১.০৩ একঘণ্টা পর উপকূল

একঘণ্টা পর উপকূল চোখে পড়ল, হাই-পাওয়ার্ড ফিল্ডগ্লাসের ভিতর দিয়ে প্রথমবারের মত উইলকক্স আইস স্টেশন দেখল মাসুদ রানা।

বরফে ছাওয়া জমিতে প্রথমে ওটাকে কোনও স্টেশন মনে হলো না। বড়জোর বলা যেতে পারে পেটমোটা গম্বুজওয়ালা কয়েকটা দালান। সবই তুষারের ভিতর ডুবে আছে আধাআধি।

কমপ্লেক্সের ঠিক মাঝে মেইন বিল্ডিং। চারকোনা ভিত্তি উপর প্রকাণ্ড গোল গম্বুজ। দালানের ভিত্তি দৈর্ঘ্য ও প্রস্থে এব শ ফুটের বেশি হবে না। উচ্চতা বড়জোর দশ ফুট।

প্রধান গম্বুজের একটু দূরে অপেক্ষাকৃত ছোট আরেকটা দালান। ওটার ছাতের উপর এক পায়ে দাঁড়িয়ে আছে বিধ্বস্ত রেডিয়ো অ্যান্টেনা। উপরের অর্ধেক কোমর ভেঙে নীচের দিকে নেমে এসেছে। নীচের অংশ এখনও দাঁড়িয়ে আছে শুধু কয়েকটা টানটান কেবলের জোরে। নানা জায়গা থেকে ঝুলছে বরফ। চারপাশে বাতি বলতে শুধু মেইন ডোম, ওটার ভিতর থেকে আসছে সাদা আলো।

স্টেশন থেকে আধ মাইল দূরে হোভারক্রাফট রাখতে বলেছে রানা। যানটা থেমে যেতেই খুলে গেল পোর্ট-সাইড দরজা, একইসঙ্গে হোভারক্রাফটের ফুলে ওঠা স্কার্টে পা রাখল সবাই, তারপর লাফ দিয়ে নেমে পড়ল শক্ত জমাট তুষারে। একপলক চারপাশ দেখে নিয়ে স্টেশনের দিকে ডাবল-মার্চ শুরু করল দলটি। হৌউউ-হৌউউ করুণ আওয়াজ তুলছে ঝোড় হাওয়া, সাগরের দিক থেকে ক্লিফের উপর ঢেউ আছড়ে পড়বার বুম বুম আওয়াজ আসছে।

তোমরা সবাই জানো কী করতে হবে, হেলমেট মাইকে বলল রানা।

বরফ-সাদা ক্লিয়ার্ডের ভিতর ছড়িয়ে পড়ল দলটি। ছুটে চলেছে স্টেশনের দিকে।

    .

সার্জেন্ট হোসেন আরাফাত দবির তুবড়ে যাওয়া হোভারক্রাফট দেখবার অনেক আগেই সামনের বরফে দেখতে পেয়েছে চওড়া ফাটল।

তুষারের মাঝে মানুষের হাস্যরত দুই ঠোঁট যেন ওটা, কমপক্ষে চল্লিশ গজ বিস্তৃত, অনেক গভীর।

মস্ত ফাটল থেকে এক শ গজ দূরে হোভারক্রাফট রেখেছে সার্জেন্ট। সে নামবার পর তুষারযান থেকে নেমে এল কয়েকজন মেরিন এবং বাঙালি সৈনিক। পিচ্ছিল বরফের ভিতর সাবধানে সামনে বাড়ল সবাই, পৌঁছে গেল ফাটলের কাছে।

এই দলের ক্লাইম্বার কর্পোরাল নাজমুল, তাকে হার্নেসে আটকে দিল সার্জেন্ট হোসেন আরাফাত দবির। নাজমুল বিড়ালের মতই সাবলীল, চটপটে, ওজনেও কম, বয়স মাত্র তেইশ। ওর আরেক নাম: প্রফেসর শঙ্কু। ছেলেমি চেহারা। পাগলের মত পড়ে সায়েন্স ফিকশন।

হার্নেসে দড়ি আটকে দিতেই উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ল নাজমুল, পেটের উপর ভর করে ক্রল শুরু করল। দেখতে না দেখতে চলে গেল ফাটলের কিনারায়, গলা বাড়িয়ে দেখে নিল নীচের দিক।

হায় আল্লা…।

দশ গজ পিছনে হেলমেট মাইকে সার্জেন্ট হোসেন আরাফাত দবির জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে, নাজমুল?

ওরা সব নীচে, স্যর, চাপা শ্বাস ফেলল কর্পোরাল। কনভেশনাল ক্রাফট। গায়ে ফ্রেঞ্চ ভাষায় কী যেন লেখা। ক্রাফটের তলা থেকে খসে পড়েছে পাতলা বরফের মেঝে। তুষারের ব্রিজ পেরুতে গিয়েই এই অ্যাক্সিডেন্ট। ..

সার্জেন্ট দবিরের দিকে মাথা ঘোরাল সে, থমথম করছে মুখ। শর্ট-রেঞ্জ রেডিয়ো ফ্রিকোয়েন্সিতে হালকা শোনাল ওর কণ্ঠ: সবাই মরে ভূত, স্যর!

নেমে পড়ো, বাছা।

আড়াই মিনিট পর খাতের তলদেশের কাছে পৌঁছে গেল নাজমুল।

চল্লিশ ফুট উপর থেকে পড়ে ভচকে গেছে হোভারক্রাফটের নাক, ফাটল ধরেছে প্রতিটি জানালার কাঁচে ওখানে তৈরি হয়েছে অসংখ্য মাকড়সার জাল। এরই ভিতর সবকিছুকে ছেয়ে ফেলেছে হালকা, তুষার, ইতিহাস থেকে মুছে দিতে শুরু করেছে ওদের অস্তিত্ব।

হোভারক্রাফটের সামনের উইন্ডস্ক্রিন ভেদ করে ছিটকে পড়েছে দুই আরোহী, ফাটলের দূর-প্রান্তে মৃতদেহ, মরেছে ঘাড় মটকে। বরফ হয়ে যাওয়া রক্তের পুকুরের ভিতর নিথর।

ভুতুড়ে পরিবেশ, বার কয়েক শিউরে উঠল নাজমুল।

হোভারক্রাফটে আরও লাশ আছে, আবছা দেখা গেল। ফাটা কাঁচের ওপাশে নক্ষত্র আকৃতির জমাট রক্তের দাগ।

নাজমুল? হেলমেট ইন্টারকমে শুনল কর্পোরাল। নীচে কেউ বেঁচে আছে?

মনে হয় না, স্যর, বলল নাজমুল।

ইনফ্রা-রেড দিয়ে পরীক্ষা করে দেখো, পরামর্শ দিল দবির। হাতে বিশ মিনিট, তারপর রওনা হব। কেউ বেঁচে থাকলে তাকে ফেলে যেতে চাই না।

আমেরিকান মেরিনদের হেলমেটের ইনফ্রা-রেড ভাইযার চালু করল নাজমুল, এখন দেখলে কেউ ভাববে ও ফাইটার বিমানের পাইলট।

বিধ্বস্ত হোভারক্রাফটের উপর মনোযোগ দিল, দেখতে পেল–ইলেকট্রনিক নীল ইমেজারি। হোভারক্রাফটের ইঞ্জিন শীতল, কোথাও হলুদ রং নেই। ভাইযারের কারণে কালোর উপর নীল রঙা দেখাল ক্র্যাশ সাইট! তার চেয়ে বড় কথা, হোভারক্রাফটের ভিতর কমলা বা হলুদ রঙের কোনও দেখা নেই। বরফের মতই ঠাণ্ডা হয়ে গেছে লাশগুলো।

নাজমুল বলতে শুরু করল, স্যর, ইনফ্রারেড থেকে যা বুঝলাম…

ঠিক তখনই ওর নীচ থেকে সরে গেল জমিন। সাবধান হওয়ার কোনও সুযোগই পেল না নামজুল, ওজন নিতে গিয়ে মটমট করে ওঠেনি বরফের মেঝে, স্রেফ খসে পড়ল সব।

এতই দ্রুত ঘটল, আরেকটু হলে বুঝত না সার্জেন্ট দবির। ফাটলের কিনারায় শুয়ে নীচে চেয়েছে সে, পরমুহূর্তে দেখল এক সেকেণ্ডে উধাও হয়েছে কর্পোরাল। ছেলেটির পিছু নিয়ে সরসর করে ছুটছে কালো দড়ি!

নাজমুল পড়ল! দড়ি ধরো! হুঙ্কার ছাড়ল সার্জেন্ট দবির। আলগা হাতে দড়ি ধরেছে দুই মেরিন, কিন্তু কথাটা শুনে দেরি করল না, দুই হাতে খ করে ধরল লাইন। তারা দুজন অপেক্ষা করছে জোর ঝুঁকির জন্য।

ফাটলের কিনারা থেকে সরসর করে নামছে দড়ি, কিন্তু দুই সেকেণ্ড পর ঝটাং করে টানটান হয়ে গেল।

উঠে দাঁড়িয়েছে সার্জেন্ট দবির, কিনারা থেকে এক পা পিছাল, তারপর উঁকি দিল খাতের ভিতর।

পড়ে আছে বিধ্বস্ত হোভারক্রাফট, বরফের দেয়ালের কাছে দুই মৃতদেহ। তারপর নাজমুলকে দেখল দবির, হোভারক্রাফটের স্টারবোর্ড দরজা থেকে দুই ফুট উপরে দড়ি থেকে ঝুলছে সে।

বাছা, ঠিক আছ তো? হেলমেট মাইকে জানতে চাইল দবির।

জানতাম, স্যর, আমাকে মরতে দেবেন না, বলল নাজমুল।

একমিনিট ঝুলে থাকো, তুলে আনছি।

জী, স্যর। হোভারক্রাফটের স্টারবোর্ড দরজার দিকে চাইল নাজমুল, পরক্ষণে আঁৎকে উঠল। হায় আল্লা! স্য–র!

    .

কাঠের প্রকাণ্ড দরজার উপর করাঘাত করল মাসুদ রানা।

উইলকক্স আইস স্টেশনের চারকোনা ভিত্তির মাঝে দরজা। ওখানে যেতে হলে সরু এক র‍্যাম্প বেয়ে আট ফুট নামতে হয়।

আবারও করাঘাত করল রানা। মূল ভিত্তির প্যারাপেটে আছে ও, উপর থেকে দরজার উপর টোকা দিচ্ছে।

দশ গজ পিছনে, র‍্যাম্পের মুখে দুই পা ছড়িয়ে উপুড় হয়ে শুয়েছে গানারি সার্জেন্ট পল সিংগার, ম্যাকমার্ডো থেকে রওনা হওয়ার আগে নিজেকে সার্জেন্ট ভাইপার বলে পরিচয় দিয়েছে। এখন তার হাতে এম-সিক্সটিন ই অ্যাসল্ট রাইফেল, তাক করেছে বদ্ধ দরজার উপর।

কয়েক মুহূর্ত পর কর্কশ কটকট আওয়াজ তুলল কাঠের দরজা, শ্বাস আটকে ফেলল রানা। তুষারের মেঝেতে এসে পড়ল সরু রুপালি আলো। ধীরে ধীরে খুলে যাচ্ছে দরজা।

রানার নীচে র‍্যাম্পে এসে দাঁড়াল এক লোক। পরনে তার কমপক্ষে সাত পরত পোশাক। হাতে কোনও অস্ত্র নেই।

হঠাৎ সতর্ক হয়ে উঠল লোকটা, বোধহয় সামনের র‍্যাম্পে সার্জেন্ট ভাইপারকে শুয়ে থাকতে দেখেছে। তার নাকের উপর তাক করা হয়েছে এম-১৬ ই অ্যাসল্ট রাইফেল।

এক পা নড়বেন না, লোকটার পিছন থেকে বলল রানা। আমরা বাংলাদেশ আর্মির সদস্য, সঙ্গে ইউনাইটেড স্টেটসের মেরিন। .

জমাট বরফের মূর্তি হয়ে গেল লোকটা।

রানার ইয়ারপিসে এক নারী কণ্ঠ বলল, দুই নম্বর ইউনিট, হাজির। সব সিকিউর করা হয়েছে।

তিন নম্বর ইউনিট, সব সিকিউর।

ঠিক আছে, আমরা সদর-দরজায় পৌঁছে গেছি। বরফের শেলফ থেকে লোকটার পাশে নেমে এল রানা, দ্রুত হাতে সার্চ করল।

র‍্যাম্প বেয়ে নামল গানারি সার্জেন্ট, হাতের রাইফেল তাক করেছে দরজার উপর।

বরফের মূর্তিকে বলল রানা, আপনি আমেরিকান? নাম কী?

নন, জে সুই ফ্রাঁসোয়া, আড়ষ্ট স্বরে বলল সে। এবার ইংরেজিতে জানাল, আমার নাম ম্যাথিউ ফ্যেনুয়্যা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *