সন্ধ্যায় ঘুরে ঘুরে সবার সাথে দেখা করল সম্রাট। তার মিষ্টি সুরের সান্ত্বনা মন জয় করে নিল সবার। এমন ভাব দেখাল যেন ইংল্যান্ডে তার শিষ্যরা অধীরভাবে অপেক্ষা করছে, তাই তাড়াতাড়ি ফিরে যাওয়া দরকার তার। এত তাড়াতাড়ি চলে যেতে হচ্ছে বলে দুঃখে আমার কলজেটা ফেটে যাচ্ছে। চোখ মুছল সম্রাট। কিন্তু কী করব, উপায় নেই। তাই ঠিক করেছি মাবাপ-হারা মেয়েগুলোকেও সঙ্গে নিয়ে যাব! আর এখানকার সয়-সম্পত্তি বেচে দেব।

আনন্দে চিৎকার করে উঠল তিন বোন, চোখে খুশির ছটা। বলল, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিক্রির ব্যবস্থা করতে। ওদের খুশির ভাব দেখে আমার বুক টনটন করে উঠল। স্পষ্ট বুঝতে পারছি বোকা বানানো হচ্ছে এই সহজ-সরল মেয়েগুলোকে। কিন্তু কীভাবে এই বিপদ ঠেকাব, বুঝতে পারলাম না।

অন্ত্যেষ্টির পরের দিন দুজন দাস-ব্যবসায়ী এল। নিগ্রো চাকরগুলোকে কিনবে ওরা। দুজন দুজায়গার লোক। একজন মেমফিসের, অপরজন অরলিয়ন্সের। নিগ্রো ছেলে দুটোকে কিনল মেমফিসের ব্যবসায়ী। আর ওদের মা চলল অরলিয়ন্সে। মেয়েগুলো এই ঘটনায় খুব আঘাত পেল। বলল, তারা স্বপ্নেও ভাবেনি ওদের বেচে দেয়া হবে অন্য কোথাও। সেদিন নিগ্রো চাকরদের গলা জড়িয়ে ওদের কান্নাকাটির দৃশ্যটা জীবনেও ভুলব না আমি। এই বিক্রি শেষপর্যন্ত টিকবে না, একথা আগে থেকে জানা না-থাকলে হয়ত হেস্তনেস্ত করে ফেলতাম একটা।

ব্যাপারটা গাঁয়ে উত্তেজনার সৃষ্টি করল। অনেকেই এর নিন্দা করল। সন্তানের কাছ থেকে মাকে আলাদা করা অন্যায়, বলল ওরা। এতে জোচ্চরগুলোর ইজ্জত কিছু কমল বটে, কিন্তু বুড়ো শয়তান আদৌ ভ্রুক্ষেপ করল না। তবে মনে হল ডিউক কিছুটা অস্বস্তি বোধ করছে। কিন্তু তার ওজর-আপত্তি কানে তুলল না সম্রাট।

নিলামের দিন খুব সকালে হারামি দুটোর হাকডাকে ঘুম ভাঙল।

পরশু রাতে আমার ঘরে গিয়েছিলে? আমাকে জিজ্ঞেস করল সম্রাট।

না।

আর কাউকে যেতে দেখেছ?

চাকর-বাকরদের।

ওদের হাতে কিছু ছিল?

জানি না। খেয়াল করিনি। কেন, কোন সমস্যা?

তা দিয়ে তোমার দরকার কী? খ্যাক করে উঠল সম্রাট। ডিউকের দিকে ঘুরে বলল, ব্যাপারটা আমাদের বেমালুম চেপে যেতে হবে। মুখ খোলা ঠিক হবে না।

দেখতে দেখতে সকাল হয়ে এল। ধীরে ধীরে মই বেয়ে নিচে নামলাম আমি। মেয়েগুলোর কামরার কাছে যেতে দেখলাম, দরজা খোলা, বিছানার ওপর একটা সুটকেস আধ-গোছানো অবস্থায় পড়ে। পাশেই দুহাতে মুখ ঢেকে কাঁদছে মেরি জেন। দেখে ভারি খারাপ লাগল।

মিস মেরি জেন, ভেতরে ঢুকে বললাম, আপনি কারো কষ্ট সইতে পারেন না। আমিও না। আমাকে বলুন, কাঁদছেন কেন?

ওই চাকরগুলোর কথা ভেবে, ডুকরে উঠল সে।

দেখবেন, দুহপ্তার ভেতরে ফিরে আসবে ওরা, কথাটা বলেই বোকা হয়ে গেলাম। কিন্তু ততক্ষণে যা হবার হয়ে গেছে।

একথা বলছ কেন? দুহাতে আমার গলা জড়িয়ে ধরে জিজ্ঞেস করল মেরি জেন।

কোণঠাসা অবস্থা হল আমার। একটু ভেবে দেখলাম, মিথ্যে বলার চেয়ে সত্যি বলা অনেক নিরাপদ। মিস জেন, কাছেপিঠে এমন কোন জায়গা আছে, যেখানে গিয়ে দু-চার দিন থাকতে পারবেন আপনি?

হ্যাঁ, মিস্টার লরথ্রপ-এর ওখানে। কেন, বল তো?

অনুমতি নিয়ে দরজায় খিল তুলে দিয়ে এসে বসলাম। চেঁচাবেন না, বললাম আমি। সব শোনার জন্যে আপনার মনটাকে শক্ত করুন, মিস জেন। এই লোক দুটো আসলে জালিয়াত, আপনার কাকা নয়।

চমকে উঠল মেরি জেন, কিন্তু আমি চড়া পেরিয়ে গিয়েছি ততক্ষণে। তরতর করে বলে দিলাম সর্ব—সেই স্টিমারযাত্রী বোকা যুবকের সাথে দেখা হওয়া থেকে এখানে আসা পর্যন্ত কিছুই গোপন করলাম না। মোহরের থলেটা কোথায় লুকিয়েছি তাও জানালাম।

জানোয়ার, বলল মেরি জেন। অস্তাচলগামী সূর্যের মত তার মুখ জ্বলছে।

এরপর তাকে বুঝিয়ে বললাম, কী করতে হবে। রাত নটা-সাড়ে নটা অবধি মিস্টার লরথ্রপের বাসায় কাটিয়ে এখানে ফিরে আসবে সে। যদি এগারটার আগেই পৌঁছে যায় তাহলে ঘরের জানালায় মোম জ্বেলে দেবে। আমি রাত এগারটার মধ্যে না ফিরলে ধরে নেবে চম্পট দিয়েছি। তখন খবরটা ফাঁস করবে, চোদ্দশিকে পুরবে শয়তান দুটোকে।

বাজারের কাছেই একটা ফাঁকা চত্বর, সেখানই নিলামের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিকেলের দিকে শুরু হল নিলাম। একের পর এক বিক্রি হয়ে যাচ্ছে সব। সম্রাট কাছেই দাঁড়িয়ে, উৎফুল্ল দেখাচ্ছে তাকে। মাঝেমধ্যে দু-একটা ধর্মীয় বোলচাল আর মিষ্টি কথায় আসর জমিয়ে রেখেছে ব্যাটা। ডিউক এদিক-সেদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে, বোবার অভিনয় করে সকলের সহানুভূতি কাড়বার চেষ্টা করছে।

নিলামের শেষ পর্যায়ে ঘাটে একটা জাহাজ ভিড়ল। মিনিট দুয়েক পর দেখা গেল সরব জনতার মিছিল এগিয়ে আসছে একটা। মিছিলের সামনে দুজন ভদ্রলোক, পরিপাটি বেশভূষা তাদের।

পিটার উইলকসের এই আরেক জোড়া উত্তরাধিকারী, হাসতে হাসতে বলল জনতা। নাও, এবার তোমরাই ঠিক কর জিনিসের দাম কাকে দেবে।

আগন্তুক দুজনের একজন বৃদ্ধ, অপরজন অল্প বয়েসী। দুজনেই সুদর্শন। যুবকের ডান হাত ভাঙা, ব্লিং-এ ঝুলিছে।

আমি পিটার উইলসের ভাই হার্ভে, বললেন বৃদ্ধ, আর এ আমাদের ছোট ভাই উইলিয়ম। পথে বিপদে পড়েছিলাম আমরা। উইলিয়মের হাত ভেঙেছে, আমাদের মালপত্র খোঁয়া গেছে জাহাজ থেকে। সম্ভবত ভুল জায়গায় ওগুলো খালাস করা হয়েছে।

হাত ভেঙেছে, কুৎসিত ভেংচি কাটল সম্রাট। মালপত্র হারিয়েছে। বাহ! বেড়ে অজুহাত খাড়া করেছে বলতে হবে। চালু মাল সন্দেহ নেই। অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল সে। জনতার একাংশেও তার ঢেউ উঠল। কিন্তু ডাক্তার রবিনসন আর উকিল লেভি বেল হাসল না। নিচু গলায় কী যেন পরামর্শ করল তারা। বার কয়েক আড়চোখে তাকাল সম্রাটের দিকে।

সবাই আমার কথা শোন, বলল ডাক্তার। এই নবাগত দুজন জালিয়াত কি-না জানি না তবে, সম্রাট ও ডিউকের দিকে ইশারা করল সে, ওই দুজন যে ঠগ সন্দেহ নেই। ব্যাপারটা আসলে কী, না-জানা পর্যন্ত পালাতে দিও না এদের। চল সবাই, দুপক্ষের মোকাবেলা করাই। তাহলেই বোঝা যাবে ব্যাপারটা।

এমন একটা মজার খোরাক পেয়ে পাগল হয়ে উঠল যেন জনতা। ওই দুই ভদ্রলোক যে-হোটেলে উঠেছেন সেদিকে রওনা হল সবাই। সূর্য প্রায় ডুবু-ডুবু। ডাক্তার আমার হাত ধরে রাখল। মনে হল আমার প্রতি তার সহানুভূতি আছে, কিন্তু তাই বলে হাত ছাড়ল না।

আমরা সবাই হোটেলের একটা বড় কামরায় জড় হলাম। কয়েকটা মোম জ্বালানো হল। তারপর নবাগত দুজনের সামনে জেরা শুরু হল।

শুরুতেই ফেঁসে গেল দুই ঠগ। এরা নির্দোষ হলে, সম্রাট আর ডিউককে দেখিয়ে বলল ডাক্তার, মোহরের থলেটা আনতে পাঠাবে কাউকে। একটা কিছু রফা না হওয়া পর্যন্ত এখানেই থাকবে থলেটা।

ঠিক! ঠিক! সায় দিল সবাই।

দুঃখিত হওয়ার ভান করল সম্রাট। বলল, থলেটা থাকলে তো কোন কথাই ছিল না। এখুনি আনিয়ে সব ঝামেলার ইতি করতাম। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে ওটা নেই। কেউ চুরি করেছে।

সব ধাপ্পা, ধমকে উঠল ডাক্তার।

পরিষ্কার বুঝতে পারলাম আমি, সম্রাটের কথা কেউ বিশ্বাস করেনি। আমাকে একজন জিজ্ঞেস করল, নিগ্রোদের ওগুলো চুরি করতে দেখেছি কি-না? বললাম, চুরি করতে দেখিনি, তবে কামরায় চুপিচুপি ঢুকতে-বেরুতে দেখেছি।

কি হে, ছোকরা, তুমিও ইংরেজ নাকি, আচমকা আমাকে প্রশ্ন করল ডাক্তার।

হ্যাঁঁ, বললাম।

হো-হো করে হেসে উঠল সবাই। লেভি বেল বলল, বসে পড়, ছোকরা। বুঝেছি, মিথ্যে বলার অভ্যেস তোমার নেই। আরও চর্চা দরকার।

সেদিনই যদি তুমি থাকতে এখানে, লেভি…

লেভি বেল! ডাক্তারের মুখের কথা কেড়ে নিল সম্রাট। দাদার প্রতিটা চিঠিতে তোমার কথা থাকত। কী সৌভাগ্য! উকিলের দিকে হাত বাড়িয়ে দিল সে।

করমর্দন করল লেভি বেল। হাসল, খুশি হয়েছে মনে হল। সম্রাটকে এক প্রান্তে ডেকে নিয়ে গিয়ে নিচুস্বরে আলাপ করল কিছু। তারপর বলল, হ্যাঁ, সব ঠিক করে ফেলব। লিখে দাও তুমি, তোমরা ভাইকে সই করতে বল। কোর্টের বাকি কাজ আমি করব।

কাগজ-কলম আনা হল। সম্রাট বসল। ঘাড় বেঁকিয়ে জিভ কামড়ে লিখল কিছু, তারপর ডিউকের হাতে দিল কলমটা। ডিউক সই দিয়ে কাগজটা উকিলের হাতে দিল।

স্যার, দয়া করে আপনি কি এটা কপি করে দেবেন? বুড়ো ভদ্রলোককে বলল উকিল। আপনার ভাইয়ের সইও লাগবে। তবে তার হাত ভাল হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করব আমরা।

এইভাবে ধূর্ত উকিল পিটার উইলকসের ভাই বলে দাবি করছে এমন তিনজনের হাতের লেখা জোগাড় করল। তারপর পকেট থেকে বের করল কিছু পুরোনো চিঠি। সেগুলোর হাতের লেখা ওই তিনজনের লেখার সঙ্গে মেলাল।

এই চিঠিগুলো, জনতাকে বলল লেভি বেল, হার্ভে উইলসের লেখা। এ তিনজনের একজনের সাথেও এই লেখার মিল নেই। বিশেষ করে, বুড়ো ভদ্রলোককে দেখিয়ে বলল, ওনারটা তো আদপে কোন লেখাই নয়, কিছু হিজিবিজি দাগমাত্র।

সমস্যাটা ব্যাখ্যা করতে দিন আমাকে, বললেন বুড়ো ভদ্রলোক। উইলিয়ম ছাড়া আমার হাতের লেখা কেউই পড়তে পারে না। তাই ও-ই আমার চিঠিপত্র লিখে দেয়। ওই চিঠিগুলো আসলে আমার জবানিতে ওর লেখা।

তবে তো উইলিয়মের হাতের লেখা পরখ করতে হয়, বলল উকিল।

কিন্তু বাঁ-হাতে ও লিখবে কীভাবে, প্রতিবাদ করলেন বুড়ো ভদ্রলোক। বরং এক কাজ করতে পারেন, ওখানে ওর নিজের চিঠিও আছে। সেগুলো মেলাতে পারেন আমারটার সাথে।

হুঁম, চিঠিগুলো পরখ করে বলল উকিল, মনে হচ্ছে ঠিক কথাই বলছেন আপনি। অন্তত একটা জিনিস পরিষ্কার বোঝা যাছে, ধাই করে সম্রাট আর ডিউকের দিকে ঘুরল সে, এই দুজন জালিয়াত।

Share This