বিশাল টেবিলে পড়ে থাকা মোহরের ছোট স্তূপের দিকে অবাক হয়ে চেয়ে আছেন মিস্টার ডেভিস ক্রিস্টোফার।

গুপ্তধন তাহলে পেলো অবশেষে বললেন পরিচালক। সব পাওনি, ঠিক, তবে কিছু তো পেয়েছ।

মোট পঁয়তাল্লিশটা, বলল কিশোর। এখানে আছে তিরিশটা, মুসা। আর রবিনের ভাগের। ক্যাপ্টেন ওয়ান-ইয়ারের ধনরাশির তুলনায় কিছুই की।

তবু তো ধন, সোনার ডাবলুন, বললেন মিস্টার ক্রিস্টোফার। এখন বল, কেন মনে হল, লুটের টাকা স্কেলিটন আইল্যান্ডে লুকানো আছে?

সন্দেহটা ঢোকাল স্কেলিটন আইল্যান্ডের ভূত, বলল কিশোর। ওসব কুসংস্কারে বিশ্বাস করি না। শুনেই বুঝলাম, দ্বীপে ভূত দেখা যাওয়ার পেছনে মানুষের কারসাজি রয়েছে। কেউ একজন চায় না, ওই দ্বীপে মানুষ যাতায়াত করুক। তখনই প্রশ্ন জাগল মনে, কেন? মূল্যবান কিছু রয়েছে? ক্যাপ্টেন ওয়ান-ইয়ারের গুপ্তধন? ব্যাপারটা নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছি। এই সময় দ্য হ্যান্ডের নিচের গুহা আবিষ্কার করে বসল পাপালো। মোহর পেল ওখানে। বুঝে গেলাম, স্কেলিটন আইল্যান্ডে ওয়ান-ইয়ারের গুপ্তধন নেই। তাহলে? একসঙ্গে তিনটে কথা এল মনে। প্ৰায় বিশ বছর পরে হঠাৎ দেখা যেতে শুরু করেছে স্যালি ফ্যারিংটনের ভূত, বছর দুই আগে থেকে। ঠিক দুই বছর আগে লুট হয়েছে দশ লক্ষ ডলার। স্কেলিটন আইল্যান্ডের পাশে উপসাগরে ধরা পড়েছে দুই ভাই, ডিক আর বাড ফিশার। ক্যাপ্টেন ওয়ান-ইয়ারের ধরা পড়ার সঙ্গে কোথায় যেন মিল রয়েছে। একটু ভাবতেই বুঝে ফেললাম ব্যাপারটা। ক্যাপ্টেন ওয়ান-ইয়ার মোহর সাগরে ফেলে দেয়নি, লুকিয়ে ফেলেছিল। হ্যান্ডের গুহায়। ফিশাররাও টাকা পানিতে ফেলে দেয়নি, লুকিয়ে ফেলেছে স্কেলিটন আইল্যান্ডের গুহায়। ব্রিটিশ জাহাজের ক্যাপ্টেনকে ফাঁকি দিয়েছিল ওয়ান-ইয়ার, একই কায়দায় পুলিশকে ফাঁকি দিয়েছে ফিশাররা।

চমৎকার! বললেন পরিচালক। আরেকটা প্রশ্ন। ডিক আর বাড তো জেলে, ভূত সাজল কে?

হান্ট গিল্ডার, এটা আমার অনুমান, বলল কিশোর, জেলে দুই ফিশারের সঙ্গে দেখা করত সে। কোনভাবে ওকে নিয়মিত টাকা দেবার বন্দােবস্ত করেছিল দুই ভাই। বিনিময়ে মাঝে মাঝেই দ্বীপে গিয়ে ভূত সেজে জেলেদেরকে দেখা দিত হান্ট। আসল কারণটা নিশ্চয় জানত না, তাহলে টাকাগুলো খুঁজে বের করে নিয়ে চলে যেত।

যেমন যেত গার্ড জিম রিভান, বললেন মিস্টার ক্রিস্টোফার।

হ্যাঁ, মাথা ঝোঁকাল কিশোর। জিম জানত না, দ্বীপেই লুকানো আছে টাকাগুলো। শুধু এটুকু জানত, কোথাও লুকিয়ে রেখেছে দুই ভাই। জেল থেকে বেরিয়ে এসে বের করবে। তার ভাগ তাকে দিয়ে দেবে।

যখন জানল, তার নাকের ডগায়ই রয়েছে টাকাগুলো, হেসে বলল রবিন, কি আফসোসই না করলা

হ্যাঁ, কিশোরের গলায় ক্ষোভ। নিশ্চয় দেখার মত হয়েছিল তার মুখের ভাবা সর্দির জন্যে তো যেতে পারলাম না…

সিনেমা কোম্পানির জিনিসপত্র চুরি করল কে? জিজ্ঞেস করলেন পরিচালক। জিম আসার আগেই তো শুরু হয়েছিল চুরি!

নিশ্চয় হান্ট, বলল কিশোর। চোর হিসেবে বদনাম আছে। ওর এমনিতেই। চুরি কুরতে গিয়ে ধরা পড়লে, ব্যাপারটাকে সাধারণ চুরি হিসেবেই নিত পুলিশ। অন্য কিছু সন্দেহ করত না।

কাজটা অন্যকে দিয়ে করানোর কি দরকার? বললেন পরিচালক। জেল থেকে তো বেরিয়েছে তখন দুভাই। ওরা করলেই পারত? আর এত সব ঝামেলার মধ্যে গেল কেন? চুপচাপ এক রাতে গিয়ে টাকাগুলো বের করে নিয়ে চলে আসতে পারত।

পারত না, বলল কিশোর। আমার ধারণা, হান্ট টাকার গন্ধ পেয়ে গিয়েছিল। দুবছর ভূত সেজেছে সে। অনেক টাকা পেয়েছে দুই ভাইয়ের কাছ থেকে। এত টাকা খামোেকা ব্যয় করেনি। ডিক আর বাড, এটা বুঝবে না, অত বোকা নয় সে। দুই ফিশারের ভয় ছিল, টাকা আনতে গেলে পিছু নেবেই হান্ট, দেখে ফেলবে। তখন তাকে একটা ভাগ দিতে হবে। হান্টের ব্ল্যাকমেলের শিকার হবারও ভয় ছিল ওদের। তাই তো কৌশলে সরাল ওকে।

কি কৌশল? জানতে চাইলেন পরিচালক।

আমরা যাব, কথাটা ছড়িয়ে পড়ল শহরে। জেনে গেল ডিক আর বাড। বুঝল, হান্টকে সরানোর এই সুযোগ। আমাদেরকে কিডন্যাপ করে। দ্য হ্যান্ডে রেখে আসতে ওকে পাঠাল ওরা। নিশ্চয় অনেক টাকা পেয়েছে, বোকার মত কাজটা করে বসল। হান্ট। ফিরে এসে সব কথা জানালাম আমরা পুলিশকে। পিছু লাগল পুলিশ। শহর ছেড়ে পালাতে বাধ্য হল হান্ট। থামল কিশোর। তারপর আবার বলে চলল, হান্ট চলে গেল। সিনেমা কোম্পানি থেকেই গেল দ্বীপে। চুরি বন্ধ করা চলবে না। জিমকে ধরল দুই ভাই। সুন্দর সুযোগ। কোম্পানি একজন গার্ড চায়। জিম হলে খুব ভাল হবে। নিজেই চাকরির দরখাস্ত নিয়ে গেল জিম। হয়ে গেল চাকরি। ঘরের ইদুর বেড়া কাটতে লাগল। দ্বীপটার আশেপাশে খুব বেশি ঘোরাফেরা করে পাপালো। গুপ্তধন খুঁজে বেড়ায়। যদি কখনও গুহায় ঢুকে টাকার বাণ্ডিল দেখে ফেলে, এই ভয়ে তার ওদিকে যাওয়া বন্ধ করতে চাইল দুই ফিশার। গুজব রটিয়ে দিল, পাপালো চোর। সিনেমা কোম্পানির জিনিসপত্র সে-ই চুরি করে। তাকে দেখলেই লাঠি নিয়ে তাড়া করে জিম। এই সময় আমরা গিয়ে হাজির হলাম। জোর পেল পাপালো। শুধু গুজব রটিয়ে ওকে আর ঠেকানো যাবে না, বুঝতে পারল দুই ভাই। সময় মত জিম পেয়ে গেল পাপালোর ছুরিটা। জানাল দুই ডাকাতকে। সুযোগটা লুফে নিল ওরা। লেন্স চুরি করােল জিমকে দিয়ে, ট্রেলারের জানালা ভাঙল, মেঝেতে ছুরিটা ফেলে রাখা হল, লেন্সগুলো নিয়ে গিয়ে পাপালোর বিছানার নিচে রেখে দিয়ে এল ডিক কিংবা বাড। পরের দিন আরেকটা সুযোগ পেয়ে গেল ডিক। দ্য হ্যান্ডের দিকে গিয়েছে পাপালো, জানল কোনভাবে। পিছু নিল। ভেঙে দিয়ে এল নৌকাটা। ব্যস, একেবারে নিশ্চিন্ত হয়ে গেল। কোন কারণে যদি পাপালোকে ছেড়েও দেয় পুলিশ, ও আর গুপ্তধন খুঁজতে যেতে পারবে না। কিন্তু বড় একরোখা পাপালো হারকুস, ওকে শেষ অবধি ঠেকাতে পারল না। দুই ফিশার। ওরই জন্যে ধরা পড়েছে ওরা, প্ৰাণে বেঁচেছে মুসা আর রবিন।

হাঁ আস্তে মাথা ঝাঁকালেন মিস্টার ক্রিস্টোফার। আচ্ছা, কিছু করে এসেছি। ওর জন্যে? সাহায্যের কথা বলছি।

আমাদের কিছু করতে হয়নি, কথা বলল মুসা। নিজের ব্যবস্থা নিজেই করে নিয়েছে পাপু।

কি?

গুপ্তধন শিকারের ওপর যে ছবিটা করা হয়েছে, তাতে মূল ভূমিকা তার দেখানো হয়েছে। দ্য হ্যান্ডের গুহা থেকে ড়ুবে ড়ুবে মোহর তুলে আনছে সে, এই দৃশ্যের ছবিও তোলা হয়েছে। মিস্টার জন নেবারের সঙ্গে আলোচনা করে বেশ মোটা অংকের পারিশ্রমিক দিয়েছে তাকে বাবা। ট্রেজার-হান্টার ছবিতে অভিনয়ের জন্যে।

খুব ভাল, খুব ভাল, খুশি হলেন পরিচালক। আর কিছু?

পরিবহন কোম্পানির দশ লাখ ডলার ফিরে পাওয়ার ব্যাপারে পাপালোর কৃতিত্বই বেশি, বলল কিশোর। তাকে একটা পুরস্কার দিয়েছে কোম্পানি। পঁচিশ হাজার ডলার।

বাহ্, বেশ বড় পুরস্কার তো! বললেন পরিচালক।

বাবাকে নিয়ে দেশে ফিরে যাবে পাপালো, বলল কিশোর। ভালভাবে চিকিৎসা করবে। একটা বোট কিনে মাছের ব্যবসা শুরু করবে। আশা পূরণ হয়েছে তার।

হুমম, মাথা ঝোঁকালেন পরিচালক। তোমাদের এই অ্যাডভেঞ্চার কাহিনী নিয়ে খুব ভাল একটা ছবি হবে। ভাবছি, পুরোটাই শুটিং করব। স্কেলিটন আইল্যান্ড আর আশেপাশের দ্বীপগুলোতে। যেখানে যা যা যেভাবে ঘটেছে, ঠিক তেমনি ভাবে। পাপালোর চরিত্রটা তাকে দিয়েই অভিনয় করালে কেমন হয়?

খুব ভাল হয়। একই সঙ্গে বলে উঠল তিন গোয়েন্দা।

ঘড়ি দেখলেন পরিচালক। ঠিক আছে। নতুন কোন রহস্যের খোঁজ পেলে জানাব।

ইঙ্গিতটা বুঝল তিন কিশোর। উঠে দাঁড়াল। মোহরগুলো টেনে নিলো মুসা। বেছে বেছে একটা ভাল মোহর-যেটা কম ক্ষয় হয়েছে, তুলে নিয়ে বাড়িয়ে ধরল। এটা আপনাকে দিলাম, স্যার। আপনার সংগ্রহে রেখে দেবেন।

থ্যাংক ইউ, মাই বয়, মোহরটা নিতে নিতে বললেন পরিচালক।

ঘর থেকে বেরিয়ে গেল তিন গোয়েন্দা।

হাতের তালুতে নিয়ে মোহরটার দিকে চেয়ে রইলেন মিস্টার ক্রিস্টোফার। বিড়বিড় করে বললেন, সত্যিকারের জলদস্যুর গুপ্তধন! হাসলেন আপন মনেই। দারুণ ছেলেগুলো কী সুন্দর সুন্দর কাহিনীর জন্ম দিচ্ছে ভাবছি, এরপর কি আসাইনমেন্ট  দেয়া যায় তিন গোয়েন্দাকে!

Share This