১৬. ল্যারির নাম ধরে ডাকতে ডাকতে

ল্যারির নাম ধরে ডাকতে ডাকতে পুকুরের দিকে চলে গেল জনি। মাঝখানটা বেশ গভীর ওটার, আর ল্যারি সাঁতার জানে না।

রাফিয়ানকে নিয়ে জিনা আর তিন গোয়েন্দা ছুটলো গেটের দিকে।

খাড়া ঢাল বেয়ে ওঠার সময় এদিক ওদিক তাকালো ওরা, বার বার ডাকতে লাগলো ল্যারির নাম ধরে। কিন্তু ছেলেটার ছায়াও নেই। কেন যেন কিশোরের মনে হচ্ছে, ফার্মে নেই ল্যারি। ভেড়ার বাচ্চাটাই হারিয়েছিলো, তাকে খুঁজতে খুঁজতে দূরে কোথাও চলে গেছে সে।

আমাদের ক্যাম্পে হয়তো গিয়ে বসে আছে, মুসা বললো। ওখানে যাবার খুব ইচ্ছে ওর, দেখলাম সেদিন।

গিয়ে থাকলে তো ভালোই, কিশোর বললো। আমার মনে হয় না। একা একা অতদূরে যায়নি সে কথনও। চেনার কথা নয়।

কি যে শুরু হলো আজ! খালি লোক হারানোর খবর শুনছি! জিনা বললো। প্রথমে গেল রিড আর জ্যাক, কোথায় আছে কেউ জানে না। এখন ল্যারি নিখোঁজ!

কোনো ছুটিই কি আরামে কাটাতে পারবো না আমরা? রবিনের প্রশ্ন। যেখানেই যাই, উত্তেজনা আর রহস্য যেন আমাদের পায়ে পায়ে গিয়ে হাজির।

খালি উত্তেজনা আর রহস্য হলে তো কোনো কথা ছিলো না, মুসা বললো। বিপদ আসে যে! সেটাই মাঝে মাঝে অসহ্য লাগে।

ক্যাম্পে এসে পৌঁছলো ওরা। ল্যারি আর টোগোর ছায়াও নেই।

এবার কোথায় যাই? জিনা বললো।

যাবো যেখানেই থোক, মুসা বললো। বলা যায় না কতোক্ষণ লাগবে খুঁজতে। এক কাজ করা যাক, কিছু মুখে দিয়ে নিই। খালি পেটে খুঁজতে বেরিয়ে আমরাও সুবিধে করতে পারবো না।

কথাটা মন্দ বলোনি। কিভাবে কোথায় খুঁজব, ইতিমধ্যে একটা প্ল্যানও করে ফেলা যাবে, একমত হলো কিশোর।

খাবার, অর্থাৎ শুধু স্যান্ডউইচ তৈরি করতে বসলো জিনা আর রবিন। হাত কাঁপছে জিনার। কোনো জিনিসই ঠিকমতো ধরে রাখতে পারছে না। বললো, গেল কোথায় ছেলেটা! কোনো ক্ষতি না হয়ে যায়, আল্লাহ না করুক! সারা সকাল ধরে নিখোঁজ!

স্যান্ডউইচ তৈরি হলো।

রবিন ডাকলো, এসো, বসে যাও। তা কি ঠিক করলে? কিভাবে কোথায় খুঁজবো?

আলাদা হয়ে ছড়িয়ে পড়বো আমরা, কিশোর একটা স্যান্ডউইচ হাতে তুলে নিলো। কিছু টম্যাটো আর গাজর নিয়ে পকেটে ভরলো। পাহাড়ের আশেপাশে খুঁজবো। একটু পর পরই ল্যারির নাম ধরে ডাকবো। তোমরা যাবে পাহাড়ের ওই দিকটায়, রবিন আর জিনাকে বললো সে। একজন খুঁজতে খুঁজতে ওপর দিকে উঠবে, আরেকজন নামবে। এই পাশটায় খুঁজবো আমি আর মুসা, একইভাবে। তারপর আমরা দুজন চলে যাবো প্রজাপতির খামারে। ওখানেও যেতে পারে।

স্যান্ডউইচ হাতে নিয়েই উঠে পড়লো ওরা। দুই দল চলে গেল দুদিকে। রাফি একবার গেল এদলের কাছে, আরেকবার দলের কাছে। এমনি করে সারা পাহাড়ময় ছুটে বেড়াতে লাগলো সে। একটা কাজ পাওয়া গেছে। সে-ও বুকে গেছে, ল্যারি হারিয়েছে। ছেলেটা আর টোগোর গন্ধ তার চেনা। বাতাস কে সেই গন্ধ বের করার চেষ্টা চালাচ্ছে।

প্রজাপতির খামারে গিয়ে দেখা গেল, সেখানে কেউ নেই। কারো চিহ্নই নেই খামারে। এমনকি মিসেস ডেনভারও কটেজে নেই, বাইরে কোথাও গেছে। আর দুই প্রজাপতি মানবের তো এ-সময় থাকারই কথা নয়। প্রজাপতি ধরতে বেরিয়েছে।

ওদের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল রবিন আর জিনার। দর থেকে চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করলো, একটা পাঁচ বছরের ছেলে আর একটা ভেড়ার বাচ্চাকে দেখেছে কিনা।

জবাব এলো, দেখেনি।

রেগে রয়েছে এখনও, জিনা বললো রবিনকে। দেখেছো কেমন কাটা কাটা জবাব দিলো? প্রজাপতি না খুঁজে এখন ওরাও আমাদের সাহায্য করলে কাজ হতো।

আবার আগের জায়গায় জমায়েত হলো তিন গোয়েন্দা, জিনা আর রাফি। প্রায় হাল ছেড়ে দিয়েছে ওরা। ল্যারিকে পাওয়া যায়নি। এরপর কি করবে, এই নিয়ে আলোচনা করছে ওরা, এই সময় হঠাৎ কান খাড়া করে ফেললো রাফিয়ান। তারপর চেঁচিয়ে উঠলো উত্তেজিত হয়ে। যেন বোঝানোর চেষ্টা করছে, আমি একটা জিনিস বোধহয় পেয়েছি।

বুঝে ফেললো জিনা। চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করলো, কি, কি পেয়েছিস রাফি?

কান আরও খাড়া করে ফেললো রাফিয়ান।

যা যা এগো, নির্দেশ দিলো জিনা। দেখ কি পেয়েছিস!

চলতে আরম্ভ করলো রাফিয়ান। মাঝে মাঝেই থেমে গিয়ে কান পাতে, শোনে, তারপর আবার চলে। ওরাও শোনার চেষ্টা করছে, কিন্তু কুকুরের মতো প্রখর নয় ওদের শ্রবণশক্তি। কিছুই শুনতে পেলো না।

আরি! কিশোর বললো। ও তো গুহার দিকে চলেছে! ওদিকে গেছে ল্যারি? ফার্ম থেকে অনেক দূরে, পথও খুব জটিল। কি করে এলো!

কি জানি! বুঝতে পারছি না, জিনা বললো। কিন্তু রাফির তো ভুল হওয়ার কথা নয়?

যেভাবেই যাক,মুসা বললো, সেটা পরেও জানা যাবে। এখন ছেলেটাকে খুঁজে পেলেই হয়।

মিনিটখানেক পরেই শোনা গেল একটা ক্লান্ত কণ্ঠ, টোগো টোগো! কোথায় তুই?

ল্যারিইইই! প্রায় একসঙ্গে চিৎকার করে উঠে ছুট লাগালো চারজনে।

অবশ্যই সবার আগে পৌঁছলো সেখানে রাফিয়ান। তিন গোয়েন্দা আর জিনা পৌঁছে দেখলো ছেলেটার মাথা চাটছে সে, তার গলা জড়িয়ে ধরে রেখেছে ল্যারি। গুহার ঠিক বাইরে বসে আছে। ভেড়ার বাচ্চাটা নেই সাথে।

ল্যারি! ল্যারি! বলে চিৎকার করে ছুটে গেল জিনা। কোলে তুলে নিলো তাকে।

বাদামী চোখ মেলে সকলের দিকে তাকালো ল্যারি। মোটেই অবাক হয়নি ওদেরকে দেখে। শান্ত কণ্ঠে ঘোষণা করলো যেন, টোগো পালিয়েছে। ওই ওখানে গিয়ে লুকিয়েছে। গুহাটা দেখালো সে।

গেছে, যাক, মুসা তার গাল টিপে দিয়ে বললো। তুমি যে যাওনি, এটাই বুদ্ধিমানের কাজ করেছে। ঢুকলে আর কোনোদিন পাওয়া যেতো না তোমাকে।

চলো ওকে বাড়ি নিয়ে যাই, রবিন বললো।

কিন্তু জিনার কোলে থেকেই লাথি মারতে শুরু করলো ল্যারি। চিৎকার করে বললো, না, না, আমি যাবো না! টোগোকে ফেলে যাবো না! টোগো! টোগো!

শোনো, ল্যারি, বোঝনোর চেষ্টা করলো কিশোর। গুহার ভেতরে থেকে থেকে শীঘ্রি বিরক্ত হয়ে যাবে টোগো। তখন আপনাআপনিই বেরিয়ে আসবে। তোমার মা তোমার জন্যে কাঁদছেন।

কাঁদুক, সাফ জবাব দিয়ে দিলো ল্যারি। আমি টোগোকে ছাড়া যাবে না।

তোমার খিদে পায়নি? মুসা জিজ্ঞেস করলো।

এই উত্তেজনার মুহূর্তেও মুসার কথায় হেসে ফেললো সবাই।

ল্যারি বললো, পেয়েছে। কিন্তু টোগোকে ছাড়া খাবো না। টোগো! টোগো! জলদি আয়। আমরা বাড়ি যাবো।

ওকে এখুনি নিয়ে যাওয়া দরকার, রবিন বললো। বাড়িতে নিশ্চয় সবার পাগল হওয়ার অবস্থা। টোগো ঢুকতে যখন পেরেছে, বেরিয়ে আসতে পারবে। জন্তুজানোয়ারের অনুভূতি খুব প্রখর। আর যদি বেরোতে না-ই পারে, দুঃখ করা ছাড়া আর কি করার আছে? দড়ি ছাড়া গুহাগুলোয় ঢোকা কোনোমতেই উচিত হবে না।

চলো, ল্যারি, জিনা বোঝালো ওকে। টোগো সময় হলেই আসবে। খেলতে গেছে তো ভেতরে। খেলা শেষ হলেই বেরিয়ে আসবে। ধীরে ধীরে গুহার কাছ থেকে সরে আসতে লাগলো সে। তোমার মা যে কাঁদছে, খারাপ লাগছে না তোমার?

লাগছে তো।

তাহলে চলো বাড়ি গিয়ে খেয়েদেয়ে টোগোকে নিতে আসবো আমরা আবার।

অবশেষে রাজি হলো ল্যারি।

খড়িমাটির পথ বেয়ে ফিরে চললো দলটা। সবাই খুশি। ল্যারিকে খুঁজে পাওয়ার উত্তেজনায় জ্যাক আর রিডের কথা ভুলেই গেছে ওরা।

ছেলেকে দেখে ছুটে এলেন মিসেস কলিউড। জিনার কোল থেকে নিয়ে নিলেন তাকে। জড়িয়ে ধরে চুমু খেয়ে কেঁদে বললেন, কোথায় চলে গিয়েছিলি তুই, ল্যারি? ওই ভেড়ার বাচ্চাটাই তোর সর্বনাশ করলো। গেল কই হতচ্ছাড়াটা!

ওকে গাল দিচ্ছো কেন? ওর খেলতে ইচ্ছে করে না? গুহার ভেতরে খেলতে গেছে।

সব শুনে শিউরে উঠলেন মিসেস কলিউড। ওই গুহায় ল্যারি ঢুকলে কি সর্বনাশ হতো সেকথা আর ভাবতে চাইলেন না তিনি।

বাবার দাও, মা, খিদে পেয়েছে, ল্যারি বললো।

সে বসলো খেতে, আর টেবিল ঘিরে সবাই বসলো তার খাওয়া দেখতে। আজ যেন ল্যারির খাওয়াটাই এক নতুন ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গপগপ করে খেতে লাগলো ল্যারি। তার খাওয়া দেখেই বোঝা গেল কি প্রচণ্ড খিদে পেয়েছে।

খাওয়া শেষ করেই চেয়ার থেকে নেমে পড়লো ল্যারি, আমি টোগোকে আনতে যাবো।

না না, তোমার যাবার দরকার নেই, তাড়াতাড়ি ছেলের হাত ধরলেন মা। আমি কেক বানাতে যাচ্ছি, তুমি আমার কাছে বসে থাকবে। সময় হলে আপনিই ফিরে আসবে টোগো।

সত্যিই ফিরে এলো টোগো। তিন গোয়েন্দা, জিনা আর জনি বসে কথা বলছে তখন পুকুর পাড়ে। নাচতে নাচতে চত্বরে ঢুকলো বাচ্চাটা। মানুষ দেখেই ব্যা ব্যা করে উঠলো।

টোগো, এসেছিস! আয়, আয়, এদিকে আয়! চিৎকার করে ডাকলো জনি।

আর, তোর পিঠে লিখলো কে?

ভুরু কোঁচকালো কিশোর।

লেখাটা পড়ার চেষ্টা করে পারলো না মুসা। বললো, শয়তান লোকের কাজ। বাচ্চাটাকে একা পেয়ে তার পিঠে কি লিখে দিয়েছিলো। মুছে গেছে।

ওর সাদা রঙটাই নষ্ট করে দিয়েছে, জিনা বললো জনিকে, ধুয়ে ফেলো। বিচ্ছিরি লাগছে দেখতে।

দাঁড়াও! তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলে উঠলো কিশোর। জে আর এম-এর মতো লাগছে আমার কাছে। আর ওই দুটো অক্ষর বোধহয় আর এবং পি, না না, বি! নিচের অংশটা মুছে যাওয়ায় পি-এর মতো লাগছে।

জে এম! আর বি! উত্তেজনায় দম বন্ধ হয়ে যাবে যেন জনির। কোটর থেকে চোখ প্রায় ঠিকরে বেরোনোর অবস্থা। তার মানে কি জ্যাক ম্যানর আর রিড বেকার! কে লিখলো?

আরও অক্ষর আছে ওর পিঠে, ছোট ছোট করে লেখা! কিশোর বললো, শক্ত করে ধরে রাখা ওকে। পড়ার চেষ্টা করি। আমার বিশ্বাস জ্যাক আর রিডই ওকে দিয়ে মেসেজ পাঠিয়েছে। ওদের কাছেই চলে গিয়েছিলো বাচ্চাটা!

প্রায় মুছে যাওয়া অক্ষরগুলো পড়ার চেষ্টা করতে লাগলো সবাই। মোট চারটা অক্ষর আছে বলে মনে হচ্ছে। ঝোপঝাড়ের ভেতর দিয়ে এসেছে বোধহয় বাচ্চাটা, পাতার ঘষায় ঝাপসা হয়ে গেছে অক্ষর।

শব্দটা কে! দেখতে দেখতে বললো কিশোর। প্রথম অক্ষরটাকে জি. ও. সি. যা খুশি ধরা যায়। কিন্তু তৃতীয় শব্দটা ভি, কোনো সন্দেহ নেই। আমি শিওর লেখাটা কেভ, মানে গুহা। আর গুহার ভেতরেই ঢুকেছিলো টোগো। মুখ তুললো সে। তাহলে ওখানেই নিয়ে গিয়ে আটকে রেখেছে জ্যাক আর রিডকে আর আমরা কিনা ভাবছিলাম…তোমার বাবা কোথায়, জনি?

গোলাঘরের পেছনে পাওয়া গেল কলিউডকে। কাজ করছেন। ভেড়ার বাচ্চা আর ওটার পিঠের লেখা দেখানো হলো তাকে।

কি করবো এখন? জিজ্ঞেস করলো কিশোর। গুহায় ঢুকবো? না পুলিশকে ফোন করবেন?

পুলিশকে অবশ্যই জানানো দরকার, কলিউড বললেন। তোমরা গুহায় চলে যাও। সাথে করে দড়ি নিয়ে যাও বেশি করে। দড়িওয়ালা গুহাগুলোয় ওদেরকে রাখার সম্ভাবনা কম, কারণ ওগুলোতে প্রায়ই লোক ঢোকে দেখার জন্যে। দড়ির একমাথা ধরে সুড়ঙ্গের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকবে একজন। আরেক মাথা ধরে অনন্যরা ভেতরে ঢুকবে। এতে হারানোর ভয় থাকবে না। বুঝতে পেরেছে আমার কথা?

মাথা কাত করলো কিশোর। আপনি না বললেও তা-ই করতাম। তাছাড়া রাফিকে তো নিয়েই যাচ্ছি। ও অনেক সাহায্য করতে পারবে।

মাথা ঝাঁকিয়ে পুলিশে ফোন করতে চলে গেলেন কলিউড।

জনি, কিশোর বললো, জলদি গিয়ে দড়ি নিয়ে এসো। আর টর্চ, যে কটা পারো। মোমবাতি আর দেশলাইও আনবে। গুহায় ঢুকে বিপদে পড়তে চাই না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *