১৮. ইয়র্কের দুর্গ প্রাসাদ

ইয়র্কের দুর্গ প্রাসাদে বিরাট এক ভোজের আয়োজন করেছেন রাজপুত্র জন। তার মিত্র যত নাম করা লোক আছে সবাইকে দাওয়াত করেছেন। এদের সহায়তায়ই রাজা রিচার্ডের সিংহাসন দখল করার পরিকল্পনা করেছেন জন।

পান ভোজন চলছে। মাঝে মাঝেই উৎফুল্ল, পরিতৃপ্ত রাজপুরুষরা চিৎকার করে উঠছে:

রাজপুত্র জন দীর্ঘায়ু হোন!

এই সময় এক দূত ভয়ানক এক দুঃসংবাদ নিয়ে এলো। পতন হয়েছে টরকুইলস্টোন দুর্গের। রেজিনাল্ড ট্রুত দ্য বোয়েফ, ব্রায়ান দ্য বোয়া গিলবার্ট ও মরিস দ্য ব্রেসি তিনজনই নিহত। ওদের সঙ্গে যারা ছিলো তাদেরও বেশিরভাগই হয় নিহত নয়তো মারাত্মক আহত। অর্থাৎ এ মুহূর্তে যদি প্রয়োজন পুড়ে ওদিক থেকে একজন লোকের সাহায্যও জন পাবেন না। খবরটা শুনে রীতিমতো মুষড়ে পড়লেন রাজপুত্র। কারণ এই তিন নাইট ছিলো তার শক্তির মূল উৎস। ওদের ছাড়া কি করে তিনি সিংহাসন দখলের লড়াইয়ে নামবেন? মুহূর্তে থেমে গেল সব উল্লাস, হৈ-চৈ, ফুর্তি। রাজপুত্র জনের সাথে সাথে আর সবাইও বসে রইলো মুখ গোমড়া করে।

হঠাৎ একটা কোলাহন শোনা গেল হল কামরার বাইরে। কৌতূহলী হয়ে তাকালেন রাজকুমার জন। দরজায় দেখা গেল দ্য ব্রেসিকে।

তার বর্ম, ঢাল, শিয়োস্ত্রাণ রক্ত, ধোঁয়া আর কাদায় নোংরা হয়ে আছে, তাকে দেখেই হাসি ফুটে উঠলো জনের মুখে।

কে বললো দ্য ব্রেসি মারা গেছে? উঠে দাঁড়িয়ে চিৎকার করলেন তিনি। এসো এসো, দ্য ব্রেসি। ফ্ৰঁত দ্য ববায়েফ আর টেম্পলার কোথায়?

দ্য ব্রেসির জবাব শুনে আবার মুখ শুকিয়ে গেল রাজপুত্রের।

টেম্পলার পালিয়েছে, বললো দ্য ব্রেসি। আর ফ্ৰঁত দ্য ববায়েফ পুড়ে মরেছে নিজের জ্বলন্ত প্রাসাদে।

হতাশ মুখে প্রিয় বন্ধু ওয়াল্ডেমারের দিকে তাকালেন জন।

আরো দুঃসংবাদ আছে, রাজপুত্র, বলে চললো দ্য ব্রেসি। রাজা রিচার্ড এখন ইংল্যান্ডে।

কী! ফ্যাকাসে হয়ে গেল রাজপুত্রের মুখ।

হ্যাঁ রাজপুত্র। আমি নিজ চোখে তাঁকে দেখেছি, তাঁর সাথে কথা বলেছি।

এখন সে কোথায়? প্রশ্ন করলেন ওয়ার্ল্ডেমার।

আমি যখন শেষবার দেখেছি তখন বনের ভেতর দিয়ে ঘোড়া ছুটিয়ে যাচ্ছিলেন।

কজন লোক আছে ওর সাথে?

একজনও না।

একে অপরের সাথে দৃষ্টি বিনিময় করলেন রাজপুত্র ও ওয়ান্ডেমার।

যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ওকে কারাগারে পুরতে হবে, বললেন রাজপুত্র জন।

কবরের চেয়ে নিরাপদ কোনো কারাগার নেই, ওয়াল্ডেমার জবাব দিলেন।

মাথা ঝাকালেন রাজপুত্র।

এক্ষুনি তাহলে রওনা হয়ে যান, ওয়াল্ডেমারকে বললেন তিনি।

দ্য ব্রেসির দিকে তাকালেন ওয়ান্ডেমার। বললেন, তুমি যাবে নাকি আমার সাথে?

না, আমি তাঁর একটা চুলেরও ক্ষতি করবো না। কাল আমাকে বন্দী করার পরও উনি আমাকে ছেড়ে দিয়েছেন। আমি কথা দিয়েছি, ভবিষ্যতে তাঁর কোনো ক্ষতি করার চেষ্টা করবো মা।

দ্য ব্রেসির দিকে তীব্র এক দৃষ্টি হেনে দ্রুত পায়ে বেরিয়ে গেলেন ওয়াল্ডেমার।

.

দ্রুত ঘোড়া ছুটিয়ে হাউস অভ দ্য টেম্পলারস-এ পৌঁছুলেন আইজাক।

সবুজ সমভূমির ওপর দাঁড়িয়ে আছে বিশাল টেম্পলস্টো মঠ। পরিখা দিয়ে ঘেরা দুর্গের মতো বিশাল দালানটা। দুজন কালো পোশাক পরা সৈন্য পাহারা দিচ্ছে ঝুলসেতু। দুর্গ প্রাচীরের আদলে তৈরি পুরু দেয়ালের ওপর টহল দিচ্ছে আরো বেশ কজন সৈনিক।

টেম্পলার নাইটদের গ্র্যান্ডমাস্টার লোকটা বৃদ্ধ। গায়ের চামড়া ঝুলে পড়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও হাঁটেন ঋজু হয়ে। শাদা ধবধবে পোশাক গায়ে। চোখের দৃষ্টিতে এখনও যেন আগুন জ্বলে। সদ্য প্যালেস্টাইন থেকে ফিরেছে এমন এক টেম্পলারের সাথে হাঁটছিলেন তিনি মঠের বাগানে। প্যালেস্টাইনের সর্বশেষ খবরাখবর সংগ্রহ করছিলেন সদ্য আসা টেম্পলারের কাছ থেকে।

ব্রাদার কনরাড অবশেষে বললেন গ্র্যান্ডমাস্টার, ইংল্যান্ডের নাইট টেম্পলারদের আচরণ দেখে খুবই মর্মাহত আমি।

হওয়ারই কথা। ফ্রান্সের ওদের চেয়েও খারাপ আচরণ করে এরা।

হ্যাঁ, এখানে সবচেয়ে ধনী লোক কারা খুঁজতে যাও, দেখবে টেম্পলাররাই। দেশের বেশিরভাগ সম্পদ কুক্ষিগত করে ফেলছে। টেম্পলার নাইট হওয়ার সময় যে শপথ নিয়েছিলো তা গুলিয়ে খেয়েছে সবাই। টেম্পলার হওয়ার সময় শাদাসিধে জীবন-যাপনের শপথ নিয়েছে, কিন্তু করছে কি? সবচেয়ে দামী কাপড়টা, সবচেয়ে ভালো খাবারটা না হলে চলে না ইংরেজ টেম্পলারদের সবচেয়ে দুঃখজনক কি জানো, কনরাড, এখানকার টেম্পলারদের অনেকেই সত্য বিশ্বাসের পথ থেকে সরে গিয়ে যতসব আজগুবী জাদু বিদ্যায় বিশ্বাসী হয়ে পড়েছে। কিন্তু আমি যখন এসেছি গ্র্যান্ডমাস্টার হয়ে, সবাইকে সোজা করে ছাড়বো। করবোই, তুমি দেখে নিও।

কনরাড কোনো জবাব দেয়ার আগেই এক ভৃত্য এসে জানালো, এক ইহুদী এসেছে। বুড়ো। স্যার ব্রায়ান দ্য বোয়া-গিলবার্টের সাথে কথা বলতে চায়।

বোয়া-গিলবার্ট! এই লোকটা, ব্রাদার কনরাড, সবচেয়ে খারাপগুলোর ভেতরেও খারাপ। দেখি ব্যাটা ইহুদী কি চায় ওর কাছে। ভূত্যের দিকে ফিরলেন গ্র্যান্ডমাস্টার। ভেতরে নিয়ে এসো–লোকটাকে, নির্দেশ দিলেন তিনি।

এলেন আইজাক প্রায় আভূমি নত হয়ে অভিবাদন জানালেন গ্র্যান্ড মাস্টার ও তার সঙ্গীকে।

শোনো, ইহুদী. শুরু করলেন গ্র্যান্ডমাস্টার, আমার সময় অত্যন্ত মূল্যবান। সুতরাং যা জিজ্ঞেস করবো, সংক্ষেপে সঠিক জবাব দেবে। যদি উল্টোপাল্টা বা মিথ্যে কথা বলো, তোমর জিভ ছিঁড়ে নেয়া হবে। এক মুহূর্ত থামলেন তিনি। তারপর তীক্ষ্ণ কণ্ঠে প্রশ্ন করলেন, স্যার ব্রায়ান দ্য বোয়া-গিলবার্টের কাছে কি দরকার তোমার?

কি জবাব দেবেন ভেবে পেলেন না আইজাক। সত্য বলার অর্থ একজন টেম্পলারের বিরুদ্ধে কথা বলা। আর মিথ্যে বলা মানে বৃদ্ধ গ্র্যান্ড মাস্টারের কথা অনুযায়ী জিহ্বা খোয়ানো। একটু ইতস্তত করে অবশেষে তিনি বলেই ফেললেন, জরভক্স মঠের প্রায়োর অ্যামারের কাছ থেকে একটা চিঠি নিয়ে এসেছি আমি তাকে দেয়ার জন্যে।

চিঠি? আমাকে দাও।

বিনা বাক্যব্যয়ে চিঠিটা তুলে দিলেন বৃদ্ধ ইহুদী। গ্র্যান্ডমাস্টার সেটা খুলে পড়লেন।

ওহ! রীতিমতো আতঙ্কিত কণ্ঠে চিৎকার করে উঠলেন তিনি। ব্রাদার কনরাড, পড়ো। জোরে পড়ো, এই ইহুদীও যেন শুনতে পায়।

পড়লো ব্রাদার কনরাড:

স্যার ব্রায়ান দ্য বোয়া-গিলবার্ট,

রাজদ্রোহী দস্যুদের হাতে আমি বন্দী। ওদের কাছে শুনলাম, আপনি নাকি সেই ইহুদী ডাইনীকে নিয়ে পালিয়েছেন। আপনি নিরাপদে আছেন জেনে আমি আনন্দিত। তবে, ডাইনী মেয়েটার ব্যাপারে সাবধান থাকবেন! গ্র্যান্ডমাস্টার যদি মেয়েটার কথা শোনেন, ভয়ানক শাস্তি দেবেন আপনাকে। তার চেয়ে ওকে ছেড়ে দিন। মুক্তিপণ হিশেবে আপনি যে অঙ্কের অর্থই চান, দেবে ওর বাবা। চিঠিটা ত্বর হাতেই পাঠাচ্ছি।

আশাকরি শিগগিরই আমাদের দেখা হবে। তখন বিস্তারিত আলাপ করবো।

এখন বিদায়,
অ্যায়মার।

.

ডাইনী! একই রকম আতঙ্কিত স্বরে চিৎকার করলেন আবার গ্র্যান্ডমাস্টার। ব্রাদার কনরাড, সত্যিই মেয়েটা ডাইনী?

আমার মনে হয় না। প্রায়োর অ্যায়মার বোধ হয় বোঝাতে চেয়েছেন মেয়েটা অপূর্ব সুন্দরী।

না, না! তুমি বুঝতে পারছে না, কনরাড, প্রায়োর অ্যায়মারের মতো দায়িত্বশীল ব্যক্তি এমন আজেবাজে কথা লিখতেই পারে না। মেয়েটা তার জাদুবিদ্যা দিয়ে বশ করেছে টেম্পলার ব্রায়ানকে, অ্যায়মার সে কথাই বোঝাতে চেয়েছে! দাঁড়াও দেখি, বুড়ো কি বলে।

আইজাকের দিকে ফিরলেন গ্র্যান্ড মাস্টার। বললেন, যদ্র বুঝতে পারছি, তোমার মেয়ে টেম্পলার বোয়া-গিলবার্টের হাতে বন্দী।

জি হ্যাঁ, মহামান্য নাইট। মুক্তিপণ হিশেবে উনি যা চাইবেন…।

থামো! আগে আমার প্রশ্নের জবাব দাও, তোমার মেয়ে মানুষের অসুখ ভালো করার ব্যাপারে বিশেষ পারদর্শী, তাই না?

জি, আগ্রহের সঙ্গে জবাব দিলেন আইজাক। অনেক আহত নাইটের ক্ষত ও সারিয়ে তুলেছে। যে ক্ষত চিকিৎসকরাও অনেক সময় সারাতে পারেনি, ও তা ভালো করে দিয়েছে।

কোথায় শিখলো এসব কায়দা কানুন?

আমাদের গোত্রের এক বৃদ্ধার কাছে।

কে সেই বুড়ি?

তার নাম মরিয়ম–

কী! সেই জাদুকরী মরিয়ম! যার জাদু বিদ্যারকাহিনী সারা খ্রীষ্টান দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছিলো! যাকে পুড়িয়ে মারা হয়েছিলো! শুনেছো, কনরাড? আমি ঠিক বলেছি কি না? বদমাশ ইহুদী! আইজাকের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করলেন গ্র্যান্ডমাস্টার। তোর মেয়ে ডাইনী। আর কত বড় সাহস, টেম্পল-এর নাইটদের সে জাদু করে! এক্ষুনি তুই দূর হয়ে যা আমার সামনে থেকে, নইলে তোর মৃত্যু কেউ ঠেকাতে পারবে না। মেয়েকে ছাড়াতে এসেছে, হাহ্! শুনে রাখ, ওর বিচার হবে। যদি ডাইনী প্রমাণ হয়, পুড়িয়ে মারা হবে ওকে!

স্যার, নাইট! মহামান্য গ্র্যান্ড মাস্টার শুরু করতে গেলেন আইজাক।

দূর হয়ে যা আমার সামনে থেকে, ভণ্ড ইহুদী, নয়তো রক্ষীদের ডাকবো।

আর কোনো উপায় না দেখে মঠ থেকে বেরিয়ে গেলেন আইজাক।

মঠের প্রধান পুরোহিতকে ডাকলেন গ্র্যান্ড মাস্টার।

আলবার্ট ম্যালভয়সিঁ! এই মঠে একজন ইহুদী ডাইনীকে এনে রাখা হয়েছে, আর আপনি তার কোনো প্রতিকার করছেন না, আশ্চর্য!

ইহুদী ডাইনী! চমকে উঠলেন আলবার্ট ম্যালভয়সিঁ।

হ্যাঁ, ইহুদী ডাইনী। ইয়র্কের সুদখোর আইজাকের মেয়ে। সে এখন এই পবিত্র মঠেই আছে। ছি!

কিন্তু কোথায়?

টেম্পলার ব্রায়ানের ঘরে খুঁজে দেখুন। এক মুহূর্ত থামলেন গ্র্যান্ড মাস্টার। তারপর বললেন, উচিত শাস্তি দিতে হবে ওকে। আপনি বিচার সভার আয়োজন করুন।

.

নাইট টেম্পলার ব্রায়ান দ্য বোয়া-গিলবার্টের ঘরে বন্দী রেবেকা।

যখন দুপুরের ঘণ্টা পড়লো, ও শুনতে পেলো অনেকগুলো পায়ের শব্দ এগিয়ে আসছে ওর ঘরের দিকে। একটু স্বস্তি বোধ করলো রেবেকা। এ ঘরের ভেতরে বা বাইরে অন্য লোক থাকলে ব্রায়ান এসে বারবার তাকে বিরক্ত করতে পারবে না।

খুলে গেল ঘরের দরজা এক সঙ্গী ও চারজন অনুচরসহ ভেতরে ঢুকলেন মঠের প্রধান পুরোহিত। রেবেকাকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে বিস্ময়ে হাঁ হয়ে গেল তার মুখ। টেম্পলার ব্রায়ানের ঘরে সত্যি সত্যিই একজন মহিলাকে দেখবেন গ্র্যান্ডমাস্টারের কথা শোনার পরও আশা করেননি তিনি। এক মুহূর্ত স্থায়ী হলো তার মুখের বিস্মিত ভাব। তারপরই সেখানে দেখা দিলো ক্রোধ।

ওঠো! চলো আমার সাথে! কঠোর স্বরে আদেশ করলেন তিনি।

কোথায় যাবো? কেন?

প্রশ্ন করার অধিকার তোমার নেই। আদেশ পালন করাই তোমার কাজ।তবু বলছি, গ্র্যান্ডমাস্টারের বিচার সভায় তোমার বিচার হবে।

বিচারের কথা শুনে প্রথমে ঘাবড়ে গেল রেবেকা। তারপর আশার সঞ্চার হলো ওর মনে বিচারক খ্রীষ্টান হলেও বিচারক তো! হয়তো ন্যায় বিচারই পাওয়া যাবে। আর ন্যায় বিচার পেলে মুক্তি পাবে।

বিচার সভায় নিয়ে আসা হলো রেবেকাকে।

উঁচু একটা বেদীর ওপর বসেছেন প্রধান বিচারক, গ্র্যান্ডমাস্টার অভ দ্য নাইটস টেম্পলার। হাতে গ্র্যান্ডমাস্টারের দণ্ড! তাঁর পায়ের কাছে নিচু একটা টেবিলে বসে দুজন লিপিকার। বিচার অনুষ্ঠানের কার্যবিবরণী লিখবে তারা। বিচারকমণ্ডলীর অপর চার সদস্য চার প্রধান পুরোহিত। গ্র্যান্ডমাস্টারের চেয়ে সামান্য নিচু চারটে আসনে তারা বসেছেন, প্রধান বিচারকের দুপাশে দুজন করে। বেদীর দুপাশে দুটো কাঠগড়া। একটায় দাঁড়িয়ে আছে আসামী। অন্যটা এখন ফাঁকা। যারা সাক্ষী দেবে তারা এসে দাঁড়াবে ওটায় যে বিরাট হলঘরটায় বিচার সভা বসেছে তিল ধারণের স্থান নেই তাতে। ডাইনীর বিচার হবে, যে শুনেছে সে-ই হাজির হয়েছে দেখতে।

অবশেষে শুরু হলো বিচার অনুষ্ঠান।

সমবেত দর্শক ও শ্রোতমণ্ডলী, জলদগম্ভীর স্বরে শুরু করলেন গ্র্যান্ড মাস্টার, ইয়র্কের ইহুদী আইজাকের কন্যা রেবেকার বিচার করতে আমরা এখানে সমবেত হয়েছি। ইহুদী কন্যার বিরুদ্ধে অভিযোগ গুরুতর। সে নাকি ডাইনী, জাদুবিদ্যার চর্চা করে। শুধু চর্চা করেই ক্ষান্ত হয়নি, সে তার জাদুর প্রভাবে এই পবিত্র মনে একজন টেম্পলারকে মোহিত করে রেখেছে। যারা এই জাদুকরী, ডাইনীর স্বপক্ষে বা বিপক্ষে সাক্ষী দিতে প্রস্তুত তারা দাঁড়াও।

বিপক্ষে সাক্ষী দেয়ার জন্যে বেশ কয়েকজনকেই পাওয়া গেল। বেশির ভাগই টেম্পলার ব্রায়ানের সঙ্গী। কি করে নাইট টেম্পলার রায়ান দ্য, বোয়াগিলবার্ট টরকুইলস্টোন দুর্গ রক্ষার দায়িত্ব উপেক্ষা করে, নিষ্ট্রের প্রাণ বিপন্ন করে আগুনের হাত থেকে রেবেকাকে বাঁচিয়েছে তার বিশদ বিবরণ দিলো তারা।

আসামীর অতীত জীবন সম্পর্কে সাক্ষ্য দিতে পারে এমন কেউ এখানে আছে? জিজ্ঞেস করলেন গ্র্যান্ড মাস্টার।

দর্শকদের ভেতর থেকে কেউ কোনো সাড়া শব্দ করলো না।

মানে, আমি বলতে চাইছি, আবার বললেন গ্র্যান্ডমাস্টার, আসামী যে অনেকদিন ধরেই জাদুবিদ্যার চর্চা করে আসছে তা কেউ জানে?

এবার হলঘরের এক কোণে একটু গোলমাল মতো শুরু হলো। গ্র্যান্ড মাস্টার তার কারণ জানতে চাইলেন। জানা গেল, সেখানে এক কৃষক উপস্থিত আছে, যে এক সময় মারাত্মক অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী ছিলো। কোনো চিকিৎসকের ওষুধে তার অসুখ ভালো হয়নি। পরে আজকের আসামীই তুকতাক করে তাকে অনেকখানি সুস্থ করে তুলেছে। এখন সে লাঠি ভর দিয়ে হাঁটতেও পারে।

গ্র্যান্ডমাস্টারের নির্দেশে অনিচ্ছা সত্ত্বেও উঠে দাঁড়ালো লোকটা।

তোমার নাম কি? জিজ্ঞেস করলেন গ্র্যান্ডমাস্টার।

হিগ।

কি হয়েছিলো বলো তো।

একটু ইতস্তত করে হিগ শুরু করলো তখন আমি আসামীর বাবা আইজাকের অধীনে কাজ করতাম। হঠাৎ একদিন অসুস্থ হয়ে পড়ি। তখন আসামীর নির্দেশ মতো ওষুধপত্র খেয়ে আমি অনেকখানি ভালো হয়ে উঠি।

ইহুদী ডাইনীর ওষুধে ভালো না হয়ে অসুখে মরাই তোমার জন্যে ভালো ছিলো, গ্র্যান্ড মাস্টার মন্তব্য করলেন।

যার কাছ থেকে এক সময় উপকার পেয়েছে গ্র্যান্ডমাস্টারের ভয়ে তার বিরুদ্ধে সাক্ষী দিতে হলো বলে মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেল হিগের। সে আর এখানে থাকবে না বলেই ঠিক করলো। কিন্তু বিচারের ফলাফল শেষ পর্যন্ত কি হয় তার জন্যে সে রয়ে গেল।

গ্র্যান্ডমাস্টার এবার রেবেকাকে জিজ্ঞেস করলেন, স্বপক্ষে বলার মতো কিছু আছে তোমার?

আপনার কাছে দয়া ভিক্ষা করে লাভ নেই, বললো রেবেকা। তা আমি করতেও চাই না। কিন্তু, টেম্পলার ব্রায়ান এখানে উপস্থিত আছেন, তাকেই আমি জিজ্ঞেস করছি, বলুন স্যার টেম্পলার, আমার বিরুদ্ধে যে ভয়ঙ্কর অভিযোগ আনা হয়েছে তা সম্পূর্ণ মিথ্যে ও ভিত্তিহীন কি না?

অখণ্ড নিস্তব্ধতা বিচার কক্ষে। টেম্পলার ব্রায়ানের জবাব শোনার জন্যে রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছে সবাই।

মুখ খুলুন, টেম্পলার, আবার বললো রেবেকা। আপনি যদি মানুষ হন, যদি সত্যিকারের খ্রীষ্টান হন, আমার কথার জবাব দিন! আপনি যদি সত্যিকারের নাইট হয়ে থাকেন তাহলে তার মর্যাদা রাখুন।

জবাব দাও, ব্রায়ান দ্য বোয়া গিলবার্ট! নির্দেশ দিলেন গ্র্যান্ড মাস্টার।

ব্রায়ানের মনে তখন দ্বন্দ্ব চলছে। তার কথার ওপর নির্ভর করছে রেবেকার জীবন। আবার সত্য বললে ধুলায় গড়াগড়ি যাবে তার নিজের মান মর্যাদা সুনাম। এই দোটানায় পড়ে অনেকক্ষণ সে কোনো কথা বলতে পারলো না। অবশেষে তার মুখ দিয়ে একটা মাত্র কথা বেরোলো-ভাঁ-ভাঁজ করা কাগজ!

এই ডাইনীর জাদু শক্তি এমনই যে আমাদের টেম্পলার কথা বলার শক্তি পর্যন্ত হারিয়ে ফেলেছে, গ্র্যান্ডমাস্টার বললেন। তবে অনেক কষ্টে যে কাগজের কথা ও বলেছে তা-ই সাক্ষ্যের কাজ করবে। দেখাও, ডাইনী, কাগজটা!

রেবেকাকে যখন বিচার সভায় আনা হয় তখন ভীড়ের ভেতর কে যেন তার হাতে একটা কাগজ গুঁজে দিয়ে যায়। রেবেকা এতক্ষণ তা খুলে দেখারও সুযোগ পায়নি। গ্র্যান্ডমাস্টারের কথায় সে সেটা খুলে দেখলো।

একজন চ্যাম্পিয়ন* দাবি কর, লেখা রয়েছে কাগজটায়।

কথা কটির মধ্যে একটু যেন আশার আলো দেখতে পেলো রেবেকা।

আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে তা সম্পূর্ণ মিথ্যে, ভিত্তিহীন, বললো সে। আমি নিরপরাধ। আপনাদের আইনে আছে, দুই যোদ্ধার মধ্যে দ্বন্দ্বযুদ্ধে** এ ধরনের অভিযোগের মীমাংসা হতে পারে। আমি প্রার্থনা করছি, এক্ষেত্রেও তাই করা হোক। মাননীয় বিচারকদের অনুমতি পেলে একজন চ্যাম্পিয়ন লড়বে আমার পক্ষ হয়ে।

তোমার মতো ডাইনীর পক্ষে লড়ার জন্যে কে এগিয়ে আসবে?

আমি যদি নিরপরাধ হই, ঈশ্বরই আমার পক্ষে লড়ার জন্যে কাউকে না কাউকে পাঠিয়ে দেবেন।

সহকারী বিচারকদের সাথে কয়েক মুহূর্ত পরামর্শ করলেন গ্র্যান্ড মাস্টার। অবশেষে বললেন, ঠিক আছে, তোমার প্রার্থনা মঞ্জুর করা হলো। তিন দিনের সময় দেয়া হচ্ছে। এর মধ্যে তোমাকে জোগাড় করতে হবে তোমার চ্যাম্পিয়ন। আমাদের মঠের পক্ষে লড়বে টেম্পলার ব্রায়ান দ্য বোয়া-গিলবার্ট।

তিন দিন যে খুব কম সময়।

হলেও কিছু করার নেই। এর চেয়ে বেশি সময় তোমাকে দেয়া যাবে না।

বেশ, রেবেকা বললো, ঈশ্বরের ইচ্ছা যদি তাই হয় আমি আর কি বলবো? আমি তারই ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর করছি।

ম্যালভয়সিঁ, গ্র্যান্ডমাস্টার বললেন, এবার তাহলে লড়াইয়ের জায়গা ঠিক করে ফেল।

সেইন্ট জর্জ গির্জার সামনে যে ফাঁকা জায়গা আছে সেখানেই হতে পারবে।

ভালো কথা। রেবেকা, তিন দিনের ভেতর তুমি ওখানে তোমার চ্যাম্পিয়নকে হাজির করবে। যদি না পারো, বা তোমার চ্যাম্পিয়ন যদি পরাজিত হয় তাহলে ডাইনীদের যেভাবে পুড়িয়ে মারা হয় তোমাকেও সেভাবে পুড়িয়ে মারা হবে।

চুপ করে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলো রেবেকা। তারপর বললো, চ্যাম্পিয়ন জোগাড় করার জন্যে আমি আমার আত্মীয়-স্বজনদের সাথে যোগাযোগ করার সুযোগ প্রার্থনা করছি।

সংগত প্রার্থনা। দেখ এখানে যারা আছে তাদের কেউ তোমার আত্মীয়-স্বজনদের কাছে যেতে রাজি আছে কি না।

উপস্থিত জনতার উদ্দেশ্যে রেবেকা বললো, সত্যের খাতিরে বা অর্থের বিনিময়ে আমার একটা চিঠি আমার বাবার কাছে পৌঁছে দিতে রাজি আছেন কেউ চুপ করে আছে জনতা। খোদ গ্র্যান্ডমাস্টারের সামনে ডাইনীর অভিযোগে অভিযুক্ত একজন ইহুদী নারীকে সাহায্য করার সাহস কেউ পাচ্ছে না।

এই সামান্য উপকারটুকু করার সৎসাহস কারো নেই! বললো রেবেকা। তাহলে কি আমি আত্মরক্ষার কোনো সুযোগই পাবো না?

সাক্ষী দেয়ার পর থেকেই অনুতাপে দগ্ধ হচ্ছিলো হিগের অন্তর। এবার সে উঠে দাঁড়ালো। বললো, আমি পঙ্গু, ভালো করে হাঁটতে পারি না। তবু আমি নেবো এ ভার।

ঈশ্বরের অনুগ্রহ হলে বোবা কথা বলতে পারে, পঙ্গু পাহাড় ডিঙাতে পারে, স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বললো রেবেকা। চিন্তা কোরো না, হিগ, ঈশ্বরই তোমাকে হাঁটার শক্তি দেবেন। এরপর রেবেকা গ্র্যান্ডমাস্টারের দিকে তাকিয়ে বললো, আমি একটা চিঠি লিখবো আমার বাবার কাছে। আমাকে কাগজ কলম দেয়া হোক।

আসামীকে কাগজ কলম দেয়ার নির্দেশ দিলেন গ্র্যান্ডমাস্টার।

সংক্ষেপে তার অবস্থার কথা লিখে চিঠিটা হিগের হাতে দিলো রেবেকা। বললো, আমার বাবাকে দেবে চিঠিটা। মনে রেখো, তোমার ওপরেই আমার জীবন মরণ নির্ভর করছে।

আমার প্রতিবেশী বুথানের ঘোড় নিয়ে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমি ইয়র্কে পৌঁছানোর চেষ্টা করবো, বলে বিদায় নিলো হিগ।

ভাগ্য ভালো হিগের, রেবেকারও।

পথে নামার কিছুক্ষণের ভেতর হিগ দেখলো, দুজন ইহুদী টেম্পলস্টোর দিকেই আসছে। আরেকটু কাছাকাছি হতেই সে চিনতে পারলো, দুই ইহুদীর একজন আইজাক। তাঁকে থামিয়ে রেবেকার চিঠিটা তাঁর হাতে দিলো হিগ।

গভীর হতাশা নিয়ে আইজাক পড়লেন:

বাবা,

আমার বিরুদ্ধে ডাইনীর অভিযোগ আনা হয়েছে। যদি কোনো নাইট আমার পক্ষ হয়ে লড়ে জয়লাভ করতে পারেন একমাত্র তাহলেই প্রমাণ হবে আমি নির্দোষ। তা না হলে আমাকে আগুনে পুড়িয়ে মারা হবে। তিন দিন সময় দেয়া হয়েছে আমাকে। এর মধ্যে যদি কোনো নাইট আমার পক্ষ হয়ে লড়তে রাজি না হন, তাহলে আমার বাঁচার কোনো আশা নেই। আমার ধারণা, স্যাক্সন সেড্রিকের পুত্র আইভানহো নিজেই আমার পক্ষে লড়তে রাজি হলেন, অবশ্য এর ভেতর যদি তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠে থাকেন। যদি তিনি এখনো সুস্থ না হয়ে থাকেন তবু আমার বিশ্বাস, কাউকে না কাউকে তিনি পাঠাবেন। আইভানহোকে এই খবর দিয়ে বলবেন, রেবেকা নির্দোষ।

————
* চ্যাম্পিয়ন: অন্য একজনের হয়ে লড়াই করে যে নাইট।

** সে যুগের রীতি অনুযায়ী এ ধরনের যুদ্ধে যে জয়ী হতো, ধরে নেয়া হতো তার দাবিই সঠিক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *