১.০৫ এ-ডেকের ক্যাটওয়াকে

ওঁরা চারঘণ্টা আগে এসেছেন, বলল নিনা ভিসার।

এ-ডেকের ক্যাটওয়াকে দাঁড়িয়েছে নিনা ভিসার ও রানা, এখান থেকে আইস স্টেশনের মূল অংশ চোখে পড়ছে।

নিনা এরই ভিতর রানাকে জানিয়েছে, উইলকক্স আইস স্টেশনটা: বরফের শেলফের ভিতর খাড়া করে গাঁথা বিশাল একটা ব্যারেলের মত। এই ফ্যাসিলিটি পুরো পাঁচতলা। একেবারে নীচতলা সাগর-সমতলে।

সিলিন্ডারের প্রতি তলায় রয়েছে কিছু ধাতব ক্যাটওয়াক; দুপাশের দেয়ালে খাড়া, সরু রাং ল্যাডার; ওগুলো দিয়েই ওঠা-। নামা করতে হয়। এই ফ্যাসিলিটি ফাঁকা ফায়ার এস্কেপের মতই। চারপাশে বরফের দালান। প্রতিটি তলায় ক্যাটওয়াক মিশেছে চারটে সমতল মেঝের টানেলে। মাঝের মস্ত শাফট ঘিরে এসব টানেল। কমপাসের চার কাটার মতই উত্তর-দক্ষিণ পুব ও পশ্চিমে গেছে।

একেকটি লেভেলকে একতলা ধরে নেয়া হয়েছে। এ থেকে শুরু করে ই লেভেল নাম দেয়া হয়েছে। ফ্যাসিলিটির সবচেয়ে উপরে এ-ডেক। আর ই-ডেক একদম নীচে, ওখানে। রয়েছে ধাতব একটি প্ল্যাটফর্ম। তার ভিতর সাগরের পানির মস্ত পুল। নিনা জানিয়েছে, ব্যারেলের মাঝে সি-ডেক, ওখানে রিট্রাক্টেবল একটা সেতু বাড়িয়ে দেয়া যায় স্টেশনের শাফটের উপর।

এরা কজন এসেছে? জানতে চাইল রানা।

প্রথমে তিনজন, তারপর আরও দুজন, বলল নিনা। আমাদের সঙ্গে রয়ে গেছে চারজৰ। শেষজন আমেরিকান ও বাঙালি বিজ্ঞানীদেরকে নিয়ে হোভারক্রাফটে করে ডিখ, ঈলেখের দিকে রওনা হয়েছে।

আপনি এদের চেনেন?

সা ডেনি পেয়েযি ও ম্যাথিউ ফ্যোনুয়্যাকে চিনি, বলল নিনা। আমার ধারণা, ভীষণ ভয় পেয়ে প্রস্রাব করে ফেলেছে পেয়েযি, আপনারা যেভাবে অস্ত্র নিয়ে এসে ঢুকলেন! …আর চতুর্থ লোকটাকেও চিনি, তার নাম দু লা বোয়াবার্থেলিউ।

সার্জেন্ট জনি ওয়াকার একটু আগে নিনা ভিসারকে নিয়ে। ডাইনিংরুমে ঢুকবার দু মিনিটের ভিতর রানা বুঝে গেছে, কিছু জানতে চাইলৈ এই মহিলার কাছেই প্রশ্ন করতে হবে। ম্যাকমার্ডো থেকে রওনা হওয়ার আগে ওকে বলা হয়েছে, গত এক সপ্তাহের পরিস্থিতি কেমন ছিল তা জেনে নিলে ওর সুবিধে হবে।

অন্যরা ক্লান্ত এবং ভীত, কিন্তু নিনা ভিসার শক্ত রয়েছে। মনে হচ্ছে সবার দায়িত্বে আছে সে-ই। ওয়াকার ও কেলগ রানাকে বলেছে, ফ্যাসিলিটি সিকিউর করতে গিয়ে ই-ডেকে মহিলাকে পেয়েছে। আধহাত কালো দাড়িওয়ালা এক ফ্রেঞ্চ বিজ্ঞানীকে ড্রিল রুম ঘুরিয়ে দেখাচ্ছিল সে।

স্টেশনের বিশাল শাফটের দিকে চেয়ে আছে নিনা ভিসার, আপাতত গভীর চিন্তার ভিতর ডুবে গেছে। তার দিকে চাইল রানা। নিনা ভিসারের চেহারাটা খুবই আকর্ষণীয়, দেখলে মনে হয়। বয়স পঁচিশের বেশি। গাঢ় বাদামি চোখ, কাঁধে ফুলে ওঠা কালো চুলের মেঘ। একটু উঁচু চোয়াল, কিন্তু বেমানান লাগে না। ঠোঁট দুটো মায়াবী কবিতার মত। মহিলার কণ্ঠে চকচক করছে রুপালি চেইনে ঝোলানো একটা লকেট।

হঠাৎ করেই ক্যাটওয়াকে এসে দাঁড়াল ছোট্ট একটি মেয়ে। রানা আঁচ করল, ওর বয়স বড়জোর দশ! খাটো করে ছাঁটা সোনালি চুল, বোতামের মত ছোট্ট নাক, চোখে ভারী কাচের চশমা। কমিকের চরিত্রের মত লাগছে মেয়েটিকে, ফুলে ওঠা বড় একটা পারকা পরেছে–উলের হুড ঝুলছে ওর মাথার পিছন অংশে।

মেয়েটির পিছনে ক্যাটওয়াকে এসে থেমেছে সিল মাছটি।

ওর নাম কী? নিনা ভিসারের কাছে জানতে চাইল রানা।

ও আমার মেয়ে, মেরি, মেয়েটির কাঁধ চাপড়ে দিল নিনা। মেরি, ইনি মেজর রানা।

হাই, মেরি, বলল রানা।

কয়েক সেকেণ্ড চুপ রইল মেয়েটি, নিস্পলক দেখছে রানাকে। চোখ আটকে গেছে মেরিনদের দেয়া আমার, হেলমেট ও অস্ত্রের উপর।

দেখতে দারুণ লাগছে আপনাকে, শেষ পর্যন্ত বলল।

তা-ই? মৃদু হাসল রানা।

চোখদুটো যেন কালো সাগরের মত গভীর।

তোমার বয়স কত, মেরি?

বারো, প্রায় তেরো হতে চলেছে।

আচ্ছা?

হা। বয়সের তুলনায় একটু খাটো আমি।

আমিও, বলল রানা। পায়ের দিকে চাইল। থপথপ করে এগিয়ে এসেছে সিল, শুকে দেখছে ওর হাঁটু। আর তোমার বন্ধু? ওর নাম কী?

ও একটা মিষ্টি মেয়ে, নাম লিলি।

উবু হলো রানা, হাত বাড়িয়ে দিতেই ওটা শুকল সিল মাছ। খুব বড় নয় লিলি, আকারে মাঝারি কুকুরের সমান। গলা থেকে ঝুলছে সুন্দর একটা লাল কলার।

লিলি কী ধরনের সিল? জানতে চাইল রানা। আলতো চাপড় দিল ওটার মাথায়। 

আর্কটাসেফালাস গেযেলা, বলল মেরি। আর্কটিকের ফার সিল।

রানার হাতের চারপাশে মাথা দিয়ে গুঁতো দিতে শুরু করেছে লিলি, বুঝিয়ে দিচ্ছে ওর কানের পিছন দিকটা চুলকে দিতে হবে। নীরব নির্দেশ পালন করল রানা, তারপর হঠাৎ করেই কাত হয়ে পড়ে গেল সিল, চিত হয়ে গিয়ে ধরল পেট।

ও বুলছে ওর পেট চুলকে দিতে হবে, হেসে ফেলল মেরি। খুব খুশি হয়। 

ক্যাটওয়াকে শুয়ে অপেক্ষা করছে লিলি। ফ্লিপারগুলো উঁচু করে দৈহ থেকে সরিয়ে রেখেছে। আরও নিচু হলো রানা, ব্যস্ত হাতে চুলকে দিল মসৃণ পেট।

আপনি সারাজীবনের জন্যে একজন বন্ধু পেলেন, মন্তব্য করল নিনা ভিসার। মনোযোগ দিয়ে রানাকে দেখছে সে।

ভাল বন্ধু পেলে সব সময়েই ভাল লাগে, সোজা হয়ে দাঁড়াল রানা।

জানতাম না যারা যুদ্ধ করে, তারা বন্ধুত্বও করে, হঠাৎ করেই বলল নিনা। অস্বস্তির ভিতর ফেলে দিয়েছে রানাকে।

এক মুহূর্ত পর বলল রানা, সবাই তো আর পাষণ্ড হয় না।

কিন্তু আপনারা এখানে এসেছেন একটা জিনিস নিতে।

সুন্দরী মহিলার চোখে চোখ রাখল রানা। কয়েক সেকেণ্ড পর চোখ সরিয়ে নিল নিনা। রানা বুঝে গেল, বোকা নয় মহিলা।

আগের প্রসঙ্গে ফেরা যাক, বলল ও। আপনি ওঁদের দুজনকে ভাল করেই চেনেন। আর তৃতীয়জনের সঙ্গেও পরিচয়, হয়েছে, ঠিক?

হা।

আর চতুর্থজন… গ্যাসেয়া ভিভাদিয়েখ?

তার সঙ্গে আগে কখনও দেখা হয়নি।

রানা জানতে চাইল, ওঁরা মোট কজনকে ডিখ-ঈলেখ-এ নিয়ে গেছেন?

হোভারক্রাফটে বড়জোর ছয়জন আঁটে, কাজেই পাঁচজন বিজ্ঞানীকে নিয়েছেন।

আর নিজেদের চারজনকে এখানে রেখে গেছেন।

ঠিকই ধরেছেন।

মহিলার দিকে চেয়ে আছে রানা। এবার কয়েকটা বিষয় পরিষ্কার করে নেয়া যাক। যেমন, বরফের নীচে আপনারা কী পেয়েছেন; বা রাশেদ হাবিব… স্টেশনে যে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে… থেমে গেল রানা।

কী ইঙ্গিত করা হয়েছে, বুঝতে পেরেছে মহিলা। বাঙালি মেজর চাইছে না, বাচ্চা মেয়ের সামনে খুন নিয়ে আলাপ হোক।

হ্যাঁ, আলাপটা সেরে নেয়াই ভাল, আড়ষ্ট মুখে বলল নিনা ভিসার।

উইলকক্স আইস স্টেশনের চারপাশে নজর বোলাল রানা। অনেক নীচে সুনীল পানির পুল। একতলা উপর থেকে শুরু হয়েছে ক্যাটওয়াক। তারপর টানেলের ওপাশে বরফের দালান। সেসব অবশ্য দেখা যাচ্ছে না। রানার চোখ ভাসা ভাসা ভাবে সবই দেখছে, কিন্তু মন অন্যখানে। অন্তর বলছে, এখানে বড় ধরনের কোনও গোলমাল চলছে। কিন্তু আঙুল তুলে নির্দিষ্ট কিছু দেখাতে পারবে না।

কয়েক সেকেণ্ড পর জানতে চাইল রানা, আমি যদি ভুল বলি, আমাকে শুধরে দেবেন। এই স্টেশন তো বরফের শেলফ খুঁড়ে তৈরি? প্রতিটি দেয়াল বরফের, সেক্ষেত্রে বরফ গলছে না কেন? আপনারা নানান মেশিনারি ব্যবহার করছেন, এতে প্রচুর তাপ হওয়ার কথা।

আগেও অ্যান্টার্কটিকায় এশিয়ানদের দুএকটা স্টেশনে বিসিআইয়ের কাজে এসেছে রানা। শেষবার মস্ত বিপদে পড়েছিল, সেবার ঠেকাতে হয় শ্বেতাঙ্গদের ভয়ঙ্কর চক্রান্ত এবং হামলা।

এখন নিনা ভিসারের কাছ থেকে এই আমেরিকান স্টেশনের বিষয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য চাইছে ও। কখন-কী-কোন্ তথ্যের প্রয়োজন পড়বে, বলা যায় না।।

আপনি খুবই ভাল প্রশ্ন করেছেন, বলল নিনা ভিসার। আমরা আমেরিকানরা যখন এখানে এলাম, দেখা গেল কোর ড্রিলিং মেশিন থেকে প্রচণ্ড তাপ তৈরি হচ্ছে। ফলে বরফের দেয়াল গলতে শুরু করল। তখন সি-ডেকে কুলিং সিস্টেম বসানো হলো। তারপর থেকে একটা থার্মোস্ট্যাট সারাক্ষণ স্টেশনের তাপমাত্রা মাইনাস এক ডিগ্রিতে রাখে। মজার ব্যাপার, উপরে হয়তো হিমাঙ্কের তিরিশ ডিগ্রি নীচে আবহাওয়া, কাজেই কুলিং সিস্টেম ভিতরের পরিবেশ উষ্ণ করে। এতে আমরা সবাই খুশি।

খুশি হওয়ারই কথা, চারদিক দেখছে রানা। আবার ডাইনিংরুমের দরজার উপর চোখ পড়ল ওর। ম্যাথিউ ফ্যেনুয়্যা এবং অন্য তিন ফ্রেঞ্চ ভিতরে, উইলকক্স আইস স্টেশনের বাসিন্দাদের সঙ্গে একই টেবিলে বসেছে। ক্যাটওয়াক থেকে তাদেরকে চোখে পড়ছে।

আপনি আমাদের সবাইকে ফিরিয়ে নিতে এসেছেন? হঠাৎ রানার পিছন থেকে জানতে চাইল মেরি।

চিন্তিত চোখে চার ফ্রেঞ্চকে দেখছে রানা, কয়েক সেকেণ্ড পর মেয়েটির দিকে ফিরল! এখনই নয়, মেরি। তার আগে কিছু কাজ শেষ করতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *