হ্যারি প্রাইস আর রড মিলার তো বটেই, মুসা রবিন এমনকি হ্যানসনও অবাক হয়ে গেছে।

কিন্তু… শুরু করেই থেমে গেল মুসা।

বুঝতে পারলে না? মুসার দিকে চেয়ে বলল কিশোর। মেয়েমানুষের পোশাক আর উইগ পরেছিল ওরা। আমাকে বাঁধার সময় ছয়ে দেখেছিলাম। তখনই বুঝেছি, পুরুষের বুট। বুঝলাম, ছদ্মবেশ ধরেছে। পাঁচজনকে একবারও একসঙ্গে দেখিনি। তারমানে, দুজনেই পাঁচজনের অভিনয় করেছে। এক কুমিরের ছানা সাতবার দেখানোর মত, অনেকটা।

তারমানে… দুই আরব, দুই মহিলা আর এক আলখেল্লাঅলা, সব ওই দুজনেরই কাণ্ড! তাজ্জব হয়ে গেছে মুসা।

ঠিকই বলেছে ও, কিশোরের আগেই জবাব দিল হ্যারি প্রাইস। তোমাদের ভয় দেখাতে বার বার চেহারা বদলেছি। তবে, ক্ষতি করার কোন ইচ্ছে ছিল না। আমাদের। বাঁধন খুলে দেবার জন্যেই আবার ফিরে গিয়েছিলাম। কিন্তু তোমাদের বন্ধুরা দেখে ফেলল। তাড়া খেয়ে ফিরে এসেছি।

আমরা খুনী নই, বলল বেঁটে লোকটা, রড মিলার। স্মাগলারও না। ভুতও না। যা করেছি, সব তোমাদেরকে ভয় পাওয়ানোর জন্যে। মুখ টিপে হাসল সে।

তবে আমি খুনী, গম্ভীর দেখাচ্ছে প্রাইসকে। জন ফিলবিকে আমিই খুন করেছি।

হাঁ হ্যাঁ, ঠিক, এমন ভাবে বলল মিলার, যেন ভুলেই গিয়েছিল কথাটা। তবে বিশেষ কিছু এসে যায় না। তাতে।

পুলিশের হয়ত এসে যাবে, বলল হ্যানসন। কিশোরের দিকে চেয়ে বলল, চলুন আমরা যাই। পুলিশকে খবর দেই গিয়ে।

দাঁড়ান দাঁড়ান, হাত তুলে বাধা দিল প্রাইস। একটু সময় দিন আমাকে। জন ফিলবির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি। আপনাদের।

জন ফিলবির ভূতের সঙ্গে তো? ভুরু কুঁচকে গেছে মুসার।

ভুতই বলতে পার। ও নিজেই বলবে, তাকে কেন খুন করেছি আমি।

আর কিছু কেউ বলার আগেই ঘুরে হাঁটতে শুরু করল প্রাইস। পাশের ঘরে চলে গেল।

তাড়াতাড়ি পা বাড়াল সেদিকে হ্যানসন।

থামুন থামুন, বাধা দিল মিলার। ভয় নেই, পালাবে না। মিনিট খানেকের ভেতরেই ফিরে আসবে। হ্যাঁ, কিশোর পাশা, এই যে নাও, তোমার ছুরি।

থ্যাংক্যু, বলল কিশোর। আট ফলার ছুরিটা নিয়ে কোমরের বেল্টে আটকাল।

ঠিক এক মিনিট পরেই দরজায় এসে দাঁড়াল লোকটা। না, মিস্টার ফিসফিস নয়। তার চেয়ে বেঁটে, কিছু কম বয়েসী একজন লোক। পরিপটি করে আঁচড়ানো ধূসর চুল। পরনে টুইডের জ্যাকেট। মুখে হাসি।

গুড ইভনিং বলল লোকটা। আমি জন ফিলবি। আমাকে নাকি দেখতে চাও?

মিলার ছাড়া আর সবাই হাঁ করে চেয়ে আছে। একেবারে চুপ।। এমন কি কিশোরও চুপ হয়ে গেছে।

মিটি মিটি হাসছে মিলার। বলল, ও সত্যিই জন ফিলবি।

হঠাৎই ব্যাপারটা বুঝে ফেলল। কিশোর। মুখ দেখে মনে হল, পোকা গিলে ফেলেছে। আপনি জন ফিলবি, আপনিই হ্যারি প্রাইস, মিস্টার ফিসফিস, তাই না?

মিস্টার ফিসফিস চেঁচিয়ে উঠল মুসা। তা কি করে হয়! মিস্টার প্রাইসের চেয়ে বেঁটে, চুল আছে…

কিশোর ঠিকই বলেছে, পকেট থেকে একটা উইগ বের করে। পরে ফেলল ফিলবি। আবার মাথা টাকা হয়ে গেল তার। বুক চিতিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল, লম্বা দেখাল একটু। হঠাৎ ফিসফিসে গলায় চেঁচিয়ে উঠল, একটু নড়বে না! প্ৰাণের ভয় থাকলে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকা।

চমকে উঠল তিন গোয়েন্দা, হ্যানসনসহ। পরীক্ষণেই বুঝল ব্যাপারটা। নিজেকে মিস্টার ফিসফিস প্রমাণ করল ফিলবি। অবাক হল তিন গোয়েন্দা, লোকটা কত বড় অভিনেতা, বুঝল এখন।

পকেট থেকে কি যেন একটা বের করল ফিলবি। প্লাস্টিক তৈরি। গলায় লাগিয়ে দিতেই গভীর কাটা দাগ হয়ে গেল। ছেলেরা, বুঝতে পেরেছ তো এবার? জন ফিলবিকে হ্যারি প্রাইস বানিয়ে ফেলা কিছুই না। গলার স্বর বদলে ফেলি। কথা বলি ভয়াবহ ফিসফিসে গলায়। কেউ ঘুণাক্ষরেও কল্পনা করতে পারে না, আমিই জন ফিলবি।

গলার নকল দাগ আর মাথার উইগটা খুলে আবার পকেটে রেখে দিল ফিলবি। এস, বস সবাই। তারপর বল, কে কি জানতে চাও। তবে, আগে আমিই বলে নিচ্ছি। কিছু, টেবিলে রাখা ছবিটা দেখিয়ে বলল, দেখছ, মিস্টার ফিসফিসের সঙ্গে হাত মেলাচ্ছি। আমি। কি করে করলাম? খুব সহজে। ফটোগ্রাফির একটা কৌশল। অনেক বছর আগে, ছবিতে যখন অভিনয় করতাম, গলার স্বর খুব খারাপ ছিল। তোতলাতাম। লোকের সঙ্গে কথা বলতেই লজা লাগত। আশ্চর্য লোকের স্বভাবা এটাকেই দুর্বলতা ধরে নিল ওরা। ঠকােত। অনেক ভেবে চিন্তে শেষে নিজেকে মিস্টার ফিসফিস বানিয়ে নিলাম। ভয় পাওয়ানোর মত চেহারা। গলায় কাটা দাগ দেখে ধরেই নিল লোকে, লোকটা ডাকাত-ফাকাত গোছের কিছু। তার ওপর ভয়ঙ্কর ফিসফিসে গলা। বুঝে গেলাম, হ্যারি প্রাইসকে ভয় পায় লোকে। ব্যস, তাকেই ম্যানেজারের পদটা দিয়ে দিলাম। এরপর থেকে টাকা পয়সা আদায় বা কোন কঠিন কাজ করার দরকার পড়লেই ফিসফিস সেজে হাজির হতাম লোকের সামনে। কেউ ধরতে পারেনি। লোকে জেনেছে জন ফিলবি আর হ্যারি প্রাইস আলাদা লোক। একমাত্র রড মিলার ছাড়া আর কেউ জানত না ব্যাপারটা। ও আমার মেকআপ ম্যান ছিল। ফিসফিস সাজার ফন্দিটা ওর মাথা থেকেই বেরিয়েছে, থামল জন ফিলবি। হাসল। কেমন লাগছে শুনতে?

ভাল, ভাল, বলে উঠল মুসা। বলে যান!

ভালই কাটছিল দিন, বলে চলল ফিলবি। এই সময়ই এল টকিং-পিকচার। ভাবলাম, অভিনয়কেই বেশি গুরুত্ব দেবে লোকে। গলার স্বরে সামান্য খুঁত, সেটা মাপ করে দেবে। কিন্তু না, দিল না। ওটাকেই অস্ত্ৰ বানিয়ে আমার মন গুড়িয়ে দিল। গরম লোহার শিক ঢুকিয়ে যেন ছাঁকা দিয়ে দিল কলজেয়। ছেড়ে দিলাম অভিনয়। ঘরকুণো হয়ে গেলাম। এই সময়ই নোটিশ এল ব্যাংক থেকে, ঋণের দায়ে আমার বাড়ি দখল করে নেবে। ফিলবি ক্যাসল অন্যের হয়ে যাবে, ভাবতেই খারাপ লাগে আমার। বেপরোয়া হয়ে উঠলাম। থামল একটু সে। তারপর বলল, ক্যাসল তৈরির সময়ই সুড়ঙ্গটা আবিষ্কার করেছি। ক্যাসল বানিয়ে শ্রমিকেরা চলে গেল। রিড আর আমি ছাড়া আর কেউ জানত না এটা। সুড়ঙ্গের মাঝামাঝি একটা দরজা বানিয়ে নিলাম, তারের জাল আর সিমেন্ট দিয়ে। এখানে এই বাড়িটা বানালাম। লোকে জানল, এটা হ্যারি প্রাইসের বাড়ি। এক ঝড়ের রাতে পাহাড়ের ওপর থেকে আমার গাড়িটা ফেলে দিলাম নিচে। লোকের কাছে মরে গেল। জন ফিলবি।

ভূত-প্ৰেতগুলো বানালেন। কখন? জানতে চাইল কিশোর।

শেষ ছবিটাতে অভিনয় করার সময়! ভেবেছিলাম, যেদিন ছবি মুক্তি পাবে, বন্ধুদেরকে দাওয়াত করে এনে মজা দেব। তা আর হল না। ছবি দেখে হাসাহাসি শুরু করল লোকে। মন খারাপ হয়ে গেল, থামল ফিলবি। তারপর বলল, পরে খুব কাজে লেগেছে জিনিসগুলো। এমনিতেই পুরানো ধাঁচের ক্যাসল, ভেতরে অদ্ভুত সব জিনিসে ঠাসা। দেখেই গা ছমছম করে লোকের, ভয় পেতে শুরু করে। তারপর দুয়েকটা ভূত কিংবা প্ৰেতাত্মা সামনে হাজির হয়ে গেলে, ভিরমি খেতে বাকি থাকে। শুধু, হাসল সে। লোকে জানল ক্যাসলে ভূতের উপদ্ৰব। আছে। ওরা আর ওদিকে মাড়াল না। পথটাও বন্ধ করে দিলাম পাথর ফেলে ফেলে। ক্যাসল আর বেচিতে পারল না ব্যাংক। হাতে সময় পেলাম। বসে না থেকে দুষ্পপ্ৰাপ্য কাকাতুয়ার ব্যবসা শুরু করে দিলাম। কিছু টাকা জমেছে এখন আমার হাতে। আর সামান্য কিছু জমলেই ব্যাংকের টাকা পুরো শোধ করে দিতে পারতাম, জোরে নিঃশ্বাস ফেলল। ফিলবি। কিন্তু তোমরা বোধহয় তা হতে দিলে না।

মিস্টার ফিলবি, এতক্ষণ মন দিয়ে অভিনেতার কথা শুনছিল। কিশোর। আপনিই আমাদেরকে ফোন করেছিলেন, না? ভয় দেখাতে চেয়েছিলেন?

মাথা ঝোঁকাল অভিনেতা। ভেবেছিলাম, এরপর আর ক্যাসলের ধারে কাছে আসবে না। কিন্তু সাহস অনেক বেশি তোমাদের।

কি করে জানলেন, সেরাতে আমরা যাব? আমাদের পরিচয় জানলেন কি করে? জিজ্ঞেস করল কিশোর।

মৃদু হাসল ফিলবি। রড মিলার, স্পাইয়ের কাজটা ওই করেছে। ব্ল্যাক ক্যানিয়নের ধারে, একটা পাহাড়ের ঢালে ছোট একটা বাংলো আছে। ওটা তার বাড়িা নিচে থেকে সহজে লোকের চোখে পড়ে না বাড়িটা। কাছাকাছি থাকে, ক্যাসলের ওপর নজর রাখতে সুবিধে তারা। তোমাদেরকে দেখেছিল। সঙ্গে সঙ্গে টেলিফোনে জানিয়েছে আমাকে, থামল সে।

পাহাড়ের মাথায় টেলিভিশন এরিয়্যাল কে বসিয়েছে, বুঝতে আর অসুবিধে হল না তিন গোয়েন্দার।

কিন্তু আমাদের নাম জানলেন কি করে? আবার জিজ্ঞেস করল। কিশোর।

বলছি, হাত তুলল। ফিলবি। কাগজে পড়েছি রোলস রয়েস প্রতিযোগিতার কথা। ব্ল্যাক ক্যানিয়নে গাড়িটাকে দেখল রড। আমাকে জানােল। তাড়াতাড়ি গিয়ে ঢুকলাম ক্যাসলে। ভয় দেখিয়ে তাড়ালাম তোমাদেরকে। সত্যি, ভয় পেতে দেরি করেছ তোমরা। আরও অনেক আগেই ভয় পেয়ে পালিয়েছে অন্যেরা। যাই হোক, তারপর ফিরে এলাম। এখানে। টেলিফোন গাইডে খুঁজলাম তোমার নাম নেই। ধরেই নিলাম, টেলিফোন নেই তোমার। তবু শিওর হবার জন্যে ফোন করলাম ইনফরমেশনে। ওরা জানাল, আছে। আর কি? পেয়ে গেলাম নাম্বার।

অ, মাথা চুলকাচ্ছে কিশোর। শুটকিকেও নিশ্চয় দেখেছিলেন। মিস্টার মিলার?

শুটকি! অবাক চোখে তাকাল ফিলবি।

আমরা ছাড়াও আরও দুটো ছেলে এসেছিল। একজন রোগাপাতলা ঢাঙা।। নীল একটা স্পোর্টস কার নিয়ে এসেছিল….

ও হ্যাঁ হ্যাঁ। শুটকি! ভাল নাম দিয়েছ। হাহ্‌ হাহ্‌ করে হাসল ফিলবি।

উসখুস করছে রড মিলার। শেষে বলেই ফেলল, একটা খুব খারাপ কাজ করে ফেলেছিলাম সেদিন। আরেকটু হলেই সর্বনাশ হয়ে গেছিল! ওই যে পাথরের ব্যাপারটা। ক্যাসলের ওপরে পাহাড়ের মাথায় আমিই লুকিয়ে ছিলাম। সেদিন ওখানে বসেই নজর রাখছিলাম তোমাদের ওপর। কতগুলো পাথরের আড়ালে ছিলাম। হঠাৎ পা লেগে হড়কে গেল একটা পাথর। চমকে উঠলাম। নিচে রয়েছ তোমরা। কি হল, দেখার জন্যে উঁকি দিলাম। আমাকে দেখে ফেললে তোমরা। ধরার জন্যে উপরে উঠতে লাগলে। লাফিয়ে সরে এসে ছুটলাম। কয়েকটা পাথর গড়িয়ে গিয়ে ধাক্কা লাগল আলগা পাথরের স্তূপে। ব্যস, নামল পাথর ধস। ওই জায়গাটাই এমন। তোমরা আটকে গেলে গুহায়। তাড়াতাড়ি নেমে গিয়ে গুহার বাইরে দাঁড়ালাম। কি করব না করব, দিশেহারা হয়ে পড়েছিলাম। ধরেই নিয়েছিলাম, চ্যাপ্টা হয়ে গেছ তোমরা। মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়েছিলাম। ওখানেই। পাথরের ফাঁক গলে লাঠির মাথা বেরোতে দেখে কি যে খুশি লেগেছিল, বলে বোঝাতে পারব না, থামল সে।

গুহাটা না থাকলেই তো খতম করে দিয়েছিলেন। গোমড়া মুখে বলল মুসা।

সত্যি বলছি, বলল মিলার। ইচ্ছে করে ফেলিনি। ওটা নিতান্তই দুর্ঘটনা…

এরপর আর কোন কথা চলে না। চুপ করে গেল মুসা।

নিচের ঠোঁটে চিমটি কাটছে কিশোর। হঠাৎ মুখ তুলে বলল, কিন্তু কয়েকটা ব্যাপার পরিষ্কার হচ্ছে না এখনও!

কি ব্যাপার? জানতে চাইল ফিলবি।

আপনার সঙ্গে যেদিন দেখা করলাম, বলল কিশোর। মিছে কথা বলেছেন। ঝোপ পরিষ্কার করেননি, অথচ বলেছেন করছিলেন। কেন? টেবিলে লেমোনেড রেডি রেখেছিলেন। কি করে জানলেন আমরা যাব?

হাসল অভিনেতা, কি করে জানলাম? গুহ থেকে বেরোলে তোমরা। গাড়ি পর্যন্ত তোমাদেরকে অনুসরণ করে গিয়েছিল মিলার। বেশ জোরেই শোফারকে আমার এ-জায়গাটার নাম বলেছিলে। পাথরের আড়ালে লুকিয়ে শুনেছিল মিলার। খবর দিল আমাকে। লেমোনেড রেডি করলাম। জানালায় দাঁড়িয়ে দেখলাম, রোলস রয়েসটা আসছে। একটা মাচেটে নিয়ে চট করে গিয়ে ঢুকে পড়লাম একটা ঝোপে। হঠাৎ নাটকীয় ভাবে বেরিয়ে এসে, চমকে দিতে চেয়েছিলাম তোমাদেরকে। চাপ সৃষ্টি করতে চেয়েছিলাম স্নায়ুর ওপর। তারপর শোনালাম টেরর ক্যাসলে ভূত আমদানি করার কাহিনী, হাসল ফিলবি। মুসা কিন্তু সত্যিই ভয় পেয়ে গিয়েছিল।

চট করে আরেক দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিল মুসা।

তোমাদেরকে ক্যাসল থেকে দূরে রাখার অনেক চেষ্টা করেছি, আবার বলল ফিলবি। কিন্তু পারলাম না। বড় বেশি একরোখা ছেলে তোমরা। বেশি বাড়াবাড়ি করতে গিয়ে আজ ধরাই পড়ে গেলাম। এতই তাড়াহুড়ো করেছি, সুড়ঙ্গ মুখের দরজা বন্ধ করতে ভুলে গেছি। পাখিগুলো গিয়ে ঢুকল সুড়ঙ্গে। আরও ফাঁস করে দিল ভূতের পরিচয়।

আবার ঠোঁটে চিমটি কাটল কিশোর। জিপসি বুড়ি সেজে কে গিয়েছিলেন? নিশ্চয়ই আপনার বন্ধ, মিস্টার মিলার?

হাঁ। ভয় দেখাতে চেয়েছিলাম তোমাদেরকে, বলল ফিলবি।

ভয় পাইনি, বরং কৌতুহল আরও বেড়ে গিয়েছিল। সন্দেহও বাড়ল। বুঝলাম, ভূত নয়, টেরর ক্যাসলে মানুষের বাস আছে। সেটা আরও স্পষ্ট করে দিল রবিনের তুলে আনা ছবি। আর্মর সুটে মরচে নেই, লাইব্রেরির বইয়ে ধুলো নেই। তার মানে, কেউ একজন নিয়মিত পরিষ্কার করে রাখে ওগুলো। কে? কার এত দরদ জিনিসগুলোর জন্যে? আন্দাজ করলাম, একজনেরই হতে পারে। সে আপনি, মিস্টার ফিলবি। …তবে, আজ রাতে কিন্তু বোকাই বানিয়ে ফেলেছিলেন। আরব দসু্যু সেজে। স্মাগলাররা ক্যাসলটাকে ঘাঁটি বানিয়েছে, প্রায় বিশ্বাসই করে ফেলেছিলাম।

হ্যাঁ, ঠিকই অনুমান করেছিলে। আমিই পরিষ্কার করি। জিনিসপত্রগুলো। আর কিছু জানার আছে?

অনেক! বলে উঠল মুসা। জানতে চাই, জলদস্যুর ছবিটা সত্যিই কি চোখ টিপেছিল?

আমি টিপেছিলাম, বলল ফিলবি। ছবিটার পেছনের দেয়াল আসলে কাঠের তৈরি। সাদা রঙ করা কাঠের একটা বোর্ড। টেনে খুলে আনা যায়। ঠেলে দিলেই আবার বসে যায় খাপে খাপে। বোর্ডটা সরিয়ে ছবির পেছনে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম। চোখের পেছনে ছোট গোল প্লাস্টিকের চাকতি সরিয়ে, ওই ছেদায় নিজের চোখ রেখেছিলাম। তুমি চাইতেই টিপলাম।

কিন্তু পরে ছবিটা ভালমত পরীক্ষা করে দেখেছি। রবিনও দেখেছে। কোন ছিদ্র ছিল না চোখের জায়গায়।

ওটা আরেকটা ছবি। একই রকম দেখতে। তোমরা ফিরে আসবে সন্দেহ করে সরিয়ে ফেলেছিলাম আগের ছবিটা।

কিন্তু নীল ভূত? ওটা কি দিয়ে বানালেন? একের পর এক প্রশ্ন করে গেল মুসা। অর্গানের কাঁপা ভূতুড়ে বাজনা? আয়নার ভেতরে মেয়ে ভূত? ইকো হলের ঠাণ্ডা বায়ুপ্রবাহ?

বলতে খারাপই লাগছে, বলল অভিনেতা। রহস্যগুলো আর রহস্য থাকবে না। ঠিক আছে, তবু বলছি…

কয়েকটা রহস্য এমনিতেও আর রহস্য নেই, বাধা দিয়ে বলল কিশোর। আমি জানি, কি করে কি করেছেন। বরফের ভেতর দিয়ে কোন ধরনের গ্যাস প্রবাহিত করেছেন। দেয়ালের গোপন কোন ছিদ্র দিয়ে ওই ঠাণ্ড গ্যাস ঢুকিয়ে দিয়েছেন ইকো হলো। হয়ে গেল। ঠাণ্ডা বায়ুপ্রবাহ। বিচিত্র বাজনা, সেই সঙ্গে চেচামেচি, গোলমাল সৃষ্টি করা খুব সহজ। রেকর্ডকে উল্টো ঘোরানোর ব্যবস্থা করেছেন। এই উল্টো বাজনা অ্যামপ্লিফাই করে ছড়িয়ে দিয়েছেন স্পীকারের সাহায্যে। নীল ভূত বানানােও সহজ। নীল লুমিনাস পেইন্ট মাখিয়ে নিয়েছেন পাতলা অয়েল পেপারে। সুতোয় কাগজের এক মাথা বেঁধে বুলিয়ে দিয়েছেন ওপর থেকে। সুতো ধরে টেনে নাচিয়েছেন ওটাকে। তারপর, কুয়াশাতঙ্ক। কোন ধরনের কেমিক্যাল পুড়িয়ে সৃষ্টি করেছেন এমন ধোঁয়া। এমন কোন ধরনের কেমিক্যাল, যেটার ধোঁয়ায় গন্ধ নেই। দেয়ালের গোপন ছোট ছোট ছিদ্র দিয়ে চালান করে দিয়েছেন। প্যাসেজে। কি, ঠিক বলছি তো?

হ্যাঁ, ঠিকই বলেছ মাথা ঝোঁকাল ফিলবি। না, মাথায় ঘিলু আছে তোমার, স্বীকার করতেই হবে!

আয়নার ভূত তো আপনি নিজেই, আবার বলল কিশোর। মেয়ে মানুষের পোশাক পরে, প্যাসেজ দিয়ে গেয়ে পাল্লা খুলে দাঁড়িয়ে পড়েছেন। তারপর সুযোগ বুঝে চট করে আবার ঢুকে গেছেন প্যাসেজে। বন্ধ করে দিয়েছেন পাল্লা। খুব সহজ। কিন্তু একটা জিনিস বুঝতে পারছি না। কোন কৌশলে লোকের স্নায়ুর ওপর চাপ ফেলেছেন আপনি। অস্বস্তি, ভয়, শেষে আতঙ্ক এসে চেপে ধরে। কি করে করলেন?

আরও ভাব আরও ভাব, মাথা খাটিয়ে বের করার চেষ্টা কর। শেষ পর্যন্ত না পারলে, বলে দেব। এখন এস, কিছু জিনিস দেখাচ্ছি তোমাদের।

সবাইকে পাশের ঘরে নিয়ে এল ফিলবি। বিরাট এক ড্রেসিং রুম। নানাধরনের। উইগ, পোশাক আর মেকআপের সরঞ্জাম থরে থরে সাজানো রয়েছে কয়েকটা আলমারিতে। এক পাশে বিরাট এক র‍্যাকে অনেকগুলো গোল ক্যান ।

ওগুলোতে ফিল্ম, ক্যানগুলো দেখিয়ে বলল ফিলবি। আমার অভিনয় করা সমস্ত ছবির একটা করে ফিল্ম। এক সময় কোটি কোটি লোককে অনেক আনন্দ দিয়েছি। অথচ আজ আমাকে ভূত সেজে লুকিয়ে থাকতে হচ্ছে লোকচক্ষুর আড়ালে! কেমন বিষন্ন গলা অভিনেতার, সবারই মন ছুয়ে গেল। তা-ও রেহাই পেলাম না। তােমরা এলে। ছদ্মবেশ খুলে ফেললে আমার। কাল সকাল থেকেই পিলপিল করে লোক আসতে থাকবে। হাসােহাসি করবে, টিটকিরি দেবে।

কেউ কোন কথা বলল না।

তবে, গলার স্বর নিয়ে আর কেউ হাসতে পারবে না। এখন, আবার বলল ফিলবি। ওষুধ খেয়ে আর প্র্যাকটিস করে করে সারিয়ে ফেলেছি আমি।

নিচের ঠোঁটে সমানে চিমটি কেটে চলেছে কিশোর।

কিন্তু এত কষ্ট করে কি পেলাম! অভিনেতার গলায় ক্ষোভ। আবার আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করবে লোকে। ক্যাসলটা আমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নেবে ব্যাংক। এবার হয়ত সত্যিই আত্মহত্যা করতে হবে। আমাকে!

মিস্টার ফিলবি, হঠাৎ বলল কিশোর, ওই ক্যানগুলোতে আপনার অভিনীত সমস্ত ছবি আছে, না?

হ্যাঁ। কোথাও ভূত সেজেছি আমি, কোথাও দানব, কোথাও জলদস্যু…

নির্বাক ছবির যুগ তো অনেক আগেই শেষ। তারমানে অনেকদিন থেকেই পড়ে আছে। আর কোন হলে দেখানো হচ্ছে না এখন।

না, হচ্ছে না। সবাক ছবি ফেলে নির্বাক ছবি কেন দেখবে লোকে? কিন্তু এসব কথা কেন?

মনে হচ্ছে, আপনার ক্যাসল আপনারই থাকবে। একটা বুদ্ধি এসেছে মাথায়। আগামী কাল জনাব আপনাকে। আর হ্যাঁ, এখান থেকে কোথাও যাবেন না। ভয়ের কিছু নেই। আপনিই টেরর ক্যাসলের ভূত, কথাটা এখনই ফাঁস করছি না আমরা। অনেক রাত হল। আচ্ছা চলি। কাল দেখা হবে।

সুড়ঙ্গ পথেই আবার ক্যাসলে ফিরে এল ওরা—তিন গোয়েন্দা আর হ্যানসন। বেরিয়ে এল ক্যাসল থেকে।

আজ আর ভূতের ভয় নেই। ধীরেসুস্থে নেমে এল পথে। রোলস রয়েসে উঠল।

Share This