১৭. আবার ভাঙলো নীরবতা

আবার ভাঙলো নীরবতা। তবে এবার কথা বললো কিশোরকে যারা ধরেছ তাদের একজন। খুব চালাক মনে করেছিলে নিজেকে। কেমন বুঝলে মজাটা?

অচেনা কণ্ঠস্বর। তোমাকে আর সিনর স্টেফানোকে ছাড়া হবে না কিছুতেই। তবে অ্যাজটেক ড্যাগারটা কোথায় আছে যদি বলো, তাহলে ছেড়ে দিতেও পারি।

জালের নিচে চাপা থেকে শ্বাস নিতেও যেন কষ্ট হচ্ছে কিশোরের। নড়াচড়ার চেষ্টা করতে গিয়ে লক্ষ্য করলো, আরেকজন মানুষ রয়েছে তার পাশে। নিশ্চয় সিনর স্টেফানো। এতোক্ষণ বুঝতে পারেনি কেন, যে তিনি আছেন? হয়তো তাঁর মুখেও কাপড় গোঁজা। বেঁধে রাখা হয়েছে। যাতে নড়তেও না পারেন, কথা বলতে না পারেন।

জেলে দুজনকে নিয়ে হ্রদের পাড়ে পৌঁছেছে ততোক্ষণে রবিন আর মুসা। লঞ্চটা আগের জায়গাতেই রয়েছে। সারেঙকে ডেকে জিজ্ঞেস করলো, কিশোর এদিকেই এসেছে। দেখেছেন? যে মানুষটাকে খুঁজতে এসেছি তাকে নিয়ে সেই লোক তিনজনও এসেছে। বোটটোট যেতে দেখেছেন নাকি?

না, অবাক মনে হলো সারেঙকে। দেখিনি তো!

মুসার দিকে তাকালো রবিন। তারপর জেলে দুজনের দিকে। হুগো আর নিটো। বললো, মিথ্যে কথা বলেছে লোকটা। নিশ্চয় আটকে ফেলেছে। কিশোরকে। ওই কুঁড়েতেই রয়েছে এখনও। সরানোর সময় পায়নি। জলদি চলুন।

ঘুরে প্রায় দৌড়াতে শুরু করলো সে। আগের পথ বেয়ে উঠতে লাগলো। পেছনে অন্য তিনজন।

কুঁড়েটায় পৌঁছতে বেশিক্ষণ লাগলো না। তাদেকে হুড়মুড় করে ঢুকতে দেখে অবাক হয়ে তাকালো ঘরের দুজন লোক।

কিশোর কোথায়? কঠিন গলায় জিজ্ঞেস করলো রবিন।

মানে? কি বলছো? বললো একজন।

ততোক্ষণে ঘরের আবছা অন্ধকার চোখে সয়ে এসেছে রবিন আর মুসার। লোকটাকে চিনে ফেললো, চেহারাটা ভালোমতো দেখতেই। এই সেই নকল পুলিশ অফিসার, গাড়িতে উঠে ওদেরকে যে কিডন্যাপ করে নিতে চেয়েছিলো।

জাল থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যে মরিয়া হয়ে উঠলো কিশোর। না পেরে দাপাতে শুরু করলো মেঝেতে। লাথি মারতে শুরু করলো।

ওই তো! চেঁচিয়ে উঠলো মুসা। ওই যে!

দরজার দিকে দৌড় দিলো দুই কিডন্যাপার। ঝট করে এক পা বাড়িয়ে দিলো মুসা। পায়ে লেগে আছাড় খেয়ে পড়লো একজন। আরেকজনকে আটকে ফেললো হুগো আর নিটো।

রবিন জাল সরাতে শুরু করে দিয়েছে। টেনে টেনে তুলে ছুঁড়ে ফেলছে একপাশে। বেরিয়ে পড়লো দুজন মানুষ। একজন কিশোর, আরেকজন সিনর স্টেফানো। মুক্ত করলো ওদেরকে।

বিধ্বস্ত মনে হচ্ছে আরকিওলজিস্টকে। বিড়বিড় করে বললেন, থ্যাংক ইউ!

এতো কাহিল হয়ে পড়েছেন তিনি, উঠে দাঁড়ানোরই শক্তি পাচ্ছেন না। তাকে প্রায় বয়ে আনতে হলো বাইরে।

হয়েছে, ছেড়ে দাও, স্টেফানো বললেন। আমার অসুবিধে হচ্ছে না। কাল রাতে তোমাদের কথা আর মিস্টার সাইমনের কথা আলোচনা করতে এনেছি লোকগুলোকে। দারুণ গোয়েন্দা তোমরা। হাল তো ছাড়োইনি, পিছু নিয়ে ঠিক চলে এসেছে এখানে।

ঠিকই বলেছেন! বললো হুগো। কয়েকটা ছেলে যেরকম সাহস দেখালো…এদের জন্যেই শয়তানটাকে ধরতে পারলাম। বলে দুই অপরাধীর একজনের বুকে খোঁচা মারলো। এটার বাড়ি আমাদের এলাকায়। শয়তানী করতে করতে শেযে কিডন্যাপার হতেও বাধলো না! রবিনের দিকে তাকালো। কি করবো দুটোকে?

প্যাকুয়ারে পুলিশের কাছে নিয়ে যাবো, অনুরোধের সুরে বললো রবিন। আপনারা কি আমাদের সঙ্গে যেতে পারবেন? এদুটোকে নিতে সুবিধে হতো।

নিশ্চয় যাবো, জবাব দিলো নিটো।

পিছমোড়া করে হাত বেঁধে টেনে নেয়া হলো দুই বন্দিকে। হাঁ করে দৃশ্যটা দেখতে লাগলো গায়ের লোক। লঞ্চে তোলা হলো দুজনকে। সারেংও অবাক হয়েছে। বললো, ধরতে পারলে তাহলে!

হ্যাঁ, পেরেছি, মুসা বললো।

গাল ফুলিয়ে বসে রইলো দুই বন্দি। কোনো কথারই জবাব দিলো না। প্রশ্ন করা বাদ দিলো ওদেরকে কিশোর। কিভাবে ধরা পড়েছেন, গল্পটা বললেন সিনর স্টেফানো। পর্বতের ওপর একটা ধ্বংসস্তূপ আছে। ওটাতে প্রাচীন নিদর্শন পাওয়া যাবে ভেবে খুঁড়তে গিয়েছিলেন। পুরানো একটা মন্দিরও আছে ওখানে।

মন্দিরের ভেতর আমাকে আটক করলো ওরা, বললেন তিনি। ধরে নিয়ে গেল কুঁড়েটায়, যেটাতে প্রথম আমাকে পেয়েছিলে তোমরা। অনেক প্রশ্ন করলো। জোর করতে লাগলো। বার বার জিজ্ঞেস করলো ছুরিটার কথা। বলিনি। তারপর খেতে চলে গেল। এই সময় এলে তোমরা তোমাদেরকেও বাধলো ওরা। ছুটলে কিভাবে?

মুসা এসে খুলে দিয়েছে, মুসাকে দেখালো রবিন। আমাদের গোয়েন্দা সংস্থার তৃতীয় সদস্য। মুসা আমান।

হেসে হাত বাড়িয়ে দিলো মুসা। হাতটা ধরে জোরে ঝাঁকিয়ে দিলেন আরকিওলজিস্ট। পরের ঘটনা বলতে লাগলেন। টেনেহিঁচড়ে তাকে একটা গাড়িতে নিয়ে গিয়ে তুললো কিডন্যাপাররা। তারপর নিয়ে এলো প্যাজকুয়ারোতে। এই লোকটা, নকল পুলিশ অফিসারকে দেখালেন তিনি। আমাকে অনেক হমকি দিয়েছে। প্রশ্নের জবাব না দিলে নাকি টর্চার করে মেরে ফেলবে। কিছুতেই মুখ খুলিনি আমি।

তীব্র ঘৃণা ফুটলো লোকটার চোখে। থুহ করে থুথু ফেললো আরকিওলজিস্টের পায়ের কাছে। দাঁতে দাঁত চেপে বললো, ভেবো না পার পেয়ে গেছো! আমার দলের লোকেরা এখনও মুক্ত রয়েছে। কিছু একটা করবেই ওরা।

আর করবে কচু, বুড়ো আঙুল দেখালো কিশোর। তোমাদেরকে পাবে তো। ঠিকই কথা বের করে নেবে পুলিশ। ঘাড় ধরে টেনে আনবে তোমার দোস্তদের। শয়তানী করা বের করে দেবে।

প্যাজকুমারোতে পৌঁছে সোজা থানায় চলে এলো ওরা। সঙ্গে সঙ্গে হাজতে ঢোকানো হলো দুই আসামীকে। হুগো আর নিটো কিশোরদেরকে বললো, ওরা দ্বীপে ফিরে যেতে চায়। তাদের কাজের জন্যে অনেক ধন্যবাদ দিলো কিশোর, পারিশ্রমিক দিতে চাইলো।

মাথা নাড়লো হুগো। কি যে বলো। জীবনে এই প্রথম আসামী ধরার সুযোগ পেয়েছি। সমাজের একটা উপকার করলাম। এ-তো আমার ভাগ্য। তোমাদের মতো সাহসী ছেলে যদি কিছু আমাদের এখানেও থাকতো, অনেক ভালো হতো। ধন্যবাদ বিনিময় চললো কিছুক্ষণ। তারপর চলে গেল জেলে দুজন।

তিন গোয়েন্দা আর সিনর স্টেফানোর মুখে ঘটনার বৃত্তান্ত শুনলেন থানার ইনচার্জ। মেকসিকো সিটি আর অকজাকায় লোকদুটোকে খুঁজছে পুলিশ, একথা শুনে টেলিফোন করলেন দুটো শহরের পুলিশকে। তারপর রিসিভার নামিয়ে রেখে ফিরে এলেন হাসিমুখে।

তোমাদের জন্যে একটা সুখবর আছে, বললেন তিনি। দলের নেতা হুবার্ট রিগোকে অ্যারেস্ট করা হয়েছে মেকসিকো সিটিতে।

হুবার্ট রিগো! তিক্তকণ্ঠে বললেন স্টেফানো। এতোক্ষণে বুঝতে পারলাম, ওরা এতো কিছু জানলো কার কাছে। আমার কথা, ছুরিটার কথা। লোকটা আমার গাইউ ছিলো। বহু বছর সঙ্গে থেকেছে।

আরও খবর আছে, অফিসার জানালেন। তিন গোয়েন্দার দিকে ফিরে বললেন, মিস্টার সাইমনের পাইলটকে যে কিডন্যাপ করেছিলো, তাকেও ধরা হয়েছে। ওর দলের লোকেরাই আমেরিকান সেজে ছদ্মনামে ফোন করেছিলো পুলিশ আর পেপারকে, সিনর স্টেফানোর মৃত্যুর মিথ্যে সংবাদ দিয়েছিলো।

যাক, স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো কিশোর। তবে আরও দুজন বাকি রয়ে গেছে। তিন ভ্যাকুয়ামোর একজন ধরা পড়েছে, হাজতের দিকে দেখালো সে। বাকি রয়েছে…

ধরবো। যাবে কোথায়?

অফিসারের কাছে শুনলো ওরা, পুলিশের কাছে সব স্বীকার করেছে হুবার্ট রিগো। এক কোটিপতি নাকি তাকে লোভ দেখিয়েছিলো, ছুরিটা বের করে দিতে পারলে অনেক টাকা দেবে। চুরি করে কিংবা অন্যভাবে আরও প্রাচীন জিনিস জোগাড় করে ওই লোককে দিয়েছে রিগো। অ্যাজটেকদের জিনিস সংগ্রহের নেশা কোটিপতি লোকটার।

সিনর স্টেফানোকে নিয়ে থানা থেকে বেরোলো তিন গোয়েন্দা। ফিরে এলো হোটেলে। প্রথমেই গোসল সেরে নিলো সবাই। খাওয়া শেষ করলো। তারপর বিশ্রাম নিতে এলো। বিছানায় শুয়ে পড়লেন আরকিওলজিস্ট। কেন তাকে খুঁজতে এসেছে এতোক্ষণে জানানোর সুযোগ পেলো ছেলেরা। সংক্ষেপে সব জানানো হলো তাকে।

মন দিয়ে শুনলেন স্টেফানো। ছেলেরা তাদের কথা শেষ করলে বললেন, এবার তাহলে আমার গল্প শোনো। মাস দুই আগে একদিনের কথা। বিরক্ত করে তুলেছিলো আমাকে রিগো। তাকে বরখাস্ত করলাম। হোটেলের ঘরে বসে ফোনে আলাপ করছি রেডফোর্ডের সঙ্গে, হঠাৎ দেখি জানালা দিয়ে আড়িপেতে আমার কথা শুনছে রিগো। আমার মনে হয় সেদিনই ছুরিটার কথা শুনে ফেলেছিলো সে, চুরি করার মতলব এটেছিলো। প্রায়, হাজার বছরের পুরানো জিনিস ওটা। অনেক টাকার জিনিস।

দম নেয়ার জন্যে তিনি থামলে কিশোর বললো, আপনি মিস্টার রেডফোর্ডকে ধার দিয়েছিলেন ছুরিটা। আপনারা দুজন আর রিগো বাদে কি আর কেউ জানতো এটা?

মনে হয় না। জানার কোনো উপায় ছিলো না। পাওয়ার পর আর কাউকে বলিনি আমি।

মুসা জিজ্ঞেস করলো, ছুরিটা দেখতে কেমন?

খুব সুন্দর। আগ্নেয় শিলায় তৈরি ফলাটা। এখনও অনেক ধার। সোনার তৈরি বাট। তাতে ডানালা সাপের ছবি খোদাই করা। নীলকান্তমণি আর চুনি, পাথর খচিত।

তিন বছর আগে পুরানো অস্ত্র জোগাড় করতে এদেশে এসেছিলো রেডফোর্ড। আমার সংগ্রহ দেখলো। অনুরোধ করতে লাগলো ছুরিটা দেয়ার জন্যে। বিক্রি করতে রাজি হলাম না আমি। বললাম, জিনিসটা আমার দেশের সম্পত্তি। স্টেট মিউজিয়ামে দিয়ে দেবো। অবশেষে অনেক চাপাচাপি করে আমাকে রাজি করালো, কিছুদিনের জন্যে ধার দিতে। আমি তাকে বিশ্বাস করতাম। পাঁচ বছরের জন্যে ছুরিটা তার সংগ্রহে রাখতে চেয়েছিলো। দিয়ে দিলাম।

ছুরিটা কোথায় লুকিয়ে রেখেছেন মিস্টার রেডফোর্ড, কিশোর জিজ্ঞেস করলো। জানেন আপনি?

না। বলেনি। আমিও শোনার দরকার মনে করিনি। বের করতে পারেনি এখনও কেউ?

মনে হয় না।

মুখ কালো করে ফেললেন স্টেফানো। দেয়াই উচিত হয়নি। বের করতে না পারলে… কিন্তু কি করবো? এমন চাপাচাপি শুরু করলো!

ভাববেন না, কিশোর বললো। অন্য কারো হাতে চলে না গিয়ে থাকলে ঠিকই বের করে ফেলবো।

হ্যাঁ, হেসে বললো রবিন। লুকানো জিনিস বের করতে ওস্তাদ আমাদের কিশোর পাশা। ধরে নিতে পারেন, পেয়ে গেছেন। আচ্ছা, আরেকটা কথা এসবের মধ্যে পিকো আলভারো এলো কিভাবে? উইলে তার নামও রয়েছে।

এক মুহূর্ত ভাবলেন আরকিওলজিস্ট। বললেন, জিনিসটার কথা গোপন রেখে একজন সাক্ষি রাখতে চেয়েছিলাম। আমার আর রেডফোর্ডের মাঝে যে একটা চুক্তি হয়েছে একথাই শুধু জানবে তৃতীয় লোকটি, কি জিনিসের ব্যাপারে তা জানানো হবে না। রেডফোর্ডের কিছু হলে আমাকে চিনিয়ে দেয়ার জন্যেও একজনকে দরকার। আলভারোকে সেই তৃতীয় লোক হিসেবে বেছে নিলাম দুজনেই। রেডফোর্ড মারা গেছে শুনে, সত্যি, খুব কষ্ট লাগছে, দীর্ঘশ্বাস ফেললো স্টেফানো। আমার সঙ্গে বেঈমানী করেনি। গোপন রেখেছে ছুরির কথা। তোমাদের সঙ্গে রকি বীচে যাবো আমি। ছুরিটা আনার জন্যে। ওটা খোঁজার ব্যাপারেও তোমাদেরকে সাহায্য করতে পারবো।

খুব ভালো হয় তাহলে, কিশোর বললো। মিস্টার রেডফোর্ডের বাড়িতে ছবির যেসব স্লাইড পেয়েছে ওরা, জানালো সিনর স্টেফানোক। একটা ছবি ভোলা হয়েছে একটা বাগানে।

বুঝতে পেরেছি। মেকসিকো সিটির বাইরে, একটা কটেজ ভাড়া নিয়েছিলো। রেডফোর্ড। ওখানে তোলা হয়েছে।

আরেকটাতে অ্যাজটেক যোদ্ধার পোশাকে দেখা গেছে আপনাকে, হেসে বললো মুসা।

স্টেফানোও হাসলেন। পিরামিড অভ দি সানের কাছে ইনডিয়ানদের একটা অনুষ্ঠান হচ্ছিলো সেদিন। আমিও যোগ দিয়েছিলাম তাতে। ইউনিভারসিটির কয়েকজন প্রফেসর ধরলেন, আমার ছবি তুলবেন। তোলা হলো। রেডফোর্ডও তুলছিলো। অনেক পুরানো একটা পোশাক পরেছিলাম সেদিন।

মিস্টার সাইমনকে ফোন করা হলো। সব শুনে খুব খুশি হলেন তিনি। সিনর স্টেফানো তিন গোয়েন্দার সঙ্গে আসছেন শুনে আরও খুশি হলেন। বললেন, প্লেন পাঠানোর ব্যবস্থা করবেন।

পরদিন মেকসিকো সিটিতে পৌঁছলো ওরা। প্লেন অপেক্ষা করছে। তাকে যে কিডন্যাপ করেছিলো, সেই লোকটা হাজতে শুনে ল্যারি কংকলিনও খুশি হলো।

রকি বীচে পৌঁছার পরদিন সকালে দল বেঁধে মিস্টার রেডফোর্ডের বাড়িতে গেল সবাই–তিন গোয়েন্দা, মিস্টার সাইমন, উকিল মিস্টার নিকোলাস ফাউলার এবং সিনর এমিল ডা স্টেফাননা। গাছের গায়ে যে তীর চিহ্নগুলো রয়েছে, সেগুলো দেখার জন্যে অস্থির হয়ে উঠেছে কিশোর। ও হ্যাঁ, রকি বীচে আসার পর সাইমন জানিয়েছেন, গাছটাতে আরও কতগুলো তীর আঁকা রয়েছে। এতো সূক্ষ্মভাবে, খুব ভালো করে না দেখলে চোখে পড়ে না।

অনেকক্ষণ ধরে ওগুলোকে দেখলো কিশোর। ঘন ঘন চিমটি কাটলো নিচের ঠোঁটে। তারপর সাইমনকে বললো, একটা ব্যাপার লক্ষ্য করেছেন? তীরগুলো সব একই দিক নির্দেশ করছে। আর মাথাগুলো নিচের দিকে ঝোকানো। কোন জায়গায় খুঁজতে হবে, তাই বোঝাতে চাইছে, না? আর অ্যাজটেক যোদ্ধার ছবিটা দিয়ে বোঝাতে চেয়েছে ওদিকে রয়েছে জিনিসটা।

হ্যাঁ, ইঙ্গিতটা পরিষ্কার, সাইমন বললেন। তীরের মাথা নিচের দিকে ঝোঁকানো। তার মানে মাটির নিচে খুঁজতে বলেছে। খোঁজা তো আর বাদ রাখিনি।

মাটির নিচে বলতে মাটিতে পুঁতে না রেখে মাটির তলার ঘরও তো হতে পারে। সেলার? ওদিকেই তো।

দীর্ঘ একটা নীরব মুহূর্ত কিশোরের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন ডিটেকটিভ। তারপর ঝট করে দৃষ্টি ফেরালেন তীরের মাথা যেদিকে করে রয়েছে সেদিকে। হাঁটতে শুরু করলেন। তার পিছু নিলো তিন গোয়েন্দা।

সেলারে এসে ঢুকলো ওরা। শুরু হলো খোঁজা। তন্ন তন্ন করে খুঁজেও পাওয়া গেল না ছুরিটা। চারপাশে তাকাতে লাগলো কিশোর। কোথায় হতে পারে? সেলারের কথাই বোঝানো হয়েছে কোনো সন্দেহ নেই তার। একধারে একটা পাইপ রয়েছে। নেমে এসেছে ওপর থেকে। ফুটখানেক নেমে বেরিয়ে গেছে দেয়াল কুঁড়ে। সেটার দিকে পুরো একটা মিনিট স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো সে। নিচের ঠোঁটে চিমটি কাটলো। তারপর আনমনেই বললো, এটা এখানে কেন? এ পাইপের কি দরকার? এটার তো কোনো কাজ নেই! বুঝেছি! তুড়ি বাজালো সে। সাইমনের দিকে তাকিয়ে বললো, আসুন আমার সঙ্গে।

বাইরে বেরোলো কিশোর। পাইপটা যেদিকে দিয়ে বেড়িয়েছে সেখানকার মাটি খুঁড়তে শুরু করলো। বেরিয়ে পড়লো পাইপটা। মাটির নিচ দিয়ে চলে গেছে পুব দিকে। রবিন আর মুসাকেও হাত লাগাতে অনুরোধ করলো সে। খুঁড়তে খুঁড়তে এগিয়ে চললো।

দশ ফুট দূরে একটা ঝোপের ভেতরে গিয়ে শেষ হয়েছে পাইপ। কংক্রীটের গাঁথুনি দিয়ে একটা ছোট বাক্সমতো তৈরি করা হয়েছে পাইপের মাথার কাছে। বাক্সের ওপর গোল একটা লোহার ঢাকনা। ঢাকনার মাথায় আঙটা। পানি নিষ্কাশনের পাইপের মাথায় যেমন জয়েন্ট বক্স তৈরি করা হয়, সেরকম। কেউ দেখে কিছু সন্দেহ করতে পারবে না।

আঙটা ধরে টান দিতেই উঠে এলো ঢাকনাটা। ভেতরে হাত ঢুকিয়ে দিলো কিশোর। পানি নেই। খটখটে শুকনো। আসলে পানি যাওয়ার জন্যে বসানো হয়নি পাইপটা। বের করে আনলো সুন্দর করে অয়েল পেপারে মোড়া একটা প্যাকেট। না খুলেই বলে দেয়া যায় ভেতরে কি রয়েছে। নীরবে সেটা সিনর স্টেফানোর হাতে তুলে দিলো সে।

কাঁপা হাতে প্যাকেটটা খুলতে লাগলেন আরকিওলজিস্ট। সবাই তাকে ঘিরে এসেছে। আগ্রহে উত্তেজনায় চকচক করছে সকলেরই চোখ।

বেরিয়ে পড়লো অ্যাজটেক যোদ্ধার সম্পত্তি। ছবিতে যেরকম দেখেছে গোয়েন্দারা, সেরকমই, তবে অনেক বেশি সুন্দর। আলো পড়লেই ঝিক করে উঠছে নীলকান্তমণি আর রুবি পাথরগুলো।

সুন্দর! প্রায় ফিসফিসিয়ে বললেন ফাউলার। চোরেরা যে পিছু লেগেছিলো, এ-কারণেই। সিনর স্টেফানো, অনেক দাম এটার, তাই না?

হাসি ফুটেছে আরকিওলজিস্টের মুখে। অনেক! অ্যানটিক মূল্য! মাটি খুঁড়ে একবার বের করেছিলাম আমি, আরেকবার বের করলো এই ছেলেগুলো! সত্যি, এরা জিনিয়াস! আমি ওদের কাছে কৃতজ্ঞ।

কৃতজ্ঞ শুধু আপনিই নন, সিনর, উকিল বললেন। আরও অনেকেই হবে। মিস্টার রেডফোর্ডের উইলে যাদের যাদের নাম লেখা রয়েছে, তারা সবাই। কারণ এখন আর সম্পত্তি ভাগাভাগি করে নিতে কোনো অসুবিধে হবে না ওদের।

***

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *