১৬. হোটেলে ফিরে এলো তিন গোয়েন্দা

হোটেলে ফিরে এলো তিন গোয়েন্দা। আসার পথেই থানায় নেমে পুলিশকে। জানিয়ে এসেছে সব কথা।

অপেক্ষা করছে ওরা। পুলিশ বলেছে, কোনো খোঁজ পেলেই জানাবে। অনেক রাত হলো। কিন্তু ফোন আর আসে না। বসে বসে আলোচনা করছে তিনজনে, অনুমান করার চেষ্টা করছে, কোথায় নিয়ে যাওয়া হতে পারে সিনর স্টেফানোকে। কিছুই বুঝতে পারছে না। কোনো সূত্র ছাড়া বুঝবেই বা কিভাবে?

ঘুমোতে যেতে তৈরি হলো তিনজনে। এই সময় এলো ফোন। রিসিভারটা কিশোরের দিকে বাড়িয়ে ধরে ম্যানেজার বললো, তোমাকে চাইছে।

প্রায় থাবা দিয়ে রিসিভারটা নিয়ে কানে ঠেকালো কিশোর। হালো!

কিশোর? আমি, পুলিশ নয়। আমি, পিন্টো আলভারো।

ও, আপনি! কি খবর?

তোমাদেরকে বলেছিলাম না, খোঁজখবর করবো। করেছি। আমার পরিচিত সমস্ত জায়গায় ফোন করেছি। যেখানে যেখানে স্টেফানো যেতেন, আমাকে নিয়ে, সব জায়গায়। এইমাত্র ট্যাক্সকো থেকে হ্যানিবাল কারনেস জানালো, তাকে নাকি দেখেছে। তিনজন লোকের সঙ্গে গাড়িতে। খাবার কিনতে থেমেছিলো গাড়িটা। কারনেসের মনে হয়েছে, পুরানো কোনো ধ্বংসস্তূপ খুঁড়তে চলেছেন আরকিওলজিস্ট। সেজন্যেই তোক নিয়েছেন সাথে।

কোনদিকে গেছে! দুরুদুরু করছে কিশোরের বুক।

উত্তর-পশ্চিমে। ঠিক কোথায়, বলতে পারলো না। জিজ্ঞেস করতে পারেনি কারনেস।

এই হ্যানিবাল কারনেসটি কে?

ট্যাক্সকোর একটা সুভনিরের দোকানের মালিক। আর্টিস্ট-কাম-আরকিওলজিস্ট। ডা স্টেফানোর ছাত্র।

ও। আর কিছু বলতে পারলো? গাড়িটা কি গাড়ি? লোকগুলো কেমন?

গাড়িটা কালো রঙের সেডান। লোকগুলো মেকসিকান, জেলে বলেই মনে হয়েছে কারনেসের। নানারকমের কাজ করে ওই অঞ্চলের জেলেরা মাছ ধরে, গরু পোষে, ভালো টাকা পেলে শ্রমিকের কাজ করে। বিশেষ করে মাটি খোঁড়ার কাজ। অনেক টাকা দেয় তো আরকিওলজিস্টরা।

ডা স্টেফানোর সঙ্গে যে দেখা হয়েছে, সংক্ষেপে সেকথা জানালো কিশোর। শুনে খুব চিন্তিত হলো আলভারো। বললো, পুলিশ খুঁজছে খুঁজুক, সে আরও খোঁজ নেবে।

তাকে অনেক ধন্যবাদ জানিয়ে ফোন রেখে দিলো কিশোর। দুই সহকারীকে নিয়ে ঘরে ফিরে এলো। ম্যাপ খুলে বসলো।

ট্যাক্সকো বের করলো। উত্তর-পশ্চিম দিকে আঙুল এগিয়ে নিয়ে যেতে যেতে হঠাৎ বলে উঠলো, বুঝেছি! লেক প্যাজকুয়ারোতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে!

কি করে বুঝলে? একই সঙ্গে জিজ্ঞেস করলো রবিন আর কিশোর।

ওটাই ওদের জন্যে একমাত্র নিরাপদ জায়গা। এখানকার পুলিশ অতদূরে খুঁজতে যাবে না। তাছাড়া, কয়েকটা সূত্র আছে আমাদের হাতে। রবিন, মনে আছে, কথা বলার সময় খালি মাছ মাছ করছিলো লোকগুলো? আলভারোও বললো, কারনেসের নাকি জেলের মতো মনে হয়েছিলো লোকগুলোকে। আর সব চেয়ে বড় সূত্রটা হলো প্রজাপতি জাল। বলেছে, প্রজাপতি জাল দিয়ে না ধরে ধরেছি ল্যাসো দিয়ে। লেক প্যাজকুয়ারোই একমাত্র জায়গা পৃথিবীতে, যেখানে ওই জাল দিয়ে মাছ ধরা হয়। তারমানে লোকগুলো ওখানকারই অধিবাসী। কাউকে লুকানোর জন্যে নিজের অঞ্চলকেই সবচেয়ে নিরাপদ মনে করবে ওরা। গেছেও সেদিকেই। আর কোনো সন্দেহ নেই, টেবিলে চাপড় মারলো কিশোর। ওই হ্রদেই সিনর স্টেফানোকে নিয়ে গেছে ওরা।

পুলিশকে জানানো দরকার, মুসা বললো।

না! এটাই আমাদের শেষ সুযোগ, বিফল হতে চাই না। পুলিশ দেখলে হুঁশিয়ার হয়ে যেতে পারে ব্যাটারা। জায়গায় জায়গায় ওদের চর থাকতে পারে। খবর পেলেই আবার সিনর স্টেফানোকে সরিয়ে ফেলবে। ওরা এখনও জানে না আমরা আন্দাজ করে ফেলেছি। কাজটা আমাদেরকেই করতে হবে। গোপনে।

তার মানে লেক প্যাজকুয়াররাতে যাচ্ছি আমরা?

হ্যাঁ। কাল সকালে উঠেই।

পরদিন সকালে নাস্তা সেরে বেরিয়ে পড়লো তিন গোয়েন্দা। ট্যাক্সকোতে পৌঁছলো দুপুরবেলা। লাঞ্চের সময় হয়েছে। গাছে ছাওয়া বড় একটা চর মতো জায়গায় গাড়ি রাখলো। মেকসিকানরা এরকম জায়গাকে বলে ক্যালো। চারপাশ ঘিরে রয়েছে পর্বত। বাড়িঘর রয়েছে ঢালের ওপর। অসংখ্য পাথরের রাস্তা উঠে গেছে এদিক ওদিক। চত্বরের একধারে সুন্দর একটা পাথরের গির্জা দেখা গেল। অনেক পুরানো। বাকি তিনধারে রয়েছে চমৎকার সব দোকানপাট, হোটেল, রেস্টুরেন্ট।

হেঁটে একটা রেস্টুরেন্টের দিকে এগোলো তিন গোয়েন্দা। বেশির ভাগ দোকানেই দেখলো রূপার তৈরি জিনিসপত্রের আধিক্য।

ট্যাক্সকো রূপার জন্যে বিখ্যাত, বিদ্যে ঝাড়লো চলমান জ্ঞানকোষ, রবিন। অনেক রূপার খনি আছে এখানে। ফলে রূপার জিনিস বানানোর কারিগরও আছে।

একটা জানালার সামনে দাঁড়িয়ে গেল কিশোর। হাত তুলে দেখালো, দেখ, কি সুন্দর!

রূপার তৈরি একটা প্রমাণ সাইজের মানুষের মূর্তি। একজন ইনডিয়ান। হাতের একটা বটুয়া থেকে শস্যের বীজ ছিটানোর ভঙ্গি।

হ্যানিবাল কারনেসের খোঁজ করলে হয় না? মুসা বললো, হয়তো সিনর স্টেফানোর ব্যাপারে আরও কিছু জানা যেতে পারে। ছাত্র ছিলো যখন তার।

ঠিক বলেছো! তুড়ি বাজালো কিশোর। দাড়াও, আগে খেয়ে নিই। খেয়েদেয়ে বিল দেয়ার সময় ম্যানেজারকে জিজ্ঞেস করলো কিশোর।

কারনেস? ম্যানেজার বললো, একটু আগেই তো দেখে এলাম। কয়েকজন ছাত্রকে নিয়ে ছবি আঁকছে। কয়েকটা দোকান পরেই তার দোকান। ডান পাশে ঘুরে সোজা চলে যাও।

দোকানের সামনে বেড়া দেয়া একটা উঠান। সেখানে বসে ছবি আঁকছে কয়েকজন চিত্রকর। তাদের মধ্যে রয়েছে লাল দাড়িওয়ালা একজন লোক। উজ্জ্বল নীল স্মক পরনে। সেই কারনেস।

ছেলেরা তার পরিচয় জিজ্ঞেস করতেই মুখ তুলে হাসলো। হ্যাঁ, আমিই হ্যাঁনিবাল কারনেস। আলভারো তোমাদের কথা বলেছে। আমেরিকা থেকে এসেছো। সিনর স্টেফানোর খোঁজে। চমৎকার জায়গা আমেরিকা। অনেকদিন থেকেছি। আঁকার অনেক দৃশ্য আছে ওখানে।

অন্যান্যদের সঙ্গে কারনেসও বসে ছবি আঁকছে। ক্যানভাসে দেখা গেল একটা স্কেচ, ছোট একটা ছেলে একটা খচ্চরের গলায় দড়ি ধরে টানছে।

সেদিকে তাকিয়ে কিশোর জিজ্ঞেস করলো, কি ধরনের ছবি বেশি আঁকেন আপনি?

সব ধরনেরই। তবে মানুষের প্রতিকৃতি আঁকতেই বেশি ভালো লাগে আমার, হাসলো সে। তোমরা যাকে খুঁজতে এসেছো, সেই সিনর স্টেফানোরও ছবি আমি এঁকেছি। দেখবে? এসো।

তিন গোয়েন্দাকে দোকানের ভেতরে নিয়ে এলো কারনেস। চলে এলো পেছনের একটা ঘরে। তার স্টুডিওতে।

সুন্দর একটা লাইফ-সাইজ ছবি। দেয়ালে ঝুলিয়ে রেখেছে কারনেস। নিখুঁত করে একেছে তার ওস্তাদ এমিল ডা স্টেফানোর ছবি।

প্রশংসা করলো কিশোর। স্টেফানোর সম্পর্কে প্রশ্ন করতে লাগলো। অনেক তথ্য জানালো কারনেস, যেগুলো তিন গোয়েন্দার কাছে নতুন।

সিনর স্টেফানো খুব ভালো লোক, কারনেস বললো। শান্ত স্বভাবের। কারো সাতেপাচে যান না। নিজের কাজ নিয়ে থাকেন। অ্যাজটেক যোদ্ধার রক্ত বইছে শরীরে। বিশ্ববিদ্যালয়ে সহকর্মীরা তো তার নামই দিয়ে ফেলেছে অ্যাজটেক যোদ্ধা।

শুনেছি, রবিন বললো, একেকজন আরকিওলজিস্টের একেক জিনিসের প্রতি শখ। যদিও প্রাচীন সব ধরনের জিনিস খুঁড়ে বের করতেই সমান আগ্রহী তারা। সিনর স্টেফাননার শখটা কি, বলতে পারেন?

ঠিক এই প্রশ্নটাই করতে যাচ্ছিলো কিশোর, চুপ হয়ে গেল, করে ফেলেছে রবিন।

তুমি ঠিকই বলেছো, মাথা ঝাঁকালো কারনেস। একেকজনের একেক শখ। সিনর স্টেফানোর ছিলো পুরানো অন্ত্রের। বিশেষ করে অ্যাজটেকদের। অনেক অস্ত্র যোগাড় করেছেন তিনি। শত শত বছরের পুরানো। স্টেট মিউজিয়ামকে দিয়ে দিয়েছেন।

এই তথ্যটা জেনে খুব উত্তেজিত হলো তিন গোয়েন্দা।

পুরানো অস্ত্র হাতে, তার একটা ছবিও এঁকেছি আমি, কারনেস জানালো। এসো, এদিকে, আরেকটা ছবি দেখালো সে। শেষ হয়নি ছবিটা। বাকি আছে। তিন বছর আগে একেছি এটা। শেষ করে ফেলতে পারতাম, করিনি। সিনর স্টেফানো অনুরোধ করেছেন, আরও দুটো বছর যেন অন্তত অপেক্ষা করি। শেষ করে এটা স্টেট মিউজিয়ামে দিয়ে দেয়ার ইচ্ছে আছে আমার।

এতদিন অপেক্ষা করতে বলেছেন কেন? মুসার প্রশ্ন।

কি জানি, বলতে পারবো না। নিশ্চয় কোনো কারণ আছে। অকারণ ফালতু কথা বলার মানুষ তিনি নন।

আরও কাছে গিয়ে গভীর মনোযোগে ছবিটা দেখতে লাগলো কিশোর। ঝলমলে অ্যাজটেক পোশাক পরে রয়েছেন স্টেফানো। হাতে একটা বড় ছুরি। সোনা দিয়ে তৈরি বাঁটটায় পালকওয়ালা সাপের ছবি খোদাই করা রয়েছে। নীলকান্তমণি বসানো।

ভাবনা চলেছে তার মাথায়। তিন বছর আগে আঁকা হয়েছে ছবিটা, আরও দুবছর অপেক্ষা করার কথা। তার মানে পাঁচ বছর। অ্যাজটেক যোদ্ধার সম্পত্তি ফেরত দেয়ার একটা নির্দিষ্ট সময় চেয়েছিলেন মিস্টার রেডফোর্ড। স্টেফানোও সময় চেয়েছেন কারনেসের কাছে। দুটোর মাঝে কোনো সম্পর্ক আছে?

সিনর স্টেফানোর পাওয়া অস্ত্রগুলো কখনও দেখেছেন? আচমকা প্রশ্ন করলো কিশোর।

না। তিনি সেসব কাউকে দেখাতেন না। জানাতেনই না। মিউজিয়ামে পাঠানোর পর সবাই জানতো। আগে প্রকাশ না করার কারণ বোধহয় চোর ডাকাতের ভয়। তবে একটা জিনিস আমি দেখে ফেলেছিলাম।

কী?

ছুরি। ওই যে, ছবিতে যেটা এঁকেছি।

আর কোনো সন্দেহ রইলো না কিশোরের। উইলে অ্যাজটেক যোদ্ধা বলে কাকে বোঝাতে চেয়েছেন মিস্টার রেডফোর্ড, এবং তার জিনিসটা কি। যোদ্ধা হলেন এমিল ডা স্টেফানো, আর সম্পত্তি হলো ওই ছরি।

অনেক মূল্যবান তথ্য জানতে পেরেছে। আর কিছু জানার নেই। আরও কিছু ছবি দেখে, বেরিয়ে এলো তিন গোয়েন্দা। ট্যাক্সকো থেকে বেরিয়ে সোজা রওনা হলো লেক প্যাজকুয়ারোর পথে। আগের রাতে আলভারোকে যা যা বলেছে, ছেলেদেরকেও ঠিক একই কথা বললো কারনেস, সিনর স্টেফানোকে কখন কি অবস্থায় দেখা গেছে।

বিকেল বেলা হ্রদের পাড়ে পৌঁছলো ওরা। ছোট একটা গ্রাম প্যাজকুয়াররা। একটামাত্র সরু রাস্তার ধারে গড়ে উঠেছে ওখানকার যতো সব বাণিজ্যিক ভবনগুলো। একটা হোটেল আছে। তাতে উঠলো তিন গোয়েন্দা। গোসল-টোসল সেরে বেরিয়ে পড়লো সিনর স্টেফানোর খোঁজে।

রাস্তার ধারের দোকানগুলোতে ঢুকে লোকের সঙ্গে কথা বললো। স্টেফানোর হবি দেখিয়ে তাঁকে দেখেছে কিনা জিজ্ঞেস করলো। কেউ দেখেনি। নিরাশ হয়ে হোটেলে ফিরে এলো গোয়েন্দারা। সেদিন আর কিছু করার নেই। সকাল সকাল খেয়েদেয়ে শুতে গেল।

ভুল করলাম না তো? রবিনের প্রশ্ন। হয়তো এখানে আনাই হয়নি তাঁকে।

প্রজাপতি জালের কথা কিছুতেই মন থেকে সরাতে পারছি না আমি, কিশোর বললো। কাল সকালে হ্রদের পাড়ে চলে যাবো। জেলেদেরকে জিজ্ঞেস করবো। দেখি, কিছু বলতে পারে কিনা।

এতে কাজ হলো। তিনজন লোক জানালো, ছবির মানুষটাকে দেখেছে। যে তিনজনের সঙ্গে দেখেছে, তাদেরকেও চেনে ওরা। খারাপ লোক। জাতে জেলে কিন্তু মাছ ধরার চেয়ে, অন্যায় কাজেই বেশি আগ্রহ ওদের। একটা লঞ্চে করে চলে গেছে জ্যানিৎজিও দ্বীপের দিকে। তীরে দাঁড়িয়েই দেখা যায় দ্বীপটা পাহাড়ও রয়েছে একটা ছোটখাটো। বিশাল এক মূর্তি গড়া হয়েছে পাহাড়ের মাথায়, একজন পাদ্রীর। তার নাম মোরোজ। ১৮১০ সালে একটা বিদ্রোহী বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

ওখানে যাওয়ার জন্যে বোট ভাড়া পাওয়া যাবে কিনা জানতে চাইলো কিশোর। ছোট একটা বন্দর দেখিয়ে দেয়া হলো তাকে। ওখান থেকে ছোটখাটো এক লঞ্চই ভাড়া করে ফেললো সে। দ্বীপে রওনা হলো।

তিনজনেই অবাক হয়ে দেখতে লাগলো জেলেদের মাছ ধরা। বিচিত্র জাল ঝপাৎ করে ফেলছে পানিতে। যেন ঝাঁপ দিয়ে পড়ছে দানবীয় প্রজাপতির ডানা। যখন টেনে তোলা হচ্ছে, তাতে লাফালাফি করছে সার্ডিন মাছের মতো একধরনের মাছ। প্রচুর ধরা পড়ছে।

লঞ্চের সারেং ওদেরকে জানালো, সে জাতে জেলে। মাছ, ধরে বিক্রি করে পয়সা জমিয়ে এই লঞ্চ কিনেছে।

এতো ছোট মাছ দিয়ে কি হয়? রবিন জানতে চাইলো।

খায়। শুকিয়ে শুটকি করে মেকসিকো সিটিতে পাঠানো হয়। প্যাজকুয়ারো হ্রদের মাছের দারুণ চাহিদা। খুব স্বাদ। অনেক দামে বিকোয়।

দ্বীপের কাছাকাছি চলে এসেছে বোট। পানির কিনারে সারি দিয়ে বাঁধা আস্ত গাছের কাণ্ড কুঁদে তৈরি একধরনের ডিঙি, অনেকটা বাংলাদেশের তালের নৌকার মতো। ওগুলো জেলেদের সম্পত্তি। এই ডিঙিতে করেই মাছ ধরতে বেরোয় প্যাজকুয়ারোর জেলেরা।

সৈকতে মানুষের অভাব নেই। জাল ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে শুকানোর জন্যে। ছেঁড়া জায়গাগুলো মেরামতে ব্যস্ত মেয়েরা।

তীরে ভিড়লো বোট। পাইলটকে অপেক্ষা করতে বলে নামলো তিন গোয়েন্দা। প্রথম যে মহিলাকে ছবিটা দেখালো কিশোর, সে-ই বলে দিতে পারলো সিনর স্টেফানোকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। পাহাড়ের দিকে দেখিয়ে দিলে সে। ঢাল বেয়ে উঠে গেছে একটা পাথরের তৈরি রাস্তা। দুপাশে বাড়িঘর দোকানপাট। প্রতিটি বাড়ির সামনেই খুঁটি পুঁতে তার ওপর লম্বা করে সরু গাছের কাণ্ড ফেলে রাখা হয়েছে। জাল ঝুলিয়ে রখার জন্যে।

আবার ছবিটা দেখালো কিশোর। কয়েকজন লোককে। ওরাও পাহাড়ে দিকে নির্দেশ করলো।

মনে হয়, চলার গতি বাড়িয়ে দিলো রবিন, এইবার আর বিফল হবে না।

দাড়াও! বাধা দিলো কিশোর। পুলিশ দেখছি না এখানে। বিপদে পড়ে যেতে পারি, এভাবে গেলে। ব্যাটাদের ল্যাসোর ক্ষমতা তো দেখেছি। জোয়ান দেখে দুতিনজন লোক নিয়ে যাওয়া দরকার।

কাকে নেবে? মুসার প্রশ্ন।

আশেপাশে তাকালো কিশোর। জাল নিয়ে কাজ করছে কয়েকজন জেলে। দুজনকে খুব পছন্দ হলো তার। জোয়ান, বলিষ্ঠ শরীর। ফুলে ফুলে উঠছে হাতের পেশী। তাদেরকে গিয়ে সবকথা বুঝিয়ে বললো সে।

অবাক হলো লোকগুলো। একজন বললো, আমাদের দ্বীপে কিডন্যাপার! শেষ পর্যন্ত শয়তানগুলো কিডন্যাপিং করলো! চলো, আমি যাবো, ওই লোকটার নাম হুগো।

উঠে দাঁড়ালো আরেকজন, আমিও, তার নাম নিটো।

পাহাড় বেয়ে উঠতে শুরু করলো দলটা। পথের পাশের প্রতিটি বাড়ি, দোকান খুঁজতে খুঁজতে চললো। পাহাড়ের ওপরে যেতে দেখা গেছে। কিডন্যাপারদের, কিন্তু কোন বাড়িতে তা দেখেনি কেউ। অনেক ওপরে উঠে বয়ে মোড় নিয়েছে পথটা। কিশোর বললো, একসাথে না থেকে ভাগাভাগি হয়ে খোঁজা দরকার। তাতে অনেক তাড়াতাড়ি আর সহজ হবে।

রাস্তার শেষ বাড়িটার দিকে এগিয়ে চললো সে। সমস্ত দরজা খোলা। নাহ, এখানে থাকবে না, ভাবলো সে।

তবু, না দেখে যাওয়া ঠিক হবে না। কয়েকটা দরজায় দাঁড়িয়ে ভেতরে উঁকি দিলো কিশোর। আর মাত্র একটা দরজা। সেটার সামনে সবে এসে দাঁড়িয়েছে, হ্যাঁচকা টানে তাকে ভেতরে টেনে নিলো কয়েকটা হাত বাধা দেয়ার সুযোগই পেলো না। এমনকি সাহায্যের জন্য যে চিৎকার করবে, তারও উপায় রাখলো না। মুখে গুজে দেয়া হলো ময়লা কাপড়। একটা জাল দিয়ে জড়িয়ে ফেলা হলো। ঠেলে ফেললো ঘরের কোণে। আরও কিছু জাল ফেলে চাপা দেয়া হলো তাকে।

এতো সহজে ধরা পড়ে গেল বলে নিজের ওপরই রাগ হতে লাগলো কিশোরের। কয়েক মিনিট সব কিছু চুপচাপ রইলো, তারপর একটা লোককে বলতে শুনলো, তোমার জন্যে কি করতে পারি?

এই লোককে দেখেছেন? রবিনের কণ্ঠ। নিশ্চয় ছবি দেখিয়ে জিজ্ঞেস করেছে।

এক মুহূর্ত নীরবতা। তারপর লোকটা জবাব দিলো, হ্যাঁ, দেখেছি। তিনজন লোকের সঙ্গে গেছে। হ্রদের দিকে। সাথে একটা ছেলেও ছিলো, মনে হয় আমেরিকা থেকে এসেছে।

থ্যাংক ইউ। যাই, দেখি, ওদিকেই খুঁজি।

নীরব হয়ে গেল আবার বাইরে। অসহায় হয়ে পড়ে থেকে কিশোর ভাবছে, সাহায্যের আশা শেষ। চলে গেছে রবিন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *