১.০৯ হাসি-হাসি সুরে ফ্রেঞ্চে

গুড মর্নিং, হাসি-হাসি সুরে ফ্রেঞ্চে বলল রানা।

চার বিজ্ঞানী দাঁড়িয়ে পড়েছে দরজার সামনে। চেহারা বোকা-বোকা। সামনে ও পিছনে দুজন করে পাশাপাশি দাঁড়িয়েছে, মাঝে বড় একটা করে কন্টেইনার।

তাদের সামনে গিয়ে দাঁড়াল রানা, হাতে আলগা ভাবে ঝুলছে এমপি-৫। ওর পিছনে এমপি-৫ কাঁধে তুলে ফেলেছে কর্পোরাল টনি কেলগ ও সার্জেন্ট জনি ওয়াকার। অস্ত্রের নলের উপর দিয়ে সামনের লোকগুলোকে দেখছে তারা।

ভিতরে ঢুকে পড়ন, আমন্ত্রণ জানাল রানা।

লোকগুলো এক মুহূর্ত ইতস্তত করল, তারপর সামনে বাড়ল। একপাশে সরে গেল রানা। সবাই দরজা দিয়ে ঢুকতেই পিছনে রওনা হলো। আড়ষ্ট পায়ে চলেছে ফ্রেঞ্চরা। বোঝা গেল ভারী কন্টেইনার বইতে কষ্ট হচ্ছে তাদের।

একমিনিট হাঁটতেই ফুরিয়ে গেল সুড়ঙ্গ, ক্যাটওয়াকে বেরিয়ে এল ওরা। একটু দূরে ডাইনিংরুমে উজ্জ্বল আলো জ্বলছে। ওদিকে হাতের ইশারা করল রানা। ওর পিছনে দুপাশ থেকে কাভার করছে টনি কেলগ ও জনি ওয়াকার।

আপনারা ইংরেজি জানেন? সবাই ডাইনিংরুমে ঢুকতেই জানতে চাইল রানা।

নতুন এই দলের নেতা বললেন, জী। তবে একটু আগে আপনি যেমন সাবলীল ফ্রেঞ্চ বললেন, তেমনি করে ইংরেজি জানি না আমরা।

দুই কন্টেইনার মেঝের উপর রেখে চারপাশ দেখছেন। তারা। চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে সতীর্থদের দেখে।

কাঁধে অস্ত্র ঝুলিয়ে তাদের পাশে চলে গেল কেলগ, ভাল ভাবে সার্চ করে দেখল। কারও সঙ্গে অস্ত্র নেই। মাথা নাড়ল রানার দিকে চেয়ে।

ইংরেজিতে জানতে চাইল রানা, এখানকার সব সায়েন্টিস্ট ফ্রেঞ্চ স্টেশনে পৌঁছেছেন? সবাইকে একটা টেবিলের পিছনে বসতে ইশারা করল।

হ্যাঁ, নিরাপদে ডুমো ডিখ-ঈলেখ পৌঁছেছেন, প্রথম ভদ্রলোক জানালেন।

তাঁর চেহারা দেখে মনে হয় নিয়মিত খেতে পান না। দুই গালে বড় দুটো গর্ত, উঁচু চোয়ালের হাড়ের কারণে দেখতে খারাপ লাগে, চোখদুটোও খোড়লের ভিতর বসা। সুড়ঙ্গ দিয়ে আসবার সময় নিজের নাম বলেছেন জ্যাকুস ফিউভিল। লিস্টে এই নাম আছে, জানে রানা। এঁর নামের নীচে সংক্ষিপ্ত বায়োডেটায় লেখা: জ্যাকুস ফিউভিল, জিয়োলজিস্ট, কন্টিনেন্টাল শেলফের প্রাকৃতিক গ্যাসের উপর গবেষণা করছেন।

সুড়ঙ্গ ধরে আসবার পথে অন্য তিন ফ্রেঞ্চের নামও জেনে নিয়েছে রানা। এঁদের সবার নাম আছে ওই লিস্টে।

অন্য চার ফ্রেঞ্চ বিজ্ঞানী এখনও ডাইনিংরুমেই আছেন। তারা ম্যাথিউ ফ্যেনুয়্যা, গ্যাসেয়া ভিভাদিয়েখ, সঁা ডেনি পেয়েযি ও দু লা বোয়াবার্থেলিউ। এদিকে উইলকক্স আইস স্টেশনের আসল বাসিন্দারা চলে গেছেন নিজেদের কোয়ার্টারে। আগেই রানা বলে দিয়েছে, আপাতত তাদেরকে ওখানেই থাকতে হবে। আর এ দিকে ওর দলের কয়েকজনকে নিয়ে নতুন আগন্তুকদের সঙ্গে দেখা করতে গেছে রানা। সে-সময়ে ওর দলের মেরিন ল্যান্স-কর্পোরাল কেভিন হাক্সলে ডাইনিংরুমের দরজা পাহারা দিয়েছে।

আমরা যতটা সম্ভব দ্রুত ফিরেছি, বললেন জ্যাকুস ফিউভিল। সঙ্গে টাটকা খাবার আর ফিরতি পথের জন্য ব্যাটারি চালিত কম্বল এনেছি।

তিশা করিমের দিকে চাইল রানা। ডাইনিংরুমের আরেক দেয়ালের কাছে মেয়েটি। ওখানে ফ্রেঞ্চদের আনা সাদা রঙের কন্টেইনার দুটো পরীক্ষা করে দেখছে।

এসব আনার জন্য ধন্যবাদ, ঘুরে জ্যাকুস ফিউভিলের দিকে চাইল রানা। অনেক করেছেন। আমরা এসেছি কয়েক ঘণ্টা পর, এখানে পৌঁছে দেখলাম ইতিমধ্যেই ফ্রেঞ্চরা সাহায্য করছে।

তা তো করবেই, বললেন জ্যাকুস ফিউভিল। প্রতিবেশীর খোঁজ নেয়া তো সবারই দায়িত্ব। ক্লান্ত হাসলেন তিনি। অ্যান্টার্কটিকায় কেউ জানে না কখন কার কী সাহায্য লাগবে।

ঠিকই বলেছেন, তাঁর এক সঙ্গী বললেন।

রানার ইয়ারপিসে বলে উঠল, সার্জেন্ট সিংগার: মেজর, আরেকটা কন্ট্যাক্ট। এইমাত্র ট্রিপ-ওয়ায়ার পেরুল।

ভুরু সামান্য কুঁচকে গেল রানার। বড় দ্রুত ঘটছে সব। আট বিজ্ঞানীকে সামলাতে পারবে ওরা, কিন্তু এখন উইলকক্স আইস স্টেশনে আরও লোক এলে…

একমিনিট, মেজর, সব ঠিক। ওটা আমাদের হোভারক্রাফট। সার্জেন্ট দবির ফিরছে।

আস্তে করে শ্বাস ফেলল রানা। ঘুরে দাঁড়িয়ে দরজার দিকে পা বাড়াল। ক্যাটওয়াকে পৌঁছে রওনা হলো সদর-দরজার দিকে।

ওদিকে ডাইনিংরুমের দেয়ালের কাছে দুই কন্টেইনারের একটার ভিতর হাত ভরে দিয়েছে তিশা করিম। উপর থেকে সরিয়ে ফেলেছে কয়েকটা কম্বল ও টাটকা পাউরুটি। বাক্সের নীচে। বেশ অনেকগুলো–ক্যান। বেশির ভাগই মাংসের গরুর, শুয়োরের ও মুরগির। প্রতিটি ক্যান সিল করা। মাথার উপর রিং, ওটা ধরে টান দিলে ছাতের সরু পাত উঠে আসবে।

কয়েকটা ক্যান সরিয়ে বাক্সের নীচে মনোযোগ দিল তিশা। আঁর ঠিক তখনই কী যেন চোখে পড়ল।

কী যেন বড় অস্বাভাবিক!

বেশিরভাগ ক্যানের চেয়ে বড় ওই ক্যানটা। আকারে মাঝারি, ত্রিকোণাকৃতির। প্রথমে তিশা নিশ্চিত হতে পারল না, কেন ওর সন্দেহ জেগেছে। কিন্তু আকারটা বড় বেঢপ।

পরক্ষণে বুঝে গেল।

এই ক্যানের সিল ভাঙা। পাত উঠিয়ে নিয়ে আবারও ঠিক ভাবে রাখতে চেয়েছে। খুঁতটা প্রায় চোখেই পড়ছে না। ভাল করে খেয়াল করলে বোঝা যায়, ক্যানের মুখে সরু একটা কালো রেখা।

চট করে ঘুরে চাইল তিশা, ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেছে মাসুদ রানা। চোখ পড়ল ফ্রেঞ্চ বিজ্ঞানীদের উপর। ওকেই দেখছেন জ্যাকুস ফিউভিল, চকিতে চাইলেন বোয়াবার্থেলিউয়ের দিকে।

.

রানার সঙ্গে সার্জেন্ট হোসেন আরাফাত দবিরের দেখা হলো এন্ট্রান্স টানেলের কাছেই, ডাইনিংরুক্ষ থেকে তিরিশ ফুট দূরের ক্যাটওয়াকে।

কী অবস্থা? জানতে চাইল রানা।

থমথম করছে সার্জেন্টের মুখ। খুব খারাপ খবর, স্যর।

খুলে বলুন।

সিগনাল হারিয়ে যায়। ওটা একটা ফ্রেঞ্চ হোভারক্রাফট। ডুমো ডিখ-ঈলেখের। একটা গভীর খাদের ভিতর পড়ে।

তারপর? চট করে ডাইনিংরুমের দরজার দিকে চাইল রানা। ওখানে রয়েছে ফ্রেঞ্চরা। কয়েক মিনিট আগে জ্যাকুস ফিউভিল বলেছে দ্বিতীয় হোভারক্রাফট নিরাপদে ডুমো ডিখঈলেখ পৌঁছে গেছে। কী হয়েছিল? পাতলা বরফের কারণে দুর্ঘটনা?

না, স্যর। আমরা প্রথমে তা-ই ভেবেছি। পরে কাছ থেকে দেখল কর্পোরাল নাজমুল।

কী দেখল? চট করে জানতে চাইল রানা।

মাথা নাড়ল দবির। হোভারক্রাফটের ভিতর পাঁচটা লাশ, স্যর। সবার মাথার পিছনে গুলি করা হয়েছে।

রানার হেলমেট ইন্টারকমে শোনা গেল তিশার কণ্ঠ: স্যর, মস্ত কোনও গোলমাল। খাবারের ক্যান আগেই খোলা হয়েছে।

ঝট করে ঘুরে দাঁড়াল রানা। ডাইনিংরুম থেকে বেরিয়ে এসেছে তিশা করিম। দ্রুত হেঁটে আসছে। হাতে তিনকোনা একটা ক্যান। ওটার মুখ খোলা।

মেয়েটির পিছনে ডাইনিংরুমে জ্যাকুস ফিউভিলকে দেখতে পেল রানা। লোকটা চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছে। চেয়ে আছে তিশার দিকে, তারপর তার চোখ পড়ল রানার চোখে ওদের চোখ আটকে গেছে পরস্পরের উপর।

এর এক সেকেণ্ড পর যা বোঝার বুঝে গেল দুজনেই।

তিশা এগিয়ে আসছে বলে ফিউভিলকে আর দেখতে পেল না রানা। ক্যানের মুখ খুলে ফেলেছে মেয়েটি, ভিতর থেকে কী যেন বের করছে। জিনিসটা ছোট এবং কালো। যেন কোনও ক্রুশ। তফাৎ হচ্ছে ওটা খুদে আকারের, হাতলের জায়গাটা পিছন দিকে বেঁকে গেছে।

জিনিসটার উপর চোখ পড়তেই বিস্ফারিত হলো রানার চোখ। সতর্ক করতে মুখ হাঁ করল ও, কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে।

ডাইনিংরুমে সাদা দুই কন্টেইনার লক্ষ্য করে ঝাঁপ দিয়েছে ফিউভিল। একইসঙ্গে উঠে দাঁড়িয়েছে দু লা বোয়াবার্থেলিউ। স্টেশনে পৌঁছে. তাকে সার্চ করেনি রানারা। ঝটকা দিয়ে পারকা সরিয়ে দিয়েছে সে, দুই হাতে বেরিয়ে এসেছে ফ্রেঞ্চদের তৈরি খাটো ব্যারেলের ফ্যামাস অ্যাসল্ট রাইফেল। ওই একই সময়ে ফ্রেঞ্চ বিজ্ঞানী গ্যাসোয়া ভিভাদিয়েখ দুই পকেট থেকে বের করেছে দুটো ক্রুশ। ওই একই জিনিস তিশার হাতে। ভিভাদিয়েখের ডান হাতের ক্রুশ থেকে ছিটকে বেরুল কী যেন। তিশাও ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে, ওই মুহূর্তে রানা দেখল হঠাৎ করেই মেয়েটির মাথা পিছনে ঝটকা খেল। পরক্ষণে মেঝের উপর ধড়াস্ করে পড়ল তিশা।

এক সেকেণ্ড পর ব্রাশ ফায়ারের আওয়াজে খানখান হলো নীরবতা। অ্যাসল্ট রাইফেলের ট্রিগার পেঁচিয়ে ধরেছে দু লা বোয়াবার্থেলিউ, ডাইনিংরুম থেকে বেরুল একপশলা গুলি। দরজার সামনে দু টুকরো হয়ে গেল কর্পোরাল কেভিন হাক্সলে।

দশ সেকেণ্ডে কয়েক দফায় গুলিবর্ষণ করল বোয়াবার্থেলিউ, ততক্ষণে মেঝের উপর ঝাপিয়ে পড়েছে তার শত্রুপক্ষের প্রত্যেকে। সবাই বুঝে গেছে, উইলকক্স আইস স্টেশন হয়ে উঠেছে যুদ্ধক্ষেত্র।

মাসুদ রানা বলছি! হেলমেট মাইকে শান্ত কণ্ঠে বলল রানা, দুই লাফে চলে গেছে কাছের টানেলের দরজার আড়ালে। ওরা আটজন! আবার বলছি, ওরা আটজন! ছয়জন মিলিটারি পারসোনেল! দুজন সায়েন্টিস্ট। এরা কমাণ্ডোদের জন্যে অস্ত্র লুকিয়ে এনেছে। কাউকে কোনও ছাড় দিতে যেয়ো না!

রানার চারপাশে ছিটকে পড়ছে বরফ-কুঁচি, দু লা বোয়াবার্থেলিউয়ের গুলি লাগছে মাথার উপরের বরফ-দেয়ালে।

ক্রসবো দেখে ফেলেছে বুঝেই কাজে নেমে পড়েছে ফ্রেঞ্চ কমাণ্ডোরা।

পৃথিবীর প্রতিটি এলিট মিলিটারি ইউনিটের বিশেষ কিছু চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য থাকে। ইউনাইটেড স্টেটসের নেভি সিল মুখোমুখি লড়াই-এ বারো গেজ পাম্প-অ্যাকশন শটগান ব্যবহার করে। ব্রিটিশ স্পেশাল এয়ার সার্ভিস, বা এসএএস ব্যবহার করে নাইট্রোজেন চার্জ। ইউএস মেরিন ফোর্স রিকনিসেন্স ইউনিট বা রেগুলার ইউনাইটেড স্টেটস্ মেরিন কর্পস ব্যবহার করে আমালাইট এমএইচ-১২ ম্যাগহুক। ওটা এ্যাপলিং হুকসহ লঞ্চার। ধাতব দেয়াল বেয়ে উঠবার সময় ব্যবহার করা হয় হাই-পাওয়ার্ড ম্যাগনেট। ম্যাকমার্ডো স্টেশনে রানার দলের সবার জন্য এই একই জিনিস দেয়া হয়েছে।

মাত্র একটি এলিট ফোর্স ব্যবহার করে ক্রসবো।

দো খমিয়েখ খেযিমন্ত প্যাখাশুতিস্ট দোইনফেন্তেখিয়্য দে মেখিন হচ্ছে ফ্রেঞ্চদের ক্র্যাক কমান্ডো ইউনিট–অন্য দেশে এরা ফাস্ট মেরিন প্যারাশুট রেজিমেন্ট নামে পরিচিত। এদের কাজ ব্রিটিশ এসএএস বা ইউএসএ-র সিলের মতই।

এই রেজিমেন্ট ইউএস মেরিন বা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর রেগুলার ফোর্সের মত নয়। এদের কাজ এক ধাপ উঁচু স্তরের। অফেন্সিভ ইউনিট বা অ্যাটাক টিম, এলিট কভার্ট ফোর্স–এদের একমাত্র কাজ শত্রুপক্ষের এলাকায় ঢুকে পড়া এবং দেখামাত্র সবাইকে হত্যা করা।

রানা যখন তিশাকে ক্যানের ভিতর থেকে খুদে ক্রসবো বের করতে দেখেছে, ও বুঝে গেছে ওই লোকগুলো ডুমো ডিখঈলেখের বিজ্ঞানী নয়।

ফ্রেঞ্চ এলিট ফোর্সের কমাণ্ডোরা ধরেই নিয়েছে রানা ডুমো ডিখ-ঈলেখের বিজ্ঞানীদের নাম জেনে আসবে, কাজেই তাদের নাম ধার করে এসেছে উইলকক্স আইস স্টেশনে। নিজেদেরকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করবার জন্য সঙ্গে এনেছে সত্যিকারের দুজন বিজ্ঞানীকে।

ডুমো ডিখ-ঈলেখের ম্যাথিউ ফ্যেনুয়্যা ও স্যা ডেনি পেয়েযিকে আগে থেকেই উইলকক্স আইস স্টেশনের বাসিন্দারা চিনত।

নিষ্ঠুর ধোকাবাজি করেছে এরা।

রানা যখন ওর দল দিয়ে স্টেশনে এল, ওরা দেখল এই দলের নেতা ম্যাউি ফ্যেনুয়্যা, যাকে এখানকার বাসিন্দারা ভাল করেই চেনে। কাজেই ওরা ধরে নিয়েছে এরা সবাই বিজ্ঞানী। এদের একজন উইলকক্স আইস স্টেশনের পাঁচ বিজ্ঞানীকে সরিয়ে নিয়েছে, ভঙ্গি করেছে নিরাপদে পৌঁছে দেবে ফ্রেঞ্চ স্টেশনে। অথচ নির্দ্বিধায় ওরা নিরীহ সিভিলিয়ান মানুষগুলোকে বিনা অপরাধে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে তুষারের প্রান্তরে। ভাবতে গিয়ে এখন রাগে ফুঁসছে রানা, মনের চোখে দেখছে: বাঙালি ও আমেরিকান বিজ্ঞানী–নারী-পুরুষ, সবাই কাঁদছে, করুণ সুরে প্রাণভিক্ষা চাইছে: আমাদেরকে মারবেন না, দয়া করুন, বাঁচতে দিন! তাদের পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে ফ্রেঞ্চ কমাণ্ডোরা, তারপর মাথার পিছনে পিস্তলের নল ঠেকিয়ে গুলি করল। হোভারক্রাফটের ভিতর ছিটকে পড়ছে ধূসর মগজ ও রক্ত।

ম্যাথিউ ফ্যোনুয়্যা ও স্যাঁ ডেনি পেয়েযি আসলে বিজ্ঞানী?

ভাবতে গিয়ে ঘৃণায় মুখ কুঁচকে ফেলল রানা। নিরীহ অসহায় বিজ্ঞানীদের হত্যার সঙ্গে নিজেদের জড়াতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেনি, এদেরকে কী লোভ দেখিয়েছে ফ্রেঞ্চ সরকার?

অবশ্য, জবাবটা পাওয়া খুবই সোজা।

ফ্রেঞ্চদের হাতে স্পেসশিপ এলে পরীক্ষা করবার প্রথম সুযোগ দেয়া হবে এদেরকে।

হেলমেট ইন্টারকমে একের পর এক চিৎকার শুনল রানা।

পাল্টা গুলি করো!

সরে এসো!

হাক্সলে মারা গেছে। তিশাও!

শালার কপাল! ওই হারামজাদাকে গুলি করতে…

দরজার কৰাটের আড়াল থেকে সামনের দিক দেখল রানা। ডাইনিংরুম এবং মেইন এন্ট্রান্স প্যাসেজওয়ের মাঝে ক্যাটওয়াকে পড়ে আছে তিশা।

রানার চোখ স্থির হলো কেভিন হাক্সলের উপর। ডাইনিংরুম ও ক্যাটওয়াকের মাঝে সে। বড় বড় দুই চোখ ভোলা, মুখটা ভেসে গেছে রক্তে, হেঁড়াখোঁড়া, পেট থেকে এসেছে ওই রক্ত। ওকে পয়েন্ট-ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জে গুলি করেছে দু লা বোয়াবার্থেলিউ।

একটু দূরে স্টেশনের মেইন এন্ট্রান্সের মুখে কর্পোরাল নাজমুল আছে, ঝট করে বেরিয়ে এসেই গুলি করে আবার আড়াল নিচ্ছে। ফ্রেঞ্চদের ফ্যামাস রাইফেল দুর্বল র্যাট-ট্যাট আওয়াজ তুলছে, তার জবাবে জার্মানদের তৈরি এমপি-৫ যেন বাতাস ভরা টিউব ফুটো হওয়ার আওয়াজ করছে। কর্পোরাল নাজমুলের পাশে যোগ দিয়েছে কর্পোরাল টনি কেলগ।

চারপাশ দেখে নিতে চাইল রানা। পশ্চিম টানেলের মুখে জবুথবু হয়ে বসেছে সার্জেন্ট জনি ওয়াকার। ওয়াকার, ঠিক আছেন? জানতে চাইল রানা।

দু লা বোয়াবার্থেলিউ যখন গুলি শুরু করল, ডাইনিংরুমের সবচেয়ে কাছে ছিল সার্জেন্ট জনি ওয়াকার ও কর্পোরাল কেভিন হাক্সলে। গুলি শুরু হতেই, ঝট করে কবাটের আড়ালে সরে গেছে ওয়াকার। ওদিকে সরাসরি গুলির তোড়ে পড়েছে কেভিন। দ্রুত পছিয়েছে ওয়াকার, ঝেড়ে দৌড় দিয়ে পৌঁছে গেছে পশ্চিম টানেলের আপাত নিরাপদ আড়ালে।

পঞ্চাশ ফুট দূরে তাকে হেলমেট মাইকে কথা বলতে দেখল রানা। ওর হেডসেটে বলে উঠল ঘড়ঘড়ে কণ্ঠ: ঠিক আছি, স্যর। একটু চমকে গেছি, তবে কিছু হয়নি।

গুড।

রানার মাথা থেকে একফুট উপরে বরফের দেয়ালে লাগল একপশলা গুলি। আবারও দরজার কবাটের আড়ালে চলে গেল ও। পরক্ষণে কবাটের পাশ থেকে উঁকি দিল। অবশ্য, এবার শিসের মত একটা আওয়াজও পেল।

এক সেকেণ্ড পর কানের কাছে ধাতব খট আওয়াজ শুনে চমকে গেল। চার ইঞ্চি দৈর্ঘ্যের একটা তীর এসে বিঁধেছে ওর ডান চোখের দুই ইঞ্চি দূরের বরফ-দেয়ালে। ডাইনিংরুমে জ্যাকুস ফিউভিলকে দেখতে পেল রানা। লোকটার হাতে উদ্যত ক্ৰসবো। তীর মারা হতেই তার দিকে খাটো ব্যারেলের সাবমেশিনগান বাড়িয়ে দিল বিজ্ঞানী ম্যাথিউ ফ্যেনুয়্যা। এক সেকেণ্ড পর গোলাগুলিতে যোগ দিল ফিউভিল।

চৌকাঠের আড়াল থেকে আবারও উঁকি দিল রানা, তিশাকে দেখতে পেল। ডাইনিংরুম এবং মেইন এন্ট্রান্সের মাঝে ক্যাটওয়াকের উপর পড়ে আছে মেয়েটা, নিথর।

তারপর হঠাৎ করেই নড়ে উঠল ওর হাত।

জ্ঞান ফিরছে বলেই বোধহয় ওটা স্বাভাবিক রিফ্লেক্স।

হাত নাড়া দেখেছে রানা, হেলমেট মাইকে বলল, রানা বলছি, তিশা বেঁচে আছে। কিন্তু একদম খোলা জায়গায়। আমাকে কাভার দিতে হবে। আমি ওকে নিয়ে আসব। তোমরা কনফার্ম করো।

একের পর এক বক্তব্য এল:

কেলগ, চেক।

নাজমুল আছি। 

জনি ওয়াকার, চেক।

দবির আছি, বলল সার্জেন্ট। আপনি যেতে পারেন, স্যর। কাভার দিচ্ছি। …এবার, স্যর!

ঠিক আছে! আড়াল থেকে ছিটকে বেরুল রানা, চলে এসেছে। ক্যাটওয়াকে।

বাঙালি সৈনিক ও আমেরিকান মেরিনরা একইসঙ্গে বেরিয়ে এসেছে কাভার পজিশন থেকে, গুলি শুরু করেছে ডাইনিংরুমের দরজা লক্ষ্য করে। কানে তালা লেগে গেল রানার! ডাইনিংরুমের দেয়াল থেকে চারপাশে ছিটকে পড়ছে বরফের কুঁচি। শ খানেক বুলেট কয়েক সেকেণ্ডে দেয়াল খুবলে তৈরি করল অসংখ্য গর্ত। সবার গুলিবর্ষণে পিছিয়ে গেছে জ্যাকুস ফিউভিল, ডাইভ দিয়ে কাভার নিয়েছে।

এদিকে বাইরে ক্যাটওয়াকে তিশার পাশে হাঁটু গেড়ে বসেছে রানা। চট করে দেখে নিল মেয়েটির মাথা। কেভলার হেলমেটের ফোরহেড গার্ড থেকে রক্তের সরু রেখা নামছে কপালবেয়ে। এক ইঞ্চি পুরু কেভলার বর্ম ভেদ করে কপালে এসে থেমেছে রুপালি তীর, চিকচিক করছে উজ্জ্বল আলোয়। ত্বক ফুটো করে করোটির এক মিলিমিটার আগে থেমে গেছে তীর।

ঠিক আছে, এবার উঠে পড়ো, মেয়ে! তাড়া দিল রানা, নিশ্চিত নয় তিশা শুনতে পেয়েছে। চারপাশ থেকে কাভার ফায়ার দিচ্ছে ওর দলের সবাই। হ্যাঁচকা টানে তিশাকে কোলে তুলে নিল রানা, পরক্ষণে উঠে দাঁড়িয়েই ছুটতে শুরু করল মেইন এন্ট্রান্স টানেলের প্যাসেজওয়ে লক্ষ্য করে।

হঠাৎ কোথা থেকে উদয় হলো এক ফ্রেঞ্চ কমাণ্ডো। লোকটা আছে ডাইনিংরুমের বরফের দেয়ালের ওপাশে। এইমাত্র বুলেটে তৈরি গর্তের ভিতর দিয়ে রাইফেল বের করছে-সে।

মুহূর্ত দেরি না করে তিশাকে কোল থেকে বাম কাঁধে নিল। রানা, পরক্ষণে হোলস্টার থেকে ছোঁ দিয়ে তুলে নিল পিস্তল, পরপর দুবার গুলি করল। দুর্বল আওয়াজ তোলে ফ্যামাস রাইফেল, এমপি-৫ করে চাকার টিউব ফুটো হওয়ার আওয়াজ, কিন্তু মেরিনদের আই.এম.আই ডোের্ড ঈগল অটোমেটিক পিস্তল সত্যিকারের বজ্রপাত। রানার দুটো গুলিই ঠিক জায়গায় লেগেছে–বিস্ফোরিত হলো ফ্রেঞ্চ কমাণ্ডোর মাথা, ওখানে একটা লাল বাষ্পের বল তৈরি হলো। রানা দেখেছে দুবার লোকটার মাথা ঝাঁকি খেয়েছে, তারপর ধপ্ করে পড়ে গেছে সে।

জুলদি ভাগুন, স্যর! ইয়ারপিসে হোসেন-আরাফাত দবিরের কণ্ঠ শুনল রানা।

প্রায় পৌঁছে গেছি! গুলির আওয়াজের উপর দিয়ে বলল ও ইণ্টারকমে আরেকটা কণ্ঠ শুনল। খুব ঠাণ্ডা গলা এর। ওদিকে কোনও গোলাগুলি নেই।

মেরিন ফোর্স, ভাইপার বলছি। আমি এখনও বাইরের পোস্টে। আরও ছয়জন ফ্রেঞ্চ কমাণ্ডো বেরুচ্ছে দ্বিতীয় হোভারক্রাফট থেকে। আবারও বলছি, পরের হোভারক্রাফট থেকে নেমেছে ছয়জন কমাণ্ডো। স্টেশনের এন্ট্রান্স টানেলের দিকে যাচ্ছে।

এক সেকেণ্ড পর ইন্টারকমে গুলির আওয়াজ শুনল রানা। ওটা ভাইপারের স্নাইপার রাইফেল।

ভাইপার বলছি, মেরিন ফোর্স। ওরা এখন পাঁচজন। মেইন এন্ট্রান্সের দিকে ছুটছে।

কাঁধের উপর দিয়ে মেইন এন্ট্রান্স টানেলের দিকে চাইল রানা। তিশাকে নিয়ে ওদিকেই ছুটবে ভেবেছিল। এই মুহূর্তে ওখানে আছে হোসেন আরাফাত দবির ও টনি কেলগ, ডাইনিংরুমের দিকে গুলি পাঠাচ্ছে। ওখানে ওই একই কাজ করছে সার্জেন্ট জর্জ মারফি।

এর এক সেকেণ্ড পর বিস্ফোরিত হলো যুবকের বুক। শক্তিশালী কোনও অস্ত্র থেকে গুলি করে ছিন্নভিন্ন করে দেয়া হয়েছে ওর পিঠ-বুক। প্রচণ্ড ঝাঁকি খেয়েছে মারফি, পাজরের খাঁচা থেকে ছিটকে বেরিয়েছে রক্ত। কোমর থেকে শুরু করে ঘাড় পর্যন্ত ভয়ঙ্কর আঘাতে এক ঝটকায় পিছিয়ে গেছে, তরুণ সৈনিকের মেরুদণ্ড ভাঙবার মড়াৎ আওয়াজটা স্পষ্ট শুনল রানা।

এক সেকেণ্ডের দশ ভাগের এক ভাগ সময়ে এন্ট্রান্স প্যাসেজওয়ে থেকে ছিটকে বেরুল হোসেন আরাফাত দবির ও টনি কেলগ। ঘুরেই পিছন-টানেলের শত্রুদল লক্ষ্য করে গুলি পাঠাল ওরা। এক মুহূর্ত ওখানে থামল না, কয়েক কদম সরে চলে গেল সবচেয়ে কাছের রাং-ল্যাডারের সামনে, দেরি না করে নামতে শুরু করেছে বি-ডেকের দিকে।…

রানা এবং ওর দলের সবার কপাল মন্দ, এইমাত্র ফিরেছে হোসেন আরাফাত দবির ও ওর দলের সবাই। হঠাৎ করেই গুলি শুরু হতে ভাল কোনও অবস্থান বেছে নিতে পারেনি কেউ। ওরা মেইন এন্ট্রান্সের কাছে দুই দল ফ্রেঞ্চের মাঝে আটকা পড়েছে। পিছনে ডাইনিংরুমে একদল কমাণ্ডো, ওদিকে মেইন এন্ট্রান্স দিয়ে ঢুকে পড়েছে তাদের দ্বিতীয় দল।…

পরিস্থিতি বুঝতে সময় লাগেনি রানার, মাইকে বলল, দবির! নীচে নামুন! সবাইকে নিয়ে বি-ডেকে!

এখন তা-ই করছি, স্যর!

এর চেয়ে ঢের খারাপ পজিশনে রানা ও তিশা। ওরা আছে ক্যাটওয়াকে। একপাশে ডাইনিং হল, আরেক পাশে এন্ট্রান্স প্যাসেজওয়ে। কোথাও যাওয়ার নেই। কোনও দরজা নেই আড়াল নেবে। লুকাতে পারবে না কোনও প্যাসেজওয়েতে। মাত্র তিন ফুট চওড়া ধাতব ক্যাটওয়াক একদিকে জমাট বরফের দেয়াল, অন্য দিক শুধু শূন্য, সত্তর ফুট নীচে নীল পানির পুল।

যে-কোনও সময়ে মেইন এন্ট্রান্স প্যাসেজওয়ে দিয়ে ভিতরে ঢুকবে দ্বিতীয় ফ্রেঞ্চ কমাণ্ডো দল, এবং একদম সামনে পাবে রানা ও তিশাকে।

মাথার পাশে বরফ-দেয়াল বিস্ফোরিত হতেই চরকির মত ঘুরল রানা। ডাইনিংরুমে উঠে দাঁড়িয়েছে জ্যাকুস ফিউভিল, একের পর এক গুলি শুরু করেছে অ্যাসল্ট রাইফেল থেকে। ডেযার্ট ঈগল পিস্তল দিয়ে ডাইনিংরুমে ফিউভিলের দিকে পর পর ছয়বার গুলি ছুঁড়ল রানা। চট করে দেখে নিল মেইন এন্ট্রান্স। আর বড়জোর দশটা সেকেণ্ড পাবে।

মনে মনে বলল রানা, কপাল মন্দ। ওর কাঁধের উপর এলিয়ে পড়ে আছে তিশা।

ক্যাটওয়াকের রেলিঙে ঝুঁকল রানা। অন্তত সত্তর ফুট নীচে স্টেশনের পুল। ওদের বাঁচবারই কথা। কিন্তু কিলার ওয়েইল…

অন্য কোনও উপায় নেই?

পায়ের নীচের ক্যাটওয়াক দেখল রানা, তারপর চাইল পিছনের বরফ-দেয়ালের দিকে।

মেজর, ওখান থেকে সরে যান, নইলে মরবেন? বলে উঠেছে সার্জেন্ট জনি ওয়াকার। স্টেশনের দক্ষিণ ক্যাটওয়াকে বেরিয়ে এসেছে সে। ওখান থেকে পরিষ্কার দেখছে উত্তর এন্ট্রান্স টানেল। যা দেখছে, তাতে খুশি হওয়ার কিছু নেই।

সরে যেতেই চেষ্টা করছি, বলল রানা।

ডাইনিংরুমে ফিউভিলের দিকে আরও দুটো গুলি পাঠাল ও, তারপর হোলস্টারে রেখে দিল পিস্তল। কাঁধে ঝুলন্ত হোলস্টার থেকে বের করে নিল ম্যাগহুক। আর্মালাইট এমএইচ-১২ দেখতে পুরনো আমলের টমি গানের মত। দুটো পিস্তল গ্রিপ; একটা সাধারণ গ্রিপ, সঙ্গে ট্রিগার, আরেক দিকে মাযলের নীচে সাপোর্ট গ্রিপ। আসলে ম্যাগহুক একটা কমপ্যাক্ট পিস্তল, দু হাতলওয়ালা লঞ্চার, নল দিয়ে প্রচণ্ড গতিতে ছুঁড়ে দেয় এ্যাপলিং হুক।

কাঁধের উপর গুঙিয়ে উঠেছে তিশা। বরফ-দেয়ালের দিকে লঞ্চার তাক করল রানা, টিপে দিল ট্রিগার। জোরালো ধাতব ঘটাং আওয়াজ তুলেমাযল থেকে ছিটকে বেরুল এ্যাপলিং হুক, তীব্র গতি তুলে ঢুকেছে জমাট বরফের দেয়ালে, চারপাশ বিস্ফোরিত করে পৌঁছে গেছে ডাইনিংরুমে। ওদিকে পৌঁছে যেতেই খুলে গেছে ওটার আঁকশি।

মেজর! সরে যান!

ভাল করেই জ্ঞান ফিরেছে তিশার। প্রায় জোর করেই কাঁধ থেকে নেমে পড়ল।

আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরো! নির্দেশ দিল রানা।

কেন? এক পলকে লালচে হয়ে গেল তিশার গাল।

জলদি! সময় নেই! মেয়েটির কাঁধে দুই হাত রাখল রানা, কাছে টেনে নিল। দুজনের ঠোঁট খুব কাছাকাছি। কেউ দেখলে ভাববে: দুই প্রেমিক-প্রেমিকা পরস্পরকে জড়িয়ে ধরেছে, এবার চুমু দেবে একে অপরকে। বামহাতে আরও শক্ত করে তিশাকে জাপ্টে ধরল রানা, ঘুরেই নিতম্ব রাখল রেলিঙে। একবার দেখে নিল মেইন এন্ট্রান্স টানেল, ওখানে প্যাসেজওয়ের বরফ-দেয়ালে কালো ছায়া। এক সেকেণ্ড পর ওখান থেকে এল গুলির আওয়াজ।

শক্ত করে ধরো, তিশার কানে বলল রানা। 

মেয়েটির পিছনে দুই হাতে লঞ্চার শক্ত করে ধরেছে ও। গলা জড়িয়ে ধরেছে তিশা। হঠাৎ করেই পিছনে ভর দিল রানা, তারপর তিশাকে নিয়ে রেলিং টপকে নীচের দিকে পড়তে লাগল।

মুহূর্ত পর একপশলা গুলি রেলিঙে লেগে নানা দিকে ছুটে গেল। পড়তে শুরু করে কয়েক ফুট উপরে সাদা-কমলা আগুন ছিটকাতে দেখল রানা। কানের কাছে বাতাসের শোঁ-শোঁ আওয়াজ।

ওদের উপরে সরসর করে বেরুচ্ছে ম্যাগহুকের কেবল। বিডেক ছাড়িয়ে নেমে চলেছে ওরা, একপলক দবির ও কেলগকে দেখল, অবাক বিস্ময় নিয়ে ওদেরকে পড়তে দেখছে তারা।

তারপর লঞ্চারের সামনের গ্রিপে কালো বাটনে চাপ দিল রানা। মাযলের ভিতর দ্রুত খুলে যাওয়া কেবলকে আঁকড়ে ধরল ক্ল্যাম্পিং মেকানিজম।

প্রচণ্ড ঝটকা খেয়ে থামল রানা ও তিশা। একটু উপরে বিডেক। ক্যাটওয়াকের দিকে ওদেরকে দুলিয়ে নিয়ে চলেছে কেবল। কয়েক ফুট নীচে সি-ডেকের ক্যাটওয়াক, দু সেকেণ্ড অপেক্ষা করল রানা, তারপর তিশাকে নিয়ে নেমে পড়ল ধাতব গ্যাংওয়েতে।

সি-ডেকের ক্যাটওয়াকে পা রাখতেই লঞ্চারের ট্রিগারে দুবার চাপ দিল রানা। এ-ডেকে স্ন্যাপ আওয়াজ তুলে সঙ্কুচিত হলো গ্যাপলিং হুকের আঁকশি, ডাইনিংরুমের দেয়ালে নিজের তৈরি গর্তের ভিতর দিয়ে বেরিয়ে এল। আইস স্টেশনের বিশাল শাফটে পড়তে শুরু করেছে। ওটাকে নিজের পেটে টেনে নিচ্ছে লঞ্চার। পাঁচ সেকেণ্ড পর আবারও ছুঁড়বার অবস্থায় পৌঁছে গেল যন্ত্রটা।

তিশাকে নিয়ে সবচেয়ে কাছের ডোরওয়ের দিকে রওনা হলো রানা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *