১.০৩ রাজহংসীর মত ভেসে চলেছে

রাজহংসীর মত ভেসে চলেছে মর্নিং স্টার কিশোর বাংলা নাম রেখেছে শুকতারা। ঘোষণা করে দিয়েছে, যতদিন স্কুনারটা তাদের অধিকারে থাকবে, শুকতারা বলেই ডাকবে ওটাকে। রবিন আর মুসা আপত্তি করেনি। ক্যাপ্টেন কিছুক্ষণ গাঁইগুই করে শেষে মেনে নিয়েছে। কিশোর বুঝিয়ে দিয়েছে তাকে, যেহেতু.জাহাজটা ভাড়া নিয়েছে ওরা, ওটার ওপর সর্বময় কর্তৃত্ব এখন ওদের।

দুরন্ত গতিতে ছোটার জন্যেই যেন জন্ম হয়েছিল জাহাজটার। সমকক্ষ টিউনা শিকারি আর কোন জাহাজই পারে না শুকতারার সঙ্গে, মাছ নিয়ে বন্দরে ফেরার প্রতিযোগিতায় হেরে যায়। তিনকোনা মারকোনি পালের কারণেই গতি এত বেড়েছে এটার। এ ধরনের পাল কুনারে সাধারণত দেখা যায় না, সম্রান্ত রেসিং ইয়টগুলোতেই লাগানো হয়। কিন্তু শুকতারা সাধারণ স্কুনার নয়। বোট রেসেও অংশগ্রহণ করেছে। তিনটে পাল ছাড়াও রয়েছে অকজিলারি ইঞ্জিন, বাতাস পড়ে গেল, কিংবা সরু চ্যানেলের ভেতর দিয়ে চলার সময় ওই ইঞ্জিন ব্যবহার হয়সাধারণত পাল যেখানে কাজ করে না। কিন্তু বাতাস থাকলে, আর তিনটে পালেই হাওয়া লাগলে যে গতি পায়, ইঞ্জিনের পুরো ক্ষমতা নিংড়েও তার অর্ধেক হবে না। এই তো এখনই সতেরো নট গতিতে ছুটছে, অথচ যেন গায়েই লাগছে না ওর।

ডেকে দাঁড়িয়ে আছে তিন গোয়েন্দা। এরকম একটা জাহাজের সাময়িক মালিক হতে পেরে গর্বে ফুলে উঠেছে বুক। নৌকা-জাহাজ সম্পর্কে মুসার জ্ঞান বেশি, স্কুনারটা সে-ই পছন্দ করেছে। টাকা এসেছে তার বাবার পকেট থেকে অর্ধেক, বাকিটা কিশোরের চাচা রাশেদ পাশার কাছ থেকে। দুজনে শেয়ারে ব্যবসা করে, জন্তুজানোয়ার ধরে বিক্রি করার, স্কুনারটার মালিক ক্যাপ্টেন ইজরা কলিগ। জাতে জেলে, দক্ষ নাবিক, ক্যাপ্টেন উপাধিটা নিজেই নিজের নামের আগে বসিয়ে নিয়েছে।

শুকতারাতেই আছে সে। ক্যাপ্টেন হিসেবে এসেছে, তার জন্যে আলাদা পয়সা দিতে হবে। ষাট ফুটি একটা জাহাজ সামলানো এমনকি মুসার পক্ষেও সবসময় সম্ভব না। তাছাড়া যাচ্ছে ওরা অচেনা সমুদ্রে, দক্ষ একজন নাবিকের দরকার আছে। জাহাজের মাঝি-মাল্লা রয়েছে আরও দুজন, দুজনেই তরুণ। একজনের নাম জামবু, ডাকনাম না ছদ্মনাম কে জানে, আসল নাম বলতে নারাজ। রোদে-পোড়া শরীর, কর্কশ চেহারার মতই যেন চরিত্রটাও। আরেকজন বাদামি চামড়ার এক দানব, নাম কুমালো, বাড়ি দক্ষিণ সাগরের ছোট্ট এক দ্বীপে, রায়াটি। এক বাণিজ্যিক জাহাজের চড়ে এসেছিল আমেরিকায়, স্যান ফ্রান্সিসকোয় নেমেছিল। ঘুরেছে অনেক শহর, স্বপ্ন ভঙ্গ হয়েছে, স্বর্গ খুঁজে পায়নি শ্বেতাঙ্গদের দেশে, অথচ গল্প অনেক শুনেছিল। তাই প্রথম সুযোগেই ফিরে চলেছে আবার নিজের দেশে। স্কুনারটা পলিনেশিয়ান দ্বীপপুঞ্জের দিকে যাবে শুনেই আর দ্বিরুক্তি করেনি, মাল্লার চাকরি নিয়ে উঠে পড়েছে।

সামনের ডেকের নিচে ছোট্ট কেবিনে গাদাগাদি করে ঘুমাতে হবে তিন নাবিককে। তিন গোয়েন্দার থাকার জায়গা আরও কম, পেছনের ডেকের নিচে। জায়গা অনেকই ছিল, ছেড়ে দিতে হয়েছে বিশাল ট্যাংকগুলোর জন্যে, যেগুলোতে, জলজ প্রাণী জিয়ানো হবে। দুটো কেবিনের মাঝামাঝি বসানো হয়েছে ওগুলো।

খুদে গ্যালিটাকে ব্যবহার করা হবে রান্নাঘর হিসেবে। একটা প্রাইমাস স্টোভ আছে। স্টোররূমে আর একরত্তি জায়গা নেই, খাবারের বাক্স, বস্তা, টিনে বোঝাই। আছে মাছ আর অন্যান্য জানোয়ার ধরার নানারকম সরঞ্জাম–জাল, হারপুন, বড়শি, সুতা, আরও অনেক কিছু।

তিনটে মাস্তুলের বড়টাতে, অর্থাৎ প্রধান মাস্তুলের অনেক ওপরে লাগানো রয়েছে একটা মাচামত, ক্রোজ-নেস্ট, কিশোর বলে কাকের বাসা। ওখানে উঠে বসে চোখ রাখা যায় দূরে, শিকার খুঁজে বের করা সহজ হয়। সামনের গলুইয়ে রয়েছে পুলটি– লম্বা একটা তক্তা ঠেলে বেরিয়ে গেছে কয়েক ফুট সামনে, লোহার মোটা পাত দিয়ে ওটাকে জায়গামত ধরে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। অনেক ফিশিং বোটেই থাকে ওরকম পুলপিট। হারপুন হাতে ওটার মাথায় গিয়ে দাঁড়ায় শিকারি, পানিতে মাছের খোঁজ করে। চোখে পড়লেই পলকে ছুঁড়ে মারে হারপুন, গেঁথে তোলে মাছ। ওখানে দাঁড়ালে রোমাঞ্চকর অনুভূতি হয়, আশ্চর্য এক ভাল লাগা। মাথার ওপরে খোলা আকাশ, পায়ের তলায় ছুটন্ত সাগর, মাঝে একটা তক্তা ছাড়া আর কিছু নেই। পানির অনেক নিচে দৃষ্টি যায় এখানে দাঁড়ালে, স্পষ্ট চোখে পড়ে সাগর-জীবন।

পালা করে কয়েকবারই পুলপিটে দাঁড়িয়েছে তিন গোয়েন্দা। অবাক হয়ে ভেবেছে, কি জানি কি চোখে পড়ে যায়? অচেনা কিছু দেখা যেতেই পারে। কারণ প্রফেসর ইস্টউড বলেছেন, প্রশান্ত মহাসাগরে যত প্রাণী আছে, তার অর্ধেকের বেশি হয়ত এখনও অপিরিচিত মানুষের কাছে। মানুষ জানেই না, আছে ওগুলো।

বিশাল এই জলাশয়ের সব চেয়ে বেশি যেখানটায় চওড়া, এগারো হাজার মাইল; গড় গভীরতা তিন মাইল, কোন কোন জায়গা আরও বেশি, ছয়টা গ্র্যাণ্ড ক্যানিয়ন একসাথে জোড়া দিয়ে ডোবালেও ডুবে যাবে। লক্ষ লক্ষ দ্বীপ রয়েছে এর বুকে, নামকরণ হয়েছে মাত্র তিন হাজারের। মহাসমুদ্রের এই অসীম জলরাশি কত হাজারো রহস্য এখনও লুকিয়ে রেখেছে বিজ্ঞান আর মানুষের অগোচরে, কে জানে!

হুইল ধরেছে ক্যাপ্টেন ইজরা কলিগ। ছোেট নীল চোখে শেয়ালের ধূর্ততা। রোদে পোড়া, বৃষ্টিতে ভেজা মুখের বাদামি চামড়া দেখে আর বোঝার উপায় নেই মূল রঙ কি ছিল। মাঝে মাঝে তাকাচ্ছে বিনাকল-এ রাখা কম্পাসের দিকে।

এই রকম বাতাস থাকলে সহজেই পোনাপের পাশ কাটাতে পারব, একসময় বলল কলিগ।

কেন, বাতাস গোলমাল করার সম্ভাবনা আছে নাকি? কিশোর জিজ্ঞেস করল।

আছে। একটা অশ্ব অক্ষাংশ। বাতাসের মতিগতি বোঝা মুশকিল। এরকম থাকে না। হাওয়াই ছাড়ানোর পর নিশ্চিন্ত। বাতাস মোটামুটি এক থাকে ওখানে, দুর্ঘটনার ভয় কম।

দুর্ঘটনা? পায়ে পায়ে সেখানে এসে দাঁড়িয়েছে রবিন, কথা শোনার জন্যে। কি দুর্ঘটনা?

হারিক্যান। সর্বনাশ করে ছাড়ে।

এখন কি হারিক্যানের মৌসুম নাকি? মুসা জিজ্ঞেস করল।

হ্যাঁ। থাক, ওসব অলক্ষুণে কথা বলার দরকার নেই। হয়ত কিছুই ঘটবে। কিশোরের মুখের ওপর তীক্ষ্ণ শেয়াল-দৃষ্টি নাচাল কলিগ। এত টাকা খরচ, এত সাজসরঞ্জাম…ওদিকে কি দরকার? শুধুই জানোয়ার ধরা, না অন্য কিছু?

হঠাৎ সন্দেহ হল কিশোরের। তথ্য জানতে চাইছে ক্যাপ্টেন? নাকি জানতে চাওয়ার ভান করছে শুধু, যা জানার জেনে ফেলেছে ইতিমধ্যেই? তাকে তো বলা হয়েছে, জলজ জানোয়ার ধরতে যাচ্ছে ওরা। তাহলে হঠাৎ এই প্রশ্ন কেন? মুক্তা খেতের কথা জানে নাকি লোকটা?

জবাব দিল না কিশোর। সরে এল ওখান থেকে। জাহাজের পালে হাওয়া লাগার পর থেকে যে ভাল লাগাটা ছিল, দূর হয়ে গেছে, মনের কোণে ভারি হয়ে উঠছে সন্দেহের কালো মেঘ।

প্রায় ভুলেই গিয়েছিল কালো সেডানের সেই লোকটার কথা। বাড়ি থেকে বন্দর পর্যন্ত কেউ তাদেরকে অনুসরণ করেনি। জাহাজ খোলা সাগরে বেরিয়ে আসার পর সে মনে করেছিল, শয়তানকে পিছে ফেলে এসেছে। সামনে শুধুই আনন্দ, আর রোমাঞ্চকর অ্যাডভেঞ্চার।

এখন মনে হল, ভুল করেছে। নতুন করে তাকে ভাবিয়ে তুলল ক্যাপ্টেন ইজরা কলিগ। জামবুকে সন্দেহ করল, লোকটা কেন আসল নাম বলতে চায় না? সন্দেহ হল কুমালোকে, লোকটা কি সত্যিই দেশে ফিরে যাওয়ার জন্যে শুকতারায় উঠেছে? নাকি দক্ষিণ সাগরে ওদের সঙ্গে চলেছে প্রফেসরের মুক্তা খেতের সন্ধানে? কাকে ছেড়ে কাকে সন্দেহ করবে বুঝতে পারছে না সে। জামবু আর কুমালো, দুজনকেই চাকরি দিয়েছে ইজরা কলিগ। তিনজনই কি একদলে?

কি হল? ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল মুসা।

হাসল কিশোর। তার সন্দেহের কথা বলে এখনই দুই সহকারীকে ঘাবড়ে দিতে চায় না। না, কিছু না…ঝড়ের কথা শুনে ভাবছি…ওই দেখ, মেঘ।

বিশেষ সুবিধের লাগছে না, আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল রবিন। মাথার ওপর দিয়ে উড়ে চলেছে একটুকরো কালো মেঘ। নামবেই বোধহয়। তার কথা শেষ হতে না হতেই ঝরঝর করে ঝরে পড়ল কফোঁটা। বোঝা যায়, আরও ঝরবে।

বৃষ্টি! চেঁচিয়ে উঠল মুসা। তারমানে গোসল। খাইছে, গায়ে যা গন্ধ হয়ে গেছে না। বাড়ি থেকে বেরোনোর পর আর গা ধোঁয়ার সুযোগ পাইনি।

ছুটে কেবিনে চলে গেল সে। খানিক পরেই বেরিয়ে এল কাপড় খুলে, পরনে শুধু একটা জাঙ্গিয়া। হাতে সাবান।

বড় বড় ফোঁটায় বৃষ্টি পড়তে লাগল। শরীর ভিজিয়ে নিয়ে সাবান দিয়ে জোরে জোরে গা ঘষতে শুরু করল মুসা। সাদা ফেনায় ঢেকে ফেলল পা থেকে মাথা পর্যন্ত। ইতিমধ্যে কমে গেছে বৃষ্টি। আবার নামার অপেক্ষা করতে লাগল সে উৎকণ্ঠিত হয়ে। চোখ বোজা। দেখতে পেল না, মাথার ওপর থেকে সরে গেছে। মেঘের টুকরোটা। একটা ফোঁটাও পড়ছে না আর।

সাবানের ফেনার একটা স্তম্ভ হয়ে যেন দাঁড়িয়ে আছে মুসা। ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করছে। তার দিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে হাসছে কিশোর আর রবিন। কলিগও তাকিয়ে আছে, মজা পাচ্ছে।

আরেকটু মজা করার লোভ ছাড়তে পারল না রবিন। হঠাৎ উত্তেজিত কণ্ঠে চেঁচিয়ে উঠল, মুসা, দেখ দেখ!

কি হয়েছে দেখার জন্যে চোখ মেলল মুসা। প্রায় সাথেসাথেই বন্ধ করে ফেলল আবার। চোখে সাবান ঢুকে জ্বলুনি শুরু হল। চেঁচাতে শুরু করল সে, ওরে বাবারে, গেছি! এই এই, আমাকে এক বালতি পানি এনে দাও না কেউ! অ্যাই…।

কেউ পানি আনতে গেল কিনা দেখারও উপায় নেই। সহ্য করতে পারল না আর মুসা। সোজা ছুটে গেল রেলিঙের কিনারে। থমকে দাঁড়াল এক মুহূর্ত। তারপরই রেলিঙ টপকে মাথা নিচু করে ঝাপ দিল সাগরে।

ধুয়ে গেল সাবান। একটু আগে বৃষ্টি হয়েছে, পানি বেশ ঠাণ্ডা। কয়েক মুহূর্ত দাপাদাপি করল মুসা। তারপর ওপরে তাকিয়ে রবিনের উদ্বিগ্ন মুখের দিকে তাকিয়ে হেসে বলল, থ্যাঙ্ক ইউ, রবিন। পানিতে নামার সাহস করতে পারছিলাম না, নামিয়ে দিয়ে ডর ভেঙেছ। চমৎকার পানি। এই কিশোর, নামবে নাকি?

না, হাত নাড়ল কিশোর। উঠে এস, জলদি। বড় বড় হাঙর থাকে এসব অঞ্চলে।

থাকুকগে। হাঙরকে ভয় পাই না আমি।

হাসল কিশোর। মুসার সাগরপ্রীতির কথা জানা আছে তার। হঠাৎ চোখ বড় বড় করে অভিনয় শুরু করল, ও, জানো না বুঝি? সাগরের পানিতেও ভূত থাকে। ওদের বলে খ্যাংড়া ভূত…

ঠিক এই সময় বোধহয় পায়ে একটা মাছের বাড়ি লাগল, গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠল মুসা, ওরে বাবারে! খেয়ে ফেলল রে! খ্যা-খ্যা-এ্যাংড়া ভূত…জলদি একটা দড়ি দাও! তোল আমাকে!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *