১. আস্তাবলের সামনে এসে

সেয়ানে সেয়ানে – গোলাম মাওলা নঈম
প্রথম প্রকাশ: ২০০১

০১.

আস্তাবলের সামনে এসে সিগারেট ধরানোর পর জেমস মরগান খেয়াল করল দেয়াশলাইয়ে আর একটি কাঠিও অবশিষ্ট নেই। বিরক্ত হয়ে বাক্সটা প্রধান সড়কের লাগোয়া নর্দমায় ছুঁড়ে ফেলল ও, একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে আস্তাবলের দিকে এগোল। সামনের বেঞ্চিতে বসা জোয়ান একটা ছেলে দেখছে ওকে, ছোট ছোট চোখে একরাশ কৌতূহল। জেমস যখন স্যাডল ছেড়ে তার দিকে এগিয়ে গেল, ওর লম্বা সুঠাম শরীর আর উরুতে বাঁধা জোড়া পিস্তলের ওপর আটকে থাকল ছেলেটার চোখ।

ঘোড়ার লাগাম হস্তান্তরের পর তরুণ হসল্যারের ছেড়ে যাওয়া আসনে বসল মরগান। ঘণ্টাখানেক পর আসব। ভাল করে যত্ন কোরো, ছেলেটার উদ্দেশে বলল ও। একটা রূপোর ঈগল দেব তোমাকে।

মাথা ঝাঁকিয়ে ওকে আশ্বস্ত করল সে। অনেক দূর থেকে এসেছ, না?

ওয়াইওমিং।

সিগারেট শেষ করে আস্তাবল ছাড়ল মরগান। শূন্যপ্রায় রাস্তা ধরে দক্ষিণে এগোল। হাতের ডানে একটা সেলুন দেখে রাস্তা পেরিয়ে ঢুকে পড়ল ভেতরে। অগোছাল তবে বারকিপারের আন্তরিক হাসি শেষ পর্যন্ত বেরুতে দিল না ওকে। বারের সামনে উঁচু টুলের সারির একটায় ক্লান্ত দেহ চাপিয়ে হুইস্কির ফরমাশ দিল ও। হুইস্কিতে চুমুক দেয়ার ফাঁকে দেখে নিল সেলুনের ভেতরটা। পাঁচ-ছয়জনের একটা দল আড্ডায় বসেছে এক টেবিলে, নিষ্কর্মা লোক। চেহারা-সুরৎ দেখে বোঝা যায় রকবাজ। দূরে, ও-মাথায় একটা টেবিলে বসেছে দু’জন পাঞ্চার, সামনে হুইস্কির ভরা গ্লাস। নীরব কৌতূহলী চোখে দেখছে ওকে।

কাজের ধান্ধায় থাকলে কিছু খবর দিতে পারি তোমাকে, নিচু কণ্ঠে বলল বারকিপ, মরগানের ঊরুতে ঝোলানো জোড়া পিস্তলের দিকে উদ্দেশ্যপূর্ণ চাহনি হানল ওগুলো যদি সত্যিই ভাল চালাতে জানো, যথেষ্ট খাতির পাবে এখানে।

রেঞ্জ ওঅর?

শেষতক ওরকম হতেও পারে। এখানকার একটা আউটফিট কঠিন কিছু লোক চায়।

তাড়া আছে আমার। অনেক দূর যেতে হবে।

দুদিন আগে মারা গেছে আমাদের মার্শাল, বারকিপারের উৎসাহ কমল না। গরু চুরির তদন্তে বেরিয়ে মারা পড়ল বেচারা। এদিকে পরস্পরের বিরুদ্ধে লড়ার জন্যে মুখিয়ে আছে দুটো বাথান। আইনের বাধা নেই, কে যে কখন কাকে হামলা করে বলে! ইচ্ছে করলে সুযোগটা নিতে পারো। মনে হচ্ছে তোমাকে খাতির করবে ওরা।

আগ্রহ পাচ্ছি না, বন্ধু। ধন্যবাদ। পকেট থেকে খুচরো পয়সা বের করে বিল মেটাল মরগান। মাথায় হ্যাট চাপিয়ে নড় করল বারকিপের উদ্দেশে। প্রত্যুত্তরে ত্যাগ করল লোকটা, ন্যাকড়া দিয়ে বার মোছায় ব্যস্ত হয়ে পড়ল।

বেরিয়ে এসে ফুটপাথ ধরে দক্ষিণে এগোল মরগান, হাতের ডানে নাপিতের দোকান পেয়ে ঢুকে পড়ল। সোরেলের যত্নের ফাঁকে সময়টা কাজে লাগানো যেতে পারে, ভাবল ও, টানা পথচলায় সবসময় সুযোগ হয়ে ওঠে না। মুখ ক্ষৌরি করিয়ে নিল। গোসল করার পর অনুভব করল ঝরঝরে লাগছে, দীর্ঘ পথচলার ক্লান্তি কেটে গেছে অনেকটাই।

নাপিতের দোকান থেকে বেরিয়ে ফিরতি পথে আস্তাবলের দিকে এগোল ও, কয়েকটা বাড়ি পর জেনারেল স্টোরের সামনে একটা চাক ওয়্যাগন চোখে পড়ল। চর্বিসর্ব শরীরের চল্লিশোর্ধ্ব এক বুড়ো কয়েকটা প্যাকেট তুলে রাখছে ওয়্যাগনে।

স্টোরে ঢুকল ও। দৈনন্দিন জিনিসপত্র সাধারণত অনেকগুলো একসাথেই কেনে মরগান। ভবঘুরে মানুষের ক্ষেত্রে যা হয়-ফুরিয়ে গেলেও কেনার সুযোগ সবসময় হয়ে ওঠে না। এক প্যাকেট দেয়াশলাই আর বুলেট কিনে দাম মিটিয়ে দিল।

বেরুনোর সময় পাশ ফিরতে দেখতে পেল মেয়েটাকে, ভেতরের কামরা থেকে বেরিয়ে এসেছে। আশ্চর্য কমনীয় মুখ, রুক্ষতার কোন চিহ্নই নেই অথচ তুকটা রোদপোড়া। দীর্ঘ শরীর আকর্ষণ করবে যে কোন পুরুষকে। ওকেই দেখছিল মেয়েটা, আড়চোখে ওর উরুতে বাঁধা জোড়া পিস্তলের দিকে তাকাল একবার, তারপর চোখ ফিরিয়ে নিয়ে দোকানির সাথে কথা বলতে শুরু করল।

স্টোর থেকে বেরিয়ে আস্তাবলে চলে এল মরগান।

মিস বডম্যানের সাথে দেখা হয়েছে, না? সহাস্যে জানতে চাইল তরুণ হসল্যার, আগের মতই পোর্চে বসে আছে। স্টোরের উল্টোদিকে আস্তাবলের অবস্থান বলে সবকিছু দেখেছে।

কিছু বলল না মরগান, নির্বিকার।

এখানকার অনেকেই ওর প্রেমে পড়েছে, কেবল ও নিজে কারও প্রেমে পড়ে না।

তুমি খুব চালাক।

ধন্যবাদ। চলে যাচ্ছ?

উত্তর না দিয়ে স্যাডল ব্যাগে বুলেট আর দেয়াশলাইয়ের প্যাকেট ঢোকাল মরগান। হসল্যার সোরেলটাকে নিয়ে আসতে স্যাডলে চেপে মূল রাস্তা ধরে দক্ষিণে এগোল। একেবারে ঠাণ্ডা শহর, ভাবল ও। রাস্তায় লোকজন কম, সেলুনগুলোও ফাঁকা। আয়তন অনুযায়ী যেরকম হওয়ার কথা, তত লোক বাস করে না এখানে। ক্যাসল টাউনে আগেও এসেছে ও, বছর দুই আগে যেমন দেখেছিল তেমনি আছে শহরটা। খুব একটা বদলায়নি।

রাস্তার দু’পাশে সারিবদ্ধ দোকানের বেশিরভাগই বন্ধ। কাজ চলছে কিছু দোকানের। একেবারে দক্ষিণে আবাসিক এলাকা। জেনারেল স্টোর, হোটেল, ব্যাংক, ল-অফিস, গির্জা-সবই আছে। ক্যাসল টাউন বড় শহর ঠিকই, কিন্তু এর বড় অসঙ্গতি হচ্ছে দৈন্যদশা।

শহরের ওপাশে মিসৌরি যাওয়ার ট্রেইল, ক্যালট্রপ ক্যানিয়নের পশ্চিমে ওল্ডম্যান মাউন্টেনস হয়ে মিসৌরি নদীর কাছে শেষ হয়েছে। নদীর ওপারে মরগানের আপাত গন্তব্য। অবশ্য তার আগেও থামতে পারে। টেক্সাস থেকে যতটা সম্ভব দূরে থাকতে চায় ও, স্যাডল ব্যাগের টাকাগুলো কাজে লাগিয়ে নির্ঝঞ্ঝাট জীবন শুরু করার ইচ্ছে।

বামে মোড় নিয়েছে রাস্তা, উল্টোদিকে একটা গলি। মোড় ঘুরে চওড়া রাস্তার ওপর চোখ পড়তে বিস্মিত হলো মরগান। স্পরের আলতো ছোঁয়ায় দাড়িয়ে পড়ল সোরেলটা।

পঞ্চাশ গজ দূরে কাত হয়ে পড়ে আছে চাক ওয়্যাগন, একটু আগে জেনারেল স্টোরের সামনে দেখে এসেছে যেটা। ধুলোর ওপর বসে ককাচ্ছে বুড়ো, আর রাস্তার ঠিক মাঝখানে মেয়েটাকে ঘিরে রেখেছে তিনজন। আশ্চর্য কঠোর হয়ে গেছে সুন্দর মুখটা, জেদ আর ক্ষোভে স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশি উজ্জ্বল দেখাচ্ছে-এতদূর থেকেও স্পষ্ট দেখতে পেল মরগান। কয়েক কদম এগোল সোরেলটা, এখনও ওর উপস্থিতি টের পায়নি কেউ।

বলেছি তো, চড়া সুরে বলল মেয়েটি, অধৈর্য দেখাচ্ছে। যাব না আমি!

যাচ্ছ তুমি, ম্যাম, শরীরের তুলনায় ঘাড় মোটা এমন একজন বলল। পাঞ্চারের পোশাক পরনে, কোমরে সিক্সশূটার।

টেনিসনকে আমার কথা আগেই বলেছি! ঝঝ মেয়েটার কণ্ঠে।

জানতাম জোর করেই নিয়ে যেতে হবে, দুই কদম এগোল লোকটা।

পিছিয়ে গেল নীলনয়না, আতঙ্কিত। তোমরা সবাই কাপুরুষ, তোমাদের বস্-ও! একজন মহিলার সাথে জোর করতে বাধছে না তোমাদের?

খরখর শব্দে হাসল ঘাড়-মোটা। কেউ যখন অবাধ্য হয়, তখন তাকে জোর করতেই হয়, ম্যাম, হাত বাড়িয়ে মেয়েটার কজি চেপে ধরল সে, কিন্তু ঝাড়া মেরে ছড়িয়ে নিল নীলনয়না, রুখে দাঁড়াল এবার। দ্রুত হাত চালাল পাঞ্চার, চড়টা গলে পড়তে কাত হয়ে পড়ে গেল মিস বডম্যান।

সরে এসো, বাছা! লোকটা ফের এগোতে নিচু কণ্ঠে নির্দেশ দিল মরগান।

তপ্ত লোহার ছ্যাকা খেয়েছে যেন, থমকে দাড়াল পাঞ্চার, বিকৃত হয়ে গেছে মুখ। ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল, কোমরের কাছে চলে গেছে ডান হাত। বিরক্তি আর ভর্ৎসনা দেখা গেল নীল চোখে। কোন্ নর্দমা থেকে উঠে এসেছ, হাঁদারাম? রাগে চেঁচাল সে।

ওয়াইওমিং যদি তাই হয়…’

তুমি একটা আস্ত বোকা! মরগানের কথা কেড়ে নিল সে। মরার শখ হয়েছে নাকি?

লেডির কাছ থেকে সরে এসো সবাই, ফের বলল ও, নির্লিপ্ত চাহনিতে দেখছে পিস্তলের কাছে চলে গেছে সবার হাত। একটা উপলক্ষ পেলে মুহূর্তে হাতে চলে আসবে, আগুন ঝরাবে।

সাহস আছে তোমার, স্ট্রেঞ্জার, নাকি মাথায় ঘিলু কম বুঝতে পারছি না, হালকা সুরে বলল আরেকজন। তিনজনের বিরুদ্ধে ডুয়েল লড়ার খায়েশ হয়েছে দেখছি! আড়চোখে সঙ্গীদের দিকে তাকাল সে, মুখে চাপা কৌতুকের হাসি। দেখেছ, পয়েট, উরুতে আবার জোড়া পিস্তল ঝুলিয়েছে? উঁহু, গায়ে পড়ে জ্ঞান দিতে আসা কোন মাস্টারবাবুকে কখনও পিস্তল ঝোলাতে দেখিনি আমি। তোমরা কখনও দেখেছ?

সস্তা তামাশায় ভ্রুক্ষেপ করল না মরগান, ভাবলেশহীন দেখাচ্ছে ওকে। সতর্ক দৃষ্টিতে দেখছে লোকগুলোকে। হিসাবে ভুল করছে ওরা। প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসী। দেখাচ্ছে তিনজনকে, সংখ্যায় বেশি বলে পরোয়া করছে না। মরগানের টান টান হয়ে দাঁড়ানোর ভঙ্গি, চোখের শ্যেনদৃষ্টি কিংবা শীতল নির্বিকার আচরণ মানেই সমূহ বিপদ-কিন্তু কোনটাই ধরতে পারছে না। ভুল করতে যাচ্ছে ওরা, করুণার সাথে ভাবল মরগান। এদের কেউই পিস্তলে চালু নয়, স্রেফ উদ্ধত পাঞ্চার কেবল।

মাফ চেয়ে চলে যাও, বাছা। পয়েট হয়তো ক্ষমা করতেও পারে! তাচ্ছিল্যের সাথে বলল দ্বিতীয়জন।

ওদের সাথে যেতে চাও, ম্যা’ম? মিস্ বডম্যানের উদ্দেশে জানতে চাইল মরগান।

না, স্পষ্ট সুরে বলল মেয়েটি, উঠে দাঁড়িয়েছে।

ব্যস, চুকে গেল ব্যাপারটা। নিজের চরকায় তেল দাও তোমরা।

পয়েট, ঘাড়-মোটাকে ডাকল তৃতীয়জন। সাহস দেখো ওর, কেমন চালবাজি করছে!

পিস্তলের গুলিতে উত্তর দিল ঘাড়-মোটা, ঝটিতি অস্ত্র তুলেই গুলি করল মরগানের পেছনে বাড়ির দেয়ালে চল্টা উঠাল গুলিটা, ওদিকে ধুলোর ওপর নিথর পড়ে থাকল তার দেহ। নিঃসাড় দাঁড়িয়ে আছে অন্যরা, সঙ্গীর পরিণতি দে আতঙ্কে সিটিয়ে গেছে। কখন অস্ত্র বের করে গুলি করেছে মরগান, টেরই পায়নি কেউ।

ভাগো সবাই! বিরক্ত স্বরে বলল মরগান, জানে লড়ার মুরোদ এদের কারও নেই। শুধু শুধু একটা বুলেট খরচ হলো।

তিন মিনিটের মধ্যে সঙ্গীর লাশসহ সরে পড়ল দুই বীরপুরুষ।

বিস্ময় আর ঘটনার আকস্মিকতা সামলে নিতে সময় নিল মেয়েটি। তারপর এগিয়ে এল মরগানের দিকে, মৃদু স্বরে ধন্যবাদ জানাল। ততক্ষণে বুড়োর। সাহায্যে চাক ওয়্যাগনটাকে দাঁড় করিয়ে ফেলেছে মরগান। সামনে এসে হাত বাড়িয়ে দিল নীলনয়না, নিজের পরিচয় জানাল-মেলিসা বডম্যান। বুড়ো লোকটা বডম্যানদের কূক, ক্লীভ অ্যালেন।

মাথা থেকে হ্যাট সরিয়ে নড় করল মরগান, তারপর সোরেলের দিকে এগোল। পরিচিত হয়ে খুশি হালাম, ম্যাম।

কোথায় যাচ্ছ? অবাক হয়েছে মেয়েটি।

মিসৌরি।

কি কাণ্ড! আমাকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সুযোগও দেবে না? অসন্তুষ্ট স্বরে বলল মেলিসা বডম্যান। নিদেনপক্ষে একসাথে পান করতে পারি আমরা। তারপর আমাদের বাথানে যাব…অবশ্য তোমার সময় হলে মি, মরগান।

ভাবতে হলো ওকে। শেষে ঝামেলায় জড়িয়ে পড়বে না তো?

প্লীজ! অনুরোধ এল।

দ্বিমত করল না মরগান। সুন্দরী কোন মেয়েকে মুখের ওপর নিরাশ করেনি ও কখনও, মেলিসা বডম্যানের ক্ষেত্রে সাহসও হবে না বোধহয়। অস্বীকার করার উপায় নেই নীলনয়নার কাছাকাছি হওয়ার আগ্রহ জমাট বেঁধে আছে ওর ভেতরে।

যেতে যেতে ওর সম্পর্কে জানতে চাইল মেলিসা, কিন্তু কৌশলে এড়িয়ে গেল মরগান। শহরটা কিভাবে গড়ে ওঠা উচিত ছিল এ নিয়ে আলাপ শেষ করার আগেই একটা সেলুনের সামনে পৌঁছে গেল ওরা। নিরিবিলি ও পরিচ্ছন্ন পানশালা, ভাল লাগল মরগানের। মেলিসার বিপরীতে বসল ও। ওর জন্যে হুইস্কি আর নিজের জন্যে অরেঞ্জ জুসের ফরমাশ দিল মেয়েটি।

নিজের প্রসঙ্গ তো এড়িয়েই গেছ, এই ঝামেলাটা সম্পর্কেও জানতে চাওনি তুমি।

আমার মত মানুষদের অত কৌতূহল নেই।

খানিক তাকিয়ে থাকল মেলিসা, তারপর মৃদু হাসল। বাথানে যাচ্ছ তো?

নড করল মরগান, মেয়েটি নিজের কৌতূহল চেপে রাখায় কৃতজ্ঞ বোধ করছে। ও একটু ভিন্ন ধাতের মানুষ, নিজের সম্পর্কে আলোচনা ওর অপছন্দ। মেলিসা হয়তো তা বুঝতে পেরেছে, কিংবা হতে পারে ভুলও বুঝেছে। নিজের সম্পর্কে যে তোক কিছু জানাতে চায় না, তার জীবনে আপত্তিকর কিছু থাকবেই-এ ধরনের চিন্তা মেয়েটির মাথায় খেলে যাওয়া বিচিত্র কিছু নয়। সেসব ভেবে মাথা ঘামাল না মরগান, ওর সম্পর্কে কে কি মনে করল তা নিয়ে চিন্তা করা ওর ধাতে নেই।

উঠল ওরা। পানীয়ের দাম পরিশোধ করেছে মেলিসা, এ নিয়ে আগ বাড়িয়ে ভদ্রতা দেখাতে যায়নি মরগান। কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সুযোগ দিচ্ছে। ওয়্যাগনের কাছে এসে সোরেলে চাপল ও। চালকের আসনে বসে অপেক্ষা করছিল ক্লীভ অ্যালেন, তার পাশে উঠে বসল মেলিসা। শহর ছাড়িয়ে পুবের ট্রেইল ধরে এগোল ওয়্যাগন। ইতোমধ্যে বডম্যানদের সম্পর্কে অনেক কিছু জেনে ফেলেছে মরগান। মেলিসার বাবা পঞ্চাশোর্ধ্ব এক বুড়ো যে মুক্ত সরল জীবন পছন্দ করে, টেনেসি ছেড়ে তাই এদিকে এসেছে বাপ-বেটি। অল্প সময়ের মধ্যে এখানে মোটামুটি গুছিয়ে নিয়েছে। মিসেস বডম্যান মারা গেছে মেলিসার যখন এগারো চলছিল। বলতে গেলে কৃকের হাতেই বড় হয়েছে মেলিসা। বাপ-মেয়ে আর ক্লীভ, এ তিনজন মিলে ওদের পরিবার।

বামে মোড় নিয়েছে ট্রেইল, হাতের ডানে মাইল খানেক দূরে ক্যাকটাস হিলের ঝাঁপসা দেহ। চিরুনির মত খাঁজকাটা চূড়াগুলো চোখে পড়ছে। ধূলিধূসর পথের দু’পাশে অনাবাদী জমি। পাহাড়শ্রেণী পেরিয়ে আসার পর অবশ্য বদলে গেল পরিবেশ। ডানে বিস্তৃত তৃণভূমি চোখে পড়ল, বাতাসে দুলছে-বড়বড় ঘাস। বাথানের জন্যে আদর্শ জায়গা। মরগান ভেবে পেল না ওখানে কেন বসতি করেনি কেউ। একপাশে খানিকটা উঁচু জমি, লজপোল পাইনের বিশাল ঝাড়ের সামনেই। ওখানে র‍্যাঞ্চ-হাউস তৈরি করলে চমৎকার লাগবে। পেছনে ক্যাকটাস হিলের দৈত্যাকার অবয়ব জায়গাটার সৌন্দর্য বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

ফ্ল্যাগ-বি বাথানে পৌঁছতে দুপুর হয়ে গেল। বিশাল ফটকের পর বিস্তীর্ণ তৃণভূমি, শেষে র‍্যাঞ্চ-হাউস। বাথানটা এখনও প্রাথমিক অবস্থায় রয়েছে বলে অগোছাল লাগছে। অভিজ্ঞ হাতের ছোঁয়া পেলে সেরা হয়ে উঠতে পারে। সবচেয়ে আকর্ষণীয় জিনিস পাহাড়ের কোলে র‍্যাঞ্চ-হাউসের অবস্থান, দূর থেকে চমৎকার লাগে।

সুদর্শন এক বুড়োকে দেখা গেল পোর্চে, মেলিসার সাথে চেহারার মিল আছে। কৌতুকপূর্ণ দৃষ্টিতে মাপছে মরগানকে, ক্ষীণ আগ্রহ প্রকাশ পেল চাহনিতে। ব্যক্তিত্ববান পুরুষ, প্রথম দর্শনে মনে হলো ওর কাছে।

এরপর দৌড়ে বারান্দায় উপস্থিত হলো ছোট্ট একটা ছেলে। মেলিসাকে দেখে স্বর্গীয় হাসিতে উদ্ভাসিত হলো মুখ। ছুটে এসে মেলিসার কোলে জায়গা করে নিল। প্রাণবন্ত আর সজীব লাগছে বাচ্চাটাকে। দেরি করেছ! অভিযোগ করল ছেলেটা

বডম্যান-কন্যা চুমু খেল তাকে। দুঃখিত, শ্যন। এরকম হবে না আর।

ঠিক তো?

বাধ্য মেয়ের মত মাথা ঝাঁকাল মেলিসা।

খুশি হয়ে মায়ের কোল ছাড়ল শ্যন, ছুটে ঢুকে গেল ভেতরে।

বারান্দায় উঠে এসে বাপের সামনে দাঁড়াল মেলিসা, সকালে শহরে ঘটে যাওয়া ঘটনা জানাল।

নির্বিকার মুখে শুনে গেল বাথান মালিক। মেলিসা থামার পর আপনমনে হাসল। ওর কাছে যাওয়াই ঠিক হত, শেষে মন্তব্য করল।

কি বলছ, বাবা! লোকটা আমাকে ধরে নিয়ে যেতে বলেছে, আমি কি ফেরারী? ওর লোক আমার গায়ে হাত তুলেছে…হঠাৎ মরগানের ওপর চোখ পড়তে থেমে গেল মেলিসা। নিজেকে সামলে নিয়ে বাপের সাথে পরিচয় করিয়ে দিল অতিথিকে।

সৌজন্যমূলক আলাপের ক্ষেত্রে যা হয়, বেশিদূর এগোল না। অতিথির মুখে মৃদু অস্বস্তির ছায়া হয়তো দেখে থাকবে মেলিসা, লাঞ্চের প্রসঙ্গ তুলে মরগানকে নিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ল। বাবা তোমাকে পছন্দ করেনি, অস্বস্তিভরা কণ্ঠে বলল ও। কিছু মনে করোনি তো?

না। এটাই স্বাভাবিক।

কি বলতে চেয়েও নিজেকে নিবৃত্ত করে নিল মেয়েটি। শেষে শ্রাগ করে বলল: তবু আজকের ঘটনার জন্যে তোমার কাছে কৃতজ্ঞ আমরা।

পাশাপাশি এগোল মরগান। এসব ছোটখাট ব্যাপারে মাথা ঘামানো ওর ধাতে নেই। স্বয়ং ওর বাবাও মরগানের বাউণ্ডুলে জীবন পছন্দ করে না, তাই অনেক আগে বাড়ি ছেড়ে চলে এসেছে। ফেরে খুব কম, তা-ও জন্মদাত্রীর কারণে। শেষবার গিয়েছিল গত বড়দিনে।

একসাথে লাঞ্চ করল ওরা। কফি আসার পরপরই হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এল সেয়ানে সেয়ানে

ক্লীভ অ্যালেন। উদ্বেগে কুঁচকে গেছে বুড়োর চোখ-মুখ। মেলিসাকে ডেকে নিয়ে বাইরে চলে গেল।

ঠিক দুই মিনিট পর ফিরে এল মেলিসা। ওর শুকনো মুখ আর উৎকণ্ঠা দেখে প্রমাদ গুণল মরগান। জিজ্ঞেস করার ইচ্ছে হলো না, জানে নিজ থেকেই বলবে। মেয়েটা।

ছেড়ে যাওয়া আসনে বসল মেলিসা। দ্বিধা ওর মুখে। এরকম হবে জানলে কিছুতেই এখানে আসতে জোর করতাম না তোমাকে, স্নান, অপরাধী কণ্ঠে বলল। ওরা আসছে, মি. মরগান.. হয়তো জানে এখানেই আছ তুমি।

কিছুটা বুঝতে পারল মরগান, বাকিটা আন্দাজ করে নিল। মেরুদণ্ডে শীতল একটা অনুভূতি হচ্ছে। কোন কারণ নেই, তবু বিপদের আগে ঠিক ঠিক টের পায় ও। আমি চাই না তোমাদের কোন ক্ষতি হোক, ম্যাম, শান্ত, নিষ্কম্প সুরে বলল ও। কারা ওরা?

আলফ্রেড টেনিসনের লোক, শহরে যারা আক্রমণ করেছিল আমাকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *