১৬-২০. দিনের বেলায় লেজি এমে রেইড

দিনের বেলায় লেজি এমে রেইড চালিয়ে মিস মাস্টারসনকে তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ব্যাঙ্ক ডাকাতির প্রায় পরপরই ঘটায় শহরে বিপুল অসন্তোষ আর ক্রোধ ছড়িয়ে পড়ল। হোপের সবাই একমত যে ওই ডাকাত দলের বিরুদ্ধে একটা কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার সময় এসেছে। কিন্তু যখন খবর এলো কাজটা ইতোমধ্যেই করা হয়েছে, তখন শহরের কিছু লোক এতে অসন্তুষ্ট হলো। তবে এই অসন্তোষ ছড়াবার একক হোতা হচ্ছে শেরিফ টেলর নিজেই। সে সতর্কতার সাথে এই কথাটা ছড়াল যে দুই র‍্যাঞ্চের সম্মিলিত এই অভিযানে কেবল তাকে এবং তার অফিসের মর্যাদাই ক্ষুণ্ণ করেনি, এতে সমস্ত এলাকাবাসীকেও উপেক্ষা করে ছোট করা হয়েছে।

এইভাবে সফলতার সাথে অসন্তোষ ছড়িয়ে পরদিন সকালে সে সন্তুষ্ট চিত্তে বার বি রাঞ্চে হাজির হলো। কিন্তু বার্টের অভ্যর্থনা শেরিফের কাছে মোটেও সন্তোষজনক মনে হলো না।

আজ সকালে তোমাকে খুব খুশি দেখাচ্ছে? বিদ্বেষের সাথে বলল বার্ট। এর কারণটা কি?

আমি শহরে জেমসের বিরুদ্ধে বিরূপ মনোভাব সৃষ্টি করে এসেছি, গর্বের সাথে জানাল সে। ওই লোক যদি মনে করে থাকে যে আউটলদের উচ্ছেদ করার জন্যে শহরবাসীর বাহবা পাবে, তাহলে ওকে হতাশ হতে হবে।

চমৎকার কাজ করেছ, উপহাস করে বলল বার্ট। এতে ওর ভয়ে একেবারে মরে যাওয়ার অবস্থা হবে। তোমার কি মনে হয় এতে সে ভয়ে দেশ ছেড়ে পালাবে?

টেলরের চেহারা থেকে খুশির ভাবটা মুছে গেল। অস্বস্তিভরে ঘোর পিঠে সে একটু নড়েচড়ে বসল।

তুমি একটা নেহাতই অযোগ্য শেরিফ, তাই না? শুরু করল সে। আমি তোমার পিছনে না থাকলে এই চাকরি তুমি কতদিন রাখতে পারতে?

অতিথির ফোলা লালচে মুখে ওই প্রশ্নে একটু বেগুনির ছাপ দেখা দিল।

আমি জানি বন্ধু হিসেবে তুমি আমার জন্যে অনেক করেছ, বলল সে। এবং তোমার উপকারের কথা আমি কোনদিন ভুলব না।

কথাটা না ভোলাই তোমার উচিত, কঠিন স্বরে বলল বার্ট। আমিই তোমার একমাত্র বন্ধু। জেমসকে তুমি কবে গ্রেপ্তার করবে, টেলর?

ওকে গ্রেপ্তার করব? বিস্ফারিত চোখে প্রশ্ন করল সে। কোন অপরাধে?

তোমার বাড়ির বাগান থেকে ফুল চুরি করার জন্যে, রোষের সাথে বলল বার্ট। প্রথমত জ্যাককে খুন করার অপরাধই যথেষ্ট, এরপরে খোঁজ নিয়ে আরও কারণ বের করা যাবে।

কিন্তু আমার কাছে এর এক চিলতে প্রমাণও যে নেই, টেলর প্রতিবাদ জানাল।

না, শেরিফ হয়েও তোমার কাছে তা থাকবে না-তোমারই কাজ অন্যদের করে দিতে হবে, ধমক দিল বার্ট। কিন্তু তোমাকে ওই ব্যাপারে কোন চিন্তা করতে হবে না; আমার কাছে এর যথেষ্ট প্রমাণ আছে।

তুমি প্রমাণ করতে পারবে সেই জ্যাককে মেরেছে? হতভম্ব টেলর বিস্ময়ে চিৎকার করে উঠল।

বিজয়ীর মত মাথা ঝাঁকাল বার্ট। তুমি ধরে নিতে পারো যে সে ফাঁসিতে ঝুলেই গেছে, বলল সে। তুমি ঘোড়া নিয়ে আমার সাথে চলো, আমি তোমাকে প্রমাণ দেখাচ্ছি।

আধঘণ্টা পর ওরা সিঙ্কে লুকানো ঝোঁপের কাছে পৌঁছল। বার্ট আঙুল তুলে ঝোঁপটা দেখিয়ে বলল, তুমি নিজেই ওর ভিতরে উঁকি দিয়ে দেখো।

ঝোঁপটাকে ঠেলে সরিয়ে শেরিফ কুঁচকানো জামাগুলো একে একে বের করে খুঁটিয়ে পরীক্ষা করে দেখল। হ্যাটটা দেখে তার খুদে চোখদুটোও বিস্ময়ে বিস্ফারিত হওয়ার বৃথা প্রয়াস পেল।

এটা যে মাস্টারসনেরই হ্যাট তাতে কোন সন্দেহ নেই। তাহলে এই জামা-কাপড়ও নিশ্চয় তারই হবে, বলল সে। হঠাৎ কাপড়ের তলায় চকচকে একটা জিনিস ওর দৃষ্টি আকর্ষণ করল। হাতে তুলে নিয়ে দেখল ওটা একটা উইনচেস্টার। শেষবার ব্যবহারের পর অনেকদিন পরিষ্কার না করায় ওটায় কিছুটা মরচে ধরেছে। কিন্তু ওটার বাটে আঁচড় কেটে লেখা দুটো অক্ষর স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে-জে. জি.।

অক্ষরগুলো হয়ত জেমস গ্রীনের নামের আদ্যাক্ষর, খুশিতে চিৎকার করে উঠে বলল সে। যেন একটা কঠিন সমস্যার সমাধান খুঁজে পেয়েছে।

চমৎকার একটা উর্বর মাথা আছে বটে তোমার, বলল বার্ট। তবে অক্ষরগুলো জন গ্ৰেহাম নামের আদ্যাক্ষরও হতে পারে।

সান্দগ্ধ চোখে ওর দিকে তাকাল টেলর। তুমি কি ধারণা করছ এটা জেমসেরই রাইফেল? প্রশ্ন করল সে।

ধারণা করব কি, বলদ, আমি নিশ্চিত জানি। বাৰ্ট চোখ টিপে ইশারা করায় আশ্বস্ত হয়ে দাঁত বের করে সমঝদারের মত হাসল শেরিফ। এখন মনে থাকে যেন, এগুলো আমি খুঁজে পাইনি। তুমি তোমার একজন ডেপুটির সাথে এদিক দিয়ে যাবার সময়ে এগুলো দেখতে পেয়েছ। বুঝেছ?

ওর কথার মানে পরিষ্কার বুঝেছে শেরিফ। খুশিতে টেলরের চোখদুটো চকচক করছে। এতদিনে সে তার অপমানের প্রতিশোধ নেয়ার একটা চমৎকার সুযোগ পেয়েছে। এবার সে শহরের সবাইকে দেখিয়ে দিতে পারবে যোগ্য শেরিফই পেয়েছে ওরা।

ওগুলো আপাতত যেখানে ছিল সেখানেই রেখে দাও, বলল বার্ট। পরে একজন ডেপুটির সামনে তুমি এসব খুঁজে বের করলে তোমার মান অনেক বাড়বে।

তোমার ব্রেইনে দারুণ ধার আছে বটে, বার্ট, তোষামোদের সুরে বলল টেলর।

ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে র‍্যাঞ্চের পথ ধরে এগোবার সময়ে শেরিফ প্রশ্ন করল, জেমস সম্পর্কে তোমার আর কিছু বলার আছে?

হ্যাঁ, তুমি ব্যাঙ্ক ডাকাতি আর রাস্টনকে গুলি করার অভিযোগ দুটোই ওর ওপর চাপাতে পারো, ঠাণ্ডা স্বরে বলল বার্ট। শেরিফ নিজের জিনের ওপর প্রায় লাফিয়ে উঠল।

তুমি কি সেটাও প্রমাণ করতে পারবে?

তার দরকার পড়বে না-সে নিজেই তার প্রমাণ দেবে।

কিন্তু আমি ভেবেছিলাম- শুরু করেছিল বিভ্রান্ত শেরিফ।

বিরাট ভুল। তোমার মত মানুষের কোন চিন্তাই করা ঠিক নয়, কারণ মগজ বলে কিছুই তোমার নেই। তোমার হয়ে আমাকেই সব চিন্তা করতে দাও। এটাই বেশি নিরাপদ।

ফাটা বেলুনের মত চুপসে গেল টেলর। সে ভাল করেই জানে যে এই বদ লোকের কৃপাতেই শেরিফের পদে ভূষিত হয়ে আজ সে সমাজে মাথা উঁচু করে বাঁচার সুযোগ পেয়েছে। যদিও লোকটা সম্পর্কে সামান্যই জানে, তবু অনেক কিছুই সন্দেহ করে টেলর। তবে ওকে বিশ্বাস করে আজ পর্যন্ত নিজের সম্পর্কে ব্যক্তিগত কোন কথাই বার্ট তাকে বলেনি। তাই এখনও সে ওর বন্ধু না হয়ে লোকটার কথা মত নাচার পুতুলই রয়ে গেছে।

জ্যাককে শেষ করার পিছনে জেমসের কি স্বার্থ? কিছু কথা বের করার চেষ্টা করল টেলর।

আমার ধারণা এমারি আর সে যুক্তি করে লেজি এম হাত করার চেষ্টায় আছে, ব্যাখ্যা করল বার্ট। মেয়েটাও যদি না থাকে, তাহলে আমি ছাড়া ওদের আর কেউ ঠেকাবার থাকবে না।

কিন্তু মেয়েটাকে ব্ল্যাক মাস্কের দল নিয়ে যাওয়ার পর সে ওকে উদ্ধার করে আনার চেষ্টা করেছিল, যুক্তি দেখাল টেলর।

তুমি বলতে চাইছ যারা মেয়েটাকে নিয়ে গেছে তাদের মুখে কালো মুখোশ পরা ছিল, ব্যাঙ্ক ডাকাতির সময়ও তাই ছিল-কিন্তু তাতে এটা প্রমাণ হয় না যে এটা ওই ডাকাত দলেরই কাজ। এখন আমি বুঝতে পারছি, জেমস লোকটা ওদের নাম ব্যবহার করেছে মাত্র। কিন্তু মেয়েটাকে ওরা খুঁজে পায়নি-পেয়েছে? লোকটা সত্যিই খুব চালাক। অত্যন্ত চালাক।

তাহলে মেয়েটাকে নিয়ে ওরা কি করতে পারে?

খুব সম্ভব পুঁতে ফেলেছে, নির্বিকার ভাবে মিথ্যে বলল বার্ট। জ্যাকের আর কোন উত্তরাধিকারী আছে বলে আমি শুনিনি। এদিকে এমারি নিজেই হচ্ছে জ্যাকের উইলের রক্ষক। এটা একেবারে সেই মায়ের হাতে তৈরি মোয়া খাওয়ার মত সহজ।

জাজ এমারির কিন্তু অত্যন্ত সৎ বলে সুনাম আছে, বলল সে।

অত্যন্ত চতুর ঠগদের সেটা থাকাই স্বাভাবিক, ঝাঁঝের সাথে মন্তব্য করল র‍্যাঞ্চার।

শহরের কাছে এসে টেলর বিদায় নেয়ার সময়ও শেষ কথাটা বার্টই বলল।

আমি শুনলাম রাস্টন নাকি প্রায় সুস্থ হয়ে উঠেছে, শীঘি আবার ব্যাঙ্ক চালু করবে। ব্যাঙ্কের ওপর চোখ রেখো, আমার মনে হচ্ছে ওখানে তোমার একটা ভাল সুযোগ আসতে পারে। তুমি সব সময়ে ওটার কাছাকাছি দুজন লোক রেখো, কিন্তু জেমস সুযোগ না দিলে নিজে থেকে কিছু করতে যেয়ো না। আমাকে একটা ছোট ট্রিপ নিতে হবে–এদিকে তুমি তোমার কাজ চালিয়ে যাও। তুমি যদি আমি যেমন বলেছি সেই কাজটাও পণ্ড করো তবে জেনো এর পর থেকে তোমার আর আমার পথ আলাদা; বুঝেছ?

শেরিফ নড করে বিদায় নিয়ে শহরের পথ ধরল। বার্টের চোখ ওকে অবজ্ঞার দৃষ্টিতে অনুসরণ করল।

মনেমনে সে ভাবছে: আমি যদি ওকে জানাতাম জেমসই হচ্ছে বিদ্যুৎ এরফান, আর ওকেই তার গ্রেপ্তার করতে হবে, তাহলে এতক্ষণে টেলর সোজা। মেক্সিকোর পথে রওনা হয়ে যেত। অবশ্য সেটা করলেও ওকে ঠিক দোষ দিতে পারতাম না-কারণ ওই লোকটাকে কে না ভয় পায়? বার্ট এবার তার ফোরম্যানের খোঁজে রওনা হলো।

হ্যালো, ডোভার, পথেই দেখা পেয়ে বলল বার্ট। খবর কি? তোমার কাজ কেমন এগোচ্ছে?

একেবারে সিল্কের মত মসৃণ। তুমি শেরিফকে কতটা ভজাতে পারলে?

হ্যাঁ, পুরোটাই গিলেছে ও। সবই আমাদের পক্ষে কাজ করছে। তবু তুমি আপাতত, শহরেই থাকো, তুমি একটু নজর রাখলে টেলর তার কাজ পণ্ড করতে পারবে না।

পাইনের জঙ্গলে লুকোনো কাঠের গুঁড়ি দিয়ে তৈরি একটা কেবিনে রাখা হয়েছে মিস মাস্টারসনকে। কেবিনটা চমৎকার দেখতে না হলেও অত্যন্ত মজবুত। কালো মুখোশ পরা কয়েকজন লোক ফিলের মাথা কম্বল দিয়ে ঢেকে ওকে হলওয়ে থেকে তুলে এনে ঘোড়ার পিঠে বসিয়ে বেঁধে ঘোড়াটাকে লীড করে নিয়ে চলল। নিরুপায় অবস্থায় ফিলের দম বন্ধ হয়ে আসতে চাইছে কম্বলের তলায়। প্রায় এক ঘণ্টা পরে ঘোড়া থামিয়ে কম্বলটা সরিয়ে নেয়ায় সে আবার মুক্তভাবে শ্বাস নিতে পেরে চারপাশে তাকিয়ে দেখল।

ওখানে চারজন লোক আছে, দুজন সামনে আর দুজন পিছনে। প্রত্যেকেই অস্ত্রধারী এবং সবার পরনেই রেঞ্জ পোশাক। হাঙরের দাঁতের মত চুড়ার সারির দিকে এগোচ্ছে ওরা। ওই এলাকাটা ঘুরে দেখার অদম্য ইচ্ছা একবার ওর মনে জেগেছিল, কিন্তু লরিই ওকে এদিকে আসতে দেয়নি।

ঘন্টার পর ঘণ্টা রাইড করার পর প্রথম চূড়ার ছায়ায় এসে একটা জায়গায় থামল ওরা। ওর বাঁধন খুলে ঘোড়ার পিঠ থেকে নামিয়ে পায়ে হাঁটিয়ে একটা সরু কার্নিস বেয়ে ওকে নিয়ে চলল লোকগুলো। লরির বর্ণনা থেকে জায়গাটাকে ব্ল্যাক মাস্কের আস্তানা বলে চিনতে পারল ফিল। ঢালু ঢাল বেয়ে উঠতে উঠতে একবার ভাবল: জেমস কি ওকে উদ্ধার করতে এখানে আসবে?

প্রধান গুহার পাশে কম্বলের ওপর বসে একটা বিনিদ্র রাত কাটল ওর অন্ধকার গর্তে। সকালে ওদের একজন রুটি, বেকন, আর কফি নিয়ে এলো ওর জন্যে।

আধঘণ্টা পরেই আমরা রওনা হব, রুক্ষ স্বরে জানাল সে।

আমাকে তোমরা কোথায় নিয়ে যাবে? প্রশ্ন করল ফিল, কিন্তু কোন জবাব পেল না।

গরম আর কড়া কফি ওর মধ্যে কিছুটা প্রাণ ফিরিয়ে আনল। কিন্তু খাবার কিছুই ছুঁলো না সে।

অল্পক্ষণ পরেই লোকটা ফিরে এসে রেখে যাওয়া লণ্ঠনটা তুলে নিয়ে ওকে অনুসরণ করতে ইশারা করল। একটা অন্ধকার লম্বা সুড়ঙ্গ পার হয়ে কতগুলো রুক্ষ ধাপ বেয়ে উপরে উঠল ওরা। ওখানে আর একজন লোক ওদের জন্যে অপেক্ষা করছিল। প্রতিবাদ সত্ত্বেও ওর কজিদুটো একত্রে বেঁধে চোখও রুমাল দিয়ে বাঁধা হলো। তারপর ওকে ঘোড়ার পিঠে তুলে দিয়ে আবার শুরু হলো গত দিনের মত যাত্রা। সামনের ট্রেইল দেখতে পাচ্ছে না বলে ফিলকে পুরোপুরি ঘোড়ার বিবেচনার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। ঝাঁকি খেতে খেতে ওর পুরো শরীর ব্যথা হয়ে গেছে। প্রতিবার ঢাল বেয়ে নিচে নামার পর ঘোড়াটা আবার চড়াই ধরে উপরে উঠছে। তাকে যে কোথায় নিয়ে যাওয়া হচেছ এসম্পর্কে ওর কোন ধারণাই নেই। তবে সকালের হাওয়ার তাজা আর ঠাণ্ডা ভাব থেকে সে অনুমান করল এখনও উঁচু পাহাড়েই আছে ওরা। তবে গতকালের তুলনায় আজকের যাত্রাটা অনেক কম সময় স্থায়ী হলো দেখে কিছুটা আশ্বস্ত হলো ফিল! পাইন জঙ্গলের ভিতর একটা কেবিনের সামনে এসে শেষ হলো পথচলা।

কেবিনটা খুঁটিয়ে পরীক্ষা করে সে বুঝল এখান থেকে গোপনে পালানোর কোন সুযোগ নেই। দেয়ালগুলো আছোলা মোটা মোটা গুঁড়ি দিয়ে তৈরি। মেঝের মাটিও অত্যন্ত শক্ত। বিশাল দরজাটাও বাইরে থেকে ভারী তালা দিয়ে আটকানো। বন্দিশালা হিসেবে এটা আদর্শ। আলো-বাতাস ঢোকার জন্যে কেবল একফুটি একটা চৌকো গর্ত রয়েছে দেয়ালে। ওটা দিয়ে কেবল বাইরের পাইনের জঙ্গল দেখতে পাবে বন্দি-কিন্তু ওই পথে কোন মানুষের পক্ষে বের হওয়া অসম্ভব। আসবাব বলতে ওখানে রয়েছে একটা বেঞ্চ আর কাঠের প্যাকিং বাক্স উল্টে রেখে কাজ চালাবার মত একটা টেবিল। আর বিছানার গদি হিসেবে ব্যবহার করার জন্যে কচি দেবদারু গাছের নরম ডগার পাতার স্তূপ কম্বল দিয়ে ঢাকা। ফিল লেজি এম র‍্যাঞ্চে তার নিজের শোয়ার ঘরের সাথে এটার তুলনা করে শিউরে উঠল। বাইরে তালা খোলার শব্দে বোঝা গেল কেউ আসছে। বেঞ্চের ওপর বসে নিজের চেহারাটা যতটা সম্ভব নির্ভয় রাখার চেষ্টা করল ফিল। যে লোকটা ভিতরে ঢুকল সে ওকে যারা ধরে এনেছে তাদের কেউ নয়। এই লোকটা কিছু লম্বা গড়নের। লোকটা তার কাত করে পরা হ্যাটটা মাথা থেকে নামানোর কোন প্রয়োজন বোধ করল না। মুখোশের আড়ালে ফুটো দিয়ে কেবল ওর নীল দুটো লোলুপ চোখ দেখা যাচ্ছে।

আমাকে এখানে নিয়ে আসা হয়েছে কেন? ফিল প্রশ্ন করল।

সেটা তুমি পরে জানতে পারবে, জবাব দিল সে। এখন আমি কেবল এটুকু বলতে পারি যে একজন অতিথি তোমার সাথে দেখা করতে আসবে। তার একটা প্রস্তাবে রাজি হলে তোমাকে ছেড়ে দেয়া হবে।

আমি যদি প্রত্যাখ্যান করি?

আমরা তো সেটাই চাই, খিলখিল করে হেসে সে বলে চলল, তাহলে আমি আর বয়েজরা লটারি করে ঠিক করব সবার আগে তোমাকে কে ভোগ করবে।

কথাটার মানে বুঝতে পেরে ফিলের মুখ থেকে রক্ত সরে গেল।

এই ভিজিটর কখন আসবে? প্রশ্ন করল ফিল।

ওহ, সে একটু সময় পেলেই আসবে, নির্বিকার ভাবে বলে সে বেরিয়ে গেল। ওকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে লোকটা দরজা বন্ধ করে চলে যাওয়ার পর খুব দুশ্চিন্তার মধ্যে ফিলের সময় কাটছে।

ওর ভিজিটরের পরিচয় জানার কৌতূহল ওকে চিন্তায় ফেলল; অনেক চিন্তা করে সে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছল, যে আসবে সে জেমস ছাড়া আর কেউ হতে পারে না। ওর মনে যে সন্দেহের বীজ বার্ট বুনে দিয়েছে, তাতে সে প্রায় নিশ্চিত যে ওর ফোরম্যানই লেজি এম দখল করার জন্যে এইসব করাচ্ছে। এই মুহূর্তে বার্টের সাথে সব সম্পর্ক ছিন্ন করার জন্যে ওর আফসোস হচ্ছে। লরিও ফিলের বিরুদ্ধে এই চক্রান্তের সাথে যুক্ত, এটা ভাবতেও ওর কষ্ট হচ্ছে।

এই অনিশ্চিত অপেক্ষার অস্থিরতা ওকে পাগল করে তুলেছে। তাই সে ওই লম্বা আউটলর জানালা দিয়ে বাইরে না তাকানোর নির্দেশ অমান্য করেই বারবার ওই ফোকরের মত গর্ত দিয়ে তাকিয়ে বাইরেটা দেখার চেষ্টা করছে। কিন্তু বারবার তাকিয়ে সে কেবল একবারই একটা লোকের দেখা পেল। লোকটা খাটো আর বেশ বলিষ্ঠ। টেনে সামনের দিকে নামানো হ্যাটের তলায় লোকটার চেহারা দেখতে পেল না বটে, কিন্তু কাঁচা-পাকা দাড়ি আর চোখে লাগানো প্যাঁচ দেখে সে তৎক্ষণাৎ ওকে শহরে যে লোককে বার্টের সাথে ধাক্কা খেয়ে পড়ে যেতে দেখেছিল, সেই একই লোক বলে চিনতে পারল। কিন্তু লোকটা একবারও মুখ তুলে কেবিন বা ফোকরের দিকে না চেয়ে মাথা নিচু করে সোজা হেঁটে চলে গেল।

১৭.

যেকোন বন্দিশালার সবথেকে কঠিন শাস্তি হচ্ছে একাকী ঘরে বন্দি থাকা। আটচল্লিশ ঘণ্টা ওই ঘরে বন্দি থাকার পর ওর মনের অবস্থা যখন একেবারে কাহিল এই সময়ে তৃতীয় দিন সকালে যে রোজ ওকে খাবার এনে দেয়, তার বদলে তালা খুলে অন্য কেউ কেবিনে ঢুকল। লোকটা ব্ল্যাক বার্ট।

তুমি? চেঁচিয়ে উঠল ফিল। ওহ, ঈশ্বরকে ধন্যবাদ! আমি ভয় পাচ্ছিলাম লোকটা-সম্ভবত আর কেউ হবে।

বিশাল লোকটা দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে বসা ফিলের দিকে চেয়ে অদ্ভুত ভাবে একটু হাসল। এই মুহূর্তটার জন্যে সে বহুঁকাল অপেক্ষা করেছে। কামরার মাঝখানে রাখা কাঠের বাক্স উল্টে তৈরি টেবিলে বসে সিগারেট বানানোর সরঞ্জাম বের করল।

শোনো, ফিল, বলে চলল সে, দেখলে তো, পুরোনো বন্ধুর ওপর বিশ্বাস রেখে স্ট্রেঞ্জারকে আপন করে নিয়ে দেখো তার ফলে নিজেকে কেমন ঝামেলায় ফেলেছ।

মেয়েটা লজ্জায় একটু লাল হলো; ওর কাছে মনে হলো এই বকাটা যেন সত্যিই তার পাওনা ছিল।

ফিল বলল, আমি এসবের অর্থ কিছুই বুঝতে পারছি না।

কেন? এটা তো লাল হরফে বড়বড় করে লেখা পড়ার মতই সহজ। যে সম্পর্কে তোমাকে আমি আগেই সাবধান করেছিলাম, বলল বার্ট। এমারি আর তোমার ফোরম্যান যুক্তি করে লেজি এম দখল করার মতলবে আছে। এই নরকের কীটগুলো জেমসেরই ভাড়া করা আউটল। এখন তুমি তার বন্দি। সে তোমাকে নিয়ে কি করবে তা আমি জানি না; তবে আমার ধারণা ও চাইবে তুমি ওর সাগরেদ লরিকে বিয়ে করো; তাহলে র‍্যাঞ্চটা, পুরোই ওদের দখলে চলে যাবে। আর এর পরে যদি তোমার কোন খারাপ কিছু ঘটে- অর্থপূর্ণ ইঙ্গিতের সাথে ওখানেই তার কথা শেষ হলো।

মেয়েটা আতঙ্কিত দৃষ্টিতে তাকাল। আমি ভাবতেই পারি না মানুষ এত নীচ হতে পারে।

তুমি ওদের চেনো না, ফিল, বার্ট তাকে বোঝাবার চেষ্টা করল। তুমি হয়ত শুনে অবাক হবে যে জেমসই তোমার বাবাকে খুন করেছে-এটার প্রমাণ পাওয়া গেছে এখন। ব্যাঙ্কের টাকা লুট করে রাস্টনকেও সে-ই গুলি করেছে।

এই চরম আঘাতে একেবারে ভেঙে পড়ল ফিল। যদিও বাবার দেখা পাওয়ার আশা সে প্রায় ছেড়েই দিয়েছিল, তবু একটা ক্ষীণ আশা তার মনে জাগ্রত ছিল। কিন্তু বাবা যে কারও স্বার্থসিদ্ধির জন্যে খুন হয়েছে এটা কিছুতেই সহ্য করতে পারছে না।

আমার সিদ্ধান্ত যদি ভুল হয়ে থাকে তাহলে এমারি কেন এখানে উপস্থিত? সে এখানে কি করছে?

জাজ এমারি এখানে? বিস্ময়ে চিৎকার করে উঠল ফিল। কেবল মাথা ঝাঁকিয়ে সম্মতি জানাল বার্ট। কিন্তু এর পিছনে কোন যুক্তি সে দেখাতে পারল না। সে কেবল কথাটা বলেই ক্ষান্ত হলো। ফিল ভাবল বাট নিশ্চয় সত্যি কথাই বলছে।

কিন্তু তুমি আমাকে এখান থেকে উদ্ধার করে নিয়ে যাবে, তাই না? উদ্বিগ্ন স্বরে প্রশ্ন করল ফিল। আমি ভয় পাচ্ছি-দারুণ ভয়ে আছি।

ধূর্ত লোকটার চোখ দুটো আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। এর জন্যে তোমাকে দোষ দেয়া যায় না। ভয় পাওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তোমাকে এখান থেকে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা সম্পূর্ণ তোমার ওপর নির্ভর করছে।

আমার ওপর? তার মানে? প্রশ্ন করল ফিল।

নিশ্চয়, হাসল বার্ট। এখন আসল কথাটা হচ্ছে ব্ল্যাক মাস্কের দল যত ভয়ঙ্করই হোক আমার সাথে লাগতে আসার সাহস পাবে না। তুমি যদি আমার, হও, তাহলে তোমাকেও ওরা ছুতে সাহস পাবে না। ওরা আমাকে বা আমার নিজস্ব কোন কিছুর ক্ষতি করার সাহস পাবে না। বুঝেছ?

তোমার কথার মানে আমি ঠিক বুঝলাম না, অনিশ্চিত স্বরে বলল ফিল।

অর্থাৎ আমি তোমাকে বিয়ে করার প্রস্তাব দিচ্ছি। জানি এই পরিস্থিতিতে এভাবে প্রস্তাব দেয়া কোন মেয়েই পছন্দ করবে না, কিন্তু এছাড়া তোমাকে এখান থেকে উদ্ধার করার বিকল্প কোন পথ নেই, বলল বার্ট। যদি জেমস তার সাগরেদ লরির সাথে বিয়ে করানোর জন্যে জাজকে এখানে এনে থাকে, তাহলে

সে এটা জেনে অবাক হবে যে তোমার আগেই বিয়ে হয়ে গেছে।\

ফিল ওর কথা শুনে ভগ্ন হৃদয়ে চোখ বুজে ভাবছে। লরি এবং তার ফোরম্যান যত দোষই করে থাকুক না কেন সে বাটকে মোটেও বিয়ে করতে চায় না। কেবিনের দেয়ালে হেলান দিয়ে ফিল নিজের মনটাকে গুছিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছে।

জাজ হয়ত এই বিয়েতে রাজি হবে না, বলল সে।

আমি ওর সাথে কথা বলার পর আমার মনে হয় সে রাজি হতে বাধ্য হবে, কঠিন স্বরে বলল বার্ট। ও যা ভাবছে তার চেয়ে অনেক বেশি জানি আমি।

চোখ বুজে কিছুক্ষণ ভেবে আর কোন উপায় খুঁজে না পেয়ে মরিয়া হয়ে সে রাজি হওয়ার জোগাড় করছে এই সময়ে কে যেন ফিসফিস করে ওকে বলল, মিথ্যে কথা, ভেঙে পোড়ো না, ভেবে দেখার জন্যে সময় চাও।

অবাক হয়ে ফিলের চমকে ওঠা খেয়াল করল না র‍্যাঞ্চার। সে বিজয়ের হাসি নিয়ে ফিলের জবাবের অপেক্ষায় বসে আছে। যদিও মেয়েটা ওই রহস্যময় উপদেশটা ওকে কে দিয়েছে তা জানে না, তবু ওটা ওর মনের জোর অনেক বাড়িয়ে দিল।

ভাবার জন্যে আমাকে কিছু সময় দিতে হবে তোমার, বলল সে।

নিরাশায় কালো হলো বার্টের মুখ। নষ্ট করার মত সময় আর আমাদের হাতে নেই, বলল সে। এখানে আসতে আমাকে বড় একটা ঝুঁকি নিতে হয়েছে, এখানে বেশিক্ষণ থাকা মোটেও নিরাপদ হবে না। আরও একটা কথা তোমার জেনে রাখা ভাল-তোমার ফোরম্যানের আসল নাম জেমস গ্রীন নয়, সে আউটল বিদ্যুৎ এরফান নামেই বেশি পরিচিত। আমার বিশ্বাস ওর কথা তুমি আগেও নিশ্চয় শুনেছ?

ফিলের চেহারা একেবারে ফেকাসে হয়ে গেল। আউটল বিদ্যুৎ এরফান! তার মনে পড়ল ওই লোকের অদ্ভুত সাহসিকতা আর পিস্তলে দারুণ দক্ষতার অনেক গল্পই সে শুনেছে। চমকার চাতুরীর সাথে লোকটা বারবার আইনের চোখে ধুলো দিয়ে ধরা পড়ার হাত থেকে রেহাই পেয়েছে। কিন্তু সে জানে না যে এরফান এখন আর আউটল নেই বরং আইনের পক্ষেই এখন কাজ করছে সে। এবং যেসব অপরাধ সে করেছে বলে শোনা যায় সেগুলোর একটাও সে করেনি–অন্য লোকের অপরাধ ওর ঘাড়ে দোষ হিসেবে চেপেছে। কিন্তু ফিলের ধারণা ওই রকম ভয়ঙ্কর লোকের পক্ষে অসাধ্য কোন কাজ নেই।

কি, এসব জানার পরেও তুমি ভাবতে চাও? প্রশ্ন করল সে।

দুর্বল হয়ো না, স্বরটা আবার ওকে সাবধান করল।

হ্যাঁ, আমাকে ভাবতেই হবে, ক্ষীণ স্বরে বলল ফিল।

বার্টের ধৈর্য ফুরিয়ে আসছে; স্পষ্টতই ক্রুদ্ধ স্বরে সে বলল, এতে এত ভাবার কি আছে? হয় আমার স্ত্রী হয়ে এখান থেকে তোমার বেরোতে হবে, নইলে এরফানের ভাড়া করা ডাকাতদের হাতে তোমাকে নির্যাতিত হতে হবে। কথাটা বলেই মেয়েটার দিকে চেয়ে সে বুঝল ভুল করে ফেলেছে। শুধরে নেয়ার চেষ্টায় সে তাড়াতাড়ি আবার বলল, ওদের একজনকে আমি ও-কথা বলতে শুনে ফেলেছি।

কিন্তু ক্ষতি যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। ওই একই হুমকি সে লম্বা আউটলটার মুখে শুনেছে। বার্টের ব্যাখ্যায় ওর সন্দেহ কাটল না। তাই মুখ কুঁচকে বিফল হয়ে বেরিয়ে আসার আগে বার্ট জানাল জাজের সাথে কথা বলতে যাচ্ছে সে।

ওর সাথে সব ব্যবস্থা ঠিক করে ফেলার পর তোমাকে একটা সিদ্ধান্ত নিতেই হবে, ফিল, হুমকি দিল বার্ট। আমাকে নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরানো চলবে না।

বার্ট বেরিয়ে গেল। মেয়েটা ঘরে তালা লাগানোর শব্দ শুনতে পেল। এখন ওর একটাই আশা থাকল-ওই অচেনা সুরের মালিক। নিজের পিছনের দেয়ালটা এবার ভাল করে পরীক্ষা করে দেখল ফিল। ঠিক ওর পিছনেই দুটো গুড়ি সমান হয়ে বসেনি-তাই ওখানে একটা ফাঁক রয়ে গেছে; ওই লোকটা নিশ্চয় ওখান দিয়েই ওদের কথা শুনেছে এবং ফিসফিস করে কথা বলে ওকে সাহস জুগিয়েছে। ওই ফাঁক দিয়ে অনেক চেষ্টা করেও কাউকে সে দেখতে পেল না। আবার সেই একাকীত্ব আর একটানা অবসর। এতক্ষণে সে ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করার অবকাশ পেল। সে ভাবছে বার্টের কাছে ওর তালার চাবি কিভাবে এলো? আর ওই লম্বা লোকটাই বা কিভাবে জানল ওর সাথে একজন কেউ একটা প্রস্তাব নিয়ে দেখা করতে আসবে? এবং ওর প্রস্তাব না মেনে নিলে-নাহ, আর ভাবতে পারছে না ফিল; মাথাটা ওর গুলিয়ে যাচ্ছে। তবে কি সেই অচেনা লোকটা সত্যিই ওকে ঠিক পরামর্শই দিয়েছে? কিন্তু বার্টের প্রস্তাব মেনে না নিলে এখান থেকে সে কিভাবে বেরোবে? ওই অচেনা লোকটা কি তাকে কোন সাহায্য করতে পারবে? কিন্তু একটা লোক এতজনের সাথে একা কিভাবে পেরে উঠবে? আর ভাবতে পারছে না সে। উঠে গিয়ে ওই ফোকর দিয়ে উদাস দৃষ্টিতে বাইরের দিকে চেয়ে রইল ফিল। কিন্তু পাইন গাছ আর ঝোঁপ ছাড়া কোন মানুষ, ওর। চোখে পড়ল না।

বার্টকে বেশিদূর যেতে হলো না, ফিলের কামরা থেকে বেরিয়ে মাত্র বিশ কদম হেঁটেই সে আরেকটা কেবিনের সামনে পৌঁছল। এটাও ফিলের কেবিনের ছাদেই গড়া। কেবিনের ভিতর সে ডেজার্ট এজের জাজ এমারিকে বেঞ্চে বসে নিশ্চিন্তে পাইপ ফুকতে দেখল। বন্দি লোকটা দরজা দিয়ে ঢোকা উজ্জ্বল আলোয় চোখ পিটপিট করে তাকাল। তারপর আগন্তুককে চিনতে পেরে ব্যঙ্গের সুরে সম্ভাষণ জানাল।

মর্নিং, বার্ট, ওরা কি তোমাকেও ধরে এনেছে, নাকি তুমিই ওদের বস?

উভয় ক্ষেত্রেই তোমার ধারণা ভুল, জবাব দিল বার্ট।

ভাল কথা, তাহলে আমার এখানে উপস্থিতির জন্যে তোমাকে ধন্যবাদ জানানোর কোন প্রয়োজন নেই, বলল এমারি।

না, তবে তোমার ফেরার ব্যবস্থা করার জন্যে হয়ত তোমাকে তা দিতে হতে পারে, ওকে জানাল বার্ট।

এবং তার মূল্য কত পড়বে, বার্ট? জানতে চাইল জাজ। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে লোকটাকে যাচাই করে দেখছে সে।

একটা ছোট্ট অনুষ্ঠান, যেটাতে তোমার কোন খরচই লাগবে না, জবাব এলো।

হুম! শুষ্ক স্বরে বলল বুড়ে। কিন্তু আমি ক্যাশ দেওয়াটাই বেশি পছন্দ করব। তা সেই কাজটা কি ধরনের হবে?

শুধু একটা বিয়ে পড়িয়ে তোমাকে কাগজে সই করতে হবে, ব্যস, এইটুকুই তোমার কাজ, হাসল বার্ট।

চট করে জাজের চোখ বিস্ময়ে বিস্ফারিত হলো। শুনে খুশি হলাম, বলল সে। আমার মনে হয় বিয়ের বন্ধনটাই একমাত্র ঝুঁকি যেটাতে জড়াতে তুমি। কখনও সাহস পাওনি। অনুষ্ঠানটা কি বার বিতে হবে?

না, এখানে, র‍্যাঞ্চার জবাব দিল।

ভাল কথা, হালকা সুরে বলল জাজ। একটা বিয়ে হবে এবং পাহাড়েই হবে মধুচন্দ্রমা-মন্দ কি? এটা তো রোমান্টিক একটা ব্যাপার। তবে পাত্রীর নাম এবং এই বিয়েতে তার মত আছে কিনা, সেটা আমাকে আগে জানতে হবে।

পাত্রীর নাম ফিল মাস্টারসন, এবং সে-ও ইচ্ছুক, সরাসরি জানাল বার্ট।

জাজ এমারি আবার বসে পড়ল। মিস মাস্টারসন এখানে? কঠিন স্বরে বলল সে। এর মানেটা কি?

এর মানে হচ্ছে আমি তোমার খেলার চাল বুঝে ফেলেছি। তুমি র‍্যাঞ্চটা দখল করবে আমি তা হতে দেব না, তুমি হেরে গেছ, জবাব দিল বার্ট। তুমি মাস্টারসনকে ভজিয়ে ওর উইলে নিজেকে অভিভাবক করে বসিয়েছ, তোমার নিজস্ব লোক এরফানকে ফোরম্যান হিসেবে কাজে লাগিয়েছ। এর পরপরই জ্যাক নিরুদ্দেশ হলো। তুমি যাকে নির্দিষ্ট করে দেবে তাকেই ফিলের বিয়ে, করতে হবে। পরে সে-ও হয়ত অদৃশ্য হবে আর লেজি এম পুরো তোমার দখলে। এসে যাবে। অত্যন্ত নিখুঁত চক্রান্ত। তোমার বুদ্ধির তারিফ করতে হয়।

হতবাক চোখে বার্টের দিকে চেয়ে আছে এমারি তোমার কল্পনা শক্তি যে। এত সুদূর প্রসারী হতে পারে তা আমি স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি, বার্ট।

র‍্যাঞ্চার জাজের কথাকে কোন পাত্তাই দিল না। তুমি কেবল একটাই ভুল করেছ, সেটা হচ্ছে আমাকে তুমি গোনার মধ্যে ধরোনি, বলে চলল বার্ট। ফিল মাস্টারসনকে আমার হাতে তুলে দেয়া হবে বলে অনেকদিন আগে থেকেই কথা হয়ে আছে। আমি তাকে স্ত্রী না করে কিছুতেই ছাড়ব না। তবে এর জন্যে তোমার মত নেয়া অপরিহার্য হয়ে দাড়িয়েছে দেখে ভাবলাম আমি তোমাকে দিয়েই বিয়ের চুক্তিটা লেখাব।

তাই তুমি তোমার ভাড়াটে গুণ্ডা পাঠিয়ে আমাকে এখানে আনিয়েছ, তাই? বলল জাজ।

ওদের মালিক আমি নই, ওরা কেবল টাকার বদলে কাজটা করেছে, ব্যাখ্যা করল বার্ট। তবে আমার বিশ্বাস আমি যা বলব তা-ই ওরা করবে।

তাতে আমারও কোন সন্দেহ নেই, জাজের জবাবে বার্টের কপালের ভাঁজ আরও গভীর হলো।

শোনো, জাজ, এক মাইল পথ পাড়ি দেয়ার জন্যে ছয় মাইল ঘুরে কোন লাভ নেই, বলল সে। আমি তোমার ওপর অবিচার করতে চাই না। ফিলের সাথে আমার বিয়ে দিয়ে তুমি এরফানকে যদি বাদ দাও, তাহলে আমি লেজি এমকে তিন ভাগে ভাগ করে তোমাকে এক ভাগ দিতে রাজি আছি। তুমি কি বলো?

তুমি নেহাতই একটা পাজি লোক, জবাব দিল এমারি।

তবে কি আমার প্রস্তাব তুমি প্রত্যাখ্যান করছ?

আমার জবাব কি তোমার কাছে মেনে নেয়ার মত শোনাল? পাল্টা প্রশ্ন করল এমারি।

উঠে দাঁড়াল র‍্যাঞ্চার; চেহারা রাগ আর বিদ্বেষে বিষাক্ত দেখাচ্ছে। ডান হাতের মুঠোয় পিস্তলের বাঁট আঁকড়ে ধরেছে।

তুমি একটা বোকা গাধা, চিৎকার করল সে। তোমাকে এই মুহূর্তে গুলি করে মেরে ফেললে আমাকে ঠেকাবে কে?

এতে কয়েক প্রকারের বাধা আছে, হাসল জাজ। প্রথমত এতে আমার সম্মতি পাওয়া তোমার হবে না।

বাজে,যুক্তি! তোমার পরে যে ভার নেবে-

সে হচ্ছে গভর্নর ব্লেক, আমার একজন পুরোনো বন্ধু। সে অবশ্যই তাকে আমি যেমন বলে রেখেছি সেই অনুযায়ীই কাজ করবে, শান্ত স্বরে বলল এমারি। সে অনেক প্রশ্ন জিজ্ঞেস করবে তোমাকে; যেগুলোর উত্তর দেয়া তোমার পক্ষে অত্যন্ত কঠিন হবে। আমাকে হত্যা করলে তুমি এই ডাকাতদের হাতের পুতুলে পরিণত হবে; তৃতীয়ত, এরফান তোমাকে তুমি যেমন কুকুর ঠিক সেইভাবেই গুলি করে মারবে।

এবার বার বির লোকটা হাসল।

আমাকে মারতে হলে ওকে অনেক বাধা বিঘ্ন পেরিয়ে আসতে হবে। হোপের শেরিফ যদি তার সাহস হারিয়ে না থাকে তাহলে মিস্টার গ্রীন এখন হাজত বাস করছে।

কিসের অপরাধে? গর্জে উঠল জাজ।

ব্যাঙ্ক ডাকাতি আর রাস্টনকে গুলি করার অপরাধই যথেষ্ট; জ্যাককে হত্যা করার কথা না হয় বাদই দিলাম। তোমার পেশার সাহায্য ওর দরকার পড়বে-অবশ্য ওরা যদি আগেই ওর বিচার শেষ না করে থাকে।

অসম্ভব কথা, মন্তব্য করল জাজ।

কিন্তু ওর বিরুদ্ধে প্রমাণ তা বলে না। অত্যন্ত চতুর লইয়ার ছাড়া এ যাত্রা কেউ ওকে বাচাতে পারবে না! টেলরের হাতে সব প্রমাণই আছে।

জাজ র‍্যাঞ্চারের দিকে চেয়ে ওকে যাচাই করে বুঝল অন্তত এখন লোকটা মিথ্যা বলছে না। জাজের মাথায় কি চিন্তা চলছে আঁচ করে বার্ট আবার চেষ্টা করল।

আমার প্রস্তাবটা তোমার আবার ভেবে দেখা ভাল, এটাই তোমার একমাত্র উপায়, পরামর্শ দিল বার্ট।

ওর দিকে কতক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে থেকে জাজ এমারি বলল, ব্ল্যাক বার্ট, একদিন যখন সুযোগ আসবে, আমি তোমাকে ফাঁসি দেয়ার আদেশ দেব।

শক্ত লোক হলেও এমারির শান্ত স্বরে দেয়া হুমকিতে বিচলিত হলো বার্ট। কিন্তু বেপরোয়া মনোবৃত্তি এতে তার রাগ আরও চড়িয়ে দিল।

সব ভাল তাই এখন আমার হাতে, ব্যাটা বুড়ো খচ্চর, রূঢ় স্বরে বলল সে। তুমি এখানেই পচে মরবে। হঠাৎ একটা চিন্তা খেলল তার মাথায়। তুমি টের পাচ্ছ তো, আমার সাথে বিয়ে দেয়া না হলে মেয়েটার কপালে কি ঘটবে?

হ্যাঁ, ধমকের সুরে বলল এমারি। মেয়েটা সারা জীবন কষ্ট আর অবমাননার হাত থেকে বেঁচে যাবে।

বার্ট হাসল। ভূল-ঠিক ওটা তার কপালে জুটবে না, কারণ ওকে আমি ব্ল্যাক মাস্কদের হাতে তুলে দেব। বেঁচে থেকে মৃত্যুর যন্ত্রণা ভোগ করবে ও। আজীবন!

জাজ বার্টের দিকে তীব্র ঘৃণার চোখে তাকাল।

আমাকে আমার সিদ্ধান্তে অটল রাখার জন্যে যে কথাটা বলার দরকার ছিল ঠিক সেটাই তুমি বলেছ, ধীর স্বরে বলল জাজ। ঠিক এই কারণেই সার্জেন যেমন মানুষের দেহ থেকে বিষাক্ত অঙ্গ কেটে বাদ দেয়, তোমাদের মত বদ লোকে সমাজ থেকে নির্মূল করার জন্যে ওই একই কারণে বিদ্যুৎ এরফানের মত লোকের প্রয়োজন আছে।

ঠাণ্ডা স্বরে বলা হলেও কথাগুলো বার্টকে তপ্ত ব্র্যান্ডিং আয়রনের মতই ঘঁাকা দিয়ে পুড়িয়ে দিল। এই বুড়ো তাহলে সব জেনেশুনেই বিদ্যুৎ এরফানকে এখানে জেমস গ্রীন সাজিয়ে পাঠিয়েছিল। এই বুড়োই পরোক্ষ ভাবে তার ব্ল্যাক মাস্ক দলটাকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। রাগে দিশেহারা হয়ে জাজের মুখে প্রচণ্ড ঘুসি মারল সে।

জোরালো আঘাতে দেয়ালের ওপর ছিটকে পড়ল এমারি; গাল কেটে রক্ত গড়াচ্ছে। দেয়ালে ঠেস দিয়েই মেঝের ওপর পড়ে গেল।

এটা কেবল একটা নমুনা, দাঁতেদাত পিষে বলল বার্ট। এর পর তোমার কপালে যে শাস্তি আছে তাতে নরকও তোমার কাছে বেশি সুখের বলে মনে হবে।

কামরা ছেড়ে বেরিয়ে দরজা তালা দিয়ে চলে গেল র‍্যাঞ্চার।

জাজ কোন আশার আলোই দেখতে পাচ্ছে না। বড় একটা খেলায় নেমেছে বার্ট। জ্যাক মৃত, এরফান জেল-হাজতে, ফিলও ব্ল্যাক মাস্কের হাতে বন্দি, সে নিজেও তাই। মিথ্যে বড়াই করেনি বার বি র‍্যাঞ্চার, সব ভাল তাসই তার হাতে। এখন জাজ নিরুপায়।

১৮.

লেজি এমে এখন আর সেই আগেকার হালকা মূড় নেই। ব্যর্থতার গ্লানিতে ভুগছে ওরা। ডাকাত দলটাকে ধ্বংস করে এলেও ওদের প্রধান লক্ষ্য অর্জিত হয়নি। ওদের মধ্যে সব থেকে অসুখী হচ্ছে লরি, কারণ সে ওই অভিযানে যোগ দিতে পারেনি। লরি এখন বিছানা ছেড়েছে বটে, কিন্তু বাম হাতটা এখনও স্লিঙে ঝুলছে। কাউবয়রা ফেরার পর গত চব্বিশ ঘণ্টায় সে এরফানকে অতিষ্ট করে তুলেছে।

আমি তো তোমাকে বলেছি আমাদের পক্ষে যতটা সম্ভব ছিল তা আমরা করেছি, এই নিয়ে পঞ্চমবার ওকে বলল এরফান। না, আমি ওখানে যাচ্ছি না; আমাকে হোপে যেতে হবে। ওখানে আমার কিছু কাজ আছে। না, আমি কোন প্রেমে পাগল লেংড়া প্রেমিককেও সাথে নিতে চাই না।

সরাসরি কথাটা বলে ওর কবল থেকে রেহাই পেয়ে যোপের পথ ধরল এরফান। দুপুরের পরে শহরে পৌঁছল সে। রাস্তায় কোন লোকজন নেই। মাথার ওপর সূর্য যেন আগুন ছড়াচ্ছে। ফেনটনের বারে একটা বিয়ার খেয়ে পিপাসা মেটাবার কথা ভাবছে, এই সময় সে লক্ষ করল রাস্টন তার ব্যাঙ্ক আবার খুলেছে। ব্যাঙ্কে ঢুকে সে দেখল ব্যাঙ্কারকে দুর্বল আর অসুস্থ দেখাচ্ছে।

একটা ম্লান হাসি দিয়ে ওকে স্বাগত জানাল ব্যাঙ্কার।

তোমাকে ফিরে আসতে দেখে খুশি হলাম, মিস্টার রাস্টন, বলল এরফান। আগের ব্যবসাই আবার গুছিয়ে নিচ্ছ?

আমি আবারও চেষ্টা করে দেখছি, বলল সে। এখানকার লোকজন। আমাকে অনেক সাহায্য করছে-ওরা কেউ আমাকে দোষ দিচ্ছে না। মিস্টার বার্টের কথাই ধরো, ডাকাতির আগের দিনই সে পাঁচ হাজার ডলার ব্যাঙ্কে জমা দিয়েছিল, কিন্তু সে কথা দিয়েছে টাকাটা সে দাবি করবে না। সে টাকাটা আবার ফেরত পাওয়া যাবে ভেবেই ঝুঁকি নেবে। শহরের আর সবাই ওর কথাতেই বিশ্বাস করে। ওরাও কেউ এই মুহূর্তেই টাকা দাবি করছে না।

আরে, এটা তো খুব ভাল কথা, বলে মনেমনে ভাবল এরফান: চালটা অত্যন্ত চতুরও বটে। এটা সেটা কিছু কথার পরে সে পকেট থেকে চারটে একশো ডলারের নোর্ট বের করে বলল, এগুলো তুমি ভাঙিয়ে দিতে পারবে? আমার কিছু ছোটছোট দেনা শোধ করা দরকার।

নিশ্চয়, জেমস, কিন্তু তোমার তেমন তাড়া না থাকলে আমার ক্লার্ককে একটা ছোট কাজে আমি একটু বাইরে পাঠাতে চাই।

না, আমার এখন কোন তাড়া নেই, বলল এরফান।

রাস্টন একটা খাতা বের করে কি যেন দেখে নিচু স্বরে কিছু নির্দেশ দিল। ক্লার্ক চটপট তার কাজে বেরিয়ে গেল।

এরফান সময় কাটাবার জন্যে একটা সিগারেট তৈরি করছে। ব্যাঙ্কার ধীর গতিতে ছোট নোট গোনা শুরু করল।

এরফান লক্ষ করল টাকা গোনার ফাঁকে ব্যাঙ্কার নার্ভাস ভাবে বারবার দরজার দিকে তাকাচ্ছে।

তুমি কি মনে করো ডাকাতির টাকা ফিরে পাওয়ার কোন চান্স তোমার আছে? প্রশ্ন করল এরফান।

মনে হচ্ছে যেন এখন একটা উজ্জ্বল সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে, কাঁপা স্বরে জবাব দিল রাস্টন।

বাইরে অনেকগুলো পায়ের শব্দ শোনা গেল। এরফান ঘুরে দেখল দরজা দিয়ে শেরিফ আর তার দুই ডেপুটি ব্যাঙ্কে ঢুকছে। ওদের পিছনে বেশ কিছু শহরবাসীকেও দেখা যাচ্ছে। বিপদের গন্ধ টের পাচেই এরফান। অফিসার সবার হাতই পিস্তলের বাঁটের কাছাকাছি রয়েছে। কাউন্টারে হেলান দিয়ে এরফান একটু কাত হয়ে হাসিমুখে ওদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। ওর বুড়ো আঙুল দুটো গানবেল্টের ফাঁকে গোঁজা।

সামনে এগিয়ে এসো, শেরিফ, আমার কাজ প্রায় শেষ, বলল এরফান।

বিদ্বেষের চোখে ওর দিকে তাকাল টেলর। তোমার আসল কাজ এখনও শুরুই হয়নি, কঠিন স্বরে বলল সে। তুমি যেসব নোট এখানে ভাঙাতে এসেছ, সেগুলো তুমি কোথায় পেলে?

আমি জানি না তুমি কেন এর মধ্যে নাক গলাতে এসেছ, তবে কেবল তোমার কৌতূহল মেটাবার জন্যেই বলছি, যেদিন এই ব্যাঙ্কে ডাকাতি হয় সেদিন সকালে এই ব্যাঙ্ক থেকেই আমি এই টাকা তুলেছি, ঠিক বলিনি, রাস্টন?

মাথা নাড়ল ব্যাঙ্কার। যে চারটা নোট তুমি ভাঙাতে এসেছ সেগুলো হচ্ছে চুরি করা নোটেরই একটা অংশ, বলল সে।

অবাক বিস্ময়ে রাস্টনের দিকে ঠাণ্ডা চোখে তাকাল এরফান। তারপর শান্ত স্বরেই বলল, তোমার নিশ্চয় কোন ভুল হচ্ছে, স্যার।

ওর স্বরের অর্ন্তনিহিত হুমকি টের পেয়ে ব্যাঙ্কারের মুখ পুরো সাদা হয়ে। গেল, ভয়ে ঠোঁট কাঁপছে, কিন্তু তার জবাবে কোনরকম ইতস্ততার লক্ষণ প্রকাশ পেল না।

এতে কোন ভুল হওয়ার অবকাশ নেই। এখানে সবগুলো বড় চুরি যাওয়া নোটের একটা লিস্ট রয়েছে আমার কাছে; এর একটা কপি আমি, শেরিফকেও দিয়েছি। বিশ্বাস না হলে তুমি নিজেই চেক করে দেখতে পারো, বলে সে খাতাটা আর নোট এরফানের দিকে বাড়িয়ে দিল।

নাম্বারগুলো মিলিয়ে দেখল এরফান, সত্যিই ওর দেয়া নোটের নাম্বারগুলো চুরি যাওয়া নোটের ভিতর রয়েছে।

খাতার আগের পৃষ্ঠায় জেমস গ্রীন, র‍্যাঞ্চার টিম, এবং সেলুন মালিক ফেনটনের নামের তলায় লেখা কতগুলো নাম্বার দেখিয়ে ব্যাঙ্কার আবার বলল, ডাকাতির আগে সেদিন সকালে যেসব টাকার লেনদেন এই ব্যাঙ্কে হয়েছে। সেগুলোর নাম্বার এখানে লেখা আছে।

এই রহস্যের কোন সমাধান করতে না পেরে কঠিন দৃষ্টিতে ব্যাঙ্কারকে আর একবার যাচাই করে দেখল এরফান, কিন্তু ওর দৃষ্টির সামনে লোকটা মোটেও মিথ্যাবাদীর মত মিইয়ে গেল না। টিম আর ফেনটন দুজনেই ওকে বলেছিল, রাস্টন অত্যন্ত সৎ বলে ওর খ্যাতি আছে। লোকটা মিথ্যা কথা বলছে বলে ওর মনে হলো না। বুঝতে পারছে যেভাবেই হোক ওকে কেউ কোণঠাসা করার। ব্যবস্থা করে জালে আটকেছে। ওগুলো রাস্টনকে ফিরিয়ে দিয়ে সে নিজের নাম্বারগুলোর একটা লিস্ট করে দিতে বলল। একটা কাগজে দ্রুতহাতে ওর একটা কপি করে এরফানের দিকে বাড়িয়ে দিল সে।

কাগজটা পকেটে ভরে টেলরের দিকে চেয়ে সে হেসে বলল, আমি জানি না কিভাবে তুমি এটা সম্ভব করলে, কিন্তু এটা সত্যিই একটা নিখুঁত ফ্রেম-আপ, বলল সে। আমি ধারণা করছি এখন তুমি আমাকে ওই ব্যাঙ্ক ডাকাতির সাথে জড়িত থাকার অপরাধে গ্রেপ্তার করতে চাইবে?

অবশ্যই-অন্যান্য চার্জের সাথে, যেমন রাস্টনকে গুলি করে হত্যার চেষ্টা।

হায়, ঈশ্বর, আমি কি তোমাকে গুলিও করেছিলাম, রাস্টন? আমি সত্যিই দুঃখিত।

এবং জ্যাক মাস্টারসকেও তুমিই খুন করেছ, যেন হাটে বোমা ফাটাচ্ছে, এভাবে ঘোষণা করল টেলর।

কিন্তু অভিযুক্ত লোকটার মধ্যে এর কোন প্রতিক্রিয়া দেখা গেল না। এরফান বলল, তুমি প্রেসিডেন্ট লিঙ্কনের নামটা ডাকাতির সাথে যোগ করতে ভুলে গেছ।

ওর মন্তব্যে দরজার মুখে দাড়ানো শহরবাসীর মধ্যে হাসির রোল উঠল।

বিষাক্ত রাগে টেলরের হাত পিস্তল বের করার জন্যে বাঁট ছুঁয়ে ফেলেছিল, কিন্তু হঠাৎ মনে পড়ল সামনের লোকটা সহজেই বার্টকেও হারিয়ে দিয়েছিল। তাই সে সঙ্গে সঙ্গে বাঁট ছেড়ে দিল। কিন্তু ওর এই ঘটনাটা অনেকেই লক্ষ করেছে। তোমার জন্যে এক প্যাকেট তাস আনব, টেলর? বলে উঠল শহরের একজন।

রোষের দৃষ্টিতে বক্তার দিকে চেয়ে শেরিফ বলল, এক প্যাক গাধার কোন প্রয়োজন আমার নেই। তারপর ডেপুটি দুজনের দিকে ফিরে সে আদেশ দিল, ওর পিস্তল দুটো তোমরা ছিনিয়ে নাও। কিন্তু ওদের কারও মধ্যে এগিয়ে যাওয়ার কোন আগ্রহ দেখা গেল না দেখে এরফান হাসল।

শান্ত হওয়াই ভাল, শেরিফ, সাবধান করল সে। শান্তিপ্রিয় মানুষ আমি, কিন্তু আমার সহ্যের সীমা পার হলে তোমার কপালে খারাবি আছে। আইনকে আমি শ্রদ্ধা করে চলি-কিন্তু তোমার মত নীচ কীট, যারা আইনের নামে কুকাজ, করে তাদের ঘৃণা আমি করি।

হাহ, আমি আদেশ দিলেই সবাই মিলে গুলিতে তোমাকে ঝাঁঝরা করে ফেলবে, হুমকি দিল শেরিফ।

এরফানের মুখের চেহারা একটুও ম্লান হলো না, কিন্তু কখন যে সবার চোখকে ফাঁকি দিয়ে কোমরের দুপাশে ওর দুটো কোল্ট .৪৫ উঠে এসে শেরিফকে কাভার করেছে তা কেউ টের পায়নি।

তোমার আদেশটা শহরের দাফনকারীকে দাও, টেলর, কারণ তুমিই সবার আগে যাবে, ঠাট্টার স্বরে বলল এরফান।

শেরিফের মুখ থেকে সব রক্ত সরে গেল। গোলাগুলির সম্ভাবনায় দরজা থেকে উৎসাহী দর্শকের দল ঝটপট উধাও হলো। ওদের অবস্থা দেখে এরফান হেসে বলল, তোমাদের কারও আতঙ্কিত হওয়ার কোন কারণ নেই-কেবল শেরিফ আর তার ডেপুটি দুজনকে হাত তুলে দাঁড়িয়ে আমার বক্তব্য শুনতে হবে।

ওরা নির্দ্বিধায় হাত তুলে দাঁড়াল বটে, কিন্তু শেরিফ তার মুখ বন্ধ না রেখে বলল, তুমি গ্রেপ্তারে বাধা দিয়ে কেবল নিজের বিরুদ্ধে আরও একটা অভিযোগ বাড়ালে।

ভাল, কিন্তু তবু আমাকে একবারের বেশি ফাঁসি দিতে পারবে না তোমরা, মৃদু হাসল এরফান। আমি কোন বাধা মোটেও দিচ্ছি না, কিন্তু তোমার আতিথ্য গ্রহণ করার আগে আমাকে ছোট্ট একটা কাজের ব্যবস্থা করে যেতে হবে। তুমি বুঝতেই পারছ, আমার অবর্তমানে লেজি এম–দেখাশোনা করার জন্যে কেউ থাকছে না। র‍্যাঞ্চে এই খবর পৌঁছলে ওদের সাথে যে শহরের একটা লড়াই বেধে যাবে এতে কোন সন্দেহ নেই। তাই ডেজার্ট এজে জাজ এমারির কাছে আমার একটা খবর পাঠানো দরকার, যেন সে এসে র‍্যাঞ্চের হাল ধরে। সে জানবে কি করতে হবে। আইনত সে-ই এখন ওই র‍্যাঞ্চের অভিভাবক।

এই সময়ে দরজার কাছে একটা নড়াচড়ার আভাস পাওয়া গেল। এরফান দেখল ভিড় ঠেলে ইয়র্কি ভিতরে ঢুকল। এরফানের চেহারায় ওকে চেনার কোন চিহ্ন দেখা গেল না।

আমি তোমার জন্যে এই খবরটা ওখানে পৌঁছে দেব, মিস্টার গ্রীন। একটা কাজে আমি ওখানেই যাচ্ছি।

আমি তোমার কাছে কৃতজ্ঞ, স্ট্রেঞ্জার, গম্ভীর স্বরে বলল এরফান।

শোনো, আমার এই ব্যাপারে কিছু বক্তব্য আছে, বলল টেলর।

চোখ সরু করে শেরিফের দিকে তাকাল ইয়র্কি। তুমি কি আমার গতিবিধিতে হস্তক্ষেপ করতে চাও? অ্যাসিড মেশানো স্বরে প্রশ্ন করল সে।

ওর চ্যালেঞ্জের জবাবে বলার কিছুই খুঁজে পেল না শেরিফ। উপেক্ষার ভঙ্গিতে কাঁধ উঁচিয়ে মাথা নাড়ল সে। দরজার দিকে এগোল যুবক। কিন্তু মাটিতে বুটের ঘষার সামান্য শব্দেই সে ঝট করে ঘুরে দাড়াল। ওর কোমরের পাশে দুটো পিস্তলই শেরিফকে কাভার করে রয়েছে। দ্রুততায় সে প্রায় এরফানের সমকক্ষ। কোন হুমকি নেই, কেউ একজন পা সরিয়েছে মাত্র দেখে সে বলল, সরি, জেন্টস, আমার নার্ভ একটু উত্তেজিত অবস্থায় আছে।

লোকটা যখন দরজা দিয়ে বেরিয়ে অদৃশ্য হলো, শেরিফ তখন মনে মনে বিরাট হাঁফ ছাড়ল।

ভিড়ের অনেকে লোকটাকে অদৃশ্য হতে দেখে সশব্দে সস্তির শাস ছাড়ল।

একজন ডেপুটি মন্তব্য, করল, ছোকরার নার্ভ স্থির করার জন্যে জরুরী চিকিৎসা দরকার।

বিপদ কেটে যাওয়ার পর কিছুটা সাহস ফিরে পেয়ে টেলর বলল, আবার এই ধরনের আচরণ করলে ওই ছোঁকরা দেখবে এই শহরটা ওর জন্যে বেশি গরম। এরফানের দিকে তাকাল সে। এবার তো তোমার কাজ হয়েছে-এখন তুমি আর কি চাও?

এরফান তার পিস্তল দুটো খাপে ভরে গানবেল্ট খুলে শেরিফের দিকে বাড়িয়ে দিল। এখন আর তোমার আতিথ্য গ্রহণ করতে আমার কোন আপত্তি নেই, কিন্তু তুমি ভুল মানুষকে গ্রেপ্তার করছ; যদিও তোমার মত অপদার্থের জন্যে এটা কিছুই নয়। দুশ্চিন্তার কোন কারণ নেই তোমার

শেরিফ এই অপমানটা নীরবেই হজম করল। কিন্তু বিপজ্জনক এই লোকটার এমন সহজ আত্মসমর্পণ তাকে কিছুটা অস্বস্তিতে ফেলে দিল।

১৯.

হোপ এগেইন এতটা উন্নত নয় যে অন্যান্য শহরের মত পাকা একটা জেল আছে বলে বসতকারীরা গর্ব করতে পারে। হোপের জেল মানে শেরিফের অফিসের পিছনে এক কামরার মাটির তৈরি একটা ঘর, কিন্তু ওটার চব্বিশ ইঞ্চি চওড়া দেয়ালের ভিতরে রয়েছে পরপর সাজানো মোটামোটা গাছের গুঁড়ি। উঁচুতে এক বর্গফুটের একটা ফোকর। কাচবিহীন ফোকরেও বাড়তি নিরাপত্তা দেয়ার জন্য একটা শক্ত লোহার বার বসানো হয়েছে; যেটার কোন প্রয়োজন ছিল না, কারণ ওই ফাঁক দিয়ে একটা ছোট বাচ্চা ছাড়া আর কারও বেরোনো অসম্ভব। মোটা মোটা লোহার গরাদের দরজাটা ভারী তালা দিয়ে আটকানো। কামরায় একটা জাজিমের শয্যা আর একটা বেঞ্চ ছাড়া আর কিছু নেই।

চামড়ার ফিতে দিয়ে বাঁধা হাতে কোনমতে একটা সিগারেট তৈরি করে ওটা ধরিয়ে এরফান ভাবতে বসল। চুরি করা নোট ওর কাছে কিভাবে এলো এর সমাধান বের করতে পারল না বহু ভেবেও। আর একবার গভীর ভাবে চিন্তা করতে গিয়ে হঠাৎ এর একটা সম্ভাব্য সমাধান ওর মাথায় খেলল। টাকাটা লুকিয়ে বা তালা দিয়ে রাখার কোন প্রয়োজন বোধ করেনি ফিল। সুতরাং অল্প খুঁজেই ডেস্কের দ্বিতীয় খোলা ড্রয়ারে টাকা খুঁজে পেয়েছিল এরফান। যে ডাকাত দল ওই টাকা পাওয়ার জন্যে এত কিছু করল, তারা হাতের কাছে পেয়েও ওটা নেয়নি কেন? এর একটাই ব্যাখ্যা হয়-ওকে বিপদে ফেলার উদ্দেশ্যেই ওরা ওই টাকা নিয়ে তার বদলে ডাকাতি করা টাকা রেখে গেছে।

কিন্তু এমন একটা জঘন্য কাজ কে করতে পারে? হয়ত শোধ তুলতে কাজটা শেড়ি করে থাকতে পারে। কিন্তু দুহাজার ডলার এত সহজে ছেড়ে দিয়ে শোধ নেয়ার পাত্র সে নয়।

টাকাটা ওর হাতে কিভাবে এলো তার একটা সমাধান হলেও এটা প্রমাণ করার কোন রাস্তা সে দেখতে পাচ্ছে না। যেহেতু হোপ শহরের প্রায় সবাই ওই ডাকাতিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কাজেই ওর নিষ্কৃতি পাওয়ার সম্ভাবনা একেবারেই নেই। খুনের অভিযোগ নিয়ে সে মোটেও মাথা ঘামাচ্ছে না। ভাবছে টেলর ওকে কেরল ভয় দেখাবার উদ্দেশ্যেই ওই হুমকি দিয়েছে। যাহোক, অলস হয়ে বসে থাকলে ওর চলবে না। যে-করেই হোক এখান থেকে ওকে বেরোতেই হবে। নিশ্চিত কোন প্রমাণ তাকে এমারির হাতে তুলে দিতেই হবে।

হাত দুটোকে মুক্ত না করতে পারলে সে কিছুই করতে পারবে না। জোর খাটিয়ে বিশেষ লাভ হলো না, চামড়ার ফিতের বাঁধন একটু ঢিলে হলো মাত্র। এবার সে দাঁত দিয়ে গিট খোলার চেষ্টা করল, কিন্তু এতেও বিশেষ লাভ হলো না; তবে লালায় ভিজে যেন চামড়া সামান্য একটু বাড়ল। এতে একটা বুদ্ধি এলো ওর মাথায়; দরজার সামনে গিয়ে সে চেঁচাতে শুরু করল। প্রায় সাথে সাথে গার্ড একজন হাজির হলো।

তোমার আবার কি দরকার? খেকিয়ে উঠল সে।

পানি, চট করে জবাব দিল বন্দি এরফান। এই ঘরটা একেবারে আভেনের মত গরম।

একটু হেসে এক বালতি পানি আর একটা মগ এনে হাজির করল গার্ড।

এই নাও, ষাড়ের মত আর চেঁচিয়ো না, ঠাট্টা করে বলে গেট খুলে ওগুলো দরজার পাশেই নামিয়ে রেখে গেটে আবার তালা দিয়ে চলে গেল লোকটা…

মগ দিয়ে তুলে অল্প একটু পানি খেয়ে বালতিটা আড়ালে সরিয়ে নিয়ে বাঁধন সহ কজিদুটো বালতিতে ডুবিয়ে রাখল সে। আধঘণ্টা পরে চামড়া ভিজে নরম হওয়ার পরে এরফান দেখল সে যখন খুশি বাধন থেকে হাত বের করে নিতে পারছে। তবু সন্ধ্যা পর্যন্ত অপেক্ষা করল ও। ও আশা করছে সন্ধ্যা হলেই যথারীতি কাম এগেইন সেলুনে ঢুকবে টেলর তার ড্রিঙ্কের জন্যে। তখন অফিসে কেবল দুই ডেপুটি ছাড়া আর কেউ থাকবে না।

সন্ধ্যার পর আবার সে চেঁচামেচি শুরু করল। সেই আগের ডেপুটিই এলো।

এখন আবার কি হয়েছে? পেট কামড়াচ্ছে? প্রশ্ন করল সে।

ঠিকই ধরেছ! বলল এরফান। তোমাদের এই বিলাসবহুল হোটেলে কি খাওয়ার কোন ব্যবস্থা নেই?

আরে! তোমার কথা তো আমি একেবারে ভুলেই গেছিলাম, বলল সে। দেখি কি করতে পারি তোমার জন্যে।

মনে মনে এরফান বলল: আমিও একই কথা ভাবছি। গেরো থেকে হাত দুটো পিছলে বের করে নিয়ে মৃদু হাসল ও।

অল্পক্ষণের মধ্যেই এক চাকাঁ মাংস আর কিছু রুটি নিয়ে ফিরে এলো ডেপুটি। দরজার তালা খুলে ভিতরে ঢুকে মেঝের ওপর রেখে দাড়াল।

দুঃখিত, তোমার জন্যে কফির- শুরু করেছিল সে।

কিন্তু ওর কথা শেষ হওয়ার আগেই লাফিয়ে এগিয়ে এরফান লোকটার কানের নিচে খোলা হাতে প্রচণ্ড একটা রদ্দা মারল। জ্ঞান হারিয়ে ঝপ করে মাটির মেঝের ওপর পড়ল-একটা, টু শব্দ করারও সুযোগ পেল না বেচারা। মেঝেটা মাটির হওয়ায় ওর পড়ার শব্দও অফিস ঘরে পৌঁছল না। ওকে বেঁধে মুখে রুমাল গুঁজে দিতে মাত্র কয়েক সেকেন্ড সময় লাগল।

ঈশ্বরকে ধন্যবাদ ডেপুটির খাপে পিস্তল আছে, বলে ওটা পরীক্ষা করে দেখল এরফান। গুলি ভরাই আছে। ওটা বেল্টে খুঁজে তালা বন্ধ করে করিডোর ধরে অফিসের আধখোলা দরজা পেরিয়ে বেরিয়ে আসার সময়ে অফিস থেকে কেউ হাঁক ছাড়ল।

জেক? এখন আবার কোথায় চললে?

এখনই ফিরে আসছি, জেকের রুক্ষ স্বর নকল করে জবাব দিল এরফান।

টেলর নির্দেশ দিয়েছে দুজনকেই এখানে থাকতে।

জাহান্নামে যাক টেলর, সে নিজে কোথায়? জবাব দিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে এলো এরফান।

এর জবাবে অন্য ডেপুটি কি বলল শুনতে পেল না এরফান। হ্যাটটা চোখের ওপর টেনে নামিয়ে পরের বাড়িটার ফাঁকে ঢুকে পিছনের গলিতে চলে এলো ও। ফেনটনের সেলুনের পিছনে দেখল মালিকের ঘোড়াটা ওখানেই রাখা আছে। ফেনটনের সাথে ওর বন্ধুত্ব কি ওর অনুমতি ছাড়া ওর ঘোড়াটা নেয়ার পরেও ধোপে টিকবে? পশ্চিমে কারও ঘোড়া চুরি করার মত বড় অপরাধ খুব কমই আছে। তবু ঝুঁকিটা নেয়ারই সিদ্ধান্ত নিল ও। পিস্তলটা গেঞ্জির তলায় ঢাকা।

ঘোড়ার পিঠে উঠে বার বি র‍্যাঞ্চের সবচেয়ে কাছের আড়াল লক্ষ করে ঘোড়া ছোটাল এরফান। মাত্র কয়েকটা ঝোঁপের আড়ালে পৌঁছেছে, এই সময়ে পিছন থেকে কিছু লোকের উত্তেজিত চিৎকার শুনে আঁচ করল সম্ভবত তার জেল থেকে বেরিয়ে আসাটা প্রকাশ পেয়ে গেছে।

ও ভাল করেই জানে, প্রচলিত ট্রেইলগুলোর ওপর অবশ্যই কড়া নজর রাখা হবে, তাই প্রধান ট্রেইল এড়িয়ে ঝোঁপঝাড়ের মধ্যে দিয়ে পথ করে নিয়ে এগোচ্ছে ও। ট্র্যাক লুকাবার কোন চেষ্টাই করছে না, কারণ জানে, অন্ধকারে। কেউ ওকে ট্র্যাক করার চেষ্টা করবে না। একটা সাধারণ ধারণার ওপর নির্ভর করেই এগোচ্ছে। হঠাৎ লক্ষ করল হার্ভি বোলটনের–পোড়া কেবিনের পাশ দিয়ে চলেছে ও। বড় কটনউড গাছে খোদাই করা ফোর বি আর কাটা দাগের সারি চাঁদের আলোয় ভূতুড়ে দেখাচ্ছে। ওদিকে আড়চোখে একবার চেয়ে আবার এগোতে যাচ্ছে, এই সময় এক আরোহী খুব কাছেই গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে ওকে দেখে একটা গালি বকে লাগাম টেনে ঘোড়া থামাল। লোকটা বার বির ফোরম্যান ডোভার। দ্রুত পিস্তল বের করে এরফানকে কাভার করল সে।

হাত তোলো, প্রোন্তো, আদেশ দিল ডোভার। কিন্তু যখন সে দেখল এরফান নিরস্ত্র, ওর কোমরে কোন পিস্তল ঝুলছে না, তখন খুশিতে ওর গলার ভিতর থেকে একটা কর্কশ হাসি বেরিয়ে এলো; আজই তোমার শেষ দিন, জেমস, বলল সে। বার্ট এবং আমার, দুজনেরই ইচ্ছা তুমি ওই গাছ থেকে। ঝোলো। হঠাৎ এমন একটা সুবর্ণ সুযোগ পেয়ে সে আনন্দে আত্মহারা। আশা। করেছিল এমন অসহায় নিরস্ত্র অবস্থায় পড়ে শত্রুর চোখে স্পষ্ট ভয়ের চিহ্ন ফুটে উঠতে দেখতে পাবে। কিন্তু ভয়ের বদলে, অবজ্ঞা দেখতে পেয়ে সে নিরাশ হলো।

ঘোড়াটাকে এগিয়ে এনে রাগ মেটাতে সে বাম হাতে এরফানকে একটা প্রচণ্ড ঘুসি মারল। কিন্তু সেটাই ওর কাল হলো। একটা ধূসর ছায়া ক্রুদ্ধ একটা গরগর শব্দ করে ডোভারের গলার ওপর ঝাপিয়ে পড়ল। আচমকা আক্রমণের ধাক্কায় লোকটা ঘোড়ার পিঠ থেকে উল্টে পড়ে গেল। এরফান এই সুযোগে পিছলে ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে দাঁড়াল। ততক্ষণে জন্তুটাকে হটিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে হাতের কাজটা শেষ করার জন্যে ঘুরে দাঁড়িয়েছে ডোভার। দেখল এরফান হাত ভাঁজ করে স্থির দাঁড়িয়ে ওর দিকে চেয়ে হাসছে।

ডোভার, তোমার জন্যে গাছটা অপেক্ষা করছে, স্বাভাবিক গলায় বলল এরফান।

লোকটা বেপরোয়া হলেও ক্ষণিকের জন্য যেন তার শিরদাঁড়া বেয়ে ঠাণ্ডা একটা ভয়ের স্রোত নেমে গেল। কিন্তু তার মনে পড়ে গেল যে এরফান নিরস্ত্র। হাসির সাথে সে তার পিস্তল তুলল। ডোভার ট্রিগার টিপতে যাচ্ছে, এই সময়ে এরফানের হাতটা নড়ে উঠল, ওর পিস্তলের মুখে আগুনের, ঝিলিক দেখল ডোভার। টলে উঠে পড়ে গেল লোকটা। বিস্ময় ফুটে উঠল শুয়ে থাকা ডোভারের মুখে; মৃত্যুর আগে সে একবার ভাবার চেষ্টা করল এরফানের হাতে অস্ত্রটা কোথা থেকে গজাল!

টমি লেজ নাড়তে নাড়তে এরফানের কাছে এগিয়ে এলো। ওর মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে দিয়ে এরফান বলল, তুইও আমারই মত, ঋণ রাখা পছন্দ করিস না।

বার বি লোকটার ঘোড়ার পিঠ থেকে দড়ি নিয়ে ওটা দিয়েই ডোভারকে গাছে ঝুলিয়ে দিল এরফান। ডোভারেরই ছুরি নিয়ে গাছে আরেকটা আঁচড় কাটল।

দশ মিনিটের মধ্যেই কাজ শেষ করে আবার রওনা হলো; কিন্তু অল্পদূর এগিয়েই পিছন থেকে ঘোড়ার খুরের আওয়াজ পেয়ে থেমে পিস্তল হাতে তৈরি থাকল। রাইডারকে লরি বলে চিনতে পেরে হেসে পিস্তলটা কোমরে গুঁজে রাখল।

তুমি এখানে? প্রশ্ন করল সে।

কুকুরটাকে অনুসরণ করে, জবাব দিল লরি। তোমার খোঁজে হোপের দিকে রওনা হয়েছিলাম। ওই চারপেয়ে উকুনের বান্ডিলটা কখন যে আমার পিছু নিয়েছে তা আমি টেরই পাইনি। গা-ঢাকা দিয়ে এগোচ্ছিল শয়তানটা। যখন দেখা দিল তখন আর র‍্যাঞ্চে ফিরিয়ে নেয়ার উপায় ছিল না। হোপে পৌঁছে শুনলাম শহর গরম, তোমাকে জীবিত বা মৃত ধরার জন্যে ওরা পাচশো ডলার পুরস্কার ঘোষণা করেছে।

বেশ ভাল অঙ্কের টাকা বলতে হবে, মন্তব্য করল এরফান।

টাকাটা অর্জন করার কথা ভাবছ? ঠাট্টা করল লরি।

বলা যায় না, করতেও পারি, জবাব দিল এরফান। তোমার কথা শেষ করো।

আমি যখন ফেনটনের সেলুন পার হচ্ছি, তখন টমি হঠাৎ এমন জোরে ছুটল, মনে হলো যেন ওকে যমে তাড়া করেছে, বলল লরি। আমি আঁচ করলাম ও নিশ্চয় তোমার ট্রেইলের গন্ধ পেয়েই অমন পাগলের মত ছুটছে। তুমি কখনও গোসল করো না বলেই রক্ষা, নইলে বেচারা নির্ঘাত গন্ধ না পেয়ে ট্রেইল হারিয়ে ফেলত।

তুমি আমাকে খুঁজতে কেন বেরিয়েছিলে? ওর খোঁচাটা উপেক্ষা করে প্রশ্ন করল এরফান। পরমুহূর্তেই বলল, কালও আমি গোসল করেছি সাবান মেখে, আর তুমি? খটাশও ফেল মেরে যাচ্ছে তোমার গায়ের গন্ধের তুলনায়!

আমি দেখা করতে চাইনি, বাধ্য হয়েছি, পাল্টা আক্রমণ এড়িয়ে জবাব দিল লরি। ইয়র্কি ডেজার্ট এজ থেকে ফেরার পথে ওর ঘোড়ার পা খোড়া করে। ফেলে। শেষে ওকে বাকি পথ হেঁটে ফিরতে হয়েছে। র‍্যাঞ্চে ফেরার পর ওর। আর নড়ার অবস্থা ছিল না। আমি তোমাকে বলতে এসেছিলাম যে ডেজার্ট এজে। গিয়ে জাজের দেখা ইয়র্কি পায়নি। তিন-চার দিন আগে চারজন কঠিন চেহারার লোক তার সাথে দেখা করতে গিয়েছিল। তাদের সাথেই জাজ কোথাও গেছে। আজ পর্যন্ত তার আর কোন খবর পাওয়া যায়নি। কাজের মেয়েটার কথা অনুযায়ী যারা গিয়েছিল তারা কেউ ওখানকার স্থানীয় লোক নয়। তাদের আগে কখনও সে দেখেনি।

এটা এরফানের জন্যে সত্যিই খারাপ খবর। কিন্তু খবরটা ও শান্ত ভাবেই গ্রহণ করল।

তাই? তাহলে ওরা ওঁকেও নিয়ে গেছে, বলল সে। সব পথ ওরা একবারে বন্ধ করে ফেলার চেষ্টা করছে।

তুমি আমাকে পরিষ্কার করে কিছুই বলছ না। ওরা কারা? এবং ওদের উদ্দেশ্যই বা কি?

ওরা যে কারা তা আমি এখনও ঠিক জানি না। তাই আমরা ওদেরই খোঁজে আছি।…আমার ধারণা ওই চূড়াগুলোর মাঝে মেয়েটার সাথে জাজকেও ওরা কোথাও আটকে রেখেছে।

ফিলের কোন খোঁজ-খবর এখনও পাওয়া যায়নি বলে অকথ্য ভাষায় গালাগালি শুরু করল লরি। ওকে কিছুক্ষণ খুঁটিয়ে লক্ষ করে বলল গম্ভীর এরফান, তুমি পরিবেশটাকে যথেষ্ট বিষাক্ত করা হয়েছে মনে করলে আমরা আবার রওনা হতে পারি।

লরি চুপসে গেল। তুমি কোন দিকে যাচ্ছ? প্রশ্ন করল।

ফোরম্যান তার গন্তব্যের কথা জানাতেই আবার ছুটল গালির ফোয়ারা। তোমার নিশ্চয় মাথা খারাপ, গালি শেষে বলল লরি। তুমি কি জানো না যে শহরের অর্ধেক লোক এখন পুরস্কারের লোভে শহর ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছে তোমাকে খুঁজে পাওয়ার আশায়? এইসব এলাকাতেই ছড়িয়ে আছে ওরা। আর তুমি কিনা যেখানে সব থেকে বেশি ভয়, সেখানেই যেতে চাচ্ছ?

ওটাই একমাত্র জায়গা যেখানে আমাকে খোঁজার কথা ওদের মাথাতেই আসবে না, বলল এরফান। তাছাড়া ওখানে কিছু জরুরী কাজও আছে আমার।

ঝুঁকিটা নেয়ার কোন মানেই হয় না। তুমি হয়ত গিয়ে দেখবে পিস্তল হাতে ওখানে ডোভার তোমার জন্যে আগেই অপেক্ষা করছে।

না, আমার তা মনে হয় না। তুমি কি তোমাদের সেই পোড়া ছাপরার ট্রেইল ধরে এসেছ?

না, আমি একটা শর্টকাট পথ দিয়ে এসেছি। তুমি এত শব্দ করছিলে যে তোমাকে খুঁজে বের করতে আমার কোন ঝামেলাই হয়নি, অভিযোগ করল সে। কিন্তু ওই ছাপরার সাথে এর কি সম্পর্ক?

এরফান ব্যাখ্যা করল কেন ডোভার বার বিতে ওদের স্বাগত জানাতে পারবে না। যুবকের চেহারা গ্র্যানিট পাথরের মত শক্ত হয়ে উঠল; তারপর পিছনে টমির দিকে চেয়ে ওর মুখটা আবার নরম হলো।

গুড ওল্ড টমি, বলল সে। আমি আমার কথা ফিরিয়ে নিচ্ছি, তুমি উকুনের ডিব্বা নও, তুমি আমাদের আউটফিটেরই একজন সদস্য।

আধঘণ্টা পর বার্টের র‍্যাঞ্চহাউসের পঞ্চাশ গজ দূরে ঝোঁপের আড়ালে এসে ওরা ঘোড়া থামাল। সঙ্গীকে ঘোড়ার সাথে ওখানেই থেকে কুকুরটাকে শান্ত রাখার নির্দেশ দিয়ে নিঃশব্দ পায়ে সামনের দিকে এগোল এরফান। বাঙ্কহাউস পার হওয়ার সময়ে সে ভিতরে কারও সাড়াশব্দ পেল না।

স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে, ব্ল্যাক মাস্কের ভয়ে ভীত নয় বার্ট; নিজের মনেই হাসল এরফান।

যদিও এখানে এটাই ওর প্রথম ভিজিট, তবু সে আঁচ করল যে সামনের। দুটো জানালাই সম্ভবত বসার ঘরের জানালা হবে। উঁকি দিয়ে ভিতরে চেয়ে বুঝল ওর ধারণাই ঠিক। জানালার সার্শি ঠেলে উপরে ওঠাবার চেষ্টা করে দেখল খোলাই আছে। দ্রুত হাতে টেবিলের নথিপত্র ঘেঁটে সে যা খুঁজছিল তা পেয়ে গেল। ওটা ছাপানো নাম্বার লেখা একটা লেজার বই। পাতা উল্টে দেখল একটা পাতা ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে। এবার সে ডেস্কের ড্রয়ার খোলার চেষ্টা করে দেখল, প্রথমটা তালা দেয়া, কিন্তু বাকিগুলো খোলা। লুকানোর কিছু থাকলে ওটার মধ্যেই রাখা হয়েছে। এবার ডোভারের ছুরিটা ওর কাজে লাগল। ওটার সাহায্যে অল্পক্ষণ চেষ্টার ফলেই ড্রয়ারটা খুলে ফেলল ও। তাড়াহুড়ায় রাখা একটা নোটের বান্ডিল ওপরেই রাখা রয়েছে। ওগুলো বের করে নিয়ে চাঁদের আলোয় সে নাম্বারগুলো পড়ে দেখে বুঝল এগুলোই সেই গরু বিক্রির টাকা, যেগুলো সে ব্যাঙ্ক থেকে উঠিয়েছিল।

তুমি ভালই প্ল্যান এঁটেছিলে, বার্ট, বিড়বিড় করে বলল সে। কিন্তু খেলা এখনও শেষ হয়নি। তবে এটা আমাকে স্বীকার করতেই হবে যে তোমার মাথায় কেবল গোবরই নেই, কিছু ঘিলুও আছে-অন্তত বোকা বাঁদরের সমান।

একে একে বাকি ড্রয়ারগুলোও সার্চ করে দেখে গুরুত্বপূর্ণ কিছু খুঁজে পেল ও। তবু বার্টের নিজের হাতে লেখা একটা কাগজ কি মনে করে যেন সে নোটগুলোর সাথে পকেটে ঢুকাল।

এরফান লরির কাছে পৌঁছে দেখল বেচারা দেরি দেখে খুব বেশি চিন্তিত হয়ে উঠেছে। তুমি কি পুরো র‍্যাঞ্চটাই তোমার সাথে নিয়ে এসেছ? নইলে তোমার এত সময় লাগল কেন? প্রশ্ন করল সে।

সানসেট, তুমি মাঝেমাঝে এমন কথা বলো যে মনে হয় তোমার একটা বন-মুরগির চেয়েও বুদ্ধি কম, টিটকারি দিল ওর ফোরম্যান। আমি যা খুঁজছিলাম তা আমি পেয়েছি। এই যে, এগুলো রাখো।

পকেট থেকে সে কেবল টাকাগুলো বের করে লরিকে দিল। এত টাকা দেখে কাউবয়ের চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। ওগুলোর বিশেষ তাৎপর্য লরিকে বুঝিয়ে বলল এরফান। পরে খাতাটাও দিল।

তার মানে বার্ট ওই ব্ল্যাক মাস্কের সাথে জড়িত, আমি আশা করছিলাম তোমাকে আর সেটা বানান করে বুঝিয়ে বলতে হবে না, বলল এরফান।

ঠিক আছে, ওয়াইয গাই সলোমন; এখন তোমার পরবর্তী চালটা কি?

এগুলো তুমি ফেনটনের কাছে পৌঁছে দেবে, প্রয়োজন হওয়ার আগে পর্যন্ত সে এগুলো যত্নের সাথে রক্ষা করবে। তুমি টমিকেও সাথে নিয়ে যাও, তবে ট্রেইল ধরে এগিয়ো না।

তুমি কি করবে?

শেরিফের কাছে ফিরে যাব; ওই পাঁচশো ডলার দাবি করতে হবে না?

লরি সন্দিগ্ধ চোখে ওর দিকে তাকাল। কিন্তু এরফান ঠাট্টা করছে না বুঝে ও বিস্ময়ে হতবাক হলো।

পালিয়ে গেলে আমি দোষী, সেটাই প্রমাণিত হবে।

এরফান যে ঠাট্টা করছে না এটা ওর স্বর শুনে বুঝতে কোন অসুবিধাই হলো লরির। তুমি পাগল, এরফান, বলল। একবারে বদ্ধ পাগল।

আমি যদি এখন পলিয়ে যাই, তবে সেটা নিজের অপরাধ স্বীকারের সামিল হবে।  

টমিকে লরির সাথে যাওয়ার নির্দেশ দিয়ে সে ফেনটনের ঘোড়ার পিঠে উঠল।

তুমি সত্যিই বোকা, এরফান, ওরা তোমাকে দড়িতে না ঝুলিয়ে ছাড়বে না

দূর, তোমার বিয়েতে আমি ঠিকই নাচব, বলে এরফান শহরের দিকে রওনা হলো। সময় নিচ্ছে কারণ ভোরে পৌঁছতে চায় ও।

লরি এরফানের যুক্তি ঠিকই বুঝতে পারছে, কিন্তু এরফান এভাবে স্বেচ্ছায় ধরা দিয়ে মরণের মুখোমুখি হোক এটাও সে চাইছে না, কিন্তু এরফান যখন ওই সুরে কথা বলে তখন ওর সাথে তর্ক করা বৃথা। বেশিদিনের পরিচয় না হলেও ওকে সে ভালভাবেই চেনে। টমিকে ডাক দিয়ে সে-ও শহরের পথে রওনা হলো।

ট্র্যাক এড়িয়ে ধীর গতিতে এগোচ্ছে এরফান, কারণ পুরস্কার লোভী কোন বাউন্টি হান্টারের কবলে পড়তে চায় না সে। আবার নিরাপদে জেলে টোকাই ওর উদ্দেশ্য। যখন পুবের আকাশটা হালকা হয়ে আসছে, তখন শহরের কাছে পৌঁছে কতগুলো ঝোঁপের কাছে নেমে ঘোড়াটাকে ওটার পাছায় একটা চাপড় বসাল এরফান। জানে, ওটা ঠিকই বাড়ি যাবে।

এবার সে পিস্তলটা ঝোঁপের ভিতর ফেলে ধীর পায়ে জেলের দিকে এগোল। দমাদম কিছুক্ষণ দরজায় কিল মারার পর ঘুম ভরা চোখে রাত্রিবাস পরে টেলর নিজেই দরজা খুলল। কিন্তু এরফানকে নিরস্ত্র অবস্থায় সামনে দেখে তার চোখ থেকে ঘুমের ভাবটা মুহূর্তে অদৃশ্য হলো।

সকাল বেলা এত শব্দে অনেকেই তাদের বাড়ির দরজা খুলে উঁকি দিল। এমন অভাবনীয় একটা দৃশ্য দেখে অনেকেই বাইরে বেরিয়ে এলো।

ডেপুটির রাতের নেশা এখনও কাটেনি। এরফান সরাসরি তার পুরস্কার দাবি করল শেরিফের কাছে।

ডেপুটি বোকার মত প্রশ্ন করল, তুমি কি চাও?

কেন? আত্মসমর্পণ করে পুরস্কারের টাকা দাবি করতে এসেছি। তাছাড়া আমি ক্লান্ত, একটা বিছানা আমার কাছে এখন ভালই ঠেকবে, একগাল হেসে বলল এরফান।

না, তোমাকে কিছুতেই ওই টাকা দেয়া যাবে না। ডেপুটির নেশাগ্রস্ত মাথাটা এখন কিছুটা পরিষ্কার হয়ে আসছে।

এতক্ষণে সবগুলো বাড়ি থেকেই লোকজন বেরিয়ে এসেছে এই অস্বাভাবিক দৃশ্য দেখার জন্যে। একজন ক্রিমিনাল নিজেই কিনা ফের গ্রেপ্তার হতে এসেছে! অভাবনীয় ব্যাপারই বটে!

এমন ওরা ভাববে সে-জন্যেই খেলছিল এরফান।

এটা কোন ধরনের শহর, ক্ষুব্ধ স্বরে প্রশ্ন করল ও। জেমস গ্রীনকে ধরে আনার জন্যে পুরস্কার ঘোষণা করা হলো, আমি এটা পূর্ণ করার পরেও বলা হচ্ছে আমাকে টাকা দেয়া হবে না-এটা কোন ধরনের বিচার? শহরবাসীদের কাছেই বিচার চাইল এরফান।

অনেকেই বলল, টাকাটা খুশি মনেই দিয়ে দাও, টেলর। কিপটেমি তোমার কোনমতেই শোভা পায় না।

তুমি কোথায় গিয়েছিলে? প্রশ্ন করল টেলর

তোমার চক্রান্তে একটু বাগড়া দিতে গেছিলাম, বলল সে।

এতে শেরিফের মনে হলো ওকে সবার সামনে অপমান করা হচ্ছে। তাই সে কঠিন স্বরে প্রশ্ন করল, কোথায় গেছিলে তুমি?

একটু বেড়াতে পেছিলাম, জবাব দিল সে।

একটু হাঁটতে বেরিয়েছিলে, তাই না? ভাল, কিন্তু এরপর তোমার পরবর্তী হাঁটা হবে ফাঁসিতে ঝোলানোর গাছ পর্যন্ত।

আমার বিচার তাহলে হয়ে গেছে? শান্ত স্বরে প্রশ্ন করল এরফান।

ওর ডেপুটি দুজন এতক্ষণে এসে হাজির হয়েছে। রাগের দৃষ্টিতে ওদের দিকে তাকাল টেলর।

ওকে নিয়ে যাও, বলল সে। এবার হাতের সাথে ওর পাও বেঁধে রাখবে, আদেশ দিল। এরফানকে ডেপুটিরা ভিতরে নিয়ে যাওয়ার পর শেরিফ নিজেও ভিতরে অদৃশ্য হলো।

দর্শকদের একজন মন্তব্য করল, লোকটা হয় পাগল, নইলে নির্দোষ। এই পরিস্থিতি দেখে এটুকুই উদ্ধার করতে পারল এরফান।

২০.

বার্ট ওকে ছেড়ে যাওয়ার পর চার ঘণ্টা পার হয়ে গেছে এখনও ফিল বেঞ্চের ওপর ঠায় বসে আছে। ভয় পাচ্ছে কখন লোকটা আবার ফিরে আসবে। তার চারপাশে পুরো জগৎটাই যেন ভেঙে গুড়িয়ে গেছে। কোনরকম আশার আলোই সে দেখতে পাচ্ছে না। বার বির মালিককে বিয়ে করাটা তার কাছে নেহাত ঘূণ্য বলে মনে হচ্ছে। এটা সে পরিষ্কার বুঝতে পেরেছে বার্ট কি ধরনের লোক। এর মধ্যে কেবল একবার নীরবতা ছিন্ন হয়েছে-পরপর দুটো গুলি ছোড়ার আওয়াজ তাকে চমকে দিয়েছিল।

চাবি দিয়ে তালা খোলার শব্দ বার্টের ফিরে আসার কথা ওকে স্মরণ করিয়ে দিল। লোকটা তার জবাব জানতে আসছে। উঠে দাঁড়াল ফিল। কিও বার্টের বিরাট দেহের পরিবর্তে দরজায় দেখা গেল সেই চোখে ঠুলি পরা লোকটাকে। হাতের ইশারায় ফিলকে সে ডাকল।

চলে এসো, খসখসে স্বরে বলল সে।

কিন্তু ভয়ে একটু পিছিয়ে গেল ফিল? কোথায়? নার্ভাস স্বরে প্রশ্ন করল মেয়েটা। কেন?

আমি তোমাকে এখান থেকে বের করে নিয়ে যেতে এসেছি, বলল ঠলি। গুড়ির ফাঁক দিয়ে ফিসফিস করে আমি তোমাকে যে উপদেশ দিয়েছিলাম সেটা তুমি মানায় আমি খুশি হয়েছি।

তাহলে তুমিই ছিলে? একটু আশ্বস্ত হলো ফিল, কিন্তু তবু সংশয় ওর পুরো কাটল না।

লোকটা মাথা ঝাঁকাল, কিন্তু মেয়েটা তবু ইতস্তত করছে দেখে শান্ত স্বরে বলল, আমি তোমাকে আমার এক বন্ধুর কাছে নিয়ে যাচ্ছি। অবশ্য তুমি যদি ব্ল্যাক বার্টের জন্যেই অপেক্ষা

না, না, আমি তোমার সাথেই আসছি, দ্রুত বলে উঠল ফিল।

পাইন গাছের ভিতর দিয়ে পথ দেখিয়ে লোকটা একই রকম আরেকটা কেবিনের সামনে থেমে ওটার তালা খুলে ফিলকে ভিতরে ঢুকতে বলল। ভিতরে দরজার দিকে চেয়ে বিষণ্ণ মুখে দাঁড়িয়ে আছে এক বৃদ্ধ, যাকে দেখেই ফিল চিনল।

জাজ এমারি! খুশিতে চেঁচিয়ে উঠল সে, কিন্তু পরক্ষণেই ওর মনটা আবার খারাপ হয়ে গেল এই লোকটাই এরফানের বন্ধু মনে পড়ায়। বার্টের কথা অনুযায়ী এ-ও তার বিরুদ্ধে চক্রান্তে জড়িত। জাজের চেহারা পাল্টে গেল অন্য। ভিজিটরকে দেখে।

তাহলে এটা তুমি, বার বির সেই কুকুরটা নয়, বলল সে। ঠুলি পরা লোকটার দিকে তাকাল জাজ। এটা আবার কি খেলা, বন্ধু? প্রশ্ন করল সে।

কাঁধ উঁচাল লোকটা। এটা কোন খেলা নয়, জাজ, জবাব দিল সে। আমি তোমার সাথে একটা ডীল করতে চাই। সপ্রশ্ন চোখে ওর দিকে চাইল জাজ।

এখানে একটা লোক আছে, এখন যার শেষ অবস্থা। লোকটা একটু থামলে বোঝার ভঙ্গিতে মাথা ঝাঁকাল এমারি। না, আমি ওকে গুলি করিনি, বলে চলল মুখোশধারী। লোকটা সেদিন জেমসের দলের বিরুদ্ধে গোলাগুলিতে গুহায় আহত হয়েছে। ওর মনে কিছু কথা জমে আছে। ওটার লিখিত একটা বিবৃতি তোমাকে দিয়ে লিখিয়ে মেয়েটাকে সাক্ষী রেখে সই করে যেতে না পারলে মরেও সে শান্তি পাবে না। তুমি যদি আমার সাথে এসে ওর বিবৃতিটা লিখে দাও, তাহলে কথা দিচ্ছি, আমি নিজে তোমাদের এখান থেকে বেরোবার ব্যবস্থা করে দেব।

এমারি কেবল এক মুহূর্ত চিন্তা করেই বলল, পথ দেখাও।

ওই লোকটাকে অনুসরণ করে পাইনের জঙ্গল থেকে বেরিয়ে একটা ছোট মালভূমি পেরিয়ে বড় ধরনের কেবিনে পৌঁছল। এক বান্ডিল কম্বল রাখা আছে ওখানে। একপাশে দুটো কম্বলের ওপর দুজন লোক অনড় হয়ে পড়ে আছে। অন্যপাশে একজন লোক দুর্বলভাবে একটু ককিয়ে উঠল।

ওই লোকটা কে? যে ককিয়ে উঠল তার পাশের লোকটাকে দেখিয়ে প্রশ্ন করল জাজ।

ওহ্, ওর নাম কি, এই আউটফিটের অস্থায়ী বস্। এখন সে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, জবাব দিল সে।

বেপরোয়া স্বরে কথাটা বলা হলেও ফিল শিউরে উঠল। ওর দুটো গুলির শব্দ শোনার কথা স্পষ্ট মনে আছে।

হ্যালো, প্যাঁচ, দুর্বল স্বরে বলল আহত লোকটা।

হ্যালো, জন, তুমি এখন কেমন বোধ করছ? এক চোখের লোকটা জানতে চাইলেও জবাবের অপেক্ষা না করে আবার বলল, আমার দেয়া কথা মত আমি জাজ আর মেয়েটাকে এখানে নিয়ে এসেছি। এমারির দিকে ফিরে সে ফিসফিস করে বলল, তুমি কাজ শুরু করে দাও, ওর সময় প্রায় শেষ হয়ে এসেছে।

কাগজ-পেনসিল বের করে মেয়েটাকেও কথাগুলো শুনতে ইঙ্গিত করল জাজ। অসুস্থ লোকটা বুঝল।

আমার হাতে বেশি সময় নেই, জাজ, এবং কথাগুলো তাই আমি সরাসরিই বলছি, শুরু করল সে। তোমার নিশ্চয় ডেজার্ট এজের কয়েক বছর আগের সেই ডাকাতির কথা মনে আছে? স্টেজ ড্রাইভার ডাগ যে রেইডে মারা গেছিল? জাজকে নড় করে সম্মতি জানাতে দেখে সে আবার বলে চলল, ওই চারজনের মধ্যে আমিও ছিলাম। আমিই ডাগকে গুলি করেছিলাম। তবে আমার ভুল ধারণার জন্যেই সেটা ঘটেছিল। হঠাৎ লোকটা লাগাম ছেড়ে পিছন দিকে হাত বাড়াল দেখে আমি ভেবেছিলাম সে বন্দুক তুলতে যাচ্ছে। কিন্তু আসলে যে ও তামাক খোজার জন্যে হাতাচ্ছে তা আমি পরে জেনেছি-ওর কাছে কোন বন্দুক ছিল না-ওর সাথে আমার কোন শত্রুতা ছিল না; ওটা ছিল একটা ভুল। কিন্তু তোমাকে এখানে আনার আসল কারণ হচ্ছে ওই রবারির পর আমাকে দিয়ে বাধ্য করে একটা কাগজে লিখিয়ে সই করিয়ে নেয়া হয় খুনটা অন্য একজন করেছে যে ওই ডাকাতির সাথে মোটেও জড়িত ছিল না।

দুর্বল স্বরটা আরও দুর্বল হয়ে এলো, শেষে ভীষণ কাশতে শুরু করল জন। দুহাতে কম্বলটা খামচে ধরেছে লোকটা, মনে হচ্ছে যেন ওর রোদে পোড়া চামড়া ভেদ করে আঙুলের হাড়গুলো আবার যখন সে কথা বলতে সক্ষম হলো তখন সেটা ফিসফিসানি থেকে বেশি জোরে শোনা গেল না।

যে নামটা আমাকে লিখতে বাধ্য করা হয়েছিল সেটা হচ্ছে-জ্যাক মাস্টারসন, ব্যথায় মুখ কুঁচকে কথাটা শেষ করল জন।

আমার বাবা! বলে উঠল ফিল।

হাত নেড়ে ওকে চুপ করাল এমারি। সামনের দিকে ঝুঁকে সে প্রশ্ন করল, কে তোমাকে ওটা লিখতে বাধ্য করেছিল? কেন?

বার বির মালিক, ব্ল্যাক বার্ট! ফুপিয়ে শ্বাস নিয়ে বলল গানম্যান।

মানুষটার মৃত্যু ঘনিয়ে এসেছে বুঝেই জাজ কি লিখেছে সেটা পড়ে শোনাল বেচারা। প্যাচের সাহায্য নিয়ে একটু উঁচু হয়ে কাগজটাতে সই করে দিল জন। তারপর সে আগ্রহের সাথে জাজ আর মেয়েটাকেও ওই কাগজে সই করতে দেখল। এবার সে একটা স্বস্তির শ্বাস ফেলে পরিশ্রান্ত অবস্থায় চিৎ হয়ে শুয়ে, পড়ল।

বার্ট হচ্ছে- শুরু করেছিল সে, কিন্তু আর মুখ খুলল না।

জাজ কম্বল দিয়ে ওর মুখ ঢেকে দিয়ে কাগজটা ভাঁজ করে পকেটে রাখল। তারপর চোখে পট্টি বাঁধা লোকটার দিকে ফিরে প্রশ্ন করল, এখন?… তোমাকেই বা আমরা কি নামে ডাকব?

তোমরা শুনেছ ও আমাকে কি নামে ডেকেছে, বুড়ো আঙুল দিয়ে বিছানার দিকে দেখিয়ে জবাব দিল আগন্তুক। এখানে আর কোন নামের মত ওটাও ভাল চলবে।

জাজ আড়চোখে কামরায় ঘুমন্ত অন্য লোকটার দিকে কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকাল। ওই লোকটার ঘুম খুব গভীর বলে মনে হচ্ছে, মন্তব্য করল সে।

হ্যাঁ, স্লিকের ঘুম অত্যন্ত গভীর, মড়ার মতই সে ঘুমাচ্ছে, বলে প্রসঙ্গ পাল্টাল লোকটা। এখান থেকে আমাদের তাড়াতাড়ি সরে পড়তে হবে। বাকি চারজনের ফেরার সময় হয়ে এসেছে-ওরা এসে পড়লে ঝামেলা বাধাবে।

অন্য চারজন? প্রশ্ন করল এমারি।

হ্যাঁ, আমি আর কি ছাড়া ব্ল্যাক মাস্ক দলে কেবল ওই কয়জনই বেঁচে আছে এখন-বাকি সবাই গুহায় জেমসের বিরুদ্ধে লড়ে মারা পড়েছে, ব্যাখ্যা করল প্যাঁচ।

বোঝা যাচ্ছে লোকটা আগে থেকেই প্ল্যান করে সব ব্যবস্থা করে রেখেছে, দেখা গেল কেবিনের পিছনে অন্ধকার ছায়ায় তিনটে ঘোড়া আগে থেকেই জিন। চাপিয়ে সাজিয়ে রাখা আছে। অন্ধকার এখন কেশ গাঢ়, কারণ চাঁদটা একটা মাঝারি আকারের মেঘের আড়ালে ঢাকা পড়েছে। কিন্তু যেটুকু আলো আছে তাতেই আকাশের গায়ে বিশাল আকারের পাহাড়ের চূড়াটা দেখা যাচ্ছে। ফিল আঁচ করল ওটা পাহাড়ের দ্বিতীয় চূড়া। কিন্তু ওদের গাইড ওই দৃশ্য দেখার জন্যে বেশি সময় দিল না।

আমাদের দ্রুত ছুটতে হবে, প্রথম কয়েক মাইল কেবল একটা ট্রেইলই গেছে, খসখসে স্বরে জানাল প্যাঁচ।

ঘোড়ার পিঠে ওঠার পর পথ দেখিয়ে প্রথমে এগোল লোকটা, তাকে অনুসরণ করছে ফিল, সবার শেষে এমারি। এই পথ তাকে চোখ বাঁধা অবস্থায় পেরোতে হয়েছে মনে করে শিউরে উঠল ফিল।

ওর মনটা এখন বর্তমান বিপদ নিয়েও ভাবতে পারছে না। মৃত ডাকাতের স্বীকারোক্তি থেকে সে এখন স্পষ্ট বুঝতে পারছে কেন ওর বাবা বার্টকে ঘৃণা করলেও সহ্য করতে বাধ্য হত। কিন্তু এতে বাবার অদৃশ্য হওয়ার কারণটা মোটেও পরিষ্কার হলো না ওর কাছে। তাই জেমস সম্পর্কে তার মনে সন্দেহ রয়েই গেল। এবং এই ছোট গড়নের আউটল, যে ওদের পালাতে সাহায্য করছে! সে-ই বা এসবের সাথে নিজেকে কেন জড়াচ্ছে? এই চক্রান্তের সাথেই বা তার কি সম্পর্ক? সামনের লোকটা কুঁজো হয়ে জিনের ওপর বসে ঘোড়াকে হাঁটিয়ে নিয়ে এগোচ্ছে। রাস্তাটা এতই সরু যে হাঁটার বেশি জোরে গতিতে চলা অসম্ভব।

একঘণ্টারও বেশি সময় ধরে ঢাল বেয়ে নিচে নামার পর কতগুলো পাইন গাছের ভিতর ওদের গাইড ট্রেইল ছেড়ে জঙ্গলের ভিতর ঢুকে ঘোড়ার পিঠ থেকে নামল।

কিসের শব্দ এলো-আমি ঘুরে দেখি, কম কথায় প্রকাশ করল প্যাঁচ। নীরব থাকো তোমরা। নিঃশব্দে পাইনের ভিতর অদৃশ্য হলো সে। জবাবের জন্যে অপেক্ষা না করেই ঢাল বেয়ে উঠে অন্ধকারে মিশে গেল। ফিল নিজের ঘোড়াটা সঙ্গীর আরও কাছে হাঁটিয়ে নিয়ে এলো।

তোমার কি মনে হয় ওকে বিশ্বাস করা যায়? ফিসফিস করে প্রশ্ন করল সে

আমার তো তাই বিশ্বাস, এবং সে-ই একমাত্র ভরসা, জবাব দিল জাজ। তাছাড়া ব্যক্তিগত ভাবে কুচক্রী বার্টের প্ল্যান পণ্ড করতে সময়মত হোপে পৌঁছতে আমি যে-কোন ঝুঁকি নিতে রাজি। ওরা যদি জেমসকে ফাঁসি —

আউটল ফিরে আসায় ওদের কথা ওখানেই শেষ হলো। ওর তাড়া দেখে বোঝা গেল কোন জরুরী খবর আছে।

ওরা আসছে-সময়ের আগেই ফিরেছে। লাফিয়ে ঘোড়ায় উঠে বসল সে। লুকাবার চেষ্টা করে কোন লাভ নেই, এই এলাকা ওদের কাছে নিজের বাড়ির সিঁড়ির মতই পরিচিত। যে করেই হোক লড়াই করে ওদের ঠেকাতে হবে। তোমার ঘোড়ার খাপে একটা উইনচেস্টার আছে, জাজ, আর আমি একটা ভাল জায়গা চিনি।

জঙ্গল ছেড়ে বেরিয়ে একটা খোলা জায়গা পেরিয়ে ওরা কিছু বড়বড় পাথরের আড়ালে আশ্রয় নিল। ঘোড়াগুলোকে সবথেকে বড় পাথরের আড়ালে লুকিয়ে রেখে, ফিলকে একটা নিরাপদ আশ্রয়ে লুকিয়ে ওরা দুজন রাইফেল হাতে তৈরী থাকল।

চাঁদটা আর মেঘের আড়াল থেকে বেরোবার সময় পেল না, প্যাঁচ বিরক্তি প্রকাশ করল।

এতে ওদের চেয়ে আমাদেরই বেশি সুবিধা হবে, মন্তব্য করল জাজ। ওরা আমাদের খোলা জায়গা পেরিয়ে আক্রমণ করতে পারবে না।

সেটা ঠিক, কিন্তু আমরাও সহজে সটকে পড়তে পারব না। ওই যে ওরা।…কিন্তু ব্যাপারটা কি?

সন্ধি-চুক্তির নিশান-ওরা কথা বলতে চায়, বলল এমারি।

চারজন রাইডার পাইন জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এসেছে। সবার আগে যে এগিয়ে আসছে তার হাতে সাদা নিশান। লোকটা যখন দুশো গজের মধ্যে এসে পৌঁছেছে, তখন প্যাঁচ উঠে দাঁড়াল।

যথেষ্ট এগিয়েছ, বলল সে। কিছু বলার থাকলে বলো।

এভাবে বন্দিদের নিয়ে পালাবার মানে কি, প্যাঁচ? ওদের লীডার প্রশ্ন করল।

সেটা আমার নিজস্ব ব্যাপার, তোমাকে বলতে যাব না, জবাব দিল প্যাঁচ। তবে তোমাদের একটা ভাল পরামর্শ দিচ্ছি, এই তল্লাট ছেড়ে চলে যাওয়ার সময় এখনও আছে।

আউটল হাসল। খুব ভড়কে গেছ, তাই না? ঠাট্টা করল সে। সময় এলেই আমরা যাব, কিন্তু তার আগে আমরা ওই মেয়ে আর জাজকে চাই।

এগিয়ে এসে চেষ্টা করে দেখতে পারো, হুমকি দিল প্যাঁচ। ঝুঁকি নেয়ার কোন প্রয়োজন নেই, তোমাদের পালাবার সব পথ বন্ধ। আমরা সাহায্যের জন্যে লোক পাঠিয়েছি, ওরা পৌঁছা’নো পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করতে হবে, এই যা।

তোমরা কাকে পাঠালে-স্লিককে? প্রশ্ন করল প্যাঁচ। এতে ওদিক থেকে যেসব গালি এলো তাতে প্যাঁচ খিকখিক করে হাসল।

তুমি এখন কি করবে? জানতে চাইল আউটল।

তোমরা এখনই না পালালে গুলি করব। দাঁড়ানো অবস্থাতেই রাইফেল তাক করল প্যাঁচ।

তড়িঘড়ি ঘোড়া ঘুরিয়ে নিয়ে ছুটল লোকটা। তার পিছন থেকে তিনটে গুলি এলো বটে, কিন্তু একটাও প্যাচের গায়ে লাগল না, জাজও পাল্টা গুলি ছুঁড়ল, কিন্তু তাতে ডাকাতদেরও কোন ক্ষতি হলো না। তারা ততক্ষণে পাইন জঙ্গলে অদৃশ্য হয়েছে।

কিছুক্ষণের জন্যে সব নীরব হলো।

প্যাঁচ বলল, সাহায্যের জন্যে লোক পাঠানোর কথাটা পুরো একটা ধাপ্পা, পাঠাবার মত কোন লোকই ওদের নেই। এখন হয়ত ওরা আমাদের ওপর ইন্ডিয়ান খেলা খেলবে। অবশ্য জাদের ধারে এক খণ্ড মেঘ আসছে এখন। প্যাচের মনে হলো সে যেন ঘাসের উপর দিয়ে কালো একটা কিছু এগিয়ে আসতে দেখতে পাচ্ছে। সাবধানে তাক করে ট্রিগার টিপে দিল সে। কালো জিনিসটা একটা ঝাঁকি খেয়ে স্থির হয়ে গেল। পর মুহূর্তেই একটা দড়ির ফাঁস ওর গলা বেয়ে কনুই পর্যন্ত নামল, ওটার একটা ঝটকায় রাইফেলটা হাত থেকে ছিটকে পড়ল ওর। ঢাল বেয়ে কয়েক পাক গড়িয়ে নামায় দড়িটা ওর গায়ে আরও পেঁচিয়ে গেল। এখন একেবারে অসহায় অবস্থা ওর। সঙ্গীদের দিকে সাহায্যের আশায় চেয়ে দেখল ওদের ওর মত একই অবস্থা। তিক্ত মনে সে টের পেল বুদ্ধির খেলায় ওরা শয়তানদের কাছে হেরে গেছে। তাদেরই একজন সামনে দিয়ে এগোবার সময়ে অন্যরা ঘুরে পিছন দিক দিয়ে উপরে উঠেছে। যে লোকটা সাদা পতাকা নিয়ে এগিয়েছিল, সে এখন ওর দিকে বিষদৃষ্টিতে চেয়ে আছে।

প্যাঁচ, তোমাকে এবার আমাদের সাথে গাদ্দারী করার উচিত সাজাই পেতে হবে, হিসহিস করে বলল সে।

নিজের পিস্তলটা বের করল লোকটা। পরবর্তী সেকেন্ডেই অসহায় প্যাচের দেহ ফুটো হয়ে যেত, কিন্তু একটা ঠাণ্ডা ভারী স্বর বাধ সাধল।

এক্সকিউজ মি, জেন্টস, এটা কি ব্যক্তিগত লড়াই, নাকি যে কেউ যোগ দিতে পারে? প্রশ্ন এলো।

চমকে উঠে আউটল ঘুরে চেয়ে দেখল পরিস্থিতি পাল্টে গেছে, উদ্যত পিস্তল হাতে দুজন শক্ত চেহারার লোক ওদের কাভার করে আছে।

বাঁধা অবস্থায় একটা অসহায় মানুষকে গুলি করে মারা আমার কাছে মোটেও পছন্দ হচ্ছে না, বলে চলল নবাগত লোকটা। আকাশের দিকে হাত তোলো, কয়োটির দল! ধমকে উঠল লোকটা।

দুজন ডাকাত ওর নির্দেশ মত হাত তুলল বটে, কিন্তু যে-লোকটা প্যাঁচকে গুলি করতে যাচ্ছিল সে পিস্তল ঘুরিয়ে পাল্টা আক্রমণের চেষ্টা করল। কিন্তু তার আগেই অন্য পিস্তলটা গর্জে উঠল। ঘোড়ার পিঠ থেকে উল্টে অস্বাভাবিক ভঙ্গিতে মাটিতে পড়ল লোকটা। এক নজরেই বোঝা গেল মারা গেছে যে গুলি করেছিল সে নড করে তার সন্তুষ্টি প্রকাশ করল। তারপর ফিলের দিকে এগিয়ে গেল।

তাহলে শেষ পর্যন্ত আমরা তোমাকে ঠিকই খুঁজে পেয়েছি, মিস মাস্টারসন, বলল সে।

খুশিতে চিৎকার করে উঠল ফিল। আরে! রে এদারটন! তুমি এখানে কিভাবে এলে? প্রশ্ন করল সে।

গুহায় তোমাকে না পেয়ে জেমস আমাকে আর এক্স টি থেকে পলকে তোমার খোঁজে এই পাহাড়গুলো চষে ফেলার নির্দেশ দিয়ে গেছে, ব্যাখ্যা করল কাউবয়। এবারে অন্যজনের দিকে চেয়ে ওর চোখ বিস্ফারিত হলো। অবাক কাণ্ড! জাজ এমারিও দেখি রয়েছে তোমার সাথে!

যত কম কথায় সম্ভব বর্তমান পরিস্থিতিটা ওকে জানাল জাজ। এরফানের বিপদের কথা জেনে একটা গালি দিয়ে জিভে কামড় দিল রে। ওখানে ফিলের উপস্থিতির কথা ওর মনে ছিল না।

তাহলে এখন আমরা কি করব? প্রশ্ন করল সে। মিস মাস্টারসন, আমি, আর এই প্যাঁচ যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পাহাড় থেকে নেমে হোপের দিকে রওনা হচ্ছি; তুমি আর পল নিজেদের আউটফিট নিয়ে আমাদের অনুসরণ করো। কপাল ভাল থাকলে হয়ত আমরা সময়মত পৌঁছতে পারব।

প্যাঁচকে দড়ির প্যাঁচ থেকে ছাড়িয়ে নেয়া হলো; ডাকাত দুজনকে নিরস্ত্র করে এই এলাকায় আবার দেখা গেলে গুলি করে মারার হুমকি দিয়ে ছেড়ে দেয়ার পর পল আর রে নিজের নিজের ব্যাঞ্চের পথ ধকল। বাকি তিনজন হোপের ট্রেইলের দিকে রওনা হলো।

মাথা নিচু করে নীরবে ঘোড়া ছোটাচ্ছে এমারি। সামান্য দেরি হলেও সে মেজাজ দেখাচেছ। ফিল বুঝতে পারছে যে জেমসের জন্যে দুশ্চিন্তাতেই লোকটা এমন করছে। জাজের দুশ্চিন্তা ওকেও গভীর ভাবে প্রভাবিত করল। মাত্র একবার সাহস সঞ্চয় করে ফিল ওকে প্রশ্নটা করেই বসল।

এটা কি সত্যি যে জেমসই একসময়ে আউটলু বিদ্যুৎ এরফান নামে পরিচিত ছিল?

হ্যাঁ, কিন্তু সে কখনও আউটল ছিল না। ওর নামে মিথ্যে কথা রটানো হয়েছিল। ওর আসল নাম এরফান জেসাপ। এখন সে গভর্নর ব্লেকের অধীনে ডেপুটি ইউ এস মার্শাল হিসেবে কাজ করছে, বলল জাজ। তুমি যে জেমসকে পছন্দ করো না তা আমি জানি। কিন্তু আমি আশা করি একদিন তুমি ওকে সত্যিই ঠিকমত চিনবে, এবং বুঝবে আসলে ওর কাছে তুমি কতটা ঋণী।

বুড়ো লোকটার স্বর অত্যন্ত কঠিন শোনাল। এবং তার কথার সুরেও ভসনার আভাস সুস্পষ্ট। ফিল চুপ করে থাকল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *