১.১৪ কসাইখানা হয়ে উঠেছে উইলকক্স

কসাইখানা হয়ে উঠেছে উইলকক্স আইস স্টেশনের পুল। সিডেকের অ্যালকোভে হতবাক হয়ে গেছে মাসুদ রানা।

বরফ-ঠাণ্ডা পানিতে ধোঁয়া বা মেঘের মত ছড়িয়ে পড়ছে তাজা রক্ত। কোথাও কোথাও অনেক বেশি পরিমাণে, ওদিকটায় কিলার ওয়েইলগুলোকেও স্পষ্ট দেখা গেল না।

পুলের একদিকে ফ্রেঞ্চ কমাণ্ডোরা, বেশির ভাগ হামলা হচ্ছে তাদেরই উপর। এরই ভিতর দুজন লোক হারিয়েছে তারা। পুলের কিনারে ধাতব ডেকে উঠবার জন্যে উন্মাদের মত সাঁতরে, চলেছে নাজমুল, নিশাত ও তিন বিজ্ঞানী।

পুরো পথ তীক্ষ্ণ চিৎকার ছেড়েছে পিঙ্ক পারকা পরা মেরি, ঝপাস্ করে চিত হয়ে নেমেছে পুলে, এবং সঙ্গে সঙ্গেই টুপ করে ডুবে গেছে।

ঝট করে দবিরের দিকে চাইল রানা, বি-ডেকের উল্টো রেলিং থেকে ঝুলছে সার্জেন্ট।..

পলকের জন্য চোখে চোখ পড়ল দুজনের। একদম হেরে যাওয়া চেহারা দবিরের, ভীষণ বিরক্ত ও ক্লান্ত, লালচে দুই চোখ বলে দিল পরাজয় মেনে নিয়েছে। আর কিছুই করবার নেই ওর।

কিন্তু রানার কিছু করবার আছে। ঠোঁটে ঠোঁট চেপে বসেছে ওর, বর্তমান পরিস্থিতি বুঝে নিয়েছে।

পুলের আরেক দিকে ডাইভিং বেলের ওপাশে পড়েছে মেরি, ওদিকের পানি এখনও ফাঁকা। অন্যরা পৌঁছে গেছে, পুলের কিনারায়, মহাব্যস্ত হয়ে পানি ছেড়ে উঠতে চাইছে। কেউ খেয়াল করেনি ছোট্ট মেয়েটা পুলের ভিতর পড়েছে।

পুলের দিকে চেয়ে আছে রানা, শুনতে পেল সার্জেন্ট জনি ওয়াকারের কণ্ঠ। সার্জেন্ট ভাইপার ওরফে পল সিংগার ও বাংলাদেশ আর্মির লেফটেন্যান্ট গোলাম মোরশেদের সঙ্গে দ্রুত কথা বলছে সে। ফ্রেঞ্চ কমাণ্ডোদের বিরুদ্ধে এ-ডেকে তুমুল গোলাগুলি চলছে ওয়াকার ও মোরশেদের।

… ওদের নিয়ে যাও দক্ষিণে….

ওরাও অস্ত্র ব্যবহার করতে পারবে না…

ঘুরে দাঁড়াল রানা, কাজে লাগবে এমন জরুরি কিছু খুঁজছে দুই চোখ।

একটু দূরে নির্জন অ্যালকোভ। কয়েক মুহূর্ত হলো তিশাকে পুল ডেকে পাঠিয়েছে। ভেবেছিল নিজে দবিরকে সাহায্য করতে যাবে। কিন্তু তার আগেই পড়ে গেল মেয়েটা। বেচারি আছে এখন পুলের ভিতর কিলার ওয়েইলদের সঙ্গে।

পিছনে কন্সেলের বোতামগুলো দেখল রানা, ওখানে একটা লিভারের নীচে লেখা: ডাইভিং বেল উইঞ্চ।

ওটা দিয়ে কিছু হবে না।

ওর চোখ আটকে গেল বড় চৌকো এক বোতামের উপর। তার নীচে লেখা: ব্রিজ।

নীচের পুলের দিকে আবারও চাইল রানা, ওর মনে পড়েছে নিনা ভিসারের কথা: এখান থেকেই স্টেশনের মাঝে বাড়িয়ে দেয়া যায় রিট্রাক্টেবল ব্রিজ।

এক লাফে অ্যালকোভে পৌঁছে গেল রানা, বড় চৌকো বোতামটা টিপে দিল, সঙ্গে সঙ্গে শুনল পায়ের নীচে জোরালো গুঞ্জন।

কী যেন পাশের দেয়ালের ওদিক থেকে গুনগুন করছে। মেঝের তলা থেকে বেরিয়ে পুলের উপর যাচ্ছে সরু এক প্ল্যাটফর্ম। ওদিক থেকেও একটা আসছে। দুটো মিলিত হবে ক্যাটওয়াকের নীচে।

এবার আর এক সেকেণ্ডও নষ্ট করল না রানা, ব্রিজের উপর দিয়ে দৌড়াতে শুরু করল। ওর চেয়ে অনেক দ্রুত সামনে বাড়ছে সেতু। ওটা বেশি চওড়া নয়, বড়জোর দুই ফুট, দুদিকে কোনও রেলিংও নেই। ওদিক থেকে আসছে অন্য অংশ, মাঝে মিলিত হবে; বড় করে শ্বাস নিল রানা, দৌড়ের গতি আরও বাড়িয়েছে, হঠাৎ করেই কোনাকুণি ভাবে লাফ দিল সেতুর উপর থেকে।

ওদিকে অবাক হয়ে চেয়ে আছে সার্জেন্ট হোসেন আরাফাত দবির। বিশাল কূপের মাঝে তীরের মত ছুটছে মাসুদ স্যর, ডাইভিং বেলের উপর দিয়ে পেরিয়ে গেল, তারপর পড়তে লাগল বরফ-ঠাণ্ডা পুলের ভিতর।

ভারী ইটের মত পড়ছে রানা, তবে অদ্ভুত একটা কাজ করল। ঝট করে ডানহাত উপরে তুলল, কী যেন নিল কাঁধের পিছন থেকে।

যতটা পারে ছড়িয়ে দিয়েছে দুই পা, এখন আর পানির গভীরে তলিয়ে যাবে না। দুই হাতে শক্ত করে ধরেছে কাঁধের পিছন থেকে নেয়া জিনিসটা।

.

ভয় পেয়ে পুলের ভিতর ঘুরে দাঁড়িয়েছে মেরি ভিসার। ওর পাশে বিস্ফোরিত হয়েছে পানি।

মেরি ভেবেছিল ওটা কোনও কিলার ওয়েইল, কূপের অনেক গভীর থেকে উঠে এসেছে। কিন্তু মাথা ও মুখে লেগেছে কয়েক বালতি পানি। চোখ পরিষ্কার হতেই আবারও দেখল, ওর পাশেই পানির ভিতর নেমেছে এক লোক।

যোদ্ধাদেরই কেউ। এক মুহূর্ত পর টের পেল, এই লোককে আগেও দেখেছে, কথাও বলেছে। এই লোকটা বেশ ভাল। নামটা মনে করবার চেষ্টা করল মেরি। মাশুক, ভাবল। বা মাটুশ। ওই রকমই নাম।

ঠিক আছ তো, মেরি? জানতে চাইল লোকটা।

বোকা-বোকা চেহারায় উপর-নীচ মাথা দোলাল মেরি।

উপর থেকে পানিতে পড়েছে লোকটা, কান থেকে খুলে গেছে ইয়ারপিস। ওটা ঠিক করে নিল সে। লোকটার দুই চোখের মণি–কুচকুচে কালো। অন্য কারণে হঠাৎ করেই চমকে গেল মেরি, কী যেন হুশ করে পাশ কাটিয়ে গেছে। পরক্ষণে বুঝল ওটা একটা কিলার ওয়েইল।

দুজনের মুখের পাশ দিয়ে চলে গেল ওটার কালো, উঁচু ডরসাল ফিন। তারপর খুব ধীরে তলিয়ে গেল।

তীব্র আতঙ্কে হাঁপাতে শুরু করেছে মেরি।

ওর পাশে পানির গভীরে চোখ রেখেছে লোকটা। ওরা পুলের যেখানে আছে, সেখানে রক্ত ছড়িয়ে পড়েনি। নীচে শুধু স্ফটিকের মত স্বচ্ছ নীল পানি।

লোকটার চোখ লক্ষ্য করে পানির নীচে চাইল মেরি। এক সেকেণ্ড পর ভীষণ চমকে উঠল। মস্ত হাঁ করে ওর পায়ের দিকে ছুটে আসছে এক কিলার ওয়েইল!

টানা চিৎকার শুরু করেছে মেরি, কিন্তু ওর পাশের লোকটা চুপ করে আছে। ভঙ্গি দেখে মনে হলো ভয়ডর বলে কিছু নেই, সম্পূর্ণ নির্বিকার। এক সেকেণ্ড পর পানির দিকে দুই হাতে তাক করল সাবমেশিন-গানের মত জিনিসটা। পেরিয়ে গেল একটা সেকেণ্ড, তারপর খুনি তিমির দিকে চেয়ে টিপে দিল ট্রিগার।

কিন্তু গুলির আওয়াজ হলো না।

জোরালো ঘটাং আওয়াজ করে কী যেন বের হয়েছে।

রানার লঞ্চারের মাযল থেকে ছিটকে বেরিয়েছে গেল, ম্যাগনেটিক এ্যাপলিং হুক। পানির ভিতর সোজা গিয়ে গেঁথেছে তিমির নাকে। প্রচণ্ড ব্যথা পেয়ে চমকে উঠেছে তিমি, থমকে গেছে স্থানুর মত।

মেরিনদের এই লঞ্চার প্রতি বর্গ ইঞ্চিতে চার হাজার পাউণ্ড ধাক্কা তৈরি করে, গন্তব্যে পৌঁছে দেয়, এ্যাপলিং হুককে। রানা নিশ্চিত ছিল না এই জিনিস থামাবে সাত টনি কিলার ওয়েইলকে। জল্পটাও চমকে গেছে তার সঙ্গে কেউ লড়তে এসেছে দেখে।

পর পর দুবার লঞ্চারের ট্রিগারে চাপ দিল রানা, সঙ্গে সঙ্গে ফিরতে লাগল গ্র্যাপলিং হুক।

পুরো আস্ত আছ তো? মেরির দিকে চাইল রানা, হাত পায়ের সব আঙুল আছে?

হাসি-হাসি দুই চোখের দিকে চাইল মেরি, বোকার মত মাথা দোলাল।

তা হলে চলো লেজ তুলে পালাই, মেরির হাত ধরে সঁতরাতে শুরু করল রানা।

.

পুলের ধারে পৌঁছেছে নিনা ভিসার, হাঁকুপাঁকু করে উঠে গেল ইস্পাতের ডেকে, ঘুরে চাইল। একটু দূরে প্রাণপণে সাঁতরাচ্ছে রলিন্স ও রাফায়লা।

তাড়াতাড়ি! চেঁচিয়ে উঠল নিনা। তাড়াতাড়ি!

আগে পৌঁছুল রাফায়লা, দুই হাতে তার হাত ধরল নিনা, টান দিয়ে তুলে নিল, ডেকে।

হাঁপাতে হাঁপাতে আসছে রলিন্স, এখনও দুই গজ দূরে।

আরও জলদি, রলিন্স!

আর মাত্র এক গজ পেরুতে পারলেই…

রলিন্স ক্লান্ত ও হতাশ চোখে চাইল, ডেকের কিনারে হাঁটু গেড়ে অপেক্ষা করছে নিনা ভিসার।

তারপর পৌঁছে গেল রলিন্স, অলিম্পিকের চ্যাম্পিয়ন সাঁতারুর মত বুক দিয়ে ধপ করে বাড়ি দিল ডেকের পাশে। বিজয়ীর মত হাত বাড়িয়ে দিয়েছে, সামনে ঝুঁকে খপ করে তার হাত ধরল নিনা। ডেকের উপর টেনে তুলছে, এমন সময় লোকটার পিছনের পানি চিরে দেখা দিল খুনি তিমি। মস্ত হাঁ করেছে ওটা, মুহূর্তে রলিন্সের পা থেকে শুরু করে বুক পর্যন্ত চোয়ালের ভিতর পুরে নিল।

ক্ষুরের মত দাঁতগুলো পাজরে বসতেই জিওলজিস্টের দুই চোখ বিস্ফারিত হলো। এখনও তার দুই হাত ধরে প্রাণপণে টানছে নিনা। কিন্তু ওদিক থেকে এল অনেক বেশি জোরালো টান। এক সেকেণ্ড পর পানির নীচে নামল কিলার ওয়েইলের বিশাল মাথা, সরিয়ে নিতে শুরু করেছে শিকারকে। নিনা টের পেল, আতঙ্কিত বিজ্ঞানীর দুই হাতের নখ চিরে দিচ্ছে ওর হাতের চামড়া, বেরিয়ে আসছে রক্ত। এক মুহূর্ত পর ওর হাত থেকে ছুটে গেল লোকটা। ডেকের উপর ধপ করে পড়ে গেল ও। ভীত দৃষ্টিতে দেখল, মুহূর্তে তলিয়ে গেল রলিন্স।

.

এখনও ডেকের কয়েক গজ দূরে নিশাত ও নাজমুল। গায়ের সমস্ত শক্তি ব্যবহার করে আসছে ওরা। কোনওদিকে চাওয়ার সময় নেই নাজমুলের, কিন্তু এমপি-৫-র নল পানির নীচে ডুবিয়ে গুলি করছে নিশাত। বাংলাদেশ আর্মি কলেজে শিখেছে: পানির নীচে গুলি ভাল কোনও ফলাফল এনে দেয় না। পানিতে মাত্র ছয় গজ গেলেই সাধারণ বুলেটের ভেলোসিটি প্রায় ফুরিয়ে যায়। এরপর একটু গিয়েই টুপ করে ডুবে যায়।

এই কঠিন বাস্তব যেন মানতে চাইছে না নিশাত। ও অপেক্ষা। করছে, তারপর খুনি তিমি কাছে আসতেই গুলি শুরু করছে। বুঝতে পারছে, ওই দানবগুলোর পুরু চামড়া ভেদ করছে বুলেট। অবশ্য তাতে বড় কোনও ক্ষতি হচ্ছে না। নিশাতের গুলির তোড়ে বাঁক নিয়ে অন্য দিকে সরছে কিলার ওয়েইল, কিন্তু তা কয়েক মুহূর্তের জন্য, তারপর আবারও ফিরছে, যেন এরকম সামান্য চিমটিতে কিছুই যায় আসে না তাদের।

ডেকের পাশে পৌঁছেছে নাজমুল, এবার উঠে পড়বে, চট করে কাঁধের উপর দিয়ে চাইল। একটু পিছনে আসছে নিশাত আপা।

বামদিকে চেয়ে আছে নিশাত; পানির নীচে গুলি পাঠাতে শুরু করেছে। তারপর হঠাৎ করেই হাতের ঝাঁকুনি থেমে গেল। মনে হলো খুব দ্বিধান্বিত হয়ে উঠেছে সে।

অস্ত্রটা আর গুলি ছুঁড়ছে না।

চেম্বারে ফেঁসে গেছে একটা বুলেট।

হতবাক নাজমুল দেখল, মহা-বিরক্তি নিয়ে এমপি-৫ ঝাঁকাতে শুরু করেছে আপা, মনে হলো ঝাঁকি দিয়েই অস্ত্র চালু করবে।

আর ঠিক তখনই নাজমুল টের পেল, পানির নীচ দিয়ে কালো কী যেন উঠে আসছে নিশাতের ডানদিকে।

আপা! গলা ফাটিয়ে চেঁচিয়ে উঠল নাজমুল, ডানদিকে!

শুনতে পেয়েছে নিশাত, ঝট করে ঘুরে গেছে ওদিকে। এবং দেখেও ফেলেছে, পিছনে উঠে আসছে খুনি তিমি। এখন আর কোনও কাজে আসবে না অস্ত্র। পানির ভিতর সরে যেতে চাইল নিশাত, দুই পা ভাঁজ করে তুলে নিল বুকের কাছে। এক সেকেণ্ড পর কয়েক ইঞ্চির ব্যবধানে ওর পিছন দিয়ে চলে গেল কিলার ওয়েইল।

নাজমুল মাত্র ভাবতে শুরু করেছে, নিশাতকে পাশ কাটিয়ে চলে গেছে খুনি, কিন্তু ঠিক তখনই টের পেল, গতিপথ পাল্টে নিয়েছে ওটা, ভেসে উঠেছে পানির উপর, চোয়ালের ভিতর খপ করে পুরে নিয়েছে অস্ত্র সহ নিশাতের হাত।

তীব্র ব্যথা পেয়ে এমপি-৫ ছেড়ে হ্যাঁচকা টান দিয়ে ছাড়িয়ে নিল সে হাতটা। অস্ত্রের উপর কামড় পড়তেই চিবাতে শুরু করেছে তিমি।

কবজি থেকে রক্ত বেরুচ্ছে নিশাতের। আশপাশের পানি লাল হয়ে উঠছে।

পাত্তা দিল না নিশাত, হাত যে আছে এই তো বেশি! অস্ত্রটা অবশ্য হারিয়েছে। ডেকের কাছে পৌঁছতে ব্যস্ত হয়ে উঠল।

নাজমুলের মনে হলো, খোদ শয়তানের তাড়া খেয়েছে আপা। নিজে দুই হাতে ভর দিয়ে উঠে এল প্ল্যাটফর্মে, তাড়া দিল: জলদি আপা! আরও জলদি!

টর্পেডোর মত অবসছে নিশাত সুলতানা।

প্ল্যাটফর্মের কিনারায় হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল নাজমুল। নিশাতের পিছনে আবার দেখা দিয়েছে কালো ছায়া।

ওরকম কালো ছায়া পুলের চারপাশে। অনেক।

তারপর হঠাৎ করেই বুঝল নাজমুল, কোনওভাবেই ডেকে পৌঁছবে না আপা!

যেন ওর ভাবনা বাস্তব করতেই হঠাৎ নিশাতের ছুটন্ত দুই পায়ের পিছনে হাজির হলো বিশাল এক কালো দানব।

হতবাক নাজমুল দেখল, ওখানে মৃদু কাপছে সুবোধ-শান্ত পানি, তার ভিতর দিয়ে খুব ধীরে এল ওটা, বিশাল সাদা-কালো চোয়ালের ভিতর দেখা দিল লালচে কী যেন।

চওড়া মুখ খুলছে খুনি তিমি!

করাতের মত দাঁতগুলো বেরিয়ে আসতেই রক্ত হিম হয়ে এল নাজমুলের। স্বচ্ছ পানির ভিতর দেখল, নিশাতের পিছনে বিশাল কালো ডরসাল ফিন খুব ধীরে উঠছে আর উঠছে, তারপর বেচারি আপার পাদুটো ঢুকে গেল তিমির চোয়ালের ভিতর।

তখনও পা ছুঁড়ছে নিশাত।

এক মুহূর্ত পর তিমি নিশ্চিত হলো শিকার ধরা পড়েছে, আস্তে করে চোয়াল বন্ধ করল নিশাতের হাঁটুর একটু উপরে।

.

মানসিক ও শারীরিক প্রচণ্ড ঝাঁকি খেয়েছে নিশাত, ওর জানা ছিল না কোনও হামলা এমন ভয়ঙ্কর হতে পারে।

হতচকিত নাজমুল দেখল, নিশাতকে অনায়াসে নীচে নিয়ে যাচ্ছে তিমি। চারপাশের পানি ভরে উঠছে ফেনা ও বুদ্বুদে, তার ভিতর ফিনকি দিয়ে পড়ছে রক্ত। উন্মাদিনীর মত ছটফট করছে নিশাত, চোয়ালের কারাগার থেকে বেরুতে চাইছে।

হঠাৎ ভেসে উঠল নিশাত, একইসঙ্গে উঠে এসেছে তিমিটাও। পানির নীচে ঝটকা-ঝটকি করতে গিয়ে কীভাবে যেন চোয়ালের থেকে এক পা ছুটিয়ে নিতে পেরেছে নিশাত, তিমির নাকের সামনে আবারও সাঁতরাতে শুরু করেছে।

শুয়োরের বাচ্চা! চিল্কার করে গালি দিল।

কিন্তু ওর অন্য পা কোনওভাবেই ছাড়ছে না তিমি।

হোঁচট খেয়ে সামনে বাড়ল নিশাত, মুখের কাছে দেখা দিল সাদা স্রোত। ওকে ঠেলে নিচ্ছে তিমি। একটু সামনে নাজমুল ও প্ল্যাটফর্ম!

তারপর দড়াম করে ডেকের সঙ্গে বাড়ি খেল নিশাত। কী করে যেন শক্ত করে ধরে ফেলেছে ধাতব প্ল্যাটফর্মের গ্রিল।

খুন করে ফেলব, হারামজাদা! দাঁতে দাঁত চিপে চিৎকার ছাড়ল নিশাত। শালা, শুয়োরের বাচ্চা!

দুই হাতে শক্ত করে প্ল্যাটফর্ম ধরেছে নিশাত। ঝটকা দিয়ে। সামনে বাড়ল নাজমুল, খপ করে ধরে ফেলল নিশাতের দুই হাত, প্রাণপণে টানছে পিছন দিকে। এবার শুরু হলো তিমির সঙ্গে টাগঅভ-ওয়ার। মাঝে বেকায়দা ভাবে আটকা পড়েছে নিশাত।

তারপর নাজমুল দেখল হোলস্টার থেকে কোল্ট অটোমেটিক রিভলভার বের করল নিশাত, কিলার ওয়েইলের মাথা তাক করেই গুলি ছুঁড়ল।

মর শালা! বলল নাজমুল।

কী? খাবি? তিমির উদ্দেশ্যে চিৎকার করল নিশাত, এটা খেয়ে দ্যাখ!

ওর অস্ত্রের মাযলের মুখ থেকে ঝলকে উঠল হলুদ আগুন, সঙ্গে সঙ্গে জ্বলে উঠল চারপাশের গ্যাসীয় বাতাস। বিকট বিস্ফোরণটা নিশাত ও নাজমুলকে কমপক্ষে পাঁচ গজ পিছনে ছিটকে ফেলল ডেকের উপর।

তিমির কপাল এত ভাল নয়। ঠিক মগজে ঢুকেছে বুলেট। সঙ্গে সঙ্গে একের পর এক ঝাঁকি খেতে শুরু করেছে ওটা। পিছিয়ে চলেছে, আরও উপরের দিকে উঠছে মাথা। তারপর নিজের তৈরি রক্তের ধোঁয়ার ভিতর আস্তে করে নেমে গেল পানিতে। মুখে রয়ে গেল তার পুরস্কার–মারা যাওয়ার মাত্র পাঁচ সেকেণ্ড আগে নিশাতের বাম পায়ের হাঁটু কেটে নিয়েছে।

.

পুলের ঠিক মাঝে আছে মেরি ও রানা, একদিকে ডাইভিং বেল, ওদিকে পঁচিশ ফুট দূরে প্ল্যাটফর্ম। পরস্পরের দিকে পিঠ রেখে চারপাশ দেখছে। হতবাক হয়ে গেছে। চারপাশে কিছুই নড়ছে না। বড় বেশি শান্ত পানি, কোথাও কোনও আওয়াজও নেই।

স্যর, প্রায় ফিসফিস করে বলল মেরি। তিরতির করে কাঁপছে চোয়াল। ভয় এবং ঠাণ্ডায়।

কী, মেরি? চারপাশের পানিতে চোখ রেখেছে রানা।

আমার খুব ভয় লাগছে।

ভয়? কীসের জন্য? রানার নিজের কণ্ঠ একটু কেঁপে গেল। আজকাল তো বাচ্চারা কিছুই ভয় পায় না। এসব অনেক দেখে সি ওয়ার্ল্ডে।

কথাটা মাত্র বলেছে রানা, দুই চোখ বিস্ফারিত হলো, দেখল ঠিক সামনেই একটা কিলার ওয়েইল। পানির উপর নাক উঁচু করে তেড়ে আসছে মেরি এবং ওর দিকে!

মেরি, ডুব দাও! চেঁচিয়ে উঠল রানা। তেড়ে আসা তিমির চওড়া মুখ খুলে যেতেই দেখা দিয়েছে ছুরির মত দুই সারি সাদা দাত।

বড় করে দম নিয়েই ডুব দিল রানা, সঙ্গে হঁচকা টান দিয়েছে মেরিকে।

পানির ভিতর হঠাৎ করেই চারপাশ হয়ে উঠল নীরব, নিঃশব্দ। ওদের উপর দিয়ে তীব্র গতি তুলে পেরুল বিশাল সাদা পেট, খ্যা আওয়াজ তুলে ঘষা দিল রানার হেলমেটের উপর অংশে। আবারও জোর ঝপাস্ আওয়াজ তুলে পানির উপর পড়ল তিমির মাথা, এখনও এগিয়ে যাওয়ার গতি কমেনি।

এই সুযোগে মাথা তুলল রানা ও মেরি, হাঁ করে দম নিতে চাইছে।

চট করে বামদিকে চাইল রানা, ওদিকে প্ল্যাটফর্মের উপর নাজমুল ও নিশাত। ডানদিক দেখল, নিরাপদেই ওই ডেকে উঠেছে নিনা ভিসার ও. রাফায়লা ম্যাকানটায়ার। দ্রুত সরছে কিনারা থেকে।

চরকির মত ঘুরল রানা, জোরালো টান খেয়ে এইমাত্র তলিয়ে গেল আরেক ফ্রেঞ্চ কমাণ্ডো! লোকটা প্রায় পৌঁছে গিয়েছিল ডেকের কাছে। চাপা শ্বাস ফেলল রানা, অন্যদের চেয়ে অনেক বেশি দূর পেরুতে হবে ওদেরকে। উপর থেকে ওরা পড়েছে পুলের ঠিক মাঝে।

মরুক শালার ফ্রেঞ্চগুলো, ভাবল। উপরের দিকে চাইতেই দেখল সি-ডেকের মাঝে কূপের উপর রিট্র্যাক্টেবল ব্রিজ। পরক্ষণে কান ফাটানো আওয়াজে চমকে গেল। সি-ডেকের অ্যালকোভের ভিতুর বিকট বিস্ফোরণ হয়েছে। সাদা আগুনের বিশাল লকলকে জিভ চেটে দিল সেন্ট্রাল শাফটের বাতাসকে।

রানা বুঝে গেছে কী হয়েছে। এ-ডেকের ফ্রেঞ্চরা ভাল করেই। জানে গোলাগুলি অসম্ভব, কাজেই শাফটের ভিতর গ্রেনেড ফেলছে। বুদ্ধি আছে কুকুরগুলোর! গ্যাস মিশ্রিত বাতাসে গ্রেনেড ফাটলে ক্ষতি হবে দ্বিগুণ। লোকগুলোর প্রথম টর্গেট ছিল উপরের ওই অ্যালকোভ। একটু আগে তিশা আর রানা ওখান থেকে গুলি করছিল। করছিল।

 হঠাৎ আগুনের গোলকের ভিতর থেকে বেরিয়ে এল কী যেন।

ওটা বেশ বড় ও ধূসর, চৌকো আকৃতির, গড়িয়ে পড়ে গেল মাঝের কূপে। বড় দ্রুত পড়ছে পুলের দিকে। শোঁ-শোঁ আওয়াজ তুলে বাতাস কেটে নামছে বিপুল ওজন নিয়ে। এক সেকেণ্ড পর বজ্রের মত জোর আওয়াজ তুলে নীচের প্ল্যাটফর্মে নামল চার শ পাউণ্ডের ইজেকশন সিট। একটু আগে সি-ডেকের অ্যালকোভে, কসোলের সামনে ছিল। ধাতুর ডেকের বুকে গভীর ট্যাপ ফেলল ওটার নিখাঁদ ইস্পাতের শরীর।

চারপাশে নানা হৈ-চৈ ও আওয়াজ, কিন্তু রানার চোখ আটকে গেছে তিনতলা উপরের রিট্রাক্টেবল ব্রিজের উপর। দূরত্বটা মেপে নিচ্ছে।

তিরিশ ফুট। বড়জোর পঁয়ত্রিশ ফুট?

সময় নষ্ট করল না রানা, তুলে ধরল ম্যাগহুক, বুড়ো আঙুলে এম লেখা বোতাম টিপে দিল। জ্বলে উঠেছে লাল বাতি, এ্যাপলিং হুক অ্যাকটিভেট হয়েছে। এবার কাজ করবে ম্যাগনেট।

ট্রিগার টিপতেই ম্যাগহুক থেকে ছিটকে বেরুল ম্যাগনেটিক হেড, খটাং শব্দে আটকে গেল রিট্রাক্টেবল ব্রিজের নীচে।

মনে মনে অংক কষল রানা: হিসাব শেষে বিড়বিড় করে বলল, ধূর!

মেরির হাতে ম্যাগহুক ধরিয়ে দিল, দ্রুত স্বরে বলল, মিষ্টি মেয়ে, একটা কথাই বলব: ভুলেও এটা ছাড়বে না!

দুই হাতে লঞ্চার ধরেছে মেরি, অবাক হয়ে রানার দিকে চাইল।

আশ্বাস দেয়ার ভঙ্গিতে হাসল রানা, বলল, শুধু শক্ত করে ধরো।

এবার ম্যাগহুকের গ্রিপে কালো বোম চাপ দিল রানা। হঠাৎ পানি ছেড়ে আকাশে উড়াল দিল মেরি, উঠছে ম্যাগহুকের টানে। ওটা যেন অদ্ভুত কোনও ছিপ, উল্টো টেনে নিচ্ছে শিকারিকে।

মেরির ওজন কম, কোনও সমস্যা হচ্ছে না ম্যাগহুকের, যেন পাখির বাচ্চা তুলছে ব্রিজের দিকে। রানা জানত, ও নিজে ম্যাগহুকে ওজন চাপালে অনেক ধীরে উঠবে।

মেরিকে নাগালে পাওয়ার জন্য পানি থেকে লাফিয়ে উঠল এক কিলার ওয়েইল।

চমকে গেল রানা, বিশাল ওই তিমি পানি থেকে তুলে ফেলেছে গোটা দেহ, তীরের মত উঠছে শূন্যে।

ম্যাগহুকের টানে এখনও উপরে উঠছে মেরি, নীচে চেয়ে দেখল পানি থেকে ছিটকে উঠে আসছে তিমি। যেন স্রেফ নরক থেকেই উঠে আসছে ওটা, মুখ থেকে বেরুচ্ছে বিকট গর্জন!

ঠিক তখন উপরে ঠক আওয়াজ হলো।

ওর দিকে উঠে আসছে তিমি।

বিস্মিত হয়ে ফুঁপিয়ে উঠল মেরি, উপরে চাইল।

ও আটকে গেছে ব্রিজের নীচে।

আর উঠতে পারবে না!

বিশাল চওড়া হাঁ খুলেছে তিমি, পৌঁছে গেছে লাফের শেষে…

প্রাণপণে ম্যাগহুক আঁকড়ে ধরেছে মেরি, বুকের কাছে তুলে ফেলল দুই পা। ঠিক তখনই ওর নিতম্ব থেকে ছয় ইঞ্চি নীচে বিশ্রী খটাৎ আওয়াজ তুলল তিমির দাঁতগুলো, বন্ধ হয়ে গেছে চোয়াল।

চেয়ে রইল মেরি, কালো-সাদায় মেশানো তিমি আবারও নীচে পড়ছে। খুব দ্রুত ছোট হচ্ছে ওটা, তারপর ঝপাস্ করে নামল পুলে, তলিয়ে গেল। দানবটা কমপক্ষে তিরিশ ফুট লম্বা ছিল, পানির গভীর থেকে সোজা উঠে এসেছিল ওপরে।

হঠাৎ মেরির মুখের সামনে হাজির হয়েছে একটা হাত, ভয়ের চোটে আরেকটু হলে হার্ট অ্যাটাক করত, ছেড়েই দিত ম্যাগহুক।

ভয় নেই, সোনা-পাখি, বলে উঠল একটি কণ্ঠ, আমি।

মুখ তুলে হাসি-হাসি মুখটা দেখল, মেরি। এই মানুষটাকে খুব বিশ্বাস করি, ভাবল। নাম তো মনে নেই, কিন্তু ইনিই বই লিখতে গিয়ে লেখক নাম পেয়েছেন বন্ধুদের কাছ থেকে।

সার্জেন্ট হোসেন আরাফাত দবিরের হাতটা ধরল মেরি।

তিন সেকেণ্ড পর ওকে রিট্রাক্টেবল ব্রিজে নামিয়ে দিল মানুষটা। প্রথম কিছুক্ষণ হাঁপাল মেরি, তারপর খুশিতে কেঁদে ফেলল। ওর কাঁধে আস্তে করে হাত রাখল দবির, অবাক হয়েছে। এক সেকেণ্ড পর পারকার পকেটে হাত ভরল মেরি, বের করল হাঁপানি রোগের প্লাস্টিকের পাফার।

ওটা ব্যবহার করে বড় দুটো দম নিল মেরি, তারপর দবিরের চোখে চোখ রেখে বলল, সি ওয়ার্ল্ডে ওই জিনিস নেই!

.

পুলের মাঝে রানা খেয়াল করছে, ওকে ঘিরে অনবরত চক্কর কাটছে দুটো কিলার ওয়েইল। গালের সবচেয়ে ছোট এই দুটো। বোধহয় তরুণ বয়সী।

উপরের দিকে মুখ তুলে চেঁচিয়ে উঠল রানা, দবির, আমার ম্যাগহুক ফেলুন!

দেরি না করে সেতুর উপর শুয়ে পড়ল সার্জেন্ট, সরু প্ল্যাটফর্মের নীচে হাত বাড়িয়ে ডি-অ্যাকটিভেট করতে চাইছে গ্যাপলিং হুকের ম্যাগনেট।

জলদি, দবির! পুলের ভিতর থেকে এল রানার ব্যস্ত কণ্ঠ।

চেষ্টা করছি, স্যর! বলল সার্জেন্ট, এক মিনিট!

সেই সময় আমার কই!

সেতুর নীচে পুরো কাঁধ ঢুকিয়ে দিয়েছে দবির, গ্রিপের এম লেখা সুইচ পেতে চাইছে। ওটাই শক্তিশালী ম্যাগনেটকে অ্যাক্টিভেট ও ডি-অ্যাক্টিভেট করে

এ কাজ করতে গিয়ে হঠাৎ চমকে গেল দবির। আবছা শুনল, সেতুর উপর কার সঙ্গে যেন কথা বলছে মেরি!

ফ্রেঞ্চ কোনও কমাণ্ডো?

এবার যেন স্পষ্ট শুনল, লিলি, সাহায্য কর! ডাইভারকে সাহায্য কর!

পিটপিট করে চাইল দবির। ভাবতে শুরু করেছে, কাজের চাপে শেষে খারাপ হয়েই গেল মাথা।

.

পুলের ভিতর রানা বুঝে গেছে, মৃত্যু এবার অনিবার্য। চক্কর কাটছে দুই তিমি। একটা সামনে, অন্যটা পিছনে। এই ফাঁদ থেকে বেরুনোর কোনও উপায়ও নেই। 

হঠাৎ করেই চক্কর থামিয়ে আরেক দিকে রওনা হলো একটা তিমি। অজান্তে ঢোক গিলল রানা।

এবার খেলা খতম করতে আসবে ওটা।

খুব ধীরে ঘুরল, মাথা তাক করেছে রানার দিকে, পানির মাত্র একফুট নীচে আছে। ডরসাল ফিন আরও উপরে উঠল খুনি তিমির, তারপর হঠাৎ করেই মিসাইলের তীব্র গতি পেল। কালোসাদা মাথার ধাক্কা খেয়ে উপরে তৈরি হলো বড় ঢেউ। সরাসরি রানার দিকে আসছে খুনি তিমি।

চট করে ঘুরে চাইল রানা। না, কোথাও যাওয়ার নেই। এমন কোনও অস্ত্রও নেই যেটা ওটাকে ঠেকাবে।

তাই বলে হার মেনে নেব? ভাবল রানা। হ্যাঁচকা টানে হোলস্টার থেকে বের করে নিল ডেযার্ট পিস্তল, তুলে ধরেছে পানির উপর।

মনে মনে বলল, এভাবে যদি মরতে হয়, তো লড়েই মরব!

তীব্র বেগে আসছে তরুণ তিমি।

কিন্তু হঠাৎ করেই কালো কী যেন ঝপাৎ করে পড়ল রানার মুখের সামনে। ওর এবং তিমির মাঝে আছে ওটা।

এতই পিছলা, পানির ভিতর কোনও আওয়াজই করেনি, স্যাৎ করে সরে গেল রানার সামনে থেকে, প্রচণ্ড গতি তুলে আরেক দিকে রওনা হয়েছে।

ভাল করেই ওটা দেখেছে দুই তিমি, মুহূর্তে মনোযোগ হারিয়ে ফেলেছে রানার উপর থেকে। যে তিমিটা ছুটে আসছিল, সেটা রানার একফুট আগে বাঁক নিল, নতুন উদ্যমে ছুটল নতুন শিকার ধরতে।

হতভম্ব হয়ে গেছে রানা। ওটা আসলে কী? এক পলকের জন্য মনে হয়েছে, কোনও ধরনের সিল!

ঠিক তখনই সামনে পড়ল ম্যাগহুক। ওটা ডুবে যাওয়ার আগেই খপ করে ধরল রানা, উপরের দিকে চাইল। সেতুর উপর উপুড় হয়ে শুয়ে আছে সার্জেন্ট দবির, এক হাত সেতুর নীচে।

একবার ম্যাগহুক দেখে নিল রানা, বুঝল নতুন করে জীবন পেতে চলেছে।

আধ সেকেণ্ড পর হঠাৎ করেই ওর মুখের কাছে দেখা দিল ছোট্ট কালো একটা সুঁচালো মাথা। ভীষণ চমকে পানিতে চিত হয়ে পড়ল রানা। তবে বুঝেছে, ওটা মেরির লিলি— অ্যান্টার্কটিক গেযেলা সিল।

ভিজে যাওয়ায় ছোট্ট লাল কলার চকচক করছে, জন্তুটা কোমল চাহনি ফেলল রানার চোখে। তারপর রওনা হয়ে গেল আরেক দিকে। রানা শপথ করে বলতে পারবে, নিঃশব্দে হাসছিল ছোট্ট সিল। পুলের ভিতর অনায়াসে দুই তিমিকে ফাঁকি দিয়ে নানা দিকে ছুটছে।. .

হঠাৎ করেই বামদিকে মাথা ঘোরালো। বোধহয় শুনতে পেয়েছে অস্বাভাবিক কোনও শব্দ, হয়তো দেখেছে অন্য কিছু। একবার খুশি-খুশি ভঙ্গি করে রানার দিকে চাইল, তারপর পানির নীচ দিয়ে রওনা হয়ে গেল পুলের আরেক দিকে।

পানির সামান্য নীচ দিয়ে তীব্র গতি তুলে ছুটছে, যেন, সত্যিকারের কোনও টর্পেডো। তিমিগুলোকে বোকা বানাতে মুহূর্তে মুহূর্তে সরছে বামে বা ডানে, তারপর হঠাৎ করেই খাড়া ডাইভ দিয়ে নেমে গেল গভীর পানির ভিতর। এক সেকেণ্ড পর তিমিগুলো টের পেল, পালাতে শুরু করেছে তাদের শিকার। ঝন্টু করে বাক নিল তিনটে কালো ডরসাল ফিন, ব্যস্ত হয়ে ধাওয়া শুরু করল।

সুযোগটা আগেই নিয়েছে রানা, চলে এসেছে তীরের কাছে। আর মাত্র তিন ফুট পেরুলেই…

এমন সময় বড় ঢেউ ভীষণ দুলিয়ে দিল ওকে, পুরো এক পাক ঘুরে গেল ও–এইমাত্র প্রচণ্ড গতি তুলে ওকে পাশ কাটাল বিশাল এক তিমি। এইবার কামড়ে ধরবে, ভাবল রানা। কিন্তু তা নয়, ওটা পিছু নিয়েছে মায়াবী ফার সিলের।

ফোঁস করে শ্বাস ফেলল রানা, সামনে বেড়ে ধরে ফেলল ডেকের গ্রিল। দেরি না করে উঠে এল পানি থেকে, চোখ পড়ল তুবড়ে যাওয়া ইজেকশন সিটের উপর। একটু সামনে কাত হয়ে পড়ে আছে ওটা। ঘুরে চাইল রানা, চারপাশে হৈ-চৈ চলছে।

অনেক আগেই পানি থেকে উঠেছে নিনা ভিসার ও রাফায়লা ম্যাকানটায়ার, এখন দ্রুত চলেছে ই-ডেকের টানেল লক্ষ্য করে। একটু দূরে ক্যাপ্টেন নিশাত ও কর্পোরাল নাজমুল। নিশাতের উপর ঝুঁকে পড়েছে ছেলেটা, মনে হলো আপার পায়ের কোনও ক্ষত থেকে রক্ত থামাতে চাইছে।

পুলের উল্টো দিকে অবশিষ্ট দুই ফ্রেঞ্চ কমাণ্ডোকে দেখল রানা, তারাও নিরাপদ। চুপচুপে ভেজা, এইমাত্র ডেকে উঠেছে। তাদের একজন ওকে দেখেছে, দেখামাত্র হাত বাড়িয়ে দিয়েছে ক্রসবো বের করতে।

ঠিক তখনই চোখের কোণে নড়াচড়া দেখে ঘুরে দাঁড়াল রানা। পানির নীচ দিয়ে আসছে পরিচিতি কালো ছায়া।

মিষ্টি মেয়ে লিলি।

তার পিছনে তেড়ে আসছে বিশাল কালো-সাদা তিনটি দেহ। মনে হলো, কখনও হাল ছাড়বে না।

পানির সামান্য নীচে প্রচণ্ড গতি তুলছে লিলি। কয়েক মুহূর্ত পর পর পিছনে ঝটকা দিচ্ছে ফ্লিপারগুলোতে। হঠাৎ করেই কাত হয়ে গেল লিলি, পরক্ষণে বুলেটের মত এল পানির ভিতর দিয়ে। রক্ত ভরা পানিতে কখনও দেখা যাচ্ছে, আবার পরক্ষণে দেখা যাচ্ছে না ওকে।

ওদিকের ডেকে দুই ফ্রেঞ্চ কমাণ্ডো, মোটেই কমল না লিলির গতি। রানার মনে হলো রকেট হয়ে গেছে ওটা, পিছনে তেড়ে আসছে তিনটে কালো-সাদা শয়তান দানব।

অবাক হয়ে দেখছে রানা, ডেক থেকে তিন ফুট দূরে থাকতে হঠাৎ করেই ঝাপ দিল লিলি। পানি থেকে উঠে এল দেহ, সাবলীল ভঙ্গিতে পেট দিয়ে নামল ডেকের উপর, দুই হতবাক ফ্রেঞ্চকে পিছনে ফেলে সরসর করে চলে গেল নয় ফুট দূরে। ওখানেই থামল না, পিছলে যাওয়া থামতেই কাজে লাগাল চার ফ্লিপার, পানির ধার থেকে আরও দূরে সরে যেতে ছুটতে লাগল।।

এক সেকেণ্ড রানা ভাবল, লিলি অমন করছে কেন? দ্বিতীয় সেকেণ্ডে অতীত মনে পড়ল। পানির ধার থেকে সরে না গেলে কিলার ওয়েইল থেকে কেউ নিরাপদ নয়।

তবু চেয়ে আছে রানা।

পুলের ওদিকে হাজির হয়েছে বিশাল এক কালো-সাদা দানব, ভয়ঙ্কর গর্জন ছাড়তে ছাড়তে গভীর পানি থেকে উঠে এসেছে, প্রকাণ্ড শরীর নিয়ে আছড়ে পড়ল পুরু ধাতব প্ল্যাটফর্মে। তখনও পিছলে চলেছে নিজ বিপুল ওজনে। মসৃণ ভাবে কাত হলো, খুলে . গেল মস্ত চোয়ালের হাঁ, মনে হলো কোনও কষ্ট ছাড়াই ধরে ফেলল এক ফ্রেঞ্চ কমাণ্ডোকে। পরক্ষণে নরম দেহ পেয়ে বসাল জোরালো কামড়। টানা চিৎকার শুরু করেছে কমাণ্ডো। এদিকে বেকায়দা ভঙ্গিতে বিশাল শরীর নিয়ে ডেকে পিছাতে শুরু করেছে কিলার ওয়েইল, কয়েক সেকেণ্ড পর ঝপাস্ করে নেমে পড়ল পুলে। হারিয়ে গেল হতভাগ্য লোকটাকে নিয়ে।

ডেকের সবাই এবার বুঝল: কিনারা থেকে সরতে হবে!

তিশাকে দেখতে পেল রানা, নাজমুলের সঙ্গে যোগ দিয়েছে সে। দুজন মিলে কাঁধে তুলে নিয়েছে নিশাতকে, পুলের কিনারা থেকে সরছে। তারই ফাঁকে নিশাতের কোমর থেকে নীচের অংশ দেখতে পেল রানা। ওখানে হাঁটু থেকে কাটা পড়েছে একটা পা।

ঠিক তখন পিছনে ঝপাৎ জোরালো আওয়াজ পেল রানা। থরথর করে কেঁপে উঠেছে প্ল্যাটফর্ম! চরকির মত ঘুরল ও, দেখল, উঠে এসেছে আরেক দানব। ওখান থেকে হাসি-হাসি মুখ করে গড়িয়ে আসছে ওর দিকে!

যেন সাপের মত পিছলে চলছে!

এখনও হাঁটুর উপর ভর করে বসে আছে রানা।

একপাশে কাত হয়ে গেল তিমি, বিরাট হাঁ মেলেছে!

বিশাল দানবের উল্টো দিকে প্রাণ হাতে নিয়ে ডাইভ দিল রানা, ঝাপ দিয়ে মনে মনে বলছে: রানা রে, পালা এবার!

ওর চোখ পড়েছে তুবড়ে যাওয়া ইজেকশন সিটের উপর। চার ফুট দূরে কাত হয়ে পড়ে আছে ওটা। হয়তো ওই পর্যন্ত পৌঁছুতে পারবে। যদি লাফ দিয়ে ওটা টপকে যেতে পারে, আর কোনও বিপদ নেই। ডাইভ শেষে ডেকে পড়ে ধড়মড় করে উঠে বসল রানা, দেরি না করে হামাগুড়ি দিয়ে রওনা হয়ে গেল ইজেকশন সিট লক্ষ্য করে।

কিন্তু অনেক দ্রুত আসছে খুনি তিমি!

পিচ্ছিল ডেকের উপর থ্যাপ-থ্যাপ করে থাবা পড়ছে রানার, কিন্তু তা যথেষ্ট নয়। ঠিক সময়ে ইজেকশন সিটের ওপাশে যেতে পারবে না। চারপাশে ঝরঝর করে পড়ছে পানি। পিছলে আসা কিলার ওয়েইলের তৈরি বৃষ্টি!

রানার ঠিক পিছনে পৌঁছে গেছে ওটা।

রক্তে প্রচুর অ্যাড্রেনালিন নিয়ে আবার সামনে ঝাপিয়ে পড়ল রানা। স্পষ্ট বুঝে গেছে, চেয়ারের ওপাশে যেতে পারবে না, কাজেই ঝাঁপ দিয়েই পিঠ ঘুরিয়ে নিয়েছে।

এক সেকেণ্ড পর টের পেল, আছে ইজেকশন সিটের ভিতর!

কাত হওয়া সিটে আসীন হয়েছে, বা বলা উচিত শুয়ে আছে। পুলের দিকে ওর মুখ, চট করে চোখ তুলে চাইল। কিন্তু কিছুই দেখবার নেই, সামনে শুধু বিশাল কিলার ওয়েইল।

বুকের উপর হাজির হয়েছে ওটা! এখনও গর্জাতে গর্জাতে আসছে!

আর মাত্র তিন ফুট! মোটেও কমছে না গতি!

এখন আর থামবে না!

একবার শ্বাস ফেলেই চোখ বুজে ফেলল রানা। ঠিক তখনই ওর মাথার চারপাশে বন্ধ হলো খুনি তিমির বিরাট চোয়াল!

ভয়ঙ্কর জোরালো ঘঠাং! আওয়াজ পেল রানা। আগে কখনও এমন বিকট আওয়াজ জীবনেও শোনেনি। ভেবেছিল তীব্র, টনটনে ব্যথা লাগবে, ওর মাথা চিবাতে শুরু করেছে কিলার ওয়েইল!

কিন্তু কই, কোথাও কোনও ব্যথা নেই যে!

অবাক হয়ে চোখ মেলল, পরক্ষণে চমকে গেল সামনে ছোরার মত গিজগিজে এসব কী! এক সেকেণ্ড পর টের পেল, এদিক-ওদিকে, উপরে-নীচে শুধু দাঁত আর দাঁত! তার ওদিকটা প্রায়ান্ধকার। দুই সারি দাঁতের মাঝে লালচে থলথলে জিভ!

আরও এক সেকেণ্ড পর কাজ শুরু করল রানার মগজ।

ওর মাথা আছে খুনি তিমির মুখের ভিতর!

অজানা কোনও কারণে, যে ভাবেই হোক, যদিও বোঝা যাচ্ছে

বিষয়টা কী… তবে এখনও আস্ত আছে ও।

এটা কোনও ভাবেই হওয়ার কথা নয়। উপরের দিকে মুখ তুলে চাইল রানা। তুবড়ে যাওয়া ইজেকশন সিটের স্টিলের হেডসেট ওর মাথার তিন দিকে।

রানার মাথার দুপাশে হেডরেস্টে প্রচণ্ড কামড় বসিয়েছে কিলার ওয়েইল। কিন্তু খুব পোক্ত জিনিস এই স্টিলের হেডরেস্ট, ঠেকিয়ে দিয়েছে ভয়ঙ্কর কামড়। রানার কান থেকে মাত্র এক মিলিমিটার দূরে তিমির দাঁত। দুপাশে ডেবে গেছে হেডরেস্টের ইস্পাত। একদিকের ইস্পাত এবড়োখেবড়ো, সামান্য খোঁচা দিয়ে

এক ফোটা রক্ত বের করেছে রানার বাম কান থেকে।

রানার বুক ও মাথার দিক আছে তিমির বিশাল মুখের ভিতর।

হঠাৎ করেই ওর নীচে ঝাঁকি খেল ইজেকশন সিট।

ধাতব প্ল্যাটফর্মে শুরু হলো ঘষ্টে যাওয়ার আওয়াজ। সিটের ভিতর অংশে সরে গেল রানা। মনে হলো লেংচে লেংচে সামনে বাড়ছে সিট!

হঠাৎ করে থেমে গেছে নড়াচড়া 1 ঝাঁকি খেয়ে সামনে বেড়েছে রানা, আবার থমকে গেছে সিট। হঠাৎ করেই ও বুঝে গেল কী ঘটছে।

চেয়ার সহ ওকে পুলের দিকে টেনে নিয়ে চলেছে তিমি!

আবারও জোরালো আঁকি খেল ইজেকশন সিট। রানা বুঝল, ডেকের উপর কমপক্ষে তিন ফুট টেনে নেয়া হয়েছে ওটাকে।

মনের চোখে বিশাল তিমির নড়াচড়া দেখছে রানা। পিছলে পিছিয়ে চলেছে। আগের তিমি এভাবেই ফ্রেঞ্চ-কমার্তোকে নিয়ে উধাও হয়েছে পুলের ভিতর। আর এটা টেনে নিয়ে চলেছে চার শ পাউণ্ড ওজনের ইজেকশন সিট।

আবারও হোঁচট খেয়ে সামনে বাড়ল প্রকাণ্ড সিট। গরম বাতাসের হলকা লাগল রানার মুখের উপর। ওই বাতাস এসেছে তিমির পেট থেকে।

তিক্ত হাসল রানা। খুব হাঁসফাঁস লাগছে ওটার, রূপকথার বইয়ের দুষ্ট নেকড়ের মত বড় করে শ্বাস ফেলছে। কে জানে, মনে মনে হয়তো বলছে: এইবার হাঁপ দেব, কাঁপ দেব, তারপর উড়িয়ে দেব তোর ছোট্ট বাড়ি!

সিট চোয়ালে নিয়ে ছেঁচড়ে পিছাচ্ছে তিমি। একবার পানিতে নামতে পারলেই…।

গরম হাওয়া মুখে লাগতেই সিটের ভিতর গা মুচড়ে সরে যেতে চাইল রানা। আবারও হোঁচট খেয়ে সামনে বাড়ছে সিট। পানিতে গিয়ে পড়বার আগেই তিমির কাছ থেকে ভাগতে হবে।

ইজেকশন সিটের নীচ অংশ দিয়ে বেরিয়ে আছে রানার পা, পাশেই হাস্যরত তিমির খোলা ঠোঁট। রানা ভাবছে, ওই পথে যদি নামি, পিছলে বেরুতে পারব সিট থেকে, তারপর তিমির মুখের পাশ থেকে উঠেই দে ভোঁ দৌড়!

খুব তিক্ত মনে ধীরে ধীরে সিট থেকে নীচের দিকে নামতে শুরু করেছে রানা। খুব সতর্ক, ব্যাটা তিমি যদি টের পায় ও ভাগতে, চায়, তো…

হঠাৎ করেই একপাশে আরও কাত হয়ে গেল ইজেকশন সিট, ধাতব ডেকের উপর ভয়ানক ঘষটে যাওয়ার আওয়াজ শুরু হয়েছে। দাঁতগুলো থেকে আসছে বিশ্রী বাজে দুর্গন্ধ। দুই হাতে খপ করে আর্মরেস্ট ধরল রানা, কোনওভাবেই দানবটার মুখের ভিতর গিয়ে ঢুকতে চায় না।

নিজেকে একটু সামলে নিয়ে আবারও নীচের দিকে নামতে লাগল রানা। চেয়ারের হাঁটুর কাছে নেমে এল। ওর দুই চোখ চেয়ে আছে খোঁচা-খোঁচা দাঁতগুলোর উপর। আবারও নড়ে উঠল চেয়ার, ভীষণ ভারী জিনিস বইতে গিয়ে ঘড়ঘড় শব্দ করছে তিমি।

খুব সাবধানে আরও এক ইঞ্চি নামল রানা।

সমস্যার মুখে পড়ে ওখানেই থামতে হলো।

সিটের যেখানে নেমেছে, আর ধরতে পারবে না দুই দিকের আর্মরেস্ট। কিন্তু ধরবার মত কিছু লাগবেই, নইলে নিজেকে সিট থেকে বের করবে কী করে? ব্যস্ত হয়ে সামনের পাশ দেখল রানা।

না, কিছুই তো নেই! 

তারপর ওর চোখ পড়ল কিল্লার ওয়েইলের দাঁতের উপর।

দুই হাতে খুনি তিমির মস্ত দুটো সাদা দাঁত খপ করে ধরল রানা। আর তখনই আচমকা ঝাঁকি খেয়ে আবারও সামনে বাড়ল ইজেকশন সিট। রানা টের পেল, এবার ডেক থেকে সামান্য উঁচু হয়ে উঠেছে ওটা!

ভয়ে পেয়ে গেল ও। চেয়ার পৌঁছে গেছে ডেকের কিনারে। এবার উল্টে পড়বে পুলে। তারপর…

আরও শক্ত ভাবে দুই দাঁত ধরল রানা, তারপর জোর ঠেলা দিল। সরসর করে নীচে নামল ওর শরীর, পরক্ষণে ইজেকশন সিট থেকে বেরিয়ে এল। বিশাল,তিমির মুখের পাশেই ডেকে পড়েছে। চোখের সামনে দেখতে পেল, পুলের ভিতর নেমে গেছে দানবের লেজ। পানিতে ঝাপটা দিতেই উপরে উঠল মাথা। ডেক থেকে তুলে ফেলেছে গোটা ইজেকশন সিট। পিছলে পানিতে নেমে গেল কালো-সাদা শরীর, সঙ্গে নিয়ে চলেছে ভারী পুরস্কার।

এক সেকেণ্ড দেরি করেনি রানা, লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়িয়েই ঝেড়ে দৌড় দিয়েছে নাজমুল, তিশা ও নিশাতকে লক্ষ্য করে। দৌড়ের ফাঁকে হেলমেট মাইকে বলল, সার্জেন্ট জনি ওয়াকার, রিপোর্ট পাঠান!

এখনও এ-ডেকে, মেজর। ভাইপার আর লেফটেন্যান্ট মোরশেদ আমার সঙ্গেই।

উপরে ওরা কজন? জানতে চাইল রানা।

মাসুদ ভাই, পাঁচজন মিলিটারি, দুজন সিভিলিয়ান, জবাব দিল মোরশেদ। কিন্তু এইমাত্র দুজন কমাণ্ডো মই বেয়ে নীচের লেভেলে যাচ্ছে। …কী বললেন? আরেশশালা…

কানেশন কেটে গেছে। খস-মস্ আওয়াজ শুনতে পেল রানা।

মোরশেদ…

কিন্তু হঠাৎ করেই রানার একটু সামনে হাজির হয়েছে এক ফ্রেঞ্চ কমাণ্ডো!

পুলের ভিতর পড়া পাঁচ ফ্রেঞ্চ কমাণ্ডার শেষজন। শুধু এই লোকই বেঁচে আছে। বরফ-ঠাণ্ডা পানিতে ভিজে চুপচুপে, কিন্তু আগুন হয়ে আছে রাগে, ভয়ঙ্কর ভাবে ভুরু কুঁচকে রানাকে দেখল। যেন নরক থেকে এসেছে, শত্রুর বুকে তাক করল ক্রসবোরা

দৌড় থামাল না রানা, ঝট করে হাঁটুর পাশের খাপ থেকে বের করে নিল থােয়িং নাইফ, এবং দৌড়ের উপরই হাতের ঝটকায় ছুঁড়ে মারল পিছন দিকে। ফলাটা বাতাসে শিস তুলে গাঁথল ফ্রেঞ্চ শত্রুর বুকে। ধুপ করে পড়ল লোকটা। বড় জোর দুই সেকেণ্ড ব্যয় হলো এতে। লাশের পাশে ফিরে এল রানা, এক টানে বের করে নিল ছোরা, বাদ পড়ল না ক্রসবোও, দেরি না করে হাঁটতে শুরু করেছে। হেলমেট মাইকে বলল, মোরশেদ, তোমাদের কী খবর? ঠিক আছ?

জী, মাসুদ ভাই। সরি। আমার আগের হিসাব ভুল ছিল। একটা কমেছে। এখন আছে চারজন আর দুই বিজ্ঞানী।

নীচের পাঁচটা শেষ, বলল রানা। দক্ষিণ টানেলের মুখে পৌঁছে গেছে ও। ওখানেই নিশাতকে নিয়ে টানেল ধরে চলেছে তিশা ও নাজমুল।

নিশাতের উপর চোখ পড়ল রানার। বাম হাঁটু রক্তাক্ত। এবড়োখেবড়ো হাড় বেরিয়ে আছে, পায়ের নীচের অংশ নেই।

ওঁকে নিরাপদ কোথাও নিয়ে চলো, বলল রানা। রক্ত পড়া বন্ধ করতে হবে। মেথাডন লাগবে।

জী, বলল তিশা।

নিশাতকে বয়ে নিতে সাহায্য করছে রানা। নরম স্বরে বলল, কেমন বোধ করছেন, আপা?

আপার গালে একটা চুমু দিলে… দেখবে ঠিক হয়ে গেছি, দাঁত দাঁত চেপে বলল নিশাত। নীরবে সহ্য করছে ভয়ঙ্কর ব্যথা।

তাই দেব আমরা, আগে কাজ শেষ করি, সামনের টানেলে দরজা দেখেছে রানা। তিশা ও নাজমুলকে বলল, ওখানে নিয়ে চলো।

সামনে বেড়ে দরজা খুলল রানা, আহত নিশাতকে সাবধানে ঘরে ঢোকাল ওরা। পোশাক থেকে টপটপ করে পড়ছে পানি। এটা কোনও গুদাম-ঘর। নিশাতকে মেঝের উপর শুইয়ে দিতেই জখম পা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে উঠল নাজমুল।

হেলমেট মাইকে বলল রানা, সবাই তোমরা কোথায়?

ইন্টারকমে এল একের পর এক নাম ও তাদের পরিস্থিতি।

সার্জেন্ট ভাইপার, সার্জেন্ট জনি ওয়াকার ও লেফটেন্যান্ট গোলাম মোরশেদ এ-ডেকে।

লেফটেন্যান্ট তিশা করিম ও কর্পোরাল, নাজমুল ই-ডেকে। রানার সামনেই, তবুও হেলমেট ইন্টারকমে নাম ও অবস্থান জানাল ওরা সবাই। এমন কী বাদ পড়ল না ক্যাপ্টেন নিশাতও, নিজের নাম জানাল।

টনি কেলগ, হলিডে স্যাম্পসন, জর্জ মারফি মারা গেছে, কোনও সাড়া এল না সার্জেন্ট হোসেন আরাফাত দবিরের তরফ . থেকেও।

ঠিক আছে, সবাই মন দিয়ে শোনো, বলল রানা। আমার ভুল না হলে ফ্রেঞ্চ কমাণ্ডারা এখন চারজন। এ ছাড়া আছে দুই বিজ্ঞানী। তারা যে নিরীহ এমন কথা বলছি না। …এবার শোনো, শেষ করতে হবে এই লড়াই। সংখ্যার দিক থেকে এখন আমরা বেশি। আমি চাই গোটা ফ্যাসিলিটির উপর থেকে শুরু করে নীচ পর্যন্ত তল্লাসী করা হোক। ওদেরকে কোণঠাসা করব আমরা। সতর্ক থাকতে হবে, যেন আমাদের আর কাউকে হারাতে না হয়। …ঠিক আছে, এবার শোনো আমরা কী করব। প্রথমে…

হঠাৎ থেমে গেল রানা, ওদের মাথার উপরের ছাতে, ধপ ধপ আওয়াজ শুরু হয়েছে। মুখ তুলে ছাতের দিকে চাইল ওরা।

আর কোনও আওয়াজ নেই।

ডানদিকের সুড়ঙ্গের ছাতে নির্দিষ্ট বিরতি দিয়ে দুটো করে ফ্লুরোসেন্ট বাতি জ্বলছে।

কিন্তু হঠাৎ করেই নিভে গেল সব বাতি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *