১৭. বাটপার দুটো হাল ছাড়ার পাত্র নয়

বাটপার দুটো হাল ছাড়ার পাত্র নয়। এটা ন্যায়বিচার হল না, মিনমিন করে বলল সম্রাট।

এক কাজ করুন, আচমকা বললেন বুড়ো ভদ্রলোক। পিটার উইলকে কবরে শুইয়েছে এমন কেউ আছে এখানে?

হা, বলল একজন। আমি আর অ্যাবি টার্নার।

সম্রাটের পানে তাকালেন বৃদ্ধ। বললেন, আচ্ছা বলুন তো, মৃতের বুকের ওপর কী উল্কি আঁকা ছিল?

হঠাৎ পিনপতন নীরবতা নেমে এল। সবাই জবাবের আশায় সম্রাটের মুখের দিকে তাকাল। ম্লান হয়ে গেছে তার মুখ। পরক্ষণেই সামলে নিয়ে বলল, ছোট্ট একটা নীল তীর। এত ছোট যে প্রায় দেখাই যায় না।

বুড়ো ভদ্রলোক অ্যাবি টার্নার আর তার সঙ্গীর দিকে তাকালেন। উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে তার চোখ। ওনার কথা আপনারা শুনলেন, বললেন তিনি। এবার বলুন, পিটারের বুকে অমন কোন চিহ্ন আপনারা দেখেছেন?

না, স্যার। দেখিনি, দুজনেই একযোগে জবাব দিল।। দেখার কথাও নয়, বললেন বৃদ্ধ। আসলে আপনারা তিনটে অক্ষর দেখেছেন। এইভাবে লেখা, লিখে দেখালেন বৃদ্ধ, পি-বি। ঠিক কি-না?

আবার দুজন একত্রে বলল, না আমরা তাও দেখিনি।

বারুদের মত তেতে উঠল ঘর। সব শালা ঠগ, হইহই করে উঠল জনতা। ওদের পিঠের ছাল তুলে লবণ মাখিয়ে দাও।

লেভি বেল একলাফে টেবিলের ওপর উঠে দাঁড়াল। থাম তোমরা, গলা ফাটিয়ে বলল সে। চল, লাশ তুলে এদের কথা যাচাই করে দেখি।

হুঁররে! সমস্বরে চেচাল সবাই। চার ভাইসহ আমাকে করস্থানে নিয়ে এল ওরা। আমি ভয়ে কাঁপছি। কথা সত্যি না হলে নির্ঘাত আমাদের সবাইকে ফাঁসিতে ঝোলান হবে।

বন্যার মত গায়ের সবাই হুঁমড়ি খেয়ে পড়েছে কবরখানায়! গোর খুঁড়তে যতগুলো গাইতি-শাবল দরকার তার একশ গুণ দেখা গেল ওখানে। তখন রাত প্রায় নটা, অথচ কেউ লণ্ঠন আনেনি সঙ্গে। মাইল খানেক দূরের এক বাসা থেকে লণ্ঠন আনতে একজনকে পাঠাল ওরা।

তারপর অন্ধকারের মধ্যেই কবর খুঁড়তে লাগল। হঠাৎ ভয়ঙ্কর আঁধার হয়ে এল চারদিক। বৃষ্টি শুরু হল, সাথে শোঁ শোঁ বাতাস। কিন্তু প্রবল উত্তেজনায় ঝড়বাদল গায়ে মাখল না কেউ, কাজ নিয়ে মেতে রইল।

এক সময়ে কফিনটা ওঠান হল ওপরে। পেরেক খোলার সময় আরেক দফা হুঁড়োহুঁড়ি বাধল জনতার মাঝে, কার আগে কে ভেতরে উঁকি দেবে তা-ই নিয়ে প্রতিযোগিতা।

হঠাৎ বিদ্যুচ্চমকের আলোয় দিনের মত উজ্জ্বল হয়ে উঠল সব কিছু। ঠিক তখনি কেউ একজন চেঁচিয়ে বলল, যিশুর কিরে মোহরের থলেটা কফিনের ভেতর!

হাতে ঢিল পড়েছে, অনুভব করলাম। যে-লোক আমার হাত ধরে ছিল, সে-ও তামাশা দেখার জন্যে ঠেলাঠেলি শুরু করে দিয়েছে। এই সুযোগ, ভাবলাম। অন্ধকারের ভেতর দিয়ে প্রায় উড়ে চললাম আমি। গাঢ় অন্ধকার, থেকে থেকে বিজলির চমক, ঝড়বৃষ্টির মাতম উপেক্ষা করে নদীর দিকে ছুটে চললাম।

তীরে এসে দেখলাম ঘাটে একটা নৌকো বাঁধা। নৌকোটা খুলে নিয়ে ভেলার উদ্দেশে রওনা দিলাম। ভেলার গায়ে ওটা যখন ভিড়ল, ক্লান্তিতে কেবল শুয়ে পড়তে বাকি আমার। কোনমতে বললাম, জিম, শিগগির কর। ভেলা ছেড়ে দাও।

ছইয়ের ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরল জিম। ঠিক ওই সময়ে আকাশে বিদ্যুৎ চমকাল। জিমকে দেখে ভয়ে আমার পিলে চমকে গেল। পিছু হঠতে গিয়ে পড়ে গেলাম নদীতে। আসলে ভুলে গিয়েছিলাম, রাজা লিয়রের পোশাক পরে আছে জিম। ওর সারা গায়ে নীল রং মাখান হয়েছে যেন দেখলে মনে হয় পানিতে-ডোবা কোন আরব। যাক, যেভাবে মাছ তোলে তেমনিভাবে আমাকে টেনে তুলল জিম। ওই শয়তান দুটোকে খসাতে পেরেছি দেখে খুশি হল।

দুসেকেন্ড পরই রশি কেটে মাঝ-নদীতে গিয়ে পড়লাম আমরা। কিছুদূর যেতেই পেছনে বৈঠা বাওয়ার শব্দ পেলাম। পরক্ষণে বিজলিচমকের আলোয় দেখলাম, একটা ছিপ নৌকোয় চেপে ছুটে আসছে সম্রাট আর ডিউক। বজ্জাত দুটোকে দেখে এত মুষড়ে পড়লাম যে আরেকটু হলেই রাগে-দুঃখে আমি কেঁদে ফেলতাম।

ভেলায় উঠে আমার কলার চেপে ধরল সম্রাট। বাঁদর ছোঁড়া কেটে পড়ার মতলব, আঁ? ঘেউ ঘেউ করে উঠল সে।

না, জাঁহাপনা। একটুও না। ছাড়ুন, লাগছে।

সত্যি করে বল, নইলে পিটিয়ে ছাতু করে ফেলব।

বলছি, বলছি, হাঁপাতে হাঁপাতে বললাম। যে-লোকটা আমাকে ধরে রেখেছিল। সে খুব ভাল ছিল। বলল, আমার মত এক ছেলে ছিল তার। ছেলেটা গত বছর মারা গেছে। তাই আমাকে বিপদে পড়তে দেখে তার খুব দুঃখ লাগছে। সবাই যখন কফিনের ভেতর মোহর দেখতে ব্যস্ত তখন সে আমাকে বলল, এই বেলা পালাও নইলে তোমাকেও ফাঁসিতে ঝোলাবে ওরা। আর আমিও দে-ছুট। আর যা-ই হোক ফাসিতে ঝুলতে চাই না আমি।

গুল মারার জায়গা পাস না, ধমকে উঠল সম্রাট, ঝাঁকুনি দিল আমার কাঁধ চেপে ধরে।

ছেড়ে দাও ওকে, বলল ডিউক। ওর জায়গায় তুমি হলেও এটাই করতে। সম্রাট ছেড়ে দিল আমাকে, ওই গায়ের বাসিন্দাদের বাপ-মা তুলে গাল দিল।

বরং নিজেকে গাল দাও, ডিউক বলল তাকে। তুমি-ই তো সব নষ্টের গোড়া। তোমার গোঁয়ার্তুমিতেই আমরা সবাই আজ মরতে বসেছিলাম।

চুপ করে কিছুক্ষণ বসে থেকে চোরের মত ছইয়ের ভেতর ঢুকে গেল সম্রাট। বসে বসে মদ গিলতে লাগল। একটু বাদে ডিউকও তার বোতল নিয়ে পড়ল। আধঘণ্টার মধ্যেই, যেমন চোরদের হয়, ভাব হয়ে গেল ওদের। নেশা গাঢ় হওয়ার সাথে সাথে ভালবাসাও প্রগাঢ় হয়ে উঠল। তারপর এক সময় গলাগলি ধরে নাক ডাকতে লাগল দুজন। যখন নিশ্চিত হলাম ঘুমে কাদা হয়ে আছে ওরা, জিমকে সব খুলে বললাম আমি।

ওই ঘটনার পর বেশ কদিন কেটে গেছে, ভয়ে কোথাও থামতে সাহস পাই না আমরা। দক্ষিণে এগিয়ে চলছে ভেলা; ক্রমশ গরম হয়ে উঠছে আবহাওয়া। এদিকে এখন গ্রীষ্মের মওশুম। বাড়ি থেকে দূরে, আরও দূরে সরে যাচ্ছি আমরা। শুকনো হলুদ ঝুরি দাড়ির মত ডাল বেয়ে মাটি ছুঁয়েছে। এরকম দৃশ্য এই প্রথম দেখলাম আমি। শুনশান বনানী, কেমন যেন মরা-মরা ভাব। জোচ্চর দুজন যখন বুঝতে পারল বিপদ কেটে গেছে, আবার ফটকাবাজি শুরু হল তাদের।

এক জায়গায় তারা মদ না-খাওয়ার পক্ষে বক্তৃতা দিল, কিন্তু ভালমত মদ যে খাবে, সে পয়সাটাও জোটাতে পারল না। আরেক খানে খুলল নাচের ইশকুল। অথচ ক্যাঙারু যতটুকু নাচে, ওরা তার সিকি ভাগও জানে না। ফলে যা হবার তা-ই হল, ধাওয়া খেল গায়ের লোকদের। এরপর বজ্জাত দুটো বক্তৃতার স্কুল খুলল। প্রথম বক্তৃতা দেয়ার সাথে সাথে শ্রোতারা এমন গাল দিল যে পালিয়ে বাঁচল ওরা। এরপর ডাক্তারি, ভাগ্য গণনা, সম্মোহনবিদ্যা-বহুকিছুই চেষ্টা করল, কিন্তু বরাত খুলল না। শেষপর্যন্ত ওদের পকেট গড়ের মাঠ হয়ে গেল, ওরা হতাশায় মরিয়া হয়ে উঠল।

সর্বক্ষণ ফিসফিস করে কী সব শলাপরামর্শ করে। জিম আর আমি খুব অস্বস্তি বোধ করতে লাগলাম এতে। মনে হল এ যাবত ওরা যা করেছে, তার চাইতেও বড় দরের কোন শয়তানি মতলব আঁটছে। বিষয়টা নিয়ে বারবার আলোচনা করলাম আমি আর জিম। মনে হল, এবার ওরা কারো বাসায় বা দোকানে সিদ কাটবে। ভয় ধরে গেল আমাদের। এরকম কিছু করলে, জিম আর আমি ঠিক করলাম, ওরে সাথে সম্পর্ক রাখব না।

একদিন খুব সকালে ভাল একটা জায়গা খুঁজে ভেলাটা লুকিয়ে রাখলাম আমরা। ওখান থেকে পাইভিল গ্রাম দুমাইল সামনে। সম্রাট ডাঙায় গেল। যাবার আগে বলল, এখানকার লোকেরা রয়্যাল নানসাচ পালার কথা জানে কি-না সেটা দেখতে যাচ্ছে। যদি দুপুরের মধ্যে ফিরে না আসি, বলল সে, বুঝবে সব প্ল্যানমাফিকই এগুচ্ছে। তোমরাও তখন চলে আসবে গায়ে।

দুপুর এল, কিন্তু সম্রাটের টিকিটি নেই। আমি খুশিই হলাম, যাক এবার হয়ত পালাবার মওকা মিলবে। আমাকে নিয়ে গায়ে গেল ডিউক। অনেক খোজাখুঁজির পর সম্রাটের সন্ধান মিলল। নোংরা একটা ভাটিখানার পেছনে মদে চুর হয়ে পড়ে আছে। কতগুলো রকবাজ ছোকরা হাসিমশকরা করছে তাকে নিয়ে। সে-ও জড়ান গলায় গাল দিচ্ছে ওদের। কিন্তু ওঠার শক্তি নেই বলে কিছু করতে পারছে না।

তুমি একটা আস্ত উজবুক, সম্রাটকে গাল দিল ডিউক।

সম্রাটও অকথ্য ভাষায় পাল্টা গাল দিল। ওদের চেঁচামেচি জমে উঠতেই সটকে পড়লাম আমি। নদীর দিকে হরিণের মত ছুটে চললাম। এই সুবর্ণ সুযোগ। একবার পালাতে পারলে, ভাবলাম মনে মনে, ওরা আর ধরতে পারবে না আমাদের। খুশিতে ডগমগ হয়ে আমি ঘাটে পৌঁছুলাম।

 

ভেলা ছেড়ে দাও, জিম। শিগগির, চিৎকার করে বললাম।

কোন উত্তর নেই, কেউ ছইয়ের ভেতর থেকে বেরোল না। জিম নেই। আবার গলা ফাটিয়ে ডাকলাম ওকে। না, কোন সাড়া নেই। চলে গেছে বুড়ো জিম। জঙ্গলের ভেতরেই বসে পড়লাম আমি। দুচোখ ছাপিয়ে জল নামল, কিছুতেই শান্তি পাচ্ছি না মনে। খানিক বাদে আবার রাস্তায় উঠলাম। কী করা যায় ভাবছি, হঠাৎ দেখলাম আমার বয়েসী একটা ছেলে যাচ্ছে ওই পথ দিয়ে।

আজব চেহারার কোন অচেনা নিগ্রোকে দেখেছ? জিজ্ঞেস করলাম ছেলেটাকে।।

ওপরে-নিচে মাথা দুলিয়ে ছেলেটা জানাল দেখেছে।

কোথায়?

এখান থেকে দুমাইল দূরে। সাইলাস ফেলপস-এর গোলা বাড়িতে। একজন পলাতক নিগ্রোকে পাকড়াও করেছে তারা। দুশ ডলার পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে ওর নামে।

কীভাবে ধরল?

বদখত চেহারার এক বুড়ো মাত্র চল্লিশ ডলারে স্থানীয় একজনের কাছে তথ্যটা ফাঁস করে দিয়েছে। তার নাকি তাড়া আছে, নদীপথে যাবে কোথাও, তাই অপেক্ষা করতে পারেনি পুরো টাকাটার জন্যে।

ভেলায় ফিরে গিয়ে চুপচাপ চিন্তা করতে লাগলাম, কী করব। কিন্তু কোন মীমাংসায় পৌঁছুতে পারলাম না। এক সময় মাথাটা ব্যথা করতে লাগল, তবু কুলকিনারা পেলাম না। এতখানি রাস্তা এক সাথে চলা, ওদের জন্যে এতটা করা—সবই পানিতে পড়ল। মাত্র চল্লিশটা ডলারের জন্যে জিমকে ধাপ্পা দিতে এতটুকু বাধল না লোকগুলোর।

একবার নিজেকে বোঝালাম, জিমকে যদি দাস থাকতেই হয়, তবে যেখানে তার বউ-ছেলে রয়েছে সেখানে থাকাই ভাল। ঠিক করলাম টম সয়্যারকে চিঠি দেব। ওকে বলব মিস ওয়াটসনকে জানাতে, কোথায় পাওয়া যাবে জিমকে। পরক্ষণে ইচ্ছেটাকে বাতিল করতে হল। কারণ এতে হয়ত জিমের বিপদ আরও বাড়বে। রেগে গিয়ে দূরে কোথাও তাকে বিক্রি করে দেবে মিস ওয়াটসন। আর যদি তা নাও দেয়, তবু লোকে হীন চোখে দেখবে জিমকে। অকৃতজ্ঞ ভাববে। তাছাড়া আমার অবস্থাটাও চিন্তা করে দেখতে হবে। সবাই জানবে, হাকলফিন একজন নিগ্রোকে পালাতে সাহায্য করেছে। তারপর কখনও ওই শহরের কারো সাথে দেখা হলে আমার মুখে থুতু দেবে সে।

এই রকম নানান চিন্তা ভিড় জমাল মাথায়। বিবেকের চিমটিতে জ্বলতে লাগলাম। জিমকে পালাতে সাহায্য করেছি বলে ভীষণ নীচ মনে হল নিজেকে। মনে হল, আমাকে এজন্যে অনন্ত নরকযন্ত্রণা ভোগ করতে হবে। শিউরে উঠলাম। তাড়াতাড়ি এক টুকরো কাগজ পেন্সিল নিয়ে মিস ওয়াটসনকে চিঠি লিখতে বসলাম।

চিঠিটা শেষ করে একটু ভাল বোধ হল। জীবনে এই প্রথম যেন সব পাপ ধুয়েমুছে পাক-সাফ হলাম। ঠিক করলাম এবার আমার আত্মার মুক্তির জন্যে বিধাতার কাছে প্রার্থনা করব।

তখনই মনে পড়ল ফেলে আসা দিনগুলোর কথা। জিমের কথা মনে পড়ল, তুফান মাথায় করে ভেসে চলেছি আমরা; কথা বলছি, গান গাইছি; হাসছি। ওর সাথে শত্রুতা করার মত কোন ছুতো খুঁজে পেলাম না। সবসময় আমাকে আগলে রাখার চেষ্টা করেছে সে। আমি যাতে পরম নিশ্চিন্তে ঘুমোতে পারি, সেজন্যে সারা রাত জেগে একা পাহারা দিয়েছে, মুহুঁর্তের তরেও ডাকেনি। মনে পড়ল, সে আমাকে সোনামানিক বলে ডাকত। ওকে বাঁচিয়েছিলাম বলে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেছিল এই দুনিয়ায় তার যত বন্ধু আছে তাদের মধ্যে আমিই সেরা…।

আবার বর্তমানে ফিরে এলাম। চিঠিটা চোখে পড়ল। তুলে নিলাম ওটা। আমার শরীর কাঁপছে, দুটোর মধ্যে একটা বেছে নিতে হবে আমাকে। কোনটা তা ঠিক করে ফেলেছি ইতিমধ্যে। শ্বাস বন্ধ করে আবার পড়লাম চিঠিটা। বেশ তা-ই হোক, বললাম মনে মনে, নরকেই যাব আমি। কুচি কুচি করে ছিড়ে ফেললাম চিঠিটা।

সব চিন্তা ঝেটিয়ে দূর করে দিলাম মাথা থেকে। নষ্টামির মধ্যেই যখন বেড়ে উঠেছি, বললাম আপনমনে, তখন পাশের পথই আমার পথ। সে-পথেই চলব আমি! চুরি করব জিমকে, যে করেই হোক।

তারপর চিন্তা করতে বসলাম কীভাবে কাজ শুরু করব। অনেক ভেবেচিন্তে উপায় বের করলাম একটা। কাজ হাসিল করার জন্যে একটা দ্বীপও দেখে রাখলাম নদীর একদিকে। তারপর অন্ধকার একটু জেঁকে বসতেই ভেলাটা সেখানে নিয়ে গেলাম। ওখানেই ঘুমোলাম রাতে। ভোরের আলো ফোটার আগে ঘুম থেকে উঠে নাস্তা সারলাম। আমার জিনিসপত্র যা ছিল গুছিয়ে নিলাম একটা বোঁচকায়। ডিঙি নিয়ে সাইলাস ফেলপসের গোলাবাড়ির কাছেই এক জায়গায় নোঙর করলাম। পাথরখণ্ড ভরে ডুবিয়ে দিলাম ডিঙিটা। কাপড়ের পোটলাটাও লুকিয়ে রাখলাম একটা ঝোপের ভেতর।

তারপর রাস্তায় উঠলাম। একটু যেতেই একটা সাইনবোর্ড চোখে পড়ল। তাতে লেখা: ফেলপসের করাতকল। আরও কিছুদুর এগিয়ে আশপাশ দেখে নিলাম ভাল করে; যখন নিশ্চিত হলাম-কেউ দেখেনি আমাকে, রওনা দিলাম শহরের উদ্দেশে। পথেই দেখা হল ডিউকের সাথে, দেয়ালে রয়্যাল নানসাচ নাটকের বিজ্ঞাপন সঁটছে। আমাকে দেখে বিস্মিত হল সে।

কী হে, তুমি কোখেকে? বলল ডিউক। ভেলাটা কোথায়?

আমারও তো সেই একই প্রশ্ন, বললাম।

কেন, আমাকে জিজ্ঞেস করছ কেন? তোমারই তো ভাল জানার কথা।

আমি জানি না। রাতে নদীর পাড়ে গিয়ে ভেলা নেই দেখে ভাবলাম, তোমরা বোধহয় কোন বিপাকে পড়ে পালিয়েছ ওটা নিয়ে। তাহলে গেল কই ভেলাটা? আর বেচারা জিমেরই-বা কী হল?

জানি না, ডিউক বলল। রাতে নদীতীরে গিয়ে আমরা দেখলাম ভেলা নেই। তখন মনে করলাম আমাদের ফাঁকি দিয়ে পালিয়েছ তুমি।

গেলে জিমকে রেখে যেতাম না।

এটা অবশ্য ভেবে দেখিনি আমরা। আচ্ছা, তোমার কি ধারণা, ওই নিগ্রো শালা আমাদের জারিজুরি সব ফাঁস করে দেবে? দিলে ওর পিঠের চামড়া তুলে নেব আমি।

কী করে বলবে, ও তো পালিয়েছে?

না, পালায়নি। ওই বুড়ো হারামি চল্লিশ ডলারে বিক্রি করেছে ওকে। আমাকে এক পয়সাও ডাগ দেয়নি, একা সাবড়েছে।

বিক্রি করেছে? কোথায়? ওকে আনতে যাব আমি।

পারবে না। তবে যদি কথা দাও আমাদের কথা বলবে না কাউকে, তোমাকে ওর ঠিকানা দিতে পারি।

দিলাম কথা।

আব্রাহাম ফস্টার নামে এক লোকের কাছে আছে। এখান থেকে চল্লিশ মাইল দূরে। লাফায়েত যাবার পথেই ফস্টারের খামার পাবে।

জানি, মিথ্যে বলছে শয়তানটা। আমাকে এখান থেকে দূরে কোথাও সরিয়ে দেয়াই ওর মতলব! যা-ই কে, ওর কথা বিশ্বাস করার ভান করলাম।

ঠিক আছে, সেখানেই যাচ্ছি তাহলে, ওকে বললাম। তারপর লাফায়েতের পথে মাইলটাক যাবার পর জঙ্গলের মাঝ দিয়ে ফের সাইলাস ফেলপসের বাসার পথ ধরলাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *