১.১৩ পানিতে পড়েই তলিয়ে গেল

পানিতে পড়েই তলিয়ে গেল নিনা ভিসার। মুখের সামনে অজস্র বুদ্বুদ। এক পলকে নীরব হয়েছে চারপাশ। ..

শিউরে উঠল নিনা। উহ্, কী ঠাণ্ডা! থরথর করে কাঁপতে শুরু করেছে সারাশরীর।

তারপর হঠাৎ করেই আওয়াজগুলো শুনল।

ভুতুড়ে পানির ভিতর চাপা ধুপ ধুপ। তারপর থেমেও গেল আওয়াজ। উপর থেকে পড়েছে অন্যরা।

অলস ভঙ্গিতে উপরে উঠছে বুদ্বুদ, সেগুলোর ভিতর দিয়ে দেখল একটু দূরে প্রকাণ্ড আকারের জিনিসটা।

মসৃণ ভঙ্গিতে চলেছে, ওগুলো কী?

বিশাল, কালো রঙের।

বরফ-ঠাণ্ডা পানির ভিতর নিঃশব্দে চলছে, ঠিক ওভাবে ভাসে আকাশের চিল। প্রস্থে গাড়ির চেয়ে চওড়া কালো দেহগুলো। হঠাৎ বড় একটা ঢেউ দুলিয়ে দিল নিনাকে। প্রথমে কিছুই বুঝল না, তারপর হঠাৎ করেই দেখল সামনে হাঁ করা বিশাল এক মুখ। অসংখ্য গিজগিজে দাঁত, সব ক্ষুরের মত ধারালো।

ভীষণ ভাবে চমকে গেল নিনা।

কিলার ওয়েইল!

দ্রুত হাত-পা নাড়তে শুরু করেছে সে, কয়েক সেকেণ্ড পর হঠাৎ করেই উঠে এল পানি-সমতলে, বড় করে দম নিল। এখন আর বরফ-ঠাণ্ডা পানি নিয়ে ভাবছে না। পুলের ভিতর একের পর এক কালো ডরসাল ফিন উঠে আসছে!

পুলের কোথায় আছে বুঝবার আগেই নিনার পাশে ভেসে, উঠল কী যেন! চমকে গিয়ে চরকির মত ঘুরল ও।

না, কোনও খুনি তিমি নয়।

রাফায়লা ম্যাকানটায়ার।

নিনা টের পেল, নতুন করে চালু হয়েছে ওর হৃৎপিণ্ড। এক সেকেণ্ড পর আরেক পাশে ভেসে উঠল জিয়োলজিস্ট ম্যাক্স জে. রলিন্স।

আবার ঘুরে চাইল নিনা। বিধ্বস্ত বি-ডেক থেকে পুলের নানা দিকে পড়েছে পাঁচ ফ্রেঞ্চ কমাণ্ডে। খেয়াল করল, তাদের একজন পানির উপর উপুড় হয়ে ভাসছে।

শাফটের উপর থেকে এল তীক্ষ্ণ চিঙ্কার।

ছোট্ট কোনও মেয়ে চেঁচিয়ে চলেছে।

উপরে চাইল নিনা ভিসার।

ওই যে অনেক উপরে মেরি, বি-ডেকে ক্যাটওয়াকের উল্টে যাওয়া রেলিং থেকে ঝুলছে। যে বাঙালি সার্জেন্ট ওদেরকে এদিকে এনেছে, ভাঙা ক্যাটওয়াকে উপুড় হয়ে সামনে বাড়ছে সে, বোধহয় মেরির হাত ধরতে চায়।

মেরির দিকে চেয়ে আছে নিনা, এক মুহূর্ত পর টের পেল, ওর এবং রলিন্সের মাঝ দিয়ে গেল বিশাল এক কিলার ওয়েইল। ওর পায়ে গা ঘষে গেছে জল্পটা।

এক সেকেণ্ড পর চিৎকার শুনল নিনা।

লোকটা পুলের আরেক দিকে। দ্রুত ঘুরেছে নিনা, দেখল এক ফ্রেঞ্চ কমাণ্ডোকে সাদা আগুনে অসংখ্য ফোস্কা মুখে, পুড়ে গেছে কপাল-গাল–পাগলের মত পুলের কিনারায় পৌঁছুতে চাইছে সে। চোখে বেদম ভয়, ফোপাচ্ছে বাচ্চার মত, ফোঁস-ফোঁস করে শ্বাস ফেলছে।

এ ছাড়া কোথাও কোনও নড়াচড়া নেই।

ভয়ে জমে গেছে সবাই।

মুহূর্ত পর দেখা গেল ব্যস্ত সাঁতারুর পাশে হাজির হয়েছে কালো, বিশাল এক ডরসাল ফিন। হঠাৎ গতি কমাল তিমি, . আক্রমণাত্মক ভঙ্গি নিয়ে লোকটার পিছনে ডুব দিল।

এর ফলে ভয়ঙ্কর পরিণতি হলো লোকটার।

হঠাৎ করেই জোরালো কড়াৎ, আওয়াজ তুলল তার মেরুদণ্ড, পিছনে বেঁকে গেল পিঠ। ধাক্কা খেয়ে ঘুরে গেছে সে, চিৎকার করতে মস্ত হাঁ করেছে, কিন্তু গলা থেকে কোনও শব্দ বেরুল না। বিস্ফারিত হলো, দুই চোখের তারা। সে বোধহয় দেখেছে খুনি তিমি কেটে নিয়েছে, তার কোমর থেকে নীচের অংশ! ওই অংশ এখন তিমির প্রকাণ্ড চোয়ালের ভিতর!

পরের কামড় আরও অনেক ভয়ঙ্কর। প্রচণ্ড হ্যাঁচকা টান খেল কমাণ্ডো, পানির উপর ঠাস্ করে পড়ল মাথা, পরক্ষণে চিরদিনের জন্য হারিয়ে গেল সে।

যিশু! চোয়াল ঝুলে পড়েছে নিনার। হায় যিশু…

.

সার্জেন্ট আরাফাত দবির ক্যাটওয়াকের যে অংশে, সেটা বরফের দেয়ালের ভিতর গেঁথে থাকা। আপাতত পড়বার কথা নয়। বেশ খাড়া ভাবে ঢালু হয়ে নেমেছে ক্যাটওয়াক, নীচে সেন্ট্রাল শাফট বা গভীর কূপ।

দবির তিন বিজ্ঞানীর নাম জানে না, অবশ্য এটা জানে, ওরা ক্যাটওয়াকে অনেক সুথ ছিল। চট করে কিছু ধরতে পারেনি। সবাই পড়ে গেছে কূপের ভিতর।

কিন্তু ওর রিফ্লেক্স ছিল বিদ্যুতের ঝিলিকের মত। নীচ থেকে ক্যাটওয়াক সরতেই ডেকের উপর ঝাপিয়ে পড়েছে, একহাতে খপ করে ধরেছে ক্যাটওয়াকের গ্রিল।

পিচ্চি মেয়েটাও দারুণ চালু।

পায়ের নীচে মেঝে সরে যেতেই ক্যাটওয়াকের উপর আছাড় . খেয়েছে সে, ঢালু মেঝেতে গড়িয়ে চলে গেছে শেষ প্রান্তে। এরপর খাদের ভিতর পা-কোমর-বুক পড়তেই রেলিং পেরুল মাথাটাও। আর ঠিক তখনই শেষ চেষ্টা করেছে ওর কপাল ভাল, একহাতে ধরে ফেলেছে হ্যাণ্ড রেলিং।

গ্যাস বিস্ফোরণে দুর্বল রেলিং এক পলক স্থির থেকেছে, পরক্ষণে লচকে গেছে। এখন ঝুলছে ভাঙা ক্যাটওয়াকের শেষে। উপর অংশ উল্টে নীচে নেমে এসেছে।

ওখানে ঝুলছে ছছাট্ট মেয়েটি। ক্যাটওয়াকের মুচড়ে যাওয়া উল্টো রেলিং মাত্র একহাতে ধরতে পেরেছে। পঞ্চাশ ফুট নীচে পুলের ভিতর অপেক্ষা করছে বুভুক্ষু খুনে তিমির পাল!

ভুলেও নীচে তাকাবে না! গম্ভীর স্বরে বলল, দবির। মেয়েটির হাত ধরবার জন্য উপুড় হয়ে পিছলে সামনে বাড়ছে সে। এরই ভিতর নীল পানির পুলে দেখেছে কিলার ওয়েইল। এ-ও দেখেছে, এক কমাণ্ডোকে নিয়ে গেছে একটা দানব। সে-কারণেই চাইছে না বাচ্চা মেয়েটা ওদিকটা দেখুক।

মেয়েটা অঝোরে কাঁদছে, বারবার ফুঁপিয়ে বলছে, আমাকে পড়ে যেতে দেবেন না, স্যর, প্লিয!

কক্ষনো দেব না, পেটের উপর ভর করে হাত বাড়িয়ে দিল দবির। একবার মেয়েটার কবজি ধরতে পারলেই…

এখনও দবিরের আশপাশে বেশ কিছু ছোট আগুন জ্বলছে ক্যাটওয়াকে। মেয়েটার কবজি থেকে কমপক্ষে একফুট দূরে ওর হাত। দবির দেখল চারপাশ দেখতে শুরু করেছে মেয়েটি।

তোমার নাম কী? হঠাৎ করেই বলল দবির। সরিয়ে নিতে চাইছে মেয়েটার মনোযোগ।

আমার হাত পুড়ে যাচ্ছে, ফুপিয়ে উঠল মেরি।

রেলিঙের ওদিকটা দেখে নিল দবির। বামে পনেরো ফুট দূরে প্ল্যাটফর্মের এক অংশে জ্বলছে খুদে আগুন। রেলিং যেখানে মচকে গেছে, জায়গাটা ওখানে।

হ্যাঁ, সোনা-পাখি, জানি হাতে গরম লাগছে। এই এখনই তোমাকে সরিয়ে নেব। শুধু একটু অপেক্ষা করো। কী যেন বললে তোমার নাম?

মেরি।

বাহ্, খুব সুন্দর নাম। আমার নাম দবির। কিন্তু আমার বন্ধুদের মত তুমিও আমাকে লেখক বলতে পারো।

ওঁরা আপনাকে ওই নামে কেন ডাকেন?

মাথা কাত করে চাইল দবির। ওখানে রেলিং চাটছে আগুন।

অবস্থা ভাল না।

বিস্ফোরণের ফলে তাপ তৈরি হয়েছে, রেলিঙের কালো রং শুকিয়ে চড়চড় করছে, যেন শুকনো কাগজ। এখন যদি ওখানে আগুন লাগে; জ্বলতে শুরু করবে গোটা রেলিং।

পিছলে সামনে বাড়ছে দবির। মেয়েটার হাত ধরতে চাইছে। কিন্তু তা করতে হলে এখনও ছয় ইঞ্চি এগুতে হবে। প্রায় পৌঁছেই গেছে।

তুমি কি সবসময় এত কথা জানতে চাও? প্রাণ খুলে হাসার ভঙ্গি নিতে চাইল দবির, গলা দিয়ে বেরুল দুর্বল হাসি। শরীর টানটান করতে গিয়ে কুঁচকে গেল গাল। আসলে জানো… খুব সাবধানে এক ইঞ্চি এক ইঞ্চি করে নীচে নামছে। বড় করে শ্বাস ফেলল। হয়েছে কী, একবার… শ্বাস নিল। আমার এক বন্ধু একবার ধরে ফেলল একটা বই লিখছি…

বুঝতে পেরেছি… আবারও নীচে চলে গেছে মেরির চোখ।

মেরি, সোনা-পাখি, এবার শোনো। …হ্যাঁ, তুমি শুধু আমার দিকে তাকিয়ে থাকো। ঠিক আমার দিকে। কারও দিকে না।

ঠিক আছে, সায় দিল মেরি। পরক্ষণে নীচে চাইল। মনে হলো এক্ষুনি হাত ছেড়ে দেবে।

শালার কপাল আমার… বিড়বিড় করল দবির।

.

ফ্রেঞ্চ কমাণ্ডোকে যেখান থেকে নিয়ে গেছে, তার মাত্র তিন ফুট দূরে কর্পোরাল নাজমুল। লোকটাকে ওভাবে মরতে দেখে আত্মা খাঁচা ছাড়া হয়ে গেছে ওর।

এখন থমথম করছে গোটা পুল।

কেউ কোনও আওয়াজ করছে না।

প্রায় নাড়াচাড়া না করেই ভেসে থাকতে চাইছে নাজমুল। চারপাশে নজর রেখেছে। নোনা পানি বরফের মত ঠাণ্ডা। ভীষণ জ্বলছে কাঁধের ক্ষতটা। ওটার কথা ভুলে থাকতে চাইছে।

ওর পাশে ভাসছে নিশাত সুলতানা, অপেক্ষা করছে কখন কী ঘটে। পাশে উপুড় হয়ে ভাসছে মৃত হলিডে। মাথা থেকে সরু রেখায় রক্ত বেরুচ্ছে, মিশে যাচ্ছে নীল পানিতে।

পুলের ভিতর স্থির হয়ে আছে অবশিষ্ট চার ফ্রেঞ্চ কমাণ্ডো। নাজমুল বা নিশাতের দিকে ঘুরেও চাইছে না। আপাতত দুই পক্ষ ভুলে গেছে লড়াই।

চোখ সরিয়ে বিজ্ঞানীদেরকে দেখল নাজমুল।

পানিতে পাথরের মূর্তি হয়ে গেছে দুই মহিলা আর ওই ছিচকাদুনে লোকটা।

পুলের ভিতর ওরা দশজন।

বাধ্য না হলে নড়ছে না।

কারও সাহস নেই যে সাঁতার কাটবে।

কয়েক সেকেণ্ড আগে দেখেছে কীভাবে তলিয়ে গেছে ফ্রেঞ্চ কমাণ্ডো।

এ থেকে শিক্ষা নিয়েছে সবাই যদি না নড়ো, তোমাকে না-ও দেখতে পারে।

শ্বাস আটকে ফেলল নাজমুল! নীচে মসৃণ ভাবে সরছে বিশাল, সব আকারের তিমি।

ক্লিক আওয়াজ পেয়ে ঘুরল নাজমুল। পানির উপর এমপি-৫ তুলে ধরেছেন আপা!

উনি খেপা মানুষ, ভাবল নাজমুল। এটা সম্ভব শুধু ওঁর পক্ষেই। পিস্তল দিয়ে লড়বেন খুনে তিমির বিরুদ্ধে!

থমথম করছে চারপাশ।

কেউ নড়লেই…. .

হঠাৎ পানি-সমতলের একটু নীচে নিশাতের ডানে বিকট গর্জন ছাড়ল এক তিমি। পরক্ষণে তুলে ফেলল শরীরের উপর অংশ, বাতাসে ভেসে কাত হয়ে গেল, গুঁতো দিল গিয়ে নিথর হলিডের দেহে। বিশাল চোয়ালে নিল লাশ, ক্ষুরধার দাঁতগুলো গা গুলানো খচখচ আওয়াজ তুলে মাংস কাটছে। মুড়মুড় করে ভাঙছে বেশির ভাগ হাড়। লাশ নিয়ে ডুবে গেল তিমির মাথা, পরক্ষণে তলিয়ে গেল লেজটাও। ওখানে রইল শুধু ঘোলাটে লালচে ফেনা।

হলিডে এক ফোঁটা নড়ছিল না।

পুলের সবাই একইসঙ্গে জ্ঞান অর্জন করল।

ওরা নড়ছে কি নড়ছে না, তা নিয়ে কিলার ওয়েইলের কোনও মাথা-ব্যথা নেই! .

এবার একইসঙ্গে নড়ে উঠল নয়জন। পুলের কিনারায় যেতে পাগল হয়ে উঠেছে সবাই। সবার পিছনে ভেসে উঠেছে. খুনে তিমিগুলো, তারাও ব্যস্ত হয়ে উঠেছে পেট-পূর্তি করতে।

.

বি-ডেকের ভাঙা ক্যাটওয়াকে কাকে যেন অভিশাপ দিচ্ছে সার্জেন্ট হোসেন আরাফাত দবির।

মেরি যখন পুলের দিকে চেয়েছে, ও দেখতে পেয়েছে বিশাল কালো-সাদা কী যেন। নীচে ওসব কী তা বুঝতে পেরেই থিরথির করে কাঁপতে শুরু করেছে ওর নীচের চোয়াল। তারপর যখন দেখেছে পানির নীচ থেকে লাফ দিয়ে উঠেছে একটা, কচমচ করে চিবিয়ে খাচ্ছে হলিডের শরীর, কেঁপে উঠল ওর সারা শরীর।

হায় খোদা, হায় যিশু! ফুঁপিয়ে চলেছে এখন। 

বাধ্য হয়ে তাড়াহুড়া করতে হচ্ছে দবিরকে। ক্যাটওয়াকের শেষপ্রান্তে পৌঁছে বুক পর্যন্ত নামিয়ে দিয়েছে খাতে। কোমর থেকে পা ক্যাটওয়াকের উপরে, মাথা তাক করেছে অনেক নীচের পুলের দিকে। একবার নীচে খসে পড়লে…।

মুক্ত ডানহাত মেরির দিকে বাড়িয়ে দিয়েছে দবির।

দুজনের হাত মাত্র দুই ইঞ্চি দূরে।

বলতে গেলে কবজি প্রায় পেয়েই গেছে দবির।

এমন সময় হঠাৎ করেই বামদিকে নরম একটা ফস্ আওয়াজ শুনল। ঝট করে ঘুরে চাইল। শালার কপাল…।

রেলিঙে ধরেছে ছছাট্ট কমলা আগুন, দ্রুত পোড়াতে শুরু করেছে শুকনো কালো রং। তার ভিতর দিয়ে খুব সরু রেখার একটা শিখা আসছে।

বিস্ফারিত হলো দবিরের দুই চোখ।

রেলিং বেয়ে রকেটের মত আসছে শিখা!

ঠিক মেরির হাতের দিকেই!

এখনও পুলে খুনি তিমির দিকে চেয়ে আছে মেরি। মাথা তুলে দবিরের দিকে চাইল। দুজনের চোখ মিলিত হতেই দবির বুঝল, আতঙ্কে জড়পদার্থ হয়ে গেছে মেয়েটা।

ওর পক্ষে যতটা নামা সম্ভব, নেমে গেছে দবির। টানটান হয়ে উঠেছে সমস্ত পেশি, ক্যাটওয়াক থেকে নীচে ঝুলছে দেহের উপরের অংশ। শেষ চেষ্টা হিসাবে খপ করে মেরির কবজি ধরতে চাইল।

কালো, হ্যাণ্ড রেলিঙের উপর দিয়ে ছুটে আসছে কমলা শিখা, পিছনে লম্বা লেজ।

মেরির কবজি থেকে মাত্র এক ইঞ্চি দূরে দবিরের হাত।

আরও একটু নামতে চাইল সে। ওর আঙুলের ডগা স্পর্শ করল মেয়েটার হাতের উপর অংশ।

আর এক ইঞ্চি। মাত্র এক ইঞ্চি…

ঠিক তখনই উজ্জ্বল কমলা শিখা চোখের কাছে দেখল দবির। প্রচণ্ড হতাশা নিয়ে চেঁচিয়ে উঠল ও: না!

চোখের সামনে দিয়ে তরতর করে চলে গেল শিখা, গিয়ে ঢুকল মেরির হাতের নীচে।

অসহায় আতঙ্ক নিয়ে চেয়ে রইল দবির, তীব্র যন্ত্রণায় চেঁচিয়ে উঠেছে মেরি। শরীরে আগুন লাগলে কারও পক্ষেই নিয়ন্ত্রণ রাখা অসম্ভব।

রেলিং ছেড়ে দিল মেরি।

এমনই হবে, বুঝেছে দবির, আর সেজন্যই ক্যাটওয়াকের উপর অংশ থেকে বামহাত সরিয়ে নিয়েছে হোঁচট খেয়ে নেমে। এসেছে সে মেয়েটির দিকে। সরাসরি তিন ফুট পতন হলো তার। একটা হাত নীচের দিকে, অন্য হাত উপরের দিকে তাক করা।

নীচের হাত খপ করে ধরল মেরির পিঙ্ক পারকার উলের হুড। বাম হাতে ধরে ফেলেছে জ্বলন্ত রেলিং।

জোর ঝাঁকি খেয়ে থামল দুজন। চরকির মত এক শ আশি, ডিগ্রি ঘুরে গেল দবির। আরেকটু হলে সর্কেট থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল কাঁধের হাড়। এখন ওর মাথা উপরের দিকে, ঝুলছে জ্বলন্ত রেলিং ধরে। ঠিক করেছে, কিছুতেই রেলিং ছাড়রে না।

ওর হাতে পুরু চামড়ার গ্লাভস্, কিন্তু মনে হলো মাথার ভিতর আগুন ধরে গেছে। ব্যথাটা সামলে নিয়ে এক সেকেণ্ড পর মেরির দিকে চেয়ে স্বস্তির হাসি হাসল।

সোনা-পাখি, তোমাকে ধরেছি, বড় করে দম নিল দবির, পাখিটা ঠিকই খপ করে ধরেছি!

নীচে ঝুলছে মেরি, বেকায়দা ভাবে দুদিকে প্রসারিত দুই হাত। দবিরের শক্তিশালী পাঞ্জা ধরে রেখেছে উলের হুড।

ঠিক আছে, খুশি হয়ে বলল দবির। এবার দেখা যাক কীভাবে উঠে যাওয়া…।

হঠাৎ পুট করে একটা আওয়াজ হলো। আর সঙ্গে সঙ্গে একটু নীচে নামল মেরি। দবির প্রথমে বুঝল না কী ঘটেছে। তারপর দেখতে পেল। চোখ পড়েছে মেরির পারকা এবং ওটার উলের হুডের উপর।

চোখ বিস্ফারিত হলো দবিরের।

আসলে পারকার অংশ না ওই হুড!

আজকাল এসব পারকা ও হুড বিক্রি হয়। দরকার হলে একটা থেকে আরেকটাকে খুলে নেয়া যায়। মেরির  পারকার সঙ্গে হুডে রয়েছে সব মিলে ছয়টা বোতাম।

তারই একটা খুলে যাওয়ার আওয়াজ পেয়েছে দবির। অসুস্থ বোধ করল ও। মনে মনে বলল, এটা ঠিক না! আল্লা, এত কষ্ট করার পরে…

পুট! আরেকটা বোতাম খুলেছে। ~

কার উপর যেন ভীষণ অভিমান হলো দবিরের। বুঝতে পারছে না কী করবে। আসলে কিছু করবারও নেই। রেলিঙের সবচেয়ে নীচের অংশে ঝুলছে। নিজেকে আর নামাতে পারবে না। অন্য হাতে ধরেছে মেরির হুড

পুট! পুট! .

খুলে গেল আরও দুটো বোতাম। ভীষণ ভয়ে চেঁচিয়ে উঠল মেরি। ছোট ছোট ঝাঁকি খেয়ে নীচে নামছে। তারপর হঠাৎ করেই আবারও স্থির হচ্ছে।

টানটান হয়ে উঠেছে হুড। পারকার কলারে এখন মাত্র দুটো, বোতাম বাকি!

মেরিকে দুলিয়ে সি-ডেকের ক্যাটওয়াকে ফেলবে, ভাবতে শুরু করেছে দবির। ওটা আছে বারো ফুট দূরে। চিন্তাটা বাতিল করে দিল। উলের হুড ফট করে খুলে যাবে। মাত্র ওই দুটো বোতাম ধরে রেখেছে মেরির ওজন।

দুশশালার কপাল! প্রায় চেঁচিয়ে উঠল দবির। কোনও শালা সাহায্য করবে না!

নিশ্চয়ই করবে, অপেক্ষা করো, কাছ থেকেই বলে উঠল কে যেন। আমি আসছি!

মাথা কাত করে চাইল দবির, মুখ চুন হয়ে গেল। সি-ডেকের ক্যাটওয়াকের কাছে মাসুদ স্যর, বেরিয়ে আসছেন এক অ্যালকোভ থেকে। ওঁর পাশে তিশা করিম। তাকে কী যেন বলছেন স্যর। দেখিয়ে দিলেন কাছের রাং-ল্যাডার। মেয়েটা নামছে পুল ডেকের দিকে। এদিকে সাহায্য করতে আসবেন স্যর।

পুট! .

অবশিষ্ট দুই বোতামের একটা খুলে গেছে। বিকৃত চেহারা করে মেরির দিকে চাইল দবির। ভয়ঙ্কর ভয় পেয়েছে বাচ্চা মেয়েটা, তারচেয়ে দ্বিগুণ ভয় পেয়েছে ও নিজে। কাঁদতে গিয়ে লালচে হয়ে উঠেছে মেয়েটির দুই চোখ। টপটপ করে গাল বেয়ে পড়ছে অশ্রু। দবিরের চোখে চোখ রাখল। ফেঁপাতে শুরু করেছে আবার, বলল, আমি মরতে চাই না! ঈশ্বর, আমি মরতে চাই না!

আর মাত্র একটা বোতাম বাকি।

মেরির ওজন নিতে গিয়ে ভীষণ টানটান হয়ে উঠেছে হুড।

বোতাম টিকবে না।

দবির বুঝে গেছে, কিছুই করতে পারবে না। ফ্যাসফ্যাসে স্বরে বলল ও, পারলাম না, সোনা-পাখি!

এর এক সেকেণ্ড পর পুট আওয়াজ তুলল বোতাম খুলে গেল হুড। অসহায় দবির চেয়ে রইল। ওর মনে হলো খুব ধীরে নীচে রওনা হলো মেরি। বিস্ফারিত দৃষ্টিতে চেয়ে রইল ওর চোখে, মুখে ভীষণ কষ্টের ছাপ। মিষ্টি মেয়েটা নীচে গিয়ে পড়ছে, মুচড়ে উঠল দবিরের বুকের ভিতরটা।

পঞ্চাশ ফুট নীচে বরফ-ঠাণ্ডা পানিতে ঝপাস্ করে পড়ল ছোট্ট মেরি!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *