১৭. ঝাড়-জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে

ঝাড়-জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে রুদ্ধশ্বাসে প্রায় দৌড়ে চলেছে দলটা। ভেড়ার বাচ্চাটা মুসার কোলে। ওটা বুঝতেই পারছে না ব্যাপারটা কি? মানুষগুলো এরকম করছে কেন? আর সেজন্যেই যেন থেকে থেকে চেঁচিয়ে উঠছে ব্যা ব্যা করে। শরীর মুচড়ে, লাথি মেরে নেমে পড়তে চাইছে কোল থেকে, কিন্তু কেউ তার আবেদন কানে তুলছে না। দরকার আছে বলেই নিয়েছে ওকে।

অবশেষে গুহায় যাবার খড়িমাটি বিছানো পথে এসে পড়লো ওরা। জুতোর ঘায়ে বিচিত্র শব্দ করে ছিটকে কিংবা গড়িয়ে পড়ছে আলগা খড়িমাটির টুকরো। ওরা এসে দাঁড়ালো প্রবেশপথের কাছে, যেটার কপালে লেখা রয়েছে সাবধানবাণী।

ভেড়ার বাচ্চাটাকে মাটিতে নামিয়ে শক্ত করে ধরে রাখলো মুসা। জিনা ডাকলো, রাফি, এদিকে আয়। শোক টোগোকে। গন্ধটা মনে রাখ। তারপর ওর পিছে পিছে যাবি, যেখানেই যায়। দেখতে না পেলে গন্ধ শুকে কে এগোবি।

অযথা এসব কথা বললো জিনা। কিভাবে অনুসরণ করতে হয় খুব ভালোই জানা আছে রাফিয়ানের। টোগোর গন্ধ তার পরিচিত, তবু জিনার কথায় আরেকবার ভেড়ার বাচ্চাটার আগা-পাশ-তলা কলো সে।

টোগোকে ছেড়ে দিলো মুসা। রাফিকে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে বললো জিনা। জানে পারবে, তবু নিশ্চিত হতে চায় টোগোর গন্ধ শুকে ঠিকমতো এগোতে পারে কিনা রাফি। মাটি আর বাতাস শুকতে শুকতে প্রায় ছুটে চললো কুকুরটা। প্রথম গুহাটায় এসে ঢুকলো। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে ফিরে তাকালো জিনার দিকে।

যা যা, এগোরাফি, আদেশ দিলো জিনা। বুঝতে পারছি, টোগোর পিছু নিয়ে এই অত গুহায় তোকে ঢুকতে বলায় তোর অবাক লাগছে। কিন্তু ঢুকতে বলার কারণ আছে। আমরা জানতে চাই, বাচ্চাটা কোথায় যায়। এতো কথা বললো সে এই জন্যে, তার আশঙ্কা হচ্ছে বিরক্ত হয়ে না আবার এই মজার খেলাটা বন্ধ করে দেয় রাফি।

কিন্তু বন্ধ করলো না রাফিয়ান। আবার মাটি কলো।

সেই গুহাটায় এসে ঢুকলো সে, যেটাতে রঙের সৃষ্টি করেছে বরফের ঝাড় আর স্তম্ভ। চকচকে উজ্জ্বল রঙিন থামের মতো লাগছে কোনো কোনোটাকে। ওটা পেরিয়ে ঢুকলো আরেকটা গুহায়, যেটাতে সব চেয়ে বেশি রঙ। রামধনুর সাত রঙের বাহার দেখা যায় যেখানে। যেটাকে পরীর রাজ্য মনে হয়েছিলো জিনার। সেটা পেরিয়ে ঢুকলো আরেক গুহায়, যেখানে দড়ি ছাড়া সুড়ঙ্গ রয়েছে কয়েকটা।

এই যে, তিনটে সুড়ঙ্গ, জিনা বললো। আমার মনে হয় না, দড়িওয়ালা সুড়ঙ্গ ধরে ঢুকবে রাফি…।

তার কথা প্রমাণ করতেই যেন একটা দড়িছাড়া সুড়ঙ্গের মুখের কাছে মাটি শুঁকতে শুরু করলো রাফি। বাঁয়ের একটা পথ, যেটাতে সেদিন আচমকা ঢুকে গিয়েছিলো সে, তারপর অনেক ডাকাডাকি করে বের করে আনতে হয়েছে।

ঢুকে পড়লো সবাই। প্রত্যেকের হাতেই টর্চ জ্বলছে।

আমিও ভেবেছিলাম…, বলেই থেমে গেল জিনা। তার কথার প্রতিধ্বনি উঠলো সুড়ঙ্গের দেয়ালে বাড়ি খেয়েঃ আমিও ভেবেছিলাম, আমিও ভেবেছিলাম… ভেবেছিলাম…ছিলাম… ছিলাম…ইলাম…

সেদিনকার চিৎকারের মানে এখন বুঝতে পারছি, প্রতিধ্বনির ভয়ে কণ্ঠস্বর একেবারে খাদে নামিয়ে ফিসফিসিয়ে বললো কিশোর। ডাকাতগুলো চিৎকার করেছে, জোরে জোরে শিস দিয়েছে। সুড়ঙ্গে প্রতিধ্বনিত হয়ে ওই শব্দ হয়ে উঠেছিলো ভয়ঙ্কর। আমার বিশ্বাস রাফির ঘেউ ঘেউ ওরা শুনতে পেয়েছিলো। ঘাবড়ে গিয়েছিলো মানুষ আসছে ভেবে। কাজেই ভয় দেখিয়ে আমাদেরকে তাড়ানোর জন্যে ওরকম শব্দ করেছিলো।

আর সত্যি… বলেই প্রতিধ্বনি শুনে গলার স্বর নামিয়ে ফেললো রবিন, আমরা ভয় পেয়ে পালিয়েছিলাম। হ্যাঁ, তুমি ঠিকই বলেছে, ওই শয়তানগুলো ওরকম আওয়াজ করেছিলো। এছাড়া ওরকম অদ্ভুত আওয়াজের আর কোনো ব্যাখ্যা নেই।… আরিব্বাবারে, কি লম্বা সুড়ঙ্গ! আর কি রকম এঁকেবেঁকে ঘুরে ঘুরে গেছে!…আরে, সামনে দেখি আবার দুই মুখ! কোনটা দিয়ে যাবো?

সেটা রাফিই বলে দেবে, জিনা বললো। একটা সুড়ঙ্গের মুখের কাছের মাটি ইতিমধ্যেই শুকতে আরম্ভ করেছে রাফি, এবারও বাঁয়েরটা।

দড়ি আনার দরকারই ছিলো না, জনি বললো। রাফি যেভাবে পথ চিনে এগোচ্ছে, আমাদের অসুবিধে হতো না। ঠিক বের করে নিয়ে আসতো।

যা, মাথা ঝাঁকালো কিশোর। দড়ির চেয়ে অনেক ভালো পথপ্রদর্শক সে। তবে ও না থাকলে দড়ি অবশ্যই ব্যবহার করতে হতো। নইলে এই সুড়ঙ্গ আর গুহার গোলকধাঁধা থেকে বেরোনো মুশকিল হয়ে যেতো। মনে হয় পাহাড়ের একেবারে পেটের মধ্যে চলে এসেছি…।

এই সময় হঠাৎ থেমে গেল রাফি। মাথা তুলে পাশে কাত করে কান পেতে শুনছে। জ্যাক আর রিডের সন্ধান কি পেয়ে গেল? ঘেউ ঘেউ করে উঠলো একবার। বদ্ধ জায়গায় বিকট হয়ে কানে বাজলো সেই ডাক।

কাছেই কোনোখান থেকে শোনা গেল তার ডাকের জবাবঃ এইই। এইই! এই যে! এখানে! এখানে!

জ্যাক ভাইয়া! প্রতিধ্বনির কথা ভুলে গিয়ে চিৎকার করে উঠলো জনি। আনন্দে অন্ধকার সুড়ঙ্গের মধ্যেই লাফাতে শুরু করলো। জ্যাক ভাইয়া, শুনছো! আমিইইই, আমি জনিইই!

সাথে সাথে সাড়া এলো, জনি, এই যে এদিকে! বুঝতে পারছিস?

প্রায় ছুটে এগোলো রাফিয়ান। থমকে দাঁড়িয়ে পড়লে হঠাৎ। আগে আগে চলেছে কিশোর, আরেকটু হলে তার গায়ের ওপরই পড়তো। প্রথমে বুঝতে পারলো না কি ব্যাপার। তারপর টর্চের আলোয় স্পষ্ট হলো নিরেট দেয়াল, ওদের পথ আগলে যেন এক বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেয়ালের কাছে দাঁড়িয়ে আছে টোগো। অবাক কাণ্ড। সামনে দেয়াল, অথচ জ্যাকের কণ্ঠ কানে আসছে!

এই যে, আমরা এখানে!

বোঝা গেল, কিভাবে আসছে। রাফিয়ান যেখানে দাঁড়িয়ে আছে ঠিক তার পাশেই মেঝেতে একটা ফোকর। কিশোরের টর্চের আলো পড়লো তার ওপর। বললো, ওই যে, ওখানেই আছে! ওই গর্তে! জ্যাকডাই, ওখানেই আছেন, না? জবাব দিন!

জবাব এলো।

আরেকটু সামনে এগিয়ে গর্তের ভেতর আলো ফেললো কিশোর। ওই তো, গুহার মেঝেতে পড়ে রয়েছে একজন মানুষ। পাশে দাঁড়িয়ে আরেকজন, জ্যাক ম্যানর। শুয়ে থাকা লোকটাই তাহলে রিড।

ঈশ্বরকে অনেক ধন্যবাদ, আমাদের খুঁজে পেয়েছে তোমরা, জ্যাক বললো। ওরা আমাদেরকে এখানে রেখে চলে গেল, আর এলো না। হঠাৎ পেছন থেকে ধাক্কা দিয়ে ঠেলে ফেলে দিয়েছে এই গর্তে। রিডের গোড়ালি মচকে গেছে। আমি ভালোই আছি, কিন্তু উঠবো কিভাবে? অনেক চেষ্টা করেছি, পারিনি। কারও সাহায্য ছাড়া পিরবোও না।

আর কোনো অসুবিধে নেই, জ্যাক ভাইয়া, আমরা এসে গেছি, কিশোরের পাশে দাঁড়িয়ে গর্তের ভেতরে উঁকি দিয়ে বললো জনি। কিভাবে তুললে সুবিধা হবে? গর্তের মুখটা তো বেশি বড় না।

প্রথমে আমাকে টেনে তোলো, জ্যাক বললো। তারপর দুজন গর্তে নেমে রিডকে তুলে ধরবে, তখন তাকে আমি টেনে তুলে নিতে পারবো। এমন বাজে জায়গা আর দেখিনি। ওই গর্তটা ছাড়া বেরোনোর আর কোনো জায়গাই নেই। কতো লাফালাফি যে করলাম। ছুঁতেই পারলাম না ওপরের ধার! আর রিড তো দাঁড়াতেই পারে না।

শুধু কিশোর আর জনিকে দিয়ে হলো না। মুসাকেও হাত লাগাতে হলো। তারপর অনেক কায়দা কসরৎ করে টেনে তোলা হলো জ্যাককে। সাথে দড়ি না আনলে বের করতে পারতো না। জিনা আর রবিনও হাত গুটিয়ে বসে নেই। টোগোকে আটকে রেখেছে জিনা, ওটা কেবলই ছুটে একদিকে চলে যেতে চায়। আর রবিন দুই হাতে দুটো টর্চ উচিয়ে রেখেছে।

অবশেষে উঠে এলো জ্যাক। দড়ি ধরে নেমে গেল কিশোর আর মুসা। ঘোরের মধ্যে রয়েছে যেন রিড। ঘোলাটে দৃষ্টি। জ্যাকের ধারণা, মাথায় আঘাত পেয়েছে রিড। দুদিক থেকে ধরে তাকে তুলে দাঁড় করালো কিশোর আর মুসা। এক পা বাকা করে বেকায়দা ভঙ্গিতে দাঁড়ালো সে, মুসার কাঁধে ভর রেখে। বের করা শক্ত।

তবে বেশি ভারি না রিড, এই যা সুবিধে। দুই হাতে ধরে তাকে মাথার ওপর তুলে ধরলো মুসা, অনেকটা টারজানের মতো। সুড়ঙ্গের মেঝেতে বিপজ্জনক ভঙ্গিতে শুয়ে পড়লো জ্যাক। মেঝে ঢালু, তাই মাথা পায়ের চেয়ে নিচুতে। পিছলে আবার গর্তে পড়ে যাওয়ার ভয় আছে। কিন্তু পরোয়া করলো না সে। পেছনে একই ভাবে শুয়ে পড়ে শক্ত করে তার পা জড়িয়ে ধরে রইলো জনি।, বুক পর্যন্ত গর্তের কিনারে বাড়িয়ে দিয়ে স্কুলে পড়লো জ্যাক। হাত বাড়ালো নিচের দিকে। রিডের হাতের নাগাল পেয়ে শক্ত করে ধরলো। তারপর ইঞ্চি ইঞ্চি করে টেনে তুলতে লাগলো। নিচ থেকে ঠেলে রেখেছে কিশোর আর মুসা।

অবশেষে তুলে আনা হলো রিড়কে। দড়ি বেয়ে উঠতে মুসা আর কিশোরের খুব একটা অসুবিধে হলো না, কারণ জনি আর জ্যাক তো রয়েছেই সাহায্য করার জন্যে।

খুব মজার একটা ব্যাপার ঘটে গেছে ভেবে আর চুপ থাকা সমীচীন মনে করলো না রাফি। ঘাউ ঘাউ করে হাঁক ছাড়লো কয়েক বার, বদ্ধ জায়গায় কানে তালা লাগিয়ে দিলো সকলের। ভয় পেয়ে ডেকে উঠলো ভেড়ার বাচ্চাটা, জিনার হাত থেকে ছুটে যাওয়ার জন্যে ছটফট করতে লাগলো।

হউফ! করে জোরে নিঃশ্বাস ফেললো জ্যাক। আর কোনোদিন বেরিয়ে আসতে পারবো ভাবিনি! বাপরে, কি জায়গা দম বন্ধ করে দেয়! চলো, এখানে আর এক মুহূর্তও না। বেরোই। আলোবাতাস দরকার। পানির অভাবে বুকটা শুকিয়ে যা খাঁ করছে। হারামজাদাগুলো সেই যে ফেলে চলে গেল, আর এলো না!

আবার পথ দেখিয়ে দলটাকে গুহার বাইরে বের করে নিয়ে এলো রাফিয়ান। স্বচ্ছন্দে। এবার আর মাটি কিংবা বাতাস শোকারও প্রয়োজন বোধ করেনি। ভুল করেনি একটিবারের জন্যেও। ভেড়ার বাচ্চাটা কিভাবে নিরাপদে বেরিয়ে গিয়েছিলো, এখন বোঝা গেল। অনুভূতি ওটারও যথেষ্ট প্রখর। ইন্দ্রিয়ের এই প্রখরতা কেবল মানুষেরই নেই।

উজ্জ্বল সূর্যালোকে বেরিয়ে এসে চোখ ধাধিয়ে গেল ওদের। বিশেষ করে রিড আর জ্যাকের। দীর্ঘ সময় গাঢ় অন্ধকারে বন্দী ছিলো ওরা। হাত দিয়ে চোখ ঢেকে ফেললো দুজনেই।

এখানে কিছুক্ষণ বসে আগে চোখের আলো সইয়ে নিন, কিশোর পরামর্শ দিলো, নইলে হাঁটতে পারবেন না। তারপর আমাদের বলুন, ভেড়ার বাচ্চাটার গায়ে মেসেজ লিখলেন কিভাবে? ওটাও কি গর্তে পড়ে গিয়েছিলো?

হ্যাঁ, মাথা ঝাঁকালো জ্যাক। আমাদের গর্তে ফেলে দিয়ে লোকগুলো চলে গেল। আমরা পড়েই আছি, পড়েই আছি। দিনরাত্রির প্রভেদ বোঝার উপায় নেই। সময় কতো, কি বার, কিছুই বুঝতে পারছি না। কোনো শব্দও নেই। তারপর হঠাৎ করেই কানে এলো মুদ খটখট আওয়াজ। কিসের, বুঝতে পারলাম না। তখনও জানি না পাথরে লেগে ভেড়ার বাচ্চাটার খুরের শব্দ হচ্ছিলো। অবাক হলাম। আমাদের আরও অবাক করে দিয়ে গর্তে পড়লো বাচ্চাটা। একেবারে আমার ওপরেই। পড়েই চেঁচাতে শুরু করলো গলা ফাটিয়ে। বের করে দিতে গিয়েও থেমে গেলাম। বুদ্ধিটা এলো মাথায়। মনে করলাম, বাইরে বেরোলে লোকের চোখে পড়বেই। যদিও বুঝতে পারছিলাম না কি করে ঢুকলো ওটা, আবার ঠিকমতো বাইরে বেরোতে পারবে কিনা এসব।

লিখে দিয়েছিলেন বটে, মুসা বললো, কিন্তু আরেকটু হলেই নষ্ট হয়ে যেতো আপনার মেসেজ। প্রায় মুছেই গিয়েছিলো।

তবু, শেষ পর্যন্ত বুঝতে তো পেরেছে, জোরে নিঃশ্বাস ফেললো জ্যাক। রিড হাত পা ছড়িয়ে চুপ করে বসে আছে, চোখ বন্ধ। তার দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে আবার বললো সে, সুড়ঙ্গে ঢোকানোর পর পরই আমাদের সমস্ত জিনিস কেড়ে নিয়েছে ডাকাতগুলো। ঘড়ি, টাকাপয়সা, এমনকি কলমটা পর্যন্ত।

তাহলে লিখলেন কি দিয়ে? জিনা জিজ্ঞেস করলো।

রিডের প্যান্টের পকেটে একটুকরো কালো চক ছিলো, জ্যাক জানালো। ওই চক আমাদের কাছে থাকে। চিহ্ন দেয়ার জন্যে ব্যবহার করি আমরা। বিশেষ করে বড় বড় ম্যাপে এয়াররুটগুলোর ওপর। বাচ্চাটাকে ধরে রাখলো রিড, আমি ওটার পিঠে লিখলাম। অন্ধকারে কি লিখছি, তা-ও বোঝার উপায় ছিলো না। পড়তে যে পেরেছো, এটাই আমাদের ভাগ্য। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে গর্তের বাইরে ছুঁড়ে দিয়েছি বাচ্চাটাকে। ভয় পেয়ে, কিংবা ব্যথা পেয়ে, যে কারণেই হোক, গলা ফাটিয়ে কয়েকবার চেঁচালো ওটা। তারপর দিলো দৌড়, যেদিক থেকে এসেছিলো সেদিকে। কি কাণ্ড, বলো তো? যেন আমাদের মেসেজ নেয়ার জন্যেই এসেছিলো ওটা! দুনিয়াতে অনেক রহস্যময় ব্যাপারই ঘটে, যার কোনো ব্যাখ্যা নেই। আবার কাকতালীয় ব্যাপার বলতেও ইচ্ছে করে না!

হুঁ, মাথা দোলালো জনি। নইলে ল্যারিই বা ওটার জন্য পাগল হবে কেন? আর ওটারই বা ঘুরে বেড়ানোর এতো শখ হবে কেন? যখন-তখন বাড়ি থেকে বেরিয়ে এদিক সেদিক চলে যায়। আর গেলেই ওটার পিছে পিছে ছোটে ল্যারি। এজন্যে সবাই মিলে কতো বকাবকি করি দুজনকে। অথচ আজ এটার এই বাড়িপালানো স্বভাবের কারণেই খুঁজে পাওয়া গেল তোমাদেরকে! নইলে কোনোদিনই ওই গর্ত থেকে…

আর বলিস না, বলিস না! তাড়াতাড়ি হাত নাড়লো জ্যাক। দম বন্ধ হয়ে আসছে!…আচ্ছা, এবার বল দেখি, আমরা গায়েব হয়ে যাওয়ায় এয়ারফীল্ডে শোরগোল ওঠেনি?

উঠেছে, রবিন বললো। আপনাদের দুজনের প্লেন দুটো যে চুরি হয়েছে জানেন? যে দুটো আপনারা চালাতেন?

আন্দাজ করেছি। ওরাও আমাদেরকে ধরে নিয়ে এলো, ওদিকে প্লেনও উড়লো দুটো।…একটা কুকুরের চিত্তার কানে আসছিলো, পাহাড়ের ওপর থেকে। বুঝতে পেরেছি, রাফিয়ান। ইস, যদি তোরা তখন বুঝতে পারতি আমাদের ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, তাহলে ছুটে আসতে পারতি।

হ্যাঁ, ঝড়ের রাতে অনেক ঘেউ ঘেউ করেছে রাফি, জিনা বললো। আমি ওকে ধমক দিয়ে থামিয়েছি। যদি বুঝতে পারতাম ডাকাতদের দেখে চিৎকার করেছে ও…যাকগে, যা হবার হয়ে গেছে। এখন আর ওসব বলে লাভ নেই।

প্লেনগুলোর কি হয়েছে, জানো কিছু?

শুনেছি, ঝড়ের মধ্যে উড়তে গিয়ে সাগরে ভেঙে পড়েছে। পাইলটদের পাওয়া যায়নি, জনি জানালো।

ও, বিষণ্ণ হয়ে গেল জ্যাক। আমার খুব প্রিয় ছিলো প্লেনটা! আর ওড়াতে পারবো না! রিড, তোমারও নিশ্চয় খারাপ লাগছে?

হ্যাঁ, ক্লান্ত ভঙ্গিতে মাথা ঝাঁকালো রিড। গুহা থেকে বেরিয়ে খোলা বাতাসে আসার পর অনেকটা সুস্থ লাগছে তাকে, ঘোরের ভাবটা আর নেই! চল, যাওয়া যাক।

হাঁটতে জ্যাকের অসুবিধে হলো না, কিন্তু রিড একেবারেই পারলো না। পালা করে তাকে বয়ে নিয়ে চললো ছেলেরা। জিনার কোলে টোগো। ছাড়লেই সোজা পথে না গিয়ে ওটা আরেক দিকে চলে যেতে চায়।

মাঝপথে দেখা হলো পুলিশের সঙ্গে। কলিউডের ফোন পেয়ে গুহার দিকেই আসছিলো। রিডের দায়িত্ব নিলো ওরা।

ফার্মে ফিরে এলো ছেলেমেয়েরা। উদ্বিগ্ন হয়ে অপেক্ষা করছিলেন জনির বাবা, মা, আর ল্যারি। উষ্ণ সংবর্ধনা জানালেন সবাইকে। জিনার কোল থেকে টোগোকে প্রায় কেড়ে নিলো ল্যারি। জড়িয়ে ধরে আদর করতে করতে বললো, পালিয়ে যাওয়ার অভ্যাসটা তুই ছাড়, বুঝেছিস! বড়দের মতো করে বললো সে। বড় খারাপ অভ্যাস! ধরে একদিন এমন মার লাগাবো… কথা আর শেষ হলো না তার। যেন বুঝতে পেরেই মারের ভয়ে ঝটকা দিয়ে তার হাত থেকে ছুটে গিয়ে মাটিতে লাফিয়ে পড়লো বাচ্চাটা। তিড়িং বিড়িং করে খানিকটা লাফিয়ে নিয়ে দৌড় দিলো গোলাঘরের দিকে। ওটাকে ধরে আনতে ছুটলো ল্যারি।

বাচ্চা দুটোর কাণ্ড দেখে হাসতে আরম্ভ করলো সবাই। এমনকি রিডও পায়ের ব্যথা ভুলে গিয়ে হেসে উঠলো।

পাগল ছেলে! সস্নেহে সেদিকে তাকিয়ে বললেন মা। থাক, আর কিছু বলবো না টোগোকে। ওটার জন্যেই আজ ওদের ফিরে পাওয়া গেল..আরে, তোমরা সব দাঁড়িয়ে কেন? এসো এসো, ঘরে এসো। চা-নাস্তা রেডিই আছে।

ওসব নাস্তা-ফাস্তায় কাজ হবে না আমার, হেসে হাত নাড়লো জ্যাক। আমার আর রিডের ভুড়িভোজন দরকার। কখন যে শেষ খেয়েছি, ভুলেই গেছি।

ঠিক আমার কথাটা বলেছেন,তুড়ি বাজালো মুসা। কখন যে খেয়েছি মনেই নেই। এতো খাটাখাটনি করেছি, মনে হচ্ছে নাড়ি পর্যন্ত হজম হয়ে গেছে। আন্টি, দুটো বড় বড় কেক, আর অন্তত খানকুড়ি মাংসের বড়া না হলে চলবে না আমার।

পাগল ছেলে! মুসার দিকে তাকিয়ে দ্বিতীয়বার বললেন মিসেস কলিউড।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *