১.১১ পুরু কাঠের ওপাশে থরথর

পুরু কাঠের ওপাশে থরথর করে কেঁপে উঠল মেঝে, আবারও দরজায় বিঁধল শ্যাপনেল। সি-ডেকে সামনের দিকের একটা ঘরে অ্যালুমিনিয়ামের, টেবিল কাত করে তার পিছনে আড়াল নিয়েছে রানা ও তিশা।

দলের সবাই, তোমরা কোথায়? ইন্টারকমে জানতে চাইল রানা।

শুনতে পেল কয়েকটি কণ্ঠ, ওপাশে গুলির আওয়াজ।

ক্যাপ্টেন নিশাত সুলতানা বলছি, আমার সঙ্গে কর্পোরাল নাজমুল ও হলিডে সিম্পসন, বি-ডেকের উত্তর-পশ্চিম থেকে তুমুল গুলির মুখে পড়েছি!

জোরালো স্ট্যাটিক শুরু হলো রানার ইয়ারপিসে।

.. দবির… কেলগ পড়ে গেছে। পুব টানেলে… হঠাৎ বন্ধ হলো হোসেন আরাফাত দবিরের কণ্ঠ, পরক্ষণে হারিয়ে গেল সিগনাল।

ওয়াকার বলছি… সঙ্গে লেফটেন্যান্ট গোলাম মোরশেদ, এখনও এ-ডেকে। কিন্তু গুলির মুখে বেরুতে পারছি না।

সার্জেন্ট পল সিংগার জানাল, ভাইপার… আমি বাইরে, মেইন এন্ট্রান্সের দিকে আসছি।

কেলগের কাছ থেকে কোনও সাড়া নেই। এরই ভিতর মারা পড়েছে জর্জ মারফি ও কেভিন হাক্কলে। মনে মনে হিসাব কষছে রানা, ওরা তিনজন মারা গেছে, তার মানে ওকে নিয়ে দলে আছে মাত্র নয়জন। এদিকে ফ্রেঞ্চরা ছিল বারোজন, সঙ্গে হেলপার দুই বিজ্ঞানী। পল সিংগার আগেই বলেছে, বাইরে একজনকে মেরেছে সে। রানা নিজে ডাইনিংরুমে একজনকে শেষ করেছে। তার মানে ফ্রেঞ্চ কমাণ্ডোরা এখন দশজন। সঙ্গে দুই বিজ্ঞানী, তারা কোথায়। কে জানে!

বর্তমানে ফিরল ওর মন। চোখ পড়ল কাঠের প্রকাণ্ড দরজার উপর। কবাটে গেঁথে আছে অসংখ্য চকচকে রুপালি খুদে বর্শার ফলা। তিশার দিকে চাইল রানা। আমরা এখানে থাকতে পারব না।

আমারও তাই মনে হয়, স্যর, শুকনো গলায় বলল তিশা।

দ্বিতীয়বার তিশার দিকে চাইল রানা। মেয়েটা আসলে কী বোঝাতে চাইছে? আর কোনও কথাও বলছে না। তারপর ওর কাঁধের উপর দিয়ে ওদিকটা দেখিয়ে দিল।

প্রথমবারের মত ঘরে চোখ বোলাল রানা। এর আগে খেয়াল করবার সময় ছিল না।

মনে হলো এটা কোনও বয়লার রুম। ছাত জুড়ে অসংখ্য কালো পাইপ। ঘরের ডানপাশ জুড়ে একটার উপর আরেকটা সাদা রঙের বিশাল দুটো সিলিণ্ডার। ওই দুই সিলিণ্ডার দৈর্ঘ্যে কমপক্ষে বারো ফুট, উচ্চতা হবে ছয় ফুট।

দুই সিলিণ্ডারের মাঝে বড় হীরক আকৃতির লাল স্টিকার। বোঝানো হয়েছে সিলিণ্ডারের ভিতর দাহ্য পদার্থ। নীচে বড় বড় অক্ষরে লেখা:

ডেনজার
     ফ্লামেবল প্রপেল্যান্ট
        এল-৫ 
     হাইলি ফ্ল্যামেবল

প্রকাণ্ড দুই সাদা সিলিণ্ডারের দিকে চেয়ে রইল রানা। ওগুলোর সঙ্গে সংযুক্ত একটা কমপিউটার? ওটা আছে ঘরের পিছনে। কমপিউটার চলছে, কিন্তু স্ক্রিন-সেভারে দেখা গেল বিশালবক্ষা এক নির্লজ্জ মেয়ে সৈকতে শুয়ে নানান ইঙ্গিত করছে।

ঘরের পিছনে চলে গেল রানা, থামল কমপিউটারের সামনে। ওর দিকে চেয়ে ঠোঁট গোল করে ইশারা করল মেয়েটি।

পরে, ডারলিং, স্ক্রিনের দিকে চাইল রানা, কি-বোর্ডে টোকা দিল। সঙ্গে সঙ্গে উধাও হলো মেয়েটি।

সেখানে উদয় হয়েছে নানা রঙের উইলকক্স আইস স্টেশনের পাঁচতলা ডায়াগ্রাম। স্ক্রিনে পাঁচটা বৃত্ত। বামে তিনটে, ডানদিকে দুটো মাঝে মস্ত শাফট, ওটাকে ঘিরেছে প্রতিটি সার্কেল। এই সার্কেলের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চারটে সোজা টানেল।

বাইরের টানেল ও ভিতরের কূপের মাঝে বেশ কিছু ঘর। প্রতিটি রুমকে আলাদা রঙে দেখানো হয়েছে। স্ক্রিনের এক পাশে কালার চার্ট দিয়ে বুঝিয়েছে তাপমাত্রা। হিমাঙ্কের–৫.৪ ডিগ্রি থেকে শুরু করে হিমাঙ্কের-১.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত দেখিয়েছে।

দরজার কাছ থেকে মন্তব্য করল তিশা, এয়ার কণ্ডিশনিং সিস্টেম, স্যর?

হ্যাঁ। এল-৫, মানে প্রপেল্যান্ট হিসাবে ক্লোরোফ্লিউরোকার্বন ব্যবহার করে। অনেক পুরনো আমলের।

আছে তাই তো বেশি, মন্তব্য করল তিশা।

ওর পাশে পৌঁছে গেল রানা, হ্যাণ্ডেল ধরে সামান্য ফাঁক করল দরজা। পরক্ষণে চমকে গেল। বেসবল আকৃতির কালো কী যেন ছুটে আসছে ওরই দিকে!

পিছনে বেরুচ্ছে সাদা ঘন ধোঁয়া! জ্যাকুস ফিউভিলকে এডেকের ক্যাটওয়াকে দেখা গেল, হাতে ফ্যামাস অ্যাসল্ট রাইফেল। মাযলের নীচে ৪০এমএম গ্রেনেড লঞ্চার।

ঝট করে উবু হয়ে গেল রানা, চৌকাঠ এবং ওর মাথার উপরের ফাঁক দিয়ে ভিতরে ঢুকল গ্যাস-প্রপেল্ড গ্রেনেড, তখনও একটু একটু করে উপরে উঠছে, আধ সেকেণ্ড পর ঘরের পিছনে গিয়ে লাগল ওটা।

বেরোও! এক্ষুণি! চেঁচিয়ে উঠল রানা।

তিশাকে দ্বিতীয়বার বলতে হলো না, তীরের মত দরজা দিয়ে বেরুল ও। হাতের এমপি-৫, গুলি ছুঁড়ছে এ-ডেকের দিকে।

ডাইভ দিয়ে চৌকাঠ পেরুল রানা, এবং ঠিক তখনই ওর পিছনে এয়ার-কণ্ডিশনিং রুমে বিস্ফোরিত হলো গ্রেনেড। প্রায় উড়ে গেল দরজা, মজবুত কজা না থাকলে শলার মত ছিটকে পড়ত। বাইরের দিকে পুরো এক শ আশি ডিগ্রি খুলে গেছে দরজা, দড়াম করে লাগল ক্যাটওয়াকের বরফ-দেয়ালে। খোলা চৌকাঠ দিয়ে বেরুল আগুনের বিশাল এক গোলক, রানাকে স্পর্শ করেই চলে গেল স্টেশনের মাঝে।

স্যর, আসুন! ডাকছে তিশা, ক্যাটওয়াক থেকে এ-ডেক লক্ষ্য করে গুলি করছে।

মেঝেতে পড়েই এক গড়ান দিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে রানা, ঘুরেই এমপি-৫ থেকে এক পশলা গুলি পাঠাল। এইমাত্র উপরের ক্যাটওয়াকে ছিল জ্যাকুস ফিউভিল, কিন্তু ওখান থেকে সরে গেছে সে।

ছুটতে শুরু করেছে তিশা, দীর্ঘ পায়ে ওর পাশে চলে গেল রানা। সি-ডেকের ক্যাটওয়াক ধরে এগিয়ে চলেছে ওরা, বেরিয়ে এসেছে খোলা জায়গায়। মদিক কাভার করছে রানা, ডানদিক দেখছে তিশা। ওদের এমপি-৫-এর মাযল থেকে ছিটকে বেরুচ্ছে, উজ্জ্বল হলুদ ঝলকানি। ফ্রেঞ্চদের পাল্টা গুলি ওদের আশপাশের বরফ-দেয়ালে এসে লাগছে।

দশ গজ দূরের দেয়ালে ছোট অ্যালকোভ দেখতে পেয়েছে রানা।

তিশা! ওদিকে!

জী!

কয়েক মুহূর্ত পর খুদে অ্যালকোতে ঝাঁপিয়ে ঢুকল রানা ও তিশা। এক পলক পর এয়ার-কণ্ডিশনিং রুমের ভিতর বিকট আওয়াজে বিস্ফোরণ ঘটল।

রানা বুঝে গেছে, এই বিস্ফোরণ অন্যগুলোর মত নয়, একেবারেই ভিন্ন ধাচের। এটা গ্রেনেড ফাটবার শব্দ নয়, অনেক গুরুগম্ভীর গর্জন। অনেক বড় কিছু ফেটে পড়ছে।

এয়ার-কণ্ডিশনিং সিলিণ্ডার!

ওই ঘরের চার-দেয়াল চুরচুর হলো ভয়ঙ্কর বিস্ফোরণে। ঠিক যেন তাসের প্রাসাদ, মুহূর্তে ছিটকে গেল চারপাশে। কেউ শ্যাম্পেনের বোতলের কর্ক খুলেছে, এমন ভাবে প্রচণ্ড গতি তুলে ছিটকে বেরুল কালো পাইপগুলো, স্টেশনের শাফটের মাঝের একশ ফুট পেরিয়ে গাঁথল গিয়ে ওদিকের দেয়ালে।

পাশের দেয়ালে গুলি লাগতেই অ্যালকোভের দেয়ালে সেটে গেল রানা, চট করে চারপাশ দেখে নিল।

দেয়ালের গভীরে জায়গাটা ক্লজিটের মত, ব্যবহার করা হয় ডাইভিং বেল উপরে তোলা ও নামাবার বিশাল উইঞ্চের কন্ট্রোল কঙ্গেল রুম হিসাবে। কন্সেল বলতে ছোট কিছু লিভার, ডায়াল ও প্যানেল ভরা বোতাম।

কন্সোলের সামনে স্টিল-প্লেটেড বিশাল এক চেয়ার। চট করে ওটা চিনল রানা। এফ-১৪ ফাইটার বিমানের পাইলট ইজেকশন সিট। নীচে বুস্টারের কালো পোড়া দাগ, উপরে গভীর ট্যাপ খাওয়া স্টিলের মস্ত হেডরেস্ট। বুঝতে দেরি হলো না, বিগত জীবনে নিজ দায়িত্ব ভাল ভাবেই পালন করেছে এই জিনিস। উইলকক্স আইস স্টেশনের কেউ বুদ্ধি করে বিরাট চেয়ার বসিয়ে নিয়েছে রোটেটিং এক স্ট্যাণ্ডে, তারপর গোটা জিনিসটা মেঝের সঙ্গে বন্টু মেরে আটকে দিয়েছে। চার শ পাউণ্ড ওজনের মিলিটারি জঞ্জাল এখন হয়ে উঠেছে হেভি ডিউটি ফার্নিচার।

হঠাৎ করেই তুমুল গুলি শুরু হলো এ-ডেকের উত্তর-পশ্চিম কোনা থেকে। চমকে গিয়ে ইজেকশন সিটের উপর উঠে পড়ল তিশা, পরক্ষণে সরে গেল হেডসেটের ওপাশে। গুটিসুটি মেরে বসেছে। বিশাল সিটের ইস্পাতের পাত ওকে ভাল ভাবেই আড়াল দিয়েছে।

পুরো দশ সেকেণ্ড গুলিবর্ষণ চলল ইজেকশন সিটের উপর। হেডসেটে মাথা রেখে বসে রইল তিশা, চোখ বন্ধ। ইস্পাতের পাতে লেগে চারপাশে ছিটকে পড়ছে গুলি। কয়েক মুহূর্ত পর আবারও চোখ খুলে এদিক-ওদিক চাইল।

এক পাশে কী যেন নড়ছে।

ওর বামদিকে, নীচে।

ওদিকে স্টেশনের পুল।

ওখানে পানির নীচে ওটা কী? কালো-সাদা, বিশাল আকারের, ধীর ভঙ্গিতে চলছে, যেন হুমকি দিচ্ছে কাউকে। পানির বেশ কিছুটা নীচে রয়েছে ওটা, উঁচু ডরসাল ফিন সারফেস ভেদ করে উপরে উঠছে না।

প্রথমটার সঙ্গে যোগ দিল দ্বিতীয়, তারপর তৃতীয়, শেষে চতুর্থ কিলার ওয়েইল। দলের নেতা বিশাল আকারের, দৈর্ঘ্যে কমপক্ষে চল্লিশ ফুট। অন্যগুলো একটু ছোট।

ওগুলো মেয়ে, ভাবল তিশা। বইয়ে পড়েছে, একটা পুরুষের সঙ্গে থাকে কমবেশি আট-নয়টা মেয়ে।

অস্থির হয়ে উঠেছে পুলের পানি, ভাঙাচোরা দৃশ্য–এ কারণে কালো-সাদা দানবগুলোকে আরও ভয়ঙ্কর দেখাচ্ছে। পুরুষটা কাত হতেই দেখা গেল ওটার সাদা পেট আর বিকট খোলা মুখ। তিশার : ভয় লেগে গেল দুই সারি ক্ষুরধার দাঁত দেখে।

নেতার পিছনে সেই দুই তরুণ খুনি। ফ্রেঞ্চ কমাণ্ডো দলের হামলা শুরু হওয়ার আগে এদেরকে পুলে দেখেছে তিশা, তখন সিলমাছ লিলিকে খুঁজছিল তারা।

আবারও ফিরেছে… সঙ্গে এনেছে গোটা দলের সবাইকে।

পুলের কিনারা ধরে ঘুরতে শুরু করেছে গোটা পাল, ওদিকে চেয়ে শিরশির করছে তিশার বুক। মনে পড়ছে বইয়ে পড়া ভয়ঙ্কর সব বর্ণনা। বহু লোক মরেছে কিলার ওয়েইলের কবলে পড়ে!

.

বিন্দুমাত্র সুযোগ ছিল না কর্পোরাল টনি কেলগের।

তিন ফ্র্যাগমেন্টেশন গ্রেনেডের তীব্র গতির এ্যাপনেল দুপাশ থেকে আঁঝরা করেছে তাকে। অসহায় চোখে তরুণ সৈনিকের দিকে চেয়েছিল আরাফাত দবির। বিস্ফোরণের আগে মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে দুহাতে মুখ ঢেকে ফেলেছিল কেলগ, তারপর পেরেকের ডগার মত অসংখ্য এ্যাপনেল বিঁধল ওর সারা দেহে।

কাছের দরজা দিয়ে সামনের বিজ্ঞানীকে ঠেলে ভিতরে ঢুকতে চেষ্টা করছিল তার সঙ্গী, কিন্তু যথেষ্ট সময় পায়নি বেচারা। কেলগের মতই, চাওয়া যায় না তার দিকে। যেখানে দাঁড়িয়েছিল, ওখানেই ধপ করে পড়েছে লাশ। কেলগের বুক ও কাঁধের বডি আর্মার বহু এ্যাপনেল ঠেকিয়েছে, কিন্তু বিজ্ঞানী ছিল একেবারেই অনাবৃত ও অসহায়। এখনও তার গোটা দেহ থেকে দরদর করে রক্ত ঝরছে। দেখতে ভয়ঙ্কর হয়েছে লাশটা।

এ ধরনের বিস্ফোরণ হলে কোনও পেশি রক্ষা পায় না। এখানেও তাই হয়েছে। দেহে এক ইঞ্চি ত্বক নেই যা অক্ষত।

পুরু ভুরুজোড়া কুঁচকে মৃত সঙ্গীর দিকে চেয়ে রইল সার্জেন্ট আরাফাত দবির, জানে না কী করবে। বি-ডেকের আরেক পাশে বাইরের বাঁকা টানেল ধরে ছুটে চলেছে নিশাত সুলতানা। পিছনে কর্পোরাল নাজমুল ও হলিডে সিম্পসন, মাঝে মাঝে থমকে দাঁড়িয়ে গুলি করছে। টানেল ধরে ধেয়ে আসছে তিনটে কালো ছায়া।

কর্পোরাল হলিডে সিম্পসনের বয়স একত্রিশ বছর, ব্রোঞ্জের মত চকচকে ত্বক, চৌকো চোয়াল, আসলে তার পরিবার এসেছে ইতালি থেকে। মন যেমনই থাক, সবার সঙ্গে ভাল ব্যবহার করে।

এই উপদলের নেত্রী ক্যাপ্টেন নিশাত সুলতানা, রানার গোটা দলে সে সেকেণ্ড ইন কমাণ্ড? তিশা করিমের সঙ্গে ওর অনেক তফাৎ। দলের এই দুই মহিলা একজন দক্ষিণ মেরু হলে অপরজন উত্তর মেরু।

তিশার বয়স মাত্র তেইশ, দেখতে রাণী পুতুলের মত সুন্দর, মিষ্টি করে কথা বলে, অবশ্য সবার সঙ্গে একটু দূরত্ব বজায় রেখে চলে। এদিকে নিশাতের বয়স একত্রিশ, ঝাড়া ছয় ফুট উঁচু, ওজন প্রায় দুই শ পাউণ্ড। সবার দেখাদেখি রানাও ওকে আপা বলেই ডাকে। বদলে সবাই ওর কাছ থেকে পায় বড়বোনের আদর। দলের কেউ আহত হলে বা অসুস্থ হলে তার ভাবতে হয় না, সুস্থ হওয়া পর্যন্ত নার্সিঙের কাজ নিজেই নেয় সে।

হেলমেট মাইকে বলল নিশাত, স্যর, নিশাত বলছি। বিডেকে গোলাগুলি চলছে। আবারও বলছি, বি-ডেকে তুমুল গুলি চলছে। পিছন থেকে শত্রুরা আসছে। তাদের সঙ্গে ফ্র্যাগমেন্টেশন গ্রেনেড। চারপাশে এসে পড়ছে। পশ্চিম টানেলের দিকে যাচ্ছি, ওখানে বাঁক নিলে সামনে পড়বে মাঝের কূপ। আপনি বা আপনার কেউ শাফট দেখে থাকলে, আমাদের জানান ওখানে কী ঘটছে।

সবার হেলমেট ইন্টারকমে ভেসে এল রানার কণ্ঠ: রানা বলছি। মাঝের শাফট দেখছি। ক্যাটওয়াকে কেউ নেই। আপনার লেভেলে রয়েছে পাঁচজন শত্রু। সবাই এখন টানেলের ভিতর।

এ-ডেকে আরও পাঁচজন শক্র। তাদের অন্তত একজনের কাছে ৪০এমএম গ্রেনেড লঞ্চার। আপনারা যদি ক্যাটওয়াকে বেরিয়ে আসেন, নীচ থেকে আমরা কাভার দিতে পারব। …সার্জেন্ট জনি ওয়াকার, লেফটেন্যান্ট গোলাম মোরশেদ? আপনারা কোথায়?

আমরা এখনও এখানে, জবাব দিল জনি ওয়াকার।

এ-ডেকে?

জী, এবার বলল গোলাম মোরশেদ।

এখনও আটকে রেখেছে?

সরে আসবার চেষ্টা করছি, মাসুদ ভাই।

আপাতত সে-চেষ্টা বাদ থাকুক, কাজে মন দাও, তোমাদের দিকে যেন বেশি মনোযোগ দেয়। দশ সেকেণ্ড পর বি-ডেকে খোলা জায়গায় বেরিয়ে আসবে আমাদের তিনজন।

ঠিক আছে, মাসুদ ভাই।

নিশাত বলল, আমরা এখন পশ্চিম টানেল ধরে আসছি, স্যর। যে-কোনও সময়ে পৌঁছে যাব সেন্ট্রাল শাফটে।

এদিকে সি-ডেকের অ্যালকোভে হেলমেট মাইকে আবারও বলল রানা, সার্জেন্ট আরাফাত দবির! সাড়া দিন!

ওপাশ থেকে কোনও জবাব নেই।

সার্জেন্ট দবির, আপনি কোথায়?

.

বি-ডেকে মেয়েদের শাওয়ার রুমে চমকে গেছে নিনা ভিসার। এইমাত্র লাথি মেরে দড়াম করে দরজা খোলা হয়েছে। এক পলকের জন্য ভীষণ ভয় পেল সে। মেয়েদের শাওয়ার রুমে ঢুকেছে ফ্রেঞ্চ সৈনিকরা? না বোধহয়। তা হলে পাশের রুমে কে? ওটা পুরুষদের শাওয়ার রুম।

ধড়াস্ ধড়াস্ করছে নিনার হৃৎপিণ্ড। মহিলা শাওয়ার ব্লকের ভিতর আছে সে, তার মেয়ে মেরি, রাফায়লা ম্যাকানটায়ার ও জিয়োলজিস্ট ম্যাক্স জে. রলিন্স। সার্জেন্ট দবির সবাইকে ঘরে ফিরতে বললে এখানে এসে ঢুকেছে মেয়েরা। এর এক সেকেণ্ড পর দরজা খুলে মেঝের উপর ঝাপিয়ে পড়েছে রলিন্স লোকটা। এরপর দরজা বন্ধ হতে না হতেই বাইরের টানেলে ফাটল ফ্র্যাগমেন্টেশন গ্রেনেড।

সেন্ট্রাল শাফট ও বাইরের টানেলের মাঝে মেয়েদের শাওয়ার ব্লক। জায়গাটা বি-ডেকের উত্তর-পুর্ব কোণে। এখান থেকে বেরুতে হলে তিনটে দরজা: একটা গেছে উত্তর টানেলে, একটা বাইরের টানেলে, এবং অন্যটা সোজা গেছে পুরুষদের শাওয়ার রুমের পাশে।

এখন পুরুষদের শাওয়ার রুমে ধুপধাপ আওয়াজ হচ্ছে।

কিউবিকল দরজাগুলো লাথি মেরে খুলছে। তার মানেই ফ্রেঞ্চ কমাণ্ডোরা!

কেউ লুকিয়ে থাকলে মরবে।

মেরিকে দরজার দিকে ঠেলে নিয়ে গেল নিনা, ওদিক দিয়ে বেরুনো যায় উত্তর টানেলে। চলো, মেরি, এখান থেকে বেরুতে হবে।

একবার কাঁধের উপর দিয়ে পিছনে চাইল নিনা ভিসার।

ছয়টা শাওয়ারের ওপাশে পুরুষ শাওয়ার রুমের দরজা।

ওটা এখনও বন্ধ।

কিন্তু যে-কোনও সময়ে দরজা খুলবে কমাণ্ডোরা।

উত্তর টানেলের দরজার সামনে পৌঁছল নিনা, শক্ত করে ধরল হ্যালে। দ্বিধা করছে। জানার উপায় নেই ওদিকে কী অপেক্ষা করছে।

নিনা! কী করছ! চলে এসো! সাপের মত ফোঁস করে উঠল ম্যাক্স জে. রলিন্স। লম্বা ও চিকন লোক সে, কোনও কারণ ছাড়াই সারাক্ষণ ভীষণ নার্ভাস থাকে। এখন খুবই আতঙ্কিত।

ঠিক আছে, ভয় পাবেন না, বলল নিনা। হ্যাণ্ডেল মুচড়ে দরজা খুলতে শুরু করেছে।

হঠাৎ পুরুষদের শাওয়ার রুমের দরজায় ধুম করে কী যেন লাগল। পরক্ষণে সবার পিছনে খুলে গেল ওই দরজা।

পালাও! চিকন স্বরে চেঁচিয়ে উঠল রলিন্স।

ঝট করে দরজা খুলল নিনা, মেরিকে নিয়ে বেরিয়ে এল উত্তর টানেলে।

কিন্তু তিন পা যেতে না যেতেই থামতে হলো। হাঁ হয়ে গেল ওর মুখ। সামনে ভয়ঙ্কর চেহারার এক লোক, ভুরু কুঁচকে ওর মাথার উপর তাক করেছে অস্ত্র!

তারপর মাথা নাড়ল লোকটা, অস্ত্র নামিয়ে বলল, দুঃখিত।.

নিনা ও মেরির সামনে এসে দাঁড়াল সার্জেন্ট দবির। আমি নিজেই ঘাবড়ে গেছি। ভয় পাবেন না।

টানেলে বেরিয়ে এসেছে রাফায়লা ও রলিন্স, পিছনে দড়াম করে বন্ধ করে দিল দরজা। পাঠাগার ডট নেটের সৌজন্যে প্রাপ্ত।

মেয়েদের শাওয়ার রুমের দিকে ইঙ্গিত করল দবির, ওরা ওখানে?

হ্যাঁ, বলল নিনা।

অন্যরা ঠিক আছে? বোকার মত জানতে চাইল রলিন্স।

এখন আর চট করে ঘর থেকে বেরুবে না, পিছনের টানেল দেখে নিল দবির। বাইরের টানেল থেকে গুলির আওয়াজ আসছে। ওর ডান কান বেয়ে রক্ত পড়ছে, খেয়াল করেছে নিনা। বেশ বড় জখম। মনে হলো না লোকটা কিছু টের পেয়েছে। তার ইয়ারপিসে রুপালি ধাতুর টুকরো গেঁথে আছে।

আমরা সমস্যার ভিতর পড়ে গেলাম, চারপাশের টানেল। দেখছে দবির। সবার সঙ্গে কন্ট্যাক্ট হারিয়ে গেছে। এ্যাপনেলের টুকরো লেগে বিকল হয়েছে রেডিয়ো। চাইলেও যোগাযোগ করতে পারব না। অন্যদের কথাও শুনছি না।

ঘুরে দাঁড়াল দবির, নিনার উপর দিয়ে টানেলের শেষমাথা দেখল। ওদিকে গেলে স্টেশনের বিশাল শাফট ও ক্যাটওয়াক।

আমার সঙ্গে আসুন, নিনার পাশ ঘেঁষে রওনা হয়ে গেল দবির, চলেছে উইলকক্স আইস স্টেশনের মাঝের কূপ লক্ষ্য করে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *