১.১২ সার্জেন্ট দবির

সার্জেন্ট দবির! হেলমেট মাইকে নিচু স্বরে বলল রানা। ওর চোখ বি-ডেকের পশ্চিম টানেলের উপর। দবির! আপনি কোথায়, সাড়া দিন!

সার্জেন্ট নেই? জানতে চাইল তিশা।

যোগাযোগ বন্ধ, বলল রানা।

ওরা স্টেশনের পুবে, সি-ডেকে অ্যালকোভের ভিতর, অপেক্ষা করছে নিশাত, কর্পোরাল নাজুমল ও হলিডের জন্য, যে-কোনও সময়ে বি-ডেকের পশ্চিম টানেল থেকে বেরিয়ে আসবে ওরা।

প্রথমে বেরুল নিশাত সুলতানা। দ্রুত পিছনে হাঁটছে, হাতে উদ্যত অস্ত্র। এক শ আশি ডিগ্রি ঘুরছে ওটা। শত্রু দেখলেই গুলি করবে।

নিশাতকে দেখেই এ-ডেকের দিকে গুলি পাঠাতে শুরু করেছে রানা। কেউ ওখানে কাভার নিলে তাকে পিছাতে হবে। পাঁচ সেকেণ্ড পর গুলি শুরু করল তিশা, একই দিকে ওর চোখ।

অ্যালকোভের পিছন-দেয়ালের পাশে সরে এল রানা, অস্ত্র রিলোড করতে লাগল। তিন রাউণ্ড করে গুলি ছুঁড়ছে তিশা।

হঠাৎ খুব অস্বাভাবিক একটা ঘটনা দেখল রানা।

তিশার অস্ত্রের মাযল থেকে ছিটকে বেরুচ্ছে ছয় ফুটি হলুদ আগুন। মাত্র এক সেকেণ্ড পর আর শিখা দেখা গেল না। কিন্তু ওই আগুন থাকবার কথা নয়। রানার এক পলকের জন্য মনে হয়েছে তিশার এমপি-৫ মেশিন পিস্তল যেন ফ্লেম-থ্রোয়ার!

আসলে কী ঘটছে? পরক্ষণে বুঝে গেল রানা। ঝট করে ঘুরে চাইল এয়ার-কণ্ডিশনিং রুমের দিকে।

হঠাৎ করেই বলল তিশা, আমার গুলি শেষ!

ঘুরেই এ-ডেকে গুলি পাঠাল রানা। এই সুযোগে রিলোড করতে পারবে তিশা।

এ-ডেকের ক্যাটওয়াকের উপর দিয়ে ছুটছে রানার গুলি। এদিকে বি-ডেকে নিশাতের পিছু নিয়ে ক্যাটওয়াকে বেরিয়ে এসেছে নাজমুল ও হলিডে। দ্রুত পিছু হটছে ওরা। যে টানেল থেকে বেরিয়েছে, সেদিকে গুলি পাঠাচ্ছে।

হলিডের অস্ত্রের গুলি শেষ। রানা দেখল, চট করে ম্যাগাযিন খুলেছে সে, ওটা ফেলে দিল ক্যাটওয়াকের উপর। নতুন ম্যাগাযিন রিলোড করে নিল অস্ত্রের রিসিভারে। আর ঠিক তখনই পশ্চিম টানেল থেকে এল গুলি, গলার চামড়া ও সামান্য মাংস চেঁছে নিয়ে বেরিয়ে গেল ওটা।

ছিটকে পিছিয়ে গেছে হলিডে, ভারসাম্য হারিয়েছে পুরোপুরি। কয়েক মুহূর্ত পর অস্ত্র ঘুরিয়ে নিতে পারল, অজানা শত্রু লক্ষ্য করে খালি করল ম্যাগাযিন। ওই আওয়াজে মৃত লোকও জেগে উঠবে। দুই দশমিক দুই সেকেণ্ডে বেরিয়েছে তিরিশটা গুলি। আবারও খালি হয়ে গেছে ম্যাগাযিন। খপ করে হলিডের হাত ধরল নিশাত, টানেলের দিক থেকে ঘুরিয়ে নিয়ে তাড়া দিল, ক্যাটওয়াক ধরে ছুটতে শুরু করুন!

নতুন ম্যাগাযিন হাতড়াতে গিয়ে দেরি করছে আহত হলিডে, গলা বেয়ে দরদর করে পড়ছে রক্ত। ম্যাগাযিন সে পেল, কিন্তু রক্তে ভেজা হাত থেকে পড়ে গেল ওটা। রেলিঙের পাশ দিয়ে পঞ্চাশ ফুট নীচের পুলে নামল। ছলাৎ আওয়াজ তুলে হারিয়ে গেল পানির ভিতর। হলিডের কাছে বাড়তি ম্যাগাযিন নেই। হাত থেকে এমপি-৫ ছেড়ে দিল সে, হোলস্টার থেকে বের করে নিল কোল্ট .৪৫ সিঙ্গল শট রিভলভার।

থেমে থেমে এ-ডেকের উপর গুলি পাঠাচ্ছে তিশা ও রানা। হলিডের ম্যাগাযিন পুলের ভিতর পড়তে দেখেছে তিশা। ওখানে উঠে এসেছিল কিলার ওয়েইলের পালের একটা, জিনিসটা খাবার কিছু নয় দেখে আবারও ডুব দিয়েছে।

নিশাত সুলতানার অস্ত্রের গুলি শেষ। খালি ম্যাগাযিন ফেলে দ্রুত হাতে ভরে নিল নতুন ক্লিপ।

দুশ্চিন্তা নিয়ে তাদের দিকে চেয়ে রইল রানা। বি-ডেকে আপা, নাজমুল ও হলিডে ক্যাটওয়াক ধরে পশ্চিম থেকে উত্তর সুড়ঙ্গের দিকে ছুটছে।

ওরা প্রায় পৌঁছে গেছে, এমন সময় উত্তর সুড়ঙ্গ থেকে ছিটকে বেরুল সার্জেন্ট দবির, পিছনে কয়েকজন সিভিলিয়ান।

মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পড়েছে নিশাত-নাজমুল-হলিডে ও দবির।

দৃশ্যটা দেখে শ্বাস আটকে ফেলল রানা।

খোলা জায়গায় মস্ত বিপদে পড়েছে ওরা চার যোদ্ধা। সঙ্গে চার সিভিলিয়ান! যে-কোনও সময়ে হাজির হবে ফ্রেঞ্চ কমাণ্ডো দল, ঝাঁঝরা করে দেবে ওদেরকে।

সার্জেন্ট দবির! হেলমেট মাইকে চেঁচাল রানা। ওখান থেকে সরে যান! ক্যাটওয়াক থেকে…

চোখের সামনে প্রলয় দেখতে শুরু করেছে রানা।

একইসঙ্গে বি-ডেকের ক্যাটওয়াকে ছিটকে বেরিয়েছে পাঁচজন ফ্রেঞ্চ কমাণ্ডো!

পশ্চিম টানেল থেকে এসেছে তিনজন। দুজন পুব টানেল থেকে। বিন্দুমাত্র দ্বিধা করল না তারা, গুলি শুরু করেছে।

এবার যা ঘটল, তাড়াহুড়ার ভিতর ঠিক বুঝল না রানা।

বি-ডেকে পিনসার ম্যানুভার করেছে পাঁচ কমাণ্ডা, নিশাতনাজমুল ও হলিডেকে ক্যাটওয়াকে তাড়িয়ে এনেছে এবার দু পাশ থেকে গুলি করে ঝাঁঝরা করবে।

সার্জেন্ট দবির ও চার সিভিলিয়ান বাড়তি বোনাস। এদেরকে আশা করেনি ফ্রেঞ্চরা। সবাই ক্যাটওয়াকে উঠতেই ওদের উপর অস্ত্র তাক করেছে।

কিন্তু দ্বিতীয় দফা গুলি করবার কোনও সুযোগ পেল না তারা।

পশ্চিম টানেল থেকে যে তিন ফ্রেঞ্চ এসেছে, তারাই আগে গুলি করেছে। তাদের অস্ত্রের মাযল থেকে ছিটকে বেরুল অতি উত্তপ্ত সাদা আগুন।

পয়েন্ট-ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জে গুলি খেল নিশাত, নাজমুল ও হলিডে। নিশাত পায়ে, নাজমুল কাঁধে, দুর্ভাগ্য যে পরপর দুটো গুলি খেল হলিডে মাথায়, চারটে বুকে বুক-মাথা থেকে ফোয়ারার মত ছিটকে বেরুল রক্ত। মেঝের উপর পড়ার আগেই মারা গেছে সে।

আর বিশেষ কিছু বুঝবার সুযোগ পেল না বিস্মিত রানা।

কারণ ঠিক তখনই ব্যাপারটা ঘটল।

হতবাক হয়ে রানা দেখল, স্টেশনের পশ্চিমে ফ্রেঞ্চদের রাইফেলের মাযল ও বাঁটের পিছন থেকে বেরিয়েছে দ্বি-মুখী বিশাল দুই আগুনের চাবুক। যেন ভয়ঙ্কর দুই উল্কা, সাত ফুট উঁচু আগুনের গোলকের ভিতর আটকা পড়ল তিন ফ্রেঞ্চ ক্যাটওয়াক ধরে নানা দিকে নাচতে নাচতে চলেছে সাদা আগুনের গোলক, সামনে-পিছনে যা পড়ছে হজম করে ফেলছে।

বি-ডেকের ক্যাটওয়াক অদৃশ্য হলো আগুনের ভিতর, চার পাশে শুধু সাদা শিখা। কাউকে আর দেখা গেল না।

পুরো পাঁচ সেকেণ্ড চেয়ে রইল রানা, জানে না কী করবে। সব এত দ্রুত ঘটছে, যেন বি-ডেকের ক্যাটওয়াকে প্রচুর গ্যাসোলিন ঢেলে ম্যাচ দিয়ে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে কেউ।

দ্বিতীয়বার ওদিকে না চেয়ে চরকির মত ঘুরল রানা। ওই এয়ার-কণ্ডিশনিং রুম…বুঝতে দেরি হয়নি ওর।

রকেট-গ্রেনেড ক্ষতিগ্রস্ত করেছে এয়ার-কণ্ডিশনিং সিলিণ্ডারকে, ওই দুটো ফুটো হওয়ায় বেরুচ্ছে হাইলি ফ্ল্যামেবল ক্লোরোফ্রিউরোকার্বন!

এই কারণেই তখন তিশার অস্ত্রের নল থেকে বেরিয়েছে ছয় ফুটি আগুন। ওটা মস্ত সতর্কবাণী, অনেক আগেই খেয়াল দেয়া উচিত ছিল। অবশ্য তখনও স্টেশনে ছড়িয়ে পড়েনি সিএফসি।

কিন্তু এখন… বদ্ধ স্টেশনে ছড়িয়ে পড়ছে গ্যাস। ফ্রেঞ্চরা গুলি করতেই সাদা আগুন গিলে ফেলেছে বি-ডেক।

আস্তে করে শ্বাস ফেলল রানা।

এয়ার-কণ্ডিশনিং সিলিণ্ডার থেকে এখনও সিএফসি বেরুচ্ছে। ছড়িয়ে পড়বে গোটা স্টেশনে। সামান্য আগুন পেলেই…

গ্যাসের আভেন হয়ে উঠছে উইলকক্স আইস স্টেশন!

এখন শুধু সামান্য ফুলকি… বা একটা গুলি পরক্ষণে বিশাল বোমার মত ফাটবে গোটা স্টেশন!

বি-ডেকের সকেট থেকে ফট-ফটাস্ আওয়াজ তুলে খুলছে . রিভেট ক্যাটওয়াকের উপর এখানে-ওখানে আগুন। ফোস্কা পড়া মানুষগুলো প্রাণপণে চেঁচিয়ে চলেছে। যোদ্ধা হোক বা সিভিলিয়ান, ক্যাটওয়াকে পড়ে ছটফট করছে সবাই। পোশাকে আগুন, পুড়তে শুরু করেছে চামড়া, মাংস।

যেন নরকের দৃশ্য!

স্টেশনের পশ্চিমের ফ্রেঞ্চ কমাণ্ডারা গুলি চালিয়েছে নিশাতনাজমুল-হলিডের উপর, তাদের অস্ত্রের মাযলের ফুলকি থেকেই ধরেছে গ্যাসের নারকীয় সাদা আগুন, এখন তাদেরকেই আগে পোড়াতে শুরু করেছে।

প্রতিটি মাযল তৈরি করেছে দুটো করে আগুনের গোলক। একটা গেছে সামনে, অন্যটা পিছনে। অস্ত্রের মালিকের মুখ পুড়িয়ে দিতে চেয়েছে।

এখন ডেকের উপর পড়ে আছে দুই ফ্রেঞ্চ কমাণ্ডো, ছাড়ছে বিকট চিৎকার। তৃতীয়জন বারবার আছড়ে পড়ছে বরফের মেঝের উপর, নেভাতে চাইছে ফেটিগের আগুন।

ক্যাপ্টেন নিশাত ও কর্পোরাল নাজমুলের পোশাক পুড়ছে। ওদের পাশে লাশ হয়ে পড়ে আছে হলিডে। ক্যাটওয়াকের উপর চড়-চড়াৎ আওয়াজ তুলে নিথর শরীরটাকে ঝলসাচ্ছে হলুদ আগুন।

উত্তর টানেলের কাছে রাফায়লা ম্যাকানটায়ারের প্যান্ট থেকে কমলা শিখা চাপড়ে নেভাতে চাইছে দবির, ধাতুর ক্যাটওয়াকের উপর দাপাদাপি করছে মেয়েটি। দবিরের পাশে একই কাজ করছে নিনা ভিসার, পিচ্চি মেরির পারকা থেকে নেভাতে চাইছে আগুন। চিকন স্বরে চেঁচিয়ে চলেছে রলিন্স, ফসফস্ করে পুড়ছে তার মাথার সব চুল।

তারপর অসুস্থকর মড়মড় আওয়াজ শুরু হলো। মুচড়ে যেতে শুরু করেছে ইস্পাত।

মেয়েটার পোশাকের আগুন নেভানো বাদ দিয়ে মুখ তুলে চাইল দবির। বিড়বিড় করে বলল, হায় আল্লা!

 অস্বস্তিকর আওয়াজটা চমকে দিয়েছে রানাকে।

কয়েক সেকেণ্ড পর বুঝল কী ঘটছে। ক্যাটওয়াকের স্টিলের ক্রিকোণ সাপোর্ট গেছে সরাসরি বরফের দেয়ালের ভিতর। এখন দেয়াল থেকে পিছলে বেরিয়ে আসছে সব। ..

বি-ডেকের আগুন উত্তপ্ত করে তুলেছে সব রিভেট, ফলে গরম হয়ে উঠছে সাপোর্ট। গলিয়ে দিচ্ছে চারপাশের বরফ। বরফের দেয়াল থেকে খুলে আসছে বি-ডেকের গোটা কাঠামো!

ঠক-ঠক-ঠকাস্ আওয়াজ তুলে খুলছে একের পর এক রিভেট। বরফ-দেয়ালে বড় গর্ত তৈরি করে বেরুচ্ছে ইস্পাতের আড়া, ধাতব ঠং আওয়াজ তুলে সি-ডেকের ক্যাটওয়াকে পড়ল একটা রিভেট।

কয়েক সেকেণ্ড পর পড়ল দ্বিতীয় রিভেট।

নামল তৃতীয়টা।

এরপর প্রায় একই সঙ্গে পনেরোটা রিভেট খসল।

সি-ডেকের ক্যাটওয়াকে শুরু হয়েছে ধাতব বৃষ্টি। কয়েক মুহূর্ত পর হঠাৎ করেই আবারও শুরু হলো উইলকক্স আইস, স্টেশনে গা শিউরানো আওয়াজ।

ভেঙেচুরে পড়ছে স্টিলের পাত।

বি-ডেক পড়বে, বিড়বিড় করে বলল রানা।

পর মুহূর্তে হঠাৎ করেই নামতে শুরু করল সব।

গোটা ক্যাটওয়াক, গোলাকার জ্বলন্ত ফ্লোর… সবই পড়ছে সিডেকের দিকে! চারপাশে শুধু মড়মড় আওয়াজ!

বরফ-দেয়ালে ছিড়ে রইল ক্যাটওয়াকের ইস্পাতের সামান্য। অংশ। অন্য সমস্ত কিছু হঠাৎ করেই আছাড় খেল। সি-ডেকের একটু উপরে স্থির হলো বি-ডেক। আপাতত পতন থেমেছে, কিন্তু পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রি ঢালু হয়ে গেছে মেঝে।

এবার বরফ-দেয়াল থেকে পিছলে বেরুল ওই ফ্লোরের বেশির ভাগ সাপোর্ট, সোজা নেমে গেল স্টেশনের শাফট ধরে।

বি-ডেকে যারা উঠে দাঁড়িয়েছিল, ক্যাটওয়াক নিয়ে নামল সিডেকের দিকে।

তারা এগারোজন!

সাধারণ নাগরিক ও যোদ্ধারা ভাঙা ক্যাটওয়াক নিয়ে সরাসরি পড়ল উইলকক্স আইস স্টেশনের মূল শাফটে।

সোজা পঞ্চাশ ফুট নীচে নীল পানিতে ঝপাস্ করে নামল তারা!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *