১.০৭ ওয়াশিংটন ডি.সি.-র আকাশে

ওয়াশিংটন ডি.সি.-র আকাশে ঘন কালো মেঘ জমেছে, থমথম করছে পরিবেশ। এঁকেবেঁকে ঝলসে উঠছে নীলচে বিদ্যুৎ। যেকোনও সময়ে ঝমঝম করে নামবে বৃষ্টি। অথচ, মাত্র ঘণ্টা দুয়েক আগে নীল আকাশে ঝলমল করছিল সোনালী সূর্য।

বিলাসবহুল লাল কার্পেট মোড়া ক্যাপিটল বিল্ডিঙের এক প্রান্তে এইমাত্র মিটিং হল-এ বিরতি নিয়েছেন ডেলিগেটরা। সবার ফোল্ডার বন্ধ হয়ে গেছে। চেয়ার পিছনে ঠেলে উঠে। দাঁড়িয়েছেন সবাই, কোটের পকেটে চলে গেছে রিডিং গ্লাস। বিরতি ঘোষণা হতেই যার যার বসের পাশে চলে গেছে এইডরা, হাতে সেলুলার ফোন, ফোল্ডার ও ফ্যাক্সের বার্তা।

কী বুঝলে, এরিক? নিজ এইডকে বললেন স্থায়ী ইউএস রিপ্ৰেযেন্টেটিভ, জ্যাক মার্টিন। এইমাত্র নেগোশিয়েটিং রুম ত্যাগ করেছেন গোটা ডেলিগেশনের বারোজন ফ্রেঞ্চ। আজ এই নিয়ে চারবার বিরতি নিল ওরা।

ফ্রেঞ্চ মিশনের নেতা মোটা এক লোক, নাম জঁ পিয়েরে কুই। তার চাহনি দেখলে মনে হতে পারে, অন্যদেরকে অনেক নিচু শ্রেণীর মানুষ মনে করেন তিনি। এইমাত্র দলের সবাইকে নিয়ে বেরিয়ে গেছেন। আপনমনে আরেকবার মাথা নাড়লেন জ্যাক মার্টিন।

তিনি সারাটা জীবন ধরেই কূটনীতিক, বয়স চলছে ছাপ্পান্ন, বছর, বেশ বেঁটে মানুষ; কখনও স্বীকার করবেন না, কিন্তু গত দুবছরে একটু মোটাও হয়ে গেছেন। পূর্ণিমার চাঁদের মত গোল মুখ, ঘোড়ার ক্ষুরের আকৃতির ধূসর চুলগুলো খুলি কামড়ে আরও পিছাতে শুরু করেছে। হাড়ের ফ্রেমের চশমা ব্যবহার করেন, পুরু কাঁচের কারণে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বড় দেখায় নীল চোখদুটো।

উঠে দাঁড়ালেন তিনি, আড়মোড়া ভাঙলেন। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে চোখ রাখলেন বিশাল হলরুমে। ঘরের মাঝে প্রকাণ্ড গোলাকার টেবিল ঘিরে নির্দিষ্ট জায়গা ছেড়ে যোলোটি আরামদায়ক, নরম চামড়া মোড়া চেয়ার।

এই সভার মূল এজেণ্ডা: নতুন করে নিজেদের ভিতর সব। ধরনের বিরোধের নিষ্পত্তি করে নেবে মিত্রশক্তির দেশগুলো।

টিভির খবরে আন্তর্জাতিক মিত্রপক্ষীয় নেতারা হাতে-হাত মিলিয়ে যে হাসিখুশি ভাব দেখান, বেশির ভাগ সময়ই তা নকল হয়; প্রায়ই দেখা যায় বানোয়াট হাসি দিয়ে নিজেদের দুশ্চিন্তা লুকিয়ে রাখছেন। হয়তো দেখা গেল হোয়াইট হাউস থেকে বেরিয়ে এলেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ও অন্য দেশের প্রধানমন্ত্রী দুই দেশের পতাকার পাশে ক্যামেরার সামনে করমর্দন করলেন, কিন্তু বাস্তব হচ্ছে: কোনও চুক্তি সম্পাদন, প্রতিজ্ঞা ভাঙা, পরস্পরের উপর এসপিয়োনাজ, কূটনীতিকদের কামড়া-কামড়ি–এসবই গোপনে চলে মিটিংরুমে, ক্যামেরার আড়ালে। আজ সে-কাজেই ব্যস্ত ইউএস রিপ্রেযেক্টেটিভ জ্যাক মার্টিন। কূটনীতিকদের হাসি ও করমর্দন আসলে জটিল এক প্রক্রিয়ার কেকের বড়জোর আইসিং। কূটনীতিকরা একে অপরের কাছ থেকে কী সুবিধা আদায় করবেন, সেটাই একমাত্র উদ্দেশ্য।

আন্তর্জাতিক মিত্রপক্ষীয় দেশ মানেই সত্যিকারের মিত্র দেশ–নয়। এটা আসলে একে অপরকে ল্যাং মেরে পিছনে ফেলে এগিয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতা। বন্ধুত্ব যদি সুবিধা এনে দেয়, তো খুবই ভাল। সুবিধা যদি না পাওয়া যায়, সেক্ষেত্রে সাধারণ সম্পর্ক বজায় রাখাই যথেষ্ট। আন্তর্জাতিক বন্ধুত্ব মানেই বৈদেশিক সাহায্য, অন্য দেশের সামরিক ক্ষমতাকে মেনে নেয়া এবং ব্যবসায়িক সহায়তা পাওয়া। এতে প্রয়োজন পড়ে হাজার হাজার কোটি ডলার। এ বিষয়কে হালকা ভাবে উড়িয়ে দেয়া যায় না।

সেকারণেই ওয়াশিংটন ডি.সি.-র গ্রীষ্মের এই মেঘলা দিনে ক্যাপিটল বিল্ডিঙে হাজির হয়েছেন জ্যাক মার্টিন। তিনি একজন নেগোশিয়েটার। তার চেয়েও বড় কথা: তিনি একজন দক্ষ কূটনীতিক। আজ তাঁর সমস্ত কূটনৈতিক দক্ষতা কাজে লাগছে।

মিত্রপক্ষীয় দেশ আমেরিকা ও ফ্রান্সের ভিতর আজকের বিশেষ এই সভা শুধু নিজ বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য নয়, তার চেয়েও জটিল কিছু বিষয় স্থির করবার জন্য।

একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকের পর মিত্রপক্ষীয় দেশগুলো আগে কখনও এমন গুরুত্বপূর্ণ সভায় বসেনি।

আজ কূটনীতিক বা নেগোশিয়েটাররা বসেছেন দ্য নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইযেশন বা ন্যাটোর জন্য নিজেদের দরদাম কষতে।

এরিক, তুমি কি জাননা গত চল্লিশ বছর ধরে ফ্রান্সের বৈদেশিক নীতি হচ্ছে পশ্চিমা বিশ্বে ইউনাইটেড স্টেটসের ক্ষমতা হ্রাস করা? জানতে চাইলেন জ্যাক মার্টিন। বুঝে গেছেন ফ্রেঞ্চ ডেলিগেশন ফিরতে দেরি করবে।

তাঁর এইড এরিক হোমসের বয়স পঁচিশ বছর। ছেলেটি হারভার্ড থেকে ব্যাচেলার ডিগ্রি নিয়েছে আইনের উপর। কোনও জবাব দেয়ার আগে দ্বিধা করল সে। বুঝতে পারছে না কেন তাজা বোমার মত কথা বলছেন মার্টিন। সুইভেলিং চেয়ারে ঘুরে এরিকের দিকে চাইলেন কূটনীতিক। পুরু কাচের ওপাশ থেকে তরুণকে দেখছেন।

না, স্যর, আমি এ বিষয়ে তেমন কিছুই জানি না, বলল। . এরিক।

চিন্তিত ভঙ্গিতে মাথা দোলালেন মার্টিন। ওরা আমাদেরকে বুনো ষাঁড় মনে করে। আমরা যেন কোনও মানুষই নই, বিয়ার গিলতে থাকা লাল ঘাড়ওয়ালা বেবুন। তাদের মনের দুঃখ: দুর্ঘটনাবশত আমাদের হাতে এসে পড়েছে পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র। আর সে কারণেই আমরা হয়ে উঠেছি। পৃথিবীর হর্তাকর্তা। এ কারণে বড় কষ্ট ওদের মনে। ওরা তো এখন ন্যাটোর পূর্ণ সদস্য পদেও নেই। ওদের ধারণা, ইউএসএ শুধু অস্ত্রের জোরে ইউরোপের ঘাড়ে চেপে বসেছে। এটা ইউরোপিয়ান দেশগুলোর জন্য ভয়ঙ্কর অপমানজনক।

হাসি চাপলেন মার্টিন। তাঁর মনে পড়েছে, ঊনিশ শ ছিষট্টি সালে ন্যাটোর সম্মিলিত সামরিক কমাণ্ড থেকে পদত্যাগ করে ফ্রান্স, তার মূল কারণ ছিল, তারা চায়নি ন্যাটোর অধীনে থাকুক তাদের নিউক্লিয়ার ওয়েপন্স। তারা ধরেই নেয়, যে-কোনও সময়ে ওসব বোমা চলে, যেতে পারে আমেরিকার হাতে। সে সময়ের ফ্রেঞ্চ প্রেসিডেন্ট চার্লস দ্য গল পরিষ্কারভাবে বলে দেন, ন্যাটো আসলে আমেরিকানদের একটা সংগঠন। ফ্রান্স এখন ন্যাটোর নর্থ আটলান্টিক কাউন্সিলে সাধারণ পদ নিয়েছে, এবং সেটা করেছে সবার উপর চোখ রাখতেই।

এরিক বলল, স্যর, অনেকে ফ্রেঞ্চদের সঙ্গে একমত। তাঁরা অ্যাকাডেমিক ও ইকোনমিস্ট। তাঁরা বলেন ন্যাটো আসলেই আমেরিকানদের সংগঠন। আমরা ইউরোপের উপর নিজেদের অস্ত্রের ক্ষমতা দেখাচ্ছি।

হাসলেন জ্যাক মার্টিন। তিনি জানেন, ভাল ছেলে এরিক, কলেজে লেখাপড়াও করেছে, কোনও মৌলবাদী নয়, কিন্তু কফির আসরে বসে ফিলোসফিক্যাল তর্ক করতে বসা ছেলেমেয়েদের মতই বোকা। এই ধরনের তরুণ বা তরুণীরা আরও ভাল কোনও দুনিয়া আশা করে। সেজন্য অনেক কথাই বলে; কিন্তু বাস্তব কথা হচ্ছে: দুনিয়া সম্পর্কে এদের কোনও ধারণাই নেই। এরিকের কথায় রাগ করেননি মার্টিন। বরং এরিকের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ভাল লাগছে তার। কিন্তু মিটিং থেকে কী বুঝলে, এরিক? আবারও জানতে চাইলেন তিনি।

কয়েক মুহূর্ত চুপ রইল এরিক। তারপর বলল, আমেরিকা ন্যাটোর মাধ্যমে ইউরোপিয়ান দেশগুলোকে অর্থনৈতিক এবং টেকননালজির দিক থেকে পঙ্গু করে রেখেছে। বিশেষ করে নিরাপত্তার দিক থেকে। এমন কী উন্নত দেশ ইংল্যাণ্ড বা ফ্রান্সও জানে, তাদের যদি সেরা অস্ত্রের সিস্টেম পেতে হয়, তা হলে হাত পাততে হবে আমাদের কাছে। এ ধরনের অবস্থায় অদের সামনে মাত্র দুটো পথ খোলা হয় হাতে হ্যাট নিয়ে আমাদের দরজায় টোকা দেবে, নইলে যোগ দিতে হবে ন্যাটোতে! যতটা জানি, আমেরিকা কখনও ন্যাটোর বাইরের কোনও দেশকে প্যাট্রিয়ট মিসাইল সরবরাহ করেনি। জী, স্যর, আমি মনে করি ন্যাটোর মাধ্যমে ইউরোপের উপর ছড়ি ঘোরাচ্ছি আমরা।

মন্দ বলোনি, এরিক। কিন্তু একটা কথা মন দিয়ে শুনে নাও, গোটা পরিস্থিতি আরও অনেক জটিল, বললেন মার্টিন। হোয়াইট হাউস প্রথম থেকেই আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তা দেখছে। সেখান থেকেই নির্দেশ আসছে, দুনিয়ার উপর ছড়ি ঘোরাতে হবে। আমরা ইউরোপের উপর নিজেদের কর্তৃত্ব হারাতে চাই না, এরিক। বিশেষ করে অর্থনৈতিক ও প্রকৌশলের দিক থেকে। এদিকে ফ্রান্স চাইছে আমরা যেন আমাদের কর্তৃত্ব হারাই। এবং সে কারণেই গত দশ বছরেরও বেশি হলো ফ্রেঞ্চ সরকার চাইছে ইউরোপে যেন দাপট কমে আসে আমেরিকার।

কোনও উদাহরণ দেবেন, স্যর? বলল এরিক।

তুমি কি জানো, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠার পিছনে সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল ফ্রান্স?

তাই? জানতাম না, স্যর। আমি তো জানতাম…

তুমি কি জানো, ফ্রান্স প্রথম ইউরোপিয়ান দেশ যেটা প্রথম থেকেই ইউরোপিয়ান ডিফেন্স চার্টার চেয়েছে?

চুপ হয়ে গেলেন জ্যাক মার্টিন।

জী, না, স্যর, জানতাম না।

এটা কি জানো, ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সিকে সাবসিডি দিয়ে অনেক কম দামে কক্ষপথে কমার্শিয়াল স্যাটালাইট ছাড়তে সাহায্য করছে ফ্রান্স? তারা নাসার চেয়ে অনেক কম দামে এসব দিচ্ছে।

জী-না, জানতাম না।

বাছা, গত দশ বছর ধরে গোটা ইউরোপকে একত্রিত করতে চাইছে ফ্রান্স। তারা তাদের সাধারণ সব পণ্য গোটা পৃথিবীর মানুষের কাছে বিক্রি করতে চায়। ফ্রান্স এর নাম দিয়েছে রিজিওনাল প্রাইড। আমরা আমেরিকান কূটনীতিকরা বুঝতে পারছি: এসব করে ইউরোপিয়ান দেশগুলো বোঝাতে চাইছে, তারা এখন আর আমেরিকাকে তাদের পাশে চায় না।

ইউরোপের কি আসলেই আমেরিকাকে দরকার? চট করে জানতে চাইল এরিক হোস্। ভুরু কুঁচকে গেছে ওর।

দুষ্ট হাসি ফুটে উঠল মার্টিনের ঠোঁটে। যতদিন ইউরোপ আমাদের ওয়েপন্স টেকনোলজির সমান হতে না পারে–হ্যাঁ, আমাদেরকে ওদের খুবই দরকার। আমাদের ডিফেন্স টেকনোলজি অনেক আধুনিক বলে বড় কষ্ট ফ্রেঞ্চদের মনে। ওদের আজও এমন সাধ্য হয়নি যে আমাদের ধারেকাছে আসতে পারবে। এই কারণে নিজেদের ছোট মনে হয় ওদের।

আমরা যত দিন এগিয়ে থাকব, ওরা জানবে ওদের সামনে কোনও পথ নেই, বাধ্য হয়ে পিছু পিছু চলতে হবে। কিন্তু… ডানহাতের তর্জনী তুললেন মার্টিন। একবার যদি নতুন কিছু পেয়ে যায় ওরা, সেই জিনিস যদি আমাদের অস্ত্রের চেয়ে আধুনিক হয়, সেক্ষেত্রে পরিস্থিতি হঠাৎ করেই পাল্টে যেতে পারে।

মনে রাখতে হবে উনিশ শ ছেষট্টি নয় এটা। রাজনৈতিক পরিবেশ অনেক বদলে গেছে। এখন যদি ন্যাটো থেকে বেরিয়ে যায় ফ্রান্স, ধরে নিতে পারো, তার সঙ্গে ওই সংগঠন থেকে বেরিয়ে যাবে অর্ধেকের বেশি ইউরোপিয়ান দেশ। নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ যে…

ঠিক তখনই প্রকাণ্ড ঘরের দরজা খুলে গেল, পিছনে ফ্রেঞ্চ ডেলিগেশন নিয়ে টেবিলের দিকে এগিয়ে এলেন দলের নেতা জঁ পিয়েরে কুই।

সবাই যে যার সিটে বসে পড়তেই এরিকের কানে বললেন মার্টিন, আমার দুশ্চিন্তা হচ্ছে। এমনও হতে পারে, খুব আধুনিক কোনও আবিষ্কারের খুব কাছে পৌঁছে গেছে ফ্রেঞ্চরা। আজকে ওদের আচরণ খেয়াল করেছ? এরই ভিতর চারবার মিটিঙে বিরতি নিয়েছে। পুরো চারবার! তার মানে বোঝো?

তেমন কিছুই বুঝিনি, স্যর।

ওরা মিটিঙে বসে খামোকা সময় নষ্ট করছে। এমনটা করা হয় শুধু জরুরি তথ্য পাওয়ার অপেক্ষায়, কোনও খবরের আশায় থাকলে। বারবার বিরতি নিচ্ছে, যাতে ফ্রেঞ্চ ইন্টেলিজেন্সের লোক তাদেরকে বর্তমান অবস্থা জানাতে পারে। আর নেগোশিয়েটারদের চেহারা দেখে মনে হচ্ছে, জিনিসটা যাই হোক, ওটা পাল্টে দিতে পারে ন্যাটোর বর্তমান অবস্থান। …হয়তো ধ্বংসই হয়ে যাবে সংগঠনটা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *