১৯. জিম কোথায় আছে আমি জানি

জিম কোথায় আছে আমি জানি, ফেরার পথে বলল টম। রান্নাঘরের ওপাশেই যে-ছোট্ট কুঁড়েটা, ওখানে। কেন, লক্ষ্য করনি তুমি, আমরা যখন ডিনার খাচ্ছিলাম, একটা চাকর খাবার নিয়ে ওদিকে গেল?

হ্যাঁ, দেখেছি। তবে ভেবেছিলাম, কোন কুকুরের খাবার হবে হয়ত।

উহুঁ, কুকুরের না, হাক।

কেন?

কারণ, ওর ভেতর ফলও ছিল। কুকুরকে কেউ ফল খেতে দেয় না, নাকি?

তা-ই, টম।

তারপর, ধর, লোকটা যখন ওই ঘরে গেল তখন তালা খুলে ভেতরে ঢুকল, আবার বেরিয়ে এসে তালা লাগাল। খাওয়া সেরে আমরা টেবিল থেকে ওঠার সময়ে চাবিটা সে খালুকে ফেরত দেয়। ফল থেকে বোঝা যাচ্ছে, ওই ঘরে মানুষ আছে, আর তালা থেকে বোঝাচ্ছে, সে বন্দি হয়ে আছে। এবং আমি নিশ্চিত লোকটা আর কেউ নয়-জিম।

তাহলে তো, টম, শুতে যাবার আগে এক চক্কর দেখে আসতে হয় কুঁড়েটা, বললাম আমি।

কুঁড়ের চারপাশ ঘুরে দেখে এলাম আমরা। পেছন দিকে একটা ছোট্ট ঘুলঘুলি আছে। একটা মোটা তক্তা তেরছাভাবে ওটার ওপর মারা।

ওই কাঠটা খসাতে পারলেই জিম বেরোতে পারবে, টমকে বললাম আমি। তারপর আগে যেমন করেছি, তেমনি করেই রাতে চলব আমরা আর দিনে পালিয়ে থাকব। কী বলো?

মন্দ না, বলল টম। ঠিক যেন ইদুর-বেড়াল লড়াইয়ের মত। জটিলতা একটুও নেই। পানসে। বুঝলে, হাক, একটা সাবানের দোকান ভেঙে চুরি করলে যতটুকু হইচই হয়, এতে তাও হবে না। নাহ, আর একটু জটিল কিছু বের করতে হবে।

বেড়া কেটে বের করলে কেমন হয়? আমি তো সেবার খুন হবার আগে ওইভাবেই বেরিয়েছিলাম।

হ্যাঁ, এটা চলতে পারে, সায় দিল টম। এতে রহস্য আছে, কষ্টকরও বটে। কিন্তু এর চেয়েও কঠিন কিছু চাইছি আমি; এমন, যাতে বেশি সময় লাগে।

কুঁড়েটার পাশেই একটা বারান্দামত লম্বা ঘর। বন্ধ দরজায় তালা ঝুলছে। টম সাবান জ্বাল দেয়ার কেতলিটার কাছে গেল। চারদিক খুঁজে দেখল। তারপর ঢাকনি তোলার ছেনিটা নিয়ে এসে বাড়ি মেরে তালা খুলে ফেলল। ঘরের ভেতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলাম আমরা। দেশলাই জ্বেলে ভেতরটায় দ্রুত চোখ বোলালাম। বাগান করার সাজসরঞ্জাম সব-কোদাল, খুরপি, লাঙ্গল ইত্যাদি। ওগুলো দেখে টমের মাথায় প্ল্যান খেলে গেল।

পেয়েছি, হাক। গর্ত খুঁড়ে ওকে বের করব আমরা, বলল ও। এক হপ্তা সময় লাগবে এতে।

এরপর বাসায় ফিরে গেলাম আমরা। আমি খিড়কিপথে ভেতরে ঢুকলাম। ওই দরজাটা খোলাই থাকে সবসময়। একটা দড়ি আছে, টানলেই বাটের হুঁড়কোটি খুলে যায়। কিন্তু টমের কাছে ওভাবে যাওয়াটা নেহাতই মামুলি মনে হল। পাঁচবারের চেষ্টায় ল্যাম্পপোস্ট বেয়ে জানলা দিয়ে ভেতরে ঢুকল সে।

পরদিন খুব সকালে বিছানা ছাড়লাম আমরা। উদ্দেশ্য, বাইরে গিয়ে কুকুরগুলোর সাথে ভাব জমাব। ন্যাটের সাথেও খাতির করতে হবে। ও-ই খাবার দেয় জিমকে।

ন্যাট লোকটা বেশ হাসিখুশি। ভূত-প্রেতে তার দারুণ ভয়। তাই ভূত তাড়াবার জন্যে মাথার চুলে ঝুঁটি বেঁধেছে। রোজই নাকি সে আজেবাজে স্বপ্ন দেখে, জানাল। অদ্ভুত সব শব্দও শোনে।

কার খাবার? ওর হাতের থালা দেখিয়ে টম শুধাল। একসারি ঝকঝকে দাঁত দেখা গেল। দেখবেন, চলেন, ন্যাট বলল।

আমার যাবার ইচ্ছে ছিল না, জিম আমাদের দেখলেই চিনবে। তাতে ঝামেলা বাড়তে পারে আরও। কিন্তু টম যাওয়ার জন্যে একপায়ে খাড়া, অগত্যা আমাকেও যেতে হল।

যা ভেবেছি তা-ই, আমাদের দেখেই চেঁচিয়ে উঠল জিম, আরে, হাক! ওটা কে সঙ্গে, মাস্টার টম না?

ওমা! ন্যাটের চোখ কপালে উঠল। এ ব্যাটা আপনাদের চেনে?

কী বলব, বুঝে উঠতে পারলাম না আমি। কিন্তু টম ঘড়েল। তাজ্জব হওয়ার ভান করল, বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকাল ন্যাটের দিকে।

কার কথা বলছ? কে চেনে আমাদের? টম প্রশ্ন করল, ওকে।

কেন? এই পলাতক নিগ্রোটা।

কই, না। না তো।

তবে যে আপনাদের নাম ধরে ডাকল?

যেন হতবুদ্ধি হয়ে গেছে এমন ভাব করল টম। তুমি তো ভারি অদ্ভুত কথা বলছ হে, আস্তে আস্তে বলল ও। কখন ডাকল? এ লোক তো মুখই খোলেনি। আমার দিকে তাকাল টম। তুমি কিছু শুনেছ, হাক? জিজ্ঞেস করল।

না, আমি বললাম।

এবার জিমকে আপাদমস্তক এমন ভাবে মাপল টম, যেন জীবনে এই প্রথম দেখছে। তারপর জিজ্ঞেস করল, কিছু বলেছ তুমি? এর আগে কখনও আমাদের দেখেছ?

না, স্যার। দেখিনি, স্যার।

টম এবার ওই বাড়ির চাকরটার দিকে ঘুরল। তোমার মাথা ঠিক আছে তো, ন্যাট? বলল ও।

সব ওই ভূত-পেত্নীর কাণ্ড, স্যার। দোহাই আপনাদের, মালিককে বলবেন না এসব। উনি শুনলে বকবেন। ভূত-পেত্নীতে বিশ্বাস করেন না মালিক।

ন্যাটকে একটা তামার পয়সা দিল টম। ওকে আশ্বস্ত করল কাউকে কিছু বলবে না। পয়সাটা ভাল করে দেখার জন্যে ন্যাট দরজার কাছে গেল, দাঁতে কেটে পরখ কল আসল না নকল। আর সেই ফাঁকে জিমকে ফিসফিস করে টম বলল, আমাদের না-চেনার ভান করবে। রাতে কেউ গর্ত খুঁড়ছে টের পেলে বুঝবে আমরা। জিম, আমরা তোমাকে মুক্ত করার চেষ্টা করছি।

উত্তেজনায় ছটফট করছি আমরা, কখন মাটি খুঁড়ব আর কখনই-বা বের করব জিমকে। কিন্তু হঠাৎ করেই উল্টো সুর প্রল টম।

নাহ্ হাক, সব যেন বড় বেশি সাদামাঠা হয়ে যাচ্ছে, বলল। কোন পাহারাদার নেই যে তাকে ওষুধ খাইয়ে ঘুম পাড়াব। কুকুরগুলোও আমাদের চেনে, চিল্লাবে না। অথচ ওদেরও ঘুমের বড়ি দেয়া দরকার। তারপর জিমের কথাই ধর। দশফুট শেকল দিয়ে একটা চৌকির পায়ার সাথে বাধা। পায়াটা তুলে শেকল বের করলেই হল। খালুও আমার নেহাত সোজা মানুষ, চাকরের হাতে চাবি পাঠিয়ে দেয়। ফলে কষ্টের কিছুই দেখছি না, হাক। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল টম, তারপর উফু স্বরে বলল, না আছে তো কী হল, মাথা খাটিয়ে বের করে ফেলব একটা কিছু।

টম এরপর রাজ্যের ঝামেলা হাজির করল। বারবার বলল, পালানোটা বইয়ে যেমন লেখা থাকে সে-রকম হতে হবে। চালাঘর থেকে কুঁড়ে পর্যন্ত সুরঙ্গ খোঁড়ার বেলায়, বলল ও, চাকু ব্যবহার করতে হবে। প্রথমে তা-ই করলাম, কিন্তু শিগগিরই ব্যথা ধরে গেল হাতে। কাজও এগুলো অল্প। তখন বাধ্য হয়ে গাইতিশাবল তুলে নিলাম। এরপর পানির জন্যে একগাছা দড়ির মই, লেখার জন্যে একটা মোমবাতি আর কাগজ হিসেবে ব্যবহারের জন্যে একটা টিনের থালা যোগাড় করতে বলল টম। জিম কালি কোথায় পাবে জিজ্ঞেস করায় ও জানাল, গায়ের রক্ত দিয়ে লিখবে। এগুলো সব আমার কাছে ফালতু ব্যাপার মনে হল। কিন্তু টম গো ধরে বসে রইল, কারণ ও যেসব বই পড়েছে তাতে নাকি এ ধরনের কথাই লেখা আছে।

দড়ি কোথায় পাব? জিজ্ঞেস করলাম আমি।

খুঁজে-পেতে দেখ, টমের উত্তর।

এক কাজ করলে কেমন হয়, বললাম, স্যালিখালা যখন রোদে কাপড় শুকোতে দেয়, তখন না হয় তার একটা চাদর ধার করি। মই বানান যাবে।

কর। এই সাথে আরও একটা পরিকল্পনা মাথায় ঢুকিয়ে দিল টম। একটা শার্টও আনবে, বলল ও।

শার্ট দিয়ে কী হবে? জিমকে দেব। ডায়েরি লিখবে। ডায়েরি না হাতি-ও তো লিখতেই জানে না। ধরে নাও জানে।

পরদিন সকালে চাদর আর শার্ট ধার করলাম আমি। টম অবশ্য বলল এটা ধার নয়, চুরি। তবে যেহেতু আমরা একজন বন্দির প্রতিনিধি, এবং বন্দিরা জিনিস কোথেকে আসবে তার পরোয়া করে না, সুতরাং এই চুরি জায়েজ।

ওদিকে টমও একটা টিন আর চামচ চুরি করে এনেছে। একটা পিতলের মোমদানিও এনেছে সে, ওটা দিয়ে কলম তৈরি করে দেবে জিমকে। মোম এনেছে ছটা। সেরাতে দশটার পর থাম বেয়ে নিচে নামলাম আমরা। একটা মোম সঙ্গে নিলাম, জিমের জানলায় কান পেতে বুঝলাম নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছে। মোমটা ঘুলঘুলি দিয়ে ভেতরে ফেললাম। কিন্তু ও জাগল না। তারপর আমরা ঘূর্ণিবেগে গাইতি-শাবল চালালাম। আড়াই ঘণ্টা বাদে কাজ শেষ হল। সুরঙ্গের ভেতর দিয়ে বুকে হেঁটে জিমের ঘরে গেলাম। হাতড়ে হাতড়ে ধরালাম মোমটা। আমাদের দেখে খুশিতে জিম কেঁদে ফেলল।

টম জানাল, পিঠার মধ্যে ভরে ওর কাছে দড়ির মই পাঠাব আমরা। ন্যাট নিয়ে আসবে সেটা। ও যাতে কোন সন্দেহ না করে তার ব্যবস্থাও করা হবে।

পরদিন ভোরে ন্যাটের সাথে জিমের ঘরে গেলাম আমরা। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ওর খাওয়া দেখছি, হঠাৎ ওর খাটের তলা থেকে একজোড়া কুকুর বেরিয়ে এল। তারপর একে একে এগারোটা এসে জড়ো হল। হায় ঈশ্বর! রাতে চালাঘরের দরজা বন্ধ করিনি, মনে পড়ল আমার। নিগ্রো ন্যাট একবার শুধু চেঁচিয়ে উঠল, তারপর সটান মাটিতে শুয়ে গোঙাতে লাগল ভয়ে।

টম দরজাটা ফাঁক করল একটু, জিমের খাবার থেকে এক খন্ড মাংস ছুড়ে দিল বাইরে। মাংসের লোভে কুকুরগুলো বাইরে যেতেই ঝট করে দরজাটা টেনে দিয়ে সে-ও বেরিয়ে গেল। একটু বাদে ফিরে এল আবার। চালাঘরের দরজা বন্ধ করে এসেছে, আন্দাজ করলাম আমি।

পরে ন্যাটকে বলল টম, দ্যাখ, বাপু, আমার মনে হচ্ছে পেত্নীগুলোর পেটে দানাপানি পড়েনি অনেক দিন, তাই ওরা টমের খাওয়ার সময় আসছে বারবার। তুমি এক কাজ কর, ডাইনী পিঠে তৈরি করে দাও ওদের।

কীভাবে বানাব, মাস্টার সিড? জিজ্ঞেস করল ন্যাট। আমি তো বানাতে জানি না।

ঠিক আছে, আমি বানিয়ে দেব, টম আশ্বস্ত করল ওকে। তবে খুব সাবধান, বানানোর সময় পেছন ফিরে থাকবে তুমি। আর জিম যখন ওটা নেবে তখন মুখ ঘুরিয়ে রাখবে। দেখলে কিন্তু কাজ হবে না। ডাইনীরা আসতেই থাকবে।

আচ্ছা, মাস্টার সিড।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *