১৮. ফার্মে পৌঁছে দেখলাম

ফার্মে পৌঁছে দেখলাম, সবকিছু এক্কেবারে রোববারের দিনটার মত শুনশান। কেউ নেই কোথাও। মজুরের মাঠে কাজ করতে গেছে। বাতাসে মশামাছির গুঞ্জন নির্জনতাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। মনে হচ্ছে কেউ বেঁচে নেই। গাছের পাতার ঝিরঝির শব্দকে মনে হচ্ছে যেন মরা মানুষের ফিসফিসানি।

গাছের সামনেই একটা বড় আঙিনা, মরাটে ঘাসে ছাওয়া। তার ওপ্রান্তে দোতলা বাড়ি। সাদা চামড়ার লোকেরা থাকে সেখানে। রান্নাঘরটা মূল বাড়ির লাগোয়া। উঠোনের এক প্রান্তে, বেড়ার ধার ঘেঁষে, ছোট্ট একটা কুঁড়ে। একটু দূরেদূরে আরও কয়েকটা ঘর। একটা ঘরের খোলা দরজাপথে ভেতরের আসবাব দেখা যাচ্ছে। সাবান জ্বাল দেয়ায় বড় কেতলি আর একটা ছাইদানি। রান্না ঘরের সামনেই বেঞ্চি, তার ওপর এক বালতি পানি আর একটা কুমড়ো রাখা। একটা কুকুর ঘুমিয়ে আছে গাছের ছায়ায়। বেড়ার ধারেই কিছু ফলমূলের ঝোপ। বেড়ার ওপাশে বাগান। খানিকটা তরমুজের খেত, তারপর তুলোর আবাদ। একেবারে শেষপ্রান্তে জল।

বেড়া টপকে রান্নাঘরের দিকে রওনা হলাম। অর্ধেক রাস্তা গেছি এমন সময় প্রথমে একটা, পরে আরও একটা কুকুর এসে আমাকে হেঁকে ধরল। দাঁড়িয়ে গেলাম স্থাণুর মত। চক্রাকারে আরও কয়েকটা কুকুর, প্রায় গোটা পনের হবে, ঘিরে ধরল আমাকে। এদের চিৎকারে আমার কান ঝালাপালা হয়ে গেল।

একটা নিগ্রো ঝি বেলুন হাতে ছুটে বেরুল রান্নাঘর থেকে। ভাগ, টাইনি! ভাগ, স্পটি! কুকুর দুটোর পিঠে কষে দু ঘা বসল সে। কুঁই কুঁই ডাক ছেড়ে পালাল কুকুর দুটো। ওদের দেখাদেখি অন্যগুলোও ভাগল, কিন্তু পরমুহুঁর্তে আবার তেড়ে আসল কয়েকটা।

ঝি-টার পেছনে দুটো নিগ্রো ছেলেমেয়ে বেরিয়ে এসেছিল। তারা তাদের মায়ের গাউনের সাথে লেপ্টে রইল। সচরাচর বাচ্চারা যেমন করে, তেমনিভাবে মায়ের পেছন থেকে উঁকি দিয়ে আমাকে দেখতে লাগল। এবার একজন শ্বেতাঙ্গ মহিলা বেরোল। বছর পঁয়তাল্লিশেক বয়েস, মুখে একগাল হাসি। আমার দিকে এগিয়ে এল সে।

শেষপর্যন্ত এলি তাহলে! খুশিতে চেঁচিয়ে উঠল মহিলা, জড়িয়ে ধরল আমাকে। চোখে মুক্তোর মত চিকচিক করছে আনন্দাশ্রু।

তুই তোর মায়ের মত হোসনি দেখতে, বলল বুড়ি। ইতিমধ্যে আরও কয়েকটা শ্বেতাঙ্গ ছেলেমেয়ে বেরিয়ে এসেহে ঘর থেকে। তাদের দিকে ঘুরে বলল, অ্যাই, দ্যাখ তোরা, কে এসেছে। তোদের খালাতভাই, টম। নে, জিজ্ঞেস কর ওকে, কেমন আছে সে।

বাচ্চাগুলো বুড়ো আঙুল মুখে পুরে মহিলার পেছনে লুকাল। আমাকে হাতে ধরে ঘরে নিয়ে এল মহিলা। বাচ্চারাও এল পিছু পিছু। আমাকে চেয়ারে বসিয়ে বুড়ি নিজে একটা মোড়ায় বসল। তারপর আমার দুহাত চেপে ধরল।

দাঁড়া, এবার ভাল করে দেখি তোকে, বলল। কদ্দিন ধরে আশা করে আছি তোকে দেখব, তা অ্যাদ্দিনে এলি তুই। এত দেরি হল কেন আসতে? পথে জাহাজ কোন চড়ায় ঠেকেছিল?

হ্যাঁ, ম্যাডাম…জাহা…

ওসব ম্যাডাম-ফ্যাডাম ছাড়, স্যালিখালা বলে ডাকবি আমাকে। তোর খালু আজ হপ্তাখানেক হল রোজই একবার করে শহরে যাচ্ছে তোকে আনতে। আজও গেছে। পথে হয়ত দেখে থাকবি তাকে—বুড়ো মত একজন…

না, খালা, দেখিনি, বললাম আমি, ভেতরে ভেতরে দারুণ অস্বস্তি বোধ করছি।

মিসেস ফেলপস আমার উশখুশ খেয়াল করল না, সমানে বকবক চালিয়ে গেল। হঠাৎ তার একটা কথায় আমার শিরদাড়া বেয়ে হিম রক্তস্রোত বয়ে গেল।

কই, বুবু কিংবা বাসার আর কারো কথা তো বললি না কিছু? জিজ্ঞেস করল বুড়ি। আমি বরং জিবটাকে একটু বিশ্রাম দেই, তুই সেই ফাঁকে বাসার কে কেমন আছে বল।

আচ্ছা গ্যাড়াকলে পড়লাম; এ-পর্যন্ত ভাগ্য আমাকে ভালই সাহায্য করেছে, কিন্তু এবার একেবারে চড়ায় আটকে দিল। স্পষ্ট বুঝতে পারছি আর এগোনোর চেষ্টা বৃথা, সত্য কবুল না-করে উপায় নেই। মুখ খুলতে যাব সব বলার জন্যে, আচমকা আমাকে ঠেলে খাটের তলায় চালান করে দিল বুড়ি। বলল, ওই যে, আসছে ও। চুপ করে বসে থাক এখানে। টু শব্দ করিস না। ও যেন বুঝতে না পারে তুই আছিস এখানে। ওকে একটু চমকে দেব আমি।

সাইলাস ফেলপস ঘরে ঢুকল।

কি হল, আসেনি? মিসেস ফেলপস জিজ্ঞেস করল।

না। বুঝতে পারছি না কেন আসছে না এখনও। বড্ড চিন্তা হচ্ছে আমার। আলবত এসেছে। নিশ্চয়ই তুমি রাস্তায় হারিয়ে ফেলেছ ওকে।

না, স্যালি। বিশ্বাস কর।

জানলার দিকে ইশারা করল মিসেস ফেলপস্। বলল, দ্যাখো, সাইলাস, কে যেন আসছে এদিকে!

কে আসছে দেখার জন্যে সাইলাস ফেলপস জানলার ধারে যেতেই আমাকে খাটের তলা থেকে টেনে বের করল বুড়ি। ওদিকে বাইরে কাউকে দেখতে না পেয়ে মিস্টার ফেলপস্ ঘোরামাত্রই তার চোখ আমার ওপর পড়ল। মিটিমিটি হাসতে লাগল তার স্ত্রী। ফ্যালফ্যাল করে আমার দিকে তাকিয়ে রইল ভদ্রলোক।

কে? জিজ্ঞেস করল সে।

আবার কে, টম সয়্যার, বলল তার স্ত্রী।

ঘরে বাজ পড়লেও বোধকরি এতটা চমকাতাম না আমি। মনে হল, পায়ের নিচে মাটি সরে গেছে, তরতর করে পাতালে প্রবেশ করছি আমি। তাহলে এরা আমাকে টম সয়্যার ঠাউরেছে! আমার পুরোন ইয়ার, টম সয়্যার!

আমার হাত ধরে জোরে ঝাঁকুনি দিল খালু। খালা হেসে গড়াগড়ি খেল। তারপর নানান জেরায় ওরা অতিষ্ট করে তুলল আমাকে। টমের ভাই সিড, ওর বোন মেরি এবং পলিখালার কথা জিজ্ঞেস করল। স্যালিখালা আবার পলিখালার বোন। আমিও সোৎসাহে সয়্যার পরিবার সম্পর্কে সত্যি-মিথ্যে বানিয়ে অনেক গল্প শোনালাম ওদের। এমন সব ঘটনা বললাম যা গত দশ বছরে ঘটেনি ও-বাড়িতে।

আচমকা নদীতে একটা স্টিমারের ভোঁ শুনে আমার বুকের ভেতরটা ধড়াস করে উঠল। হয়ত টম সয়্যার আসছে এই জাহাজে, মনে মনে বললাম। সে যদি এখানে এসে বলে, সালিখালা, আমি টম সয়্যার, তখন কী উপায় হবে? উপলব্ধি কমলা এখুনি রাস্তায় গিয়ে ঠেকাতে হবে ওকে, সব কথা খুলে বলতে হবে।

খালা, বললাম, আমার জিনিসগুলো আনার জন্যে একটু শহরে যাচ্ছি।

চল, ওয়াগন নিয়ে আমিও সঙ্গে যাই।

না। আপনাকে খামোকা কষ্ট করতে হবে না। আমি চালাতে পারব। সাইলাস ফেলসের ওয়াগন নিয়ে শহরের দিকে যাত্রা করলাম আমি। খানিকটা যেতেই দেখলাম একটা ঘোড়া গাড়ি আসছে জাহাজঘাটার দিক থেকে। টম সয়্যার ওই গাড়িতে বসে।

দাঁড়াও, টম! চেঁচিয়ে বললাম আমি।

আমাকে দেখে ওর চোয়াল ঝুলে পড়ল, ভূত ঠাউরাল আমাকে। বলল, তোমার তো কোন ক্ষতি করিনি আমি। তবে আবার পিছু নিয়েছ কেন?

ভয় নেই, টম, বললাম, আমি ভূত না।

মরনি তুমি?

না, টম। ওদের ফাঁকি দিয়েছি। বিশ্বাস না হয়, আমাকে চিমটি কেটে দেখ।

চিমটি কেটে আশ্বস্ত হল সে, আমি হাক, এবং সত্যি সত্যি বেঁচে রয়েছি। আবার আমার দেখা পেয়ে খুব খুশি হল টম।

বল, হাক, সব খুলে বল আমাকে, টম বলল। না জানি কত মজাই করেছ তুমি।

পরে, টম। পরে সব বলব। ঠিক এই মুহূর্তে আমি ভীষণ বিপদে আছি। শোন, টম, বিপদটা কী তা জানিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, এখন আমার কী করা বল?

ঠোঁট কামড়ে খানিকক্ষণ চিন্তা করল টম। তারপর বলল, আমার সুটকেস নিয়ে বাসায় যাও তুমি। এমন ভান কর যেন এগুলো তোমার। খুব আস্তে গাড়ি চালিয়ে যাবে। এর কিছু পরেই আমি গিয়ে হাজির হব এবং নিজেকে সিড বলে পরিচয় দেব।

ঠিক আছে, টম। কিন্তু আরেকটা ব্যাপার, খুবই গোপনীয়, কেউ যেন না জানে। এখানে এক নিগ্রো আছে। আমি ওকে চুরি করে মুক্তি দিতে চাই। ওকে চেন তুমি। মিস ওয়াটসনের চাকর জিম!

কী! আঁতকে উঠল টম। বল কী, জিম তো পলাতক।

জানি। কিন্তু তবু ওকে সাহায্য করব আমি। তুমি হয়ত খারাপ বলবে এটাকে, তবু করব। কথা দাও, কাউকে কিছু জানাবে না।

তোমাকে সাহায্য করব আমি, টম বলল। নতুন অ্যাডভেঞ্চারের স্বপ্নে ওর চোখ চকচক করছে।

ওর কথা শুনে আমি তাজ্জব হয়ে গেলাম। ও খুব বড় ঘরের ছেলে, আর বড় ঘরের লোকেরা নিগ্রোদের পালাতে সাহায্য তো করেই না, বরং কেউ করলে তাকে ঘৃণা করে।

টম, জিজ্ঞেস করলাম আমি; যা বলছ ভেবে বলছ তো?

আলবত, দৃঢ় সুরে বলল ও। আমিও আর কথা বাড়ালাম না।

টমের প্যাটরা নিয়ে বাসায় ফিরে এলাম। এর আধঘণ্টা পর ওর গাড়ি এসে ফটকের কাছে থামল। স্যালিখালা জানলা দিয়ে টমকে দেখে ভাবল কোন ভিনদেশি হবে হয়ত।

বাচ্চাদের একজনকে ডেকে বলল, যা তো, জিমি, এক দৌড়ে লিজিকে বলে আয় খাওয়ার টেবিলে আরেকটা থালা লাগাতে।

বাসার সবাই দৌড়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। বিদেশি কেউ প্রতি বছরেই আসে না। তাই, পীতজ্বর হলে যেমন উত্তেজনার সৃষ্টি হয়, নতুন কেউ এলেও প্রায়

সেরকমই হয়। ভারিক্কি চালে আমাদের সামনে এল টম। খুব যত্নের সাথে মাথার টুপিটা খুলল, মনে হল সেটা এমন এক বাক্সের ঢাকনা যার ভেতর প্রজাপতি ঘুমিয়ে আছে। এবং সে তাকে জাগাতে চায় না।

আপনিই তো বোধহয় মিস্টার আর্চিবল্ড নিকলস্? সাইলাসখালুকে জিজ্ঞেস করল ও।

না, বাবা, বলল খালা। গাড়িঅলা ঠকিয়েছে তোমায়। নিকলসের বাসা এখান থেকে মাইল তিনেক দূরে। এস, ভেতরে এস।

আমরা সবাই ওকে নিয়ে খাওয়ার টেবিলে গেলাম। নিজেকে সে উইলিয়ম টমসন বলে পরিচয় দিল। বলল, ওহায়য়ো রাজ্যের হিভিল থেকে আসছে।

খেতে খেতে হঠাৎ উঠে পড়ল টম। স্যালিখালাকে চুমু দিয়ে আবার এসে বসল নিজের চেয়ারে।

হাতের উল্টোপিঠে মুখ মুছে চিৎকার করে উঠল খালা, বেয়াদব ছোড়া! আমাকে চুমু দিলি কেন তুই?

আ…আমি…মনে করলাম আপনি হয়ত পছন্দ করবেন, আমতা আমতা করে বলল টন।

কেন মনে করলি, বল?

ওরা সবাই বলল যে!

কারা?

চেয়ার ঠেলে উঠে দাড়াল টম। হতভম্ব হওয়ার ভান করল। তারপর টুপিটা হাতে নিয়ে বলল, দুঃখিত, আমি আশা করিনি এটা। তারা অবশ্য আমাকে বলেছিল, চুমু দেবে তাকে। তিনি খুশি হবেন। আর করব না এমন।

হ্যাঁ, করবে না, হাঁপাতে হাঁপাতে বলল স্যালিখালা। টম, তোমার কী মনে হয়, আমার দিকে ঘুরল টম সয়্যার, স্যালিখালা যদি জানে আমি সিড সয়্যার…

টমের কথা শেষ হবার আগেই স্যালিখালা বুকে জড়িয়ে ধরল ওকে, চুমোয় চুমোয় ভরিয়ে দিল ওর মুখ।

বুবু তো লেখেনি, তুইও আসছিস, সিড। সত্যি, দারুণ অবাক হয়েছি আমরা।

খালা প্রথমে আসতে দিতে চায়নি। বহু কষ্টে পটিয়ে এসেছি।

সেদিন সারাটা বিকেল নানান গল্প-গুজব হল আমাদের মাঝে। কিন্তু একজন পলাতক নিগ্রো ধরা পড়েছে, এমন কথা শুনলাম না কারো কাছে।

তবে রাতে খেতে বসে ওদের এক ছেলে খালুকে বলল টম আর সিডকে নিয়ে সে শহরে রয়্যাল নানসচ নাটক দেখতে যেতে চায়।

না; যাওয়া হবে না, বলল ওদের বাবা। ওই নাটকের কথা পলাতক নিগ্রোটার মুখে শুনেছি আমরা। সবাই খেপে উঠেছে ওই বাটপার দুটোর ওপর। মেরে-ধরে তাড়িয়ে দেবে। হয়ত দিয়েওছে এতক্ষণে।

একথা শুনে খারাপ লাগল আমার। শোবার ঘরে গিয়ে ঠগ দুটোর কথা বললাম টমকে। সব শুনে টম বলল, এটা তাদের পাওনা। আমি একমত হলাম ওর সাথে, কিন্তু সেই সঙ্গে অনুভব করলাম, ওদের আমার সতর্ক করে দেয়া উচিত।

জানলা দিয়ে কার্নিসে নামলাম আমরা, সেখান থেকে লাইটপোস্ট বেয়ে নিচে। শহরে গিয়ে দেখলাম চৌরাস্তার মোড়ে মিছিল করছে লোকজন। সকলের হাতে মশাল, কেউ ক্যানেস্তার পেটাচ্ছে কেউ-বা ফুঁকছে শিঙ্গা। একটা খাটিয়ার ওপর বসে আছে সম্রাট আর ডিউক। ওদের হাত-পা বাঁধা। দেখে চেনার জো নেই। সারা গায়ে আলকাতরা, তাতে পাখির পালক সাঁটা। সব মিলিয়ে কিম্ভুতকিমাকার দেখাচ্ছে ওদের। দেখে করুনা হল আমার। কেউ কারো ওপর এতটা নিষ্ঠুর কীভাবে হতে পারে ভেবে পেলাম না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *