১.১০ বি-ডেকের উত্তর টানেল ধরে

গ্রেনেড!

বি-ডেকের উত্তর টানেল ধরে ছুটছে হোসেন আরাফাত দবির ও টনি কেলগ, বাঁক ঘুরেই ঝাপিয়ে পড়ল সামনের মেঝেতে।

পিছনে বিকট আওয়াজে বিস্ফোরিত হলো গ্রেনেড, থরথর করে কেঁপে উঠেছে গোটা টানেল। বিস্ফোরণের এক মুহূর্ত পর এল জোরালো কংকাশন, ওয়েভ। সঙ্গে এল তীব্র গতিতে সুইয়ের মত কালো-কী যেন, ছিটকে গেল দুই সৈনিকের উপর দিয়ে, লাগল উল্টো দিকের দেয়ালে।

হতবাক বিস্ময় নিয়ে পরস্পরের দিকে চাইল দুই সৈনিক।

এইমাত্র ফ্র্যাগমেন্টেশন গ্রেনেড ফেটেছে।

ওটা সাধারণ বিস্ফোরকই, কিন্তু পেটের ভিতর থাকে অসংখ্য ছোট ধাতব টুকরো, প্রতিটি ছোরার মত ধারালো, একবার গায়ে বিধলে খুঁটে বের করা ডাক্তারদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব। বিস্ফোরিত হলে চারদিকে ছিটকে পড়ে টুকরোগুলো। 

আমি আগেই ভেবেছি, শুকনো স্বরে বলল টনি কেলগ, এমপি-৫-এর রিসিভারে নতুন ম্যাগাজিন ভরল সে। অনেককে বলেওছি, ওই চুতিয়া ফ্রেঞ্চদের বিশ্বাস করা যায় না। ওদের ভিতর কী যেন আছে। ওই খুদে চোখ,সাপের মত চাহনি… আর কুত্তার বাচ্চারা নাকি আমেরিকার মিত্র!

আরেকটু হলে শেষ করে দিয়েছিল, বলল দবির।

উঠে দাঁড়িয়ে আবার বাঁকের কাছে চলে গেছে কেলগ, খুব সাবধানে ওদিকে উঁকি দিল। আড়ষ্ট হয়ে গেল ওর চেহারা। হায় যিশু…

কী হয়েছে? জিজ্ঞেস করল দবির।

আর কিছু জানতে হলো না তাকে। নিজেই বুঝে গেল। ঠক্‌ঠকাস আওয়াজ তুলে বাঁক পেরিয়ে এসেছে দ্বিতীয় গ্রেনেড। ওদের দুজনের মাঝে পাঁচ ফুট দূরে এসে থেমেছে! 

ওরা দুজন খোলা টানেলে। কোথাও যাওয়ার নেই। পালাবে কোথায়? ঝেড়ে দৌড় দিলেও করিডোের পেরুতে পারবে না। তার অনেক আগেই ফাটবে গ্রেনেড।

ওটা দেখেই দুহাতের জোরে সরসর করে পিছলে এগিয়েছে দবির। দেখলে কেউ বলবে পাকা ডিফেণ্ডার, স্লাইডিং ট্যাকল করে শক্রর পা থেকে সরিয়ে দিতে চাইছে ফুটবল। কিন্তু আওতার ভিতর গ্রেনেড পেয়ে যেতেই স্লাইডিং ট্যাকল করল না সে, জীবনের সেরা কিক দিল বাম পায়ে, খট-খটাং আওয়াজ তুলে উত্তর টানেলে ফিরল গ্রেনেড, ছুটে চলেছে সেন্ট্রাল শাফট লক্ষ্য করে। পিছলে বাঁক পেরিয়ে গেল দবিরও।

সামনে বেড়ে খপ করে তার কাঁধ ধরল কেলগ, বাকের এপাশে টেনে এনে দাঁড় করিয়ে দিল। আধ সেকেণ্ড পর বিকট আওয়াজে ফাটল গ্রেনেড। দ্বিতীয়বারের মত সামনের দেয়ালে লাগল অসংখ্য ধাতুর ধারালো টুকরো।

শালার ফ্রেঞ্চ চুতিয়ারা… ঢোক গিলল কেলগ। আমরা–এবার ফেঁসে গেছি!

বাছা, ছুটতে শুরু করো, ভাগতে হবে, পরামর্শ দিল দবির। চট করে চাইল উত্তর টানেলের দিকে। ওখানে দেখতে পেল ক্যাপ্টেন নিশাত সুলতানাকে। এইমাত্র বাঁক ঘুরেছে সে। তার সঙ্গে দুই কর্পোরাল নাজমুল ও হলিডে স্যাম্পসন। বি-ডেকের পশ্চিম দিক দিয়ে ঘুরে এসেছে তারা।

সামনে দলের দুজনকে দেখে থমকে গেছে নিশাত, ক্ষণে–চড়া কণ্ঠে বলল, সবাই শুনে নাও, চারদিকে ছড়িয়ে পড়তে হবে। নইলে একসঙ্গে মোরব্বা হব। কর্পোরাল নাজমুল, কর্পোরাল হলিডে আর আমি আবারও পশ্চিমে ফিরব, ঘুরে চলে যাব বাইরের দিকের টানেলে। কেলগ আর আপনি সার্জেন্ট দবির যাবেন পুবে। আমরা যখন নিশ্চিত হবো ভাল পজিশনে পৌঁছেছি, তখন ভাবতে শুরু করব কীভাবে সবার সঙ্গে যোগ দেয়া যায়। এরপর হারামজাদার দুলকে কোণঠাসা করব। সবাই আমার কথা বুঝতে পেরেছে?

কেউ কোনও কথা বলল না, আপত্তি নেই যোগ্য ক্যাপ্টেনের কথা মেনে নিতে। নিশাতের সঙ্গে উল্টো দিকের বরফ টানেলে ঢুকে পড়ল দুই কর্পোরাল।

বাইরের দিকের টানেল ক্রমেই বেঁকে গেছে, পুব দিকে ছুটে চলেছে দবির ও কেলগ। দৌড়ের ফাঁকে বলল দবির, ঠিক আছে… এটা কী? বি-ডেক, তাই না? এখানে কী আছে?

আমি জানি না… আরও কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেল কেলগ, টানেলের বাঁকে পৌঁছে গেছে।

দুজনই থমকে দাঁড়িয়েছে ওরা, পরস্পরের দিকে চাইল। আরও কালো হয়ে গেছে কেলগের মুখ।

.

উইলকক্স আইস স্টেশনের মাঝের শাফট লক্ষ্য করে গুলি পাঠাল মাসুদ রানা।

লেফটেন্যান্ট তিশা করিম এবং ও আছে সি-ডেকে, একটা ঘরের ভিতর। খোলা দরজার ওপাশে মাঝের ক্যাটওয়াক। চৌকাঠে এসে দাঁড়িয়েছে রানা, হাতে উদ্যত পিস্তল, মূল শাফট দিয়ে দেখা যায় উপরের এ-ডেক।

রানার পিছনে ঘরের ভিতর হাঁটু গেড়ে বসেছে তিশা, ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে সচেতন হয়ে উঠতে চাইছে। হেলমেট খুলে ফেলেছে, পিঠে এলিয়ে পড়েছে কালো চুলের দীর্ঘ দুটো বেণী। কৌতূহল নিয়ে হেলমেট ও তীর দেখল তিশা। আস্তে করে মাথা নাড়ল। হেলমেট থেকে তীর খুলল না, আবার পরে নিল। কপালে ও গালে রয়ে গেল শুকনো রক্তের দাগ। গম্ভীর চেহারায় শক্ত করে ধরল এমপি-৫, উঠে দাঁড়িয়ে চলে গেল রানার পাশে।

ঠিক আছ? কাঁধের উপর দিয়ে জানতে চাইল রানা। পিস্তল তাক করেছে এ-ডেকের দিকে।

আমি কিছু মিস করেছি, স্যর?

তোমার কি মনে আছে একদল ফ্রেঞ্চ ভাব করছে তারা বিজ্ঞানী, তারপর আমাদের উপর গুলি শুরু করল? এ-ডেকের দিকে এক রাউণ্ড গুলি পাঠাল রানা।

তা মনে আছে।

আমরা তখন জানলাম, হোভারক্রাফট নিয়ে স্টেশনে ঢুকেছে ওদের আরও ছয়জন কমাণ্ডে।

এটা জানতাম না।

আর কিছু বলার… আরেকটা গুলি পাঠাল রানা, নেই।

পাশ থেকে রানার চোখের দিকে চাইল তিশা।

ওই দুই মায়াবী কালো চোখে নিজের উপর বিরক্তি। নিজেকে দোষ দিয়ে চলেছে। ফ্রেঞ্চ কমান্ডোরা সত্যিকারের রূপ দেখিয়েছে, কিন্তু সেজন্য তাদের উপর রাগ নেই। রাগ ওর নিজের উপর। আগেই বোঝা উচিত ছিল এরা বিজ্ঞানী নয়, খুনে সৈনিক।

আনমনে মাথা দোলাল তিশা।

রানা মানতে পারছে না, এরা উইলকক্স আইস স্টেশনে আগে এসেছে, সঙ্গে এনেছে সত্যিকারের দুজন বিজ্ঞানীকে, কাউকে সন্দেহ করবার কোনও সুযোগই দেয়নি।

মানুষটা নিজের উপর আরও খেপেছে, কারণ লড়াইয়ের শুরুতে কোনও পরিকল্পনা করতে পারেনি। ওদেরকে প্রথম থেকেই বোকা বানিয়েছে ফ্রেঞ্চ, বেকায়দা অবস্থায় ফেলেছে। আর এখন তো লড়াই কীভাবে চলবে সেটা তারাই ঠিক করছে।

কিন্তু আসলে কিছুই করবার ছিল না মাসুদ রানার।

তিশার মন চাইল ওকে সান্ত্বনা দিতে। কিন্তু চুপ রইল।

এদিকে নিজেকে দোষ দেয়া বন্ধ করেছে রানা, পরিষ্কার টের পেয়েছে মগজে ক্রোধ জমলে একের পর এক ভুল করবে। ওর মনে পড়ছে তিন বছর আগে লণ্ডনে ছিল, বিসিআইয়ের চিফ ওকে যোগ দিতে বলেন একটা সেমিনারে। উনি বলে দেন, ওখানে অনেক কিছু শিখতে পারবে। ওই সেমিনারে বক্তৃতা দেন লিজেণ্ডারি ব্রিটিশ কমাণ্ডার, মেজর জেনারেল জুলিয়াস বি. গুণ্ডারসন।

শক্তিশালী দেহের লোক, বাদামি দুই চোখে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, গোটা মাথা কামানো, থুতনির নীচে কুচকুচে কালো ছোরার মত দাড়ি। জুলিয়াস বি, গুণ্ডারসন দু হাজার সাল থেকে এখনও এসএএস-র প্রধান। ধারণা করা হয় তিনি বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে প্রতিভাবান ফ্রন্ট-লাইন মিলিটারি ট্যাকটিশিয়ান। ওই সেমিনার শেষে রানা মেনে নিয়েছে, ছছাট দল নিয়ে শত্রু এলাকায় ঢুকে বিজয়ী হওয়ার স্ট্র্যাটেজি সত্যিই তাঁর তুলনাহীন। অবশ্য সঙ্গে থাকতে হবে। এসএএস-র মত এলিট যোদ্ধা ইউনিট। গুণ্ডারসন কালে কালে হয়ে উঠেছেন ব্রিটিশ মিলিটারির গর্ব। শোনা যায় তাঁর অধীনে আজ পর্যন্ত এসএএস কোনও মিশনে ব্যর্থ হয়নি।

দুবছর আগে আবারও লণ্ডনে ওকে, দু দিনের একটি সেমিনারে যোগ দিতে বলেন বিসিআই চিফ মেজর জেনারেল (অব.) রাহাত খান। কমনওয়েলথ দেশগুলোর সেনাবাহিনী থেকে সেরা অফিসারদের পাঠানো হয় ওই সেমিনারে। তবে বক্তৃতা দেওয়ার জন্য নয়, কভার্ট ওয়ারফেয়ার সম্বন্ধে জ্ঞান নিতে।

ওই সেমিনারে শেষ বক্তা ছিলেন এসএএস-এর চিফ মেজর জেনারেল গুণ্ডারসন। তাঁর গভীর জ্ঞান ও সন্দেহাতীত যোগ্যতার পরিচয় পেয়ে মুগ্ধ হয় রানা। অনেকেই তাকে একের পর এক প্রশ্ন করে কাবু করতে চেয়েছে, কিন্তু খুব সহজ ভঙ্গিতে উত্তর দেন তিনি। প্রতিটা কথার ভিতর ছিল তীক্ষ্ণ সব যুক্তি।

রানার এখনও মনে পড়ে, তিনি বলেছিলেন, লড়াই শুরু হলে আপনার মনে প্রথম প্রশ্ন জেগে ওঠা উচিত: শত্রু আসলে কী চায়? যদি এই প্রশ্নের জবাব মেলে, মনকে দ্বিতীয় প্রশ্ন করুন: শত্রু কীভাবে পেতে চাইছে জিনিসটা?

নিজেই বুঝবেন; প্রথম প্রশ্নের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ দ্বিতীয় প্রশ্ন। বলতে পারেন, তা কীভাবে? ধরুন, জিনিসটা যদি তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ না-ই হয়, তো কী কারণে চাইছে? আপনাকে বুঝতে হবে, কারণ যাই হোক, ওটা পাবার জন্য জান বাজি ধরেছে সে। এটা বোঝা খুব জরুরি। এ থেকেই বুঝবেন, শুরু হয়ে গেছে লড়াই। আর সে লড়াই আপনার শেষ করতে হবে।

একবার দ্বিতীয় প্রশ্নের জবাব মিললে তৃতীয় প্রশ্ন আসে: কীভাবে এদেরকে ঠেকাবেন?

এরপর নেতৃত্বের উপর বক্তৃতা দেন গুণ্ডারসন, বারবার বলেন মাথা ঠাণ্ডা রাখতে হবে, যৌক্তিক পথে ভাবতে হবে। রাগী নেতা মানেই বোকা নেতা, সে একের পর এক ভুল করে খতম করবে তার দলকে।

আপনারা সামরিক নেতা, বলেছেন, গুণ্ডারসন, আপনাদের পক্ষে রেগে ওঠা বা বোকা বনার সুযোগ নেই।

কোনও নেতা, রাগ বা ভুল থেকে মুক্ত নয়, কাজেই এরপর গুণ্ডারসন। তাঁর তিন ধাপের ট্যাকটিক্যাল অ্যানালিসিস পেশ করেন।

আপনি যখন রেগে গেলেন, এই তিন ধাপের অ্যানালিসিস ব্যবহার করুন। রাগের বিষয়টি থেকে নিজের মন সরিয়ে নিন, শেষ করুন হাতের কাজ। তা হলে ভুলতে পারবেন কী রাগিয়ে দিয়েছিল। এরপর যে কাজে আপনাকে বেতন দেয়া হয়, সেটা শুরু করুন।

ওই সেমিনার শেষে মেজর জেনারেল গুণ্ডারসনের অধীনে ট্রেইনিং নেয় কয়েকজন সেরা অফিসার, তাদের ভিতর রানাও ছিল। অনেক কিছুই শিখতে পেরেছে তার কাছ থেকে।

এখন বরফ-ঠাণ্ডা উইলকক্স আইস স্টেশনের সি-ডেকে একটা দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে ভাবছে রানা, মনের ভিতর কথা বলে চলেছেন মেজর জেনারেল জুলিয়াস বি. গুণ্ডারসন।

বড় করে শ্বাস ফেলল রানা।

এরা কী চায়?

একটা স্পেসশিপ।

ওটা পাবে কীভাবে?

ওদের সবাইকে খুন করবে, তারপর তুলে আনবে স্পেসশিপ, কোনও দেশ বুঝবার আগেই ওটাকে সরিয়ে ফেলবে এই মহাদেশ থেকেই।

কিন্তু এই অ্যানালিসিসে একটা সমস্যা আছে। খুঁতটা ধরতে পেরেছে রানা।

বড় দ্রুত এখানে হাজির হয়েছে ফ্রেঞ্চরা।

এবং এতই দ্রুত, ইউনাইটেড স্টেটস কোনও দল পাঠাবার আগেই পৌঁছে গেছে তারা। এ থেকে বোেঝা যায় উইলকক্স আইস স্টেশন থেকে ডিসট্রেস সিগনাল ছড়িয়ে পড়বার সময় কাছেই ছিল তারা। অর্থাৎ, রাফায়লা ম্যাকানটায়ার যখন সিগনাল পাঠাল, তার আগেই ডুমো ডিখ-ঈলেখে ছিল ফ্রেঞ্চ কমাণ্ডোরা।

আগে থেকে কারও বুঝবার উপায় ছিল না ওই সিগনাল পাঠানো হবে। কাজেই, ওটা হঠাৎ করেই ঘটে।

আর এই অ্যানালিসিসের সমস্যা এখানেই।

ফ্রেঞ্চরা সামনে মস্ত একটা সুযোগ দেখতে পেয়েছে, এবং সুযোগটা নেয়ার জন্য মুহূর্তের নোটিসেই হামলে পড়েছে।

ডুমো ডিখ-ঈলেখে নিশ্চয়ই আর্কটিক ওয়ারফেয়ার বা এ ধরনের কোনও এক্সারসাইজে ব্যস্ত ছিল ফ্রেঞ্চ কমান্ডোরা।

তারপর উইলকক্স আইস স্টেশন থেকে ডিসট্রেস সিগনাল ধরল ডুমো ডিখ-ঈলেখ স্টেশন। খবর পাওয়ামাত্র ফ্রেঞ্চ সরকার বুঝে নিল, উইলকক্স আইস স্টেশনে রয়েছে এক্সট্রাটেরেস্ট্রিয়াল স্পেসশিপ, এবং তাদের এলিট মিলিটারি ইউনিট আছে মাত্র ছয় শ মাইল দূরে।

এ সুযোগ ছাড়া যায়?

ফ্রান্স মুঠোর মধ্যে পেয়ে যাবে অকল্পনীয় প্রকৌশলগত। উন্নতির সম্ভাবনা। এক পলকে পাল্টে যেতে পারে তাদের প্রপালশান সিস্টেম, হয়তো বদলে যাবে বিমানের আকৃতিও। তারা পেয়ে যেতে পারে অত্যন্ত আধুনিক, ঈর্ষণীয় অস্ত্র সম্ভার।

আসলে এর আগে কোনও জাতির সামনে এমন মোক্ষম সুযোগ আর আসেনি।

আরও ভাল দিক: ফ্রেঞ্চরা যদি উইলকক্স আইস স্টেশন থেকে স্পেসশিপ সরিয়ে ফেলতে পারে, চাইলেও আমেরিকান সরকার ইউএন বা ফ্রেঞ্চ সরকারের কাছে কেঁদে পড়তে পারবে না, কাউকে বলতে পারবে না আমেরিকার হাতে স্পেসশিপ ছিল। যা কখনও তাদের কাছে ছিলই না, তা চুরি হয়েছে, এমন কথা কী করে বলবে!

দুটো সমস্যা তৈরি হয়েছে ফ্রেঞ্চ কমাণ্ডোদের সামনে।

প্রথম সমস্যা: উইলকক্স আইস স্টেশনের বাঙালি ও আমেরিকান বিজ্ঞানী, তাদেরকে মেরে ফেলতে হবে। কোনও সাক্ষী রাখা চলবে না।

দ্বিতীয় সমস্যা গুরুতর: সন্দেহ নেই ইউনাইটেড স্টেট উইলকক্স স্টেশনে রিকনিস্যান্স ইউনিট পাঠাবে। এদিকে টিকটিক করে এগিয়ে চলেছে সেকেণ্ডের কাঁটা। ফ্রেঞ্চরা বুঝতে পেরেছে, যত দ্রুত সম্ভব ইউএস টুপ হাজির হবে, এবং তা ঘটবে স্পেসশিপ সরিয়ে নেয়ার আগেই।

তার মানেই: তুমুল গোলাগুলি।

কপালের জোরে ঠিক সময়ে নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছেছে ফ্রেঞ্চ কমাণ্ডো দল। কিন্তু তাদের পক্ষে উইলকক্স আইস স্টেশনে ফুল-স্ট্রেংথ অ্যাসল্ট চালানো সম্ভব নয়। হতে পারে, তারা স্পেসশিপ সরিয়ে নেয়ার আগেই তাদের টুপ হয়ে উঠবে অসহায়, অনেক বড় কোনও দল পাঠাবে ইউএসএ।

কাজেই তাদেরকে অন্য পরিকল্পনা করতে হয়েছে।

কমাণ্ডোরা ভান করেছে, তারা বিজ্ঞানী, প্রতিবেশীদের সাহায্য করতে এসেছে। তারা ধারণা করেছে, ছোট কোনও দল এলে বোকা বানাতে পারবে, এবং প্রথম সুযোগেই সবাইকে খুন করতে পারবে। অপেক্ষাকৃত দুর্বল ও ছোট দলের জন্য এটা মন্দ পরিকল্পনা নয়।

সেক্ষেত্রে মাত্র একটি প্রশ্ন থাকে: অ্যান্টার্কটিকা থেকে কীভাবে স্পেসশিপ সরাবে?

আপাতত ওই প্রশ্নের জবাব না পেলেও চলবে, ভাবল, রানা। এখন লড়াইয়ে মন দেয়া উচিত। আবারও প্রথম প্রশ্ন ফিরল মনে: ওরা কী চাইছে?

বিজ্ঞানী এবং ওদেরকে খুন করতে চাইছে, যত দ্রুত সম্ভব।

তা কীভাবে করবে?

মন থেকে কোনও জবাব পেল না রানা। নিজেকে জিজ্ঞেস করল, আমি হলে কী করতাম?

মুহূর্ত পর ওর মন বলে দিল: তুমি সবাইকে তাড়িয়ে এক জায়গায় নেবার চেষ্টা করতে। সেক্ষেত্রে গোটা স্টেশন খুঁজে সবাইকে খুন করতে হতো না।

গ্রেনেড! চেঁচিয়ে উঠল তিশা।

কাঁধে মৃদু ঝাঁকি খেয়ে বাস্তবে ফিরল রানা। এ-ডেক থেকে উড়ে নামছে কালো গ্রেনেড, আসছে ঠিক ওদের দিকেই। উপর থেকে পড়ছে আরও ছয়টা গ্রেনেড। ওগুলো ঢুকে গেল বিডেকের তিন টানেলের ভিতর।

সরে আসুন, স্যর!

তিশার ডাক শুনে পিছিয়ে ঘরে ঢুকে পড়ল রানা, চট করে বন্ধ করে দিল কবাট। কয়েক লাফে পৌঁছে গেল ওরা ঘরের আরেক প্রান্তে। পুরু কাঠের দরজার উপর ঠকাস্ আওয়াজ তুলল গ্রেনেড!

একমুহূর্ত পর বোমা বিস্ফোরিত হলো বিকট আওয়াজে। দরজার ভিতর অংশ থেকে নানা দিকে ছুটল সাদা কাঠের চল্টা। সে জায়গায় দেখা গেল কয়েক শ তীক্ষ্ণধার ধাতুর টুকরো, একেকটা পেরেকের ডগার মত।

চমকিত রানা দেখল দরজার একেবারে নীচ থেকে শুরু করে উপর অংশ ঝাঁঝরা হয়েছে। একটু আগে কাঠের কবাট ছিল মসৃণ, এখন মনে হচ্ছে ওটা ভয়ঙ্কর কোনও মেডিইভেল টর্চার ডিভাইস। গোটা দরজা জুড়ে খুদে বর্শার ফলা, প্রায় বেরিয়ে এসেছে পুরু কবাট ভেদ করে।

উপরে বি-ডেকে বিস্ফোরণের আওয়াজ। বি-ডেক, ভাবল রানা, ওখানে সবাইকে জড় করতে চাইছে ফ্রেঞ্চরা।

ওর শুকনো মুখ দেখে জানতে চাইল তিশা, কী ভাবছেন, স্যর?

কোনও জবাব দিল না রানা, সামনে এগিয়ে খুলে ফেলল দরজা, উঁকি দিল আইস স্টেশনের সেন্ট্রাল শাফটে। মুহূর্ত পর মাথার পাশে, খট-খট আওয়াজে দরজার চৌকাঠে লাগল দুটো বুলেট। পাত্তা দিল না রানা, সামান্য আড়াল নিয়ে উপরের এডেকের দিকে চাইল।

ক্যাটওয়াকের উপর দফায় দফায় গুলি ছুঁড়ছে পাঁচ ফ্রেঞ্চ কমাণ্ডো, উদ্দেশ্য কাভার ফায়ার দেয়া।

সেই সুযোগে নেমে আসছে বাকি পাঁচ কমাণ্ডো। মাত্র কয়েক সেকেণ্ডে মই বেয়ে নেমে এল তারা, বি-ডেকের ক্যাটওয়াকে পৌঁছে গেল। হাতে উদ্যত অস্ত্র নিয়ে ঢুকে পড়ল টানেলগুলোর ভিতর।

ওদিকে চেয়ে অস্বস্তি বোধ করল রানা। উপর থেকে ফ্রেঞ্চ কমাণ্ডোরা তাড়া দেয়ায় ওর দলের প্রায় সবাই আছে ওই বিডেকে।

এ ছাড়া আরেকটা বিষয় খুব জরুরি।

উইলকক্স আইস স্টেশনে প্রধান লিভিং এরিয়া বি-ডেক, ওখানে যার যার কোয়ার্টারে আমেরিকান বিজ্ঞানীদেরকে পাঠিয়ে দিয়েছে ও। এরপর ওরা দেখতে গেছে ফ্রেঞ্চ হোভারক্রাফট নিয়ে কারা এল।

চিন্তিত রানা চেয়ে আছে বি-ডেকের দিকে। ওদেরকে ওইখানে জড়ো করতে চাইবে ফ্রেঞ্চ কমাণ্ডোরা!

.

হঠাৎ করেই বদলে যেতে শুরু করেছে বি-ডেকের পরিস্থিতি।

বরফের টানেলের বাঁকে পৌঁছেই চমকে গেছে হোসেন আরাফাত দবির ও টনি কেলগ। ওদিক থেকে আসছে উইলকক্স আইস স্টেশনের বাসিন্দারা।

চট করে হোসেন আরাফাত দবিরের মনে পড়ল বি-ডেক হচ্ছে এদের লিভিং এরিয়া।

পিছনে সাবমেশিনগানের গর্জন শুরু হয়েছে।

হেলমেট ইন্টারকমে মাসুদ রানার কণ্ঠ শুনল দবির, প্রত্যেক ইউনিট, আমি মেজর মাসুদ রানা। এইমাত্র পাঁচ ফ্রেঞ্চ কমাণ্ডে নেমেছে ক্যাটওয়াকে। আবার বলছি, ওরা পাঁচজন। তোমরা বি-ডেকে সতর্ক হও।

দ্রুত ভাবতে শুরু করেছে দবির, কী যেন বি-ডেকের ফ্লোর প্ল্যান! ওর মনে পড়ল, অন্য লেভেলের সঙ্গে সামান্য, তফাৎ আছে বি-ডেকের। অন্য সব ফ্লোরে সেন্ট্রাল শাফট থেকে এসেছে চারটে টানেল, তারপর রয়েছে বাইরের গোলাকার টানেল, কিন্তু বি-ডেক তা নয়। পাথরের মস্ত একটি স্তরের, কারণে দক্ষিণে কোনও সুড়ঙ্গ খোড়া যায়নি বি-ডেকে।

অন্য সব লেভেলের মত নয়, বি-ডেকে প্রধান শাফট থেকে এসেছে মাত্র তিনটি টানেল, বাইরের দিকের টানেল কোনও বৃত্ত তৈরি করেনি। এর ফলে দক্ষিণ টানেল হঠাৎ করেই বুজে গেছে। দবিরের মনে পড়ল, আগেও ওদিকটা দেখেছে: টানেলের শেষে একটি ঘর, আর ওখানেই আটকে রাখা হয়েছে বাঙালি বিজ্ঞানী রাশেদ হাবিবকে।

আপাতত বাইরের দিকের টানেলে রয়েছে দবির ও কেলগ, পুব টানেলের বাঁক পেরুলে পা রাখবে উত্তর টানেলে। গোলাগুলির বিকট আওয়াজ শুনে বেরিয়ে এসেছে বিজ্ঞানীরা, অবশ্য বেশি দূর যাওয়ার সাহস হয়নি। ফ্যাকাসে হয়ে গেছে সবার মুখ, তাদের ভিতর ছোট্ট এক মেয়েকে দেখতে পেল দবির।

হায় আল্লা, বিড়বিড় করে বলল সে। পরক্ষণে কেলগকে বলল, পিছনে টানেল কাভার দাও। বোঝাতে চেয়েছে কেউ যেন বাইরের এই টানেল থেকে উত্তর টানেলে ঢুকতে না পারে।

নিজে বিজ্ঞানীদের পেরিয়ে গেল দবির, নজর রাখল পুব টানেলে। পিছন না ফিরেই বলল, লেডিজ অ্যাণ্ড জেন্টলম্যান, আপনারা যার যার ঘরে ফিরে যান। জলদি!

এখানে কী হচ্ছে? রাগত কণ্ঠে জানতে চাইল একজন বিজ্ঞানী।

আপনাদের বন্ধুরা মোটেই বন্ধু ছিল না, বলল সার্জেন্ট দবির। আপনাদের স্টেশনের ভিতর একদল ফ্রেঞ্চ প্যারাট্রুপার নিয়ে ঢুকেছে ওরা। সামনে পেলে খুন করবে আপনাদেরকে। এবার নিজের ঘরে ফিরে যান।

সার্জেন্ট, গ্রেনেড! করিডোরের দূর-প্রান্তে চেঁচাল কেলগ।

চোখের কোণে দবির দেখল এইমাত্র বাঁক পেরুল কেলগ, তীরের মত আসছে ওর দিকেই। আরও চোখে পড়ল বিশ ফুট পিছনে ড্রপ খেয়েছে ফ্র্যাগমেন্টেশন গ্রেনেড।

শালার কপাল! চরকির মত ঘুরল দবির, পুব টানেলের বাক কমপক্ষে দশ গজ দূরে!

ঠিক তখনই পুব টানেল থেকে এল আরও দুটো গ্রেনেড। বাইরের দিকের টানেলের দুই মুখে পড়েছে সব মিলে তিনটে গ্রেনেড!

ফ্রেঞ্চ কুত্তার-বাচ্চারা! বিস্ফারিত হলো দবিরের দুই চোখ। কাছের দরজার কবাট খুলতে শুরু করেছে ও, ধমকে উঠল বিজ্ঞানীদেরকে, শালারপো, শালারা, ঘরে ঢোক! এক্ষুনি! যে যার ঘরে!

এক সেকেণ্ড পর বিজ্ঞানীরা বুঝল সে কী বলছে, পরক্ষণে যে যার দরজার দিকে ঝেড়ে দৌড় দিল।

সামনের দরজা দিয়ে ঢুকে পড়ল দবির, পরক্ষণে উকি দিল কেলগ কী করছে দেখতে। বাঁকা টানেল ধরে সিক্স মিলিয়ন ডলার ম্যানের গতি তুলে ছুটে আসছে তরুণ কর্পোরাল।

তারপর পা পিছলে গেল তার।

বেকায়দা ভাবে হুমড়ি খেয়ে পড়ে সরসর করে পিছলে চলেছে বরফের মেঝেতে।

অসহায় চোখে কেলগের দিকে চেয়ে রইল দবির। লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াতে গেল কালো ছেলেটা, তারই ফাঁকে চাইল পিছনের ফ্র্যাগমেন্টেশন গ্রেনেডের দিকে।

আর বড়জোর দুই সেকেণ্ড বাকি।

দুশ্চিন্তা করতে গিয়ে দবিরের পেটের পেশি জট পাকিয়ে গেল।

বাঁচবে না টনি কেলগ। ছেলেটাকে ভাল লেগেছিল ওর।

সবচেয়ে কাছের দরজা দিয়ে ঢুকতে চাইছে দুই বিজ্ঞানী। পিছনের জন গুঁতো দিচ্ছে সঙ্গীর পিঠে। যেভাবে হোক ঘরে ঢুকতে হবে।

মহা আতঙ্ক নিয়ে কেলগের দিকে চেয়ে আছে দবির। দুই বিজ্ঞানীকে ঠেলাঠেলি করতে দেখেছে কেলগ, বুঝে গেছে ওই ঘরে আর ঢুকতে পারবে না। বাইন মাছের মত গা মুচড়ে ঘুরে চাইল, তিরিশ ফুট দূরে টানেলের বাঁকে ফ্র্যাগমেন্টেশন গ্রেনেড!

উন্মাদ হয়ে উঠল কেলগ, ঘুরেই চাইল দবিরের চোখে। দুজনের চোখ আটকে গেছে পরস্পরের উপর। ভীষণ ভয় কেলগের চোখে, বুঝে গেছে মরতে যাচ্ছে ও এখুনি।

কোথাও যাওয়ার নেই। কোথাও না!

তারপর বিকট আওয়াজে ফাটল তিন গ্রেনেড উত্তর টানেলে একটা, পুব টানেলে দুটো পেটের সব বিষ ঝাড়ল। চৌকাঠ ছেড়ে পিছিয়ে গেল দবির, চোখের সামনে দেখল দুদিকে ছুটছে চকচকে ধাতুর টুকরো!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *