১৯. দ্বীপের দক্ষিণ তীর ঘেঁষে চলা শুরু হলো

পরদিন, পহেলা নভেম্বর সকাল থেকেই দ্বীপের দক্ষিণ তীর ঘেঁষে চলা শুরু হলো।  ঠিক হলো, দক্ষিণ তীরে জাহাজডুবির চিহ্ন খুঁজে রাতের আগেই মার্সি নদী পেরিয়ে গ্রানাইট হাউসে পৌঁছতে হবে। নৌকোটা যেখানে আছে সেখানেই থাকুক দিন কয়েক।

নৌকোটা নিরাপদেই থাকবে ওখানে, কি বলো? পেনক্র্যাফটকে উদ্দেশ করে বললেন স্পিলেট।

কি করে বলি, বলল পেনক্র্যাফট, কচ্ছপের ঘটনাটা মনে নেই? আসলে জোয়ারের পানিতে, উল্টে গিয়ে ভেগেছিল কচ্ছপটা।

আমার তা মনে হয় না, স্বগতোক্তি করলেন ক্যাপ্টেন, অতদূরে জোয়ারের পানি আসতে পারে না।

তা না হয় হলো, কিন্তু অত ঘূরে গ্রানাইট হাউসে পৌঁছতে হলে নদী পেরোব কি করে? জিজ্ঞেস করল নেব।

শুধু কয়েক টান তামাক খেয়ে নিতে পারলে ও নদী সাঁতরেই পেরিয়ে যেতে পারতাম আমি, বলল পেনক্র্যাফট।

প্রায় কুড়ি মাইল পথ পেরিয়ে আসার পরও জাহাজডুবির কোন চিহ্ন চোখে পড়ল না। দুপুর হয়ে গেছে তখন। খাওয়াটা সেরে নিয়ে আবার চলা শুরু হলো।  তিনটে নাগাদ একটা শান্ত হ্রদের কাছে পৌঁছল ওরা। প্রণালীর আকারে সরু হয়ে এসে হ্রদে পড়েছে সাগরের পানি। চারদিকে পাহাড় ঘেরা ঠিক যেন একটা ছোট্ট নিরিবিলি বন্দর। টেলিস্কোপ চোখে লাগিয়ে হ্রদের বহু দূর পর্যন্ত দেখলেন ক্যাপ্টেন।  দেখতে দেখতে ক্লান্ত হয়ে গেল চোখ। কিন্তু ভাঙা জাহাজ বা জীবন্ত মানুষের কোন চিহ্নই চোখে পড়ল না। নিশ্চিন্ত হলেন সকলে পেকারিটাকে যে-ই গুলি করুক না কেন, সে আর এখন এ দ্বীপে নেই। চলে গেছে দ্বীপ ছেড়ে।

এমন সময় বনের ভেতর কুকুরের ঘেউ ঘেউ শোনা গেল। চমকে উঠে চারদিকে চাইল সবাই। টপ নেই। তবে কি এই চেঁচাচ্ছে? দৌড়ে বনের ভেতর গিয়ে ঢুকল ওরা।  টপই ডাকছে। মুখে একটা কাপড়ের টুকরো। একটা দেবদারু গাছের গোড়ায় দাঁড়িয়ে আছে। টপ ওদের দেখে কাপড়ের টুকরোটা মুখ থেকে ফেলে দিয়ে উপরের দিকে চেয়ে আবার ঘেউ ঘেউ করে উঠল। টপের দৃষ্টি অনুসরণ করে উপরের দিকে চাইল সবাই। পরক্ষণেই চেঁচিয়ে উঠল পেনক্র্যাফট, ওই তো, ওই তো জাহাজডুবির চিহ্ন।

বিরাট একটা সাদা কাপড় ঝুলছে গাছের মাথায়। ওরই অংশ হয়তো ছিড়ে মাটিতে পড়ে ছিল। তাই কুড়িয়ে পেয়েছে টপ।

ওটা জাহাজের পাল নয়, পেনক্র্যাফট, বলল স্পিলেট, এটা আমাদের বেলুনের ধ্বংসাবশেষ।

বেলুনটা দেখে খুশি হলো সবাই। সবার জন্যেই পোশাক বানানো যাবে এটা দিয়ে। তর তর করে গাছে উঠে গেল হার্বার্ট, পেনক্র্যাফট আর নেব। ঘণ্টা দুয়েক পরিশ্রমের পর দড়িদড়ার জট ছাড়িয়ে প্রায় আস্ত বেলুনটাই মাটিতে নামানো হলো।

জীবনে আর কোনদিন বেলুনে চড়ছি না। ওটা দিয়ে পাল বানাব আমি, একটা বড় নৌকোর পাল, বলল পেনক্র্যাফট।

অতবড় বেলুনটাকে বয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। তাই পাহাড়ের গুহায় একটা নিরাপদ জায়গায় রেখে দেয়া হলো ওটা। পরে এসে নিয়ে যাওয়া যাবে। এসব করতে বেলা গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়ে গেল  আজ আর গ্রানাইট হাউসের বাইরে রাত কাটাবে না ভেবে রওনা দিল অভিযাত্রীরা। যাবার আগে জায়গাটার নাম দিয়ে গেল, পোর্ট বেলুন।

সিন্দুকটা যেখানে পাওয়া গিয়েছিল সেই জায়গাটার নাম রাখা হয়েছিল ফ্লোটসাম পয়েন্ট। ওখানটায় যখন পৌঁছল ওরা, দিনের আলো নিভে গিয়ে আঁধার নেমেছে তখন দ্বীপের বুকে। মার্সি নদীর প্রথম বাঁকটার কাছে পৌঁছতে প্রায় এগারোটা বেজে গেল। প্রায় আশি ফুট চওড়া এখানে নদী। কাছে এসেই ফিস ফিস করে বলল হার্বার্ট, কি যেন ভাসছে পানিতে।

তাই তো, ফিস ফিস করে শব্দটা উচ্চারণ করেই প্রায় চেঁচিয়ে উঠল পেনক্র্যাফট, আরে ওটা তো আমাদের নৌকোটা! এখানে এল কি করে?

সম্পূর্ণ ভূতুড়ে কান্ড! নৌকোটাকে কাছে টেনে আনার পর দড়ি পরীক্ষা করে দেখলেন ক্যাপ্টেন। মনে হলো পাথরে ঘষা খেয়ে ছিড়ে গেছে দড়ি।

নৌকোয় করেই নদীটা পার হলো সবাই। যদিও ভেলা বানিয়ে নদী পার হতে হবে ভেবে রেখেছিল ওরা, কিন্তু রহস্যময় এই ঘটনাটা সবার মন ভার করে রাখল।

চিমনির কাছে নৌকোটাকে তুলে রেখে গ্রানাইট হাউসের দিকে চলতে শুরু করল ওরা! বাড়ির কাছাকাছি আসতেই আবার চেঁচাতে শুরু করল টপ। টপের চেঁচানোর কারণ বোঝা গেল আরও একটু এগোবার পর। যাবার সময় গ্রানাইট হাউসে ওঠার ঝুলন্ত সিঁড়িটা যথাস্থানে ঝুলিয়ে রেখে গেছে ওরা। এখন আর নেই সিঁড়িটা।

অন্ধকারে ভালমত দেখা যাচ্ছে না। আশেপাশে পড়ে যায়নি তো? মশাল জ্বেলে অনেক খোঁজা হলো, কিন্তু পাওয়া গেল না সিঁড়ি। এক্কেবারে গায়েব।

পেকারিটাকে গুলি করেছিলেন যিনি সেই হারামখোর ভদ্রলোকই আমাদের বাড়ি দখল করেছেন হয়তো? ক্ষোভে বুজে এল স্পিলেটের গলার স্বর।

গালাগালি শুরু করে দিল পেনক্র্যাফট। একবার মনে হলো হালকা গলায় কে যেন হেসে উঠল গ্রানাইট হাউসের ভেতর। নিরুপায় হয়ে সে রাতটা চিমনিতে কাটাল সবাই। সারারাত গ্র্যানাইট হাউসের সামনে পাহারায় থাকল টপ।

ভোর হতেই ছুটে এল ওরা গ্রানাইট হাউসের কাছে। সিঁড়ির ওপরের অংশটা যেমন ঝুলছিল তেমনি আছে। নিচের অংশটা কেউ তুলে রেখেছে চাতালে। জানালাগুলো বন্ধই আছে, তবে দরজাটা খোলা।

একটা বুদ্ধি এল হার্বার্টের মাথায়। দড়ির মাথায় তীর বেঁধে সিঁড়ির নিচের ধাপ লক্ষ্য করে ছুঁড়ল সে। বার কয়েক চেষ্টার পর সিঁড়ির ধাপ গলে নিচের দিকে পড়ল তীরটা। এবার নিচের অংশ ঢিল দিলেই সড় সড় করে নেমে আসবে তীর বাঁধা দড়ির মাথা। দুটো মাথা এক সাথে হয়ে গেলেই টেনে নামিয়ে নেয়া যাবে সিঁড়ি। তাই করতে যাবে ওরা, এমন সময় দরজা দিয়ে বিদ্যুৎ বেগে বেরিয়ে এল একটা হাত। একটানে আরও ওপরে তুলে নিল সিঁড়িটা। তীরটা খুলে নিয়ে নিচে ছুঁড়ে দিল।

সাথে সাথেই প্রচন্ড রাগে চেঁচিয়ে উঠল পেনক্র্যাফট, গুলি করে খুলি ফুটো করে দেব, শুয়োরের বাচ্চা।

কাকে গুলি করবে? জিজ্ঞেস করল নেব।

ওই হারামজাদাটাকে, দেখলে না হাতটা?

এটা মানুষের হাত না।

অ্যাঁ, তাইতো! হঠাৎ মনে হলো পেনক্র্যাফটের, মিশমিশে কালো লোমশ হাতটা মানুষের হতে পারে না  মিন মিন করে জিজ্ঞেস করল, কি ওটা?

যতদূর মনে হয় ওরাং ওটাং; মানে শিম্পাঞ্জী।

হঠাৎ এক ঝটকায় খুলে গেল দুটো জানালা। এক সাথে উঁকি মারল বেশ কটা মুখ। দাঁত ভেংচাতে শুরু করল অভিযাত্রীদের দিকে চেয়ে। ওরাং ওটাংই।

এক আজব লড়াই শুরু হলো ওরাং ওটাং আর মানুষের মধ্যে। আবার তীর বাধা দড়িটা ছুঁড়ল হার্বার্ট। সিঁড়ির ওপরের ধাপ দিয়ে গলে গেল তীরটা। দ্রুত হাতে ওই মাথাটা নামিয়ে আনল সে। এবার দড়ির মাথা দুটো ধরে নিচের দিকে টানতে লাগল সবাই মিলে। নেমে যাচ্ছে দেখে সিঁড়ির ওপরের অংশ ধরে টেনে রাখল শিম্পাঞ্জীর দল। টানাটানিতে পট করে ছিড়ে গেল দড়ি। উপায়ান্তর না দেখে গুলি চালানো শুরু করল ওরা এবার। গুলি খেয়ে নিচে পড়ে গেল একটা জানোয়ার। বুঝে গেল ওরা গুলি কি জিনিস।  চকিতে ঘরের ভেতর অদৃশ্য হয়ে গেল শিম্পাঞ্জীর দল!

গ্রানাইট হাউসের কাছ থেকে সরে গেল অভিযাত্রীরা  লুকিয়ে রইল পাথরের আড়ালে। উদ্দেশ্য—শিম্পাঞ্জীরা ভাববে হতাশ হয়ে চলে গেছে ঘরের মালিকরা, কাজেই বেরিয়ে আসবে বাইরে। কিন্তু অত বোকা না মানুষের পূর্ব পুরুষ। সমগোত্রেরই গরিলাদের মতন চট করে রাগে না ওরা। বোনদের মত গর্দভও না। ওদের ধৈর্যের কাছে হার মানতে হলো অভিযাত্রীদের।

বিরক্ত হয়ে বেরিয়ে এল অভিযাত্রীরা। গাঁইতি শাবল দিয়ে হ্রদের দিকের সুড়ঙ্গ মুখ ভেঙেই ঢুকতে হবে ভেতরে! সেদিকে রওনা হতে যাবে এমন সময় চেঁচিয়ে উঠল টপ।

টপের ডাকে উপরের দিকে চাইল অভিযাত্রীরা  আশ্চর্য! হঠাৎ কেন যেন ভয় পেয়ে গেছে ওরাং ওটাংয়ের দল। এ জানালা ও জানালায় ছুটোছুটি করে বেড়াচ্ছে ওগুলো। সুযোগ পেয়ে গুলি চালাতে শুরু করল অভিযাত্রীরা। কয়েকটা ওরাং ওটাং নিচে পড়ে যেতেই বাকিগুলো বেরিয়ে এসে ছুট লাগাল। অদৃশ্য হয়ে গেল পাহাড়ের আড়ালে।

আরও বিস্ময় বাকি ছিল তখনও। ওরাং ওটাংগুলো চলে যেতেই সড়াৎ করে নিচে এসে পড়ল সিঁড়িটা। মনে হলো কেউ যেন নিচে ঠেলে ফেলে দিল ওটা।

তাড়াতাড়ি সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠল সবাই। উঠেই থমকে দাঁড়াল। ঘরের ভেতর দাঁড়িয়ে আছে বিশাল একটা ওরাং ওটাং। ভেতরের দিকে কোথাও হয়তো বসেছিল এতক্ষণ! বেরিয়ে যাবার সময় পায়নি। কুড়াল হাতে ছুটে গেল নেব। খুনই করে ফেলবে সে জানোয়ারটাকে। বাধা দিলেন ক্যাপ্টেন, মের না ওটাকে, নেব। পোষ মানিয়ে ট্রেনিং দিয়ে কাজে লাগাতে পারব।

কিন্তু ওটাকে কাবু করতে যথেষ্ট বেগ পেতে হলো। বহু চেষ্টায় শেষ পর্যন্ত ছফুট লম্বা সাঘাতিক শক্তিশালী প্রাণীটাকে ধরে ফেলল অভিযাত্রীরা। ওরাং ওটাংটার হাত-পা শক্ত করে বাঁধা হলো দড়ি দিয়ে।

ওর একটা নাম রেখে দিলেই তো হয়, বলল পেনক্র্যাফট, কি নাম রাখা যায় ওর, অ্যাঁ? জাপ রাখা যাক কি বলেন, ক্যাপ্টেন? মাস্টার জাপ?

সম্মতি জানাল সবাই ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *