ালের কাছে ফ্রেঞ্চ কমাণ্ডোকে দেখল ওরা। লোকটা ফ্রেঞ্চ দলের নেতা জ্যাকুস ফিউভিল। লোকটা বুঝে গেছে। ফাদে পড়েছে।

আমি… আমি… সারেণ্ডার করছি, দুর্বল স্বরে বলল সে।

লোকটার দিকে চেয়ে আছে রানা। পাশ ফিরে নাজমুল ও অন্যদের দিকে চাইল। পরামর্শ আশা করছে। এক সেকেন্ড পর পা রাখল ড্রিলিং রুমের ভিতর।

মনে হলো স্বস্তির হাসি হাসল ফিউভিল।

ঠিক তখন পিছন থেকে হাত বাড়িয়ে রানার বাহু ধরল নাজমুল। থেমে গেছে রানা, ঘুরে চাইল। ফিউভিলের দিকে চেয়ে আছে নাজমুল।

ভুরু কুঁচকে ফেলল ফিউভিল।

এক সেকেণ্ড পর নাজমুল বলল, …লে পেইজ এস্ত তেন্দু।

মাথা কাত করে চাইল ফিউভিল।

তাই বলেছে? বলল রানা। তার মানে, ফাঁদ পাতা হয়েছে।

 হঠাৎ করেই অন্য কীসের দিকে যেন চোখ চলে গেল ফিউভিলের। জিনিসটা তার সামনে, মেঝের উপর। হঠাৎ করেই লোকটার হাসি ম্লান হয়ে গেল। আতঙ্কিত চোখে চাইল নাজমুলের দিকে।

নাজমুল জানে, কী দেখেছে জ্যাকুস ফিউভিল।

পাঁচটা ফ্রেঞ্চ শব্দ পড়তে পারল ফিউভিল, বুঝে গেল মস্ত ভুল করেছে মৃত্যু এবার অনিবার্য!

ওই পাঁচ শব্দ হচ্ছে: ব্যাখায়েখ সে কোসে সুখ লেনেমি।

অর্থাৎ, শক্রর এপাশে চলে আসুন!

হাসি-হাসি চেহারা করে সামনে বাড়ল নাজমুল, একই সময়ে না! বলে উঠল ফিউভিল। কিন্তু দেরি করে ফেলেছে। দরজার সামনে ট্রিপ-ওয়ায়ারে পা ফেলল নাজমুল।

ড্রিলিং রুমের ভিতর প্রচণ্ড শব্দে বিস্ফোরিত হলো দুটো কংকেভ মাইন!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *