১.০৬ চওড়া বরফের টানেলের ভিতর

চওড়া বরফের টানেলের ভিতর হেঁটে চলেছে নিনা ভিসার ও রানা। ওদের পিছনে কর্পোরাল কেলগ ও সার্জেন্ট ওয়াকার।

ওরা চারজন রয়েছে বি-ডেকে, প্রধান লিভিং এরিয়ায়। বড় একটা মোড় ঘুরতেই বরফের দেয়ালের ভিতর দুপাশে শুরু হয়েছে দরজা, ওপাশে রয়েছে বেডরুম, কমনরুম, নানা ল্যাবোরেটরি ও স্টাডিরুম। একটা দরজা মনোযোগ কেড়ে নিল রানার। ওটার উপর বায়োহ্যায়ার্ড সাইন আঁকা। ত্রিকোণ প্লেটে লেখা:

বায়োটক্সিন ল্যাবোরেটরি।

ম্যাকমার্ডো পৌঁছবার পর জানতে পারলাম, বাঙালি এক বিজ্ঞানী অন্য আরেক বিজ্ঞানীকে খুন করেছেন, বলল রানা। তাঁর অভিযোগ ছিল, চুরি করা হচ্ছে তাঁর রিসার্চের তথ্য।

রানার দিকে চাইল নিনা ভিসার। পাগলামি ছাড়া আর কী! তাঁর রিসার্চের তথ্য অন্য কেউ চুরি করবে কেন!

টানেলের শেষে পৌঁছে গেছে সবাই, সামনে বরফের ভিতর বড় একটা দরজা। তার উপর পেরেক ঠুকে কাঠের তক্তা আড়াআড়ি ভাবে আটকে দেয়া হয়েছে।

রাশেদ হাবিব, বিড়বিড় করে বলল রানা, পরক্ষণে নিনার দিকে চাইল। উনিই না প্রথম স্পেসশিপ আবিষ্কার করেন?

ভুল শুনেছেন। ওটা প্রথম দেখতে পেয়েছিলেন জন প্রাইস। রাশেদ হাবিব খুন করেছেন চার্লস মুনকে। আসলে রিসার্চ পেপার নিয়ে দুজনের এমন কোনও বিবাদ হয়নি যে একেবারে খুনই করে ফেলতে হবে। নিশ্চয়ই এর ভিতর কোনও জটিলতা ছিল।

রানা এবং ওর দল ম্যাকমার্ডো পৌঁছে উইলকক্স আইস স্টেশনের উপর সংক্ষিপ্ত ব্রিফিং পেয়েছে। তাতে মনে হয়েছে খুবই সাধারণ ফ্যাসিলিটি ওটা। ওখানে কাজ করেন কয়েক পেশার লোক। যেমন: সাগরের প্রাণী নিয়ে গবেষণা করছেন মেরিন বায়োলজিস্টরা; বরফের ভিতর আটকা পড়া ফসিল পরীক্ষা করছেন প্যালিয়েনটোলজিস্টরা; খনিজ সম্পদ খুঁজছেন জিয়োলজিস্টরা; বরফের ভিতর গভীর গর্ত খুঁড়ে হাজার বছরের কার্বন মনোক্সাইড ও অন্যান্য গ্যাস খুঁজছেন রাশেদ হাবিবের মত জিয়োফিযিসিস্টরা।

কদিন আগে উইলকক্স আইস স্টেশনে অত্যন্ত অস্বাভাবিক একটা ঘটনা ঘটেছে। রাফায়লা ম্যাকানটায়ার ডিসট্রেস সিগনাল পাঠানোর দু এক দিন আগে আরেকটি হাই-প্রায়োরিটি সিগনাল পাঠানো হয়েছে এই স্টেশন থেকেই। তাতে বলা হয়েছে, যত দ্রুত সম্ভব যেন এক স্কোয়াড় মিলিটারি পুলিশ পাঠানো হয়।

ওই সিগনালের বক্তব্য অস্পষ্ট ছিল, কিন্তু আঁচ করা যায়, এক ঝঙালি বিজ্ঞানী খুন করে ফেলেছেন তাঁর এক কলিগকে।

তক্তা দিয়ে আটকানো দরজা দেখছে রানা, একবার চারপাশের টানেল দেখে নিল। ভাবছে, আপাতত জানবার উপায় নেই আসলে এখানে কী ঘটেছে। মেজর জেনারেল (অব.) রাহাত খানের কথা মনে পড়ল। ওকে আবছা কিছু নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। ওর বুঝতে দেরি হয়নি, উনি আসলে কী চান।

মেরিন দলের সঙ্গে উইলকক্স আইস স্টেশনে পৌঁছবে, বাঙালি বিজ্ঞানী ও নুমার রিসার্চারদের পৌঁছে দেবে ম্যাকমার্ডো স্টেশনে। কিন্তু তার আগে, সুযোগ হলে দেখবে ওই স্টেশনে এটা সত্যিই স্পেসশিপ কি না। যদি পারো, ওটা সম্বন্ধে তথ্য জোগাড় করবে।

এদিকে ম্যাকমার্ডোর ব্রিফিং রুমে আমেরিকার আণ্ডারসেক্রেটারি অভ ডিফেন্স স্পিকারফোনে বলেছেন: সন্দেহ নেই ওই ডিসট্রেস সিগনাল অন্য দেশের কর্তৃপক্ষও শুনতে পেয়েছে। মিস্টার রানা, সত্যি যদি ওখানে এক্সট্রা-টেরেস্ট্রিয়াল ভেহিকেল থাকে, আপনাদের উপর যে-কোনও রকম হামলা আসতে পারে। আমেরিকান সরকার চাইছে না এমন নাজুক পরিস্থিতি হোক। এবং সেজন্য মেরিনদের পাঠানো হচ্ছে। অবশ্য, এই মুহূর্তে আমাদের সেনাবাহিনীর বড় কোনও দল ম্যাকমাৰ্ডোয় নেই। আর সেকারণেই অ্যাডমিরাল হ্যামিলটনের মাধ্যমে আপনার কাছে সাহায্য চেয়েছি আমরা। মেরিন সৈনিকরা ওই স্পেসশিপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। …এখন আমরা চাই, আপনি তাদের নেতা হিসাবে থাকুন। শুনেছি আপনার সঙ্গে বাংলাদেশ আর্মির কয়েকজন অফিসার ও নন-কমিশণ্ড অফিসার রয়েছে। তাদেরকে পাশে পেলে আমরা খুবই খুশি হব। পরে আমাদের সেনাবাহিনী ওখানে পৌঁছে গেলে আপনারা বিজ্ঞানীদের ম্যাকমাৰ্ডোয় পৌঁছে দেবেন। মিস্টার রানা, দয়া করে মনে রাখবেন, যে ভাবেই হোক, ওই স্পেসশিপ আমাদের হাতে আসতে হবে। অন্য কারও হাতে ওই জিনিস পড়লে গোটা পৃথিবী জুড়ে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হতে পারে। আবারও বলছি, ওই স্পেসশিপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। অন্য সব বিষয় এখন গৌণ হয়ে উঠেছে।

ভদ্রলোক তাঁর বক্তব্যে, বাঙালি বা আমেরিকান বিজ্ঞানীদের নিরাপত্তা বা তাদের ভালমন্দের বিষয় একটিবারও উল্লেখ করেননি। আবার একটু আগে নিনা ভিসার একই কথা বলেছে: সরকার আমাদের নিরাপত্তা নিয়ে ভাবছে না, তাদের প্রথম এবং শেষ কথা, বিজ্ঞানীরা মরলে মরুক, স্পেসশিপ হাতে পেতে হবে।

রানা স্থির করেছে, পাতাল বরফের টানেলে স্পেসশিপ দেখতে এখনই ডুবুরি পাঠাবে না। ওর মন বলছে, এই স্টেশনে বড় ধরনের সমস্যা চলছে। তার উপর পরিস্থিতি একদম বদলে গেছে ফ্রেঞ্চ লোকগুলো আসবার পর। এখন নিজের ইউনিট ও মেরিনদের ছাড়া কারও উপর বিশ্বাস রাখা মস্ত ভুল হবে।

দরজার দিক থেকে চোখ সরাল না রানা, নিনা ভিসারকে বলল, সংক্ষেপে বলুন কী ঘটেছে।

রাশেদ হাবিব স্ট্যানফোর্ডের জিয়োফিযিসিস্ট, দ্বিতীয়বার পিএইচ.ডি.-র জন্য কাজ করছিল। তার রিসার্চ ছিল আইস কোরের উপর। তার সুপারভাইযার ছিলেন ডক্টর চার্লস মুন। আইস কোরের বিষয়ে অদ্ভুত সব তথ্য পাচ্ছিল রাশেদ হাবিব। অন্য কেউ বরফের এত গভীরে গর্ত করতে পারেনি। সে পৌঁছে যায় এক কিলোমিটারের বেশি নীচে।

আইস কোর বিষয়ে সামান্য ধারণা আছে রানার। সাধারণত বরফের শেলফে তিরিশ সেন্টিমিটার চওড়া গর্ত করা হয়, অনেক গভীর থেকে তুলে আনা হয় সিলিণ্ডারের মত কোর। সেই বরফের কোরের ভিতর বদ্ধ গ্যাসগুলো পরীক্ষা করা হয়। পাওয়া যায় হাজার বছর আগের বাতাস, বোঝা যায় সে আমলে কেমন ছিল পরিবেশ।

তা যাই হোক, বলল নিনা, সপ্তাহখানেক আগে দুর্দান্ত একটা আবিষ্কার করল রাশেদ হাবিব। উপরের দিকে উঠে আসা বরফ ভেদ করল তার ড্রিল। সেই বরফ ছিল প্রিহিস্টোরিক। কোনও এককালে বড় কোনও ভূমিকম্পে ওই বরফ উঠে আসে নীচ থেকে। রাশেদ হাবিব কোরের পকেটে তিন শ মিলিয়ন বছর আগের বাতাস পেয়ে গেল। যে-কোনও জিয়োফিযিসিস্টের জন্য এটা সারাজীবনের সবচেয়ে বড় অসামান্য সুযোগ। আগে কখনও কেউ ওই সময়ের পরিবেশ সম্পর্কে জানতে পারেনি। চিন্তা করুন, তখনও পৃথিবীতে ডাইনোসর আসেনি। শ্রাগ করল নিনা ভিসার। কোনও অ্যাকাডেমিকের জন্য ওটা রংধনুর শেষ প্রান্তে সোনার কলস বলতে পারেন। খ্যাতি ছাড়াও শুধু লেকচার সার্কিটেই লক্ষ লক্ষ ডলার উপার্জন করতে পারবেন তিনি। …তারপর দুএক দিন পর আর ড্রিলিং ভেক্টর সামান্য বদলে নিল রাশেদ হাবিব–ভেক্টর বলতে বরফের ভিতর ড্রিলের অ্যাঙ্গেল বদল করা এবং, কপাল কাকে বলে, পনেরো শ ফুট নীচে পেয়ে গেল বরফের ভিতর চার শ মিলিয়ন বছর আগের ধাতু।

রানাকে এর গুরুত্ব বুঝতে দেয়ার জন্য একটু থামল নিনা ভিসার।

চুপ রইল রানা।

এরপর আমরা ডাইভিং বেল নীচে পাঠালাম, বলল নিনা। বরফের শেলফের ভিতর কিছু সনিক-রেসোন্যান্স টেস্ট করা হলো। আর ওখানেই একটা গুহার ভিতর আবিষ্কার করা হলো প্রাগৈতিহাসিক সেই ধাতু। আরও পরীক্ষা করতে গিয়ে দেখা গেল, ওই গুহা থেকে একেবারে তিন হাজার ফুট নীচে নেমে গেছে এক বরফের সুড়ঙ্গ। তখন সাগরে নেমে ওই সুড়ঙ্গ দিয়ে ডুবুরিদের উপরে উঠতে বলা হলো। সেখানেই জন প্রাইস খুঁজে পেলেন ওই স্পেসশিপ। আর এর পর হারিয়ে গেল সব কজন, ডুবুরি।

রানা জানতে চাইল, এসবের সঙ্গে ডক্টর চার্লস মুন হত্যাকাণ্ডের কী সম্পর্ক?

মুন ছিলেন রাশেদ হাবিবের সুপারভাইর, বলল নিনা। সবসময় রাশেদ হাবিবের কাঁধের উপর দিয়ে অদ্ভুত সব আবিষ্কার দেখছিলেন তিনি। ক্রমে প্যারানয়ার ভিতর চলে যায় হাবির। বলতে শুরু করে মুন তার রিসার্চ চুরি করছেন। তার আবিষ্কার নিয়ে গোপনে আর্টিকেল লিখছেন।

আসলে রাশেদ হাবিবের ভয় পাওয়ারই কথা, বহির্বিশ্বে। অনেক বেশি যোগাযোগ ছিল ডক্টর মুনের। জার্নালে লিখলে তার কথাই বিশ্বাস করবে সবাই। এডিটররা তাকে ভাল করেই চিনতেন। একমাসের ভিতর তার আর্টিকেল ছাপা হবে, কিন্তু হাবিব চাইলেও ছয় মাসের মধ্যে নিজের আর্টিকেল প্রকাশ করতে পারত না। এর পর, ধাতু আবিষ্কার হওয়ার পর হাবিব মনে করল, তার হীরার খনি চুরি করছেন মুন।

এ কারণে ডক্টর মুনকে খুন করে ফেললেন হাবিব?

হ্যাঁ। গত শুক্রবার রাতে। ডক্টর মুনের ঘরে গেল রাশেদ হাবিব, তারপর শুরু হলো চেঁচামেচি। আমরা সবাই শুনতে পেয়েছি সেই চিৎকার। ভীষণ খেপে গেল হাবিব। আগেও এমন করেছে, তাই আমরা বেশি গা করিনি। কিন্তু, এবার ডক্টর মুনকে খুনই করে ফেলল সে।

কীভাবে খুন করল? দরজার উপর চোখ রানার।

সে… একপলক দ্বিধা করল নিনা ভিসার। ডক্টর মুনের ঘাড়ে হাইপোডারমিক নিডল গেঁথে দিল। ভিতরে ছিল বিষাক্ত ইণ্ডাস্ট্রিয়াল-স্ট্রেংথ ড্রেন-ক্লিনিং ফ্লুইড।

আচ্ছা। দরজার দিকে ইশারা করল রানা। ঘরে আছেন উনি?

ওই ঘটনার পর নিজেই নিজেকে আটকে রেখেছে, বলল নিনা। এক সপ্তাহের খাবার নিয়ে ঘরে ঢুকে বলেছে, আমরা যদি তাকে ধরতে চাই, সে আমাদেরকেও খুন করবে। ভীষণ ভয় পেয়েছি আমরা। পুরো পাগল হয়ে গেছে লোকটা। তারপর একরাতে… নীচের গুহায় ডুবুরি নামাবার আগের রাত ছিল সেটা… আমরা সবাই মিলে বাইরে থেকে তক্তা দিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলাম। দরজার দুপাশে রানার লাগালেন জন প্রাইস, আর আমরা ঠিক জায়গায় ধরলাম আড়া। তারপর একটা রিভেট গান দিয়ে দরজা আটকে দিলেন প্রাইস।

ভদ্রলোক এখনও বেঁচে আছেন? জানতে চাইল রানা।

হ্যাঁ। তার নড়াচড়ার আওয়াজ পাবেন। এখন বোধহয় ঘুমিয়ে আছে। নইলে নানান আওয়াজ তৈরি করত।

দরজার কিনারা দেখতে শুরু করল রানা। শক্ত ভাবেই। দরজায় রিভেট লাগানো হয়েছে। আপনাদের বন্ধু পোক্ত কাজই করেছেন, বলল রানা। ঘুরে দাঁড়াল। অবশ্য উনি ভিতরে থেকে থাকলে। আপাতত তাঁকে নিয়ে ভাবছি না। …আপনারা তো নিশ্চিত ওই ঘর থেকে কোনও পথে বেরুনো যায় না?

এটাই একমাত্র দরজা।

অন্য কোনও পথে বেরুনো যায় না? যদি বরফের দেয়াল, মেঝে বা ছাত খুঁড়ে বের হন?

ইস্পাতের পাত দিয়ে মোড়া সিলিং এবং মেঝে, খুঁড়ে, বেরুতে পারবে না। আর এই ঘর করিডোরের শেষমাথায়। পিছনে বা দুপাশে কোনও ঘরও নেই। জমাট বরফ দিয়ে তৈরি দেয়াল। বেরুনোর কোনও উপায় নেই তার।

সেক্ষেত্রে আপাতত ওখানেই থাকুন, বলল রানা, বরফের টানেলে ফিরতি পথ ধরল, আমাদের হাতে এখন অন্য কাজ আছে।

কী করবেন ভাবছেন?

প্রথমে জানতে হবে গুহার ভিতর ডুবুরিদের কী হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *