১৭. হার্ট হিল ওয়াক-এর বিশাল ওক গাছটা

পরদিন ভোর।

হার্ট হিল ওয়াক-এর বিশাল ওক গাছটার নিচে জড় হয়েছে বিজয়ী পক্ষ। লুটের মালপত্র ভাগ বাটোয়ারা হবে। দলের নেতা বনের রাজা লক্সলি। সবুজ ঘাসের ওপর বসেছে সে ডান পাশে ব্ল্যাক নাইট আর বাঁ পাশে সেড্রিককে নিয়ে।

লক্সলির কয়েকজন অনুচর দুটো ভাগে ভাগ করে সাজিয়ে রাখলো লুট করে আনা জিনিসগুলো। তারপর লক্সলি বললো, মহান সেড্রিক, লুটের মালপত্র সব দুভাগে ভাগ করা হয়েছে। আপনার যে ভাগ ইচ্ছা আপনি নিন। আপনার যেসব লোক আমাদের সাহায্য করেছে তাদের ভেতর বিলিয়ে দেবেন।

এসবের কোনো প্রয়োজন আমার নেই, বললেন সেড্রিক। তোমরা যে প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে আমাদের জীবন আর সম্মান বাঁচিয়েছে সে জন্যে তোমাদের আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। এর দুটো ভাগই তোমরা নাও। আমি সত্যিই খুশি হবো। আমার লোকদের আমি নিজেই পুরস্কার দেবো।

এরপর সেড্রিক ওয়াম্বার দিকে তাকালেন। বললেন, এদিকে আয়, বোকা-গাধা-ভড়।

এই নাকি প্রাণ বাঁচানোর পুরস্কার! বিড় বিড় করতে করতে এগিয়ে এলো ওয়া।

সেড্রিক উঠে জড়িয়ে ধরলেন ওকে।

কি করে তোর ঋণ শোধ করবো বল তো, হাঁদা? আমার জন্যে প্রাণ দিতে গেছিলি তুই…, বলতে বলতে গলা ধরে এলো বদমেজাজী লোকটাব। সুহৃদ অ্যাথেলস্টেনের মৃত্যুতেও যে চোখে জল দেখা যায়নি সে চোখে টল টল করে উঠলো জল।

চোখের জলে তো আমার ঋণ শোধ হবে না, স্বভাবসুলভ চপল কণ্ঠে বললো ওয়াম্বা। শোধ যদি করতেই চান আমার দোস্ত গার্থকে ক্ষমা করুন। আপনার ছেলের সেবা করার জন্যেই ও পালিয়ে গিয়েছিলো।

ওকে শুধু ক্ষমা নয়, পুরস্কারও দেবো। গার্থের দিকে ফিরলো সেড্রিক। এদিকে এসো, গার্থ। হাঁটু গেড়ে বসো। আজ থেকে তুমি আর ক্রীতদাস নও। আর দশজনের মতোই স্বাধীন মানুষ। আমার জমিদারীতে কিছু জমি দেবো তোমাকে। স্বাধীনভাবে চাষবাস করবে।

লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ালো গার্থ। মাথার উপর দুহাত তুলে এক পাক ঘুরে নিয়ে তাকালো সাবেক মনিবের দিকে।

আপনার মতো দয়াশীল লোক হয় না, স্যার! চিৎকার করে উঠলো সে। আমার গলার এই আংটা খুলে দেবে কে?

ওয়াম্বা, তুইও বোস হাঁটু গেড়ে, আদেশ করলেন সেড্রিক।

বসলো ভাঁড়।

তুইও আজ থেকে স্বাধীন, সেড্রিক বললেন গার্থের গলার আংটা খুলে দে, তোরটা খুলে দেবে গার্থ।

এই সময় ঘোড়ায় চেপে সেখানে উপস্থিত হলো রোয়েনা। লক্সলি ও তার দলের সবাই উঠে দাঁড়িয়ে তাকে অভ্যর্থনা করলো। সবাইকে ধন্যবাদ জানালো রোয়েনা।

একপাশে মুখ নিচু করে বসে ছিলো বন্দী দ্য ব্রেসি। সে এবার উঠে দাঁড়ালো। অনুতপ্ত গলায় বললো, আপনার সাথে যে জঘন্য আচরণ করেছি সে জন্যে ক্ষমা চাইছি, লেডি রোয়েনা।

ক্ষমা করলাম আপনাকে, ঘোড়া থেকে নামতে নামতে বললো রোয়েনা। কিন্তু আপনার পাগলামিতে যে ক্ষতি হয়েছে, সবাইকে যে দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে সে কথা ভুলতে পারবো না কিছুতেই।

তোমাকে মেরে ফেললেই হতো উচিত শাস্তি, বলে উঠলেন সেড্রিক। অবশ্য না মেরেও যে খুব খারাপ হয়েছে তা নয়। তুমি যে অন্যায় করেছে, সে জন্যে যে অন্তর্জালা ভোগ করবে আজীবন সে-ও শাস্তি হিশেবে কম নয়।

উঠে দাঁড়ালেন সেড্রিক। আর সময় নষ্ট করতে চান না। এক্ষুনি রদারউডের পথে রওনা না হলে পৌঁছুতে দেরি হয়ে যাবে। ব্ল্যাক নাইটের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন তিনি। উষ্ণ অভিনন্দন জানিয়ে দারউডে আমন্ত্রণ জানালেন তাকে।

সাধারণ অতিথি হিশেবে নয়, বললেন সেড্রিক, আমার পুত্র বা ভাইয়ের মতো সাদরে আপনাকে অভ্যর্থনা জানাবো আমার প্রাসাদে।

আপনার আমন্ত্রণ গ্রহণ করলাম, সেড্রিক, জবাব দিলো নাইট। খুব শিগগিরই আপনার রদারউডে আমি আসবো। এবং যখন আসবো বিশেষ

একটা জিনিস আমি চাইবো আপনার কাছে।

কি তা এখন আমি শুনতে চাইবে না। শুধু এটুকু বলবো, ধরে নিন জিনিসটা আপনি পেয়ে গেছেন।

দেখবো, আজকের এই প্রতিশ্রুতির কথা সেদিন আপনার কেমন মনে থাকে!

দেখবেন, বলে দলবল নিয়ে রওনা হয়ে গেলেন সেড্রিক। গাৰ্থ আর ওয়াম্বা রয়ে গেল ব্ল্যাক নাইটের নির্দেশে। তাদের এক পাশে ডেকে নিয়ে কানে কানে কি যেন বললো নাইট। অমনি মাথা ঝাঁকিয়ে বনের ভেতর অদৃশ্য হয়ে গেল দুজন।

লক্সলি এবার এগিয়ে এলো ব্ল্যাক নাইটের দিকে।

স্যার নাইট, আপনার সাহায্য না পেলে আমাদের সব চেষ্টা ব্যর্থ হতো, বললো সে। আমি এবং আমার দলের সবাই আপনার প্রতি কৃতজ্ঞ। অনুগ্রহ করে এই সব লুটের মাল থেকে আপনার পছন্দ মতো কিছু একটা গ্রহণ করুন। আমরা সবাই খুব খুশি হবো।

বেশ, বেশ, আমি তোমার উপহার সানন্দে গ্রহণ করবো। আমার পছন্দ দ্য ব্রেসিকে। ওকে তুলে দাও আমার হাতে।

কোনো আপত্তি নেই আমার। দ্য ব্রেসির ভাগ্য আপনি ওকে নিয়ে যেতে চাইছেন। এখানে থাকলে যে দুর্দশা হতো তার হাত থেকে বেঁচে গেল বদমাশটা।

দ্য ব্রেসির সামনে গিয়ে দাঁড়ালো ব্ল্যাক নাইট।

তোমাকে মুক্তি দিলাম, দ্য ব্রেসি, বললো সে। যেখানে খুশি চলে যেতে পারো। অতীতে যা করেছে তা হয়তো আমরা ভুলে যাবো যদি ভবিষ্যতে সাবধান হও।

দ্য ব্রেসি আজানু নত হয়ে কুর্নিশ করলো ব্ল্যাক নাইটকে।

আপনার কথা আমার মনে থাকবে, স্যার নাইট, বলে সে অদৃশ্য হয়ে গেল বনের ভেতর।

লক্সলি এবার তার গলা থেকে একটা চমৎকার শিঙা খুলে নিলো। ব্ল্যাক নাইটকে বললো, সেদিনের টুর্নামেন্টে আমি এটা পুরস্কার পেয়েছি। কালকের যুদ্ধে আপনি যে বীরত্ব দেখিয়েছেন তার স্মৃতিচিহ্ন হিশেবে এটা আমি আপনাকে দিতে চাই। আপনি নিলে খুশি হবো।এই শেরউড বনে যদি কখনো কোনো বিপদে পড়েন তিনবার ফুঁ দেবেন এই শিঙায়, এমন করে, শিঙাটা তিনবার বাজিয়ে দেখালো লক্সলি, আমার লোকজন এসে আপনাকে সব রকম সাহায্য করবে।

আমি নিচ্ছি তোমার এই উপহার, বললো ব্ল্যাক নাইট। অনেক ধন্যবাদ। প্রয়োজন হলে নিশ্চয়ই তোমাদের সাহায্য চাইবো।

কিন্তু আমাদের বীর পুরুষ সন্ন্যাসী বাবাজি কোথায়? হঠাৎ মনে পড়ে গেছে এমন ভঙ্গিতে প্রশ্ন করলো লক্সলি। যেসময় খাবার দাবারের বন্দোবস্ত হয় বা লুটের মাল ভাগাভাগি হয় সে সময় তো কখনো তাকে গর হাজির থাকতে দেখিনি! আজ হলো কী?

লক্সলির কথা শেষ হতে না হতেই গম্ভীর একটা গলা শোনা গেল: পথ ছাড়ো! ভালো মানুষের দল পথ ছাড়ো! বিজয়ী বীর আর তার বন্দীর জন্যে পথ ছেড়ে দাও!

গলাটা সন্ন্যাসী বাবাজির। ইহুদী আইজাকের কোমরে দড়ি বেঁধে টানতে টানতে আসছেন তিনি। অন্য হাতে বিরাট একটা তলোয়ার, বন বন করে ঘোরাচ্ছেন মাথার ওপর। দেখে অদম্য হাসিতে ফেটে পড়লো সবাই।

এতক্ষণ কোথায় ছিলেন, ফাদার? জানতে চাইলো লক্সলি। আর এই ইহুদীকেই বা পেলেন কোথায়?

আর বোলো না, জবাব দিলেন কপম্যানহাস্ট্রের সরাসী, একটু ভালো পানীয় পাওয়ার আশায় টরকুইলস্টোন প্রাসাদের তল কুঠুরীতে ঢুকেছিলাম কাল বিকেলে। বেশ কিছুক্ষণ খোঁজাখুঁজির পর সবে ছোট্ট একটা মদের পিপের সন্ধান পেয়েছি, এমন সময় পাশের একটা ঘরের দিকে চোখ পড়লো। দরজায় তালা, কিন্তু চাবি দেয়া নয়। দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে দেখি এক কোনায় জড়সড় হয়ে বসে আছে এই বুড়ো। আমাকে দেখেই পা জড়িয়ে ধরলো। দয়া হলো আমার। ব্যাটাকে নিয়ে বেরিয়ে আসবো এমন সময় ওপর থেকে কড়ি বরগা খসে পড়ে বন্ধ হয়ে গেল বেরোনোর পথ। বাঁচার কোনো আশাই রইলো না। কিন্তু ইহুদীর সাথে মরবো–ভাবতেও পারি না শেষমেশ সিদ্ধান্ত নিলাম, তলোয়ারের এক ঘায়ে ব্যাটার কল্লাটা নামিয়ে দিই। জ্যান্ত ইহুদী আর মরা ইহুদীতেঅনেক তফাৎ, তাই না? কিন্তু বেচারার বয়স দেখে মায়া হলো আমার। তলোয়ার আর উঠলো না। শেষকালে ব্যাটাকে খ্রীষ্টধর্মের মহিমা শোনাতে শুরু করলাম। ভাবলাম তাতে হয়তো এই মহান ধর্মে ওর মতি হবে। মনে হয় কিছু ফল হয়েছে।

তাই নাকি, আইজাক? জিজ্ঞেস করলো লক্সলি।

মোটেই না, চিৎকার করে উঠলেন বৃদ্ধ ইহুদী। সারারাত আমার কানের কাছে উনি কি বকর বকর করেছেন, তার এক বর্ণ আমি বুঝিনি।

অবিশ্বাসী! তুমি মিথ্যে বলছো! এই নাও তার শাস্তি, বলতে বলতে ফাদার ঘুষি মারার জন্যে তৈরি হলেন আইজাককে।

ব্ল্যাক নাইট বাধা দিলো তাকে। বললো, ফাদার, এবারের মতো মাফ করে দিন অবিশ্বাসীকে।

তাহলে আপনিই নিন, বলে ঘুসি বাগিয়ে এগিয়ে এলেন ফাদার।

ধার হিশেবে হলে আপত্তি নেই। পরে সুদ আসলে শোধ দেবো। কি রাজি?

সন্ন্যাসীর ঘূসির ওজন মারাত্মক। কথাটা অনেকেই জানতো। তাই সবাই যখন দেখলো তার প্রমাণ আকারের একটা ঘুসি খেয়ে ব্ল্যাক নাইট একটু টললো না পর্যন্ত তখন তারা অবাক না হয়ে পারলো না।

এবার আমার ধার শোধ করার পালা। সোজা হয়ে দাঁড়ান, ফাদার, বলেই ব্ল্যাক নাইট তাকে এমন এক ঘুসি মারলো, চিৎ হয়ে মাটিতে পড়ে গেলেন ফাদার।

যাক, শোধ বোধ হয়ে গেল, উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললেন তিনি। এবার ইহুদীটার একটা ব্যবস্থা করে ফেলা উচিত। ও যখন কিছুতেই নিজের ধর্ম ছাড়বে না, তাহলে বলুক মুক্তিপণ হিশেবে কি দেবে।

দুশ্চিন্তার কিছু নেই, আইজাক, লক্সলি বললো, সময় নিয়ে ঠাণ্ডা মাথায় ভাবুন, কি দেবেন বা কত দেবেন, এই ফাঁকে আমরা আরেক বন্দীর সাথে আলাপ সেরে ফেলি। নিয়ে এসো ওকে!

লক্সলির কয়েক স্যাঙাৎ টানতে টানতে নিয়ে এলো জরভক্স মঠের প্রায়োর অ্যায়মারকে।

ডাকাতদের ওপর ভয়ানক রেগে গেছেন অ্যায়মার, আবার ভয়ও পেয়েছেন।

এ কি ধরনের আচরণ, চিৎকার করে উঠলেন তিনি। রাজার সড়ক থেকে একজন প্রায়োরকে ধরে আনো তোমরা, এত বড় সাহস! আমার জরুরি কাগজপত্র সব নিয়ে নিয়েছে। আমার পোশাক আশাক, সোনা দানা যা ছিলো সব…, দম নেয়ার জন্যে থামলেন তিনি।

হ্যাঁ, বলে যান, প্রায়োর, মৃদু হেসে বললো লক্সলি।

প্রায়োর দেখলেন তার রাগ দেখে মজা পাচ্ছে ডাকাতগুলো। কথা বলার ভঙ্গি বদলালেন তিনি। দেখ আমি শান্তিপ্রিয় মানুষ। তোমাদের ক্ষমা করে দিয়ে সব ভুলে যেতে রাজি আছি। কিন্তু তার আগে আমার কাছ থেকে যা যা তোমরা নিয়েছে সব ফেরত দেবে, আর ক্ষতিপূরণ হিশেবে দেবে একশো রৌপ্য মুদ্রা।

আমার লোকরা আপনার সাথে দুর্ব্যবহার করেছে বলে আন্তরিকভাবে দুঃখিত আমি, ফাদার, বললল ললি।

দুর্ব্যবহার! বিস্ময়ের সাথে উচ্চারণ করলেন প্রায়োর। শুধু দুর্ব্যবহার হলে তো কথা ছিলো না। ঐ লোকটা কি যেন নাম?–অ্যালান-আ-ডেল, বলে কি না, চারশো রৌপ্য মুদ্রা না দিলে আমাকে ফাঁসিতে ঝোলাবে! আমার সোনা দানা সব নেয়ার পরও এ কথা বলে!

আপনি ঠিক বলছেন, প্রায়োর? সত্যিই অ্যালান-আ-ডেল একথা বলেছে?

নিশ্চয়ই বলেছে!

তা হলে তো ও যা চেয়েছে, আপনাকে দিতেই হবে। অ্যালান-আডেল যা বলে তা করে ছাড়ে।

কী! চিৎকার করে উঠলেন হতভম্ব প্রায়োর। নিশ্চয় তোমরা রহস্য করছো। দেখ, রহস্য আমিও পছন্দ করি। কিন্তু এ ব্যাপারটা মোটেই তেমন না।

ঠিক, ফাদার, লক্সলি বললো, এ ব্যাপারটা মোটেই রহস্য নয়। আমরা যা চেয়েছি যদি না দেন এ বন থেকে প্রাণ নিয়ে বেরুতে পারবেন না।

এবার আর রাগ নয়, সত্যি সত্যিই ভয় ভর করলো প্রায়োর অ্যায়মারের মনে।

কত চাও তোমরা? জিজ্ঞেস করলেন তিনি।

সঙ্গে সঙ্গে কোনো জবাব দিলো না লক্সলি। দেরি দেখে ওর এক অনুচম বলে উঠলো, আমার একটা প্রস্তাব আছে, বলবো?

বলো।

আমার প্রস্তাব হলো, ইহুদী আইজাক ঠিক করুক প্রায়োর অ্যায়মারের মুক্তিপণ, আর আইজাকেরটা ঠিক করুক প্রায়োর।

হ্যাঁ, বুদ্ধিটা মন্দ না, একমত হলো লক্সলি। আইজাকের দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করলো, নিশ্চয়ই আপনি প্রায়োর অ্যায়মারকে চেনেন, তাঁর মঠ সম্পর্কেও জানেন ভালো করে?

হ্যাঁ, জবাব দিলেন বৃদ্ধ ইহুদী। ঐ মঠের সঙ্গে, ফাদার অ্যায়মারের সঙ্গেও আমি লেনদেন করেছি। মঠ এবং ফাদার দুজনেই ধনী।

তাহলে মুক্তিপণ হিশেবে কত দেয়া উচিত ফাদারের?। ছয়শো রৌপ্য মুদ্রা, আমার মনে হয়, খুব বেশি হবে না ওঁর পক্ষে।

ভালো কথা, বললো লক্সলি। আমি রাজি ছয়শো রৌপ্য মুদ্রায়। প্রায়োর অ্যাায়মর আপনি আমাদের ছয়শো রৌপ্য মুদ্রা দেবেন এবার বলুন, এই ই দী বৃদ্ধ কত দেবেন মুক্তিপণ?।

এক হাজার রৌপ্য মুদ্র। একটাও কম নয়। ব্যাটার ইয়র্কের বাড়ি সোনা রূপায় ঠাসা।

এক হাজার রৌপ্যমুদ্রা! আর্তনাদ করে উঠলেন আইজাক। আমার শেষ কপর্দকটা পর্যন্ত আপনারা নিয়ে নেবেন? আমার একমাত্র মেয়েকে আমি হারিয়েছি। এখন কি আমার সমস্ত সম্পদও হারাববা? ও রেবেকা! রেবেকা! তুই এখন কোথায়? হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন বৃদ্ধ। তুই বেঁচে আছিস না মরে গেছিস? আমার বাচ্চা! আমার মানিক!…।

বৃদ্ধের হাহাকার শুনে মন নরম হয়ে এলো সবারই। চুপ করে রইলো তারা! কেউ ভেবে পাচ্ছে না কি বলবে

আপনার মেয়ের চুল কি কালো? অবশেষে জিজ্ঞেস করলো একজন। কাপড়ের পাড় রূপালি জরির কাজ করা?

হ্যাঁ, হ্যাঁ। তুমি দেখেছো ওকে? ওর কোনো খবর দিতে পারবে? আগ্রহে কাঁপছে আইজাকের গলা।

টেম্পলার বোয়া-গিলবার্ট ওকে ধরে নিয়ে গেছে। আমি দেখেছি। যখন পালায় তখন আমি তীর ছোড়ার কথা ভেবেছিলাম। কিন্তু মেয়েটার গায়ে লাগতে পারে ভেবে ছুঁড়িনি।

ওই, কেন তুমি ছুঁড়লে না, তাই? টেম্পলারের মতো মানুষের হাতে আটকে থাকার চেয়ে মরা ভালো ছিলো ওর। ওহ! ওহ্! আমার মান সম্মান সব ধুলায় মিশে গেল!

লক্সলি মুখ ঘুরিয়ে তার সব লোকের দিকে তাকলো। দেখলে সবার দৃষ্টিতেই করুণা।

আইজাক, বললো সে। আপনার কাছ থেকে আমি পাঁচশো রৌপ্যমুদ্রা নেবো। বাকি টাকা আপনি টেম্পলার ব্রায়ানকে দেবেন কন্যার মুক্তিপণ হিশেবে। আশাকরি পাঁচশো রৌপ্যমুদ্রা পেলে আপনার মেয়েকে ছেড়ে দিতে রাজি হবে টেম্পলার।

প্রায়োর অ্যায়মারকে এক পাশে টেনে নিয়ে গিয়ে কড়া গলায় ঝুলি বললো, ফাদার, আমি এতদিন জানতাম আপনি ভালো খাওয়া দাওয়া, শিকার এসব পছন্দ করেন; কিন্তু বদমায়েশি, নিষ্ঠুরতা এসবও যে পছন্দ করেন তা কখনো শুনিনি।

মানে…মানে… তো তো করতে লাগলেন আয়মার।

মানে মানে, রেখে শুনুন। আমার মনে হয় আপনার কথা শুনবে টেম্পলার ব্রায়ান। রেবেকাকে ফিরিয়ে দিতে বলুন আপনার বন্ধুকে। বিনিময়ে ভালো দাম দেবেন আইজাক। চান তো আপনাকেও কিছু দেবেন উনি।

আমাকে ভাবনায় ফেলে দিলে দেখছি…, চিন্তিত কণ্ঠে বললেন প্রায়োর। ইহুরিকে সাহায্য করা আমাদের ধর্ম বিরুদ্ধ!…তবে…আইজাক যদি আমাদের মঠের সংস্কারের জন্যে কিছু সাহায্য দেয় তাহলে বোধ হয় আর আপত্তি করার কিছু থাকে না।

ঠিক আছে, দেবেন উনি। এবার তাহলে আপনি একটা চিঠি লিখে দিন ব্রায়ানকে।

দিচ্ছি। আমাকে একটা কলম দাও।

লেখা শেষ হতেই চিঠিটা প্রায়োরের কাছ থেকে নিয়ে পড়ে দেখলো লক্সলি। সন্তুষ্ট হয়ে এগিয়ে দিলো আইজাকের দিকে। বললো, চিঠিটা বোয়া-গিলবার্টকে দেবেন। আমার মনে হয় হাউস অভ দ্য টেম্পলারস মানে টেম্পলস্টো মঠে পাবেন ওকে। ব্রায়ান যা চায় দিয়ে দেবেন। দয়া করে এই একটা ক্ষেত্রে অন্তত টাকা পয়সা নিয়ে কোনো কৃপণতা করবেন না। আপনার কন্যার চেয়ে টাকা মূল্যবান নয়।

এতক্ষণ গভীর কৌতূহল নিয়ে এসব কাণ্ডকারখানা দেখছিলো ব্ল্যাক নাইট। এবার সে বিদায় নেয়ার জন্যে তৈরি হলো। যাওয়ার আগে লক্সলিকে ডেকে জিজ্ঞেস করলো, এবার নিশ্চয়ই বলবে, কে তুমি?

আমি আমার দেশ ও রাজার একজন বন্ধু, জবাব দিলো ললি। এর বেশি আর কিছু আমি এখন বলতে পারবো না। নিশ্চয়ই স্বীকার করবেন আমার মতো আপনারও কিছু গোপন কথা আছে। আমি তো তা জানতে চাইছি না।

বেশ। আশা করি পরের বার যখন আমাদের দেখা হবে, আরো ভালোভাবে আমরা জানবো একে অপরকে। এই আমার হাত, সাহসী দস্যু।

আর এই যে আমার, সাহসী নাইট।

দুটো হাত এক হলো।

লাফ দিয়ে ঘোড়ায় চাপলো ব্ল্যাক নাইট। ছুটিয়ে দিলো বনের পথে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *