১৭. ভাল নেই ইকথিয়ান্ডারের শরীর

ভাল নেই ইকথিয়ান্ডারের শরীর। ঘাড়ের পেছনের আঘাতটা বড় কষ্ট দিচ্ছে। টিশটিশে ব্যথা। হালকা হালকা জ্বরও এসেছে। কষ্ট হচ্ছে শ্বাস নিতে। তবুও পাহাড়ের কাছে সেই সৈকতে ইকথিয়ান্ডারের আসা থেমে নেই। শরীর যত খারাপই হোক, সবকিছু উপেক্ষা করে ওখানে হাজির হয় সে কি এক দুর্নিবার আকর্ষণে। দিনে অন্তত একবার গুট্টিয়ারাকে

দেখলে আজকাল ওর মনে হয় বেঁচে থেকে কোন লাভ নেই।

ঠিক দুপুর বেলায় এলো গুট্টিয়ারা। এসেই জানাল, আজ সে সাগর পাড়ে বেশিক্ষণ থাকতে পারবে না, বাবা কাজে বাইরে যাচেছ তাই দোকানে বসতে হবে আজকে ওর।

তাহলে চলো, তোমাকে পৌঁছে দিই, ওর কথা শুনে বলল ইকথিয়ান্ডার।

শহরে পৌঁছোনোর সেই ধুলোভরা সরু রাস্তাটা দিয়ে পাশাপাশি হাঁটছে ওরা। ওদের মাথার ওপর আগুন ঢালছে দুপুরের খর সূর্য।

রাস্তার উল্টো দিক থেকে আসছে অলসেন। তার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। কোনদিকে অলসেনের খেয়াল নেই। মাথাটা ঝুঁকে আছে বুকের কাছে। কি যেন ভাবছে একান্ত মনে। তাকে ডাক দিল গুট্টিয়ারা। ইকথিয়ান্ডারকে বলল, ওর সঙ্গে আমার কথা আছে। একটু অপেক্ষা করো, আমি আসছি।

অলসেনের কাছে দাঁড়িয়ে দ্রুত নিচু স্বরে কি যেন বলছে গুট্টিয়ারা। ইকথিয়ান্ডারের মনে হলো অনুরোধ করছে মেয়েটা অলসেনকে।

অলসেন উত্তর করল, ঠিক আছে, তাহলে আজ মাঝরাতের পরই।

কথা শেষে হাত মেলাল দুজন আন্তরিক ভাবে, তারপর ইকথিয়ান্ডারের কাছে ফিরে এলো গুট্টিয়ারা। ততক্ষণে অভিমানে গুম মেরে গেছে ইকথিয়ান্ডার। অবুঝ অনুভূতি ওকে ভেতরে ভেতরে অস্থির করে তুলেছে ইচ্ছে করছে অলসেনের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করে করতও, কিন্তু ভাষা খুঁজে পেল না আবেগে। কোনমতে শুধু বলল, আজ আমিও আর থাকতে পারছি না। কিন্তু একটা কথা। খুব জানা দরকার। আমার…তুমি…অলসেন…শুনলাম আজ রাতে তোমাদের দেখা হবে। তুমি আর অলসেন কি পরস্পরকে ভালবাসো?

নরম চোখের দৃষ্টিতে ইকথিয়ান্ডারকে দেখল গুট্টিয়ারা, তারপর কোমল স্বরে জিজ্ঞেস করল, বিশ্বাস করো তুমি আমাকে?

করি, ফিসফিস করল ইকথিয়ান্ডার, বিশ্বাস করি। কিন্তু তুমি তো জানো তোমাকে আমি ভালবাসি। খুব কষ্ট হয় আমার..যখন তুমি অন্য কারও সঙ্গে

ইকথিয়ান্ডার আজকে দৈহিক ভাবেও কাতর হয়ে পড়েছে। পাঁজরের সেই ব্যথাটা বেড়েছে আবার। তাকে হাঁপাতে দেখে জিজ্ঞেস করল গুট্টিয়ারা, তুমি কি অসুস্থ? মনের কষ্টে এমন হচ্ছে না তো? কষ্ট পেয়ো না। বিশ্বাস করো। আমাকে বিশ্বাস করো। তোমার কাছে আমি কিছুই লুকোইনি। শান্ত হও। ইকথিয়ান্ডার, শান্ত হও।।

একটু দূরেই আছে একজন অশ্বারোহী। দুলকি চালে যেন এদিকেই আসছে। গুট্টিয়ারাকে দেখে ঘোড়ার মুখ ফিরিয়ে দ্রুত এগিয়ে এলো সে। ইকথিয়ান্ডার তাকাল লোকটার মুখে। মনে হলো কোথায় যেন দেখেছে আগে। শহরে, নাকি সাগরে নিশ্চিত হতে পারল না। অশ্বারোহীও চোখে কৌতূহল আর বিদ্বেষ নিয়ে তাকাল ইকথিয়াল্ডারের দিকে। হঠাৎ করেই গুট্টিয়ারার দিকে ফিরল সে, দুহাতে জোর করে ঘোড়ার পিঠে তুলে নিল ওকে। হাসছে সে হা-হা করে। ঠাট্টার সুরে বলে উঠল, কি, ধরা পড়ে গেছ, তাই না, জাদুমণি? একদিন পরে তোমার বিয়ে, আর এখনও তুমি ছেলেছোকরাদের সঙ্গে হৈ-চৈ করে বেড়াচ্ছ?

অশ্বারোহী পেদরো জুরিতা ছাড়া আর কেউ নয়।

রাগে, জেদে চেহারা লাল হয়ে গেছে গুট্টিয়ারার। দেহ মুচড়ে ঘোড়া থেকে নামার চেষ্টা করল।

পাঁজরের ব্যথাটা অসম্ভব রকম বেড়ে গেছে ইকথিয়ান্ডারের। চোখের সামনে গুট্টিয়ারার এই অপমান সহ্য হচ্ছে না। দুঠোঁট নীল, জ্ঞান হারাবে যেকোন সময়ে, প্রবল ক্ষোভে-দুঃখে বলে উঠল, গুট্টিয়ারা! তাহলে এতদিন তুমি শুধু ছলনাই করলে আমার সঙ্গে?

আর কোন কথা বলল না ইকথিয়ান্ডার। বুকটা যেন ভেঙে যাচ্ছে ওর। দৌড়ে সাগরের তীরে চলে এলো ও, ঝাঁপিয়ে পড়ল সাগরের গভীর পানিতে। চোখের লোনা জল মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল সাগরের লোনা জলের সঙ্গে।

হাহাকার করে উঠল গুট্টিয়ারা। পেদরো জুরিতাকে বলল, ওকে বাঁচান! একে বাঁচান!

কারও ডুবে মরার শখ থাকলে তাকে বাঁচানোর কোন ইচ্ছে নেই আমার। অট্টহাসি হেসে বলল জুরিতা।

সে যাবে না বুঝে গুট্টিয়ারা নিজেই সাগরে ঝাঁপ দিয়ে ইকথিয়ান্ডারকে বাঁচানোর চিন্তা করল। লাফ দিয়ে ঘোড়া থেকে মেনে পড়ল ও। কিন্তু বেশিদূর যেতে পারল না। পেদরো জুরিতা  ঘোড়া ছুটিয়ে দুপা যাবার আগেই ওকে আটকে ফেলল। হাসতে হাসতে বলল, এত উতলা হবার কি আছে, গুট্টি? নিজেকে সামলাও! আজ বাদে কাল তোমার বিয়ে, ভুলে গেছ মনে হচ্ছে

এত শোক আর উত্তেজনা সইতে পারল না গুট্টিয়ারা, অজ্ঞান হয়ে গেল। জ্ঞান ফিরতে দেখল তাকে বাবার দোকানে পৌঁছে দিয়ে গেছে। পেদারা জুরিতা।

ইকথিয়ান্ডারের জন্যে বুকের ভেতরটা মুচড়ে উঠল ওর। অদম্য : কান্নায় ফুলে ফুলে উঠল ওর পিঠ। মনে চিন্তা, ইকথিয়ান্ডারের মতো সে-ও কি লাফ দিতে পারে না সাগরে? তা পারে। ইকথিয়ান্ডারের জন্যে ও তা-ও পারে! ইকথিয়ান্ডারের সঙ্গে মানুষ হিসেবে অন্তঃসারশূন্য দাম্ভিক বড়লোকের ছেলেদের কোন তুলনাই হয় না। ইকথিয়ান্ডার সাধারণ হয়েও অসাধারণ।

বাবার গলা শুনতে পেল ও। গজগজ করছে বালথাযার। কথায় বিলাপের সুর ফুটল।

বুঝছে না মেয়েটা! কিছুতেই বুঝছে না : আরে, আমার দোকানের আসল মালিকই তো হচ্ছে ওই পেদারো জুরিতা! নিজের বলতে দোকানের দশভাগের একভাগ মালও আমার না। আমি বেঁচে আছি শুধু মুক্তো বিক্রির মুনাফার একটা ছোট অংশ নিয়ে। ট্রি যদি ওকে বিয়ে

করে তাহলে দোকানের প্রায় সব মাল ফিরিয়ে নিয়ে যাবে জুরিতা। আমি পথের ফকির হয়ে যাব। গুট্টি কিছুই বুঝছে না।

আসলে সবই বুঝছে গুট্টিয়ারা, কিন্তু মন থেকে নিষ্ঠুর আর দাম্ভিক পেদরো। জুরিতাকে সে কিছুতেই মেনে নিতে পারবে না। তারচেয়ে আত্মহত্যা করাও ভাল। চুপচাপ শুয়ে থাকল গুট্টিয়ারা। এদিকে গজগজ করেই চলেছে বালথাযার। কাজের ঘর থেকে তার আওয়াজ আসছে মৃদু।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *